মন্থরাহরণ

এগার

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

বারাণসীর লক্ষ্মীকুণ্ডের সোপানশ্রেণীর ঊর্ধ্বে তাঁহার বর্তমান আবাসবাটীর দ্বিতলে জটাজুটমণ্ডিত ভদ্র ব্যাঘ্রচর্মাসনে বসিয়াছিলেন। তাঁহার পরিধানে রক্তবস্ত্র, শ্মশ্রু আনাভিলম্বিত, ঊর্ধ্বাঙ্গ ভস্মাচ্ছাদিত, রুদ্রাক্ষত্রিপুণ্ডকাদি-মণ্ডিত হইয়া তিনি ধ্যানস্থ ছিলেন। সম্মুখে আস্তৃত বালুকা-নির্মিত চতুষ্কোণ বেদীর উপর নির্বাণোন্মুখ যজ্ঞাগ্নি ধূম উদ্গিরণ করিতেছিল। স্তিমিত দীপালোকে অদূরে দুই-জন শিষ্য যুক্তকরে উপবিষ্ট ছিলেন। দ্বারী সুবাহুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ একটি কৃষ্ণবস্ত্রাবৃতা অবগুণ্ঠনবর্তী নারী কক্ষে প্রবেশ করিতেই তাঁহার পদশব্দে কক্ষের নৈঃশব্দ ব্যাহত হইল, সন্ন্যাসী চক্ষুরুন্মীলন করিলেন। তাঁহার চক্ষুর ইঙ্গিতমাত্রে অন্য ভক্তদ্বয় সসম্ভ্রমে কক্ষ ত্যাগ করিয়া গেলেন, সুবাহুও কক্ষ ত্যাগ করিল। সন্ন্যাসী মন্থরার ভয়ার্ত মুখের দিকে নিমেষমাত্র চাহিয়া বলিলেন, “অনেকক্ষণ সিক্তবস্ত্রে আছ, এই কক্ষের পশ্চাতে একটি ক্ষুদ্র কক্ষে তোমার জন্য শুষ্ক বস্ত্র, কঞ্চুলিকা এবং অঙ্গমার্জনী রক্ষিত আছে, বস্ত্র পরিবর্তন করিয়া আইস।”

মন্থরা নিঃশব্দে দূর হইতে সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া তাঁহার আদেশ পালন করিতে গেল। তাহার আগমনসংবাদ যেন সন্ন্যাসী পূর্বেই জানিতেন; সূক্ষ্ম ক্ষৌমবস্ত্র, অন্তর্বাস, মহার্ঘ কঞ্চুলিকা, গাত্রমার্জনী, কঙ্কতিকা— কিছুরই অভাব ছিল না। সিক্ত কেশ মুছিয়া আঁচড়াইয়া শুষ্ক শুভ্র বসন পরিয়া সে সন্ন্যাসীর সম্মুখে আসিতেই তিনি বলিলেন, “সারাদিন উপবাস গিয়াছে, ঐ কোণে কিছু আহার্য আছে, খাইয়া লও।”

মন্থরা বলিল, “প্রভু, আমি অত্যন্ত বিপন্না হইয়া প্রাণরক্ষার্থ আপনার শরণ লইতে আসিয়াছি। এখন আহারের কথা চিন্তা করিতে পারিতেছি না। আপনি দয়া করিয়া—”

সন্ন্যাসী বাধা দিয়া বলিলেন, “নিরাপদ আশ্রয় আমি তোমার জন্য স্থির করিয়া রাখিয়াছি। সে-জন্য রাত্রি প্রভাত হইলেই তোমাকে বহুদূরে যাইতে হইবে। তৎপূর্বে সাধ্যমতো শক্তি সঞ্চয় করিয়া লও। আহার করো, বিশ্রাম করো।”

মন্থরা ঐ কক্ষের সন্ন্যাসিনির্দিষ্ট কোণে একটি লৌহময় আচ্ছাদনী উন্মুক্ত করিয়া দেখিল রৌপ্যপাত্রে অন্নব্যঞ্জনের বিপুল সমারোহ। সে অল্প কিছু আহার ও পান করিয়া সন্ন্যাসীর নির্দেশক্রমে নিকটবর্তী একটি স্নানকক্ষে গিয়া আচমনাদি সারিয়া আসিল। সন্ন্যাসী বলিলেন, “তুমি শীতার্ত, যজ্ঞাগ্নির নিকটে আসিয়া উপবেশন করো। এইবার তোমার কী বক্তব্য আছে বলো।”

মন্থরা বদ্ধাঞ্জলি হইয়া বলিল, “কি আর বলিব? আমাকে রক্ষা করুন।”

