মন্থরাহরণ

চার

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

উচ্ছিখ ব্রাহ্মণ যখন তাহার দৈবলব্ধ স্বয়ংবরা পত্নী, তথা পিতামহীকে লইয়া তীর্থভ্রমণে বাহির হইয়াছিল, তখন তাহার ধারণা ছিল পথের কষ্টে বৃদ্ধা দুই-চারিমাসের মধ্যে মরিয়া যাইবে, তারপর সে তাহার সমস্ত অলঙ্কার ও মণিমুক্তাদি বিক্রয় করিয়া যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহপূর্বক দেশে ফিরিবে। কার্যক্ষেত্রে কিন্তু মন্থরার অত শীঘ্র মরিবার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। তৎপরিবর্তে যতই দিন যাইতে লাগিল ততই নানা উপাশে সে যেন জরাকে ঝাড়িয়া ফেলিতে লাগিল। তাহার জীবনীশক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়সঙ্কোচের জন্যও তাহার আগ্রহবৃদ্ধি হইতে দেখা গেল। প্রথম দিকে সে যেমন উদারভাবে অর্থব্যয় করিত, আজকাল আর সেরূপ করে না। ফলে সাংসারিক নিত্য-প্রয়োজনীয় ঘৃত-লবণ-তৈল-তণ্ডুল ক্রয়ের জন্য প্রদত্ত দৈনিক দুই-চারিটি রৌপ্যমুদ্রা হইতে বাঁচাইয়া উচ্ছিখের মাসিক দুই-চারি মুদ্রার বেশী সঞ্চয় হইত না। শিবিকাবাহকদের বেতন, দাসদাসীদের বেতন প্রভৃতি মন্থরা নিজহস্তে দিত, বিভিন্ন নগরে গ্রামে বাসগৃহের ভাটকস্বরূপ যেখানেই শতাধিক রৌপ্যমুদ্রা ব্যয় করিতে হইত সেখানেই উচ্ছিখের হস্তে অর্থ দিয়া অবগুণ্ঠনবতী মন্থরা স্বয়ং উপস্থিত থাকিত। কার্যতঃ সমস্ত পরিশ্রম উচ্ছিখই করিত, পারিশ্রমিকস্বরূপ সুখাদ্য এবং সেবাও পাইত, কিন্তু পরনির্ভরশীল হইয়া এরূপ দিনপাত মাঝে মাঝে তাহার ভালো লাগিত না, সে গৃহে ফিরিবার জন্য চঞ্চল হইত। বুদ্ধিমতী মন্থরা যখনই তাহার এইরূপ মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করিত তখনই বল্গারজ্জু শিথিল করিত, দিনকয়েক তাহাকে নির্বিচারে ব্যয় করিতে এবং বিলাসিতার স্রোতে ভাসিতে দিত, আদরে-সোহাগে তাহাকে আবার বশ করিয়া ফেলিত। এইরূপে তাহারা ক্রমে ক্রমে উত্তরভারতের বহু প্রসিদ্ধ তীর্থ ও নগর দর্শন করিল, কিন্তু দুর্গম পার্বত্য পথে কোনও তীর্থদর্শনে যাইতে মন্থরার আগ্রহ দেখা গেল না। অপরপক্ষে যখন যে নগরে উপস্থিত হইত সেখানেই মন্থরা স্থানীয় শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদিগের নিকট যাতায়াত করিয়া নিজ কুব্জভার মোচন ও জরামুক্তির জন্য সহায়তা চাহিত। মধুরানগরে মহর্ষি অগ্নিবেশের শিষ্য বিখ্যাত শস্ত্রচিকিৎসক আচার্য লোকপাল তাহার দেহে কঠিন অস্ত্রোপচার করিলেন, তাহার পৃষ্ঠের অস্থি-মাংস কাটিয়া, মেরুদণ্ডের বক্রতা ঘুচাইয়া তাহাকে কুৎসিত কুব্জের ভার