মণিকর্ণিকায় কাশীরাজের প্রমোদতরণী আক্রান্ত হইবার পর একমাস গত হইয়া গিয়াছে, সেদিন অমাবস্যা। কাশীনগরের একান্তে পুণ্যশ্লোক মহারাজা হরিশ্চন্দ্র একদা যে শ্মশানে চণ্ডালভৃত্যরূপে শবদাহ করিয়া অক্ষয় কীর্তি রাখিয়া গিয়াছেন সেইখানে সে-রাত্রিতে একটিও চিতা জ্বলিতেছিল না। শব-সৎকারের জন্য যে চণ্ডাল কাষ্ঠাদি বিক্রয় করিত, সে সম্ভবতঃ অদূরে চণ্ডালপল্লীতে সুপ্তিমগ্ন ছিল। মন্থরা পূর্বদিনের সাফল্যে উৎসাহিতা হইয়া আজ শত্রুহননের জন্য আর্দ্রপটী বীজ জপ করিতে আসিয়াছিল। অন্ধকারে অনেক অস্থি ও করোটি পদে পদে তাহার যাত্রায় বাধা ঘটাইতেছিল, অর্ধদগ্ধ মনুষ্যদেহভোজনে নিরত দুইটা শৃগাল তাহাকে দেখিয়া বিরক্তিসূচক শব্দ করিয়া সরিয়া দাঁড়াইল, সুদতী তো শ্মশানের ভিতর অধিকদূর প্রবেশই করে নাই, সে মন্থরার বস্ত্র-অলঙ্কারাদি লইয়া পূর্বদিনের মতো শ্মশানের প্রবেশপথেই দাঁড়াইয়া ছিল। মন্থরা ভূষণহীনা হইয়া একখানিমাত্র কৃষ্ণবর্ণ বস্ত্র পরিধানপূর্বক নদীতে অবগাহন করিল। স্নানশেষে মুক্তকেশে আর্দ্রবস্ত্রে ঊর্ধ্ব বাহু অবস্থায় দক্ষিণমুখে দণ্ডায়মানা হইয়া সে মারণ-মন্ত্রোচ্চারণ করিতে লাগিল, “ওঁ নমো ভগবতি চামুণ্ডে রক্তবাসসে অপ্রতিহতপরাক্রমে, নগরপাল-শত্রু-বধায় বিচেভসে স্বাহা”—
অশুদ্ধ মন্ত্রের এরূপ আশ্চর্য প্রভাব ইতঃপূর্বে বা পরে বোধ হয় আর কখনও দেখা যায় নাই। শুনা যায় বৃত্রাসুরের মারণযজ্ঞে পুরোহিত ‘ইন্দ্রং শত্রুং জহান’ না বলিয়া ‘ইন্দ্ৰশত্রুং জহান’ উচ্চারণ করায় ইন্দ্রশত্রু বৃত্র নিজেই নিহত হইয়াছিল, কিন্তু সে মন্ত্রোচ্চারণের অনেক পরে-মন্ত্র-শক্তির সহিত বজ্রশক্তির মিলন ঘটিবার পর! এ-ক্ষেত্রে অত বিলম্ব হইল না, মন্ত্রোচ্চারণ শেষ করিয়াই মন্থরা অনুভব করিল কয়েকটি মনুষ্যমূর্তি নিঃশব্দচরণে তাহার সন্নিকটবর্তী হইয়াছে। কাশীর নিস্তব্ধ গঙ্গাতীরে বহুদূর হইতে রাজপ্রাসাদের ঘণ্টাধ্বনি ভাসিয়া আসিতেছিল, রাত্রি দ্বিপ্রহর ঘোষিত হইল। সন্ন্যাসীর ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করিয়া মন্থরা শিহরিয়া উঠিল, ভীতিকম্পিত কণ্ঠে বলিল, “তোমরা কে? কী চাও?”
গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠে উত্তর আসিল, “আমি কাশীর নগরপাল মহাবল। মহারাজ্ঞী, মহারাজ সুপর্ণ আপনাকে স্মরণ করিয়াছেন। আমি শিবিকা আনিয়াছি। বাহকগণ, শিবিকা নামাও।”
সেইখানে সেই মুহূর্তে বজ্রপাত হইলে মন্থরা এত চমকিত হইত না। আতঙ্ক সীমা ছাড়াইলে মানুষ জ্ঞান হারায়, মন্থরাও জ্ঞান হারাইয়া সেই শ্মশানের কর্দমে পতিত হইতে যাইতেছিল, বাহকেরা তাহাকে ধরিয়া তুলিয়া সযত্নে শিবিকা-মধ্যে শয়ন করাইয়া দিল। শিবিকা শ্মশানভূমি অতিক্রম করিয়া পঞ্চক্রোশী মহাপথে উঠিল এবং বরুণাসঙ্গমের নিকটবর্তী রাজপ্রাসাদের দিকে অগ্রসর হইল।
কিয়ৎক্ষণ পরে আন্দোলিত শিবিকা-মধ্যে মন্থরার সংজ্ঞা ফিরিল। প্রথমতঃ সে কেন কোথায় আসিয়াছে কিছুই স্মরণ করিতে পারিল না, তাহার পর সিক্ত বস্ত্রের জন্য শৈত্য অনুভব করিতেই শ্মশানের এবং নগরপালের কথা মনে পড়িল। সে নীরবে চিন্তা করিতে লাগিল, এখন উপায় কি? এমন সময়ে সহসা শিবিকা থামিয়া গেল। মন্থরা শুনিতে পাইল, প্রহরী প্রশ্ন করিতেছে, “তোমরা কে? এত- রাত্রে কোথায় চলিয়াছ?” উত্তরে শিবিকার পুরোবর্তী নগরপালবেশী উষ্ণীষধারী ব্যক্তি মৃদুস্বরে কহিল, “আমি শ্রেষ্ঠী রাজতিলক। আমার পত্নী সন্ধ্যাকালে গঙ্গাস্নানে গিয়া অসুস্থা হইয়া পড়ায় ফিরিতে বিলম্ব হইয়াছে।”
মন্থরা বুঝিল, সে নগরপালের বন্দিনী নহে, কোনও তস্করের দল তাহাকে হরণ করিয়া লইয়া যাইতেছে। সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে সাহস ফিরিল, সে শিবিকাভ্যন্তর হইতে চিৎকার করিয়া বলিল, “মিথ্যা কথা। প্রহরী, ইহারা আমার কেহ নহে। বলপূর্বক আমাকে কোথায় লইয়া যাইতেছে জানি না, তুমি রক্ষা করো।”
প্রহরী বিস্মিত হইল, আদেশ করিল, “শিবিকা নামাও। আমি দেখিব।”
সম্মুখবর্তী তথাকথিত নগরপাল বলিল, “প্রহরী, আমার পত্নী উন্মাদরোগগ্রস্তা, উহার কথা শুনিয়ো না। আমাদিগকে যাইতে দাও।”
প্রহরী শিবিকার উপর দীর্ঘ ষষ্টির আঘাত করিয়া বলিল, “শিবিকা নামাও। যদি সহজে আদেশ পালন না করো, তবে এই ষষ্টি দেখিতেছ; প্রয়োজন হইলে কটিবদ্ধ কৃপাণও ব্যবহার করিতে বাধ্য হইব।”
শিবিকা নামিল। প্রহরী শিবিকাদ্বার ঈষৎ উন্মোচন করিয়া মশালালোকে দেখিল, এক সিক্তবসনা সুন্দরী শায়িতা। প্রহরীর মুখ দেখিয়া মন্থরা উঠিয়া বসিল, প্রহরী সম্পূর্ণরূপে দ্বার উন্মোচন করিয়া দিলে সে বাহিরে আসিল, বলিল, “আমি দস্যুর হাতে পড়িয়াছিলাম, তুমি আমার জীবন রক্ষা করিয়াছ। এখন দয়া করিয়া যদি আমাকে আমার গৃহের পথ দেখাইয়া দাও”—
প্রহরী বলিল, “এক মুহূর্ত অপেক্ষা করুন, এই কাপুরুষগুলাকে আগে বন্দী করি।” সে চারিদিকে চাহিয়া বিস্মিত হইয়া গেল, শিবিকাবাহকদল বা তাহাদের পুরোবর্তী তথাকথিত নগরপালের কোনও চিহ্ন নাই। সে মশাল লইয়া কিছুক্ষণ নিকটবর্তী উপপথগুলিতেও ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিল, কয়েকটি গৃহের গৃহস্থকে জাগ্রত করিয়া প্রশ্ন করিল, কোনও ফল হইল না। নিকটে-দূরে কোথাও দস্যুদের সন্ধান পাওয়া গেল না। তখন প্রহরী ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “মাতঃ, আপনি কোথায় যাইবেন?”
