অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে বিচারসভা বসিয়াছিল। প্রকাশ্য ধর্মাধিকরণে নহে, রামভবনের অন্তঃপুরমধ্যস্থিত উদ্যানমধ্যে। একটি প্রফুল্ল পুষ্পাচ্ছাদিত মর্মর শিলাসোপানযুক্ত পদ্মসরোবরের তীরে নীলাশোক, স্বর্ণপলাশ পিয়াল, কর্ণিকার প্রভৃতি বৃক্ষরাজি বেষ্টিত একটি পুষ্পিত বকুলতরুমূলে মরকতশ্যামল মণিবেদিকায় মহারাজ কুশ উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁহার পার্শ্বদেশে এবং পশ্চাদ্দেশে স্বর্ণ ও গজদন্তনির্মিত দণ্ডযুক্ত শ্বেতছত্র ও চামর লইয়া ছত্র ও চামরধারিণী, প্রতিহারী এবং কয়েকজন সশস্ত্র সৈনিক দণ্ডায়মান। তাঁহার সম্মুখে অনতিদূরে দুইজন প্রহরী দুইদিক্ হইতে শৃঙ্খলাবদ্ধ বিশাখদত্তের কটিবন্ধনরজ্জু ধরিয়া রাখিয়াছিল, তাহাদের বামভাগে আনুমানিক দুইহস্ত দূরে অমাত্য ভদ্র ভূমিনিবন্ধদৃষ্টি হইয়া অবস্থিত ছিলেন। চারিদিক নিস্তদ্ধ, কেবল তিলক আমলক মধুক পনস প্রভৃতি পল্লবঘন বৃক্ষরাজির শাখাপ্রশাখায় বিলম্বিত শতশত কিঙ্কিণী বায়ুচালিত হইয়া নিনাদিত হইতেছিল এবং বিভিন্ন ছায়া পাদপের পত্রান্তরাল হইতে ক্বচিৎ বিহগকুজন শ্রুত হইতেছিল।
মহাবাহু রামাত্মজ কুশ কন্দর্পকান্তি যুবাপুরুষ। পূর্বদিনের মানসিক উদ্বেগ, শোক এবং অনিদ্রাবশতঃ তাঁহাকে ক্লান্ত দেখাইতেছিল, নিতান্ত কর্তব্যানুরোধেই তিনি প্রাতঃকালে বিচার করিতে বসিয়াছিলেন। তিনি সম্মুখস্থ বন্দীকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, “বিশাখদত্ত, তোমাকে গতকল্য মধ্যরাত্রে আমার অস্তঃপুর-মধ্যে পাওয়া গিয়াছে। তুমি কী উদ্দেশ্যে এখানে আসিয়াছিলে, তোমার সে উদ্দেশ্য কতদূর সফল হইয়াছে আমি জানিতে ইচ্ছা করি।” কুশ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বন্দীর দিকে চাহিয়া নীরব হইলেন, বিশাখদত্তও নীরবে নতনেত্রে দাঁড়াইয়া রহিল। কুশ তখন পুনর্বার কহিলেন, “বন্দী, রাত্রিকালে বিনানুমতিতে রাজান্তঃপুরে প্রবেশের শাস্তি প্রাণদণ্ড, তাহা তুমি নিশ্চয় অবগত আছ। তোমার কটিবন্ধে ছুরিকা ছিল, প্রাসাদের অনেকগুলি ভিত্তিচিত্র, পট এবং স্বর্ণরৌপ্য ও শিলামূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে, তাহার জন্য তুমি কতদূর দায়ী এখনও তাহার মীমাংসা হয় নাই। আমার স্বর্গগত পিতৃদেব তোমাকে স্নেহ করিতেন, সেজন্য আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ না দিয়া আমি তোমাকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করি না। এখনও তোমার কি বলিবার আছে বোল।”
বিশাখদত্ত তখনও কিছু বলিল না, নিরুত্তর রহিল। কুশ বলিলেন, “তবে কি বুঝিব তোমার বক্তব্য কিছুই নাই? তুমি রাজ্যব্যাপী বিশৃঙ্খলার সুযোগে আমার ক্ষতি এবং প্রাণনাশ-চেষ্টায় আসিয়াছিলে? কোন্ মন্দবুদ্ধি সামন্তনৃপতি অথবা জ্ঞাতিশত্রু তোমাকে প্রেরণ করিয়াছিল তাহাও বলিবে না? প্রকৃত অপরাধীর সন্ধান দিলে এ-যাত্রা তোমার প্রাণরক্ষা হইতে পারিত; অন্যথা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।
সীতা-মূর্তি হরণের জন্য প্রস্তুত হইয়া রাজপুরীতে প্রবেশের সময়েই বিশাখদত্ত অধর্মভয় পরিত্যাগ করিয়াছিল, এখন নিজের মৃত্যু আসন্ন জানিয়া সে ভাবিল, “মরিতেই যদি হয় তবে একা মরি কেন?” সে দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্বক কহিল, “মহারাজ, আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করিবেন?”
