কোশলরাজধানীর প্রায় ষোড়শ ক্রোশ উত্তরে নদীতীরে নির্জন বনাচ্ছাদিত গ্রামপ্রান্তে একটি সুপ্রাচীন জীর্ণ মন্দির ছিল। মন্দিরাধিষ্ঠাত্রী দেবী এক সময়ে ঐ অঞ্চলের দস্যুদিগের আরাধ্যা ছিলেন। রামরাজত্বকালে দস্যুরা সাধু হইয়া নগরে চলিয়া গিয়াছিল; বণিক্, পুরোহিত, বৈদ্য প্রভৃতি অনিন্দ্য সমাজসেবকরূপে প্রকাশ্যে রাজানুমতি লইয়া মানুষের প্রাণহরণ ও ধনলুণ্ঠনে ব্যাপৃত ছিল, সেজন্য ইদানীং পূর্বোক্তা দেবীর আর তেমন প্রভাবপ্রতিপত্তি ছিল না। কেবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন কয়েকজন পল্লীবাসীর চেষ্টায় তাঁহার একবেলা কিছু ভোগের ব্যবস্থা হইয়াছিল, নিকটবর্তী গ্রাম হইতে একজন পুরোহিত ব্রাহ্মণ দৈনিক একবার আসিয়া তাঁহাকে কিছু তণ্ডুলকদলী প্রদর্শন এবং পুষ্পবিল্বপত্র প্রদান করিয়া যাইত। দেবীর সর্বাঙ্গ রক্তবস্ত্রাচ্ছাদিত; পুষ্পসজ্জা এবং বস্ত্রাবরণের অবকাশে তাঁহার মুখের যে অংশটুকু দৃষ্টিগোচর হইত সেটুকুও সিন্দূর-চন্দনের ডাবলেপে সম্যকরূপে বুদ্ধিগোচর হইত না। মন্থরাহরণের পরদিন মধ্যাহ্নকালে একখানি দ্রুতগামী দ্বাদশক্ষেপণিযুক্ত তরণী সেই বিরলবসতি নদীতীরে মন্দিরের অদূরে খর্জুরকাণ্ডখণ্ডরচিত ঘট্টে আসিয়া ভিড়িল। তরণীর মধ্যে একটি বস্ত্রাবৃত শিবিকা রক্ষিত ছিল, সকলে মিলিয়া সেটি সযত্নে নামাইল, তারপর চারজন বাহক শিবিকা লইয়া বনপথে অদৃশ্য হইয়া গেলে বাকী আটজন নৌকার অদূরে বসিয়া গঞ্জিকাধূমসেবন করিতে লাগিল।
শিবিকাগর্ভে ক্ষুৎপিপাসাতুরা জীবন্মৃতা কুব্জা হতবুদ্ধি অবস্থায় চর্মপেটিকাবন্ধ হইয়া পড়িয়া ছিল। শিবিকাবাহকেরা তাহাকে নৌকায় তুলিবার পরেই তাহার জ্ঞান ফিরিয়া আসিয়াছিল, কিন্তু সে তখন জীবিতা কি মৃতা, পৃথিবীতে আছে, না নরকে পৌঁছিয়াছে, স্থির করিতে না পারিয়া অসাড় হইয়া পড়িয়াছিল। মহিষচর্মের দুর্গন্ধে শ্বাসরোধকর উত্তাপে সূচীভেদ্য অন্ধকারে প্রহরের পর প্রহর প্রতি মুহূর্তেই দগ্ধসন্দংশিকাহস্ত এইভাবে সে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করিল। কোনো যমদূতের সাক্ষাতের আশঙ্কায় তাহার শরীরের রক্ত হিম হইয়া যাইতেছিল; কিন্তু তাহার বিবেচনায় শতাব্দীকাল পরেও যখন তেমন কেহ দেখা দিল না, কেহ তাহাকে তপ্ত লৌহকটাহে বা পুরীষকুণ্ডে নিক্ষেপ করিল না, তখন সে বুঝিল, সে নিশ্চয় বাঁচিয়াই আছে। অতঃপর সে নড়িবার এবং বন্ধনমুক্ত হইবার জন্য চেষ্টা আরম্ভ করিল, কিন্তু মুখ এবং হস্তপদ আবদ্ধ থাকায় কিছুই করিতে পারিল না, সাহায্যের জন্য চীৎকার করাও তাহার পক্ষে সম্ভব হইল না।
বিশাখদত্তের নির্দেশ মতো তাহার অনুচরেরা শিবিকাটিকে মন্দিরচত্বরে আনিয়া নামাইল। একজন বলিল, “ঐ তো সেই মন্দির। ঐ তো দক্ষিণে শাল্মলী বৃক্ষ, ঐ তো তাহার পার্শ্বেই কূপ। ঐ কূপেই তো এক বৎসরের জন্য প্রতিমাটিকে বিসর্জন দিবার নির্দেশ আছে। গোলমাল থামিলে আবার লইয়া যাওয়া যাইবে। লও, মূর্তিটাকে নামাও।” সকলে ধরাধরি করিয়া মূর্তিগর্ভ মহিষদৃতি নামাইল। তখন আর একজন বলিল, “যাই বলো, বাপু, আমার সন্দেহ হইতেছে। সীতার মূর্তি সর্বদা সিংহাসনে এক পা মুড়িয়া এক পা নামাইয়া উপবিষ্ট থাকিত, অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি। তাহার তলদেশই প্রশস্ত হইবার কথা। এ মূর্তির উপবেশনভঙ্গী সে তুলনায় অপ্রশস্ত, তলদেশে মহিষদৃতি কৃঞ্চিত হইয়া আছে, দেখিয়া মনে হয় কোনো ব্যক্তি দণ্ডায়মান হইয়া আছে। এদিকে আবার মধ্যস্থলে এক স্থানে প্রস্থ অনাবশ্যক রূপে অধিক স্ফীত। কোনো ভুলভ্রান্তি হইল না তো?”
আর একজন বলিল, “যাহা আছে তাহাই আছে, কর্তা নিজে ভরিয়াছেন, আমাদের কূপে নিক্ষেপ করিতে পারিলেই চুকিয়া গেল। আর্দ্রকের ব্যবসায়ীর সমুদ্রপোতের সন্ধানে কী প্রয়োজন?”
