মন্থরাহরণ

নয়

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

দুঃসংবাদ বায়ুর অগ্রে ধাবিত হয়। অন্তঃপুরে রাজার প্রাণনাশের প্রচেষ্টা প্রমোদতরণীতে তাঁহার উপর আক্রমণের উপাখ্যানের সহিত মিলিত হইয়া, কয়েক দণ্ডের মধ্যেই বারাণসীর পথে-ঘাটে সাগ্রহে আলোচিত হইতে লাগিল। রাজবাড়ীর দাসী সুদতী, উচ্ছিখ এবং ভদ্র উভয়কেই গোপনে সমস্ত সংবাদ দিয়া গেল। মন্থরা যে সপ্তাহকালের জন্য উচ্ছিখের গৃহে বাস করিতে আসিতেছে, সে কথা শুনিয়া তাহার পত্নী শঙ্করী বিস্মিতা হইয়া কপোলে হস্ত স্থাপন করিয়া বলিলেন, “সে আবার কি? রাজার রূপসী রানীর সঙ্গে তোমার কিসের এত কুটুম্বিতা?”

উচ্ছিখ বুঝাইল, “ধনিগৃহের অনাথা বালিকা, তীর্থভ্রমণের সময় তাহার পিতা আমার উপর তাহার ভার অর্পণ করিয়া সহসা পরলোকে গমন করিলে আমিই কাশীরাজের সহিত তাহার বিবাহ দিয়াছি। সে আমাকে পিতৃব্য সম্বোধন করে, তোমার কন্যার বয়সী, কোনও চিন্তার কারণ নাই। তবে একটা কথা, তোমাকে লইয়া একটু চিন্তার কারণ ঘটিতেছে। কালিন্দী আসিলেই রাজা ঘন ঘন এই গৃহে আসিবেন, তিনি জানেন আমি মৃতদার, সহসা আমার পত্নী আছেন শুনিলে হয়তো আমার উপর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস হারাইবেন। তোমাকে কিছুদিন অন্যত্র রাখিলে হয় না?”

পত্নী বলিলেন, “দ্যাখো, আমাকে আর জ্বালাইও না। আমাকে সরাইয়া দিয়া তুমি যুবতী রূপসী রানীর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করিবে, তাহা কিছুতেই চলিবে না। ও-সব পিতৃব্য-পাতানোর আমি বিশ্বাস করি না, রানী আসে তো সর্বদা আমার চোখে-চোখে থাকিবে। তুমি কেন প্রথমে রাজার কাছে মিথ্যা কথা বলিয়াছিলে? জ্বলজ্জীবন্ত পত্নীকে পরলোকে পাঠাইয়া যেমন সাধু সাজিয়াছিলে, তেমনি এখন তাহার ফলভোগ করো।”

উচ্ছিখ বলিল, “ব্রাহ্মণী, রাজরোষে অমাত্যের বৃত্তিটি গেলে দুইজনেই বিপদে পড়িব, আর আমার জীবনটি গেলে তুমি মৎস্যমাংসভোজনে বঞ্চিতা হইবে। তদপেক্ষা এক কাজ করো। তুমি এখন অকালে বৃদ্ধা হইয়া পড়িয়াছ আমি তোমাকে স্বামীপরিত্যক্তা জ্যেষ্ঠা ভগ্নী বলিয়া পরিচয় দিব। রানীকেও তুমি সেই কথা বলিয়ো।”

পত্নী বলিলেন, “হ্যাগা, এত বড়ো মিথ্যা কথা কেমন করিয়া বলিব? স্বামী থাকিতে”—উচ্ছিখ বলিল, “আরে বুঝিতেছ না, আমার মতো স্বামী থাকাও যাহা—না থাকাও তাহাই। ভাবিয়াছিলাম পিতামহী বিলক্ষণ কিছু সম্পত্তি দিয়া যাইবেন, ধূমধামে তীর্থভ্রমণে দানধ্যানে সমস্ত উড়াইয়া দিয়া মৃত্যুকালে মাত্র পাঁচ শত স্বর্ণমুদ্রা রাখিয়া গেলেন। তাহাতে আর কয়দিন চলে? এখন তুমি দয়া করিয়া পরিচয় না দিলেই রক্ষা পাইব, নচেৎ ধনেপ্রাণে মরিব।” শেষ পর্যন্ত শঙ্করী সম্মতা হইলেন। রাজা যখন মন্থরাকে লইয়া উপস্থিত হইলেন তখন তিনি অবগুণ্ঠনবতী হইয়া এক-কোণে দণ্ডায়মানা রহিলেন, উচ্ছিখ পরিচয় দিলে মন্থরা পদধূলি লইল, রাজা নমস্কার করিলেন। মুহূর্তকাল কুশল প্রশ্নাদি করিয়া রাজা বিদায় লইলে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।