কুশ বলিলেন, “বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাইলে অবশ্যই বিশ্বাস করিব।”
বিশাখদত্ত ম্লান হাস্যের সহিত বলিল, “মহারাজ, কী যে বিশ্বাসযোগ্য আর কী যে অবিশ্বাস্য তাহা বিচক্ষণ ব্যক্তির পক্ষেও বুঝিয়া উঠা কঠিন। তস্কর শক্তিশালী হইলে সে সন্ধিচ্ছেদক-শর্বলা লইয়া গৃহস্থকে আক্রমণ করে। অমাত্য ভদ্রের হস্তে তরবারি ছিল, আমার হস্তে ছিল না, সুতরাং আমি আপনার হিতকামী হইয়াও বন্দী এবং অপরাধী সাব্যস্ত হইয়াছি। এক্ষণে সাধুপ্রবর অমাত্য কী মহদুদ্দেশ্যে মধ্যরাত্রে রাজান্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছিলেন, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা কি মহারাজ কর্তব্য বোধ করিতেছেন না?”
কুশ দৃশ্যতঃ বিচলিত হইলেন। তাঁহাকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখিয়া বিশাখদত্ত বলিল, “অমাত্যের অপেক্ষা আমার উদ্দেশ্য হয়তো সাধুই ছিল, নিজের স্বার্থহানির সম্ভাবনায় তিনি আমাকে শুধু বন্দী করিয়াই সন্তুষ্ট হন নাই, চিরদিনের মতো পৃথিবী হইতে অপসৃত করিবার জন্য চক্রান্ত করিয়াছেন। রক্ষিগণের অসতর্কতার সুযোগে তিনি রাজপুরীতে প্রবেশ করিয়াছিলেন। আমি কোনও আত্মীয়ের গুরুতর পীড়ার সংবাদ পাইয়া এই অঞ্চলে আসিয়াছিলাম, তাঁহাকে অপেক্ষাকৃত সুস্থ দেখিয়া মধ্যরাত্রে রাজপ্রাসাদের সম্মুখস্থ পথ দিয়া স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনকালে মুক্তদ্বার অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাসাদের ত্রিতলে সঞ্চরমাণ উল্কাশিখা দেখিয়া আকৃষ্ট হইয়া এখানে প্রবেশ করি। দুঃখের বিষয়, আমি পৌঁছিবার পূর্বেই অমাত্যের কু-অভিসন্ধি সিদ্ধ হইয়াছিল মনে হয়, আমার অপরাধ আমি তাঁহাকে বাধা দিতে পারি নাই। মহারাজের যে বহুমূল্য সম্পত্তি অপহৃত হইয়াছে, আমার চক্ষুর সম্মুখে অমাত্যের সশস্ত্র অনুচরেরা বস্ত্রাবৃত-শিবিকা যোগে তাহা লইয়া গিয়াছে—”
মহারাজ কুশ নবীন যুবক, বাল্যকাল তপোবনে অতিবাহিত করায় নাগরিকসুলভ কৃত্রিম হাবভাবাদি তাঁহার সম্যক্ আয়ত্ত হয় নাই। এতক্ষণ গম্ভীর মুখে বিচারাসনে উপবিষ্ট থাকিলেও তিনি এইরূপ বিচার ও শাস্তিদানে অভ্যস্ত ছিলেন না, ভিতরে ভিতরে হাঁফাইয়া উঠিয়াছিলেন। বিশাখদত্তের শেষ কথায় তিনি আর গাম্ভীর্য রক্ষা করিতে পারিলেন না, উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন, “আমার বহুমূল্য সম্পত্তির মধ্যে বৃদ্ধা কুব্জা দাসী মন্থরা গতরাত্রে অপহৃতা হইয়াছে শুনিতেছি। তা বলো কি শিল্পী, তুমি অমাত্যপ্রবরকে শিবিকাযোগে মন্থরাহরণ করতে সজ্ঞানে স্বচক্ষে দেখিয়াছ? স্বপ্ন দেখ নাই তো? অমাত্য ভদ্র, আপনার এ কি প্রবৃত্তি? গৃহে সুন্দরী পত্নী থাকিতে শেষে কুব্জার রূপে মজিলেন?”