সন্ন্যাসী মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “তুমি, মা, নিজের জালে নিজে জড়াইয়াছ। প্রথম সাক্ষাতের দিন আমি তোমাকে বলিয়াছিলাম, যাহা করিয়াছ করিয়াছ, আর কাহারও ক্ষতি করিয়ো না। তুমি তো আমার কথা শুনিলে না। পট্টমহিষীর সর্বনাশ করিতে কেন গিয়াছিলে? বালকের রজ্জুপাশ যদি বক্ষে না পড়িয়া রাজার কণ্ঠে বদ্ধ হইত, কীলকের তরবারি তোমায় ক্ষেপণিচালনার পূর্বেই যদি রাজার বক্ষে বিদ্ধ হইত, সুদতীপ্রদত্ত বিষ রাজা বিড়ালীর দ্বারা পরীক্ষা না করাইয়াই যদি অম্লের সহিত গ্রহণ করিতেন, তবে তুমি নিজে কোথায় দাঁড়াইতে বলো তো? রেবস্তের মুখ বন্ধ করিবার জন্য, নগরপালকে আর্দ্রপটি-বীজ-সাহায্যে হত্যা করিবার জন্য যখন উদ্যোগ করিয়াছিলে তখন পরিণাম চিন্তা করো নাই? তুমি বোধ হয় জানো না, সুদতী এই-রাত্রে এই সময়ে নগরপাল কর্তৃক কাশীরাজের নিকট নীতা হইয়া স্বীকারোক্তি করিতেছে। সমস্ত সত্য প্রকাশ পাইয়াছে, এখন তোমাকে রক্ষা করা সত্যই কঠিন।”

মন্থরা অনেকক্ষণ নীরবে নতনেত্রে বসিয়া রহিল। পরে বলিল, “সুদতী শেষে এই কাজ করিল? সেই-তো আমাকে কুপরামর্শ দিয়াছিল?”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “মন্থরা, তুমি অযোধ্যার রাজপুরীতে দাসদাসীদের মধ্যে অনেকদিন কুসীদব্যবসায় চালাইয়াছিলে, তুমি নিশ্চয় জানো,— অর্থ কুসীদযোগে দ্বিগুণ বা বহুগুণ হইয়া ফিরিয়া আসে। তোমার দাসীর মধ্যে তোমার পাপপ্রবৃত্তি যদি কিছু অধিক পরিমাণে জাগ্রত হইয়া থাকে, তবে কাহাকে দোষ দিবে? কৈকেয়ী তো স্বভাবতঃ তেমন মন্দ ছিলেন না, তুমি তাঁহাকে বশীকরণ বিদ্যা শিখাইয়াছিলে, সপত্নীদিগের সহিত দাসীর মতো ব্যবহার করিতে শিখাইয়াছিলে, শেষ পর্যন্ত তাঁহাকে উত্তেজিত করিয়া রাজার মৃত্যুর এবং রামসীতার অশেষ দুঃখের কারণ হইয়াছিলে। তোমার জ্ঞান-বিশ্বাস-অনুসারে তুমি কৈকেয়ীর কল্যাণই চাহিয়াছিলে, সুদতীও নিজ জ্ঞানবিশ্বাস মতে তোমার কল্যাণই চাহিত। আজ নিজের জীবন বিপন্ন; তাহার একদিকে নিষ্ঠুর অত্যাচার ও মৃত্যু, আর একদিকে সত্য প্রকাশ করিলে মুক্তির প্রলোভন। সে কী করিবে? আত্মরক্ষার জন্য দুর্বলচিত্তা নারীকে বাধ্য হইয়া তোমার ভূমিকা বর্ণনা করিতে হইয়াছে। সামান্য রূপের লোভে তুমি অন্যকে অন্ধ করিয়াছ, মনে পড়ে।”

মন্থরা বলিল, “আমি কিন্তু এ-বার দুইটি বর চাহিবার সুযোগ পাইয়াছিলাম, তাহা লই নাই।”

সন্ন্যাসী মৃদু হাসিয়া বলিলেন, তোমার বুদ্ধি পূর্বাপেক্ষা পরিণতিলাভ করিয়াছে—এ-বার তাহারই প্রমাণ দিয়াছ। এক বরে নিজের নির্বাসন এবং অন্য বরে কুমারের অভিষেক প্রার্থনা করিয়া রাজাকে মুগ্ধ করিয়াছ। যদি মুখ ফুটিয়া রানীর নির্বাসন এবং কুমারের প্রাণদণ্ড চাহিতে—তাহা হইলে পাইতে না, তাহা জানো। সুপর্ণ দশরথ নহেন। এ-ক্ষেত্রে কুমার বন্দী হইয়াছেন, পট্টমহাদেবীর নির্বাসনও প্রায় ঘটাইয়াছিলে, গুপ্তচরেরাই সমস্ত পণ্ড করিয়া দিল। তুমি অতি চতুরা, যষ্টি অক্ষত রাখিয়া সর্পকে নিহত করিবার জন্যই তুমি নিজের নির্বাসন চাহিয়াছিলে, কোনও মহত্ত্ববশতঃ নহে। মন্থরা, তুমি স্বভাবতঃ দুষ্টবুদ্ধি, সুদতীর পরামর্শে তুমি মন্দ হইয়াছ—একথা আর যাহাকে বলিতে হয় বলিয়ো, আমাকে বিশ্বাস করিতে বলিয়ো না। সুদতীকে তুমি সপ্তবার হট্টগৃহে বিক্রয় করিয়া ক্রয় করিয়া আনিতে পারো। শস্ত্রচিকিৎসায় তোমার বাহিরের কুব্জ অন্তর্হিত হইলে কি হইবে, মনের বক্রতা যায় নাই।”