হইতে মুক্তি দিলেন, তাহাকে যেন নবজন্ম দান করিলেন। তিনমাস শয্যাগতা থাকিয়া মন্থরা যেদিন তাঁহার আরোগ্যশালা হইতে নির্গত হইল সেদিন তাহার আনন্দ আর ধরে না। হিমালয় পাদদেশে মায়া অর্থাৎ কনখল নগরে মহর্ষি বিদিতের প্রদত্ত পার্বত্য ভেষজ সেবন এবং অঙ্গে মর্দন করিয়া মাত্র দুইমাসের মধ্যে তাহার সর্বাঙ্গের লোল-কুঞ্চিত চর্ম বহুলাংশে বলিরেখাহীন হইল, তাহার গাত্র ও বর্ণ উজ্জ্বল এবং ত্বক্ কোমল সুখস্পর্শ হইল, কেশরাশি কুঞ্চিত, দীর্ঘ এবং ভ্রমরকৃষ্ণবর্ণ হইল। এইরূপে তাহারা যতই নগর হইতে নগরান্তরে যাইতে লাগিল ততই মন্থরার দেহের অদ্ভুত পরিবর্তন হইতে লাগিল। অতঃপর পিতামহী ক্রমে পিতৃস্বসা ও তাহার পর জ্যেষ্ঠা ভগ্নী হইলেন, কারণ উচ্ছিখও মায়ানগরে অবস্থানকালে মন্থরার অগোচরে সঞ্চিত অর্থে গোপনে চিকিৎসা করাইয়া দেহের কিছু উন্নতিবিধান করিয়াছিল, তাহাকে এখনও মন্থরার চেয়ে কিছু বয়ঃকনিষ্ঠ বোধ হইত। মন্থরা অতঃপর কেকয়রাজধানীতে প্রবেশ না করিয়া তদুত্তরস্থ তক্ষশিলা নগরে পৌঁছিল। সেখানে জনৈক যবন দন্তচিকিৎসক তাহাকে দুই পংক্তি কৃত্রিম দত্ত নির্মাণ করিয়া দিলে সেইগুলি পরিয়া সে বহুদিন পরে মাংস ভক্ষণ করিল। তাহার অবনমিত কপোলদ্বয় যুবতী-জনোচিত না হইলেও অনেকটা পূর্ণতালাভ করিল। মন্থরা সেই কৃত্রিম দন্তবিকাশ করিয়া সুদর্শন যবন-বণিক্‌ অংতিওকসের সহিত ঘনিষ্ঠতা করিতে গিয়াছিল, কিন্তু তাহার সুন্দরী পত্নী কাসাণ্ড্রার নিকট রূপের প্রতিযোগিতায় পরাস্ত হইয়া মনোদুঃখে তক্ষশিলা পরিত্যাগ করিল। মন্থরা অবশ্য সে-কথা স্বীকার করিত না, তক্ষশিলায় ছলনাময়ী গন্ধর্ব এবং যবনীদের মোহপাশে পড়িয়া পাছে তাহার বুদ্ধিহীন অপোগণ্ড কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি গুপ্তঘাতকের হস্তে প্রাণ দেয় এই ভয়েই যেন সে সেখান হইতে প্রত্যাবর্তনের অভিপ্রায় জানাইল। অতঃপর তাহারা আরও নানাস্থানে ভ্রমণ করিয়া মালবের রাজধানী অবন্তী নগরে উপস্থিত হইল। অবন্তী সে-সময়ে অতিশয় শোভাবর্তী সৌধ-কিরীটিনী নগরীশ্রেষ্ঠ ছিল। তাহার সুবিভক্ত শতশত মহাপথ ও উপপথসমূহ সহস্র সহস্র বিপণিতে শোভিত ছিল। পৃথিবীর নানা দিগ্‌দেশ হইতে সেখানে পণ্যভারবাহী উষ্ট্র, অশ্বতর ও বলদাদি পশুসহ বণিকেরা যাতায়াত করিত, অবন্তীর শ্রেষ্ঠী এবং মণিকারদের নিকট মন্থরা একে একে তাহার বহু মণি-মাণিক্য বিক্রয় করিল এবং বিক্রয়লব্ধ অধিকাংশ অর্থ নিজ উপাধানতলে রক্ষা করিয়া একাংশ দ্বারাই রাজোচিত সুখে বাস করিতে লাগিল। যে উচ্ছিখ পূর্বে দিবসান্তে ভিন্ন কক্ষে আশ্রয় লইত সেও ইদানীং