বিশাখদত্ত সহসা এই সংবাদ পাইয়া বিস্ময়ে হতবাক্ হইয়া গেল। তাহার পদদ্বয় অবশ হইয়া যাওয়ায় সে তৎক্ষণাৎ সেই তৃণাচ্ছন্ন ভূমিতলে বসিয়া পড়িত, কেবল দুই পার্শ্ব হইতে দুইজন বলবান প্রহরী তাহাকে ধরিয়া থাকায় বসিতে না পারিয়া সে অপ্রকৃতিস্থের মতো টলিতে লাগিল। স্বর্ণসীতার জন্য সে যে কেবল স্বেচ্ছায় পরকাল এবং ধর্মের মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছে তাহাই নহে, প্রচুর অর্থব্যয় করিয়াছে, দ্বাদশজন ক্রীতদাসকে মুক্তি দিবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রহিয়াছে, তাহাদের প্রত্যেককে অগ্রিম দশটি করিয়া সুবর্ণ মুদ্রা দিয়াছে, একটি স্বর্ণ-রৌপ্য-খচিত মুক্তাজালালংকৃত বহুমূল্য বিচিত্র শিবিকা সঙ্গে দিয়াছে। সমস্তই পণ্ড হইল? একদিকে রাজদণ্ডের ভয়, অন্যদিকে আশাভঙ্গের মনস্তাপ তাহাকে উন্মাদ করিয়া তুলিল। এমন সময় অমাত্য ভদ্রের দিকে তাহার দৃষ্টি নিপতিত হইল, দেখিল, তিনি মৃদু মৃদু হাসিতেছেন। বিশাখদত্ত মুক্ত অবস্থায় থাকিলে ছুটিয়া গিয়া হয়তো দুই হস্তে তাঁহার গলদেশ টিপিয়া ধরিত, তাহা না পারিয়া ক্রুদ্ধ সর্পের মতো দৃষ্টি দ্বারাই যেন দূর হইতে তাঁহাকে দগ্ধ করিতে প্রয়াসী হইল। পরে তাহার গণ্ডদেশ আপ্লাবিত করিয়া অশ্রুধারা নামিল, সে অধোবদনে গদ্গদস্বরে কহিল, “মহারাজ, আপনি আমার যে শাস্তি বিধান করিতে হয় করুন, আমি আর কিছু বলিব না।”
মহারাজ কৃশ স্পষ্টতঃই বিচলিত হইয়াছিলেন। তিনি অতঃপর অমাত্য ভদ্রের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “আর্য, আপনি আমার পিতার বয়স্য এবং আমার শুভানুধ্যায়ী। বিশাখদত্তের অভিযোগ শুনিলেন। মধ্যরাত্রে কী অভিপ্রায়ে আপনি রাজান্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছিলেন বলিবেন কি? প্রকারান্তরে আমার স্বর্গীয়া জননীর নির্বাসনের জন্য দায়ী জানিয়াও সত্যবাদিতার জন্য আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি। আশা করি সত্য সাক্ষ্য দ্বারা আপনি আমাদের সন্দেহের নিরসন এবং রহস্যের সমাধান করিবেন।”
তখন অমাত্য ভদ্র করপুটে নিবেদন করিলেন, “মহারাজ, আমি সত্য কথাই বলিব। আপনার স্বর্গীয় পিতৃদেবের নির্দেশ অনুসারে আমি দিনে রাত্রে স্ববেশে এবং ছদ্মবেশে অযোধ্যার প্রজাপূঞ্জের সুখদুঃখের সংবাদ লইবার জন্য প্রাসাদে কুটিরে পথে প্রান্তরে ভ্রমণ করিতে অভ্যস্ত। রাজান্তঃপুরে, এমন কি মহারাজের শয়নকক্ষে দিনে রাত্রে, প্রকাশ্যে বা গোপনে প্রবেশ করিবার জন্য অধিকার রামচন্দ্র স্বয়ং আমাকে দিয়াছিলেন, তাঁহার মুদ্রাঙ্কিত এই অনুমতিপত্র দেখিলেই আপনি তাহা অবগত হইবেন।”
অমাত্য বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে পত্র বাহির করিয়া নতজানু হইয়া নৃপতির হস্তে সমর্পণ করিলেন, কুশ তাহা পাঠ করিয়া ললাটে স্পর্শ করাইয়া আবার তাঁহাকে প্রত্যর্পণ করিয়া বলিলেন, “তারপর?”
