মন্থরাহরণ

পাঁচ

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

মন্থরা রূপের জন্য বহু পাপ করিয়াছে, বহু দৈহিক কষ্ট স্বীকার করিয়াছে, এতদিনে তাহার অভীষ্ট সিদ্ধ হইয়াছে। সে গঙ্গাযমুনাসঙ্গমে অষ্টোত্তরশত ব্রাহ্মণ ভোজন করাইল, নিকটবর্তী বিভিন্ন আশ্রমে তপস্বীদিগের জন্য কৃষ্ণাজিন, কমণ্ডলু ও চীর বল্কল প্রভৃতি ক্রয় করিয়া পাঠাইল, বহু দেবালয়ে পূজা দিল, তারপর উচ্ছিখকে গলবস্ত্র হইয়া ভক্তিভরে প্রণাম করিল। উচ্ছিখ আনন্দোদ্বেলিত চিত্তে তাহাকে ভূমি হইতে উঠাইয়া বক্ষে ধারণ করিতে যাইতেছিল, মন্থরা বাধা দিল। বলিল, “তাত, আপনি আমার পিতার বয়সী, পিতৃতুল্য ব্যক্তি! আপনি ব্রাহ্মণ, আমি শূদ্রা। আমার প্রতি কুদৃষ্টি দিলে আপনি ধর্মে পতিত হইবেন। যতদিন না আমাকে সুপাত্রে সমর্পণ করিতে পারেন ততদিন আপনি অভিভাবকরূপে আমার সঙ্গে থাকিলে আপত্তি নাই, কিন্তু এককক্ষে রাত্রিবাস করা আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নহে। আপনার বক্ষোলগ্ন হওয়াও আমার কর্তব্য নহে।”

উচ্ছিখ বিস্মিত হইয়া বলিল, “তবে যে তুমি বলিয়াছিলে তোমার যৌবন আমারই জন্য? তবে যে আমাদের গান্ধর্ববিবাহ হইয়াছিল?”

মন্থরা ভুবনমোহন হাসি হাসিয়া বলিল, “সে তো পূর্বজন্মের কথা। তখন তো আমি তৃষ্ণা ছিলাম। কালিন্দীতীরে সম্প্রতি আমার নবজন্ম হইয়াছে, এখন আমার নাম কালিন্দী। আমি অর্থ দিতেছি। বারাণসী নগরে বরুণাতীরে একটি নাতিবৃহৎ উদ্যানমধ্যস্থ প্রাসাদ আপনি আমার জন্য ক্রয় করিবেন, সেটিকে উপযুক্তরূপে সজ্জিত করিয়া এবং সেখানে প্রয়োজন মত দাসদাসী নিযুক্ত করিয়া আমাকে সংবাদ দিবেন। অযোধ্যার রাজান্তঃপুরে বহুদিন দাসীরূপে দুঃখভোগ করিয়াছি, বারাণসীর রাজান্তঃপুরে কিছুদিন রাজ্ঞীরূপে সুখ ও সম্মান ভোগ করিতে চাই। আপনি যদি আমার বশবর্তী হইয়া থাকেন, আমার উদ্দেশ্যসাধনে সহায়তা করেন তবে আপনিও রাজপারিষদ্ হইয়া সুখে থাকিবেন।”

উচ্ছিখ প্রথমতঃ ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া উঠিল, “পাপীয়সী, দ্বিচারিণী” বলিয়া গালি দিল। মন্থরা হাসিয়া বলিল, “তাত দ্বিচারক, তোমার মুখে ধর্মের বক্তৃতা শোভা পায় না। অর্থলোভে তুমি একটা বৃদ্ধা শূদ্রাকে বিবাহ করিয়াছ, নিজ ধর্মপত্নীকে ত্যাগ করিয়া তাহার পশ্চাতে ফিরিতেছ, রূপমোহে সর্বপ্রকার দুষ্কর্মে তাহাকে সাহায্য করিয়াছ। আর দ্বিচারিণী বলিয়া আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমা নির্দেশ করিতেছ কেন? একজন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আর একজন প্রৌঢ় নৃপতিতেই যে আমার কামনা তৃপ্ত হইবে তাহা কে বলিতে পারে? যাও, ঐ সামান্য গালি আমাকে স্পর্শ করিল না।” উচ্ছিখ তখনও চক্ষু ঘূর্ণিত এবং দন্ত কট্‌কটায়িত করিতেছে দেখিয়া মন্থরাও অতঃপর ক্রোধের ভান করিল। রুষ্টস্বরে গ্রাম্য ভাষায় কহিল, “দেখ, তোমার মুরোদ আমার অজ্ঞাত নহে। বেশী তড়পাইও না। যাহা বলি শুনিয়া চলো, নতুবা তোমার কপালে দুঃখ আছে। অস্তকূটের উচ্ছিষ্ট পত্র উড়িলেই স্বর্গে যায় না।”

উচ্ছিখ বলিল, “আমি আজই স্বগৃহে ফিরিয়া যাইব। অনেক পাপ করিয়াছি, ইহার পর আর তোমার পাপকার্যে সহায়তা করা অপেক্ষা আমার পক্ষে মৃত্যু শ্রেয়।”