রাত্রিকালে তাহার নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করিত না। সেই সময়ে একদা শিবিকারোহণে নগরভ্রমণে নির্গতা হইয়া মন্থরা একটি পদ্মপলাশলোচনা দরিদ্রা নারীকে দেখিয়া ঈর্ষায় জ্বলিয়া উঠিল। তাহাকে বর্তমানে কেহ কুৎসিত বলিতে না পারিলেও এখনও তাহাকে অপূর্ব সুন্দরী বলা চলিত না। চক্ষুদ্বয় কোটর প্রবিষ্ট না হইলেও এখনও ক্ষুদ্রাকৃতিই ছিল, নাসিকা ও সূক্ষ্মাগ্র এবং সুন্দর ছিল না। সে শুনিয়াছিল, অবন্তীর রাজবৈদ্য তিলক শস্ত্রোপচার দ্বারা অসাধ্য সাধন করিতে পারেন, তিনি শরীরের এক অংশের ত্বক্ তুলিয়া অন্য অংশে যোজনা করিতে, এক অঙ্গ তুলিয়া অন্য অঙ্গে যুক্ত করিতে, এমন-কি একজনের অক্ষিগোলক তুলিয়া অন্যজনের অক্ষিকোটরে বসাইয়া দিয়া তাহার দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণ্ণ রাখিতে সমর্থ। তাহার নির্দেশানুসারে উচ্ছিখ বৈদ্যরাজের কাছে কিছুদিন যাতায়াত করিয়া তাঁহাকে মন্থরার চিকিৎসার ভার লইতে সম্মত করাইল। তিনি অর্থলোভে এই শস্ত্ৰ-চিকিৎসার সম্মত হইয়া জানাইলেন, একটি সুনাসা, সুলোচনা সদ্যোমৃতা নারীর শবদেহ প্রয়োজন। অর্থসাহায্যে ঐরূপ একটি শবদেহ সংগৃহীত হইল, কিন্তু মৃত্যুর পরমুহূর্তে না পাওয়ায় তদ্‌দ্বারা বৈদ্যরাজের কার্যসিদ্ধি হইল না। তখন মন্থরার আদেশে উচ্ছিখ তাহার পূর্বদৃষ্ট সেই পদ্মপলাশাক্ষী ভিখারিণী উৎপলাকে খুঁজিয়া আনিল। উৎপলার অল্পদিন পূর্বে পতিবিয়োগ হইয়াছে, উত্তমর্ণের তাহার সর্বস্ব কৌশলে অপহরণ করিয়া তাহাকে পথে বাহির করিয়া দিয়াছে। একমাত্র শিশুপুত্র লইয়া, সম্ভ্রান্ত-বংশের কুলকামিনী সে, পথে ভিক্ষা করিতেছিল। ধর্মরক্ষার জন্য রাত্রে একটি দেবায়তনের বৃদ্ধ পুরোহিতের দ্বারপ্রান্তে আশ্রয় লইত। এই অবস্থায় উচ্ছিখ যখন তাহাকে সযত্নে মাতৃসম্বোধন করিয়া ডাকিয়া আনিয়া প্রাসাদোপম অট্টালিকার একটি কক্ষে স্থান দিল, তাহার পুত্রকে মহার্ঘ কৌষেয় বসনে সাজাইয়া স্বর্ণহার পরাইয়া দিল, গৃহস্বামিনী মন্থরা তাহাকে ভগ্নীসম্বোধন করিয়া আলিঙ্গন করিল, তখন সে কৃতার্থা হইয়া গেল। একমাসকাল তাহাকে সসম্মানে পোষণ ও তোষণের পর মন্থরা একদিন তাহার নিকট নিজের অন্তরের অভিপ্রায় জানাইল, তাহার নাসাগ্রভাগ ও চক্ষুর্দ্বয়ের বিনিময়ে সে তাহাকে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা দান করিবে বলিল। উৎপলা প্রথমতঃ ভীতিবিহ্বলা হইয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু মন্থরা যখন এক সহস্রকে দশ সহস্রে তুলিল, অবশিষ্ট জীবন নিরাপদ নৈশ্চিত্যে কাটাইবার এবং