মন্থরাহরণ

বার

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

বিন্ধা পর্বতমালার পাদদেশে কোশলেশ্বর রাজাধিরাজ কুশের সৌধকিরীটিনী নব-রাজধানী কুশাবতী নগরীর প্রবেশপথমুখে গগনচুম্বী স্বর্ণশীর্ষ শ্রীরামমন্দিরের শিখরামলক তখনও সন্ধ্যাসূর্যের শেষরশ্মিপাতে পদ্মরাগমণিগণ্ডের ন্যায় জ্বলিতেছিল, পশ্চিমাকাশ তখনও অপরূপ অস্তরাগের কুঙ্কুমাভায় রঞ্জিত। মন্দিরের প্রশস্ত সোপানশ্রেণী জনপূর্ণ, তাহার দুই পার্শ্বে গন্ধপুষ্পবিক্রেতা ও বিক্রেত্রীরা পুষ্পভার সাজাইয়া বসিয়াছে এবং মৃদুস্বরে পূজার্থীদের সহিত পুষ্পমাল্য ধূপদীপাদির মূল্য লইয়া তর্ক করিতেছে। দুইপার্শ্বে কিয়দ্দূর অন্তর মনুষ্যদেহ-পরিমাণ প্রদীপধারিণী পিত্তলময়ী নারীমূর্তিসমূহের করধৃত দীপমালা জ্বলিয়া উঠিয়াছে। দলে দলে যুবক-যুবতী বৃদ্ধবৃদ্ধা সোপান বাহিয়া উঠিতেছে, নামিতেছে, প্রণাম করিতেছে, পুষ্প ও অর্ঘ্য ক্রয় করিয়া মন্দিরে প্রবেশ করিতেছে। মন্দিরমধ্যে সীতা ও রামের যুগল সুবর্ণমূর্তির সম্মুখে দাঁড়াইয়া শুভ্রশ্মশ্রু পুরোহিত তখনও ষোড়শোপচারে পূজারতি করিতেছিলেন, শঙ্খ, ঘণ্টা, মৃদঙ্গ, দুন্দুভি, পটহ প্রভৃতি নানাজাতীয় বাদ্য বাজিতেছিল, সুরভিত ধূপধূম্রের গন্ধে চারিদিক আমোদিত হইতেছিল। সেই কর্মচঞ্চল জনতার মধ্যে রাজপথসন্নিহিত মন্দিরতোরণের অদূরে সর্বনিম্নস্থ সোপানের একপ্রান্তে একটি প্রায়ান্ধকার স্থানে রাজাধিরাজ কুশ তাঁহার ছত্রধারিণীর সহিত নীরবে দণ্ডায়মান ছিলেন, দুইজন স্বর্ণদণ্ডধারী রাজপুরুষ নিকটে থাকিয়া লক্ষ রাখিতেছিল, কোনও দ্রুত-ধাবমান্ পূজার্থীর সহিত তাঁহার দেহসংঘর্ষ না ঘটে। অল্পক্ষণ পূর্বে তাঁহার পারাবত-দূত পত্র লইয়া আসিয়াছে, অমাত্য ভদ্র মন্থরাকে হরণ করিয়া লইয়া আসিতেছেন। নগরদ্বারে অমাত্যকে পথ দেখাইয়া আনিবার জন্য অনুচর নিযুক্ত করিয়া কুশ তাঁহাদের অভ্যর্থনার জন্য প্রাসাদ হইতে অগ্রসর হইয়া শ্রীরামমন্দিরেই অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি প্রতিদিন রাজকার্যের অবসরে একবার এই মন্দিরে প্রণাম নিবেদন করিতে আসিতেন, আশীর্বাদ ভিক্ষা করিতে আসিতেন। আজ অত্যন্ত চিন্তাকুলিতচিত্তে তিনি উর্ধ্বে মন্দিরের দিকে চাহিয়া তখন বোধহয় স্বর্গগত জনকজননীর আশীর্বাদ ভিক্ষাই করিতেছিলেন। তাঁহার মুখমণ্ডল বিমর্ষ, দেহে ক্লান্তির চিহ্ন সুপরিস্ফুট।

মহারাজ কুশ সত্যই দুশ্চিন্তায় পড়িয়াছেন। সপ্তাহকাল পূর্বে অযোধ্যার নগরদেবী মধ্যরাত্রে তাঁহার শয়নকক্ষে আবির্ভূতা হইয়া তাঁহাকে অযোধ্যায় ফিরিবার জন্য কাতর কণ্ঠে অনুরোধ জানাইয়া গিয়াছেন। পরদিন প্রভাত হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কুশ তাঁহার সচিব এবং সভাসদ্দিগের সহিত ঐ বিষয়ে আলোচনা করিয়াছেন, লোকমত সংগ্রহ করিবার জন্য নগরবৃদ্ধদিগকে আহ্বান করিয়াছেন, কিন্তু কিছুতেই সকলের মতের ঐক্য হইতেছে না। যাঁহারা এক সময়ে আত্মীয়- বিয়োগবেদনায় ব্যাকুল হইয়া বিতৃষ্ণাভরে অযোধ্যা ত্যাগ করিয়া আসিয়াছিলেন— তাহারা অনেকেই ফিরিবার জন্য উৎসুক, অপরপক্ষে যুবকবৃদ্ধস্থপতি তক্ষক ভাস্কর প্রভৃতি যাঁহারা শতে শতে সহস্রে সহস্রে মিলিয়া নূতন নগরী কুশাবতী গড়িয়া তুলিতেছিলেন—তাঁহাদের মতে ফিরিয়া যাওয়া অনুচিত। দেবীদর্শন সম্বন্ধেও বিবিধ মত দেখা যাইতেছিল। মহর্ষি জাবালিপ্রমুখ অবিশ্বাসী কয়েকজন বলিলেন, “স্বপ্নমাত্রই অবচেতন মনের অপূর্ণ বাসনার প্রতিফলন মাত্র। মহারাজ কুশ যাহা দেখিয়াছেন তাহা স্বপ্ন ভিন্ন কিছু নহে, সুতরাং উহার উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করিবার কোনও প্রয়োজন নাই।” অপরপক্ষে ইক্ষ্বাকুবংশের কুলগুরু বসিষ্ঠদেবের তপোবনে কুশ দ্রুতগামী দূত পাঠাইয়াছিলেন, তাঁহার মতে, “দেবীর মনস্কামনা পূর্ণ করিবার জন্য কুশ অচিরে অযোধ্যাভিমুখে যাত্রা করিলেই তাঁহার এবং দেশবাসীর কল্যাণ হইবে।” গুরুদেবের সেই আদেশই শেষ পর্যন্ত কুশ শিরোধার্য করিয়াছেন। সেইদিন প্রাতঃকালেই কুশাবতী নগরে রাজপুরুষগণ রাজাদেশ ঘোষণা করিয়াছেন, “মহারাজ এক সপ্তাহের মধ্যে অযোধ্যায় যাত্ৰা করিবেন; যে-সমস্ত নাগরিক স্বেচ্ছায় তাঁহার অনুগমন করিবেন,—রাজকোষ হইতে তাঁহাদিগকে অযোধ্যায় পরিত্যক্ত গৃহ সংস্কারের জন্য অর্থসাহায্য করা হইবে, রাজকৃত্যক হইতে তাঁহাদের সপরিবারে গমনের জন্য অশ্বরথশকটাদির ব্যবস্থা করা হইবে। বণিক্‌গণ বিনাভাটকে আপণগৃহ পাইবেন, বিনা শুল্কে পাঁচবৎসর বাণিজ্য করিতে পারিবেন। ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্যশূদ্রনির্বিশেষে নাগরিক সকলেই যাহাতে অযোধ্যায় পুনর্বাসনের সুযোগ পান সেজন্য রাজা স্বয়ং দায়িত্ব লইয়াছেন। দ্বিপ্রহরে কয়েকশত কুঠারজীবী যাত্রাপথের এবং পরিত্যক্ত অযোধ্যানগরীর বনজঙ্গল পরিষ্কার করিবার জন্য এবং কয়েক শত মার্গ নির্মাণদক্ষ শিল্পী ও স্থপতি হস্তী-অশ্ব-উষ্ট্র-খর-শকটাদি-সহ অযোধ্যার পথ ও গৃহসমূহ মনুষ্যবাসোপযোগী করিবার জন্য প্রেরিত হইয়াছে। মন্দির সোপানে দাঁড়াইয়া কুশাবতীর স্থাপয়িতা শতসহস্র স্থপতির নিয়োগকর্তা এবং ভাগ্যনিয়ন্তা তরুণ নৃপতি সন্ধ্যান্ধকারে সুদূরবিস্তৃত নগরীর আলোকমালার দিকে চাহিয়া আসন্ন বিচ্ছেদবেদনায় মাঝে মাঝে বিহ্বল হইয়া পড়িতেছিলেন, আবার মন্দিরের দিকে চাহিয়া অন্তরে বলসঞ্চয় করিতেছিলেন; নিজের মনকে বলিতেছিলেন, “পিতা পিতৃসত্যপালনের জন্য এক মুহূর্তে সসাগরা পৃথিবীর আধিপত্য ত্যাগ করিয়া বনবাসে যাইতে পারিয়াছিলেন, আর আমি একটা সামান্যা নগরীর মায়া ত্যাগ করিয়া কুলদেবতার সম্মানরক্ষা করিতে পারিব না?”

রাজাধিরাজ কুশ এবংবিধ চিন্তা করিতে করিতে একবার মন্দিরের দিকে, একবার পথের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতেছেন, এমন সময়ে একটি সুসজ্জিত-উষ্ট্র-সমভিব্যাহারে একদল যাত্রী অশ্বপৃষ্ঠে এবং পদব্রজে মন্দিরতোরণে আসিয়া উপস্থিত হইল। অমাত্য ভদ্র তাহার পরিচরবর্গের অগ্রে আসিতেছিলেন, তিনি অশ্ব হইতে অবতরণ করিতেই কুশ অগ্রসর হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন করিলেন, ভদ্রও তাঁহার আলিঙ্গনপাশমুক্ত হইয়া তাঁহাকে সসম্ভ্রমে অভিবাদন করিলেন। পরস্পরের কুশল প্রশ্নবিনিময়ের পর কুশ চারিদিকে চাহিয়া বলিলেন, “কই মন্থরাকে দেখিতেছি না?”

ভদ্র হাসিয়া বলিলেন, “মহারাজ, বহুমূল্য রত্ন কি প্রকাশ্যে আনা যায়? মন্থরা ঐ মঞ্জুষার মধ্যে আছে, এখনই দেখিতে পাইবেন। এখন আমাকে ক্ষণকালের জন্য বিদায় দিন, আমার পরিচয় তাহার না জানাই মঙ্গল।” ভদ্র মৃদুস্বরে উষ্ট্রপৃষ্ঠবিলম্বিত মঞ্জুষা ও অন্যান্য দ্রব্যাদি নামাইতে নির্দেশ দিয়া সোপানশ্রেণী বাহিয়া দ্রুতপদে মন্দিরে প্রবেশ করিলেন। কুশ নিজ-মনে হাসিলেন, দুর্মূর্খেরও তাহা হইলে চক্ষুলজ্জা আছে!

কিঙ্করগণ মঞ্জুষা নামাইয়া উহার উর্ধ্বদেশ উদ্ঘাটন করিতেই মন্থরা আবির্ভূতা হইল। সে মঞ্জুষাগর্ভ হইতে অন্যের বিনা-সাহায্যেই বাহির হইয়া আসিল, তারপর চতুর্দিকে চাহিয়া বিস্ময়সূচক একটা অস্ফুট শব্দ করিয়া বলিল, “এ আমাকে কোথায় আনিলেন, প্রভু?” তারপর সন্ন্যাসীকে নিকটে দূরে কোথাও দেখিতে না পাইয়া আবার কাতর কণ্ঠে প্রশ্ন করিল, “কই, তিনি কোথায়? তোমরা কে? এ আমি কোথায় আসিলাম?”

বলা বাহুল্য, সন্ন্যাসীর শিষ্যবেশী অনুচরেরা সকলেই ছদ্মবেশ ত্যাগ করিয়াছিল, মন্থরা সেজন্য কাহাকেও চিনিতে পারিতেছিল না, এমন সময় কুশ কিঙ্করগণের মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইলেন। মন্থরার তাঁহাকে চিনিতে বিলম্ব হইল না, তাঁহার হাস্তোদ্ভাসিত মুখের দিকে দৃষ্টি পড়িতেই সে আর্তকণ্ঠে চীৎকার করিয়া উঠিল, “এ কি? ইহার পূর্বে আমার মৃত্যু হইল না কেন? ওগো, তোমরা আমাকে হত্যা করো। আমি নদীগর্ভে ডুবিয়া মরিলাম না কেন, বিষ খাইলাম না কেন? এ দগ্ধমুখ আমি রামের পুত্রকে দেখাইবার জন্য কেন জীবিতা রহিলাম!”