তৃতীয় এক ব্যক্তি বলিল, “তবু একবার খুলিয়া দেখিলেই তো হয়, চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হইয়া যায়। কূপে নিক্ষেপ করিতে তো সময় লাগিবে না, সন্দেহটা আমারও যেন হইতেছে।”
ঐ সময় মন্থরার কর্ণে বাহকদের কথা কেমন করিয়া একটু যেন প্রবেশ করিল, তাহাকে কূপে নিক্ষেপ করিবার পরামর্শ হইতেছে বুঝিয়া সে মরিয়া হইয়া বন্ধনমুক্ত হইবার চেষ্টা করিতে লাগিল, মহিষদৃতি ঈষৎ নড়িয়া উঠিল। বাহকেরা দেখিয়া ভয় পাইল। একজন বলিল, “দ্যাখ, দ্যাখ, মূর্তিটা নড়িতেছে। প্রভু কোনো জীবন্ত মানুষকে হত্যা করিবার জন্য আমাদিগকে পাঠান নাই তো?”
আর একজন বলিল, “কিছুই আশ্চর্য নহে। ধনী ব্যক্তিদের অসাধ্য কর্ম কিছু নাই। না ভাই, মূর্তিটাকে বাহির করাই যুক্তিযুক্ত। মহিষদৃতিশুদ্ধ কূপে ফেলিলে একটা বিপদও আছে। এ মন্দিরে বেশী মানুষের যাতায়াত না থাকিলেও এক বৃদ্ধ পুরোহিত প্রতিদিন একবার আসেন, এই কূপ হইতে জল তুলিয়া দেবীর পূজা করেন। মহিষদৃতি পচিয়া অচিরে জল দুর্গন্ধ হইবে, তিনি সে সংবাদ গ্রামবাসীকে দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রামের লোক আসিয়া মূর্তি উঠাইবে। মহিষচর্ম ফেলিয়া কূপ অপবিত্র না করাই ভালো।”
তখন সকলে যুক্তি করিয়া চর্মস্থালীর মুখ খুলিল। অতঃপর একজন উঁকি দিয়া বলিল, “সত্যই তো, স্বর্ণমূর্তি কোথায়? স্বর্ণালঙ্কারের মধ্যে শুভ্র শণের মতো কি দেখা যাইতেছে যেন।” আর একজন বলিল, “দূর মূর্খ, ওটা কোনও বৃদ্ধার পক্ক কেশ। ধর, ধর, টানিয়া বাহির কর।”
সকলে মহিষচর্মদৃতি মধ্য হইতে মন্থরাকে বহুকষ্টে বাহির করিল। যে ব্যক্তি প্রথমে সন্দেহ করিয়াছিল, সে বলিল, “যাহা ভাবিয়া ছিলাম তাহাই সত্য হইল। এই বৃদ্ধাকে আমরা জীবন্ত মারিতে যাইতেছিলাম। নারীহরণ তো হইয়াছেই, নারীহত্যার পাতকে লিপ্ত হইতে আমি সম্মত নহি।”
চতুর্থ ব্যক্তি একটু ধৰ্মবুদ্ধিসম্পন্ন, বিবেকের বিরুদ্ধে সে প্রভুর আদেশ পালন করিতে আসিয়াছিল, কুসংস্কারও তাহার বেশী। সে এতক্ষণ কিছু বলে নাই, এখন বলিল, “সতীমাতার অভিশাপে তাঁহার স্বর্ণপ্রতিমা ডাকিনীমূর্তি ধরিয়াছে, আজ আমাদের কাহারও নিস্তার নাই। চলো, এখনও পলায়ন করি।”
সত্যই আবদ্ধমুখহস্তপদ মন্থরার চক্ষুর্দ্বয়ে তখন ক্রুদ্ধা ডাকিনীর চক্ষুর মতোই জ্বলিতেছিল, সে চক্ষু দেখিলে ভয় পায় না এমন মানুষ সংসারে বেশী নাই। বাহকদলের মধ্যে সবচেয়ে দুঃসাহসী পিঙ্গল তবু বলিল, “ডাকিনী হইলেও মানুষ তো বটে, উহার মুখেই শোনা যাক না ব্যাপারটা কি? লও, খোলো বন্ধন।”
সকলে মিলিয়া মন্থরার হস্তপদ এবং মুখের বন্ধন মোচন করিল। তাহার একপার্শ্বে ফিরিয়া শয়ন করা অভ্যাস, কুব্জের উপর ভর দিয়া সারাদিন থাকিতে বাধ্য হওয়ায় পৃষ্ঠদেশ অসম্ভবরূপ টন্টন্ করিতেছিল। অনেকবার, ‘উঃ, আঃ’ প্রভৃতি শব্দ করিয়া সে বহু কষ্টে উঠিয়া বসিল। বাহকেরা প্রশ্ন করিল, “আপনি কে? এই মহিষদৃতির মধ্যে কেমন করিয়া প্রবেশ করিলেন?”
মন্থরার ততক্ষণে সাহস ফিরিয়াছে। সে দন্ত কট্-কটায়িত এবং চক্ষু আবর্তিত করিয়া বলিল, “আমি কে তোমরা জানো না? অযোধ্যার রাজপুরী হইতে আমাকে হরণ করিয়া আনিয়াছ, এখন ন্যাকা সাজিয়া আমাকেই প্রশ্ন করিতেছ, ‘আমি কে’? ওরে নির্লজ্জ পাপিষ্ঠের দল, যদি অবিলম্বে আমাকে ‘অযোধ্যায় যথাস্থানে পৌঁছিয়া না দিয়া আইস তবে আমি তোমাদের শাপ দিয়া ভস্ম করিয়া ফেলিব।”
মন্থরাকে কথা কহিতে শুনিয়া কেহ বা ভয় পাইল, কাহারও বা ভয় ভাঙিল। রহস্যপ্রিয় গন্ধর্ব নামক এক ব্যক্তি বলিল, “হায়, আমাদের দগ্ধ ললাট! হরণ করিলাম তো করিলাম, তোমার মতো একটা বৃষকাষ্ঠকে হরণ করিলাম? অযোধ্যার রাজান্তঃপুরে কি আর নারী ছিল না?” সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়, “ভালো বিপদেই পড়া গিয়াছে।” তখন পিঙ্গল বলিল, “তোমার শাপকে ভয় করি না, শাপ দিবার মতো শক্তি থাকিলে কল্য অর্ধেক রাত্রি হইতে অদ্য দ্বিপ্রহরের মধ্যে তুমি আমাদের বহু পূর্বেই ভস্ম করিয়া ফেলিতে। এখন ও-সব বক্তৃতা ছাড়ো, স্বর্ণসীতাকে কোথায় পাচার করিলে এবং নিজে কী ভাবে এই চর্মদৃতির মধ্যে ঢুকিলে বলো। যদি সহজে সত্য কথা না বলো তবে পিটাইয়া তক্তা বানাইব, বলিতে পথ পাইবে না।” পিঙ্গলের রঙ্গপ্রিয় বন্ধুটি বলিল, “আমরা ডাকিনীমেধ যজ্ঞ করিতেছি। এক শত আটটি ডাকিনীকে ঐ কূপে নিক্ষেপ করার কথা, তন্মধ্যে একশত সাতটিকে ইতঃপূর্বে শেষ করিয়াছি, এখন তোমাকে ফেলিতে পারিলেই আমাদের যজ্ঞ পূর্ণ হয়।” তাহাদের সাহসে সাহসী হইয়া অন্যান্য বাহকেরাও মন্থরার চারিদিকে ঘনাইয়া বসিল, তখন সে নিজের অবস্থা বুঝিয়া ভয় পাইল। যথাসম্ভব কোমল স্বরে বলিল, “তাতগণ, সত্য বলিতেছি, আমি কিছুই জানি না। অযোধ্যার রাজান্তঃপুরে শ্রীরামচন্দ্রের শয়নকক্ষে আমি ধূপ জ্বালিতে প্রবেশ করিয়াছিলাম”—