পুত্রটিকে মানুষ করিয়া তুলিবার আশায় তখন উৎপলা চক্ষু পরিবর্তনে সম্মতা হইল। অতঃপর মন্থরা অগ্রিম পাঁচসহস্ৰ স্বর্ণমুদ্রা তাহাকে গণিয়া দিল, উচ্ছিখের চেষ্টায় সেই অর্থে নগরবহির্ভাগে একটি সুন্দর ইস্টকনির্মিত গৃহ তাহাকে সাজাইয়া দেওয়া হইল; তখন উৎপলা সানন্দে একদিন সন্ধ্যাকালে শস্ত্রচিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হইল। প্রথমতঃ তাহার নাসিকাগ্রভাগ কাটিয়া লইয়া বৈদ্যরাজ মন্থরার ছেদিতাগ্র নাসিকার সহিত যুক্ত করিলেন এবং মন্থরার নাসিকাগ্রভাগ তাহার ছেদনাবশিষ্ট নাসিকায় যুক্ত করিলেন। অতঃপর উভয়ের নাসিকা ঔষধলিপ্ত ও বস্ত্রজড়িত করিয়া তিনি উভয়ের চক্ষুগোলক উৎপাটন করিলেন। উৎপলার চক্ষুগোলক অবিলম্বে মন্থরার অক্ষিকোটরে প্রবিষ্ট করাইয়া উহা সম্যকরূপে যোজিত করা হইল, কিন্তু তাহার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় হওয়ায় উৎপলার অক্ষিকোটরে মন্থরার চক্ষুগোলক প্রবিষ্ট করাইতে বিলম্ব হইয়া গেল, ফলে সে চক্ষু লাভ করিলেও সে-চক্ষুতে দৃষ্টিলাভ করিল না। বৈদ্যরাজ সাধ্যমত চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কোনও ফল হইল না। দুইমাস পরে ক্ষতচিহ্ন মিলাইয়া গেলে, পাশাপাশি দুই পর্যঙ্ক হইতে দুই নারী যখন রোগশয্যা ছাড়িয়া উঠিল তখন একজন পরম রূপবতী আর একজন বিকৃতনাসা অন্ধ। মন্থরার যে দাসী ঐ সময়ে তাহাকে ছাড়িয়া গিয়াছিল, সে বলে, মন্থরা এজন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হয় নাই, উৎপলার অন্ধ নয়নের দিকে চাহিয়া সে বিজয়িনীর হাসি হাসিত। সেই দৃশ্য সহ্য করিতে না পারিয়া সে উৎপলার সঙ্গে তাহার গৃহে চলিয়া যায়। কিন্তু মন্থরার মতে সে উৎপলার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করিয়া তাহার অসুস্থতার সময়ে তাহার উপাধানতলস্থ অর্থ অপহরণে উদ্যতা হইয়াছিল, উচ্ছিখের নিকট ধরা পড়িয়া যাওয়ায় তাহাকে এবং উৎপলাকে বিদায় দেওয়া ছাড়া তাহাদের আর গত্যন্তর ছিল না। বলা বাহুল্য, উৎপলার অকৃতজ্ঞতায় বিরক্ত হইয়া সে তাহার প্রাপ্য বাকী পঞ্চসহস্র মূদ্রা আর দেয় নাই। উৎপলার কোনও লিখিত প্রমাণপত্রী না থাকায় সে রাজদ্বারে বিচার প্রার্থনা করিতে পারে নাই, তাহার কোনও সহায়সম্বলও ছিল না। গৃহক্রয়ের পর যে অর্থ বাকী ছিল তাহার সাহায্যে সে মন্থরার পূর্বোক্তা দাসীর সহায়তায় পুত্রটিকে মানুষ করিয়া তুলিতে চেষ্টিতা হইল। চিরঞ্জীব বলিল, “দিদি, কাজটা ভালো হইল না।” তৃষ্ণা বলিল, “ভ্রাতঃ, অর্থ বাঁচিলে তোমারই থাকিবে, আমি আর কয়দিন?”