মন্থরা বলিল, “আমি ক্ষীরগ্রামে নিজ পরিচয় জানাইলে, কী-ভাবে তুমি দীর্ঘকাল আমার সহিত স্বামিরূপে বাস করিয়াছ জানাইলে তোমার ব্রাহ্মণী তোমাকে ঝাটা মারিয়া তাড়াইবে। তুমি অনাহারে পথে পড়িয়া মরিবে। আমার সহিত বিবাদ করিয়া গেলে আমিও তোমাকে এক কপর্দক দিব না, তোমার সমস্ত অলঙ্কার, বস্ত্র ও উত্তরীয় হরণ করিয়া একবস্ত্রে বিতাড়িত করিব।” দীর্ঘকাল সুখাদ্যে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করিয়া উচ্ছিখের মনুষ্যত্ব নষ্ট হইয়াছিল, দারিদ্র্যাকে সে ইদানীং ভয় করিত। দুই-চারিদিন তর্জন-গর্জন করিয়া শেষ পর্যন্ত সে শান্ত হইল, ভাগ্যের নিকট আত্মসমর্পণ করিল। তখন মন্থরার নির্দেশক্রমে একজন বিশ্বস্ত ভৃত্য লইয়া সে বারাণসীতে গেল এবং বরুণাতীরে একটি গৃহ ক্রয় করিল। অতঃপর ভৃত্যের নিকট সংবাদ পাইয়া মন্থরা সেখানে গিয়া আপনার রূপ ও ঐশ্বর্যের ছলনাজাল বিস্তার করিয়া বসিল।

মন্থরা যেখানেই যাইত পূর্বাশ্রমের দাসদাসীদিগকে বিদায় দিয়া যাইত, সুতরাং ইচ্ছামতো নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করা তাহার পক্ষে সহজসাধ্য ছিল। কৈকেয়ীর দাসীরূপে নিযুক্ত হইবার পূর্বে সে একসময়ে চতুঃষষ্টি কলার অধিকাংশ আয়ত্ত করিয়াছিল, তাহারই শিক্ষায় শিক্ষিতা হইয়া একদা কৈকেয়ী দশরথের প্রিয়তমা মহিষী হইয়াছিলেন। এখন তাহার বাল্যে এবং প্রথমযৌবনে অধীত বিদ্যা তাহার নিজের কাজে লাগিল। সে প্রতিদিন নদীতীরে অপূর্ব সুন্দর বেশভূষা ও কেশরচনা করিয়া মনোহর ভঙ্গীতে বসিয়া বীণা বাজাইয়া গান গাহিত, নদীপথে প্রমোদতরণীতে যাইতে যাইতে কাশীরাজ সুপর্ণ তাহা শুনিয়া মুগ্ধ হইলেন। একদিন, দুইদিন, তিনদিন। একাদিক্রমে চারিদিন কালিন্দীর কিন্নরকণ্ঠ শুনিয়া রাজা আর ধৈর্য ধারণ করিতে পারিলেন না, তরী হইতে নামিয়া শিলাতলোপবিষ্টা মন্থরাকে তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। মন্থরা তাঁহাকে করপুটে প্রণাম করিয়া নতনেত্রে কহিল, “মহারাজ, আমি মাতাপিতৃহীনা অনাথা, আমার আবার পরিচয় কি? আপনি দয়া করিয়া যখন আমার কুটিরদ্বারে পদার্পণ করিয়াছেন তখন একবার গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া আমাদের কৃতার্থ করুন। আমার পিতৃবন্ধু যজ্ঞদত্ত নামক ব্রাহ্মণ এই গৃহেই আছেন, তিনি আপনাকে দেখিলে আনন্দিত হইবেন, তাঁহার নিকট আপনি আমাদের সমস্ত সংবাদই পাইবেন।” বলা বাহুল্য, উচ্ছিখের নূতন নামকরণ হইয়াছিল ‘যজ্ঞদত্ত’, পত্নীর বিবাহের ব্যবস্থা তাহারই করিবার কথা। কাশীরাজ কৌতূহলবশে মন্থরাকে অনুসরণ করিয়া সেই নদীতীরস্থ অট্রালিকার মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং উহার সাজসজ্জা ও গৃহোপকরণাদি দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। সুন্দরী মন্থরা তাঁহাকে প্রচুর পানভোজনে তৃপ্ত করিল, বীণাব্বনিসহযোগে গান গাহিয়া তাঁহার হৃদয় হরণ করিল। অতঃপর রাজা তাহার পিতৃবন্ধু যজ্ঞদত্তের নিকট জানিতে পারিলেন, কালিন্দী ক্ষত্রিয় কন্যা এবং অযোধ্যার এক সম্ভ্রান্ত বংশে তাহার জন্ম। তাহার পিতা যৌবনে যজ্ঞদত্তের সহিত বাণিজ্য উপলক্ষে সস্ত্রীক কেকয়দেশে বাস করিয়াছিলেন, সেখানেই কালিন্দীর বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। অতঃপর একসময়ে এক মহামারীতে কালিন্দীর মাতা-পিতা এবং যজ্ঞদত্তের পত্নী এবং পুত্র কালগ্রাসে পতিত হইলে যজ্ঞদত্ত কালিন্দীকে লইয়া কেকয় ত্যাগ করিয়া নিরুদ্দেশযাত্রায় বাহির হইয়াছেন। তাঁহারও কেহ নাই, কালিন্দীরও সংসারে কোনও বন্ধন নাই। তাঁহাদের উভয়েরই বর্তমানে অর্থের অভাব নাই, কিন্তু কালিন্দীর বিবাহের বয়স হওয়া সত্ত্বেও তাহার বিবাহ দিতে পারিতেছেন না বলিয়া যজ্ঞদত্ত বড়োই মনঃকষ্টে আছেন। ইতঃপূর্বে তাহার রূপ এবং অর্থের লোভে বহু নগরে বহু পাণিপ্রার্থী মিলিয়াছে, কিন্তু কালিন্দী কাহাকেও পতিত্বে বরণ করিতে সম্মত হয় নাই, সেজন্য তিনিও চাপ দেন নাই। এখন কাশীরাজ্যে যদি একটি সুপাত্র মিলিয়া যায় তবে তাহাকে এইখানে পাত্রস্থা করিয়া যজ্ঞদত্ত শেষ জীবনটা নিশ্চিন্তচিত্তে বিশ্বনাথের চরণাশ্রয়ে কাটাইতে পারেন। রাজা কালিন্দী অবিবাহিতা জানিয়া আশান্বিত হইলেন, দিনের পর দিন তাহার গৃহোদ্যানে এবং প্রাসাদ শীর্ষে বসিয়া তাহার কিন্নর কণ্ঠের সঙ্গীতসুধা কর্ণ দিয়া এবং কমনীয় দেহের রূপসুধা চক্ষু দিয়া পান করিলেন, তারপর একদা তাহার কাছে বিবাহপ্রস্তাব করিলেন। মন্থরা অনেক ছল, কৃত্রিম বিনয় এবং আপত্তি করিল, তাহার পিতৃবন্ধুর মত না হইলে কিছু হইবে না জানাইল। যজ্ঞদত্তের দিকট রাজা জানিলেন, এতদিনে কালিন্দীর যোগ্যপাত্র মিলিয়াছে, তাহার আপত্তি নাই। প্রথম পরিচয়ের তিনমাসের মধ্যে শুভদিনে শুভক্ষণে কাশীরাজ সুপর্ণ কালিন্দীকে বিবাহ করিলেন। উচ্ছিখ যথাশাস্ত্র অনুষ্ঠানপূর্বক রাজাকে কন্যাদান করিলেন। তারপর কালিন্দী রাজার প্রিয়তমা মহিষী হইল। কিছুদিন পরে উচ্ছিখও কি-রূপে বেতনভুক্ অমাত্যপদে বৃত হইয়া কাশীবাস করিতে লাগিল সে-কথা পরে বলিতেছি।