ভদ্র বলিলেন, “মহারাজ, গতকল্য রজনীতে নগরভ্রমণে বহির্গত হইয়াছিলাম। এই অঞ্চলে আসিয়া লক্ষ্য করিলাম, রামভবনের তোরণদ্বার উন্মুক্ত এবং অরক্ষিত। অগত্যা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া পুরী প্রহরায় নিযুক্ত হইয়াছিলাম! মধ্যরাত্রে অন্ধকার রাজপুরীর ত্রিতলে সঞ্চরমাণ অলোকশিখা দেখিয়াও প্রথমে আমি কোনো সন্দেহ করি নাই, বহুক্ষণ গত হইলেও যখন উহা নির্বাপিত হইল না, উপরন্তু কোনওরূপ অস্ত্রাঘাতের শব্দ চারিদিকের অখণ্ড নীরবতা ভঙ্গ করিতে লাগিল তখন আমি ত্রিতলে আরোহণ করিয়া দেখি, পাপিষ্ঠা মন্থরা ঘরে ঘরে কুঠার এবং উল্কাহস্তে ভ্রমণকরতঃ অমূল্য মূর্তি এবং চিত্রসমূহ বিনষ্ট ও বিকৃত করিতেছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়-অবস্থায় তাহাকে অনুসরণ করি। অচিরে উল্কা নির্বাপিত হইলে কুব্জা অন্ধকারেই আপনার পিতৃদেবের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। সেখানে আপনার মাতৃদেবীর স্বর্ণপ্রতিমা দেখিয়া সে প্রথমে ভয়ে অভিভূত হয়, প্রেতমূর্তিজ্ঞানে তাহার স্তবস্তুতি আরম্ভ করে। পরে মূর্তি স্পর্শ করিয়া উহার স্বরূপ জ্ঞাত হইবামাত্র কুঠার উত্তোলন করিয়া মূর্তিটিতে আঘাত করিতে যায়। আমি অন্তরাল হইতে লক্ষ্য করি আর এক ব্যক্তি দ্বারসমীপস্থ হইয়াছে, আমি কক্ষে প্রবেশ করিবার পূর্বেই এই বিশাখদত্ত দ্রুতবেগে গিয়া মন্থরাকে ধরিয়া ফেলে, কুব্জা অকস্মাৎ আক্রান্ত হইয়া ভয়ে হতচেতনা হইয়া পড়ে। ইত্যবসরে তাহাকে শ্রীরামচন্দ্রের পর্যঙ্কতলে লুক্কায়িত করিয়া বিশাখদত্ত স্বীয় স্কন্ধবিলম্বিত মহিষদৃতির মধ্যে স্বর্ণসীতাকে ভরিয়া উহা অপহরণের জন্য নিজ অনুচরদিগকে ডাকিতে যায়। আমি তাহার দুরভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া ইত্যবসরে মহিষদৃতি হইতে স্বর্ণসীতাকে বাহির করিয়া বিগতচেতনা মন্থরাকে তন্মধ্যে ভরিয়া রাখি। অনতিকাল পরে বিশাখদত্তের অনুচরগণ উক্ত মহিষদৃতিমধ্যস্থা মন্থরাকে একটি বস্ত্রাবৃত শিবিকা-মধ্যে স্থাপন করিয়া প্রাসাদবহির্দেশে লইয়া গেলে আমি বিশাখদত্তকে বন্দী করি; সুরাবিহ্বল কয়েকজন প্রহরীকে প্রকৃতিস্থ করিয়া তাহাদের প্রহরায় নিযুক্ত করি। ঊষাকালে আপনাকে সংবাদ দিয়া বিচারসভা আহ্বান করিতে অনুরোধ জানাই। মহারাজ, যাহা বলিলাম তাহার একবর্ণ মিথ্যা নহে অতঃপর আপনি যাহার যাহা শাস্তি বিধান করিতে হয় করুন।”
অমাত্য ভদ্র নীরব হইলেন। মহারাজ কুশ বিস্ময়বিস্ফারিত নয়নে অমাত্যের বিবৃত কাহিনী শুনিতেছিলেন, তিনি কৌতুকোৎফুল্ল মুখে কিছুক্ষণ শিল্পী ও অমাত্য উভয়ের মুখাবলোকন করিলেন, তারপর বলিলেন, “বিশাখদত্ত, আৰ্য ভদ্র যাহা বলিলেন তাহা তুমি শুনিয়াছ। এক্ষণে তোমার বক্তব্য কি?”