রানীর সম্মানে ব্রাহ্মণী সেদিন সপ্তব্যঞ্জন রন্ধন করিলেন, কালিন্দী চাহিয়া চাহিয়া খাইলেন, শেষে বলিলেন, “পিসিমা, এমন সুস্বাদু ব্যঞ্জন জীবনে খাই নাই। এখন ইচ্ছা করিতেছে বাকী জীবনটা রাজবাটীতে না ফিরিয়া তোমার কাছেই কাটাইয়া দিই।” এই প্রস্তাবে যুগপৎ গর্বিতা ও ভীতা হইয়া ব্রাহ্মণী বলিলেন, “অমন অলক্ষণে কথা বলিতে নাই। তোমার রাজা স্বামী তাহা হইলে আর আমাদের রক্ষা রাখিবেন না। চিন্তা কি, আমি মাঝে মাঝে তোমার পিতৃব্যের হস্তে তোমার জন্য দুই-চারিটি ব্যঞ্জন পাঠাইয়া দিব।” এইরূপে রন্ধনের সুখ্যাতি দ্বারা মন্থরা ব্রাহ্মণীর হৃদয় জয় করিল ।

সুদতী সন্ধ্যাকালে পরদিনের রন্ধনের উপকরণ সংগ্রহ করিতে বাহিরে গিয়াছিল। সে ফিরিয়া বলিল, “পণ্যবীথিকায় শুনিয়া আসিলাম, নগরপাল নাকি সেই বিষবিক্রেতা বৈদ্যকে আবিষ্কার ও বন্দী করিয়াছে। তাহার উপর নির্যাতন চলিতেছে, শীঘ্রই বোধ হয় সে সমস্ত কথা প্রকাশ করিয়া দিবে।”

উচ্ছিখ এবং মন্থরা দুইজনেরই মুখ শুখাইল। উচ্ছিখ বলিল, “বিষবৈদ্যের নাম কি শুনিয়াছ?”

সুদতী বলিল, “রেবস্ত। অসিসঙ্গমের দক্ষিণে বনাঞ্চলের মধ্যে সে নাকি বাস করে।”

উচ্ছিখ উঠিয়া পড়িল, বলিল, “কালিন্দী, এ-বিপদে আমার গুরুদেবই ভরসা। আমি তাঁহার নিকট চলিলাম। দেখি তিনি কি বলেন।”

উচ্ছিথ প্রস্থান করিলে সুদতী বলিল, “এইবার আমি মরিলাম। কুক্ষণে আপনার কাছে দাসীবৃত্তি করিতে আসিয়াছিলাম।”

মন্থরা বলিল, “তোর কোনও ভয় নাই। আমি স্তম্ভন মারণ বশীকরণ সমস্ত বিদ্যা জানি। বহুদিন চর্চা নাই, তথাপি মন্ত্র মনে আছে। কাছাকাছি কোথায় শ্মশান আছে বলিতে পারিস?”

সুদতী বলিল, “পার্শ্বেই তো হরিশ্চন্দ্র ঘাট। এমন নির্জন ভয়ঙ্কর শ্মশান কাশীতে আর নাই।”

মন্থরা বলিল, “আমি তালিকা করিয়া দিতেছি, এই দ্রব্যগুলি তুই অবিলম্বে মূল্য দিয়া সংগ্রহ করিয়া আন্। তারপর, দুইজনে শ্মশানে যাইব। আমার মন্ত্রবলে রেবস্ত আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবার পূৰ্বেই মুক জড়বুদ্ধি হইয়া যাইবে, সহস্র উৎপীড়ন করিলেও তাহার নিকট নগরপাল কোনও কথা বাহির করিতে পারিবে না।”

সুদতী বাহির হইয়া গেলে মন্থরা ব্রাহ্মণীকে গিয়া বলিল, “মাসের পর মাস পাষাণপুরীতে আবদ্ধা ছিলাম, আজ যখন মুক্তি পাইয়াছি তখন আমার দাসীকে লইয়া একটু ছদ্মবেশে বাহিরে ভ্রমণ করিয়া আসি।”

ব্রাহ্মণী বলিলেন, “সত্যই তো, বাছা, বদ্ধা গাভী যুক্তি পাইলে আর কি গোশালে ফিরিতে চায়? কিন্তু অন্ধকার রাত্রি, তুমি অল্পবয়স্কা বালিকা, যদি কোনও বিপদ ঘটে?”