অনেক সময়ে দেখা যায়, আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিয়া মানুষ যে পরিকল্পনা লইয়া কার্য আরম্ভ করে প্রতিকূল দৈবশক্তি অভাবনীয়রূপে তাহা পণ্ড করিয়া দেয়। অমাত্য ভদ্র মন্থরার অনুসন্ধানকার্যে মূহূর্তকাল বিলম্ব করিবেন না সঙ্কল্প করিয়া রাজপ্রাসাদ হইতে বহির্গত হইতেছিলেন, কিন্তু প্রথমতঃ প্ৰভুর আদেশে সপরিবারে কুশাবতী গমন করিতে, দ্বিতীয়তঃ সেখানে বাসস্থানসংগ্রহ এবং পোষ্যবর্গের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করিতে তাঁহার প্রায় তিন সপ্তাহ কাটিয়া গেল। কুশাবতীতে থাকিতে মন্থরার পরিণামচিন্তায় তিনি সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকিতেন। বিশাখদত্তও রাজাদেশে কুশাবতীতে আসিয়াছিল এবং নিজগৃহে বন্দী থাকিয়া শ্রীরামচন্দ্রের স্বর্ণমূর্তি নির্মাণের জন্য মনুষ্যপ্রমাণ একটি সিথ-প্রতিমা গঠন করিতেছিল। অমাত্য ভদ্র তাহার নিকট মন্থরার সংবাদ লইতে গিয়া জানিলেন, সে কিছুই জানে না। বনমধ্যে একটি ভগ্নমন্দির এবং একটি কূপ সে একবার বহুদিন-পূর্বে শ্রীরামচন্দ্রের মৃগয়াসহচররূপে যাইবার সময় দেখিয়া আসিয়াছিল, সেইখানে সে তাহার ভৃত্যদিগকে স্বর্ণপ্রতিমাটি লুকাইয়া রাখিতে বলিয়াছিল। ভৃত্যেরা ফিরিয়া আসিলে সে তাহাদের নিকট মন্থরার সংবাদ পাইত, তাহারা ফিরিয়া না আসায় এবং বিশাখদত্ত সপরিবারে কুশাবতী নগরে চলিয়া আসায় তাহার পক্ষে এখন কিছুই বলা সম্ভব নহে। ভদ্র যে-কয়দিন কুশাবতীতে ছিলেন প্রতিদিন সহস্রকার্যের মধ্যে একবার বিশাখদত্তের গৃহে গিয়া সংবাদ লইয়া আসিতেন, তাহার পলাতক ভৃত্যেরা ফিরিয়াছে কি না। অবশেষে হতাশ হইয়া রামতিরোধান দিবসের একবিংশতি দিন পরে তিনি যেদিন কুশাবতী ত্যাগ করিলেন সেদিন ঘরে বাহিরে অনেক বাধা তাঁহাকে লঙ্ঘন করিতে হইয়াছিল। পত্নী বলিলেন, “সেই দগ্ধাননা কুব্জা বৃদ্ধাটার জন্য তোমার এত মমতা কেন? সে গিয়াছে, সংসারের পাপ গিয়াছে। তাহাকে আজ যে দয়াটা দেখাইতেছ— সেই দয়াটা সীতাদেবীকে যদি দেখাইতে, রামের কর্ণে দুর্মতি প্রজাদের কুৎসাটা না তুলিয়া যদি চাপিয়া যাইতে, তবে আজও আমরা রামরাজত্বে বাস করিতাম, তাঁহার গৃহত্যাগী পুত্রটার পাল্লায় পড়িয়া পিতৃপিতামহের বাস্তু ত্যাগ করিয়া এই অগঙ্গার দেশে আসিতাম না।”

