সুদতীর সহিত ভদ্রের সাক্ষাতের কয়েকদিন পরেই প্রবল জনরব শ্রুত হইল যে, কাশীরাজ সুপর্ণ জনৈকা অজ্ঞাতকুলশীলা বিদেশিনী সুন্দরীকে বিবাহ করিতে উদ্গ্রীব হইয়াছেন। তৎপরে যথাসময়ে উক্ত জনরব সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইল, বিবাহ উৎসবে বারাণসীর আবালবৃদ্ধবনিতা নিমন্ত্রিত হইল, সহস্র সহস্র দীন দরিদ্র ব্যক্তি সপ্তাহকাল মনের আনন্দে পানভোজন করিল। অমাত্য ভদ্র ও ভিখারীর ছদ্মবেশে সদলে সেই উৎসবে যোগ দিলেন, তিনদিন রাজপ্রাসাদের প্রশস্ত অঙ্গনে শালপত্রের আধারে বিবিধ সুখাদ্য আহার করিলেন এবং দূর হইতে নূতন রাজমহিষী কালিন্দী দেবীর দর্শনলাভ করিয়া জয়ধ্বনি দিলেন। মহিষীর পশ্চাদ্বর্তী একটি হৃষ্টপুষ্টাঙ্গ প্রৌঢ় ব্রাহ্মণকে দেখিয়া তাহার সন্দেহ হইল, শুভ্র কৌষেয় বসন, উত্তরীয় ও উষ্ণীষ-শোভিত স্বর্ণকুণ্ড-বলয়ধারী উচ্ছিখকে প্রথমে তিনি চিনিতে পারেন নাই। পরদিন বিশ্বেশ্বরমন্দির-সম্মুখস্থ পথে সেই ব্রাহ্মণকে দেখিয়া তিনি দূরে থাকিয়া তাহাকে অনুসরণ করিলেন। ব্রাহ্মণ দশাশ্বমেধ নামক সুবিখ্যাত ঘট্টে গঙ্গাতীরে উষ্ণীষ উত্তরীয়াদি উন্মোচন করিয়া স্নানে নামিলেন, তাঁহার ঊর্ধ্ব মুখী শিখাটি দৃষ্টিগোচর হইতেই ভদ্রের আর সন্দেহ রহিল না। তিনিও সোপানোর্ধ্বে একটি সুবৃহৎ বংশশলাকানির্মিত ছত্রের ছায়ায় বসিয়া তাহার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সেদিন ভদ্রের অঙ্গের সন্ন্যাসীর বেশ, মস্তকের জটাজুট এবং আনাভিলম্বিত শ্মশ্রু দেখিয়া পূর্বদৃষ্ট ভিখারীর সহিত তাঁহার কোনও সম্বন্ধ আবিষ্কার করা কাহারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। উচ্ছিখ স্নানশেষে সোপানে রক্ষিত বস্ত্র পরিধান করিয়া সিক্তবস্ত্র নিষ্পীড়নপূর্বক উপরে উঠিতেই সন্ন্যাসী তাহার সম্মুখে দাঁড়াইলেন। উচ্ছিখ প্রণাম করিলেন, ভদ্র বলিলেন, “জয়োহস্ত। বৎস, তোমার মনে বড়ো অশান্তি, বিশ্বনাথ তোমাকে শাস্তি দিন।”
উচ্ছিখ বিস্মিত হইয়া বলিল, “আপনি কে? আমার অশান্তির সংবাদ আপনি কি করিয়া জানিলেন?”
স্নানঘটে দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিল না, উচ্ছিখ জনতার ভিড় এড়াইবার জন্য তৃতীয় প্রহরে স্নান করিতে আসিয়াছিল। ভদ্র মৃদুহাস্য করিয়া বলিলেন, “বিশ্বেশ্বরের সেবক আমি, তাঁহার দয়ায় মানুষের ভূতভবিষ্যৎ আমার প্রত্যক্ষীভূত হইয়া থাকে। বৎস, তোমার করতল একবার দেখিতে পারি? ভয় নাই, অর্থ লাগিবে না। তোমার ললাট দেখিয়া মনে হয় তুমি সৌভাগ্যবান্ ব্যক্তি, কিন্তু তোমার চিত্তে সুখ নাই কেন?”