পিঙ্গল ধমক দিল, “আবার মিথ্যা কথা? মধ্যরাত্রে ধূপ দিতে ঢুকিয়াছিলি? ঘরে ধূপগন্ধ ছিল না, নিশ্চয় কোনও কু-অভিসন্ধি লইয়া তুই সেখানে গিয়াছিলি। কেন গিয়াছিলি বল্, নহিলে এখনই কূপে”—
মন্থরা বলিল, “আহা, ক্রুদ্ধ হন কেন? আপনারা আমার ধর্মপিতা, আপনাদের কাছে কি মিথ্যা বলিতে পারি? সীতাদেবী আমাকে বড়োই স্নেহ করিতেন, তাঁহার নির্বাসনের পর হইতে স্বর্ণসীতাই তাঁহার স্থান লইয়াছিল, সেটিতে আমি সুযোগ পাইলেই একটু হাত বুলাইতাম, মা জানকীর স্নেহ মনে পড়িত। কল্য মধ্যরাত্রে আমি স্বর্ণসীতার অঙ্গস্পর্শ করিবার লোভেই রামভবনে গিয়াছিলাম, কিন্তু মূর্তিটি স্পর্শ করিবার পূর্বেই কে-যেন পশ্চাৎ হইতে আসিয়া দৃঢ়মুষ্টিতে আমার হস্ত ধারণ করিল, আমি চিৎকার করিয়া অজ্ঞান হইয়া গেলাম। তারপর কি ঘটিয়াছে আমি কিছুই বলিতে পারিব না। মারুন, কার্টুন, ইহার বেশী আমার জানা নাই, সুতরাং যদি কিছু বলিতে হয় তো মিথ্যা গল্প রচনা করিয়া বলিতে হইবে।”
বাহকদের এইবার মন্থরার কথায় বিশ্বাস জন্মিল, কিন্তু অতঃপর কর্তব্য কি তাহা তাহারা নির্ধারণ করিয়া উঠিতে পারিল না। কেহ বলিল, “স্বর্ণসীতার পরিবর্তে এই কুরূপা দাসীকে লইয়া আসিয়াছি জানিলে প্রভু আমাদের অন্ধকূপে পচাইয়া মারিবেন।” কেহ বলিল, “রাজবাড়ীর দাসীকে আমরা হরণ করিয়া আনিয়াছি জানিলে রাজা আমাদিগকে শূলে দিবেন।” অনেক তর্কবিতর্কের পর স্থির হইল, তাহারা কেহ আর দেশে ফিরিবে না, হিমালয় পাদদেশে অন্য কোনো রাজ্যে গিয়া আশ্রয় লইবে এবং কায়িক পরিশ্রম করিয়া বা কৃষিকর্ম করিয়া খাইবে। অযোধ্যাতে তাহাদের গৃহসংসার বা আপন জন বলিতে কেহ ছিল না, পরাধীন জীবনে মৃত্যুমুখে ফিরিয়া যাওয়ার চেয়ে স্বাধীন জীবনে মৃত্যুবরণ করা শ্রেয়োজ্ঞান করিয়া তাহারা দেশত্যাগী হইল, বিশাখদত্ত তাহাদিগকে পুরস্কারের অর্ধেক অগ্রিম দিয়াছিল। অর্থের অভাব ছিল না।
কিঙ্করেরা চলিয়া যায় দেখিয়া কুব্জা ব্যাকুলা হইয়া বলিল, “তোমরা আমাকে এই অপরিচিত বনমধ্যে একাকিনী ফেলিয়া কোথায় চলিলে? আমি কিরূপে বাঁচিব, কি করিব, বলিয়া যাও।”
গন্ধর্ব নামক রহস্যপ্রিয় কিঙ্করটির প্রভুর সহিত রাজান্তঃপুরে যাতায়াত ছিল, দাসীর পৃষ্ঠদেশে বিশাল স্থগু দেখিয়া সে তাহাকে এতক্ষণে চিনিয়াছিল। সে বিনীত ভাবে বলিল, “ঠাকুরাণী, তুমি তবু একটা ইষ্টকগৃহের আশ্রয় সম্মুখেই দেখিতেছ, কাছাকাছি লোকালয়ও আছে। মা জানকীকে এক সময়ে তোমার চক্রান্তে ইহার চেয়ে দুর্গম অরণ্যে উন্মুক্ত আকাশতলে কতদিন বাস করিতে হইয়াছে মনে পড়ে? তুমি রাজকুমার রাজবধূকে বৃক্ষতলে ভূমিশয্যায় শয়ন করাইয়াছ, নিজে দুইচারিদিন ভগ্ন মন্দিরে বাস করিতে পারিবে না? যাক্, তোমার বনবাস এবং হরণকার্যটা হইয়া গেল, এখন কেবল অভিষেকটা বাকী।”
পিঙ্গল হাসিয়া বলিল, “তুমিই বুঝি মন্থরা? তাহা হইলে তোমাকে আমরা আর কি শিখাইব? তোমার ঐ স্থগুর মধ্যে সাতজন ব্যবহারাজীবের চাতুর্য পুঞ্জীভূত আছে, ইচ্ছা করিলে তুমি উহার সামান্যমাত্র ব্যয় করিয়া অচিরে সিংহাসন লাভ করিতে পারিবে। আমরা তোমাকে ইচ্ছাপূর্বক আনি নাই, তোমার শরীরের অলঙ্কার হরণ করিলে এ-সময়ে উপকার হইত, কিন্তু স্বভাবতঃ তস্কর নহি বলিয়া সে লোভও সংবরণ করিলাম। আমাদের বিদায় দাও, তোমার জন্য আমাদের জীবন লইয়া টানাটানি পড়িয়াছে। নৌকাখানি আমরা লইয়া চলিলাম, শিবিকা আমাদের কাজে লাগিবে না, তুমি উহার সদ্ব্যবহার করিতে পারিবে আশা করি। শুনিয়াছিলাম তোমার মুখ দেখিলে পাপ হয়, এখন তাহা অস্থিতে অস্থিতে অনুভব করিতেছি।”