ভদ্র বলিলেন, “ভদ্রে, নিয়তি বলবতী, কি করা যাইবে বলো? রামের জীবনের প্রথম পর্বে একটি ধূমকেতু তাঁহার ভাগ্যাকাশে উদিত হইয়াছিল, সে মন্থরা। রামের জীবনের দ্বিতীয় পর্বে আর একটি ধূমকেতু উঠিয়াছিল, সে ভদ্র। আজ রাম নাই, কিন্তু ধূমকেতুরা কক্ষপথে ঘুরিতে ঘুরিতে পরস্পরের উপর আসিয়া পড়িয়াছে। দ্বিতীয় ধূমকেতুর আজ ভয়, সে হয়তো প্রথমটিকে ধ্বংস করিয়াছে। দুইজনেই সগোত্র, পৃথিবীর ক্ষতি করিবার জন্যই দুইজনের জন্ম, সুতরাং পরস্পরের প্রতি একটু আকর্ষণ তাহাদের থাকিবে বই কি? মন্থরা বাঁচিয়া আছে জানিলেই আমি নিশ্চিন্ত হইব। রাজাদেশ,— তাহাকে ফিরাইয়া আনিতে হইবে। দেখি, যদি সে বাঁচিয়া থাকে তবে আনিব।”

কুশের নিকট বিদায়গ্রহণকালে কুশ বলিলেন, “আপনাকে হয়তো দীর্ঘকাল ভ্রমণ করিতে হইবে। আপনি রাজকার্যে যাইতেছেন সুতরাং প্রয়োজনযোগ্য অর্থ রাজকোষ হইতে লইয়া যান। পারাবতগুলিও লইতে ভুলিবেন না।” তারপর মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “মন্থরার যাহা হইবার তাহা হইয়া গিয়াছে, এতদিন পরে আর নাই বা গেলেন? বিলম্ব তো কম হইল না।”

ভদ্র বলিলেন, “আপনি নিষেধ করিলে অবশ্যই যাইব না, তবে আমার বিশ্বাস কর্তব্যকার্যে আপনি কখনও আমাকে বাধা দিবেন না। মন্থরা যদি মরিয়া থাকে, তবে আমাকে চিরদিনের জন্য অপরাধী করিয়া গিয়াছে, আর যদি বাঁচিয়া থাকে, তবে আবার যাহাতে কাহারও ক্ষতি করিতে না পারে সেজন্য তাহাকে কুশাবতীতে আনিয়া চক্ষের সম্মুখে রক্ষা করা প্রয়োজন হইবে। আমি দুইদিক্ চিন্তা করিয়াই যাইতেছি, মহারাজ।”

রাজদত্ত অর্থ, মুদ্রাঙ্কিত পরিচয়পত্র ছদ্মবেশের জন্য বিবিধ উপকরণ, দুইজন বিশ্বাসী ভৃত্য এবং চারিটি পারাবত লইয়া ভদ্র কুশাবতী হইতে যাত্রা করিলেন। সুতপা অযোধ্যা হইতে আনীত কিছু শুষ্ক দেবনির্মাল্য সঙ্গে দিলেন, বলিলেন, “সর্বনাশী মরিয়াও স্বভাব ছাড়ে নাই, গৃহস্থকে বনবাসে না দিয়া স্বস্তি পাইতেছে না। দেখিয়ো, চৌদ্দ বৎসর কাটাইয়া আসিয়ো না যেন।”

মন্থরা ও উচ্ছিখ ক্ষীরগ্রাম ত্যাগ করিবার প্রায় একমাস পরে অমাত্য ভদ্র নানাস্থানে অনুসন্ধান করিতে করিতে সেখানে আসিয়া পৌঁছিলেন। নদীতে নৌকাবক্ষে থাকিয়াই তিনি তরুশ্রেণীর অন্তরালবর্তী ভগ্নমন্দিরচূড়া দেখিতে পাইয়াছিলেন, অনুচরদিগের তত্ত্বাবধানে নৌকাস্থ আহার্যপরিধেয়াদি রাখিয়া তিনি কয়েকটি স্বর্ণমূদ্রা সঙ্গে লইয়া মন্দিরে আশ্রয় লইলেন। উচ্ছিখের পুত্র পঞ্চশিখ সেইদিন সন্ধ্যাকালে তাঁহাকে মন্দিরদ্বারে উপবিষ্ট দেখিয়া তাঁহার পরিচয় জানিতে চাহিলে বলিলেন, “আমি বণিক্‌ তীর্থপথিক। সংসারে কোনও বন্ধন নাই! অযোধ্যায় আসিয়া এখানকার দেবীর মাহাত্ম্য শুনিয়া কৌতূহলের বশবর্তী হইয়া আসিয়াছি। দেখিতেছি, গ্রামবাসীর দেবীর প্রতি তাদৃশী ভক্তি নাই, মন্দির সংস্কার এবং ভোগরাগের জন্য ব্যয় করিতে চাহে না।”

পঞ্চশিখ বুঝাইল, নিকটস্থ গ্রামবাসী সকলেই দরিদ্র, তবে তাহার পিতা সম্প্রতি আশাতীতরূপে কিছু ধনলাভ করিয়াছেন। তিনিও তীর্থভ্রমণে গিয়াছেন, ফিরিলে মন্দিরসংস্কার হইবে। উপস্থিত তাহাদের গৃহনির্মাণের জন্য ইষ্টক নির্মিত হইতেছে, কাষ্ঠ- প্রস্তরাদি সংগৃহীত হইতেছে। ব্রাহ্মণকুমার পূজাশেষে অতিথিকে কিছু ফল ও মিষ্টান্ন খাইতে দিল। খাইতে খাইতে কথাচ্ছলে জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া ভদ্র উচ্ছিখের বিকটদর্শনা কুব্জা পিতামহীর আকস্মিক আবির্ভাবের গল্প শুনিলেন। উচ্ছিখ তাহাকে লইয়া কোন্ কোন্ তীর্থে যাইবে তাহা জানিতে না পারিলেও মন্থরা যে মরে নাই এইটুকু জানিয়া ভদ্র নিশ্চিন্ত হইলেন। রাত্রে তিনি মন্দিরচত্বরেই শয়ন করিবেন বলিয়া ব্রাহ্মণকুমারকে বিদায় দিলেন। সে চলিয়া গেলে নৌকায় ফিরিলেন। সেদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে তাঁহার প্রথম পারাবত কুশাবতীর রাজপুরীতে সংবাদ লইয়া গেল, “মন্থরা মরে নাই, সঙ্গী সংগ্রহ করিয়া দেশভ্রমণে গিয়াছে । সন্ধানে চলিলাম।” কুশও নিশ্চিত্ত হইলেন।