বিনাব্যয়ে করকোষ্ঠী বিচার করাইবার প্রলোভন উচ্ছিখ ত্যাগ করিতে পারিল না। সেই দিনই তাহার উপর আদেশ হইয়াছিল, বরুণাতীরের আবাসগৃহখানির ক্রেতা সন্ধান করিয়া সেখানি অবিলম্বে হস্তাস্তরপূর্বক সে যেন ক্ষুদ্রতর কোনও গৃহে আশ্রয় লয়। কার্যসিদ্ধির পর আর উচ্ছিখ ব্রাহ্মণের জন্য অধিক অর্থব্যয় করা মন্থরা নিষ্প্রয়োজন বোধ করিতেছিল, উচ্ছিখও নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা করিয়া ব্যাকুল হইয়াছিল। সে ইদানীং মন্থরার স্নেহভ্রষ্ট হইবার পর তাহাকে প্রদত্ত বাজারখরচ হইতে কিছু কিছু অর্থ সরাইতে আরম্ভ করিয়াছিল, একদিন সত্য প্রকাশ পাওয়ায় মন্থরার নিকট তিরস্কৃত হইয়াছে। অদৃষ্টে আরও কি আছে জানিবার জন্য সে তৎক্ষণাৎ সন্ন্যাসীর সহিত সেই বিশাল বংশছত্রের তলদেশে কাষ্ঠাসনে বসিয়া পড়িয়া দক্ষিণ করতল প্রসারিত করিল। জ্যোতিষী কিছুক্ষণ ধরিয়া নাড়িয়া-চাড়িয়া টিপিয়া-টুপিয়া ঘুরাইয়া উহা নানারূপে পরীক্ষা করিলেন। তারপর শিরঃকম্পনপূর্বক কহিলেন, “হু”। ব্রাহ্মণ প্রশ্ন করিল, “কি দেখিলেন?”
সন্ন্যাসী বলিলেন, “সত্য বলিলে তুমি ক্রুদ্ধ হইবে না তো?”
উচ্ছিখ বলিল, “আর উদ্বেগ বাড়াইবেন না, যাহা বলিবার বলিয়া ফেলুন, আমি ক্রোধ করিব না।”
সন্ন্যাসী তখন আর একবার তাহার করতলের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “তোমার জীবনে শনির দশা কাটিয়াও কাটিতেছে না। উপস্থিত তোমার চন্দ্র দুর্বল হইয়া দ্বাদশে শনি প্রবেশ করিয়াছে, তোমার মস্তিষ্কবিকৃতির সম্ভাবনা।”
উচ্ছিখ সম্মতিসূচক শিরঃকম্পন করিল। সন্ন্যাসী বলিয়া চলিলেন, “আজীবন দারিদ্র্যদুঃখ ভোগ করিয়া তুমি বৎসরাধিককাল পূর্বে এক নারীর দয়ায় সুখের মুখ দেখিয়াছিলে, কিন্তু সে-নারী তোমার সাহায্যে উন্নতির সোপানে আরোহণ করিয়া তোমাকে জীর্ণবস্ত্রের মতো পরিত্যাগ করিয়াছে। তুমি স্ত্রী-পুত্র-গৃহ পরিত্যাগ করিয়া জাতি নষ্ট করিয়া তাহার সেবা করিয়াছ, এখন অনুতাপ করিতেছ। সত্য কি না?”
উচ্ছিখ চারিদিকে চাহিয়া ভয়ে ভয়ে বলিল, “সমস্তই সত্য। অদ্ভুত আপনার গণনাশক্তি। আর কি দেখিতেছেন? অতীতের কথা তো বলিলেন, ভবিষ্যৎ?”