এদিকে মন্থরা নূতন নেত্র লাভ করিয়া দেখিল, উজ্জয়িনীতে পুরুষের অভাব নাই। সে এতদিন শিবিকায় জালাবরণ না দিয়া বাহির হইত না, সম্প্রতি প্রকাশ্যে রথারোহণে ভ্রমণ করিতে এবং যত্রতত্র অপাঙ্গ-ইঙ্গিতে পথিকজনের চিত্তবিভ্রম ঘটাইতে লাগিল। সে যতদিন লজ্জাশীলা পুরস্ত্রীর মতো ছিল ততদিন কোনো বিপদ হয় নাই, কিন্তু সম্প্রতি তাহার হাবভাবে তাহাকে কোনও নবাগতা রূপবতী বারাঙ্গনা বিবেচনায় অবন্তীর অর্থবান্ নাগরিকেরা চঞ্চল হইয়া উঠিল, দিনে রাত্রে তাহার নিকট পত্র এবং দূত পাঠাইতে লাগিল, কেহ বা সশরীরে আসিয়া তাহার প্রসাদ ভিক্ষা করিতে লাগিল। উচ্ছিখ বিপদ গণিল। বৈদ্যরাজ তিলকের নিকট যাতায়াতকালে সে একদিন তাঁহার গৃহে শ্রেষ্ঠী সোমদত্তকে দেখিয়াছিল । ঐ শ্রেষ্ঠীর পত্নী অত্যন্ত কলহপ্রিয়া ছিলেন, শ্রেষ্ঠীকে অন্য কোনো রমণীতে অনুরক্তা জানিয়া একদিন তিনি রোববশে নিদ্রিত স্বামীর কর্ণাংশ ছেদন করিয়াছিলেন; বৈদ্যরাজের সাহায্যে শ্রেষ্ঠী সোমদত্ত অবশ্য আবার কর্ণলাভ করেন, কিন্তু তাঁহার দুর্নাম যায় নাই। সেই শ্রেষ্ঠীকে একদিন মন্থরার প্রসাদপ্রার্থনায় সমাগত দেখিয়া উচ্ছিখের মস্তকে দুর্বুদ্ধির উদয় হইল। শ্রেষ্ঠিপত্নীকে গিয়া সংবাদ দিল, তাঁহার স্বামী তৃষ্ণানাম্নী নবাগতা সুন্দরীর গৃহে যাতায়াত করিতেছেন। শ্রেষ্ঠিপত্নী তৎক্ষণাৎ একটি ছুরিকাহস্তে রথারোহণ-পূর্বক তৃষ্ণা, তথা মন্থরার গৃহে উপস্থিত হইলেন। উচ্ছিখ তাঁহাকে দূর হইতে গৃহ দেখাইয়া দিয়া রথ হইতে নামিয়া পথে দাঁড়াইয়া রহিল। সোমদত্ত সে-সময়ে মন্থরার প্রাসাদদ্বারসম্মুখস্থ অতিথি আপ্যায়নকক্ষে তাহার দর্শনাশায় বসিয়াছিলেন, বাতায়নপথে স্বীয় পত্নীকে সম্মুখস্থ পথে রথ হইতে অবতরণ করিতে দেখিয়া তিনি দ্রুতবেগে ঐ কক্ষের পশ্চাদ্বার দিয়া পলায়ন করিলেন। গ্রীষ্মবশতঃ তিনি উত্তরীয় এবং পাদুকা উন্মোচন করিয়াছিলেন, তাহা আর লইবার সময় হইল না। শ্রেষ্ঠিপত্নী বামাক্ষীও পথ হইতে স্বামীকে দেখিয়াছিলেন, তিনি কক্ষে প্রবিষ্টা হইয়া যখন দেখিলেন সোমদত্ত পলায়ন করিয়াছেন, তখন তাহার উত্তরীয় এবং পাদুকা তুলিয়া লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন এবং দ্রুতপদে দ্বিতলে আরোহণ করিলেন। সেখানে গৃহস্বামিনীকে না পাইয়া ত্রিতল অতিক্রম পূর্বক চতুর্থতলে একটি কক্ষে সখীপরিবৃতা মন্থরার দর্শন পাইলেন। মন্থরা রণচণ্ডীরূপিণী শ্রেষ্ঠিগৃহিণীকে দেখিয়া বিস্মিতা হইয়া কহিল, “তুমি কে? কি চাও? সংবাদ না দিয়া উপরে আসিলে কেন?”