কুশও বিকৃতাবয়বা কুব্জার পরিবর্তে এই অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতীকে দেখিয়া বিস্ময়ে হতবাক্ হইয়াছিলেন, তাহাকে মন্থরা বলিয়া বিশ্বাস করিতেই তাঁহার সঙ্কোচবোধ হইতেছিল। কিন্তু রমণী যখন দুই হস্তে মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত করিয়া বারংবার আর্তস্বরে বলিতে লাগিল, “প্রভু, আমি আপনার শরণ লইয়াছিলাম, এই কি তাহার প্রতিফল? আপনি আমাকে ব্যাঘ্রের বিবরে পরিত্যাগ করিয়া কোথায় গেলেন? আপনি আমাকে আপনার তপোবনে স্থান দিবেন বলিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন, এই কি আপনার তপোবন? হায়, সংসারে কি একজন মানুষকেও বিশ্বাস করিবার উপায় নাই? সর্বত্রই ছলনা, সর্বত্রই নিরীহ নির্বোধের প্রাণনাশের জন্য ব্যাধগণ মায়াজাল পাতিয়া বসিয়া আছে।”

তখন কুশের মনের দ্বিধা ঘুচিল, বাক্‌স্ফূর্তি হইল; আরও একটু অগ্রসর হইয়া তিনি কোমলকণ্ঠে বলিলেন, “মন্থরা, তুমি শান্ত হও। আমার দ্বারা তোমার কোনও ক্ষতি হইবে না। তুমি আমাদের রাজান্তঃপুরে সসম্মানে স্থান পাইবে, যতদিন জীবিতা থাকিবে—ততদিন আমরা তোমার ভরণপোষণ এবং সেবা করিব। আমারই নির্দেশ অনুসারে অমাত্য ভদ্র তোমাকে বারাণসী হইতে লইয়া আসিয়াছেন, আমি আমার নবরাজধানী কুশাবতীতে তোমাকে স্বাগত জানাইতেছি।”

মন্থরা কিছুক্ষণ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া রহিল; নবীন নৃপতির প্রসন্ন মুখের অভয়বাণী তাহার মর্মস্পর্শ করিল। সে নতজানু হইয়া কিছুক্ষণ তাঁহার পদতলে বসিয়া কাঁদিল। তারপর বলিল, “তুমি কি জানো, আমি তোমার মাতৃদেবীর স্বর্ণমূর্তি চূর্ণ করিতে উদ্যত হইয়াছিলাম? তুমি কি জানো, আমি অযোধ্যা পরিত্যাগ করিবার পূর্বে রাজপ্রাসাদের বহু অমূল্য চিত্র ও ভাস্কর্য নষ্ট করিয়াছি?”

কুশ হাস্যমুখে কহিলেন, “জানি।”

মন্থরা প্রশ্ন করিল, “তোমার প্রদত্ত শান্তি আমার সহ্য হইত, কিন্তু ক্ষমা কিরূপে সহ্য করিব, মহারাজ?”

কুশ বলিলেন, “ক্ষমার প্রশ্ন উঠে না। সংসারের মানুষ তোমাকে ভুল বুঝিয়াছিল, তোমার দ্বারা তাই কেবল সংসারের অকল্যাণই হইয়াছে। তোমার প্রতি ঈশ্বর অবিচার করিয়াছেন, মানুষ অবিচার করিয়াছে, তুমিও তৎপরিবর্তে অন্যের ক্ষতি করিয়াছ। আজ আমরা ভ্রমসংশোধনের চেষ্টা করিতে চাই, তুমি আমার সহায় হইবে না?”

মন্থরা কিছুক্ষণ নীরবে নতমুখে বসিয়া থাকিয়া সহসা কুশের পাদস্পর্শপূর্বক প্রণাম করিল। অশ্রুগদগদ কণ্ঠে কহিল, “মহারাজ, আপনি, — তুমি সত্যই সীতাদেবীর পুত্র। এই ধরিত্রীর মতো সহনশীলতা তোমাতেই সম্ভব। এক্ষণে আমি কী করিব বলিয়া দাও।”

কুশ বলিলেন, “রাজান্তঃপুরিকা যাঁহারা মন্দিরে আসিয়াছেন তাঁহাদের সংবাদ দিতেছি, তুমি তাঁহাদের সহিত আজ অন্তঃপুরে যাও। দীর্ঘপথভ্রমণে তুমি পরিশ্রান্তা আছ, এখানে জনকোলাহলের মধ্যে দাঁড়াইয়া থাকিলে বিশ্রামের আশা নাই। কল্য তোমার ভবিষ্যতের কথা আলোচনা করা যাইবে।”

মন্থরা বলিল, “মহারাজ, যখন এত দয়া করিয়াছ, তখন আর একটু দয়া করো, আমাকে রাজাস্তঃপুরে প্রবেশ করিতে আদেশ দিয়ো না। সেখানে আমার পরিচিতা বহু নারী এখনও আছে, তুমি ক্ষমা করিলেও তাহারা আমাকে ক্ষমা করিবে না, নিরন্তর দিবারাত্র ঘৃণা এবং বাক্যানলে দগ্ধ করিবে।”

কুশ বলিলেন, “তবে কোথায় থাকিতে চাও বলো? আমি উপস্থিত মন্দিরে প্রণাম করিয়া প্রাসাদে ফিরিব, আজ রাত্রে অন্ততঃ সেখানে ফিরিলে ভালো করিতে, শ্রান্তিবিনোদনের সুযোগ পাইতে।”

মন্থরা বলিল, “এ কাহার মন্দির, মহারাজ? এখানে আমার স্থান হয় না?”

কুশ বলিলেন, “এ শ্রীরামমন্দির। এখানে আমার পিতৃদেব ও মাতৃদেবীর সুবর্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে, দেখিতে চাও তো আমার সঙ্গে আসিতে পারো। পুরোহিত ঠাকুর তোমাকে মন্দিরসন্নিহিত পরিচারিকাদের গৃহে স্থান দিতে পারেন কি না তাহাও সেইসঙ্গে জানিয়া আসিতে পারিবে।”

মহারাজ কুশ মন্দির সোপান আরোহণে অগ্রগামী হইলেন, মন্থরা ছত্রধারিণী এবং রাজভৃত্যগণ তাঁহাকে অনুসরণ করিল। মন্দিরে প্রবেশ করিয়া কুশ দেখিলেন, তখনও আরতি শেষ হয় নাই; ধূপধুম্রে প্রায়ান্ধকার কক্ষের একপ্রান্তে দ্বারের অদূরে অমাত্য ভদ্র রামসীতার যুগল প্রতিমার দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে চাহিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। কুশ তাঁহার পার্শ্বে গিয়া দাঁড়াইলেন। ভদ্র তাঁহাকে দেখিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, “বিশাখদত্ত পাপিষ্ঠ হইলে কি হইবে, নিপুণ শিল্পী। প্রভুর মূর্তি যেন জীবন্ত বোধ হইতেছে।”

কুশ হাসিলেন। বলিলেন, “সত্য। আমি মাঝে মাঝে ভুলিয়া যাই যে, পিতা জীবিত নাই। মন্দিরের যে প্রান্তেই দাঁড়াই পিতার স্নেহদৃষ্টি যেন আমাকে সাহায্য এবং সান্ত্বনা দান করে।”

মন্থরা কুশের পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রবেশ করিয়া তাঁহার পার্শ্বে দাঁড়াইয়া নির্নিমেষ নেত্রে আরতি দেখিতেছিল, আরতিশেষে সকলের সহিত সেও ধুলায় লুটাইয়া প্রণাম করিল। তারপর উঠিয়া দাঁড়াইয়া সহসা অমাত্যের চক্ষুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া প্রশ্ন করিল, “আপনিই অমাত্য ভদ্র? আপনি সন্ন্যাসিবেশে আমাকে প্রতারণা করিয়া এখানে লইয়া আসিয়াছেন? বিশ্বাসপরায়ণা অসহায়া নারীকে ছলনা করিতে আপনার লজ্জা বোধ হয় নাই?”

ভদ্র বলিলেন, “ভদ্রে, আমি কুখ্যাত দুমুখে, আমাকে বেশী ঘাঁটাইও না। যখন বুদ্ধিহীনা কৈকেয়ীকে দিয়া নিরপরাধ রামকে অভিষেকমুহূর্তে বনবাসে পাঠাইয়াছিলে, তাহার ফলে বৃদ্ধ দশরথের প্রাণবিয়োগ ঘটাইয়া অযোধ্যার আবালবৃদ্ধবনিতাকে কাঁদাইয়াছিলে,— সেদিন তোমার লজ্জা বোধ হয় নাই? বৃদ্ধবয়সে সীতাদেবীর দয়ায় রানীর ঐশ্বর্যে বাস করিয়া রামতিরোধানদিবসে রাজ্যের চরম দুর্দিনে যখন সীতাদেবীর স্বর্ণপ্রতিমা ভঙ্গ করিতে উদ্যত হইয়াছিলে,— তখন তোমার লজ্জা বোধ হয় নাই? যখন পিতামহী পরিচয়ে মূর্খ উচ্ছিখকে লইয়া প্রণয়লীলায় নামিয়াছিলে, মূর্খ কাশীরাজকে রূপের কুহকে মুগ্ধ করিয়াছিলে, তখন তোমার লজ্জা করে নাই? যখন অনাথা অসহায়া উৎপলার নাসিকাচ্ছেদন এবং চক্ষু উৎপাটন করিয়া, — চন্দনার যৌবন হরণ করিয়া নিজের রূপগরিমা বৃদ্ধি করিয়াছিলে তখন তোমার লজ্জা করে নাই, মন্থরা? যখন কাশীরাজমহিষী মহাদেবীকে বিনা দোষে পতিঘাতিনী বলিয়া প্রমাণ করিতে, তাঁহার পুত্রকে মৃত্যুমুখে প্রেরণ করিতে সচেষ্ট হইয়াছিলে, তখন তোমার লজ্জাবোধ কোথায় ছিল, মন্থরা?”

মন্থরা অধোবদনা হইল। পূজাশেষে পুরোহিতের করধৃত প্রজ্বলিত আরতিপ্রদীপের উত্তাপ নিজ নিজ করতলে সংগ্রহ করিয়া অনায়াসে সন্তানসন্ততির এবং আপন আপন ইহপরকালের ইষ্টলাভের আগ্রহে যে-সমস্ত পুণ্যার্থিনী এতক্ষণ পরস্পরের সহিত প্রতিযোগিতা করিতেছিলেন তাঁহারা উভয়ের বাদানুবাদে আকৃষ্ট হইয়া পুণ্যলোভ ত্যাগ করিয়াই মন্থরা, ভদ্র ও কুশকে ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। সকলেরই চক্ষে কৌতূহল, মুখে অব্যক্ত জিজ্ঞাসাচিহ্ন, “কে এই অপূর্ব সুন্দরী রমণী? মহারাজ কুশ জিতেন্দ্রিয় বলিয়া বিখ্যাত, তাঁহার পার্শ্বে এ কেন? এই ব্যক্তিই বা কে? এ উহাকে ‘মন্থরা’ বলিয়া সম্বোধন করে কেন? ইহাদের কিসের কলহ?”