সন্ন্যাসী তাহার করতলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়াই বলিলেন, “ভবিষ্যৎ তোমার ঘোর তমসাচ্ছন্ন। তুমি কোনও বহুসম্মানিত ব্যক্তিকে প্রতারণা করিয়াছ, কুমারী-পরিচয়ে নিজের পত্নীর সহিত তাঁহার পুনর্বিবাহ দিয়াছ। তিনি এ সংবাদ অচিরে জ্ঞাত হইবেন। তোমার মৃত্যুযোগ লক্ষিত হয়, অতি শোচনীয় মৃত্যু।”
উচ্ছিখ দুইহস্তে সন্ন্যাসীর পদদ্বয় ধারণ করিল, বলিল, “আপনি আমাকে রক্ষা করুন। কি করিলে আমার জীবন রক্ষা হয় বলিয়া দিন।”
সন্ন্যাসী তাহাকে সযত্নে ধরিয়া উঠাইলেন, বলিলেন, “ভয় নাই, আমি তোমার গ্রহশান্তির জন্য উদ্যোগ করিতেছি। তোমার বর্তমান নাম যজ্ঞদত্ত, অবন্তীতে তোমার নাম ছিল চিরঞ্জীব, মথুরায় তোমার নাম ছিল দেবপ্রিয়, ক্ষীরগ্রামে তোমার নাম ছিল উচ্ছিখ। কিন্তু উহাও তোমার পিতৃদত্ত নাম নহে। তোমার প্রকৃত নাম ধনঞ্জয়। তোমার পিতার নাম সুলোচন, পিতামহের নাম ইন্দ্ৰধ্বজ, প্রপিতামহের নাম—”
উচ্ছিন্ন করপুটে বলিল, “আর বলিয়া লাভ নাই, আমার প্রপিতামহের নাম আমি নিজেই জানি না। দেখিতেছি আপনি আমার বিষয়ে আমা-অপেক্ষা অধিক সংবাদ রাখেন! অথচ জীবনে আপনার সহিত আমার কখনও সাক্ষাৎ হইয়াছে বলিয়া মনে পড়ে না। কি আশ্চর্য।”
সন্ন্যাসী বলিলেন, “অযোধ্যার সন্নিহিত ক্ষীরগ্রামে তোমার পর্ণকুটির ছিল, সেখানে সম্প্রতি ইষ্টকগৃহ নির্মিত হইয়াছে। তোমার গৃহিণী ঈষৎ কোপনস্বভাবা হইলেও সতীলক্ষ্মী, তিনি প্রতিদিন তোমাকে স্মরণ করেন। এই মুহূর্তে তিনি তোমার প্রিয় বদরীফলের আচার রৌদ্রে শুখাইতে দিয়া তোমার উদ্দেশে অশ্রুমোচন করিতে করিতে একটি দুইটি মুখে নিক্ষেপ করিতেছেন।”
উচ্ছিথ বলিল, “আমার গৃহিণী রন্ধনে সুদক্ষা, তেমন মধুর আচার করিতেও আর কাহাকেও দেখিলাম না। আম্র বলুন, তিন্তিড়ী বলুন, আর নিম্বু বলুন—”
সন্ন্যাসী বলিলেন, “অথচ সেই ধর্মপত্নীকে প্রতারণা করিয়া তুমি একটা বৃদ্ধা কুব্জাকে গ্রহণ করিয়া তাঁহাকে বিস্তৃত হইয়াছ। যদি নিজের কল্যাণ চাও তবে অবিলম্বে তাঁহাকে বারাণসীতে আনাইয়া লও, তাঁহাকে সুখী করিবার চেষ্টা করো। ডাকিনীর সংশ্রব সাধ্যমতো বর্জন করো। একদিকে সতীর শুভকামনা, অন্যদিকে আমার গ্রহশান্তির চেষ্টা মিলিত হইলে এ-যাত্রা তুমি রক্ষা পাইতে পারো।”
সেই-সময়ে ঘট্টে জনসমাগম আরম্ভ হওয়ায় সন্ন্যাসী বিদায় লইলেন। উচ্ছিখ তাঁহাকে একটি স্বর্ণমুদ্রা প্রণামী দিতে গেলে তিনি উহা প্রত্যাখ্যান করিলেন; বলিলেন, “তোমার অর্থ লইলে আমাকে সেইসঙ্গে তোমার পাপের ভাগ লইতে হইবে, অবন্তীর উৎপলার,— প্রতিষ্ঠানের চন্দনার অভিশাপ আমাকে অনুসরণ করিবে। আমি নিজের পাপের ভারে অস্থির, আর ভার বাড়াইতে চাহি না। দৈবক্রমে তোমার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছে। তুমি বিপন্ন, আমার দ্বারা যদি কিছু সাহায্য হয় আমি তাহা বিনা পারিশ্রমিকেই করিব। তুমি আমাকে তোমার নিঃস্বার্থ শুভার্থী বলিয়া জানিয়ো।”
উচ্ছিখ পদধূলি লইয়া বলিল, “প্রভুর সাক্ষাৎ কোথায় কখন পাইব? আপনি আমাকে এই দুর্দিনে পরিত্যাগ করিবেন না তো?”
