এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘মন্থরাহরণ’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
বাংলা সাহিত্যে পৌরাণিক কাহিনির পুনর্নির্মাণের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। পুরাণের পরিচিত চরিত্র, ঘটনা ও আখ্যানকে অবলম্বন করে পরবর্তী কালের লেখকেরা কখনো ইতিহাসের পুনর্পাঠ করেছেন, কখনো মানবমনের জটিলতা অনুসন্ধান করেছেন, আবার কখনো প্রাচীন কাহিনির ভেতর দিয়ে সমকালীন জীবনবোধকে প্রকাশ করেছেন। প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মন্থরাহরণ’ সেই পৌরাণিক-আখ্যানভিত্তিক বাংলা উপন্যাসধারার একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। গ্রন্থটির বিশেষ আকর্ষণ শুধু এর পৌরাণিক বিষয়বস্তুতে নয়; বরং প্রাচীন আখ্যানকে সাহিত্যিক কল্পনা ও মানবিক অনুভূতির আলোয় নতুনভাবে দেখার প্রচেষ্টায়।
‘মন্থরাহরণ’-এর প্রকাশনা-ইতিহাসও বইটির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম গ্রন্থসংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, গ্রন্থটি রাসপূর্ণিমা ১৩৯০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিকা ছিলেন শ্রীমতী হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রকাশনার ঠিকানা ছিল কর্ণিকার, শ্রীপল্লী, শান্তিনিকেতন, বীরভূম। গ্রন্থটির মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীতিলক দাস এবং মুদ্রণ সম্পন্ন হয় বোলপুরের শ্রীলক্ষ্মী প্রেসে। অর্থাৎ বইটির প্রকাশনার সঙ্গে শান্তিনিকেতন-বোলপুর অঞ্চলের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি প্রত্যক্ষ যোগ ছিল। এই প্রথম সংস্করণের প্রকাশকালকে গ্রন্থটির সাহিত্যিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়।
প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে বহুমুখী সৃষ্টিশীলতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কবিতা। বিভিন্ন পুরনো সাহিত্যপত্র ও সংকলনে তাঁর কবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। ‘পাঠশালা’ পত্রিকার কার্তিক ১৩৪৭ সংখ্যায় তাঁর ‘পরিচয়’ কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল; আবার ‘রংমশাল’-এর কার্তিক ১৩৪৪ সংখ্যাতেও তাঁর রচনা প্রকাশের নজির রয়েছে। ‘প্রেম যুগে যুগে’ সংকলনেও তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে। তাঁর কবিতার পরিসর থেকে বোঝা যায়, তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একজন লেখক ছিলেন।
প্রভাতমোহনের সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর অনুবাদ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যচর্চা। লল্লনজী গোপালের ‘সমুদ্রগুপ্ত’-এর বাংলা অনুবাদক হিসেবে তাঁর নাম পাওয়া যায়; একইভাবে প্রভাকর মাচওয়ের ‘কবীর’-এর বাংলা অনুবাদও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। ‘চিত্রে প্রাচীন ভারত’ নামে তাঁর নিজস্ব গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে, যা ভারতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর আগ্রহের পরিচয় বহন করে। এই পটভূমি থেকে ‘মন্থরাহরণ’-এর মতো পৌরাণিক বিষয়নির্ভর একটি উপন্যাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, পুরাণ ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি লেখকের আকর্ষণ তাঁর সাহিত্যিক সত্তার বিচ্ছিন্ন কোনো দিক ছিল না; বরং তাঁর বৃহত্তর সাহিত্যচর্চার সঙ্গেই তা সম্পর্কিত।
‘মন্থরাহরণ’-এর বিষয়বস্তুর কেন্দ্রে রয়েছে পৌরাণিক আখ্যান। কিন্তু পৌরাণিক উপন্যাসের প্রকৃত সার্থকতা কেবল পুরাণের ঘটনাকে পুনরায় বর্ণনা করার মধ্যে নয়। পরিচিত কাহিনি পাঠকের কাছে নতুন হয়ে ওঠে তখনই, যখন লেখক তার চরিত্রগুলোর মানবিক অনুভূতি, সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব ও আকাঙ্ক্ষাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পারেন। প্রভাতমোহনের রচনায় সেই পুরাণ-সচেতনতার সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহের যোগসূত্রটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ফলে ‘মন্থরাহরণ’কে নিছক পৌরাণিক কাহিনির পুনর্কথন হিসেবে দেখলে গ্রন্থটির সাহিত্যিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশই উপেক্ষিত হয়।
পুরাণের চরিত্রেরা সাধারণত আমাদের কাছে অতীতের দূরবর্তী মানুষ—তাদের জীবন দেবতা, রাজা, ঋষি, অসুর কিংবা কিংবদন্তির নানা পরিচয়ে আবৃত। কিন্তু উপন্যাসের শক্তি হলো, সে চরিত্রদের সেই দূরত্ব ভেঙে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা আকাঙ্ক্ষা, দ্বিধা, ভালোবাসা, ক্ষোভ, প্রতিহিংসা কিংবা অসহায়তাকে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে। ‘মন্থরাহরণ’-এর পৌরাণিক আবহও সেই অর্থে পাঠককে শুধু অতীতের একটি কাহিনির সামনে দাঁড় করায় না; বরং প্রাচীন আখ্যানের ভেতরে মানুষের চিরন্তন স্বভাব ও সম্পর্কের নানা স্তরকে উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।