বামাক্ষী কোনও কথার উত্তর না দিয়া কহিলেন, “তুমিই তৃষ্ণা? তুমিই আমার মূঢ় স্বামী সোমদত্তের মস্তক চর্বণ করিতেছ? পাপীয়সী ডাকিনী, তুই কালসর্পকে লইয়া ক্রীড়া করিতেছিস্, তোর জীবনের ভয় নাই?” সখীরা কোলাহল করিয়া উঠিয়া পড়িল, কেহ “দৌবারিক, দৌবারিক” বলিয়া ডাকিতে লাগিল, কেহ অন্যান্য ভৃত্যর নাম ধরিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। মন্থরা ততক্ষণে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে, ক্রোধে আরক্তলোচনা হইয়া বলিল, “তুমি অবিলম্বে যদি স্থানত্যাগ না করো, তবে আমার ভৃত্যগণ তোমাকে অপমান করিয়া তাড়াইবে।” বামাক্ষী নীবিবন্ধ হইতে ছুরিকা কোষমুক্ত করিয়া বলিলেন, “তৎপূর্বে আমি তোর নাসিকাকর্ণ ছেদন করিয়া তোর চক্ষুদ্বয়ে ছুরিকা দ্বারা উৎপাটন করিয়া যাইব, যাহাতে ভবিষ্যতে তুই আর কোনও নারীর সংসার ভাঙিতে না পারিস তাহার ব্যবস্থা করিয়া যাইব।” বলিতে বলিতে সে দ্রুতবেগে আসিয়া মন্থরাকে আঘাত করিল, মন্থরা সশব্দে গৃহকুট্টিমে পড়িয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, “রক্ষা করো, রক্ষা করো। উচ্ছিখ, উচ্ছিখ, কোথায় তুমি?” স্বামীর অতি-আধুনিক নাম ‘চিরঞ্জীব’ ভয়বিহ্বলতাবশতঃ সে বিস্তৃত হইয়াছিল।

বামাক্ষী ততক্ষণে তাহার বক্ষে মুখে উদরে পাদপ্রহার করিতে করিতে গর্জন করিতেছেন, “কুলটা, রূপ দেখাইয়া তুই গৃহস্থনারীর সর্বনাশ করিস, আজ তোর নাসাচ্ছেদন না করিয়া আমি জলগ্রহণ করিব না, দেখি তোর কোন্ প্রণয়ী আজ তোকে রক্ষা করে।” সখীরা যে কেহ অগ্রসর হইতে যায় সেই তাহার ছুরিকা আস্ফালন দেখিয়া পশ্চাৎপদ হয়। এমন সময় উচ্ছিখ ব্রাহ্মণ দ্রুতপদে কক্ষে প্রবেশ করিল এবং নতজানু হইয়া করপুটে বলিল, “মাতঃ, আপনি আমার পত্নীর প্রাণভিক্ষা দিন।”