নারীদের সঙ্গে পুরুষ এবং শিশুরাও চতুর্দিকে কৌতূহলবশবর্তী হইয়া ঘনাইয়া আসিতেছে দেখিয়া কুশ অস্বস্তিবোধ করিতেছিলেন, করজোড়ে সমবেত জনতাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “আপনারা দয়া করিয়া একটু পথ দিন, আমরা বাহিরে যাইতে পারিতেছি না। আমার সঙ্গী ও সঙ্গিনী দীর্ঘ পথভ্রমণে ক্লান্ত আছেন।”

কে কাহার কথা শুনে? মহারাজের ভাষণ শুনিবার জন্য তখন পর্যন্ত যাহারা দূরে ছিল তাহারাও অগ্রসর হইয়া আসিল। তখন নিরুপায় হইয়া স্বর্ণদণ্ডধারী রাজভৃত্যগণ ব্যূহরচনা পূর্বক বিভিন্ন দিকে জনতাকে ঠেলিয়া পথ পরিষ্কার করিতে লাগিল। শ্রোতৃবৃন্দ কিয়দ্দূরে অপসৃত হইলে কুশ বিরক্তিবিরস কণ্ঠে ভদ্রকে বলিলেন, “মন্দিরের মধ্যে দাঁড়াইয়া এ-সব কথা কেন? আপনি আজ শুধু নিজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন নাই, আমাকে পর্যন্ত অপদস্থ করিয়াছেন। একজন সামান্যা নারীর কটুবচনে এতটা বিচলিত হইবার আপনার কোনও কারণ ছিল না। আমার অমাত্যরূপে আমার নির্দেশে আপনি মন্থরাকে লইয়া আসিয়াছেন, কেবল এই কথাটা তাহাকে জানাইলেই যথেষ্ট হইত। যাক্, আপনি বয়োবৃদ্ধ, আপনাকে উপদেশ দেওয়া আমার পক্ষে শোভন হয় না, অথচ না বলিয়াও পারিলাম না। আপনি শ্রান্ত, এখন গৃহে গমন করুন। কল্য প্রাতে রাজপ্রাসাদের গুপ্ত মন্ত্রণাগারে আসিবেন, সেইখানে আপনার কার্যবিবরণী আনুপূর্বিক শ্রবণ করিব। শুধু তৎপূর্বে একটা কথা আপনাকে জানাইয়া দিই। এই নারী ভালো হউক, মন্দ হউক, এক্ষণে আমার আশ্রিতা। আমি ইহাকে ক্ষমা করিয়াছি, অভয় দিয়াছি। ইহাকে অপমান করার অর্থ আমাকে অপমান করা,—সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রভুশক্তিকে অপমান করা,— এ কথা স্মরণ রাখিবেন। আপনি যদি একান্তই ইহাকে ক্ষমা করিতে না পারেন, তবে অন্ততঃ আমার মর্যাদা রক্ষা করিবার জন্য জনসমাজে ইহার সহিত ভদ্রোচিত ব্যবহার করিবেন, নারীর সম্মান রক্ষা করিয়া চলিতে চেষ্টা করিবেন। সত্য বলিতে নিষেধ করি না, কিন্তু সত্যবচনও প্রিয়ভাবে বলা যায়। দুর্মুর্খ হওয়ায় কোনও গৌরব নাই, মনে রাখিবেন। যান।”

অমাত্য ভদ্র প্রথমতঃ স্তম্ভিত হইয়া কুশের দিকে চাহিয়া ছিলেন, তৎপরে নতমস্তকে তাঁহার তিরস্কারবাণী শুনিতেছিলেন। কুশ নীরব হইলে তিনি নীরবেই অভিবাদন করিয়া বিদায় লইলেন। স্বর্ণদণ্ডধারী জনৈক রাজভৃত্য অগ্রগামী হইয়া ভিড় ঠেলিয়া তাঁহাকে মন্দির বহির্দেশে সোপানশ্রেণীর সম্মুখে পৌঁছিয়া দিয়া গেল, কিন্তু কৌতূহলী জনতা তখনও তাঁহার সঙ্গ পরিত্যাগ করিল না। পশ্চাৎ হইতে কে যেন বলিল, “অমাত্য ভদ্ৰ বলিয়া বোধ হইতেছে যেন?”

অপর এক জন বলিল, “তাই তো দেখিতেছি। বহুদিন হইল দেশত্যাগী; শুনিয়াছিলাম, সন্ন্যাসী হইয়াছে, সেরূপ তো লক্ষণ দেখিতেছি না।”

আর একজন বলিল, “রামতিরোধান দিবসে প্রাসাদ হইতে যথেষ্ট ধনরত্ন সরাইয়াছিল শুনিয়াছি, ওদিকে উহার পরিত্যক্তা গৃহিণীর তো সংসার চলে না। অত অর্থ লইয়া লোকটা করিল কি?”

একটি পুণ্যবতী মহিলা বলিলেন, “কী করিল বুঝিতে পারিতেছ না? কন্যার বয়সী ঐরূপ সুন্দরীদের দয়া পাইতে হইলে অর্থ লাগে।”

আর একজন বলিলেন, “তা বটে। ঐ অবিদ্যাটাকে সংগ্রহ 0করিয়া আনিয়াছে নিশ্চয় মহারাজকে উপঢৌকন দিয়া ক্ষমালাভ করিবার জন্য। কোথাকার মেয়ে কে জানে?”

পূর্বোক্তা পুণ্যবতী কহিলেন, “কাজ নাই ও-সব পাপকথায়। তবে মহারাজ আমাদের শিশু নহেন, তাঁহাকে ভুলানো সহজ হইবে না। কেমন ধাতানিটা দিলেন, দেখিলে না? আমাদের অমাত্য নিঘৃর্ণ, উহার ভিটায় ঘুঘু চরাইয়া ছাড়িবেন, দেখ না। রাজার সম্পত্তি চুরি করিয়া যাইবে কোথায়?”

একজন বৃদ্ধ মন্তব্য করিলেন, “কুশ মাতৃনির্বাসন বিস্মৃত হন নাই, সহস্র চক্ষুর সম্মুখে পাপিষ্ঠকে কী অপমানটাই না করিলেন! তারপর কুক্কুরের মতো দূরদূর করিয়া তাড়াইয়া দিলেন। বেশ হইয়াছে।”

আর একজন বৃদ্ধ ভক্ত বলিলেন, “রাজা আমাদের বয়সে নবীন হইলে কি হইবে, বিবেচক ব্যক্তি। দুমুর্খটাকে তাড়াইলেন বটে, কিন্তু সুন্দরীটিকে হাতছাড়া করেন নাই। আহা, হতভাগ্য ভদ্রের দুই কুলই গেল।”

চারিদিকে হাসির রোল উঠিল, নানা মুখরোচক আলোচনা করিতে করিতে সকলেই অগ্রসর হইল।

অমাত্যের বুকের মধ্যে তখন বহ্নিগিরি অগ্নি উদ্গিরণ করিতেছে, তিনি নতমস্তকে দণ্ডায়মান থাকিয়া সমস্তই শুনিলেন। তাঁহাকে নানারূপে আঘাত করিয়াও যখন কোনও সাড়া পাওয়া গেল না তখন তাঁহার রসজ্ঞতায় সন্দিগ্ধ হইয়া প্রথমোক্ত নরনারীর দল তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেল। ভদ্র তখন পিছন ফিরিয়া দেখিলেন, গর্ভগৃহের কেন্দ্রস্থলে স্বর্ণবেদিকায় স্বর্ণসিংহাসনে উপবিষ্ট শ্রীরামচন্দ্র ক্ষমাসুন্দর নির্নিমেষ নয়নে তাঁহারই দিকে চাহিয়া আছেন, আর তাঁহার বেদিতলে নতজানু হইয়া বসিয়া কুশ এবং মন্থরা বৃদ্ধ পুরোহিতের নিকট হইতে প্রসাদী নির্মাল্য গ্রহণ করিতেছেন। ভদ্র অস্ফুট কণ্ঠে স্বর্ণপ্রতিমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “মহারাজ, প্রভু! কর্তব্যবোধে তোমাকে কঠিন দুঃখ দিয়াছি, তাই কি পুত্রের হস্তে আমার জন্য আজ এই কঠিন শাস্তি পাঠাইলে?”

জনৈক স্থূলকায় ধনী ব্যক্তি রাত্র্যন্ধতাবশতঃ ভদ্র যে পথিমধ্যে দণ্ডায়মান আছেন তাহা বুঝিতে পারেন নাই, সবেগে আসিয়া তাঁহার বক্ষোলগ্ন হইলেন এবং পরক্ষণেই ভূপতিত হইলেন। ভদ্র তাহাকে ধরিয়া তুলিতেই তিনি ক্ৰোধকম্পিত কণ্ঠে বলিলেন, “কে হে তুমি? চক্ষে দেখিতে পাও না? অন্ধকারে নগরবৃষের মতো পথ জুড়িয়া দাঁড়াইয়া আছ কেন?”

তাহার সমভিব্যাহারী আর এক ব্যক্তি পিছন ফিরিয়া অবিলম্বে ভদ্রের ঐ ভাবে দণ্ডায়মান থাকিবার কারণ নির্ধারণ করিয়া ফেলিল, তাঁহারই দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া সে দেখিল মন্থরাকে। বলিল, “কি হে, সুন্দরী নারী কখনও দেখ নাই বুঝি? কিন্তু ওদিকে দৃষ্টি দিয়া কোনও লাভ হইবে না, বৎস, ও রাজভোগ্য হবি, তোমার মতো সারমেয়ের পাকস্থলীতে সহ্য হইবে না।”

ইহারা অমাত্যকে চিনিত না, অমাত্যের অন্তরে ইহাদের বিষদিগ্ধ বাক্যবাণ বিদ্ধ হইয়া কী গভীর যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের সৃষ্টি করিতেছিল, তাহা ধারণা করিবার শক্তি ইহাদের ছিল না। মন্দিরদ্বারের বাহিরে আসিয়া পর্যন্ত ভদ্র যেন চলচ্ছক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন, তাঁহার চক্ষুদ্বয়ে অশ্রুবাষ্পে আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছিল। তখন তিনি সোপানাবতরণ করিবেন কি, প্রতিপদেই তাহার পদস্খলনের সম্ভাবনা ঘটিতেছিল। জরাজীর্ণ বৃদ্ধের ন্যায় তিনি এক-একটি সোপানে নামিয়াই কিছুক্ষণ বিশ্রাম লইতেছিলেন। একটি বৃদ্ধা তাঁহার অবস্থা দেখিয়া বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠে মন্তব্য করিলেন, “রাজপুরুষেরা এই মদ্যপগুলাকে মন্দিরে প্রবেশ করিতে বাধা দেয় না কেন?”

দ্বিতীয়া বৃদ্ধা মালা ফিরাইতে ফিরাইতে বলিলেন, “মদ্যপ নয় গো, মদ্যপ নয়, এ সমস্তই ভান। একদণ্ড পূর্বে এই মানুষটাকে দ্রুতপদে উপরে উঠিতে দেখিয়াছি। নিশ্চয়ই কোনও কু-অভিসন্ধি লইয়া কাহারও জন্য অপেক্ষা করিতেছে। শিকারী বিড়ালের গুম্ফ দেখিয়া চিনিতে পারো না!”

প্রথমা বৃদ্ধা বলিলেন, “আকৃতি দেখিয়া তো ভদ্র ইতর বোঝা যায় না। চল, না হয় তোরণের প্রহরীকে সাবধান করিয়া দিয়া যাই। অনেক সালাঙ্কারা ধনিকন্যা এবং রাজান্তঃপুরিকা আসিয়াছে, কাহার উপর কখন উপদ্রব করিবে কে জানে? এগুলা মানুষ, না পশু?”

অমাত্য ভদ্র এ-মন্তব্যও শুনিলেন, মনে মনে বলিলেন, “ধরণী, তুমি দ্বিধা হও, আমার এ-লজ্জা নিবারণ করো। আর যে সহ্য হয় না।” তিনি আর একটি সোপান অতিক্রম করিতে গিয়া স্খলিতপদ হইলেন, সেই মুহূর্তে একটি সবল কোমল শঙ্খবলয়শোভিত নারীবাহু তাঁহার দক্ষিণ পার্শ্ব হইতে অগ্রসর হইয়া তাহার বাম কটিদেশ বেষ্টন করিয়া ধরিল, তাঁহার পতনোন্মুখ দেহের ভার নিজ দেহে লইয়া একটি অর্ধাবগুণ্ঠিতা সুরূপা প্রৌঢ়া রমণী তাঁহাকে আসন্ন পতন হইতে রক্ষা করিলেন। সুতপা স্বামীর কানে কানে বলিলেন, “আমি সঙ্গে আছি, ভয় কি? আমার স্কন্ধে ভর দিয়া চলো।”

কুশাবতীর রাজপ্রাসাদে সভাগৃহ এবং অন্তঃপুরের মধ্যপথে সু-উচ্চ প্রাচীরবেষ্টিত উদ্যানাভ্যন্তরে রক্তপ্রস্তরনির্মিত একটি সুরম্য গৃহ রাজাধিরাজ কুশের গুপ্তমুন্ত্রণাগাররূপে ব্যবহৃত হইত। সেদিন প্রভাতে সেখানে মন্ত্রণাসভা বসিয়াছিল। নবীন নৃপতি তাহার অষ্টসচিবসহ যথাযোগ্য আসনে উপবিষ্ট হইয়া সাম্রাজ্যের শুভাশুভ বিষয়ে আলোচনা করিতেছিলেন। বিভিন্ন প্রান্তপাল, মহাসামন্ত, দণ্ডনায়ক, কোট্টপাল, হস্ত্যধ্যক্ষ, অশ্বাধ্যক্ষ, তরিক প্রভৃতি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন-প্রান্তে-নিযুক্ত রাজপুরুষদিগের নিকট হইতে সংগৃহীত সংবাদ দূত-প্রৈষণিক সভায় নিবেদন করিলেন, জ্যেষ্ঠকায়স্থ এবং মহামুদ্রাধিকৃতের সহায়তায় সম্রাটের মুদ্রাঙ্কিত আদেশপত্র সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরিত হইল। অতঃপর অন্য সকলকে বিদায় দিয়া মহারাজ কুশ সচিববর্গকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “যতদূর বুঝা যাইতেছে, তাহাতে রাজধানী স্থানান্তরিত করিলে আশু কোনও বিপদের সম্ভাবনা নাই। প্রজাগণ এবং সৈন্যগণ মুখী এবং সন্তুষ্ট, রাজ্যের সর্বত্র শাস্তি বিরাজিত।”