সন্ন্যাসী কাছে আসিয়া কানে কানে বলিলেন, “বৎস, দুই সপ্তাহের মধ্যে যদি তুমি তোমার পত্নীকে আনাইয়া লইতে পারো, তবে এইস্থানেই একপক্ষকাল পরে এই সময়ে আমার সাক্ষাৎ পাইবে। তোমাকে গ্রহবৈগুণ্য হইতে রক্ষা করিবার জন্য চেষ্টা ততদিনে সফল হইতে পারে। তুমি শীঘ্রই রাজসভায় স্থান পাইবে—যোগবলে জানিতেছি, রাজা পরামর্শ চাহিলে সর্বদা যাহাতে তাঁহার কল্যাণ হয় সেইরূপ পরামর্শই দিয়ো। উপস্থিত কিন্তু সেই ডাকিনীর সহিত প্রকাশ্যে বিরোধ করিয়ো না। সে অচিরে আর একবার তোমার সাহায্য চাহিবে, তুমি শেষবারের মতো তাহাকে সাহায্য করিয়া তাহার বিশ্বাস অর্জন করিয়ো। অতঃপর আমার সাহায্যে তুমি তাহার মায়াজাল ছিন্ন করিতে পারিবে। নচেৎ সে যেরূপ উচ্চাভিলাষিণী এবং দুঃসাহসিকা, তাহাতে রাজাকে ক্রীড়া পুত্তলিতে পরিণত করিয়া সেই কাশীরাজ্য শাসন করিবে; তখন শুধু তোমার সর্বনাশ নয়, রাজ্যের সর্বনাশ হইবে। প্রজার ঘরে ঘরে হাহাকার উঠিবে।”
সন্ন্যাসী চলিয়া যাইতে যাইতে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। কাছে আসিয়া বলিলেন, “সাবধান, আমার সহিত তোমার সাক্ষাৎ হইয়াছে— একথা পাপীয়সী যেন জানিতে না পারে।”
সন্ন্যাসী বিদায় লইলে উচ্ছিখ গঙ্গাতীরে পাষাণচত্বরে চিন্তাযুক্ত হইয়া পাদচারণা করিতে লাগিল। ইত্যবসরে রাজপ্রাসাদের জনৈকা দাসী স্বর্ণকলস কক্ষে তাহার পার্শ্বদেশ দিয়া চলিয়া গেল, অন্যের অলক্ষ্যে উচ্ছিখের দিকে অপাঙ্গে ইঙ্গিত করিয়া সে তাহার হস্তে একটি স্বর্ণকরচ প্রবেশ করাইয়া দিয়া গেল। উচ্ছিখ কিছু বলিল না, সে দ্রুতপদে আবাসগৃহে ফিরিয়া স্বর্ণকবচমধ্যস্থ ভূর্জপত্রটি বাহির করিয়া পড়িল। মন্থরা লিখিতেছে, “আগামী পরশ্ব অমাবস্যার রাত্রে বিশ্বনাথমন্দিরে সন্ধ্যারতির পর মহারাজ গোপনে নৌকাবিহারে যাইবেন। বরুণাসঙ্গম হইতে যাত্রা করিয়া দশাশ্বমেধের ঘট্ট পর্যন্ত গিয়া তাঁহার ফিরিয়া আসিবার কথা। প্রধানা মহিষী কর্ণধারের ভূমিকা লইবেন, আমরা অপর তিনজন মহিষী এবং চারজন সখী ক্ষেপণিচালনা করিব। নৌকা যতদূর সম্ভব তীরের নিকট দিয়া যাইবে, মহারাজ বেণু অথবা বীণা বাজাইবেন। তুমি দুইজন বিশ্বস্ত অনুচরকে মণিকর্ণিকার ঘট্টের নিকট আমাদের প্রমোদতরণী আক্রমণ করিতে পাঠাইবে। একজন নৌকায় উঠিয়াই মহারাজকে নিরস্ত্র করিয়া রজ্জু দ্বারা বন্ধন করিবে, আর একজন তরবারি লইয়া তাঁহার গলদেশে আঘাত করিতে যাইবে। উভয়েই যেন আমার ক্ষেপণীর আঘাত সহ্য করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আসে, সে জন্য তাহাদের উপযুক্তরূপ পুরস্কার দিবে। আমার নিকট পরাজিত হইয়া পলাইয়া গেলে আমার পরিকল্পনা সফল হইবে, তোমারও পদোন্নতির ব্যবস্থা করিব। সাবধানে আয়োজন করিবে, কেহ যেন জানিতে না পারে।”