কিঙ্করেরা চলিয়া গেলে নিরুপায়া মন্থরা উঠিয়া দাঁড়াইল, ধীরে ধীরে সোপান বহিয়া উঠিয়া মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত করিল। ভিতরে পত্রপুষ্পের স্তূপের মধ্যে অর্ধসমাহিত ক্ষুদ্র পিত্তলময়ী দেবীপ্রতিমা। মন্থরা মন্দিরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া প্রথমে জলের সন্ধান করিল; দেখিল, এক কোণে একটি মৃণ্ময় কলসের তলদেশে কিছু জল পড়িয়া আছে। মন্থরা দুই হস্তে কলস তুলিয়া আকণ্ঠ জল পান করিল। খাদ্যের সন্ধান কোথাও কিছু মিলিল না, ভাবিল, “পুরোহিতটা কী লোভী! সমস্ত ভোগ নিজে লইয়া যায়। যাক্, আজ নিশ্চয় একবার পূজা দিতে আসিবে, তখন জাগ্রতা দেবীর মুখ হইতে নৈবেদ্য কিরূপে রক্ষা করে দেখিব।” কতদিন মন্দিরে ঝাঁট পড়ে নাই কে জানে, বোধ হয় কয়েক বৎসর হইবে। বুদ্ধিমতী মন্থরা বহু অনুসন্ধানে একটি জীর্ণ সম্মার্জনী আবিষ্কার করিয়া দেবীর সম্মুখে গৃহ-কুট্টিমের একাংশ পরিষ্কার করিল। দেবীমূর্তির চতুষ্পার্শ্বে যে আবর্জনা ও পর্যুসিত পুষ্পপত্রাদির স্তূপ জমিয়াছিল তাহাতে দুইচারিটা ব্যাঘ্র লুক্কায়িত থাকা অসম্ভব ছিল না, সর্পের তো কথাই নাই। মন্থরা একটা ভগ্ন বৃক্ষশাখার সাহায্যে বহুক্ষণ সেগুলি নাড়িয়া দেখিল, হিংস্র জন্তু কিছুই বাহির হইল না। তখন নিশ্চিন্ত হইয়া দেবীমূর্তিটিকে বহু কষ্টে বেদী হইতে নামাইয়া শায়িত অবস্থায় পুষ্পপত্রের দ্বারা আবৃত করিল। তৎপূর্বে দেবীমূর্তির মুখলিপ্ত চন্দন জলে ভিজাইয়া নিজের মুখে মাখিল, ললাটের তৈলসিক্ত সিন্দূর নিজ ললাটে লেপন করিল, দেবীর ধূলিধূসরিত রক্তবস্ত্রখানি দিয়া নিজ ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢাকিয়া কেবল মুখ এবং চক্ষুর একাংশ বাহিরে রাখিয়া অবগুণ্ঠন রচনা করিল। তারপর ধীরে সুস্থে বেদীতে বসিয়া নিজের চারিদিকে পত্রপুষ্পের স্তূপ এমন ভাবে বিন্যস্ত করিল যে, তাহার দেহের তিন ভাগ তাহাতে আবৃত হইয়া রহিল। সে এইভাবে প্রস্তুত হইয়া বসিবার অনতিকাল পরেই বাহিরে কাষ্ঠপাদুকার খট্খটাধ্বনি শ্রুতিগোচর হইল, এক প্রৌঢ় পূজারী ব্রাহ্মণ দ্বারপথে দেখা দিল। তাহার একহস্তে তাম্রপাত্রে কিছু ফলমূল, জলসিক্ত আতপতণ্ডুল এবং তদুপরি স্থাপিত আর একটি ক্ষুদ্রতর পাত্রে পুষ্পবিল্বপত্রদূর্বাদি, অপর হস্তে কোশাকুশি, কুশাসন এবং ঘণ্টা। ব্রাহ্মণ ঈষৎ ক্ষীণদৃষ্টি, ঘরের পরিবর্তন কিছুই তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল না। সে নৈবেদ্যপাত্র এবং পুষ্পপাত্র দেবীর বেদীর সম্মুখে নামাইল, অনান্য দ্রবা তাহার অদূরে রাখিল। দুই হস্তের ভার নামাইয়া সে হস্তদ্বয় কয়েকবার প্রসারিত ও সঙ্কুচিত করিয়া সংবেদন ফিরাইয়া আনিল, তারপর উত্তরীয়প্রান্ত আন্দোলনপূর্বক কিছুক্ষণ বায়ুসেবন দ্বারা শান্তি অপনোদন করিল। পরে কক্ষকোণে রক্ষিত কলস ও রজ্জু তুলিয়া কুপ হইতে জল আনিতে গেল। কুব্জা এই সুবর্ণসুযোগ ত্যাগ করিল না, কিছু তণ্ডুল, একটি মোদক, কয়েকটি কদলীখণ্ড এবং আম্রখণ্ড ক্ষিপ্রহস্তে তুলিয়া গলাধঃকরণপূর্বক আবার যথাস্থানে দেবী সাজিয়া বসিয়া রহিল। ব্রাহ্মণ জলপূর্ণ কলস লইয়া কক্ষে প্রবেশ করিল, কলসের জলে কোশা পূর্ণ করিয়া কুশাসন পাতিয়া মৃণ্ময় প্রদীপ জ্বালিয়া পূজায় বসিল। প্রথমতঃ আচমন করিয়াই সে নৈবেদ্যের উপর খানিকটা ফুলজল ছিটাইয়া দিল, “গণেশাদি পঞ্চদেবতাভ্যো নমঃ, সর্বাভ্যো দেবীভ্যো নমঃ, সর্বেভ্যো দেবেভ্যো নমঃ” বলিয়া দেবীকে লক্ষ্য করিয়াও কিছু ফুল ও জল নিক্ষেপ করিল। তারপর মুদিত নেত্রে অনর্গল অশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করিতে এবং ঘণ্টা নাড়িতে আরম্ভ করিল। মন্থরা যখন দেখিল ব্রাহ্মণ আর চক্ষু খুলিতেছে না তখন বেদীর উপর হইতে ঝুঁকিয়া হাত বাড়াইয়৷ সম্মুখস্থ আমান্ননৈবেদ্যের থালা হইতে টপ করিয়া আর একটি কদলীখণ্ড তুলিয়া মুখে পুরিল। তখনও ব্রাহ্মণের চক্ষু উন্মীলিত হইল না দেখিয়া কুব্জার সাহস বাড়িল, সে বেদী হইতে হাত বাড়াইয়া একে একে দুইটি আম্রখণ্ড, একটি মোদক এবং দুইটি পনসকোষ তুলিয়া ভক্ষণ করিল। শেষবার নৈবেদ্য গ্রহণ করিবার সময় ন্যুব্জ দেহের ভারসাম্য স্থির রাখিতে না পারিয়া সে অধঃপতিত হইতে যাইতেছিল, কোনোরূপে নৈবেদ্যপাত্র দুই হস্তে ধরিয়া ‘টাল’ সংবরণ করিল। পাত্র সশব্দে নড়িয়া গেল, মাটি কাপিল। মন্থরা কোনও মতে বেদীতে যথাস্থানে উঠিয়া বসিতেই দেখিল পূজারী বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। অগত্যা সে রমণীসুলভ লজ্জায় চক্ষু মুদিত করিয়া জিহ্বাগ্র বাহির করিল।