মন্থরা বলিল, “আমরা কাছাকাছি থাকিব। আপনি চিন্তা করিবেন না।”

সুদতী ফিরিলে দুইজনে শ্মশানে গেল। কিছুক্ষণ পরে যথারীতি পূজাদি করিয়া মন্থরা বগলামুখীর কৃপা প্রার্থনা করিল : ওঁ হুঁর্লীঁ বগলামুখী রেবস্তস্য বৈদ্যস্য বাচং মুখং স্তম্ভয়, জিহ্বাং কীলয় কীলয়, বুদ্ধিং নাশয়, ওঁ হুঁর্লী স্বাহা। ওঁ হিলি হিলি চিলি চিলি স্ফুঃ, ব্রহ্মণে স্ফুঃ, সর্বেভ্যো দেবেভ্যো স্ফুঃ।”

নগরপাল সত্যই সে পর্যন্ত বিষবিক্রেতার সন্ধান পায় নাই, সুদতী বিষবৈদ্যের নামধাম অমাত্য ভদ্রের নিকট শুনিয়াছিল। বলা বাহুল্য, ভদ্রের চর সর্বদা উচ্ছিখের পশ্চাতে থাকিত, তাহারাই তাহাকে বিষ ক্রয় করিতে এবং সুদতীকে দিতে দেখিয়াছিল। সে ভদ্রের গৃহে পৌঁছিবামাত্র তিনি উচ্ছিখকে দ্বিতলে ডাকিয়া পাঠাইলেন, বলিলেন, “রেবস্ত ধরা পরিয়াছে, তুমি বোধ হয় অত্যন্ত বিপন্ন বোধ করিতেছ?”

উচ্ছিখ করজোড়ে কহিল, “প্রভু, আপনার নির্দেশেই আমি এই দুষ্কার্যে যোগ দিয়াছিলাম, এখন আপনি আমায় রক্ষা করুন।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “তোমার কোনও ভয় নাই। তুমি অবিলম্বে কালিন্দীকে সংবাদ দাও, নগরপাল রেবস্তকে রাজার সম্মুখে লইয়া গিয়াছিল কিন্তু তাহার মুখ হইতে কোনও শব্দ বাহির করিতে পারে নাই। সে জড়বুদ্ধি মুকবধিরবৎ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু নগরপালের চর সন্ধান পাইয়াছে, এক দাসী বিষ লইয়া রাজবাটীতে গিয়াছিল। রাজবাটীর দাসীদের মধ্যে সুদতীর মতো অবাধভ্রমণের অধিকার কাহারও নাই, সুতরাং তাহার উপর সন্দেহ পড়িয়াছে, সে যেন অতঃপর সতর্ক থাকে। আর, রাজা তোমাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করেন, তাহাকে কলা প্রাতে বিমর্ষ দেখিলে কথাচ্ছলে তাঁহার নিকট আমার প্রশংসা করিয়ো, বলিয়ো, আমি তাঁহার সংসারে শান্তি আনিতে পারি। আর কালিন্দীকে বলিয়ো, আগামীকল্য রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে সে যেন সাবধান থাকে, তাহার বধবন্ধনের আশঙ্কা আছে। তবে অত্যন্ত বিপদে পড়িলে সে আমার নিকট আশ্রয় পাইবে, – ইহাও জানাইয়া রাখিয়ো। কাশীরাজ যদি আমার সহিত দেখা করিতে চাহেন, তবে কলা রাত্রিশেষে অর্থাৎ পরশ্বদিন ঊষাকালে লক্ষ্মীকুণ্ডের পশ্চিমস্থ এই দ্বিতলগৃহে আমার সাক্ষাৎ পাইবেন।”