বামাক্ষী উচ্ছিখকে চিনিতে পারিয়াছিলেন, সবিস্ময়ে বলিলেন, “কে তোমার পত্নী? এই কুলটা?” উচ্ছিখ বলিল, “তৃষ্ণা কুলটা নহে, তাহার পদস্খলন হইবার উপক্রম হইয়াছিল বটে, কিন্তু আপনি তাহার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করিয়া দিয়াছেন। সে আর কাহাকেও প্রলুব্ধ করিবে না, আপনার স্বামীকে তো নয়ই। আমি আপনার মঙ্গলকামনায় পথ দেখাইয়া আপনাকে গৃহে আনিয়াছি, এখন শরণাগত আমাকে গৃহশূন্য করিবেন না।”

বামাক্ষী তখনও ক্রোধে কম্পিতা হইতেছিলেন। ধীরে আত্মসংবরণ করিয়া তিনি উচ্ছিখকে উদ্দেশ করিয়া মন্থরার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “আমি অদ্যকার মতো তোমার পত্নীকে ক্ষমা করিলাম, আর দ্বিতীয়বার করিব না। সাতদিন সময় দিলাম, ইহার মধ্যে তোমরা অবন্তী ত্যাগ করিবে। যদি না করো, তবে অষ্টমদিনে স্বয়ং ইন্দ্রও তোমার পত্নীকে রক্ষা করতে পারিবেন না জানিয়ো। আমার মূর্খ স্বামী পলায়ন করিয়াছে, তাহার এই উত্তরীয় এবং পাদুকা তোমার গৃহে পাইয়াছি। আমার স্বামীকে গুপ্তকক্ষে রুদ্ধ রাখিয়া আমি রাজদ্বারে জানাইব, তুমি তোমার পত্নীর সাহায্যে অর্থলোভে তাহাকে গোপনে হত্যা করিয়াছ। নগরপাল আমার আত্মীয়, বহু রাজসভাসদ আমার আপন-জন, তোমাদের প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা আমার পক্ষে অসাধ্য হইবে না। তৎপূর্বে ঐ পাপীয়সীর নাসাকর্ণ ছেদন এবং চক্ষু উৎপাটন করিয়া আমি উহার মতো সমস্ত কুলটাকে শিক্ষা দিব, যাহাতে তাহারা ভবিষ্যতে মূর্খ গৃহস্থদের ভুলাইবার চেষ্টা করিবার পূর্বে উহার শাস্তি চিন্তা করিয়া সাবধান হয়।”

বামাক্ষী পদশব্দে গৃহকুট্টিম কম্পিত করিয়া বিদায় লইলেন, কেহ তাঁহাকে কিছু বলিতে সাহস করিল না। তখন মন্থরা অঙ্গ হইতে ধূলি মার্জনা করিয়া উঠিয়া বসিল, গলদশ্রুনয়নে বলিল, “ধিক্ আমার অর্থে, ধিক্ তোমার মতো স্বামীকে। একটা উন্মাদিনী স্ত্রীলোকের নিকট আমি অপমানিতা হইলাম, তোমরা কেহ তাহাকে শাস্তি দিতে পারিলে না? তুমি আবার এমনই ভীরু যে পুরুষ হইয়া ঐ দুর্বৃত্তার নিকট দয়া ভিক্ষা করিলে, তাহার সমস্ত অসঙ্গত প্রস্তাব মানিয়া লইলে! এখন আমি যদি না যাই—তবে ঐ রাক্ষসী কী করিতে পারে? আমি দ্বারে দশজন সশস্ত্র প্রহরী নিযুক্ত করিব, আমি রাজদ্বারে সাহায্য প্রার্থনা করিব।”