দ্বিতীয়দিন প্রভাতেও ব্রাহ্মণকুমার আসিয়া ভদ্রের সহিত অনেকক্ষণ গল্প করিল, তাহাদের গ্রামের কয়েকজন কৌতূহলী বৃদ্ধ ব্যক্তিও তাহার নিকট সংবাদ পাইয়া বিদেশী বণিক্‌কে দেখিতে আসিয়াছিলেন। বণিক্‌ কি বস্তু তাহা অনেকেই জানিতেন না, উজ্জয়িনীতে মৎস্যের সুলভতা, গৌড়দেশে গুড়, কলিঙ্গে লবণ কত অনায়াসলভ্য সেই সেই বিষয়ে আলোচনা হইল। তাঁহাদের নিকট ভদ্র উচ্ছিখের বর্ণনা এবং তাহার বংশপরিচয় পাইলেন। তাঁহারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া, মন্থরার শিবিকা বহন করিয়া গ্রামবাসী যে কয়জন দরিদ্র ব্যক্তি মধুরা নগরে গিয়াছিল, তাহাদের ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহাদের নিকট মন্থরার বর্ণনা শুনিয়া অমাত্যের ধারণা হইল, মন্থরাকে মধুরাতেই ধরিতে পারিবেন। তিনি তিনদিন পরে গ্রামবাসীর নিকট বিদায় লইবার সময় উচ্ছিখপত্নী শঙ্করী স্বয়ং আসিয়া তাহাকে অনুরোধ করিলেন, উচ্ছিখের সহিত দেখা হইলে ভদ্র যেন তাহাকে শীঘ্র গৃহে ফিরিতে বলেন। অর্থের জন্য চিন্তা নাই, যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহাই কুসীদে খাটাইয়া তিনি অক্লেশে সংসার চালাইতে পারিবেন। দূরসম্পর্কীয়া পিতামহীর যেরূপ ডাকিনীর মতো মূর্তি, তাহাতে তাহাকে বিশ্বাস করা যায় না। কোন্‌দিন রক্তশোষণ করিয়া লইবে কে বলিতে পারে? তাঁহার একটিমাত্র স্বামী, অনেক দুঃখে তাহাকে এতদিন লালনপালন করিয়াছেন, তাহাকে হারাইতে প্রস্তুত নহেন। ভদ্র তাঁহার স্বামীর সন্ধান করিয়া তাঁহার কথা জানাইবেন বলিলেন। পরদিন তাঁহারা অযোধ্যা অতিক্রম করিলেন কিন্তু পরিত্যক্ত নগরে প্রবেশ করিলেন না। গঙ্গা ও সরযুর মিলনস্থলে পৌঁছিয়া সেখান হইতে উত্তরে প্রয়াগসঙ্গমে এবং সেখান হইতে যমুনার ধারা বাহিয়া আরও উত্তরে মধুরায় পৌঁছিতে তাঁহার পঞ্চ দিবস অতিবাহিত হইল। সেখানে একটি পান্থশালায় আশ্রয় লইয়া ভদ্র নগরীর চতুর্দিকে তন্ন-তন্ন করিয়া মন্থরার অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। একদা একজন বৈদ্যের নিকট শুনিলেন, তাঁহার গুরুদেব একজন ধনশালিনী বৃদ্ধা কুব্জার কুব্জে অস্ত্রোপচার করিয়া তাহাকে কুব্জভার হইতে মুক্তি দিয়াছেন। ভদ্রের দৃঢ় ধারণা হইল সেই বৃদ্ধাই মন্থরা, কিন্তু তিনি নিশ্চিত হইতে পারিলেন না। মন্থরার প্রাসাদের প্রহরিগণ, ‘গৃহস্বামিনী শয্যাগতা আছেন, তিনি অসূর্যম্পশ্যা, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ’ বলিয়া তাঁহাকে ফিরাইয়া দিল। উচ্ছিখের সহিত তাঁহার মাঝে মাঝে পথে সাক্ষাৎ হইত। তাহার উর্ধ্ব মুখ শিখা দেখিয়া এবং পুত্র ও পত্নীদত্ত বর্ণনার সহিত মিলাইয়া তাহাকে চিনিতে ভদ্রের বিলম্ব হয় নাই, নিজেকে বৈদ্য বলিয়া পরিচয় দিয়া একদিন তিনি তাহার পত্নীর শুশ্রূষার ভার লইবার ইচ্ছাও জানাইয়াছিলেন, কিন্তু মন্থরার নির্দেশে উচ্ছিখ তাঁহাকে সে সুযোগ দিল না, তাঁহার সহিত সাক্ষাতে বাক্যালাপও বন্ধ করিল। অগত্যা ভদ্র কিছুদিন যাবৎ আর তাহাদের ত্রিসীমানার গেলেন না, পান্থশালায় শুইয়া বসিয়া কেবলই চিন্তা করিতে লাগিলেন, কি করিয়া মন্থরাকে অযোধ্যায় লইয়া যাওয়া যায়। সপ্তাহকাল পরে তিনি আবার একবার মন্থরার সন্ধান লইতে গেলেন। গিয়া দেখিলেন, প্রাসাদে অন্য গৃহকর্তা সপরিবারে রহিয়াছেন, মন্থরা ও উচ্ছিখ কোথায় গিয়াছে কেহ বলিতে পারিল না। মন্থরা করতলগতা হইয়াও হইল না, ইহাতে অমাত্যের দুঃখের অবধি রহিল না। তিনি সন্ধান করিয়া মন্থরার ভূতপূর্ব ভৃত্যদের মধ্যে দুইজনকে বাহির করিলেন, তাহাদিগকে পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া জানিলেন, মন্থরা মায়ানগরে যাইবে, তাহার পর অবন্তীরাজ্যের রাজধানীতে যাইতে পারে। অবন্তীনগরে অমাত্য ভদ্রের জনৈক আত্মীয় বাণিজ্যোপলক্ষে বাস করিতেন, মায়ানগরেও তাঁহার পরিচিত একজন রাজামাত্য ছিলেন। ভদ্র মায়ানগরে গিয়া বহু অনুসন্ধানেও মন্থরাকে দেখিতে পাইলেন না, মনে করিলেন, সে বদরিকাশ্রম অথবা গঙ্গোত্রী