উচ্ছিখ বলিল, “কিন্তু মহারাজের নিকট যাইতে হইবে ভাবিলেই যে আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হইতেছে। কি করিয়া তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া কথা কহিব?”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “আবার বলিতেছি, তোমার কোনও ভয় নাই। আজ হইতে দুই-রাত্রির মধ্যে কালিন্দীর ছলনাজাল ছিন্ন হইবে, সে কাশী হইতে বিদায় লইবে। তারপর তুমি নির্বিঘ্নে সস্ত্রীক কাশীবাস করিতে পারিবে।”

উচ্ছিখ প্রশ্ন করিল, “প্রভু, আপনি তাহার প্রাণদণ্ড ঘটাইবেন না তো?”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “ভয় নাই, তাহাকে সসম্মানে অন্য এক রাজগৃহে প্রেরণের ব্যবস্থা করিব।”

উচ্ছিখ বলিল, “আপনার অসাধ্য কিছুই নাই।” সে প্রণাম করিয়া বিদায় লইল।

পরদিন উচ্ছিখ যথারীতি রাজসভায় গেল এবং সভাশেষে মহারাজের নিকট স্বীয় গুরুর মাহাত্ম্য কীর্তন করিয়া ও তাঁহার সহিত সাক্ষাতের উপযুক্ত সময় জানাইয়া গৃহে ফিরিল। মন্থরা জিজ্ঞাসা করিল, “পিতৃব্য, রাজসভার নূতন সংবাদ কি?”

উচ্ছিখ বলিল, “অদ্ভুত ব্যাপার। অদ্ভুত ব্যাপার। গতকল্য রেবন্ত ধরা পড়িয়া আর্তনাদ করিয়াছিল, প্রহার হইতে নিষ্কৃতির জন্য রাজার সম্মুখে সমস্ত কথা স্বীকার করিবে জানাইয়াছিল, আজ সে মূকবধিরবৎ আচরণ করিতেছে, সহসা তাহার বুদ্ধিভ্রংশ হইয়াছে। দারুণ আতঙ্কে অনেক সময়ে মানুষ এরূপ জড়বুদ্ধিব‍ হইয়া যায়।”

মন্থরা নিজের মন্ত্রশক্তির প্রভাব দেখিয়া পুলকিতা হইল, চক্ষুর ইঙ্গিতে সুদতীকে জানাইল, “কেমন? দেখিলে তো?”

সুদতীও মৃদু মৃদু শিরঃকম্পন করিয়া তাহার মন্ত্রশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাইল। উচ্ছিখ তখন নিজ গুরুদেবের পরিচয় দিয়া, তাহার যে কোনও বিপদের ভয় নাই, সে-কথা জানাইল। সুদতীর প্রতি সন্দেহ পড়িয়াছে, সে-কথা এবং কালিন্দীর যে মধ্যরাত্রে বধবন্ধনের আশঙ্কা আছে তাহাও জানাইল। উহাদের যে একমাত্র সেই মহাপুরুষের আশ্রয় লওয়া ছাড়া গতি নাই—তাহাও জানাইতে ভুলিল না।

মন্থরা সেদিন সারাদিন সুদতীকে ঘরের বাহির হইতে দিল না। সন্ধ্যার পর দুইজনে পূর্বের মতো হরিশ্চন্দ্র ঘটের মহাশ্মশানে গেল।৷ আজ তাহারা পিতৃস্বসাকে বলিয়া আসিয়াছে, ফিরিতে অনেক রাত্রি হইবে, তিনি যেন অপেক্ষা না করিয়া খাইয়া শয়ন করেন। তাহারা একটা ঘরের তালক-কুঞ্চিকা নিজেদের কাছে রাখিয়াছে, রাত্রিতে যত বিলম্বই হউক, সেই ঘরে রক্ষিত অন্নব্যঞ্জন খাইরা শুইতে পারিবে। মন্থরা স্থির করিয়াছিল, তাহাকে বধ বা বন্ধন করিবার পূর্বে নগরপালকে যদি মন্ত্রবলে হত্যা করা যায়, তবে উপস্থিতের মতো তাহার নিজের বিপদ্ কাটিয়া যাইবে, নূতন লোক এ-কার্যের ভার লইবার পূর্বেই তাহারা কাশীর খেলা শেষ করিয়া অন্য কোনও দেশে সরিয়া পড়িতে পারিবে।