পত্রের মধ্যে কোনও সম্বোধন বা লেখিকার নাম নাই। সে জন্য বুঝিতে বাধিল না, উচ্ছিখ সেই হস্তলিপি চিনিত। সে মনে মনে মহাপুরুষকে প্রণাম জানাইল, তাঁহার ভবিষ্যদ্বাণী আবার সফল হইয়াছে। উচ্ছিখ নিশ্চিত জানিত, রাজদ্রোহের অপরাধে ধরা পড়িয়া সে যদি শূলে যায়, তবে তাহার ভূতপূর্বা পত্নী নিশ্চিন্তা হইবে, তাহার জন্য একবিন্দু অশ্রুপাতও করিবে না। কাশীরাজ এবং উচ্ছিখ দুইজনেই এই ব্যাপারে নিহত হইলেও তাহার ক্ষতি হইবে না, সে হয়তো অতীতকে ধুইয়া মুছিয়া নূতন প্রণয়ের সন্ধানে বাহির হইবে। এ-ক্ষেত্রে সন্ন্যাসী স্বয়ং আদেশ দিয়াছেন বলিয়াই সে দ্বিধা করিল না। প্রতিষ্ঠান হইতে দুইজন ভৃত্যকে সে উদ্যানবাটিকা প্রহরার জন্য আনিয়াছিল, বাটী বিক্রয়ের কথা হওয়ার পর তাহাদের বেতন মিটাইয়া দেওয়া হইলেও তাহারা কার্যান্তরের সন্ধানে তখন পর্যন্ত বারাণসীতেই ছিল এবং তাহার জন্য নূতন গৃহের সন্ধান করিতেছিল। তাহাদের কৃত্রিম শ্মশ্রুগুম্ফমণ্ডিত করিয়া এবং সর্বাঙ্গে কালিমা লেপন করিয়া উচ্ছিখ সন্ধ্যার পর মণিকর্ণিকার ঘট্টে পাঠাইয়া দিল। কার্যান্তে সন্তরণপূর্বক গঙ্গার অপরপারে পৌঁছিয়া তাহারা যাহাতে অবিলম্বে গোপনে প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়া যায় সে-জন্য সে তাহাদের প্রত্যেককে তিন মাসের বেতন এবং পাঁচটি করিয়া স্বর্ণমুদ্রা অগ্রিম পুরস্কার দিয়া দিল। অর্থের জন্য কাশীরাজকে হত্যা করিতে তাহাদের আপত্তি ছিল না, কিন্তু নারীর নিকট পরাজিত ও প্রহৃত হইয়া পলায়ন করিতে তাহাদের পৌরুষে বাধিতেছিল, স্বর্ণমুদ্রা দেখিয়া শেষ পর্যন্ত আর আপত্তি করিল না। ইতোমধ্যে ভদ্রের ভিক্ষুকবেশী অনুচরগণ উচ্ছিখের নূতন আবাসগৃহ এবং সে যে-দুইজন ভৃত্যকে নিযুক্ত করিল তাহাদের নামধাম জানিয়া আসিল। তাহারাই অযোধ্যা হইতে আগত জনৈক বণিক্কে ভদ্রের নিকট কয়েকদিন পূর্বে লইয়া আসিয়াছিল, তিনি রাজাধিরাজ কুশের লিখিত অনুমতিপত্ৰ দেখিয়া তাঁহার কথা মতো উচ্ছিখের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া উচ্ছিখের উদ্যানবাটিকা ন্যায্যমূল্যে ক্রয় করিলেন এবং একজন অনুগত পুরোহিতের সাহায্যে কেদারেশ্বর-সন্নিহিত পল্লীতে একটি ক্ষুদ্র দ্বিতল গৃহ তাহার জন্য সামান্য