পূজারীর বয়স ষষ্টি বর্ষের অধিক হইবে না। শীর্ণ গৌরবর্ণ দেহের তুলনায় মস্তকটি কিছু বৃহৎ, নাসিকা ঈষৎ দীর্ঘ, চক্ষুদ্বয় আয়ত, গুম্ফশ্মশ্রুমুণ্ডিত মুখখানি দেখিতে ভালোই। তাহার পিতৃদত্ত নাম লোকে ভুলিয়া গিয়াছিল, তাহার মস্তকের কেশ, বিশেষতঃ শিখাটি সর্বদাই ঊর্ধ্বমুখ হইয়া থাকিত বলিয়া গ্রামবাসী তাহার নূতন নামকরণ করিয়াছিল ‘উচ্ছিখ’। বিদ্যাচর্চা অপেক্ষা দেশভ্রমণেই কৈশোরযৌবনে তাহার বেশী উৎসাহ ছিল; দুষ্টবুদ্ধিও কিছু অধিকমাত্রায় ছিল বলিয়া শ্রুতিস্মৃতির সহিত তেমন পরিচয় হয় নাই। গুরুগৃহে গোচারণ এবং ফলমূল-আহরণ যেমন শিখিয়াছিল, ব্যাকরণ এবং শাস্ত্রাদি তেমন অধিগত হইয়া উঠে নাই। কাশী হইতে উত্তরে তক্ষশিলা এবং দক্ষিণে কাঞ্চী পর্যন্ত উপযুক্ত গুরুর সন্ধানে ঘুরিতেই কাটিয়া গেল, পিতৃবিয়োগের পর গ্রামে ফিরিতেই সংসারের ভার স্কন্ধে পড়িল, সুতরাং আর কিছু হইল না। কয়েকটি দরিদ্র যজমান ঠকাইয়া কদাচ-কখনও দুই-একটি রৌপ্য মুদ্রা মিলিত, এই বনমধ্যস্থ মন্দিরে পূজার জন্য গ্রামপ্রধানের নিকট যে সামান্য বৃত্তি ও দৈনিক সিধা পাইত তাহাতে তাহার স্ত্রীপুত্রসহ কোনওরূপে গ্রাসাচ্ছাদন চলিত। বহুপূর্বে একবার রাজসভায় দান লইতে গিয়া সে বহু পণ্ডিতের সম্মুখে নিজের নির্বুদ্ধিতা এবং অজ্ঞতার পরিচয় দিয়া হাস্যাস্পদ হইয়াছিল, সেই হইতে সভায় সে বড়ো আর যাইত না, সে-জন্য রামরাজত্বের স্বর্ণযুগেও তাহার কিছু উন্নতি হয় নাই। সে যতই ক্ষীণদৃষ্টি হউক, তাহার নৈবেদ্যের স্থালী যে ক্রমেই শূন্য হইয়া আসিতেছে তাহা তাহার দৃষ্টি এড়ায় নাই। চক্ষু মুদিত থাকিলেও তাম্রপাত্রে যে কেহ হস্তক্ষেপ করিতেছে তাহা পুষ্পপত্রের মর্মরে এবং নৈবেদ্যপাত্রের ঈষৎ স্থানচ্যুতির মৃদু শব্দেই সে বুঝিতে পারিয়াছিল, সুতরাং সন্দিগ্ধচিত্তে মধ্যে মধ্যে চক্ষু পিটপিট করিতেছিল। নৈবেদ্যস্থালী যখন সম্পূর্ণ শূন্য হইয়া গেল, একটি কঙ্কণমণ্ডিত হস্ত যখন একে একে তাহার নিবেদিত সমস্ত ভোজ্য দ্রব্য গ্রহণ করিল তখন দেবী তাহার পূজায় জাগ্রতা হইয়াছেন মনে করিয়া সে যুগপৎ বিস্মিত এবং আনন্দিত হইয়াছিল, কিন্তু দেবী যখন সশব্দে সিংহাসনচ্যুত হইতে হইতে রক্ষা পাইলেন, তখন সম্পূর্ণরূপে চক্ষু উন্মীলন করিয়া ব্রাহ্মণ স্তম্ভিত হইয়া গেল। দেবীর দেহ সর্বাভরণভূষিত, রক্তবস্ত্রাবরণের মধ্য দিয়াও অলঙ্কারের দ্যুতি দৃষ্ট হইতেছিল, কিন্তু তাঁহার এ কী মূর্তি! শণপিণ্ডের মতো শুভ্র কেশ, কোটরগত শ্যেনচক্ষু, বলি কুঞ্চিত চর্ম, প্রকটাস্থি দেহ! বিকট দস্তহীন মুখে দেবী পনসকোষচোষণে নিযুক্তা ছিলেন, সৃক্কণী বাহিয়া পনসরস ধারাকারে নামিতেছিল, সেই অবস্থায় জিহ্বা নিঃসারণ করিতে গিয়া শোষণাবশিষ্ট পনসের ছিবড়া হড়াৎ করিয়া গৃহকুট্টিমে আসিয়া পড়িল। উচ্ছিখ ভয় পাইল। দেবী সাক্ষাৎ মৃত্যুরূপা, একবার যখন জাগিয়াছেন, তখন তাহাকেও ঐ পনসকোষের মতো চুষিয়া খাইতে কতক্ষণ? অবশ্য দেবীর মুখে দন্ত দৃষ্ট না হওয়ার সে কিছু ভরসাও পাইল; রক্ত চুষিয়া খাইলেও দেবী তাহার অস্থিমাংস চর্বণ করিতে পারিবেন না। উচ্ছিখ অতঃপর সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইয়া করযোড়ে বলিল, “দেবি, প্রসীদ”।
বুদ্ধিমতী মন্থরা ততক্ষণে কর্তব্য স্থির করিয়া ফেলিয়াছিল। ব্রাহ্মণের দেহ কিছু কৃশ হইলেও লোকটা মোটের উপর সুপুরুষ, ইহাকে লইয়া সংসার পাতিলে মন্দ হয় না। অবশ্য বয়স হইয়াছে। তা হোক, মন্থরার উপযুক্ত বয়সে বিবাহ হইলে ইহার মতো পৌত্র হইতে পারিত, সেজন্য তাহার কোনও অভিযোগ নাই। এখন ইহাকে সম্মত করানো যায় কি প্রকারে? আপনার বায়সবিনিন্দিত কর্কশ কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব কোমল করিয়া মন্থরা হাস্যোদ্ভাসিত বদনে দক্ষিণ হস্তে বরাভয়-মুদ্রা প্রদর্শন করিয়া কহিল, “ব্রাহ্মণ, আমি তোমার পূজায় প্রসন্না হইয়াছি। এক্ষণে তোমার কোন্ সাধ পূর্ণ করিব বলো?”