স্পষ্টবাদী বলিয়া সচিবগণের মধ্যে তক্ষকের দুর্নাম ছিল। তিনি বলিলেন, “মহারাজ, আজ যেখানে শান্তি বিরাজিত, কল্য সেখানে অশান্তি জাগ্রত হইতে বাধা নাই। সাম্রাজ্যের কেন্দ্ররূপে কুশাবতী অযোধ্যা অপেক্ষা শ্রেয়স্তর, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। অযোধ্যা অনেক উত্তরে, জম্বুদীপের দক্ষিণ প্রান্তে লঙ্কাদ্বীপ পর্যন্ত শাসনে রাখিতে হইলে বিন্ধ্যসন্নিহিত মধ্যদেশই কেন্দ্রীয় রাজশক্তির পক্ষে প্রশস্ত। মহারাজ এখনও অযোধ্যাযাত্রার আদেশ প্রত্যাহার করিলে ভবিষ্যতে অনুতাপ করিতে হইবে না।”

অমাত্য সুনন্দ শ্রীরামচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন, তিনি সম্প্রতি নৃপতির মুখ্যসচিব। তত্ত্বজ্ঞ এবং সর্বাপেক্ষা বয়োবৃদ্ধ বলিয়া মহারাজ কুশের তিনি সর্বাপেক্ষা বিশ্বাসভাজন ছিলেন। কুশ তাঁহার দিকে চাহিতে তিনি বলিলেন, “মহারাজ, মানবেন্দ্র মনুপ্রমুখ শ্রেষ্ঠ রাজর্ষিবৃন্দ, ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি আপনার পূর্বপিতামহগণ সকলেই অযোধ্যা নগরীকে কেন্দ্র করিয়া সসাগরা পৃথিবী শাসন করিয়াছেন। বিরলবসতি দাক্ষিণাত্যে এবং বন্ধুভাবাপন্ন লঙ্কা রাজ্যে আমাদের অচিরভবিষ্যতে বিপদের কারণ নাই, অপর পক্ষে উত্তরপশ্চিম সীমান্ত হইতে গিরিপথ দিয়া যে কোনো মুহূর্তে দুর্ধর্ষ শত্রুদল জম্বুদ্বীপ আক্রমণ করিতে পারে, সীমান্তবাসী যবন, গন্ধর্ব, কিন্নর এবং হিমাচলপাদবাসী কিরাতদিগকেও বিশ্বাস নাই, সদা সতর্ক না থাকিলে উত্তরাপথের যে-কোনো রাজ্যে বিদ্রোহ ঘটিতে পারে। শাসিত রাজ্যের বিস্তৃতির দৈর্ঘ্য বিচার না করিয়া জনসংখ্যা, কোষ, অস্ত্রবল, সৈন্যবল, শিক্ষায় অগ্রসরতা ইত্যাদিই বিচার করিতে হয়। সেদিক দিয়া অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনই আমার মতে উপস্থিত কর্তব্য।”

তক্ষক বলিলেন, “বহু সহস্র বৎসরের স্বাচ্ছন্দ্যের ফলে অযোধ্যার নাগরিকেরা অলস বিলাসী এবং অকর্মণ্য হইয়া যাইতেছিল, রাজধানী পরিবর্তনের ফলে তাহাদের মধ্যে যেটুকু জাগৃতির চিহ্ন দেখা দিয়াছে, পুরাতন আবাসে ফিরিয়া গেলে অবিলম্বে তাহা অন্তর্হিত হইবে, তাহারা নিদ্রিতাবস্থায় সহসা কোনও প্রবল শত্রুর কবলে পড়িবে।”

সুনন্দ বলিলেন, “বহু সহস্র বৎসরের সভ্যতার এবং সংস্কৃতির, শৌর্যের এবং অভিজ্ঞতার ধাত্রী অযোধ্যা। অতীত মহত্ত্বের উত্তরাধিকার হেলায় ত্যাগ না করিয়া তাহাকে আদর্শরূপে গ্রহণ করিতে পারিলে অযোধ্যা চিরদিন ‘অ-যোধ্যা’ই থাকিবে।”

উভয়েই ক্রমে উত্তপ্ত হইতেছেন দেখিয়া কুশ তাঁহাদিগকে বাধা দিলেন, বলিলেন, “অযোধ্যা-প্রসঙ্গ এখন আর আলোচনা করিয়া লাভ নাই, ইক্ষ্বাকু বংশের কুলগুরু বসিষ্ঠদেব ত্রিকালজ্ঞ মহর্ষি, তিনি যে আদেশ দিয়াছেন তাহাই আমরা শিরোধার্য করিয়াছি। আমার অনুরোধে তিনি শীঘ্রই এখানে আসিতে সম্মত হইয়াছেন। উপস্থিত আমরা প্রসঙ্গান্তরে গমন করি আসুন। আপনারা জানেন, অমাত্য ভদ্র গতকল্য সন্ধ্যার কুখ্যাতা পলাতকা দাসী মন্থরাকে ফিরাইয়া আনিয়াছেন। কী কৌশলে কুরূপা মন্থরা অপরূপ রূপলাবণ্যবতী হইয়া কাশীরাজ সুপর্ণকে বিবাহ করিরাছিল, কী কৌশলে সন্ন্যাসীর বেশধারী অমাত্য ভদ্র তাহাকে কাশী হইতে অপহরণ করিয়া আনিয়াছেন তাহা আপনারা ইতঃপূর্বে অবগত হইয়াছেন। এক্ষণে সমস্যা হইয়াছে, মন্থরাকে কোথায় স্থান দেওয়া যায়? সে রাজপ্রাসাদে থাকিতে সম্মতা নহে, আমাদের সহিত অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করিতেও সম্মতা নহে। তাহাকে লইয়া কী করা যায়?”

অমাত্য ভদ্র সচিববর্গের মধ্যে বসিয়াছিলেন। তাঁহার মনে পূর্বরাত্রে যে ক্ষোভের সঞ্চার হইয়াছিল, অদ্য প্রভাতে কুশের অকপট ক্ষমাপ্রার্থনায় তাহা বিদূরিত হইয়াছে। কুশ অন্যান্য সচিবগণের সম্মতিক্রমে তাঁহাকে তাঁহার অর্থসচিব পদে বরণ করিয়াছেন, তাঁহাকে মুদ্রাঙ্কিত নিয়োগপত্র দিয়াছেন।

তিনি বলিলেন, “মহারাজ, আমি কি এখন বিদায় লইতে পারি? জ্যেষ্ঠকায়স্থ এবং কোষাধ্যক্ষ বোধ হয় আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন।”

কুশ বলিলেন, “আলোচ্য বিষয় যখন মন্থরার ভবিষ্যৎ, তখন আপনার আর কিছুক্ষণ উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। আমি আপনারও পরামর্শপ্রার্থী।”

অমাত্য সুনন্দ রসিক ব্যক্তি, মন্ত্রণাসভার অবান্তর দলবল বিদায় লওয়ার পর হইতে তিনি একটু সহজ ভাবে দুই-একটা রসিকতা করিবার সুযোগ খুঁজিতেছিলেন, বলিলেন, “সেই সন্ন্যাসিবেশ, সেই নারীহরণ। বন্ধুবর ভদ্র কুটিলতার রাবণকেও পরাজিত করিয়াছিলেন। স্বভাবকুটিলা মন্থরা ইঁহার মঞ্জুষায় মন্ত্রমুগ্ধ সর্পের মতো সুড়সুড় করিয়া প্রবেশ করিয়াছে। মা জানকীর মতো আর্তনাদ করে নাই।”

রাজার বিদূষক মহোদর মন্ত্রণাসভার বহির্দেশে একটি বানর শিশুকে লইয়া এতক্ষণ নৃত্যশিক্ষা দিতেছিল, সে গৃহে প্রবেশ করিতে করিতে বলিল, “আহা, ‘সদা পশ্যস্তি সুরয়’। শাস্ত্র বলিয়াছেন, সর্বদা সুড়সুড় করিয়া প্রবেশ করিবে। বুঝা যাইতেছে, মন্থরা শাস্ত্রজ্ঞা।”

কুশ হাসিয়া বলিলেন, “যাক্, তোমাকে আর বিদ্যা ফলাইতে হইবে না। এখন পরিহাসের সময় নয়।”

মহোদর বলিল, “কী বিপদ! আমি শাস্ত্রকথা বলিলে তোমরা যদি পরিহাস মনে করো, তবে যাই কোথায়?”

সুনন্দ বলিলেন, “তোমার শাস্ত্রজ্ঞান তো গভীর। মন্থরাকে লইয়া কী করা যায়— সে বিষয়ে তোমার শাস্ত্র কিছু বলে?”

মহোদর বলিল, “কী আর বলিবে? শাস্ত্র মারা গিয়াছে।”

সুনন্দ বলিলেন, “আহা, বড়োই সাধু ব্যক্তি ছিল। কখন মরিল ?”

মহোদর বলিল, “আরে মুর্খ, জানো না, জ্ঞানাৎ শাস্ত্রং প্রণশ্যতি। জ্ঞান হইলেই শাস্ত্র প্রাণত্যাগ করে। আমার তিন বৎসর বয়সে জ্ঞান হয়।”

সুনন্দ বলিলেন, “তবে যে এখনই শাস্ত্র আওড়াইতেছিলে? শিখিলে কিরূপে?”

মহোদর বলিল, “কী করি? ব্রাহ্মণসন্তান, পিতৃপিতামহ চিরদিন নির্বোধদের প্রতারণা করিয়া খাইয়াছেন, আমি দুইচারিটা বচন না আওড়াইলে লোকে মানিবে কেন? তাই মৃতকে জীবন্ত বলিয়া চালাই।”

সুনন্দ বলিলেন, “তা বেশ করো। এখন তোমার মৃত শাস্ত্রকে না-হয় বাদ দাও, জীবন্তজ্ঞান কিছু পরামর্শ দেয়?”

মহোদার বলিল, “বলে, স্ত্রীরত্নংদুষ্কুলাদপি। মন্থরা পূর্বে যাহাই থাকুক, এখন সে স্ত্রীরত্ন। রাজার কোনও কর্মচারী রাজাদেশে কোনো সম্পত্তি আহরণ করিলে তাহা রাজারই প্রাপ্য হয়। আমাদের রাজার অন্তঃপুরে এ-রত্ন মানাইবে ভালো। দেবীর দোলায় আগমন, ফলং নিত্য ব্রাহ্মণভোজনং, ষোড়শোপচারেণ সংপূজনঞ্চ। অধিকন্তু শাস্ত্র বলেন, ‘মিষ্টান্নং ইতরেজনাঃ’।”

কুশ বলিলেন, “বলিয়াছ ভালো। দাসী আমার পিতামহী অপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠা, তাহা মনে আছে?”

মহোদর বলিল, “বয়স্য, শাস্ত্র বলিয়াছেন— ‘কোঽতিভারঃ সমর্থানাং?’ তুমি রাজ্যের ভারবহনে সমর্থ, আর একটা পিতামহীরবয়সী নারীর ভার বহন করিতে ভয় পাইতেছ? তা ছাড়া ‘যা গতা সা গতা’; যখন সে পিতামহী পরিচয়ে উচ্ছিখের সঙ্গে গৃহত্যাগ করিয়াছিল এখন তো তাহার সে কুরূপাবৃদ্ধার রূপ নাই। সে এখন পূর্ণ যুবতী, ভালোই মানাইবে।”

কুশ বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “তুমি দূর হও, নচেৎ প্রহৃত হইবে, ব্রাহ্মণ বলিয়া নিস্তার পাইবে না।”

মহোদর ভীতির ভান করিয়া বানরশিশুকে কক্ষে লইয়া গাত্রোত্থান করিল, “অলমলং সাহসেন। শাস্ত্র বলিয়াছেন, ‘ব্রাহ্মণং চ স্ত্রীয়োগাংশ্চ পুষ্পেনাপি ন তাড়য়েৎ’। তা তোমরা যখন শাস্ত্র মানিবে না, তখন আমিই ‘স্থানত্যাগেন দুর্জন’ করি।” সে মন্ত্রণাগৃহ ত্যাগ করিয়া অদূরে একটি বৃক্ষতলে বসিয়া আবার তাহার বানরকে নৃত্যকলা শিক্ষা দিতে লাগিল।

তখন অন্যতম সচিব উত্তম বলিলেন, “মহারাজ, মন্থরাকে কাশীরাজের নিকট প্রত্যর্পণ করিলে কিরূপ হয়? অমাত্য ভদ্রের কথায় মনে হইল, তিনি উহার প্রেমে উন্মত্ত। মন্থরা-লাভ করিলে তিনি কৃতজ্ঞতাবশতঃ চিরদিন আপনার অনুগত থাকিবেন।”