মাসিক ভাটকে সংগ্রহ করিয়া দিলেন। এত সহজে কার্যোদ্ধার হইবে তাহা উচ্ছিখ কল্পনাও করে নাই। সেই অযোধ্যাবাসী বণিক্ যখন স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া তাহার পত্নীর নিকট তাহার পত্র পাঠাইবার ব্যবস্থা এবং তাঁহাকে বারাণসীতে আনাইবার জন্য নৌকা ও শিবিকার ব্যবস্থা করিলেন এবং জানাইলেন, স্বীয় গুরু রামানন্দের নির্দেশেই তিনি এ-সমস্ত করিতেছেন তখন উচ্ছিখের ভক্তি চতুর্গুণে বাড়িয়া গেল। নূতন বাটীতে যাইবার পরদিন সে উদ্যানবাটিকার বিক্রয়লব্ধ অর্থ কাশীরাজের নিকট উপস্থিত করিল; বলিল, “মহারাজ, ঐ বৃহৎ প্রাসাদ আমার প্রয়োজন হইবে না বলিয়া উহা বিক্রয় করিয়া দিলাম। উহা কালিন্দীর অর্থেই ক্রীত হইয়াছিল, সে এখন আপনার মহিষী, আপনিই উপস্থিত এই অর্থের সদ্ব্যবহার করিবেন। আমি কেদারেশ্বর-অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র গৃহে বাস করিব, নিত্য গঙ্গাস্নান করিয়া দেবদর্শন করিয়া অবশিষ্ট জীবন যাপন করিব। আমাকে বিদায় দিন।”
কাশীরাজ বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “আপনার মতো নির্লোভ সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ আমি অধিক দেখি নাই, আপনি দয়া করিয়া আমার অমাত্যপদ গ্রহণ করিলে আমি অনুগৃহীত হইব। দিনের মধ্যে কিছুক্ষণ আপনি যদি সভায় উপস্থিত হন এবং কর্তব্যনির্ধারণে আমাকে সহায়তা করেন, তবে সে জন্য মাসিক একশত স্বর্ণমুদ্রা আমি আপনাকে প্রণামী দিব, আপনার কাশীবাসকালে নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় না করিলে আমিও আপনার পুণ্যফলভাগী হইব।”
অমাত্যাপদে বৃত হইয়া উচ্ছিখ নিশ্চিত্ত হইল, তাহার ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তা ঘুচিল। লোকে বলে, “ভিক্ষুক, অন্নভোজন করিবি?” না, “ভোজনের পর আচমন করিব কোথায়?” উচ্ছিখের তখন সেই অবস্থা। কিন্তু সেইদিন প্রাতেই জনৈক ব্রহ্মচারী বটু তাহাকে রামানন্দ স্বামীর একখানি পত্র আনিয়া দিয়াছিল, তাহাতে রাজা কি বলিবেন, তাহার কী উত্তর দিতে হইবে সমস্ত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবৃত ছিল। তদনুযায়ী উচ্ছিখ বলিল, “মহারাজ, আমি নির্জনে ঈশ্বরচিন্তা করিতে চাই, রাজপ্রসাদ আমার কাম্য নহে। আপনার অমাত্যপদলাভ অনেকেই সৌভাগ্য বলিয়া মনে করিবে, আমিও যে মনে করিতেছি না তাহা নহে। তবে রাজসঙ্গ মুক্তিকামীর পক্ষে বন্ধনস্বরূপ। তদ্ভিন্ন আমি ঐ কার্যের যোগ্য নহি। প্রথমতঃ, আমি রাজকার্য কিছুই বুঝি না, রাজনীতির কোনও সম্পর্ক রাখি না; দ্বিতীয়তঃ, অমাত্যপদ গ্রহণ করিলেই আমি আপনার বেতনভুক্ পাদোবজীবী হইব, কোনও অপ্রিয় সত্যকথা বলিলে আপনার বিরাগভাজন হইব, সে-জন্য আপনার দ্বারা প্রদত্ত এই সম্মান শিরোধার্য করিতে ভয় পাইতেছি।”