বা যমুনোত্রী এইরূপ কোনও তীর্থদর্শনে গিয়াছে। হিমাচলবক্ষে বিভিন্ন তীর্থস্থানে প্রায় তিনমাস বৃথা পর্যটন করিয়া ভদ্র অবন্তীনগরে যাত্রা করিলেন। সেখানে তাঁহার আত্মীয় রত্নবণিক্ রাজশেখরের নিকট গিয়া জানিতে পারিলেন, কোনো বিদেশিনী সম্প্রতি সেখানে কয়েকটি বহুমূল্য রত্ন ও অলঙ্কার বিক্রয় করিয়াছে, কিন্তু মন্থরার সহিত তাহার বর্ণনা মিলিল না। রমণী তাহার ভ্রাতুষ্পুত্রকে সঙ্গে করিয়া রাজশেখরের গৃহে কয়েকবার নাকি যাতায়াত করিয়াছে। তাহার গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল গৌর, কেশ ভ্রমরকৃষ্ণ, কিন্তু মুখশ্রী ভালো নহে। রমণীর সাক্ষাৎলাভের মানসে ভদ্র প্রতিদিন পথে পথে ভ্রমণ করিলেন, কিন্তু মাসাধিকাল চেষ্টা করিয়াও সফল হইলেন না। শেষ পর্যন্ত হতাশ হইয়া কুশাবতীতে প্রত্যাবর্তনের চিন্তা করিতেছেন এমন সময়ে একদিন বিশাখদত্তের ময়ূরাকৃতি সেই পূর্বদৃষ্ট শিবিকা তাঁহার নয়নপথবর্তী হইল। অনুসন্ধানে জানিলেন তৃষ্ণা নাম্নী কোনও ধনবতী বিদেশিনী সেই শিবিকায় ভ্রমণ করেন। দেবীর প্রাসাদসম্মুখে কয়েকদিন অপেক্ষা করিয়া শেষপর্যন্ত তিনি একদা বাতায়নে তাঁহার দর্শন পাইলেন, কিন্তু মন্থরার সহিত তাঁহার কোনও সাদৃশ্য দেখিতে পাইলেন না। প্রৌঢ়া যে যৌবনকালে অসামান্য রূপবতী ছিলেন তাহাতে সন্দেহ নাই। যাহা হউক, সন্দেহনিরসনের জন্য ভদ্র সুদতী নাম্নী তাঁহার আত্মীয়ের একজন বিশ্বস্তা পরিচারিকাকে তৃষ্ণা দেবীর গৃহে দাসীরূপে কাজ করিতে পাঠাইয়া দিলেন। তাহার নিকট তিনি ক্রমে জানিতে পারিলেন, তৃষ্ণা দেবীর গোপন কথা। কিরূপে সেই হৃদয়হীনা নারী এক হৃদয়হীন চিকিৎসকের সাহায্যে উৎপলা নাম্নী এক দরিদ্রা সুন্দরীর চক্ষু ও নাসিকাগ্রভাগ হরণ করিয়াছেন, তাহাও শুনিলেন। বামাক্ষীর নিকট লাঞ্ছিতা হইয়া তৃষ্ণা দেবী যখন সহসা উজ্জয়িনী ত্যাগ করিলেন তখন ভদ্রের ইচ্ছানুসারে তাঁহার আত্মীয় সুদতীকে তাহার সঙ্গে যাইতে দিলেন। সুদতী সেবাযত্নে গৃহকর্ত্রীকে এরূপ বশ করিয়াছিল যে, পূর্বপরিচয় গোপন করিবার জন্য মন্থরা তাহার ময়ূরাকৃতি শিবিকা ও বহু গৃহসজ্জা বিক্রয় করিয়া এবং অন্য সমস্ত দাসদাসীকে বিদায় দিয়া গেলেও তাহাকে সঙ্গে রাখিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিল, সেও সংসারবন্ধনহীনা বলিয়া তাহার প্রস্তাবে সম্মতা হইল। সুদতীর পরামর্শে অমাত্য ভদ্র অবন্তী হইতে বারাণসীতে যাত্রা করিলেন, সেখানে গিয়া একজন শ্রেষ্ঠী বন্ধুর গৃহে আশ্রয় লইলেন এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা করিতে লাগিলেন। বারাণসীর বিশ্বনাথমন্দিরে যে জটাজুটধারী দীর্ঘশ্মশ্রু সন্ন্যাসী মধ্যে মধ্যে দেবদর্শনে আসিতেন, দশাশ্বমেধ অথবা মণিকর্ণিকার ঘাটে যাঁহাকে কোনও কোনওদিন প্রভাতে সন্ধ্যায় ধ্যানস্থ দেখিতে পাওয়া যাইত, তিনিই যে অমাত্য ভদ্র তাহা স্বয়ং অযোধ্যাপতি কুশ অথবা তাঁহার স্বর্গীয় পিতৃদেবের পক্ষেও বুঝিয়া উঠা সম্ভব ছিল না। সেখানে প্রায় দুইমাসকাল অপেক্ষা করিয়া ভদ্র যখন প্রায় হতাশ হইয়া পড়িয়াছেন তখন একজন অষ্টাদশী সুন্দরীর সহিত তাঁহার দ্বারা নিয়োজিতা পরিচারিকা সুদভীকে রথ হইতে অবতরণ করিয়া দশাশ্বমেধ ঘটে স্নানের জন্য সমাগতা দেখিয়া তাঁহার হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিয়া উঠিল। স্নানশেষে স্বর্ণবিন্দু চিত্রিত পীতকৌষের বাস পরিয়া সুন্দরী দাসীগণপরিবৃতা হইয়া চলিয়া যাইতে যাইতে সহসা কি ভাবিয়া নতজানু হইয়া সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিল। মহাপাপিষ্ঠা হইলেও স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেবদ্বিজের আশীর্বাদলাভ বিশেষ প্রয়োজন, এ-বিশ্বাস মন্থরার যায় নাই। সন্ন্যাসী ধ্যানস্তিমিত নেত্রে বসিয়াছিলেন, সহসা যেন বাহ্যজ্ঞান ফিরিয়া পাইলেন। সুন্দরীকে উদ্দেশ করিয়া মধুর স্বরে কহিলেন, “মা, তোমার ললাটে রাজটিকা দেখিতেছি যে? তুমি কি কাশীতে নূতন আসিয়াছ, পূর্বে দেখি নাই তো?”