উচ্ছিখ আশ্বস্ত হইল। উঠয়া নতজানু হইয়া রহিল, তাহার বাক্যস্ফুর্তি হইল না। বোঝা গেল, সে বড়োই দুশ্চিন্তায় পড়িয়াছে। কিছুক্ষণ পরে গদ্গদকণ্ঠে থামিয়া থামিয়া বলিল, “দেবি, আমার অনেক সাধ, আপনি কয়টা পূর্ণ করিবেন? আমি জন্মদরিদ্র, জীবনের ভোগ কিছুই হয় নাই। আমি রসনাতৃপ্তিকর বিবিধ সুখাদ্য খাইতে চাই, সপ্তভূমিক প্রাসাদে হেমপর্যঙ্কে দুগ্ধফেননিভ কুসুমকোমল শয্যায় শয়ন করিতে চাই, রাজোচিত বসনভূষণ, যানবাহন, দাসদাসী, সম্মানপ্রতিপত্তি চাই। আমি ইচ্ছামতো ব্যয় করিতে, ভ্রমণ করিতে, আনন্দ করিতে চাই।”
মন্থরা হাসিয়া বলিল, “অর্থাৎ এককথায় তুমি অর্থ চাও? তজ্জন্য কিছু ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত আছ?”
উচ্ছিখ মুহূর্তমাত্র চিন্তা না করিয়া বলিল, “দেহত্যাগ ভিন্ন যাহা বলিবেন করিতে প্রস্তুত আছি! অর্থের জন্য আমি নরকে যাইতে প্রস্তুত আছি।”
মন্থরা কহিল, “যদি তোমার অদ্য সমস্ত বাসনা পূর্ণ হয় তবে তাহার পরিবর্তে কোনো কুরূপা নারীকে বিবাহ করিতে প্রস্তুত আছ?”
উচ্ছিখ এবার ভয় পাইল, মন্থরার মনোগত অভিপ্রায় অনুধাবন করিয়া মস্তক কণ্ডুয়ন করিতে করিতে বলিল, “কিন্তু আমার যে স্ত্রীপুত্র আছে?”
মন্থরা বলিল, “তাহাতে কি হইয়াছে? পুরুষের একাধিক বিবাহ দোষের নহে। আমার মন তত সঙ্কীর্ণ নহে, সপত্নীতে আমার আপত্তি নাই।”
উচ্ছিখ কাতরস্বরে কহিল, “আপনি দেবী হইয়া মানবকে বিবাহ করিবেন? সে কি কথা!”
মন্থরা বলিল, “দেবী হইলেও উপস্থিত আমি শাপভ্রষ্টা হইয়া মানবীদেহ ধারণ করিয়াছি, সুতরাং সেজন্য বাধা হইবে না। আমি বহুদিন রাজান্তঃপুরে ছিলাম, সেখানে তোমার সাক্ষাৎ না পাইয়া এই বনমধ্যে তোমাকে বরণ করিতে আসিয়াছি। তুমিই একমাত্র আমার শাপমোচন করিতে পারো। আমাকে গৃহে লইলে তুমি জীবনে কখনও অর্থাভাবে কষ্ট পাইবে না।”
উচ্ছিখের মুখ শুকাইল, সে ভয়ে ভয়ে বলিল, “আমি জীর্ণ পর্ণাচ্ছাদিত মৃণ্ময়কুটিরে বাস করি, আমার গৃহিণী অত্যন্ত কটুভাষিণী। পত্নীরূপে আপনাকে গৃহে লইয়া গেলে তিনি সম্মার্জনীহস্তে আমাদের উভয়কে আক্রমণ করিবেন। আমি প্রহার সহিতে অভ্যস্ত, আপনার তাহা সহ্য হইবে না।”
মন্থরা বলিল, “সম্মার্জনী চালনায় আমিও অপটু নহি। কিন্তু তুমি বৃথা ভয় পাইতেছ, এখনই তোমার পত্নীর নিকট আমাকে স্ত্রী বলিয়া পরিচয় দিবে কেন?”
উচ্ছিখ বলিল, “তবে কী বলিব? পিতামহী? আপনি আমার পিতামহীর বয়সীই হইবেন মনে হয়।”
মন্থরা বলিল; “না, না, আমার বয়স অত অধিক নয়। অম্লশূল রোগে ভুগিয়া গণ্ডদেশ ঈষৎ তুবড়াইয়া গিয়াছে এবং চক্ষ কোটর প্রবিষ্ট হইয়াছে। আমার দস্তহীন মুখ এবং শণগুচ্ছসদৃশ কেশ দেখিয়া মনে করিয়ো না আমি নিতান্ত বৃদ্ধা। যাহা হউক, পিতামহী বলিয়া পরিচয় দিলে তোমার স্ত্রী যদি সন্তুষ্টা হন তবে আমার তাহাতেও আপত্তি নাই।”
উচ্ছিখের উদ্বেগ তখনও প্রশমিত হয় নাই। বলিল, “কোনোদিন আমার পিতামহীকে দেখি নাই, কারণ আমার জন্মের পূর্বেই তিনি দেহত্যাগ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাকে মরিতে দেখিয়াছিল এমন বৃদ্ধ বৃদ্ধা এখনও গ্রামে আছে। সহসা এখন তাঁহার পুনরাবির্ভাবে সকলে সন্দেহ করিবে না কি?”