কাশীরাজ বলিলেন, “আর্য, আপনি নির্লোভ এবং আমার শুভার্থী জানিয়াই আমি আপনাকে আমার এবং রাজ্যের কল্যাণার্থে সভায় রাখিতে চাই; আপনি আমার চাটুবাদ করিবেন বলিয়া নহে। সেরূপ সভাসদ আমার অনেক আছেন, বাড়াইয়া লাভ নাই।”
উচ্ছিখ বলিল, “মহারাজ, আমি তবে স্পষ্ট কথা বলি। আমার বন্ধুকন্যা কালিন্দীকে আমি আশৈশব দেখিতেছি; তাহার বহু গুণ আছে। কিন্তু দোষেরও অভাব নাই। সে অত্যন্ত বিলাস ও আড়ম্বর প্রিয়া এবং উচ্চাভিলাষিণী। আপনি যদি তাহার কথায় প্রজাদের করভার বৃদ্ধি করেন অথবা আপনার পূর্বপত্নীদের অনাদর করেন তবে অধর্মে পতিত হইবেন, সে ক্ষেত্রে আপনার বিরোধিতা করিতে হইবে, তাহা নিশ্চয়ই আপনার পক্ষে অথবা আমার পক্ষে রুচিকর হইবে না।”
কাশীরাজ ক্রমেই অধিকতর বিস্মিত হইতেছিলেন। পূর্বরাত্রেই কালিন্দী তাঁহাকে অনুরোধ করিয়াছিল, তাহার প্রাসাদের পিঙ্গলবর্ণ-প্রস্তরে-গঠিত কক্ষগুলির অভ্যন্তরভাগ শ্বেতমর্মরে আচ্ছাদিত এবং ভিত্তিসমূহ চিত্রশোভিত করিয়া দিতে হইবে, তাহার গজদন্ত নির্মিত পর্যঙ্কের পরিবর্তে তাহার জন্য মরকত ও পদ্মরাগমণিভূষিত একখানি স্বর্ণপর্যঙ্ক নির্মাণ করাইয়া দিতে হইবে। সে নাকি শৈশবে একবার কোশলেশ্বরের রাজান্তঃপুরে ঐরূপ বহু বিলাসোপকরণ দেখিয়া আসিয়াছিল, নিজের এবং নৃপতি-স্বামীর মর্যাদা রক্ষার জন্য সেইসমস্ত সংগ্রহ করা সে বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনা করিতেছিল। কাশীর রাজকোষে তদুপযোগী অর্থের অভাব শুনিয়া সে বলিয়াছিল, “মহারাজের বহু কর্মচারী অতি অলস, অথচ উচ্চ বেতনভোগী। তাহাদের সংখ্যা এবং বেতন কমানো চলে না? রাজ্যে ধনশালী বণিকেরও অভাব নাই। সাধারণ নাগরিকেরাও যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট, কাহারও গৃহে অর্থাভাব নাই বলিয়া মনে হয়। উহাদের রাজকর কিছু বাড়াইয়া দিলেই রাজকোষে অর্থাভাব থাকিবে না। সর্ষপকে পেষণ না করিলে সে তৈল প্রদান করে না, প্রজাকে চাপ না দিলে রাজার ঐশ্বর্য বৃদ্ধি হয় না।” কথাগুলি কাশীরাজের ভালো লাগে নাই, ইতঃপুর্বে তাঁহার রাজবংশীয়া অন্য কোনও রাজ্ঞী রাজ্যশাসন সম্বন্ধে তাহাকে পরামর্শ দিতে আসেন নাই। ব্রাহ্মণের কথার নিজের মর্মবাণীর