মন্থরা তখন কাশীরাজকে ধরিবার জন্য ছলনাজাল বিস্তার করিতেছিল, সন্ন্যাসীর বাক্যে নিজের উদ্দেশ্যসিদ্ধির আশা পাইয়া তাহার সন্ন্যাসীর প্রতি ভক্তি বাড়িল। বলিল, “পিতঃ, আমার কররেখা যদি একটু দেখিয়া দেন—”

সন্ন্যাসী ইতোমধ্যে মন্থরার অজ্ঞাতে সুদতীকে ইঙ্গিতে নিজ পরিচয় জানাইয়াছিলেন, মন্থরার অনুরোধে তাহার বাম করপল্লব নিমেষের জন্য নিজ হস্তে তুলিয়া লইলেন। পরে বলিলেন, “মাতঃ, তোমার জীবন বড়ো বিচিত্র দেখিতেছি। গহ্বর হইতে শিখরে উঠিয়াছে। অনেক দুঃখ পাইয়াছ, অনেক দুঃখ দিয়াছ। তোমার কথা তো, মা, সকলের সম্মুখে বলা যায় না, তোমার দাসীদের একটু অন্তরালে যাইতে বলো।”

মন্থরার নির্দেশে মন্থরার দাসীরা দূরে অপসৃতা হইল, অন্য স্নানার্থীদেরও দূরে সরাইয়া দিল। তখন সন্ন্যাসী বলিলেন, “তুমি একসময়ে কোনও রাজগৃহে দাসী ছিলে, তোমার নামের আদ্যক্ষর ছিল ‘ম’। তোমার পরামর্শে চলিয়া সেই রাজ্যের রাণী তাঁহার স্বামীর অর্থাৎ রাজার মৃত্যুর কারণ হন, রাজ্যের সুখশাস্তি হরণ করেন। তাঁহাদের মৃত্যুর পর বৃদ্ধবয়সে তুমি তস্কর দ্বারা অপহৃতা হইয়া বুদ্ধিবলে নবজীবন ও যৌবন লাভ করিয়াছ। এখন বুঝিয়া চলিলে তুমি রাজরাণী হইতে পারো।”

মন্থরা বিস্মিতা হইল; বলিল, “আপনি কী বলিতেছেন, প্রভু? আমি কেকয় হইতে আগতা পিতৃহীনা ধনিকন্যা। আমার বয়স মাত্র অষ্টাদশবর্ষ। আমি আবার বৃদ্ধা হইলাম কবে, তস্কর দ্বারা অপহৃতা হইলামই বা কবে?”

সন্ন্যাসী মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “মা, জ্যোতিষশাস্ত্র মিথ্যা বলে না। আমি নিমেষমাত্র তোমার কররেখা পরীক্ষা করিয়া সমস্তই জানিয়াছি, আমাকে ছলনা করিতে চেষ্টা করিয়ো না। আরও শুনিতে চাও? তুমিই কুখ্যাতা মন্থরা। রামতিরোধানদিবসে রাত্রিকালে স্বর্ণসীতামূর্তি নষ্ট করিতে গিয়া তুমি শিল্পী বিশাখদত্তের নিকট বাধা পাইয়া অজ্ঞান হইয়া যাও। শিল্পী একটি চর্মদৃতির মধ্যে স্বর্ণসীতাকে ভরিয়া উহা অপহরণ করিবার মানসে অনুচরদিগকে ডাকিতে যায়। ততক্ষণে অমাত্য ভদ্র আসিয়া তাহার দৃতিমধ্যস্থিতা সীতাপ্রতিমাকে বাহির করিয়া সেই দৃতিমধ্যে হতচেতনা তোমাকে ভরিয়া দেন। অনতিকাল পরে বিশাখদত্তের অনুচরেরা তোমাকে শিবিকাযোগে ও নৌকাযোগে অযোধ্যা হইতে অদূরে ক্ষীরগ্রামের বনমধ্যস্থ দেবীমন্দিরে পরিত্যাগ করে। সেখানে তুমি পুরোহিত ব্রাহ্মণ উচ্ছিখকে গান্ধর্বমতে বিবাহ করিয়া পিতামহী পরিচয়ে তাহাকে লইয়া দেশভ্রমণে নির্গতা হও। তোমার মুক্তাশুভ্র দত্তপঙ্‌ক্তি তক্ষশিলার, তোমার গাত্রবর্ণ ও কৃষ্ণকেশ মায়ানগরের, তোমার পদ্মপলাশলোচনদ্বয় অবন্তীনগরের অভাগিনী উৎপলার— তোমার যৌবন”—