মন্থরা নতমুখে বসিয়া রহিল, কোনও উত্তর দিল না। সন্ন্যাসী বলিলেন, “এ-যাত্রা রক্ষা পাইলে স্বভাব সংশোধন করিতে চেষ্টা করিবে? সরল পথে চলিতে, কাহারও ক্ষতি না করিয়া জীবনধারণ করিতে পারিবে?”

মন্থরা তখনও নীরব। সন্ন্যাসী বলিলেন, “তোমার মতো পাপিষ্ঠার জীবন রক্ষা করিয়া ভবিষ্যতে তোমার পাপাচরণের সহায়তা করিবার জন্যই কি আমার আশ্রয় চাহিতে আসিয়াছ?”

মন্থরা কৃতাঞ্জলি হইয়া বলিল, “গুরুদেব, ক্ষমা করুন। যাহা করিয়াছি— করিয়াছি, ভবিষ্যৎজীবনে জ্ঞানতঃ কাহারও ক্ষতির চেষ্টা করিব না,— আপনাকে কথা দিতেছি। বিশ্বনাথ সাক্ষী।”

বাতায়নপথে ঊষালোক কক্ষে প্রবেশ করিতেছিল, বাহিরে অচিরে সূর্যোদয় হইবে বোধ হইল। সন্ন্যাসী সেইদিকে চাহিয়া বলিলেন, “উত্তম। মহারাজ সুপর্ণ আমার নিকট পরামর্শ লইবার জন্য এতক্ষণ বোধ হয় প্রাসাদ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়াছেন। তিনি উচ্ছিখকেও বন্দী করিয়াছেন, তোমার বিরুদ্ধে প্রচুর প্রমাণ সংগৃহীত হইয়াছে।”

সন্ন্যাসীর বক্তব্য শেষ না হইতেই বাহিরে ভেরী ও তূর্য নিনাদ শ্রুত হইল, রাজানুচরগণ রাজার আগমন ঘোষণা করিল। জনকোলাহলে, বহুজনের পদ-শব্দে, অশ্বের হ্রেষায় এবং হস্তীর বৃংহিতে নিভৃত আশ্রমের যেন ধ্যানভঙ্গ হইল। দ্বারী সুবাহু দ্রুতপদে কক্ষে প্রবেশ করিয়া করপুটে কহিল, “কাশীরাজ সুপর্ণ আপনার দর্শনাভিলাষী।”

সন্ন্যাসী প্রশ্ন করিলেন, “সঙ্গে কেহ আছেন?”

দ্বারী বলিল, “একজন ব্রাহ্মণ এবং একজন পরিচারিকা-শ্রেণীর স্ত্রীলোক প্রহরিবেষ্টিত হইয়া সঙ্গে আসিয়াছে। বোধ হয় তাহাদের বন্দী করিয়া আনিয়াছেন।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “কপিলানন্দকে বলো, তাঁহাকে সসম্মানে লইয়া আসিবে। তৎপূর্বে একখানি আসন তুমি এইখানে পাতিয়া দিয়া যাও। আর এক কথা। অনুচরদিগকে এবং বন্দিগণকে বাহিরে অপেক্ষা করিতে বলো, ভিতরে অধিক লোকের স্থান হইবে না মনে হয়।”

মন্থরা ভয়বিহ্বলা হইয়া বলিল, “আমি কোথায় যাইব? আপনি আমাকে ধরাইয়া দিবেন না তো?”

সন্ন্যাসী হাসিয়া বলিলেন, “ভয় নাই। তুমি যে কক্ষে বস্ত্র পরিবর্তিত করিলে তাহার পশ্চাতে আর একটি কক্ষে একটি বৃহৎ বহুছিদ্রযুক্ত মঞ্জুষা দেখিতে পাইবে। উহা শূন্যগর্ভ। উহার মধ্যে একটি সুন্দর সুকোমল শয্যা আস্তৃত আছে। উপস্থিত তুমি উহার মধ্যে লুকাইয়া থাকো। রাজা চলিয়া গেলে আমি বিশ্বস্ত শিষ্যদের সাহায্যে তোমাকে কাশীরাজ্যের বাহিরে প্রেরণ করিব। আমার তপোবনে তুমি আশ্রয় পাইবে। সেখানে শেষ জীবন শান্তিতে কাটাইতে পারিবে।