কুশ ভদ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র তিনি বলিয়া উঠিলেন, “না, মহারাজ, সে আর হয় না। মন্থরা কাশীরাজ্যে এবং রাজান্তঃপুরে শনিস্বরূপা হইয়া প্রবেশ করিয়াছিল, আমি আর একদিন বিলম্ব করিলে সে কাশীরাজকে দহে মজাইত। ঐ পাপিষ্ঠার প্রতি দয়া করিতে গিয়া নিরপরাধা রাজমহিষীদিগের এবং নির্দোষ প্রজাপুঞ্জের ক্ষতি করিলে আপনি ধর্মের নিকট অপরাধী হইবেন।”

সুনন্দ বলিলেন, “বন্ধুবর ভদ্র নারীহরণ করিয়া সম্প্রতি বড়োই ধর্মপ্রবণ হইয়াছেন। মহারাজ, আমি বলি কি, মন্থরাকে লঙ্কায় প্রেরণ করা হউক লঙ্কাধিপতি বিভীষণ অজর অমর, ও-দিকে তাঁহার সরমা মন্দোদরী প্রভৃতি মহিষীগণ ক্রমেই বৃদ্ধা হইতেছেন বলিয়া নিশ্চয়ই তিনি মানসিক অশান্তি ভোগ করিতেছেন। তাহাকে মন্থরা দান করিলে লঙ্কা রাজ্যের সহিত আমাদের সখ্য চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকিবে। সেখানে মন্থরা কোনওরূপ ক্ষতি করিতে সাহস করিবে না, গোলমাল করিবামাত্র রাজা বা রাজভৃত্যগণ তাহাকে উদরসাৎ করিবেন।”

এ-পরামর্শও কুশের মনঃপূত হইল না, কহিলেন, “বিভীষণ আমার পিতৃবন্ধু, তাঁহার নিকট এ-প্রস্তাব আমি করিতে পারিব না। তিনিও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, এরূপ উপহার লইতে সম্মত হইবেন বলিয়া মনে হয় না।”

অমাত্য নির্ঘৃণ বলিলেন, “মহারাজ, কুশাবতী ত্যাগ করিয়া অযোধায় গমন করিতে ও পরিত্যক্ত নগরীকে বাসযোগ্য করিয়া তুলিতে বহু অর্থের প্রয়োজন। অমাত্য ভদ্রের অনুপস্থিতিতে রাজকোষের তত্ত্বাবধান আমি করিতেছিলাম, সুতরাং এ-বিষয়ে আমার স্পষ্ট ধারণা জন্মিয়াছে যে, আপনার বর্তমান অর্থবল এজন্য যথেষ্ট নহে। প্রজাগণের নিকট প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যয় করিতে হইলে আপনার আয়বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা প্রয়োজন। করবৃদ্ধি করা আপনার মত নহে জানি, সে-ক্ষেত্রে মহারাজ রামচন্দ্র কর্তৃক বিজিত রাজ্যসমূহ হইতে প্রাপ্ত কিছু দুর্লভ মণিরত্ন বিক্রয় করা আশু প্রয়োজন হইবে। সেই সঙ্গে অনায়াসলব্ধ এই দুর্লভ নারীরত্নটিকেও কোনও সামস্ত নৃপতি বা ধনকুবের শ্রেষ্ঠীর নিকট সর্বোচ্চমূল্যে বিক্রয় করিতে পারিলে আমাদের অর্থচিন্তার কিছু লাঘব হইত। বিকল্পে তাহাকে বিভিন্নদেশীয় ধনিজনের নিকট সাময়িকভাবে গচ্ছিত রাখিয়াও অর্থসংগ্রহ করা চলিতে পারে।”

কুশ বলিলেন, “মন্থরাকে প্রতারণা করিয়া ফিরাইয়া আনায় যে পাপ না হইয়াছে, তাহাকে বিক্রয় করিলে বা পণ্যাস্ত্রীরূপে ব্যবহার করিলে তাহার শতগুণ পাপ হইবে। যে আমাকে বিশ্বাস করিয়া আশ্রয় লইয়াছে, আমি তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে তাহাকে কোনও ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ব্যবহার করিব না।”

ভদ্র বলিলেন, “মহারাজ, মন্থরা নিজমুখে তাহার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা জানাইলে ভালো হয় না?”

কুশ বলিলেন, “আপনি যথার্থ কথাই বলিয়াছেন। তাহার ভাগ্য নির্ধারণ করিবার পূর্বে তাহার বক্তব্য কিছু আছে কি না আমাদের অবগত হওয়া কর্তব্য। দৌবারিক!”

দৌবারিক দ্বারদেশ হইতে ছুটিয়া আসিয়া অভিবাদন করিল। কুশ জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমি যে রমণীকে আনিবার জন্য শিবিকাপ্রেরণ করিয়াছিলাম তিনি আসিয়াছেন কি?”

দৌবারিক নিবেদন করিল, “তিনি উদ্যান-বহির্দেশে কিছুক্ষণ হইল অপেক্ষা করিতেছেন।”

কুশ বলিলেন, “তাঁহাকে এখানে লইয়া আইস।”

তারপর সচিবগণের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিলেন, “এত লোকের সম্মুখে সে অন্তরের কথা বলিতে লজ্জা পাইবে না?”

রাজার ইচ্ছা অবগত হইয়া সচিবগণ সকলেই কক্ষ ত্যাগ করিতেছিলেন। কুশ বলিলেন, “আর্য সুনন্দ, আপনি থাকুন। আর্য ভদ্র, আপনারও থাকা প্রয়োজন।” অন্যান্য সচিবগণ অভিবাদনপূর্বক বিদায় লইবার পর অনতিবিলম্বে দৌবারিকসহ মন্থরা ধীরপদে নতমস্তকে প্রাচীরবেষ্টিত উদ্যানে প্রবেশ করিল এবং পুষ্পবীথিকামধ্যস্থ প্রস্তরমণ্ডিত পথ অতিক্রম করিয়া মন্ত্রণাগৃহে প্রবেশ করিল। সে একবার সকলের দিকে চাহিল, তারপর নৃপতিকে অভিবাদন করিয়া বলিল, “আমাকে স্মরণ করিয়াছ কেন, মহারাজ?”

কুশ বলিলেন, “ভদ্রে, আমি শীঘ্রই কুশাবতী ত্যাগ করিয়া অযোধ্যায় গমন করিব, তোমাকে তাহা জানাইয়াছি। তুমি যদি সেখানে যাইতে না চাও, তবে আমি তোমাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে লইয়া যাইব না। কিন্তু এখানে এই পরিত্যক্ত নগরে তোমার নবলব্ধ রূপযৌবন লইয়া বাস করাও নিরাপদ হইবে না। তুমি কি কাশীরাজের নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে?”

মন্থরা চিন্তামাত্র না করিয়া বলিল, “না।”

কুশ প্রশ্ন করিলেন, “অন্য কোনও রাজা বা রাজপুত্র বা ধনকুবের শ্রেষ্ঠীর কণ্ঠে বরমাল্য অর্পণ করিতে চাও? তুমি ইচ্ছা করো তো আমি আজই এই নগরীতে সমাগত কমপক্ষে উনবিংশজন মুকুটধারী নৃপতিকে তোমার সম্মুখে উপস্থিত করিতে পারি, তাঁহারা যে কেহ তোমাকে লাভ করিলে কৃতার্থ হইবেন। তুমি স্বেচ্ছায় যাঁহাকে নির্বাচন করিবে—তাঁহার সহিত তোমার বিবাহ দিব। বলো, লজ্জা করিয়ো না।”

মন্থরা বলিল, “মহারাজ, আমি বিবাহিতা, আমার বিবাহের প্রশ্ন উঠিতে পারে না।”

ভদ্র বলিতে গিয়াছিলেন, “দুইবার বিবাহ হইয়াছে, আর একবারে ক্ষতি হইত না,” কিন্তু অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করিয়া রসনা সংযত করিলেন। কুশ বলিলেন, “তবে তোমার জন্য কী করিতে পারি, বলো?”

মন্থরা অল্পক্ষণ চিন্তা করিল, তারপর যুক্তকরে বলিল, “বৎস, মহারাজ, যদি ক্ষমা করিয়া থাকো, তবে আজ আমাকে একটি ভিক্ষা দাও।”

স্বভাবদুমুর্খ ভদ্র আর স্থির থাকিতে পারিলেন না, বলিলেন, “সাবধান, মহারাজ। কেশহীন ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বিল্বতলে গমন করে না। অযোধ্যার রাজপরিবারে মন্থরার ক্রীড়া পুত্তলিকা কৈকেয়ীর বরপ্রার্থনার ফল অবিদিত নহে। এবার সে স্বয়ং রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণা হইয়াছে, এক বরেই আপনাকে পথে বসাইবার ক্ষমতা সে রাখে। কী মন্থরা, একটি বর চাহিবে, না দুইটি? মহারাজের বনবাস এবং পাপিষ্ঠ ভদ্রের শূলদণ্ড? কি বলো?”

কুশ তাঁহার কথায় কর্ণপাত না করিয়া প্রসন্ন প্রশান্ত কণ্ঠে বলিলেন, “বলো, মন্থরা, তোমার কী প্রার্থনা? আমার সাধ্যাতীত না হইলে অবশ্যই তাহা পূর্ণ করিব।”

মন্থরা বলিল, “শুনিলাম, তুমি শ্রীরামমন্দির হইতে বিগ্রহদ্বয় অযোধ্যার অপসারিত করিবে?”

কুশ বলিলেন, “যথার্থ শুনিয়াছ। স্বর্ণ-প্রতিমাদ্বয়কে পুরোবর্তী করিয়াই আমি কুশাবতী ত্যাগ করিব।”

মন্থরা বলিল, “অযোধ্যার আকাশ-বাতাস রামসীতার কীর্তিকাহিনীতে পরিপূর্ণ, সেখানে এই মূর্তিদ্বয় লইয়া গিয়া তৈলসিক্ত মস্তকে তৈলদান করিয়া কী লাভ হইবে, মহারাজ? এখানে রাখিয়া যাইলে চলে না?”

কুশ বলিলেন, “ঐ মূর্তি দুইটি আমার প্রাণস্বরূপ, মন্থরা।”

মন্থরা বুঝিল, আবার কিয়ৎকাল নীরব রহিয়া বলিল, “তবে এখানকার শূন্য মন্দিরের জন্য দুইটি প্রস্তর-প্রতিমা রচনার আদেশ দাও।”

কুশ বলিলেন, “দিয়াছি। বিশাখদত্তের পুত্র পুষ্পদত্ত এবং মথুরা হইতে আগত ভাস্কর ধনঞ্জয় দুইটি মূর্তিই প্রায় শেষ করিয়া আনিয়াছেন। বর্তমানে যে বৃদ্ধ পুরোহিত পূজা করিতেছেন,— তাঁহাকেই পূজার ভার দিয়া যাইব।”

মন্থরা বলিল, “আমাকে সেই মন্দিরের পরিচর্যার ভার দাও। আমি নিজহস্তে প্রতিদিন মন্দিরকুট্টিম মার্জনা করিব; পুষ্প-অর্ঘ্য রচনা করিব, বিগ্রহদ্বয়কে মাল্যচন্দনভূষিত করিব। পাপিষ্ঠা বলিয়া ঘৃণা করিয়ো না, এই কাজটুকুর অধিকার আমাকে দিয়া যাও।”

কুশ বলিলেন, তোমাকে মন্দির-পরিচর্যার ভার দিতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই, কিন্তু আমার সৈন্যদল চলিয়া গেলে, তোমাকে রক্ষা করিবে কে? পরিত্যক্ত নগরীতে পার্বত্য-দস্যুর। হয়তো তৃণখণ্ডটি অবশিষ্ট রাখিবে না। তাহারা বৃদ্ধ পুরোহিত এবং পাষাণ বিগ্রহকে অব্যাহতি দিলেও তোমাকে অব্যাহতি দিবে মনে হয় না।”

মন্থরা বলিল, “তাহার ব্যবস্থাও তুমি করিতে পারো। আমার বহু অপরাধ, সঞ্চিত আছে, তোমার দণ্ডপাশিককে এখনই নির্দেশ দিলে তাহার ভৃত্যেরা আমার মুখের এবং ঊর্ধ্বাঙ্গের মাংস স্থানে স্থানে দগ্ধসন্দংশিকা দ্বারা উৎখাত করিবে বা তীক্ষ্ণ অস্ত্র দ্বারা বিদারণ করিয়া ক্ষতসৃষ্টি করিবে। তখন আমি এমন বিকৃতদর্শনা হইয়া যাইব যে তস্করেও আমাকে স্পর্শ করিবে না।”

কুশ বলিলেন, “সে হয় না, ভদ্রে, ও-কথা আমি চিন্তাও করিতে পারি না।”

মন্থরা বলিস, “তবে আমি নিজেই না-হয় উত্তপ্ত তৈলে মুখমণ্ডল এবং শরীরের দৃশ্যমান অংশ দগ্ধ করি, তাহা হইলে তো আমার এ-অভিশপ্ত রূপ থাকিবে না, লোকে দেখিলে ভীত হইবে।”