প্রতিধ্বনি শুনিয়া রাজা সন্তুষ্ট হইলেন, কালিন্দীরই আত্মীয় ধর্মার্থে তাহার বিরুদ্ধতা করিতে প্রস্তুত জানিয়া বলিলেন, “দ্বিজোত্তম, আমি প্রতিশ্রুতি দিতেছি, যে-কোনও গুরুতর পারিবারিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে আপনার সহিত পরামর্শ না করিয়া আমি কাজ করিব না, আমার পক্ষে রুচিকর না হইলেও আপনার উপদেশ বিবেচনা করিয়া দেখিব। যাহা হউক, উপস্থিত আপনি যে ষষ্টিসহস্র রৌপ্যমুদ্রা দিলেন ইহা কালিন্দীর স্ত্রীধন, তাহাকেই প্রদত্ত হইবে। সে ইহা হইতে তাহার গৃহসজ্জার জন্য যাহা ইচ্ছা ব্যয় করুক, রাজকার্যে তাহাকে হস্তক্ষেপ করিতে দিব না। এখন আপনি অনুগ্রহ করিয়া অন্তঃপুরে আসিলে কালিন্দীর সহিত সাক্ষাৎ হইতে পারে। মাতাপিতৃহীনা বালিকা নিশ্চয় আপনার অদর্শনে দুঃখ পাইতেছে।”
উচ্ছিখ বলিল, “মহারাজ, এখন তাহার সহিত ঘন ঘন দেখা না করাই ভালো, তাহাতে তাহার নূতন সংসারে মন বসিতে বিলম্ব হইবে। আমি চাই, সে যখন সৌভাগ্যক্রমে আপনার মতো পতি লাভ করিয়াছে তখন মনেপ্রাণে আপনার সহিত এক হইয়া আপনার এবং রাজ্যের কল্যাণচিন্তায় যেন নিজেকে নিঃশেষে নিবেদন করিতে পারে। আমার মতো সংসারবিরাগী ব্যক্তির জন্য চিন্তা করিয়া তাহার আর লাভ নাই। আমি আমার এক আত্মীয়াকে অযোধ্যা হইতে আনাইয়া লইব, তিনিও কাশীবাসের জন্য বিশেষ ব্যাকুলা। আপনার দয়ার অন্নচিন্তা যখন রহিল না, তখন আর অন্তঃপুরে যাতায়াত করা আমার উচিত হইবে না। অন্য কোনও রাজ্ঞীর আত্মীয় যখন অন্তঃপুরে যাতায়াত করেন না, তখন কালিন্দীর আত্মীয়েরও ঘন ঘন যাতায়াত দৃষ্টিকটু হইবে, তাহাতে আপনার মর্যাদাহানি হইবে। তবে যদি আপনি দয়া করিয়া আমাদের দাসী সুদতীকে অনুমতিপত্র দিয়া রাখেন, তবে সে প্রয়োজনমতো আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আমার বন্ধুকন্যার সহিত যোগাযোগরক্ষায় আমাকে সাহায্য করিতে পারিবে।”
কাশীরাজ অবিলম্বে সুদতীকে ডাকাইয়া তাহাকে মুদ্রাঙ্কিত অনুমতিপত্র দিলেন। উচ্ছিখ তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া বিদায় লইল। রাজা তাহার নির্লোভ নিঃস্বার্থ স্বভাব এবং বিবেচনাবুদ্ধি দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছিলেন, উচ্ছিখও স্বামী রামানন্দের দূরদর্শিতার পরিচয় পাইয়া কম বিস্মিত হয় নাই; সে মনে মনে তাঁহার চরণোদ্দেশে বারবার প্রণাম জানাইল। কালিন্দীর বিনাসহায়তায় সে অমাত্যপদ লাভ করিয়াছে, ইহাতে তাহার আত্মসম্মানজ্ঞানও বৃদ্ধি পাইল।