মন্থরা দ্রুতপদে প্রস্থান করিল, সঙ্গে সঙ্গে দ্বারী সুবাহু এবং সন্ন্যাসিশিষ্য কপিলানন্দের সঙ্গে কাশীরাজ সুপর্ণ কক্ষে প্রবেশ করিলেন। সন্ন্যাসীকে নমস্কার করিয়া তিনি আসনে উপবেশন করিলে কপিলানন্দ ও সুবাহু বাহিরে গেল। সন্ন্যাসী রাজার দিকে কিছুক্ষণ নির্নিমেষনেত্রে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন, “মহারাজ, সম্প্রতি বড়ো আঘাত পাইয়াছেন। রত্নহারভ্রমে কালসর্পিণীকে কণ্ঠে ধারণ করিয়াছিলেন, সে আপনার মস্তকে দংশন করিতে উদ্যত হইয়াছে।”

কাশীরাজ বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “আপনার কথার অর্থবোধ হইল না। রাজ-পুরীর মধ্যে আমার জীবননাশের জন্য চক্রান্ত চলিতেছে, সে-জন্য অত্যন্ত অশান্তিতে আছি, ইহা সত্য।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “মহারাজ, আপনার বুঝিবার ভুল হইয়াছে। আপনার জীবননাশের উদ্দেশ্য প্রকৃতপক্ষে কাহারও ছিল না। ছলনাময়ী কালিন্দী আপনাকে কৃতজ্ঞতায় অভিভূত করিতে চাহিয়াছিল, পট্টমহিষীর প্রতি এবং রাজকুমার ঋতুপর্ণের প্রতি বিরূপ হইয়া আপনি যাহাতে একান্তভাবে তাহার অনুগত হন সেজন্য তাহার নিযুক্ত আততায়ীদিগের হস্ত হইতে এবং তাহারই প্রদত্ত বিষমিশ্রিত অন্নগ্রহণ হইতে সে আপনাকে রক্ষা করিয়াছে। আপনাকে হত্যা করা তাহার স্বার্থের প্রতিকূল হইত। আপনার বিরুদ্ধে প্রাসাদে কোনও চক্রান্ত হয় নাই, পট্টমহিষী এবং রাজকুমার সম্পূর্ণ নিরপরাধ।”

কাশীরাজ অধিকতর বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “আপনি কী বলিতেছেন, প্রভু!”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “সত্য কথাই বলিতেছি, মহারাজ। আপনি রূপমোহে অন্ধ হইয়া নিজের সর্বনাশ নিজে ডাকিয়া আনিয়াছেন। সেই অজ্ঞাতকুলশীলা ডাকিনীর কথায় নিজের পুত্রকে কারাগারে পাঠাইয়াছেন, সতী সাধ্বী পত্নীকে অবিশ্বাস করিয়া নির্বাসনে পাঠাইবার চিন্তা করিতেছেন।”

কাশীরাজ বলিলেন, “কালিন্দী নিজের নির্বাসন এবং কুমারের অভিষেক প্রার্থনা করিয়াছিল।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “সত্য, কিন্তু সেই বরপ্রার্থনার কারণ কী বলিয়াছিল মনে পড়ে? আপনার মনের মধ্যে সে বিষসঞ্চার করিয়াছে। মহারাজ, পট্টমহিষীর সহিত আপনি বিংশবৎসর কাল সংসার করিতেছেন, ইতঃপূর্বে কখনও কি তিনি আপনাকে হত্যা করিবার জন্য আততায়ী পাঠাইয়াছিলেন?”

কাশীরাজ বলিলেন, “কালিন্দীও বলিয়াছিল এ-কথা। তাহার মতে, আমাকে হত্যা করিয়া তাহাকে শাস্তি দিবার জন্যই এই চক্রান্ত। কথায় বলে, নারী যমকে স্বামী দিতে পারে, সপত্নীকে দিতে পারে না।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “যৌবনে যখন ভোগস্পৃহা প্রবল থাকে তখন স্ত্রীলোকের সপত্নীবিদ্বেষও প্রবল থাকে। আপনি পট্টমহিষীর যৌবনাবস্থাতেই একে একে আর দুই-বার বিবাহ করিয়াছেন, সুপ্রিয়া দেবী এবং শাশ্বতী দেবীকে গৃহে আনিয়া তাঁহার প্রেমের অপমান করিয়াছেন। তখন তিনি তাহা সহ্য করিয়াছেন, আর আজ করিতে পারিতেছেন না?”

সুপর্ণ বলিলেন, “আমার অপর দুই পত্নী বন্ধা। নুতন বিবাহিতা রাজ্ঞীর সন্তানসম্ভাবনায় সম্ভবতঃ সিংহাসনের জন্য—”

সন্ন্যাসী হাসিয়া বলিলেন, “মহারাজ, ইহাও আপনার ভ্রম। কালিন্দী সন্তানসম্ভাবিতা নহে, সে আপনাকে মিথ্যা সংবাদ দিয়াছে। যাহা হউক, সে ভবিষ্যতের জন্য পথ পরিষ্কার করিয়া রাখিতে চায়। মহারাজ, যে নারী বিড়াল দিয়া আপনার অন্ন পরীক্ষা করাইবার পরামর্শ দিয়াছিল, সেই-যে এই চক্রান্তের মূলে রহিয়াছে, তাহা কি আপনি বুঝিতে পারেন নাই? আপনি না বুদ্ধিমান্ বলিয়া গর্ব অনুভব করেন?”