কুশ বলিলেন, “ও-সকল চিন্তা পরিত্যাগ করো।”

মন্থরা বলিল, “আর এক উপায় আছে, তাহা কঠিনতর, কিন্তু তোমার পক্ষে তাহা অসম্ভব না হইতে পারে। আমি যে রমণীর চক্ষু ও নাসিকা হরণ করিয়া মুখমণ্ডলের সৌন্দর্যবৃদ্ধি করিয়াছি, যাহার যৌবন হরণ করিয়া যৌবনবর্তী হইয়াছি, তাহাদিগকে তুমি আনাইয়া দাও। তুমি রাজাধিরাজ, সর্বশক্তিমান্, তুমি আদেশ দিলে অবন্তীরাজ প্রতিষ্ঠানরাজ, সকলেই অবিলম্বে সেই হতভাগিনীদিগকে সন্ধান করিয়া প্রেরণ করিবেন, শল্যচিকিৎসক এবং বৈদ্যাচার্যও তোমার আহ্বান উপেক্ষা করিতে পারিবেন না। আমি যাহার যাহা কিছু লইয়াছি তাহাকে তাহা প্রত্যর্পণ করিব। আমার স্রষ্টা আমাকে কুরূপা করিয়া দাসী গর্ভজা করিয়া জন্ম দিয়াছিলেন, আমি নিজের চেষ্টায় সূরূপা হইয়াছিলাম, কিন্তু স্বভাব পরিবর্তন করিতে পারিলাম না, সে জন্য আমার বিদ্রোহ নিষ্ফল হইয়াছে, চিত্তে শান্তি নাই। এখন পরাজয় স্বীকার করিয়া কুরূপা দাসীরূপেই আমি পৃথিবী হইতে বিদায় লইতে চাই। তুমি আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করিবার সুযোগ দাও, মহারাজ।”

এমন সময়ে বেত্রবতী দ্রুতপদে আসিয়া নতজানু হইয়া জানাইল, মহর্ষি বসিষ্ঠ দ্বারে সমাগত। মহারাজ কুশ সসম্ভ্রমে তাঁহাকে প্রত্যুদ্‌গমন করিয়া লইয়া আসিলেন, পাদ্যঅর্ঘ্যপ্রদানান্তর প্রণাম করিয়া সিংহাসনের দক্ষিণ পার্শ্বে মৃগচর্ম বিছাইয়া বসিতে দিয়া সপারিষদ্ বদ্ধাঞ্জলি হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। মহর্ষি স্মিতহাস্যে সকলকে আশীর্বাদ করিয়া উপবেশন করিতে আদেশ দিলেন। অনন্তর সকলে আসন গ্রহণ করিলে তিনি রাজার এবং রাজ্যের কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। কুশ করপুটে নিবেদন করিলেন, “অত্যন্ত বিপদে পড়িয়া আপনাকে স্মরণ করিয়াছি। প্রথমতঃ কুশাবতীপরিত্যাগ-সমস্যা, দ্বিতীয়তঃ এই মন্থরা সমস্যা।”

মন্থরা এতক্ষণ কিছুদূরে একটি স্তম্ভের অন্তরালে কিছুটা আত্মগোপন করিয়া দাঁড়াইয়াছিল, মহর্ষি তাহার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাহিয়া আছেন দেখিয়া সে নতমুখে অগ্রসর হইয়া আসিল এবং ভূলুণ্ঠিতা হইয়া মহর্ষিকে প্রণামপূর্বক নতজানু হইয়া যুক্তকরে ভূতলেই উপবিষ্টা রহিল।

মহর্ষি বসিষ্ঠ কিছুক্ষণ তাহাকে লক্ষ করিলেন। তারপর মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিলেন, “তুমি কি সত্যই অনুতপ্তা?”

মন্থরা বলিল, “আপনি অন্তর্যামী, আপনার কাছে কিছুই গোপন নাই।”

মহর্ষি বলিলেন, “কাশীরাজের নিকট ফিরিয়া যাইবে?”

মন্থরা বলিল, “না, প্রভু। আমি তাঁহার প্রেমের মর্যাদা রাখিতে পারি নাই। যে রূপজ মোহে তিনি তাঁহার পূর্বপত্নীদিগের প্রেম বিস্তৃত হইয়াছিলেন— তাহার উপরও আর আমার লোভ নাই। তবে তিনি আমার দেহমনের বুভুক্ষা ঘুচাইয়াছিলেন; শ্রদ্ধা না করিতে পারি, দূর হইতে চিরদিন তাঁহার মঙ্গলকামনা করিব।”

বসিষ্ঠ বলিলেন, “তোমার পূর্বরূপ ফিরিয়া পাইলে তুমি কষ্ট পাইবে না?”

মন্থরা সবিনয়ে বলিল, “কষ্ট পাইব না—এ-কথা বলিব না, তবে সহ্য করিব। আপনার আশীর্বাদে পারিব বলিয়া মনে হয়। আপনি দয়া করিয়া মহারাজকে অনুমতি দিলে তিনি আমাকে অঋণী হইবার সুযোগ দিবেন।”

বসিষ্ঠ বলিলেন, “উত্তম। মহারাজের সাহায্যের প্রয়োজন হইবে না, আমিই তোমাকে সে সুযোগ দিব। তুমি অন্যের ক্ষতি না করিয়া যেটুকু রূপ, রৌপ্য এবং স্বর্ণের সাহায্যে, সংগ্রহ করিয়াছ তাহা তোমার থাকুক, আর যাহা অন্যের নিকট হইতে নিষ্ঠুরতা দ্বারা আহরণ করিয়াছ, তাহা এই মুহূর্তে পূর্ব-আধারে ফিরিয়া যাউক; যাহাদের নিকট তুমি ঋণী আছ, তাহাদের ঋণ শোধ হউক। শল্যচিকিৎসার দুঃখ দুই পক্ষকেই আর দ্বিতীয়বার দিতে চাহি না, তোমার সুমতির পুরস্কারস্বরূপ আমার তপোবল আজ তোমার জন্য কিছু প্রয়োগ করিলাম। তোমার কল্যাণ হউক।”

সভাস্থ সকলে বিস্মিত হইয়া দেখিল, নিমেষমধ্যে সেই পদ্মপলাশলোচনা সুনাসা নারীর অপূর্বসুন্দর যুবতীদেহ এক স্থূলনাসা অনতিক্ষুদ্রনয়না ঈষল্লোলচর্মা কিন্তু ভ্রমরকৃষ্ণকেশা গৌরবর্ণা সৌম্যমূর্তি প্রৌঢ়ার শরীরে রূপান্তরিত হইয়াছে!

মন্থরা একবার নিজের বলিরেখাঙ্কিত কপোল ও ললাট অঙ্গুলিদ্বারা স্পর্শ করিল, ঈষৎ-কুঞ্চিত গাত্রচর্ম কৌতূহলভরে নিরীক্ষণ করিল, তারপর প্রসন্ন- হাস্যোদ্ভাসিতমুখে আবার ভূতলে লুটাইয়া মহর্ষিকে প্রণাম করিল।

মহর্ষি প্রশ্ন করিলেন, “সন্তুষ্টা হইয়াছ তো?”

মন্থরার বিস্ময়ের ঘোর তখনও সম্পূর্ণ কাটে নাই, সে শুধু সন্মতিসূচক মস্তকসঞ্চালন করিল। মুহূর্তকাল পরে প্রশ্ন করিল, “উৎপলার, চন্দনার কী হইল?”

মহর্ষি হাসিয়া বলিলেন, “উৎপলা সহসা চক্ষু ফিরিয়া পাইয়া আনন্দে অধীরা হইয়াছে। সে কেবলই নির্নিমেষনেত্রে পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ করিতেছে, আর পুনঃ পুনঃ তাহার মুখচুম্বন করিতেছে। চন্দনা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়া হইয়া বসিয়া আছে। বৎস কুশ, তুমি অবিলম্বে উহাদিগকে আনাইয়া মন্থরার চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করাইয়ো। উৎপলাকে অযোধ্যায় দেবসেবার ভার দিয়ো, তাহার পুত্রকে প্রতিপালন করিয়া যথাকালে তোমার পার্শ্বরক্ষী নিযুক্ত করিয়ো, চন্দনার বিবাহে কিছু যৌতুক দিয়ো, ধনিগৃহে মনোমত প্রার্থী পাইলে বিবাহ দিয়ো।”

কুশ করজোড়ে কহিলেন, “আমি এখনই তাহাদের আনাইবার জন্য ব্যবস্থা করিতেছি। তাহারা আসিলে অবশ্যই মন্থরার সহিত সাক্ষাৎ করাইব। কিন্তু প্রভু, এই শূন্য নগরে মন্থরাকে রাখিয়া যাওয়া কি নিরাপদ হইবে?”

মহর্ষি কহিলেন, “কুশ, তোমার কুশাবতী কোনও দিন শূন্য হইবে না। শত প্রলোভনেও এ নগরী পরিত্যাগ করিবে না— এরূপ নাগরিক এখানে আছে। পুররক্ষক এবং কিছু সৈন্য, শাসন এবং বিচারের জন্য কিছু ব্যবস্থা, তোমাকে এখানে রাখিতেই হইবে, মন্থরা তাহাদের তত্ত্বাবধানেই থাকিবে। যতদিন জীবিতা থাকিবে ততদিনে সে রামায়ণ গান গাহিয়া এ অঞ্চলের পার্বত্য জাতিদের হৃদয় জয় করিবে। পরে তোমার সৈন্যদিগের আর প্রয়োজন হইবে না। স্থানীয় নিষাদ, শবরাদির বংশধরেরাই যুগযুগ ধরিয়া কুশাবতী রক্ষা করিবে, নগরীর শূন্য মন্দিরে ও গৃহসমূহে প্রদীপ জ্বালাইবে, রামনামে আকাশ বাতাস প্লাবিত করিবে।”

মহারাজ কুশ বলিলেন, “আপনার অভয়বাক্যে নিশ্চিন্ত হইলাম। আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, কুশাবতী নির্মাণ করিতে রাজকোষের বিস্তর অর্থব্যয় হইয়াছে, এখন ইহা পরিত্যাগ করিয়া লক্ষ লক্ষ নগরবাসীকে অযোধ্যায় লইয়া যাইতে এবং সেখানে জীর্ণ নগরীর সংস্কারসাধন করিতে যে অর্থব্যয় হইবে, সচিবগণের মতে আমার ভাণ্ডারে সে পরিমাণ অর্থ নাই; সে জন্য কী কর্তব্য?”

মহর্ষি কহিলেন, “অযোধ্যার নগরাধিষ্ঠাত্রী যে-দেবতা তোমাকে সেখানে আহ্বান করিয়াছেন, অর্থের ব্যবস্থা তিনিই করিয়া রাখিয়াছেন।”

কুশ বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “প্রভু, আপনার এ-কথার অর্থ বুঝিলাম না।”

বসিষ্ঠ কহিলেন, “বৎস, তুমি অভিষেকসময়ে রাজর্ষি মনুর ব্যবহৃত যে মহামূল্য মুকুট ইক্ষ্বাকুবংশের কুলপ্রথানুসারে ধারণ করিয়াছিলে তাহা এখন কোথায়?”

কুশ কহিলেন, “তাহা এখানে রাজভাণ্ডারে সযত্নে রক্ষিত আছে, বিশেষ উৎসব উপলক্ষে ব্যবহার করি। অযোধ্যার রাজগৃহেও তাহা সর্বদা ব্যবহৃত হইত না, এখনও হয় না। প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য অন্য মুকুট রাখিয়াছি।”

মহর্ষি বসিষ্ঠ কহিলেন, “অযোধ্যায় মহারাজ দশরথের রত্নভাণ্ডারের যে কক্ষে অভিষেকসময়ে ব্যবহৃত অন্যান্য মণিরত্ন ও রাজবেশের সহিত সেই মুকুটটি রক্ষিত ছিল, সে কক্ষটি মনে পড়ে কি?”