মন্থরা বলিল, “আরে, আমি কি তোমার নিজের পিতামহী? আমি তোমার পিতার দূরসম্পর্কিত পিতৃব্যপত্নী, নিঃসন্তানা বিধবা। যথেষ্ট অর্থ আছে, কিন্তু কোনো নিকট আত্মীয় উত্তরাধিকারী নাই। বৃদ্ধবয়সে যে আমার সেবা যত্ন করিবে, আমাকে তীর্থ দর্শন করাইয়া বেড়াইবে এরূপ একটি আত্মীয়ের সন্ধানে ছিলাম, অযোধ্যায় তোমার এক পিতৃবন্ধুর কাছে তোমার পরিচয় পাইয়া তোমাদের গ্রামে আসিয়াছি। তোমার সেবায় সন্তুষ্ট হইলে তোমাকে আমার যথাসর্বস্ব দিয়া যাইব, ইহাই আমার অভিপ্রায়। এই কথা বলিয়া দেখ, তোমার পত্নী কি বলেন।”
ব্রাহ্মণের দ্বিধাভাব কমিল। বলিল, “ও কথা বলিলে বোধ হয় গৃহিণী আপত্তি করিবেন না। এখন আমি ভাবিতেছি, আপনার জাতিগোত্র না জানিয়া আপনাকে ধর্মপত্নী বলিয়া গ্রহণ করা সঙ্গত হইবে কি না।”
মন্থরা হাসিয়া বলিল, “এখনই তুমি অর্থের জন্য নরকে যাইতে প্রস্তুত ছিলে, ইহার মধ্যেই মত পরিবর্তিত হইল? বেশ, আমি স্বীকার করিতেছি, আমি ব্রাহ্মণা নহি, কিন্তু ব্রাহ্মণের অনুলোম বিবাহ তো শাস্ত্ৰসিদ্ধ? তুমি আমাকে বিবাহ করিলে লোকাচারেও বাধিবে না, কারণ, আমি সধবা বা বিধবা নহি, অদ্যাবধি অবিবাহিতা। অবশ্য কুৎসিত বলিয়া যদি আমাকে বিবাহ করিতে তোমার আপত্তি থাকে তবে সাধ্য-সাধনায় কাজ নাই। অদূরে আমার শিবিকা রহিয়াছে, তুমি আমাকে অযোধ্যায় পাঠাইবার ব্যবস্থা করো। সেখানে অর্থের মূল্য বুঝিবে এরূপ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির অভাব হইবে না। তোমার মতো হতভাগ্যের সহিত বাক্যব্যয় করাই আমার অন্যায় হইয়াছে। লক্ষ্মীর প্রসাদ জীবনে বার বার যাচিয়া আসে না, আশা করি যে সুযোগ ছাড়িলে তাহার জন্য পরে অনুতাপ করিবে না।”
মন্থরা পত্রপুষ্পের স্তূপ ঠেলিয়া দাঁড়াইল, রক্তবস্ত্রের আচ্ছাদন ফেলিয়া দিল, দীপালোকের সহিত মিশিয়া দ্বারপথে আগত অপরাহ্ণের ম্লান সূর্যরশ্মি তাহার দেহে পড়িল, সর্বাঙ্গে মণিরত্ন ঝলমল করিয়া উঠিল। যতক্ষণ সে গুরুভার পাষাণের মতো তাহার স্কন্ধে আরোহণ করিবার উপক্রম করিতেছিল ততক্ষণ উচ্ছিখ তাহাকে কোনও মতে ঠেলিয়া ফেলিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু সে যখন নিজেই তাহাকে ছাড়িয়া যাইতে উদ্যতা হইল, তাহার ঐশ্বর্যের প্রত্যক্ষ দীপ্তি মোহজাল বিস্তার করিল, দুর্বলচিত্ত ব্রাহ্মণের মনে হইল, এ সুযোগ ছাড়িয়া দেওয়া মূর্খতা হইবে। দারিদ্র্যের জ্বালায় সে চিরদিন জ্বলিয়াছে, ক্ষুধা তৃষ্ণা, পত্নীর কুবাক্য, প্রতিবেশীর অবজ্ঞা, উত্তমর্ণের অপমান তাহার নিত্য সঙ্গী। এতদিন পরে এই সমস্তের ঊর্ধ্বে উঠিয়া নিশ্চিন্ত আলস্যে সচ্ছল স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন করিবার প্রলোভন সে জয় করিতে পারিল না। বলিল, “আমি সম্মত আছি, এখন কী করিতে হইবে বলো।”
মন্থরা বলিল, “আপাততঃ আমাদের গান্ধর্ব বিবাহ হইবে, দুইটি মাল্য চাই। বন হইতে কিছু পুষ্পচয়ন করিয়া আনো।” উচ্ছিখ পুষ্প আনিল, কুব্জা বিনাসূত্রে মাল্যরচনা করিতে অভ্যস্তা ছিল, দেখিতে দেখিতে দুইটি সুন্দর মালা গাঁথিয়া ফেলিল। তারপর তন্মধ্যে একটি উচ্ছিখকে দিয়া বলিল, “এস, কন্দৰ্পদেবকে সাক্ষী রাখিয়া আমরা পরস্পরকে মালাসহ হৃদয়দান করি।” কুব্জা উচ্ছিখের কণ্ঠে মালা পরাইয়া দিল। অগত্যা উচ্ছিখও মনে মনে “জয় মা শ্মশানকালী, রক্ষা করিয়ো, মা” বলিয়া কুব্জার কণ্ঠে মাল্য দিল। মন্দিরগাত্রস্থ একটা জ্যেষ্ঠিকা ‘টিক টিক’ শব্দে তাহাদের এই মিলন অনুমোদন করিল। মন্থরা অতঃপর ব্রাহ্মণের অঙ্গুলিবদ্ধ কুশাঙ্গুরীয় খুলিয়া লইয়া পরিল, নিজের অঙ্গুলি হইতে বহুমূল্য হীরকাঙ্গুরীয় লইয়া ব্রাহ্মণের অনামিকায় পরাইয়া দিল। উচ্ছিখ বলিল, “এখন কি কর্তব্য?”