সুপর্ণের দৃষ্টির ঘোর কাটিতেছিল, চারিদিকের অন্ধকার যেন স্বচ্ছ হইয়া আসিতেছিল, তবু সন্দেহ যেন যাইতে চাহিতেছিল না। তিনি মৃদুস্বরে বলিলেন, “সেই প্রেমময়ী সুন্দরী, সে এরূপ বিশ্বাসহন্ত্রী হইতে পারে? এ-যে আমার কল্পনার অতীত, প্রভু। অবশ্য পট্টমহাদেবীর গৃহে বিষ- মিশ্রিত অম্ল দেখিয়া আমারও সন্দেহ যে না হইয়াছিল তাহা নহে, তবু—”

“তবু সেই দ্বিচারিণীর সুন্দর মুখ দেখিয়া আপনি তাঁহার সতীত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়াছিলেন।”

সুপর্ণ বলিলেন, “ক্রোধবশে কিছু বলিয়া থাকিলেও তাঁহার সতীত্বে আমি কোনও দিন সন্দেহ করি নাই। কালিন্দী দ্বিচারিণী, আপনি কি বলিতেছেন, প্রভু?”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “অনেক অপ্রিয় সত্য কথাই বলিতে হইতেছে, মহারাজ, অপরাধ লইবেন না। কালিন্দী পূর্বে অন্যের বিবাহিতা পত্নী ছিল, রাজরানী হইবার লোভে সে দরিদ্র পূর্বস্বামীকে ত্যাগ করিয়া আপনাকে বরণ করিয়াছিল, আবার আপনার অপেক্ষা সুপুরুষ এবং বিশালতর রাজ্যের অধিপতি যুবক কোনও নৃপতিকে পাইলে অদ্যই সে আপনাকে জীর্ণ বস্ত্রের মতো পরিত্যাগ করিবে। করিবে কেন বলি মহারাজ, করিয়াছে। সে কল্য রাত্রিতে নগরপাল কর্তৃক সত্যপ্রকাশের ভয়ে নগর ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছে।”

কাশীরাজ আসন ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন, উত্তেজিতভাবে বলিলেন, “এ কী বলিতেছেন, প্রভু? আমার অজ্ঞাতে কালিন্দী কাশী ত্যাগ করিয়াছে? এ-কথাও আমাকে বিশ্বাস করিতে হইবে?”

সুপৰ্ণ বাতায়ন হইতে মুখ বাড়াইয়া জনৈক প্রহরীকে ডাকিলেন। সন্ন্যাসী বলিলেন, “সেই ভালো, নগরপাল মহাবলকে প্রমাণ-সহ আসিতে বলিলেই সন্দেহভঞ্জন হইবে।”

প্রহরী আসিলে কাশীরাজ তাহাকে অবিলম্বে মহাবলকে এবং উচ্ছিখকে ডাকিয়া আনিতে বলিলেন। তারপর নীরবে নতমুখে আসনে উপবিষ্ট হইলেন। সন্ন্যাসী কিছুক্ষণ পরে বলিলেন, “সে যখন রাজবাটীর বাহিরে বাস করিবার অনুমতি চাহিয়াছিল তখনই কি আপনি বুঝিতে পারেন নাই যে, সে ধৃতা হইবার ভয়ে পলায়নের আয়োজন করিতেছে?”

কাশীরাজ ৰলিলেন, “না।”

প্রথমেই উচ্ছিখ একটি বেত্র-পেটিকা সহ আসিয়া উপস্থিত হইল। কম্পিতকলেবরে একবার সন্ন্যাসীকে একবার রাজাকে প্রণাম করিয়া জোড়করে দণ্ডায়মান রহিল। রাজা প্রশ্ন করিলেন, “অমাত্য, আপনার বন্ধুকন্যা কালিন্দী এক সপ্তাহের জন্য আপনার গৃহে বাস করিতে গিয়াছিল। সে এখন কোথায়?”

উচ্ছিখ বলিল, “মহারাজ, সর্বনাশ হইয়াছে। হতভাগিনী গতকল্য রাত্রে একবস্ত্রে গৃহত্যাগিনী হইয়াছে। আমার এবং আপনার উভয়েরই মুখ পুড়াইয়াছে। আমি আপনার বিশ্বাসের সম্মান রাখিতে পারি নাই, মহারাজ। আমাকে যে শাস্তি দিতে হয় দিন।”

বলা বাহুল্য উচ্ছিখ সন্ন্যাসীর নিকট পূর্বরাত্রেই কথোপকথনের পাঠ লইয়াছিল। সে বেত্রপেটিকা খুলিয়া একে একে মন্থরার সমস্ত বস্ত্র-অলঙ্কার বাহির করিয়া দিল, বলিল, “কয়দিন হইতেই সে যেন অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে কাটাইতেছিল; কল্য সারাদিন জলগ্রহণ করে নাই। রাত্রে কখন যে গৃহত্যাগ করিয়াছে, কিছুই জানিতে পারি নাই। বস্ত্রালঙ্কার ও অর্থ সমস্তই রাখিয়া গিয়াছে। আপনার প্রদত্ত বস্ত্র আপনি বুঝিয়া লউন।”