প্রভাতমোহনের সাহিত্যিক পরিচয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তাঁর ঐতিহ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি। রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজ সম্পর্কে আলোচনায় তাঁর নাম যে সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পাশাপাশি এসেছে, সেখানে প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও পুরাণকাহিনির প্রতি অনুরাগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মন্থরাহরণ’-এর মতো একটি গ্রন্থকে পাঠ করলে এর পেছনে থাকা সাহিত্যিক মানসিকতার একটি বৃহত্তর পরিসর ধরা পড়ে। আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীনতার সংঘাত না ঘটিয়ে পুরাণকে নতুন ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থিত করাই যেন এই ধরনের সাহিত্যচর্চার অন্যতম লক্ষ্য।
এই গ্রন্থের গুরুত্ব তাই কেবল গল্পের ঘটনাপ্রবাহে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা সাহিত্যে পৌরাণিক উপন্যাসের যে ধারাটি পাঠককে একদিকে প্রাচীন ভারতীয় কাহিনির সঙ্গে পরিচিত করে এবং অন্যদিকে সেই কাহিনিকে আধুনিক সাহিত্যিক বোধের মধ্যে পুনর্গঠন করে, ‘মন্থরাহরণ’ সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত একটি গ্রন্থ হিসেবে মূল্যবান। এর পাঠে পুরাণ ও সাহিত্য, ঐতিহ্য ও কল্পনা, অতীত ও বর্তমান—এই কয়েকটি স্তর পাশাপাশি কাজ করে।
প্রভাতমোহনের লেখকসত্তাকে বিবেচনা করলে ‘মন্থরাহরণ’-এর আরেকটি দিকও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি শুধু কল্পনাশ্রয়ী কবি ছিলেন না; ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিষয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর ‘চিত্রে প্রাচীন ভারত’ গ্রন্থের প্রকাশনা-তথ্য এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের চরিত্র নিয়ে অনুবাদকর্ম সেই আগ্রহেরই প্রমাণ। ফলে পৌরাণিক বিষয়কে উপন্যাসের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘মন্থরাহরণ’-এর প্রকাশকালও একে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় বহুল আলোচিত নন এমন অনেক লেখকের বই সময়ের প্রবাহে দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়, অথচ সেই বইগুলো একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যিক সময়, রুচি ও ভাবনার সাক্ষ্য বহন করে। ‘মন্থরাহরণ’ও সেই অর্থে পুনর্পাঠের দাবি রাখে। একটি প্রাচীন আখ্যানকে একজন বিংশ শতকের বাঙালি লেখক কীভাবে দেখেছিলেন, কীভাবে তার চরিত্র ও ঘটনাকে নিজের সাহিত্যিক বোধের মধ্যে গ্রহণ করেছিলেন—এই প্রশ্নগুলো বইটির মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আর এখানেই ‘মন্থরাহরণ’-এর পাঠ আজকের পাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক। পুরাণের কাহিনি বদলে যায় না, কিন্তু প্রতিটি যুগ তাকে নতুনভাবে পড়ে। একই চরিত্র এক সময়ে ধর্মীয় বা পৌরাণিক প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, অন্য সময়ে সে হয়ে উঠতে পারে একজন জটিল মানুষ—যার সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক চাপ এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব। একটি পৌরাণিক উপন্যাসের স্থায়ী মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করে এই পুনর্পাঠের ক্ষমতার ওপর।
‘মন্থরাহরণ’ সেই কারণে কেবল পুরাণভিত্তিক একটি উপন্যাস হিসেবে নয়, প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুমুখী সাহিত্যিক পরিচয় বোঝার একটি সহায়ক গ্রন্থ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কবিতায় যেমন ছন্দ, কৌতুক ও ঐতিহ্যের উপস্থিতি দেখা যায়, তেমনি তাঁর অনুবাদ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যবিষয়ক রচনায় ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘মন্থরাহরণ’ সেই বৃহত্তর সাহিত্যিক প্রবণতার কথাসাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবে পাঠ করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, ‘মন্থরাহরণ’ এমন একটি গ্রন্থ, যার মূল্যায়নে কেবল কাহিনির চমক বা আধুনিক উপন্যাসের প্রচলিত মানদণ্ড যথেষ্ট নয়। এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে পৌরাণিক ঐতিহ্যের সঙ্গে একজন বাঙালি সাহিত্যিকের সৃজনশীল সম্পর্কের মধ্যে। প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনের নানা দিক—কবিতা, অনুবাদ, ইতিহাস ও ভারতীয় ঐতিহ্যচর্চা—একসঙ্গে বিবেচনা করলে এই উপন্যাসের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক বিস্মৃতির আড়াল থেকে ‘মন্থরাহরণ’-এর মতো গ্রন্থকে পুনরায় পাঠকের সামনে নিয়ে আসা তাই শুধু একটি পুরনো বইকে উদ্ধার করা নয়; এটি বাংলা সাহিত্যের অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত এক ধারার স্মৃতি ও উত্তরাধিকারকেও পুনরায় পাঠ করার একটি সুযোগ।