মন্থরার সেই সর্বশক্তিমান্ সন্ন্যাসীর কথা মনে পড়িল। মনে পড়িল, তাহার নিকট আশ্রয় মিলিতে পারে। সে বলিল, “লক্ষ্মীকুণ্ডে কোন্ পথে যাইব বলিতে পারো?”
প্রহরী বলিল, “লক্ষ্মীকুণ্ড তো অদূরে। এই পথ ধরিয়া এক পল চলিলেই আর একটি সঙ্কীর্ণ পথ দক্ষিণদিকে গিয়াছে দেখিতে পাইবেন। সেই পথে দশ বা দ্বাদশখানি গৃহ অতিক্রম করিলেই দক্ষিণে দেখিবেন একটি বিরাট বটবৃক্ষ, উহার বামে প্রস্তর সোপানাবদ্ধ ক্ষুদ্র কুণ্ডটিই লক্ষ্মীকুণ্ড। কিন্তু মা, আপনাকে কিছুক্ষণ যে অপেক্ষা করিতে হইবে। আমি নগরপালকে সংবাদ পাঠাইব। চৌরগণ পলায়ন করিয়াছে শুনিলে তিনি অবশ্য বিরক্ত হইবেন, কিন্তু আপনাকে রক্ষা করিতে পারিয়াছি জানিলে প্রসন্নও হইবেন। কাশীতে দিন দিন তস্করদের স্পর্ধা বাড়িতেছে। রাজা রাজকার্যে পূর্বের মতো মনোযোগ দেন না, নগরপালও দুইদিন হইল কয়েকজন আততায়ীর সন্ধানে নগরীর অধিকাংশ প্রহরী ও গুপ্তচরকে নিয়োজিত করিয়াছেন। আজ কাছাকাছি অন্য প্রহরী কেহ ছিল না বলিয়াই পাপিষ্ঠেরা পলাইতে পারিল।”
মন্থরা নগরপালের নামে ভয় পাইল। কে জানে, নগরপালের গুপ্তচরেরাই হয়তো তাহাকে লইয়া যাইতেছিল, নচেৎ তাহার সন্ধান দুর্বৃত্তেরা পাইবে কোথায়? এই হতভাগ্য হয়তো না জানিয়া বাধা দিয়াছে। সে বলিল, “সত্যই তোমার কোনও অপরাধ নাই। কিন্তু আমাকে নগরপালের নিকট লইয়া গিয়া কেন অপদস্থ করিবে? আমি ধনিগৃহের গৃহিণী, আমাকে তস্করে স্পর্শ করিয়াছে শুনিলে হয়তো আমার স্বামী আমাকে গৃহে লইবেন না, গৃহে লইলে হয়তো তাঁহার আত্মীয়বন্ধুগণ তাঁহাকে জাতিচ্যুত করিবে। কেন আমাকে বিপদে ফেলিবে? তুমি আমার ধর্মভ্রাতা, প্রাণরক্ষা করিয়াছ, এইবার মানরক্ষা করো। আমাকে যাইতে দাও।”
প্রহরী তখনও দ্বিধা করিতেছিল। বলিল, “পুরস্কারের লোভ করি না, কিন্তু আমার কর্তব্য?”
মন্থরার সহসা মনে পড়িল, সর্বাঙ্গের আভরণ উন্মোচন করিলেও তাহার কর্ণের মণিময় কুণ্ডলদ্বয় খুলিতে ভুল হইয়াছিল। সে তৎক্ষণাৎ দুই কর্ণ হইতে দুইটি কুণ্ডল খুলিয়া প্রহরীর হস্তে দিয়া বলিল, “তোমার কর্তব্য এখন আমার মানরক্ষা করা। এই কুণ্ডল দুইটি আমার ভ্রাতৃজায়াকে ভগ্নীর আশীর্বাদ বলিয়া দিয়ো।”
প্রহরী আর দ্বিধা করিল না। তাহাকে ছাড়িয়া তো দিলই, কর্তব্যের ত্রুটি করিয়া তাহাকে মশাল ধরিয়া পথ দেখাইয়া লক্ষ্মীকুণ্ডের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়া গেল। কুণ্ডের পশ্চিমকোণে একটি দ্বিতল পাষাণগৃহে দীপালোক লক্ষিত হইল, নিম্নতলের একটি কক্ষে কাহারা মৃদুস্বরে কথা বলিতেছিল। প্রহরীকে বিদায় দিয়া মন্থরা সেই গৃহের দ্বারে গিয়া করাঘাত করিল।