কাশীরাজ দেখিলেন। সেই পরিচিত কঙ্কণ কেয়ূর, পীত ও সুনীল নানা বর্ণের বিচিত্র ক্ষৌমবসন। সম্প্রতি প্রদত্ত নবলক্ষ-মুদ্রাব্যয়ে-রচিত পদ্মরাগ ও হীরকখচিত একটি কণ্ঠহার প্রভাতসূর্যকিরণে জ্যোতির্ময় ব্যঙ্গহায্যে যেন তাঁহার মূর্খতাকে উপহাস করিতে লাগিল। সুপর্ণ চক্ষু ফিরাইয়া লইলেন। বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, তোমাকে আমি বড়ো বেশী বিশ্বাস করিয়াছিলাম। তুমি জানিয়া-শুনিয়া আমার এ সর্বনাশ করিলে কেন? কালিন্দীর পূর্বে একবার বিবাহ হইয়াছিল জানিয়া—”

এ-বিষয়টার সম্বন্ধে পূর্বে পাঠ লওয়া হয় নাই, উচ্ছিখ ভীতিবিহ্বল-নেত্রে একবার রাজার, একবার সন্ন্যাসীর দিকে চাহিতে লাগিল। সন্ন্যাসী চক্ষুর ইঙ্গিতে তাহাকে আশ্বস্ত করিয়া সুপর্ণকে বলিলেন, “মহারাজ, আমি কি বলিয়াছি, অমাত্য জানিয়া শুনিয়া এ-কাজ করিয়াছেন? আমরা ধ্যাননেত্রে যাহা দেখিতে পাই— সাধারণ মানুষ কিরূপে তাহা জানিবে? কি হে, যজ্ঞদত্ত, কালিন্দীর সহিত এক সময়ে উচ্ছিখ নামক এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের কিছু ঘনিষ্ঠতা হইয়াছিল কি না? সেই-যে তোমার আত্মীয়—”

উচ্ছিখ করপুটে কহিল, “হইয়াছিল, প্রভু। কিন্তু তাহাতে দোষের কিছু আছে বুঝিতে পারি নাই।”

সন্ন্যাসী বলিলেন, “তোমার বন্ধুকন্যা গান্ধর্বমতে তাহাকে বিবাহ করিয়াছিল— তাহা তোমার জানিবার কথা নহে। কাশীরাজ সুপর্ণকে যে মুর্খ প্রতিপন্ন করিয়া গেল— সে যে তোমার চক্ষুতে ধুলি নিক্ষেপ করিবে তাহা আর বিচিত্র কি? মহারাজ, হতভাগ্যকে ক্ষমা করুন। এ সত্যই আপনার হিতার্থী।”

রাজা মৃদুস্বরে বলিলেন, “হায়, বিশ্বনাথ!” তারপর কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিলেন, “অমাত্য, আপনি যাইতে পারেন। আমার দ্বারা আপনার কোনও ক্ষতি হইবে না।”

উচ্ছিখ রাজাকে নমস্কার এবং সন্ন্যাসীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া বিদায় লইল। গৃহের বাহিরে আসিয়া হাফ ছাড়িয়া বাঁচিল। কৃতজ্ঞচিত্তে বলিল, “জয় গুরুদেব।”