মন্থরা সহসা নিজের কটিদেশ বিজড়িত থলি খুলিয়া প্রায় পাঁচ শত স্বর্ণমুদ্রা গৃহকুট্টিমে ঢালিয়া দিল, ক্ষীণালোকিত গৃহের দীপালোক সেই সুবর্ণরাশিতে প্রতিফলিত হইয়া গৃহ উজ্জ্বল করিয়া তুলিল, সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছিগের নয়নদ্বয়ও লোভে আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে দুই হস্তে সেই স্বর্ণরাশি নাড়িতে লাগিল। মন্থরা হাসিয়া বলিল, “অজ্জ-উত্ত, অদ্য হইতে আমি তোমার হইলাম, আমার সমস্ত সম্পত্তি তোমার হইল। সুখে দুঃখে তুমি আমাকে ত্যাগ করিও না। উপস্থিত এই স্বর্ণমুদ্রাগুলির কয়েকটি লইয়া সংসারের স্বাচ্ছন্দ্যবিধান করো। সপ্তাহকালের মধ্যে আমাকে তীর্থযাত্রায় লইয়া যাইবার উদ্যোগ করো। ইহার শতগুণ মূল্যের মণিরত্ন আমার অলঙ্কারে আছে, আমার কুব্জের মধ্যে লুক্কায়িত আছে। যখন প্রয়োজন হইবে তখনই পাইবে।”
ব্রাহ্মণ পুলকিত হইয়া কহিল, “প্রিয়তমে, অদ্য হইতে আমি তোমার ক্রীতদাস হইলাম। তোমার শিবিকাবাহকদের কোথায় সন্ধান পাইব? বনমধ্যে এত অর্থ লইয়া বেশীক্ষণ বসিয়া থাকা নিরাপদ নহে।”
মন্থরা বলিল, “আমি জানিতাম তুমি আমার বিধিনির্দিষ্ট স্বামী, সুতরাং ফিরিব না স্থির করিয়াই আসিয়াছিলাম। বাহকদের আমি বিদায় দিয়াছি। তুমি একটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করিয়া গ্রাম হইতে কয়েকজন বাহক সংগ্রহ করিয়া লইয়া আইস। আর তোমার পত্নীকে আপাততঃ দশটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়া আমার আগমনসংবাদ জ্ঞাপন করিয়া আহারের উদ্যোগ করিতে বলিয়া আইস।” কোশার জলে দেবীর রক্তবস্ত্র ভিজাইয়া মন্থরা নিজের মুখ ও হস্ত পদ পরিমার্জনা করিতে লাগিল।
উচ্ছিখ দ্রুতপদে গ্রামে ফিরিল এবং কয়েক দণ্ডের মধ্যেই চারিজন বাহক এবং বহু প্রতিবেশীকে সঙ্গে লইয়া আসিল। তখনও সন্ধ্যা হয় নাই, তথাপি কয়েকজন অতিরিক্ত উৎসাহী ব্যক্তি উল্কা জ্বালাইয়া লইল। সেই উল্কালোকে বনপথ আলোকিত করিয়া বিচিত্র কারুকার্যময় শিবিকায় আরোহণপূর্বক কুব্জা যখন ব্রাহ্মণের পর্ণকুটিরদ্বারে পৌঁছিল তখন প্রতিবেশিনীরা লাজবর্ষণ করিয়া শঙ্খধ্বনি করিয়া তাহাকে বরণ করিলেন, ব্রাহ্মণী সসম্মানে পদদ্বয় ধৌত করাইয়া তাহাকে গৃহে তুলিলেন। উচ্ছিখের পিতামহীর রূপ দেখিয়া অনেকেই অন্তরালে হাসিল, ‘বিধবার শরীরে আবার এত অলঙ্কার কেন’ বলিয়া কেহ কেহ বক্রোক্তি ও নিন্দাও করিল, কিন্তু সম্মুখে সকলেই তাহাকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করিল। যাহারা ইতঃপূর্বে দরিদ্র উচ্ছিখকে ডাকিয়া কথা বলিত না তাহারা তাহার অভাবনীয় সৌভাগ্যদর্শনে বিস্মিত হইয়া তাহাকে ভ্রাতৃসম্বোধনপূর্বক বিবিধ সুখাদ্য পাঠাইল। মোদক ক্ষীর ও সুপক্ক আম্র-পনসাদি দ্বারা রাত্রির আহার শেষ করিয়া কুব্জা শয়ন করিতে গেল। ব্রাহ্মণের নিত্য ব্যবহার্য ছিন্নকন্থার উপর গৃহিণী তাঁহার বিবাহের সময়ে প্রাপ্ত পট্টবস্ত্রখানি পাতিয়া দিলেন এবং সারা রাত্রি জাগিয়া তাহাকে তালপত্রের দ্বারা ব্যজন করিতে এবং তাহার পদসেবা করিতে লাগিলেন। উচ্ছিখের পুত্র পঞ্চশিখ যুবাপুরুষ, সবে গুরুগৃহ হইতে ফিরিয়াছে। তাহাকে দেখিয়া মন্থরার মন ঈষৎ চঞ্চল হইয়াছিল, সহসা তাহার পিতাকে বিবাহ করিয়া ফেলার জন্য অনুতাপও হইয়াছিল, কিন্তু সে কিছুই মুখভাবে প্রকাশ পাইতে দিল না। তাহাকে কাছে বসাইয়া গায়ে হাত বুলাইয়া অনেকটা বশ করিয়া ফেলিল, শেষ পর্যন্ত মিষ্টান্ন খাইবার জন্য পাঁচটি স্বর্ণমূদ্রা দিতে সে প্রপিতামহীর পদধূলি লইয়া ধন্য হইল।
পরদিন অযোধ্যা হইতে স্থপতি প্রভৃতি আনিতে লোক ছুটিল, কারণ উচ্ছিখের প্রাসাদ নির্মাণ করিবার উপযুক্ত ইষ্টকনির্মাতা, দারুশিল্পী প্রভৃতি কিছুই সে গ্রামে ছিল না। মন্থরার অর্থে গ্রামের মধ্যেই বিস্তৃত ভূমিখণ্ড ক্রীত হইল, শিল্পীরা কাজে লাগিল। প্রাসাদনির্মাণের ভার পঞ্চশিখের উপর দিয়া সপ্তাহকাল পরে উচ্ছিখ পিতামহীকে লইয়া তীর্থযাত্রা করিলেন। যাত্রার পূর্বে আবালবৃদ্ধবনিতা গ্রামবাসীকে একদিন চর্ব্যচুষ্যলেহ্যপেয় বিবিধ আহার্যে পরিতৃপ্ত করিয়া এবং ব্রাহ্মণদিগকে একটি করিয়া স্বর্ণমুদ্রা ভোজন-দক্ষিণা দিয়া মন্থরা সকলের হৃদয় জয় করিল। অনেকগুলি বৃদ্ধ বৃদ্ধা তীর্থদর্শনমানসে তাহাদের সঙ্গী হইবার জন্য উৎসুক ছিল, কিন্তু কত বৎসর পরে তাহারা ফিরিবে তাহার স্থিরতা নাই জানিয়া এবং গঙ্গোত্রী মানস সরোবর প্রভৃতি দুর্গমতীর্থে যাইবার পথে মৃত্যুসম্ভাবনা আছে শুনিয়া পশ্চাৎপদ হইল। বলা বাহুল্য, গৃহনির্মাণের এবং কয়েক বৎসরের মতো সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের উপযুক্ত স্বর্ণমুদ্রা সে উচ্ছিখপত্নীর নিকট রাখিয়া গেল।