কুশ কহিলেন, “পড়ে, প্রভু। অযোধ্যা পরিত্যাগের পূর্বে আমি সে কক্ষ শূন্য করিয়া সমস্ত ধনরত্ন লইয়া আসিয়াছি। কক্ষটি প্রায়ান্ধকার, তন্মধ্যে অবস্থিত পাষাণনির্মিত কয়েকটি গুরুভার শ্রীহীন মঞ্জুষা কেবল আনয়ন করা প্রয়োজন বোধ করি নাই। সেগুলি বোধ হয় পৃথগ্‌ভাবে নির্মিত হয় নাই, গৃহকুট্টিমসংলগ্ন করিয়াই রচিত হইয়াছিল।”

বসিষ্ঠ কহিলেন, “তোমার অনুমান সত্য। তাহারই একটির তলদেশে গৃহকুট্টিমসংলগ্ন একটি গুপ্তদ্বার আছে। সেই দ্বারপথে ভূগর্ভস্থ একটি গুপ্তকক্ষে যাওয়া যায়। সেখানে অবতরণ করিলে তুমি মহারাজ ইক্ষাকুর সঞ্চিত গুপ্তধন পাইবে। মান্ধাতা, দিলীপ, রঘু প্রভৃতি তোমার পূর্বপিতামহগণ সেই স্বর্ণভাণ্ডার যুগে যুগে সমৃদ্ধ করিয়াছেন, নিতান্ত প্রয়োজন হইলে আমার অনুমতি লইয়া তাহা হইতে কিছু কিছু ব্যয়ও করিয়াছেন। তোমার পিতা শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে তাহার কিয়দংশ প্রজাবর্গের মঙ্গলার্থে পূর্তকার্যে এবং যজ্ঞাদির জন্য একসময়ে ব্যয়িত হইয়াছিল, আবার বিভিন্ন সময়ে বিজিত রাজ্যসমূহ হইতে আহৃত রাশি রাশি স্বর্ণ তিনি গোপনে সেখানে রক্ষা করিয়াছিলেন। প্রয়োজন মতো সেখান হইতে কয়েক কোটি স্বর্ণমুদ্রা তুমি এখন গ্রহণ করিতে পারিবে। কার্যশেষে আমাকে সংবাদ দিয়ো।”

কুশ বিস্ময়ে হতবাক্ হইয়াছিলেন, আত্মসংবরণ করিয়া বলিলেন, “পরিত্যক্ত বনাবৃত নগরীতে কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা অরক্ষিত অবস্থায় পড়িয়া আছে, অথচ আমরা তাহা কেহই জানি না! যদি এতদিনে তাহা তস্করে অপহরণ করিয়া থাকে?”

মহর্ষি হাসিয়া বলিলেন, “তস্করের চতুর্দশ পুরুষের সাধ্য নাই, সে কক্ষের সুড়ঙ্গপথ খুঁজিয়া বাহির করে। আমার অজ্ঞাতসারে সে কক্ষে কেহ প্রবেশ করিতে পারিবে না। তুমি এই কুঞ্চিকা গ্রহণ কর, ইহার সংলগ্ন তাম্রপত্রে ক্ষুদ্রাকারে ঐ কক্ষের মানচিত্র অঙ্কিত ও তাহাতে গুপ্তদ্বারের স্থান নির্দিষ্ট আছে। এই কুঞ্চিকা-সাহায্যে দ্বারের কপাট উদ্ঘাটন করিয়া সোপান পথে নিম্নে অবতরণ করিতে হইবে। যিনি যাইবেন—তিনি একা যতটা ভার বহন করিতে পারেন, তত পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রাই যেন এককালে গ্রহণ করেন, একাধিক ব্যক্তি যেন ঐ কক্ষের সন্ধান জানিতে না পারে। আমার ইচ্ছা, তুমি অমাত্য ভদ্রকে নগরসংস্কারের ভার দিয়া অযোধ্যায় প্রেরণ করো। তিনি পুরাতন রাজপ্রাসাদে সপরিবারে বাস করিলে এবং প্রতিদিন তিন চারিবার স্বর্ণমুদ্রা উত্তোলন করিলে কেহ গুপ্তকক্ষের কথা জানিতে পারিবে না; যত অর্থই ব্যয় হউক, তিনি ঐ গৃহে বসিয়া পাইবেন। তুমি অযোধ্যার এবং সাম্রাজ্যের প্রজার কল্যাণের জন্য আজীবন ব্যয় করিলেও সে ভাণ্ডার শূন্য হইবে না।”

অমাত্য ভদ্র করজোড়ে বলিলেন, “প্রভু, মহারাজ কুশ আমাকে অর্থসচিবপদে নিযুক্ত করিয়াছেন। আমি রাজদত্ত সম্মান প্রত্যাখ্যান করিতে পারি নাই, তথাপি সর্বদা শঙ্কিত আছি। এ-কার্যে আমার সহায়ক কর্মীরা আছেন, সাক্ষী আছেন, অর্থের পরিমাণও মহারাজ জ্ঞাত আছেন। অপরদিকে আপনি যে অপরিমিত স্বর্ণরাশির কথা বলিতেছেন—তাহার বর্ণনা শুনিয়াই আমার হৃৎকম্প হইতেছে। শেষবয়সে কি বিনাদোষে দুর্নামভাগী হইব? তদ্ভিন্ন আমি দরিদ্র, কল্পনাতীত ঐশ্বর্যের মধ্যে একা দিবারাত্র বাস করিয়া যদি আত্মসংবরণ করিতে না পারি? যদি প্রলোভনে পড়ি?”

মহর্ষি বলিলেন, “কোনও চিন্তা নাই, সুড়ঙ্গপথে যুগজীবী কালসর্প গোপনে সোপানপ্রান্তে প্রহরায় নিযুক্ত আছে। মহারাজ রঘুর সময়ে একজন রাজপুরুষের মতিভ্রম হইয়াছিল, তিনি বহুবার রাজনির্দেশে স্বর্ণ গ্রহণ করিয়া একবার লোভবশে নিজ-প্রয়োজনে ঐ কক্ষ হইতে রাজার অজ্ঞাতে অর্থ অপহরণ করিতে গিয়া প্রাণ হারাইয়াছিলেন। তুমি প্রলোভনে পড়িয়াছ বুঝিলেই সৰ্প তোমাকে দংশন করিবে। তুমি পাপ করিবার অবসর পাইবে না।”

ভদ্র হাসিয়া বলিলেন, “নিশ্চিন্ত হইলাম। মহারাজ অনুমতি দিলেই আমি এখন সপরিবারে যাত্রা করিতে পারি। বিধবা হইবার পূর্বে আমার পতিপ্রাণা পত্নীকে কিছুদিন মরলোকে পতিসেবা করিবার সুযোগ দিতে পারিব।”

মহর্ষি হাস্যস্ফুরিতাধরে বলিলেন, “তোমার পত্নীর বৈধব্যযোগ নাই, তোমার দারিদ্র্যও আর অধিকদিন থাকিবে না। মহারাজ কুশ যদি তোমাকে তোমার দায়িত্বের উপযুক্ত বেতন প্রদান না করেন, অযোধ্যার সংস্কারসাধনের জন্য কার্যশেষে উপযুক্তরূপে পুরস্কৃত না করেন, তবে তিনি ধর্মে পতিত হইবেন। সম্প্রতি তুমি দীর্ঘকাল পরিশ্রম করিয়া মন্থরাকে ফিরাইয়া আনিয়াছ, সে-জন্য রাজার কাছে কী পুরস্কার লাভ করিয়াছ?”

“কিঞ্চিৎ তিরস্কার” বলিয়া লজ্জিত কুশ আসন ত্যাগ করিয়া উঠিলেন, নিজ কণ্ঠ হইতে বহুমূল্য মণিখচিত স্বর্ণহার লইয়া অমাত্য ভদ্রের কণ্ঠে পরাইয়া দিলেন। বসিষ্ঠ এবং সুনন্দ উভয়ে, ‘সাধু, সাধু’ রবে তাঁহার কার্যে সমর্থন জানাইলেন। বসিষ্ঠ প্রণত ভদ্রের মস্তকে হস্তার্পণ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন, “কল্যাণমস্তু!”

এতক্ষণে মন্থরা কথা কহিল। সে মহর্ষি বসিষ্ঠকে সম্বোধন করিয়া বলিল, “প্রভু, আপনি বলিলেন, আমি রামায়ণ গান গাহিয়া বিন্ধ্যের পার্বত্য অধিবাসীদিগকে বশ করিব, কিন্তু রামায়ণ গান তো আমি কখনও করি নাই। কিরূপে করিব? কে আমাকে শিখাইবে? আমার পাপজিহ্বায় প্রাকৃত ভাষার আলাপ কোনও রূপে চলিতে পারে, দেবভাষা আমার মুখে সুষ্ঠুরূপে উচ্চারিত হইবে কি ?”

বসিষ্ঠ কহিলেন, “মহর্ষি বাল্মীকি রামায়ণ রচনা করিয়া কুশ এবং লব নামক দুইটি সুকণ্ঠ বালককে উহা তাললয়যোগে গাহিতে শিখা‍ইয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে একজন আমাদের সম্মুখেই উপবিষ্ট রহিয়াছেন। তুমি অনুরোধ করিলে তিনি নিশ্চয় তোমাকে রামায়ণ গান করিতে শিখাইবেন। আর উচ্চারণের সম্বন্ধে কোনও বাধা ঘটিবে না, তোমার জিহ্বার কিছুমাত্র জড়তা লক্ষিত হইতেছে না।”

কুশ বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “এ আপনি কী আদেশ করিতেছেন, প্রভু? কতদিন পূর্বে পিতৃদেবের সভায় রামায়ণ গাহিয়াছিলাম, এতদিন চর্চা নাই; আজ কি কিছু মনে আছে? তদ্ভিন্ন সেই বিরাট্ কাব্যগ্রন্থ কণ্ঠস্থ করিতেই মন্থরার কয়েক বৎসর লাগিবে, তাললয়-সহযোগে সমস্ত অংশ গাহিতে শিখিবে কতদিনে?”

বসিষ্ঠ বলিলেন, “তা, দিবসত্ৰয় লাগিবে মনে হয়। মন্থরা তীক্ষ্ণবুদ্ধিশালিনী ও শ্রুতিধরা। আমার আশীর্বাদে শ্রবণমাত্র সে যথোচিত সুস্বরে তাললয়যোগে তোমার কণ্ঠ অনুসরণ করিয়া রামায়ণ গান করিতে পারিবে। একবার শুনিলেই শ্লোকগুলি তাহার কণ্ঠস্থ হইবে। তোমাদের দ্বৈত সঙ্গীতে পৃথিবী মোহিত হইবে।”

কুশ তখনও ইতস্ততঃ করিতেছিলেন। বলিলেন, “কুশাবতী পরিত্যাগের জন্য বহু আয়োজন অসম্পূর্ণ, এখন আমি রামায়ণ গাহিতে বসিব? আমি রাজা, সভা ডাকিয়া গান গাহিলে প্রজারা ভাবিবে কী?”

মহর্ষি বলিলেন, “ইহাতে তোমার রাজমর্যাদার কিছু হানি হইতে পারে বটে, কিন্তু প্রজাদের হৃদয়াসনে তোমার অধিকার দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হইবে– নিশ্চয় জানিয়ো। আমি প্রধানতঃ তোমার কণ্ঠে রামায়ণ শুনিব বলিয়াই আজ তপোবন ছাড়িয়া উপস্থিত হইয়াছি, আমাকে নিরাশ করিয়ো না, বৎস। কুশাবতীপরিত্যাগের প্রাক্কালে এই উপত্যকাভূমিতে পুণ্য রামকথা জলে স্থলে আকাশে বাতাসে ছড়াইয়া দিয়া যাও, মন্থরাকে নবজীবন দান করিয়া যাও।”

কুশ বলিলেন, “আপনার আদেশ শিরোধার্য। আর্য সুনন্দ, আপনি রামমন্দির সম্মুখস্থ চত্বরে উৎসবের আয়োজন করুন। নগরে ঘোষণা করুন, অপরাহ্ণে রামায়ণ গান হইবে। আর্য ভদ্র, আপনি মহর্ষির মধ্যাহ্ন-সন্ধ্যাবন্দনা ও আহারের ব্যবস্থা করিয়া গৃহে যাইবেন। কল্য আপনাকে অযোধ্যাযাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে।”