উচ্ছিখ নিষ্ক্রান্ত হইবার পরক্ষণেই নগরপাল মহাবল কক্ষে প্রবেশ করিল। সে গত দুইতিন-দিন বড়োই অশান্তিতে কাটাইতেছিল। অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করিতে আরম্ভ করিয়া সে অতি অল্পকালের মধ্যে অভাবনীয়রূপ সাফল্যলাভ করিয়াছিল। তাহার চরগণ একে একে যে-সকল তথ্য তাহাকে আনিয়া দিতেছিল— সেগুলি যেন তাহারা অনায়াসে সংগ্রহ করিতেছিল, কোনও অদৃশ্যশক্তি যেন তাহাদের সাহায্য করিতেছিল। অসিসঙ্গমের পরপারে বিষবৈদ্য রেবস্তের সন্ধান যেমন আকস্মিক ভাবে পাওয়া গেল, তেমনি একটি সুন্দরী রমণী মূষিকের উৎপাতে উত্যক্ত হইয়া কোন্‌দিন কোন্ সময়ে তাহার নিকট বিষ ক্রয় করিয়া লইয়া গিয়াছে তাহা স্মরণ করিতেও তাহার বাধা হয় নাই। অপরদিকে, সেই সুন্দরী রমণীকে কেদারেশ্বরের পাষাণসোপান হইতে যে কৈবর্ত বরুণাসঙ্গমের কাছে আদিকেশবের মন্দিরনিম্নে পৌঁছিয়া দিয়াছিল সে স্পষ্টই তাহাকে রাজবাটীর দাসী বলিয়া নির্দেশ করিয়াছে। প্রাসাদ-পুররক্ষীরা একবাক্যে বলিয়াছে, নূতন রাজ্ঞী কালিন্দীর দাসী সুদতীর কাশীরাজের বিশেষ অনুমতি-অনুসারে যে-রূপ অবাধভ্রমণের অধিকার ছিল— সেরূপ আর কাহারও ছিল না। পূর্বের অমাবস্যার দিন সন্ধ্যাকালে মণিকর্ণিকার ঘট্টে দুইজন ভীমকায় স্নানার্থী নাকি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। সেখানেও সন্ধ্যাকালে একজন সুন্দরী স্নানার্থিনীকে তাহাদের সহিত মৃদুস্বরে আলাপ করিতে দেখা গিয়াছিল, রাজার নৌকা আক্রান্ত হইবার কিছু পূর্বেই সে অদৃশ্য হয়। স্থানীয় কয়েকজন নিত্যস্নায়ী ব্যক্তি সাক্ষ্য দিয়াছে, ঐ তিনজনকে তাহার পূর্বে তাহারা কোনও দিন দেখে নাই, একজন ঐ নারীকে রাজপ্রাসাদের দাসী বলিয়া বর্ণনা করিয়াছে। এ সমস্ত প্রমাণই একটি সত্য নির্দেশ করিতেছিল, সুদতীর কর্ত্রী নূতন রাজ্ঞী কালিন্দী দেবীই সমস্ত চক্রান্তের মূলে অবস্থিতা। অথচ রাজার আদেশ, সুদতী বা কালিন্দী দেবীর সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ করাও চলিবে না। এই দ্বিধার মধ্যে নগরপাল বিমূঢ় অবস্থায় ছিল, সে রাজাদেশে রাজসাক্ষাতে করপুটে নিবেদন করিল, “মহারাজ, অপরাধের প্রমাণ যথেষ্ট পাইতেছি, কিন্তু বলিতে সাহস হয় না। হয়তো আপনি বিশ্বাস করিবেন না, হয় তো আমাকেই দণ্ড দিবেন, কারণ সত্য বড়োই অপ্রিয়।”

কাশীরাজ অনেকটা আত্মস্থ হইয়াছিলেন, বলিলেন, “নূতন রাজ্ঞী কালিন্দী দেবীর বিরুদ্ধেই প্রমাণ পাইয়াছ আশা করি। যাহা জানিয়াছ নির্ভয়ে বলো। আমি আজ সমস্ত সহ্য করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছি।”

নগরপাল একে একে তাহার সমস্ত সংগৃহীত তথ্য নৃপতির কর্ণগোচর করিল। রাজা বলিলেন, “সুদতীর বা কালিন্দীর কোনো সন্ধান পাইলে?”

নগরপাল বলিল, “না, মহারাজ, তবে এখনও আশা ছাড়ি নাই।”

রাজা বলিলেন, “আর সন্ধানে প্রয়োজন নাই। উহারা যেখানে ইচ্ছা থাক। তুমি তোমার চরদিগকে পুরস্কৃত করিয়ো। তাহাদিগকে বলিয়ো, কুমার ঋতুপর্ণকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিতে চাই, এ-বিষয়ে প্রজাগণের মতামত জানিতে ইচ্ছা করি। অতঃপর সর্বদা সতর্ক থাকিবে, আমার প্রাণরক্ষা না হইলে তোমার প্রাণ যাইবে জানিয়া রাখিয়ো।”

কাশীরাজের চক্ষুর ইঙ্গিতে নগরপাল প্রণাম করিয়া বিদায় লইল। সুপর্ণ নির্জীবের মতো নতনেত্রে বসিয়া রহিলেন। সন্ন্যাসী বলিলেন, “যাহা হইয়াগিয়াছে তাহার জন্য অনুতাপ করিয়া লাভ নাই, মহারাজ।”

সুপর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “কিন্তু কালিন্দীর কী হইল, কী হইবে না জানিয়া মন যে শান্ত হইতেছে না, প্রভু। সে আমার সহিত যতই ছলনা করিয়া থাকুক, আমার প্রণয়ে একাধিপত্য-লাভের লোভেই করিয়াছে, আপনিই বলিতেছেন, আমার প্রাণনাশের ইচ্ছা তাহার ছিল না। এ-ক্ষেত্রে তাহাকে এক কথায় মন হইতে সরাই কি করিয়া? যাহাকে লইয়া এতদিন সংসার করিয়াছি, সে অনাথিনীর মতো পথে পথে ফিরিতেছে ভাবিলেই যে প্রাণের মধ্যে কেমন করিতে থাকে। সে অসহায়া সুন্দরী যুবতী, শূন্যহস্তে একবস্ত্রে পথে বাহির হইয়াছে; হয়তো এতক্ষণে কোনও দুর্বৃত্তের কবলে পড়িয়াছে—”