বিশাখদত্ত নৈরাশ্যে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িয়াছিল। বলিল, “মহারাজ, অমাত্যের কথা সম্পূর্ণ সত্য। আমি দুর্বুদ্ধিবশতঃ আমার স্বহস্তনির্মিত স্বর্ণপ্রতিমায় লোভ করিয়াছিলাম, অমাত্যের নিকট আমি চাতুর্যে পরাজিত হইয়াছি। আমার ইহকাল পরকাল উভয়ই গিয়াছে।”
তাহার বক্তব্য শুনিয়া মহারাজ কুশ কিয়ৎক্ষণ নীরবে চিন্তা করিলেন। তারপর হাসিয়া বলিলেন, “বিশাখদত্ত, তুমি তস্কর এবং দণ্ডার্হ মহাপাপী হইলেও কল্য রাত্রে তুমি আমার মাতৃদেবীর স্বর্ণপ্রতিমাটিকে ধ্বংসের কবল হইতে রক্ষা করিয়াছ। সেজন্য আমি তোমাকে প্রাণদণ্ড দিলাম না। তোমার অনুচরগণ মন্থরাকে কোথায় লইয়া গিয়াছে তাহা তুমি নিশ্চয় অবগত আছ। আৰ্য ভদ্রকে সন্ধান দিলে তিনি অবিলম্বে তাহাকে উদ্ধার করিতে পারিবেন আশা করি। যতদিন তাহাকে ফিরিয়া পাওয়া না যায় ততদিন তুমি নিজ গৃহের বাহিরে যাইতে পারিবে না। আমার পিতৃদেবের একটি স্বর্ণমূর্তি তুমি বিনা পারিশ্রমিকে নির্মাণ করিয়া বৎসরান্তে আমার নিকট উপস্থিত করিবে, মূর্তিরচনার জন্য উপযুক্ত পরিমাণ স্বর্ণ অবশ্য তুমি রাজকোষ হইতে পাইবে। সাবধান, গতকল্য রাত্রির বৃত্তান্ত যেন নগরবাসী কাহারও কর্ণগোচর না হয়। মন্থরাহরণের জন্য প্রজাগণ আমাকে দায়ী করিতে পারে। এখানে উপস্থিত প্রত্যেককে আমি এ-বিষয়ে সতর্ক করিয়া দিতেছি, আমার আদেশ পালিত না হইলে কঠিন শাস্তি পাইতে হইবে।”
রাজাজ্ঞায় কর্মকার আসিয়া বন্দীর শৃঙ্খল মোচন করিল, প্রহরীরা তাহার কটিদেশ হইতে বন্ধনরজ্জু খুলিয়া লইয়া তাহাকে প্রাসাদ বর্হিদেশে রাখিয়া আসিল। অতঃপর আর কয়েকজন প্রহরী অমাত্য ভদ্রের ইঙ্গিতে বিংশতিজন অন্তঃপুররক্ষককে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় সেখানে উপস্থিত করিল। তাহাদের তখন সুরাবিহ্বলতা কাটিয়াছে, খোঁয়াড়ি-জনিত অবসাদে সকলেই কাতর। কুশকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া তাহারা কাঁদিয়া আকুল হইল, তাহাদের অশ্রুস্রোতে উদ্যানপথ কর্দমাক্ত হইয়া গেল। মহারাজ ক্রুশ সরোষে তাহাদিগকে তিরস্কার করিতে লাগিলেন। তাহারা অস্ফুট গদ্গদ কণ্ঠে যাহা বলিল তাহার সরলার্থ, “মহারাজ, আমরা পিতৃতুল্য মহারাজ রামচন্দ্রের বিহনে অনাথ হইয়াছি। তাঁহার বিরহ-দুঃখ ভুলিবার জন্য সামান্য সুরাপান করিয়াছিলাম মাত্ৰ। তারপর আর কিছুই জানি না।”