সেইদিন অপরাহ্ণকালে শ্রীরামমন্দিরের সম্মুখস্থ পথের অপরপার্শ্বে সুবিস্তৃত সমতলক্ষেত্রমধ্যে রক্তপ্রস্তরমণ্ডিত বিশাল চত্বরে একটি মহতী সভার অধিবেশন চলিতেছিল। কুশাবতী নগরীর নরনারী কেহ বোধ হয় সে সময়ে আর গৃহে ছিল না। চত্বর, পথ, প্রান্তর, মন্দির সোপান, চতুর্দিকের বৃক্ষরাজি, সর্বত্রই সেদিন অগণিত-জনসমাবেশ, অদৃষ্টপূর্ব জনতা। পূর্বে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল নরমুণ্ডসমূদ্র। সুসজ্জিত চত্বরের কেন্দ্রস্থলে ঈষদুচ্চ অর্ধচন্দ্রাকৃতি মর্মরশিলাবেদিকার একপ্রান্তে বহুমূল্য কৌষের আস্তরণের উপর তুলকপূর্ণ সুকোমল সুখাসনসমূহে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, চেদী, মৎস্য, বিদর্ভ প্রভৃতি জম্বুদ্বীপের বিভিন্ন সামন্তরাজ্যের রাজগণ এবং অপরদিকে নৈগম, পৌরাণিক, শাব্দিক ও সঙ্গীতজ্ঞ সুপণ্ডিত ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বৈশ্যাদি দ্বিজগণ উপবিষ্ট; তাঁহাদের মধ্যস্থলে বিচিত্র কম্বলাস্তৃত উচ্চতর অংশে ব্যাঘ্রমৃগমেষাদির চর্ম বিছাইয়া বসিয়াছেন বসিষ্ঠ, মার্কণ্ডেয়, জাবালি, মৌদ্গল্য, গার্গ্য প্রমুখ মহাতেজা মহর্ষিবৃন্দ। তাঁহাদের সম্মুখে অনতিদূরে চতুরকুট্টিমে কাশ্মীরদেশীয় একটি মনোরম আসনে বসিয়া শ্বেতবস্ত্রোত্তরীয়ধারী শ্বেতচন্দনচর্চিত এবং শ্বেতমালাশোভিত তরুণ নৃপতি কুশ কলস্বনা দ্বিরদবীণাসহযোগে, শ্রুতিমনোরমমূর্ছনাসহকারে কিন্নরকণ্ঠে পুণ্য রামায়ণ গান করিতেছিলেন, তাঁহার পার্শ্বে বসিয়া কৌষেয়বসনা এক সৌম্যমূর্তি প্রৌঢ়া রমণী অনুরূপ বীণাসহযোগে তাললয়সম্পন্ন সেই অপরূপ কণ্ঠস্বর আপন মধুর কণ্ঠে অনুসরণ করিয়া ভক্তিরসাপ্লুত হৃদয়ে সুধারস পরিবেশন করিতেছিলেন। ঋষিগণ অনেকেই সমাধিস্থ, রাজগণ এবং পণ্ডিতগণ সকলেই সম্মোহিত, জনতা অতীতের স্বপ্নে বিমোহিত এবং বাহ্যজ্ঞানহীন। লক্ষলক্ষ শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো উৎকর্ণ হইয়া সেই পুণ্যকাহিনী শুনিতেছে। কুশ প্রথমে একটি শ্লোক একাকী গান করেন, পরক্ষণে সেই শ্লোকটি ঐ রমণীর সহিত কণ্ঠ মিলাইয়া একত্রে আর-একবার গান করেন। এই ভাবে সর্গের পর সর্গ অতিক্রম করিয়া তাঁহারা দশরথমহিষী কৈকেয়ীর বরপ্রার্থনা প্রসঙ্গে পৌঁছিলেন। রামাভিষেকের সংবাদে আনন্দিতা কৈকেয়ীর মন্থরাকে রত্নহার-দানের উদ্যোগ, মন্থরার কুপরামর্শে তাঁহার দুর্মতির উদয় ও বরপ্রার্থনা, কৈকেয়ীর অভিপ্রায় জানিয়া দশরথের আর্তনাদ এবং রামের শান্তচিত্তে পিতৃসত্যপালনের কঠিন সংকল্প গ্রহণ সমস্তই বর্ণিত হইল। মন্থরার কণ্ঠ তখন ক্ষণে ক্ষণে অশ্রুবাষ্পে রুদ্ধ হইয়া আসিতেছিল, তথাপি সে একবার ও থামিল না। রাম সীতা লক্ষ্মণ সংসার কাঁদাইয়া বনে গেলেন, পুত্রশোকে হাহাকার করিতে করিতে হতভাগ্য বৃদ্ধ দশরথের মৃত্যু হইল, ভরত আসিয়া মাতাকে তিরস্কার করিলেন, শত্রুঘ্ন মন্থরাকে প্রহার করিলেন। অগণিত দর্শকের চক্ষুর সম্মুখে যেন চিত্রের পর চিত্র উদ্ঘাটিত হইতেছে, রহিয়া রহিয়া শতকণ্ঠে ধিক্কারধ্বনি উঠিতেছে। রাত্রি ক্রমে গভীর হইতে গভীরতর হইতেছে, আকাশে চন্দ্র অস্তোন্মুখ, প্রস্তরবেদিকার বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপিত দীপমাল৷ জ্বলিয়া জ্বলিয়া নির্বানোন্মুখ। ভরতমিলন, রামের পঞ্চবটিবাস, অসহায়-জানকীকে হরণ করিয়া রাবণের লঙ্কায় প্রস্থান বর্ণিত হইয়া গেল। রাম বনে বনে কাঁদিয়া বেড়াইতেছেন শ্রোতারা কাঁদিতেছে, ঋষি, রাজা, পণ্ডিত, মুর্খ, ধনী, নিৰ্ধন সকলেরই নয়ন অশ্রুসিক্ত। তরুণ গায়ক এবং প্রৌঢ়া গায়িকার কণ্ঠে সুধানির্ঝর এবং চক্ষুদ্বয়ে অশ্রুনির্ঝর যুগপৎ বলিয়া চলিতেছে কিন্তু গানের বিরতি নাই, আহারনিদ্রাবিস্তৃত শ্রোতৃবর্গেরও শ্রবণে ক্লান্তি নাই।

সহসা বাধা দিলেন মহর্ষি বসিষ্ঠ। তিনি আসন ত্যাগ করিয়া দণ্ডায়মান হইতেই কুশ নীরব হইলেন, মহর্ষি মধুরস্বরে কুশকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “বৎস, একরাত্রে রামায়ণ শেষ করিতে পারিবে না, এইবার বিরাম দাও।”

কুশ নতজানু হইয়া ভূমিন্যস্তমস্তকে মহামান্য মুনিবৃন্দকে প্রণাম নিবেদন করিলেন, তারপর দণ্ডায়মান হইয়া উপস্থিত সুধীগণের নিকট ও সমাগত শ্রোতৃবৃন্দের নিকট করজোড়ে বিদায় প্রার্থনা করিলেন। দূরে নিকটে সভাভঙ্গসূচক তূর্যধ্বনি শ্রুত হইল, নিস্তরঙ্গ নীরব জনসমুদ্র যেন সহসা তরঙ্গোচ্ছ্বসিত হইয়া বিপুল গর্জনে জয়ধ্বনি দিয়া উঠিল, তারপর দিগ্বিদিকে বিস্তারিত হইয়া ক্ৰমে হ্রাসপ্রাপ্ত হইতে লাগিল।

মন্থরাও কুশের সঙ্গে সঙ্গেই বীণা রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, সেও সভার উদ্দেশ্যে বদ্ধাঞ্জলি হইয়া নমস্কার জানাইল, তারপর একে একে মুনিগণের চরণবন্দনা করিল। মহর্ষি জাবালি হাস্যমুখে বলিলেন, “বৎসে, তুমি আমার মত আজ সপ্রমাণ করিয়াছ। পাপ এবং পূণ্যের কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নাই, অবিনশ্বর সত্য বলিয়া কিছু নাই, ধর্ম এবং অধর্ম কিছুই শাশ্বত নহে। আশীর্বাদে আমার বিশ্বাস নাই, সুতরাং করিলাম না। নিজ গুণেই তুমি জয়ী হইবে। বৃথা শরীরকে কষ্ট দিয়ো না। প্রতিদিন কিছুক্ষণ ব্যায়ামচর্চা করিও, সঙ্গীতাভ্যাস ছাড়িয়ো না। জীবনে বহুজনকে আনন্দ দিতে পারিবে, নিজেও আনন্দ পাইবে। মরণের পর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, সুতরাং কে কি বলিল, তাহাতে তোমার কিছু আসিবে যাইবে না। মৌগ্দল্য, শাণ্ডিল্য প্রভৃতি ঋষিগণ কেহই জাবালির বাক্যের প্রতিবাদ করিলেন না, তবে সকলেই মন্থরার সঙ্গীতের ভুয়সী প্রশংসা করিয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিলেন। বসিষ্ঠের পদধুলি লইয়া মন্থরা অস্ফুট কণ্ঠে প্রশ্ন করিল, “প্রভু, পারিব তো?”

বসিষ্ঠ স্নেহভরে তাহার মস্তকে উভয় হস্ত স্থাপন করিয়া কহিলেন, “পারিবে বৎসে, পারিবে। তুমি আজ অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছ, আর তোমার ভয় নাই। ভগবান রামচন্দ্র তোমার নিত্যসঙ্গী হইবেন; তোমার কল্যাণ করিবেন। অবশিষ্ট জীবন তুমি শান্তিতে অতিবাহিত করিবে, এ আমি দিব্যচক্ষে দেখিতেছি। আশীর্বাদ করি তুমি জনকল্যাণী হও, পাপীতাপীর আশ্রয় হও, আত্মজ্ঞা হও।”

মন্থরা প্রণাম করিয়া চলিয়া যাইতেছিল, বসিষ্ঠ সহসা বলিয়া উঠিলেন, “আজ মহর্ষি বাল্মীকি এখানে উপস্থিত নাই; তাঁহার রামচরিতকাব্যের এই পরম রমণীয় পরিবেশন তিনি দেখিলেন না, এই পরম আনন্দ হইতে বঞ্চিত হইলেন। বৎসে, তিনি তোমার শূককীটরূপ দেখিয়াছেন এবং বর্ণনা করিয়াছেন, তাহার স্পর্শের জ্বালা তিনি বর্তমানকালকে অনুভব করাইয়াছেন এবং অনাগত কালের জন্য রাখিয়া যাইতেছেন, কিন্তু তোমার প্রজাপতিতে রূপান্তর তিনি দেখিলেন না, ইহার সৌন্দর্য উপভোগ করিলেন না, আমার এই দুঃখ রহিল। তাঁহার রামায়ণে তোমার প্রতি অবিচার চিরস্থায়ী হইয়া রহিয়া যাইবে, ইহা উচিত হয় না। আমি মহর্ষিকে তোমার এই পরিবর্তনের কথা জানাইতে না পারিলে স্বস্তি পাইতেছি না । উত্তরকাণ্ডে আর একটা সর্গ যথাস্থানে যোগ করিয়া দেওয়া তাঁহার পক্ষে কঠিন হইবে না। তুমি কী বলো?”

মন্থরা কৃতাঞ্জলি হইয়া বলিল, “প্রভু, আমি প্রকৃতপক্ষে পাপিষ্ঠা; মহর্ষি রামায়ণে আমার পরশ্রীকাতরতার এবং ক্রুরতার যে চিত্র আঁকিয়াছেন, তাহাতে বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নাই, তিনি আমার যথার্থ রূপই জগদ্বাসীকে দেখাইয়াছেন। আমার বর্তমান চিত্তস্থৈর্যে আমার নিজেরই সম্পূর্ণ বিশ্বাস নাই, সুতরাং মহর্ষিরচিত পুণ্যকাহিনীর মধ্যে আমার কথা আর বাড়াইয়া লাভ নাই, আপনি তাঁহাকে আমার জন্য, কোনও অনুরোধ করিবেন না। আপনার দয়া আমি জীবনে ভুলিব না, আপনার আশীর্বাদ আমার অন্তরে চিরদিন বলসঞ্চার করিবে; কিন্তু পুণ্যবতী বলিয়া পরিচয় দিতে আমি কোনওদিন পারিব না। এখন আমাকে একান্তে প্রায়শ্চিত্ত করিতে অনুমতি দিন।”

অতঃপর কিছুক্ষণ অবনত মুখে নীরবে অবস্থান করিয়া মন্থরা পুনরপি অশ্রুগদগদ কণ্ঠে বলিল, “আমি জানি, পৃথিবীতে রামকথা যতদিন প্রচারিত থাকিবে, ততদিন এই হতভাগিনীর নাম কেহ ভুলিবে না, অনাগতযুগের শতকোটি মানবমানবীর ধিক্কার এবং অভিশাপ আমাকে মৃত্যুর পরপারে যুগযুগান্তর ধরিয়া অনুসরণ করিবে, তাহাও জানি। কেবল আমার অন্তহীন পাপের সেই অকূল অন্ধকারের মধ্যে এই পথভ্রষ্টার অসহায় আত্মাকে পথ দেখাইবার জন্য দুইটি মহৎ হৃদয়ে করুণার দীপ্ত শিখা জ্বলিবে, একটি বৃদ্ধ এবং একটি তরুণ শুভকামী, অত্যাচারিত নরদেবতা, রামসীতার গুরু এবং সন্তান, আমাকে তাঁহাদের উদার অন্তরের ক্ষমায় স্নেহে এবং আশীর্বাদে অভিষিক্ত করিবেন, এই সান্ত্বনায় আমি পরলোকেও, নরকেও শান্তিলাভ করিব।”

মহারাজ কুশ নীরবে অশ্রুমোচন করিলেন, অদূরে দণ্ডায়মান অর্থসচিব ভদ্র অশ্রু গোপন করিবার জন্য মুখ ফিরাইলেন, কেবল মহর্ষি বসিষ্ঠ অবিচলিতচিত্তে মন্থরার মস্তকোপরি কল্যাণহস্ত প্রসারিত করিয়া প্রসন্ন হাস্যোদ্ভাসিতবদনে বলিলেন, “তথাস্তু।”

সমাপ্ত

বার ❀ মন্থরাহরণ ❀ এডুলিচার পাঠশালা