ভদ্র মনে মনে হাসিলেন। তাহার মুখখানির মায়া কাটাইতে পারিতেছ না আর কি। মুখে বলিলেন, “মহারাজ, আপনার দয়ার শরীর, পাপীয়সীর প্রতি এ-দয়া আপনারই উপযুক্ত বটে, কিন্তু আপনার চিন্তার কারণ নাই। অতঃপর যেখানে যাইতেছে—সেখানে সে নিরাপদে মাতৃতুল্য সম্মানে থাকিবে, কোনও পুরুষ তাহার কেশাগ্র স্পর্শ করিবে না। আমি এ-বিষয়ে আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিতেছি। তাহার যথেষ্ট শিক্ষা হইয়াছে, সে এখন তপস্বিনীর জীবন যাপন করিবে।”

কাশীরাজ সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া বিদায় লইলেন। বলিলেন, “আমি আপনার কাছে চিরঋণী রহিলাম। আপনার সেবায় লাগিতে পারিলে কৃতার্থ হইব।”

ভদ্র বলিলেন, “আমাকে রাজাধিরাজ কুশ তাঁহার বর্তমান রাজধানী কুশাবতীতে যাইবার জন্য নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। তাঁহার দ্বারা প্রেরিত একটি নৌকা গঙ্গাতীরে অপেক্ষা করিতেছে, অদ্য শেষ রাত্রেই আমাকে যাইতে হইবে। আপনি নগরপালকে জানাইয়া দিন, সে যেন প্রচলিত শুল্কনির্ধারণার্থ পরীক্ষাদি দ্বারা আমার যাত্রাবিঘ্ন না ঘটায়।”

সুপর্ণ বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “সে কি, প্রভু। আজই যাইবেন? আমি যে আশা করিতেছিলাম, আপনার নিকট কিছুদিন সান্ত্বনা লাভ করিব।”

ভদ্র বলিলেন, “সান্ত্বনা আপনার গৃহেই পট্টমহিষীর কক্ষে অপেক্ষা করিতেছে, মহারাজ। অবিলম্বে তাঁহার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। অচিরে কুমার ঋতুপর্ণকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিবার ব্যবস্থা করুন। আপনার অন্তরে এবং সংসারে শান্তি আসিবে,– বিশ্বাস করুন। আমাকে বিদায় দিন।”

সুপর্ণ কিছুক্ষণ নীরব রহিয়া বলিলেন, “আমার মুদ্রাঙ্কিত আদেশপত্র আমার কোনও কিঙ্কর এখনই আপনাকে দিয়া যাইবে, উহা সঙ্গে থাকিলে কাশীনগরের অথবা কাশীরাজ্যের প্রত্যন্তদেশস্থ রক্ষীরা আপনাকে বাধা দিবে না।”

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে ভদ্র সদলে নৌকারোহণ করিলেন। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ কয়েকটি মঞ্জুষা তাঁহার সঙ্গে ছিল, রাজাদেশে কেহ তাহা পরীক্ষা করিল না। বলা বাহুল্য, কাশীনগরে সেদিন তাঁহার আবাসবাটিকায় মন্থরাকে স্নানাহারাদির জন্য দুইবার মঞ্জুষার বাহিরে আসিতে দেওয়া হইয়াছিল, কিন্তু সে স্বেচ্ছায় দিবসের অধিকাংশ সময় সেই মঞ্জুষা মধ্যে আশ্রয় লইয়াছিল, বহির্জগতের সম্বন্ধে তাহার মনে একটা আতঙ্ক আসিয়াছিল। নৌকাযাত্রার প্রারম্ভে সন্ন্যাসী এবং তাঁহার শিষ্যেরা যখন বিশ্বেশ্বরের সু-উচ্চ মন্দিরচূড়া লক্ষ্য করিয়া প্রণাম নিবেদন করিলেন তখনও সে বাহিরে আসিতে চাহিল না। কাশীর রাজ্যসীমা অতিক্রম করিয়া বিন্ধ্যাচলের নিকট যখন সন্ন্যাসী নৌকাত্যাগপূর্বক সশিষ্য অশ্বারোহণ করিয়া স্থলপথে যাত্রা করিলেন, মন্থরা তখনও মঞ্জুষা মধ্যে বসিয়া রহিল। সন্ন্যাসী একটি উষ্ট্র সংগ্রহ করিয়া তাহার পৃষ্ঠের একদিকে মন্থরা-গর্ভ মঞ্জুষাটি এবং অপরদিকে অন্যান্য মঞ্জুষা তালযন্ত্রাবদ্ধ করিয়া ঝুলাইয়া দিলেন। কাশীরাজমহিষী মন্থরা এইরূপে স্বেচ্ছায় অপহৃতা হইয়া উষ্ট্রের গতিচ্ছন্দের তালে তালে দুলিতে দুলিতে ঘুমাইয়া জাগিয়া, শুইয়া বসিয়া কুশাবতীর পথে যাত্রা করিল।