করুণাময় মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে প্রতিপালিত হওয়ায় মহারাজ কুশ স্বভাবতঃই কোমল হৃদয় ছিলেন, বিশেষতঃ গতরাত্রে পিতৃশোক ভুলিবার জন্য তিনিও সুরাপানের প্রয়োজনীয়তা বোধ করিয়াছিলেন, কেবল জন্মাবধি অভ্যস্ত নহেন বলিয়া সুরাপাত্র স্পর্শ করেন নাই। রক্ষিগণের শোকের গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়া তিনি তাহাদের লঘুদণ্ড দিলেন, তাহাদিগকে সারাদিন উপবাসী থাকিয়া অনুতাপ করিতে বলিয়া বিদায় দিলেন। অতঃপর অন্যান্য প্রহরী, কঞ্চুকী ও অনুচর-অনুচরীদিগকে দ্বিতীয়বার “রাত্রির ঘটনা যেন প্রকাশ না পায়” এইরূপ নির্দেশ দিয়া বিদায় দিলেন। তারপর স্বয়ং গাত্রোত্থানপূর্বক অমাত্য ভদ্রের সহিত প্রাসাদাভিমুখে চলিতে চলিতে বলিলেন, “অমাত্যবর, আপনি বুদ্ধিবলে দুর্বুদ্ধি শিল্পীকে পরাজিত করিয়া আমার মাতৃদেবীর স্বর্ণপ্রতিমাটি রক্ষা করিয়াছেন, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু যাহাই বলুন না কেন, একটি জড় পদার্থের জন্য একটি অমূল্য মনুষ্যজীবনকে আপনি বিপন্ন করিয়াছেন, ইহা আপনার মতো বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির কর্তব্য হয় নাই।”
ভদ্র বলিলেন, “মহারাজ, আমি আমার কার্যের গুরুত্ব সে সময়ে বুঝিতে পারি নাই। নিমেষ-মধ্যে মহিষদৃতির ভিতর স্বর্ণপ্রতিমার পরিবর্তে একটি গুরুভার অপর বস্তু প্রবেশ করাইতে হইবে,—এইটুকু কেবল আমার চিন্তার বিষয় ছিল। নিকটে আর কিছু না পাইয়া কুব্জাকেই ব্যবহার করিয়াছি। হয়তো কুব্জার উপর পূর্বাবধি আমার বিদ্বেষ ছিল বলিয়াই অন্য উপায় আমি সন্ধান করি নাই। কুব্জা কেবল আপনাদের পারিবারিক সুখশান্তিই হরণ করে নাই, সীতাহরণের জন্য মূলতঃ সে-ই দায়ী হইলেও সীতাপবাদ শ্রীরামচন্দ্রের কর্ণগোচর করার অপরাধে আমি বহু নগরবাসীর নিকট, এমন-কি স্বগৃহে ঘৃণার্হ হইয়াছি।”
কুশ বলিলেন, “আর্য ভদ্র, আমি সমস্তই বুঝি। মন্থরার উপর আমিও সন্তুষ্ট নহি। গতকল্য রাত্রে সে আমার প্রাসাদের যে ক্ষতি করিয়াছে তাহা অল্প নহে, আমার মাতাপিতার জীবনে তৎকৃত ক্ষতির তো তুলনাই হয় না। কিন্তু সে তো অল্পবুদ্ধি অদৃষ্টের ক্রীড়নক। দেবকার্যসিদ্ধির জন্য, রামচরিত্রের মহিমা প্রকাশের জন্য এবং স্ফুরণের জন্য তাহার প্রতিকূলতার প্রয়োজন ছিল। মন্থরা না থাকিলে রাবণবধ হইত না, রামায়ণ লিখিত হইত না। যাহা হউক, এক্ষণে আপনি অবিলম্বে বিশাখদত্তের গৃহে যান এবং তাহার নিকট সন্ধান জানিয়া মন্থরাকে ফিরাইয়া আনুন।”
অমাত্য ভদ্র কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিলেন, “মহারাজ, আপনি পরম কারুণিক শ্রীরামচন্দ্রের পুত্রের উপযুক্ত কথাই বলিয়াছেন। যতদিন না মন্থরাকে ফিরাইয়া আনিতে পারি ততদিন আমি অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করিব না। নিজ অপরাধের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ এই নির্বাসনদণ্ড আমি স্বেচ্ছায় লইলাম।”