আর বলিতে হইল না, ভদ্র আর কি বলিবেন নিজেই জানিতেন না; মন্থরা তাঁহার পদপ্রান্তে লুটাইয়া পড়িল, বলিল, “পিতঃ, আপনি সর্বজ্ঞ। আমার হরণব্যাপারের যে-বিবরণ আমি নিজেও জানিতাম না তাহাও আপনি জানেন দেখিতেছি। উৎপলার চক্ষু এবং চন্দনার যৌবন আমি অর্থমূল্যে ক্রয় করিয়াছি, তাহাদের চিরদিনের জন্য দারিদ্র্য ঘুচাইয়া দিয়াছি তাহাও আপনি নিশ্চয় জানেন। কাশীরাজকে মোহিত করিয়া আমি রাজরানী হইবার আশা রাখি, আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “মা, আশীর্বাদ করিতেছি, তুমি রাজরানী হইবে। তবে তোমার চতুর্দিকে শত্রু, বুঝিয়া চলিবে। যদি কখনও বিপদে পড়ো, আমার সাহায্য লইবে; অপরন্তু আমার শত্রুতাসাধন করিলে স্বয়ং যমরাজও তোমাকে রক্ষা করিতে পারিবেন না জানিয়ো। এখন যাও, অনেক দর্শনার্থী আমার জন্ম অপেক্ষা করিতেছেন।”

মন্থরা কাতরভাবে বলিল, “পিতঃ, আমার গুপ্তকথা প্রকাশ হইলে সর্বনাশ হইবে, আপনি আমাকে রক্ষা করুন।”

সন্ন্যাসী সস্নেহে বরাভয়হস্ত প্রসারণ করিয়া বলিলেন, “পাগলী, আমার দ্বারা কোনও কথা প্রকাশিত হইবে না, তোর ভয় নাই। যাহা করিয়াছিস করিয়াছিস, আর কাহারও ক্ষতি করিস না।”

মন্থরা অনুচরীদের লইয়া চলিয়া গেল। সেইদিন সন্ধ্যাকালে বারাণসীর লক্ষ্মীকুণ্ডের একটি প্রাসাদশিখর হইতে অমাত্য ভদ্রের দ্বিতীয় পারাবত কুশাবতীতে পত্র বহন করিয়া লইয়া গেল, “মন্থরার সন্ধান পাইয়াছি। সে যৌবন ফিরিয়া পাইয়াছে, কাশীর রাজমহিষী হইবার চেষ্টায় আছে। শীঘ্রই নিজের জালে নিজে জড়াইবে আশা করি। আমার প্রত্যাবর্তনের অধিক বিলম্ব নাই।

স্বামী রামানন্দ, লক্ষ্মীকুণ্ড, বারাণসী।”

পত্রপ্রাপ্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে মহারাজ কুশ কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরকে অমাত্য ভদ্রের সহায়তার জন্য পাঠাইলেন। তাহারা কেহ শিষ্যরূপে সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারী সাজিয়া সন্ন্যাসীর সঙ্গে রহিল, কেহবা গৃহস্থ ভক্তরূপে তাঁহার আশ্চর্য জ্যোতিষজ্ঞানের মহিমা কীর্তন করিতে লাগিল। ভদ্র কিন্তু অতঃপর কিছুদিন আর বাটীর বাহির হইলেন না, মন্থরা কয়েকবার গঙ্গাস্নানে আসিয়া তাঁহার দর্শন না পাইয়া নিশ্চিন্ত হইল। বলা বাহুল্য, পাপিষ্ঠা কুব্জা সেই সর্বজ্ঞ সন্ন্যাসীর শক্তির পরিচয় পাইয়া ভীতা হইয়াছিল। সুদতী একদিন একা স্নানে আসিয়াছিল, সেদিন একটি মুণ্ডিতশির ভিখারীকে পথপ্রান্তে ভিক্ষা দিতে গিয়া শুনিল, “লক্ষ্মীকুণ্ডের রামানন্দ স্বামীর মতো জ্যোতিষী এ-যুগে দেখা যায় না।” কণ্ঠস্বর শুনিয়া দাসী বিস্মিতা হইয়া মুখের দিকে চাহিতেই ভিখারী হাসিয়া বলিল, “তিনি লোকসমাগম ভালোবাসেন না। একা দ্বিপ্রহরের পর গেলে দেখা হইবে।” সুদতী অমাত্যকে চিনিল, চক্ষুর ইঙ্গিতে সাবধান হইয়া তখন কিছু প্রকাশ করিল না। দুই-দিন পরে সুযোগ বুঝিয়া একদা সে তাঁহার বাসস্থানে গিয়া সাক্ষাৎ করিল, আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা তাঁহাকে বলিল; তাঁহার নিকট পরামর্শ ও পুরস্কার গ্রহণ করিয়া বিদায় লইল।