কুশ বলিলেন, “আর্য, আপনি বৃথা দুশ্চিন্তা করিতেছেন! মন্থরা হয়তো বিশাখদত্তের গৃহেই কোনো গুপ্তগৃহে লুক্কায়িত আছে, এক প্রহরের মধ্যেই আপনি তাহাকে উদ্ধার করিয়া আনিতে পারিবেন। বিশাখদত্ত আর আমার বিরুদ্ধতা করিতে সাহসী হইবে মনে হয় না।”
ভদ্র বলিলেন “না মহারাজ, আমি সে বিশ্বাস রাখি না। শিবিকাবাহকদের বিদায় দিবার অব্যবহিত পূর্বে বিশাখদত্ত মৃদুস্বরে যে নির্দেশ দিতেছিল দূরে থাকিয়া তাহার অনুসরণ করিতে করিতে আমি তাহার মধ্যে কয়েকটি শব্দ শুনিয়াছি। ‘নদীতীরে বনমধ্যে ভগ্ন দেবীমন্দির-পার্শ্বে কূপ’ এই কয়েকটা কথা স্পষ্ট আমার কর্ণগোচর হইয়াছে। আমার বিশ্বাস পাপিষ্ঠ বিশাখদত্তের ধারণা হইয়াছিল, স্বর্ণসীতার সন্ধানে নগরপাল অযোধ্যানগরীর প্রাসাদ কুটির মন্দির কূপ সরোবরের সর্বত্র তন্ন তন্ন করিয়া সন্ধান চালাইবে, তাহার গৃহও বাদ দিবে না। সেজন্য সে উপস্থিত স্বর্ণসীতা কোনও দূরবর্তী লোকালয়বর্হিভূত স্থানে কূপমধ্যে লুকাইয়া রাখিতে পাঠাইয়াছে, কারণ সে জানিত, এক বা দুই বৎসর পরে আপনার অনুচরেরা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ মনোরথ হইয়া স্বর্ণসীতার সন্ধানে বিরত হইবে, তখন এক সুযোগে সে মূর্তিটি আবার গোপনে স্বগৃহে লইয়া আসিয়া কোনও গুপ্তকক্ষে রাখিয়া দিবে বলিয়া স্থির করিয়াছিল। এক্ষণে আমার ভয় হইতেছে, পাপিষ্ঠ বিশাখদত্তের অনুচরেরা স্বর্ণসীতাভ্রমে দৃতিমধ্যস্থা মন্থরাকে কূপে না নিক্ষেপ করিয়া থাকে, আমি নারীহত্যার জন্য দায়ী না হইয়া থাকি।”
কুশ মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “নারীহত্যার জন্য দায়ী হইতে কি আপনি এখনও অভ্যস্ত হন নাই?” ভদ্র লজ্জায় অধোবদন হইলে কুশ অনুতপ্ত হইয়া বলিলেন, “কিছু মনে করিবেন না, আমরা বোধহয় কেহই কিছুর জন্য দায়ী নহি। যাহা হউক, আপনি জীবিতা কিংবা মৃতা মন্থরাকে লইয়া শীঘ্রই প্রত্যাবর্তন করিবেন আশা করি। আমি বনে পালিত অনভিজ্ঞ যুবক। পিতৃদেবের তিরোধানে রাজ্য বিশৃঙ্খল, অসময়ে আপনার মতো বিচক্ষণ বন্ধুর সাহায্য আমার বিশেষ প্রয়োজন জানিবেন। উপস্থিত আমার দ্বারা আপনার আর কোনও প্রয়োজন সাধিত হইতে পারে?”
ভদ্র বলিলেন, “মহারাজ, দয়া করিয়া আমার পত্নীকে জানাইবেন, গুরুতর রাজকার্যে আমাকে দূরদেশে যাইতে হইতেছে, কবে ফিরিব তাহার কোনও স্থিরতা নাই। আমার অনুপস্থিতিতে তাহাদের শুভাশুভের দিকে লক্ষ্য।”
কুশ বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “আপনি কি গৃহে একবার দেখাও করিয়া যাইবেন না? তাহাতে ক্ষতি কি ছিল?”
ভদ্র বলিলেন, “মহারাজ, মন্ত্রগুপ্তির জন্য সতর্কতার প্রয়োজন আছে। তদ্ভিন্ন আমি না বুঝিয়া যাহা করিয়াছি তাহার জন্য অনুতাপানলে দগ্ধ হইতেছি, এখনও হায়তো দ্রুত পৌঁছিতে পারিলে মন্থরার জীবন রক্ষা হইতে পারে। এখন প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান্।”
কুশ বলিলেন, “আপনি তবে একপল অপেক্ষা করুন, আমি আপনাকে আমার মুদ্রাঙ্কিত একটি অনুমতিপত্র দিব। সেই পত্র দেখাইলে আমার সাম্রাজ্যের অন্তর্গত জম্বুদ্বীপের সমস্ত রাজ্যের রাজা এবং রাজপুরুষেরা আপনাকে প্রয়োজনানুরূপ সাহায্য করিতে বাধ্য থাকিবেন। উপস্থিত একটি দ্রুতগামী নৌকা লইয়া যাইবেন, প্রয়োজনমতো পাথেয় অর্থ আমার অনুচর আপনাকে এখনই দিয়া যাইতেছে।” কুশ দ্রুতপদে প্রাসাদসোপান আরোহণ করিতে করিতে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। বলিলেন, “আর এক কথা। আমি দুই-চারি দিবসের মধ্যেই কুশাবতীতে চলিয়া যাইতেছি। অযোধ্যা হৃদয়বিদারক শোকের সমুদ্রে নিমজ্জিত, ইহাকে উদ্ধার করিবার শক্তি আমার নাই। নগরীর ঘরে ঘরে পিতামাতা ভ্রাতা ভগ্নী পুত্রকন্যা কেহ-না-কেহ গতকল্য সরযুসলিলে আত্মবিসর্জন করিয়াছে। যাহারা অবশিষ্ট আছে—তাহারা আমার সঙ্গে আমার মতো রুদ্ধশোকাগ্নিতে জ্বলিতেছে, আর কিছুদিন এখানে থাকিলে উন্মাদ হইয়া যাইবে। আমি অবিলম্বে নগরবাসী সকলকে জানাইয়া দিতেছি, যাহার ইচ্ছা নিজের সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি সঙ্গে লইয়া আমার অনুগমন করিতে পারে। চতুর্দিকের সহস্র-স্মৃতিপূর্ণ রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ হইতে নূতন রাজ্যে গিয়া শান্তি পাইতে পারে। এ-ক্ষেত্রে আপনি সপ্তাহকাল পরে আসিলে হয়তো দেখিবেন, পরিত্যক্ত নগরীতে জনপ্রাণী নাই। সুতরাং আপনার পত্নীপুত্রের যাত্রার আয়োজন না করিয়া দিয়া আপনার অযোধ্যা ত্যাগ করা এসময়ে সমীচীন হইবে না। মন্থরার যাহা হইবার এতক্ষণে হইয়া গিয়াছে বলিয়া আমার বিশ্বাস; সেই পাপীয়সীর জীবন সহজে যাইবে বলিয়া বোধ হয় না। তাহার জন্য আপনি আপনার আত্মীয়দের প্রতি কর্তব্যে অবহেলা করিলে ধর্মে পতিত হইবেন।”
ভদ্র নৃপতির বাক্যে দ্বিধাগ্রস্ত হইলেন। তখন কুশ বলিলেন, “আমি আপনার প্রভুপুত্র। বয়ঃকনিষ্ঠ হইলেও আশা করি আমার আদেশ অমান্য করিবেন না?”
ভদ্র বদ্ধাঞ্জলি হইয়া বলিলেন, “উপস্থিত আপনিই আমার অন্নদাতা এবং প্রভু। আপনার কী আদেশ বলুন?”
কুশ মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “আপনার আত্মীয় পরিজন সকলকে সঙ্গে লইয়া এক সপ্তাহের মধ্যে আপনি আমার সঙ্গে কুশাবর্তীতে গমন করিবেন। সেখানে তাহাদের বাসগৃহের সুব্যবস্থা করিয়া আপনি মন্থরার সন্ধানে গমন করিবেন।”
ভদ্র করপুটে মস্তক অবনত করিয়া বলিলেন, “আপনার আদেশ শিরোধার্য করিলাম। তবে কি মন্থরাকে পাইলে কুশাবতীতেই লইয়া যাইব?”
কুশ বলিলেন, “হা, তৎপূর্বে আমাকে সংবাদ দিবার জন্য আমার কুশাবতী- প্রাসাদশিখরে প্রতিপালিত কয়েকটি সংবাদবাহী পারাবত আপনার সঙ্গে দিব। আপনার সাফল্যের সংবাদের জন্য আমি উৎকণ্ঠিত থাকিব বুঝিতেই পারিতেছেন।”
অমাত্য ভদ্র নৃপতিকে অভিবাদন করিয়া বিদায় লইলেন। নিজ গৃহের দ্বারদেশ উন্মুক্তই ছিল, তিনি দ্বিতলে উঠিয়া সেই অবস্থাতেই শয্যার আশ্রয় লইলেন। সুতপা পূর্বরাত্রে স্বামীকে গৃহে প্রবেশ করিতে না দিয়া অনুতপ্তা ছিলেন, তাঁহার সাড়া পাইয়া একটি রৌপ্যপাত্রে কিছু আহার্য-সামগ্রী লইয়া আসিয়া দেখিলেন, তিনি গভীর নিদ্রায় অভিভূত। তিনি নীরবে শিয়রে বসিয়া তাঁহাকে ব্যজন করিতে লাগিলেন।