উচ্ছিখ বলিল, “তৃষ্ণা, তুমি আমার প্রতি ক্রুদ্ধা হইয়াছ, কিন্তু ভাবিয়া দেখ, তখন আমার গতান্তর ছিল না। উন্মাদিনী শ্রেঠিপত্নী তোমার বক্ষে পদ স্থাপন করিয়া দণ্ডায়মানা ছিল, আমি বলপ্রয়োগে তাহাকে বাধা দিতে গেলে সে বিদ্যুদ্বেগে হয় তোমার কণ্ঠে পদাঘাত করিয়া তোমাকে শ্বাসরুদ্ধ করিয়া হত্যা করিত, না হয় করধৃত ছুরিকা আমূল তোমার চক্ষে বসাইয়া দিত বা তোমার নাসিকা ছেদন করিত। এই অবস্থায় আমার ধৈর্যধারণ না করিয়া উপায় ছিল না। তারপর তাহার নির্দেশ পালন সম্বন্ধে আমার সম্মতিদান তোমার অপ্রিয় হইয়াছে বুঝিতেছি, কিন্তু উপায় কি ছিল? তুমি আমি এ-নগরীতে নূতন আসিয়াছি, আমাদের সহায় বলিতে অর্থ। একমাস বেতন না পাইলে ভৃত্যেরা এবং পরিচারিকারা ছাড়িয়া যাইবে, অধিকতর অর্থ পাইলে তাহারা আমাদেরই বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিবে। তুমি শুনিলে, নগরপাল এবং রাজপুরুষেরা শ্রেষ্ঠিজায়ার আত্মীয়, এ ক্ষেত্রে তাহার সহিত বিবাদ করিয়া এখানে অধিক দিন থাকা নিরাপদ নয়। তুমি বহু কষ্টে বহু-সাধনায় বর্তমান রূপলাবণ্য লাভ করিয়াছ, কখন কোন্ অসতর্ক মূহূর্তে এক উন্মাদিনীর আক্রমণে তাহা হারাইবে তাহার নিশ্চয়তা নাই। কাজ কি বিবাদে? উজ্জয়িনী ছাড়া কি নগর নাই, না সেখানে মানুষ বাস করে না?”

মন্থরা মনে মনে অত্যন্ত বিরক্ত হইলেও উচ্ছিখের কথার যুক্তিযুক্ততা স্বীকার করিল। সে প্রাসাদস্বামীর প্রাপ্য ভাটক শোধ করিয়া দাসদাসীদিগকে বিদায় দিয়া একদিন রাত্রিকালে নিঃশব্দে অযোধ্যা-হইতে-আনীত তাহার সেই শিবিকাযোগে অবন্তী ত্যাগ করিল, উষ্ণীষপরিহিত সুবেশ উচ্ছিখ অশ্বপৃষ্ঠে তাহাকে অনুসরণ করিল; বহু অশ্ব, অশ্বতর, উষ্ট্রবলদাদি পশু তাহাদের গৃহসজ্জা এবং মূল্যবান্ তৈজসপত্রাদি বহন করিয়া চলিল।

মন্থরা এখন সুন্দরীপদবাচ্যা, উচ্ছিখেরও সুপুষ্ট সুন্দর দেহ দেখিয়া কাহারও তাহাকে অতীতের সেই ভিক্ষান্নভোজী পুরোহিত ব্রাহ্মণ বলিয়া চিনিবার উপায় ছিল না। গঙ্গাযমুনার সঙ্গমস্থলে প্রতিষ্ঠান নগরে প্রবেশ করিবার পূর্বেই মন্থরার বিরাগ বিদূরিত হইয়াছিল, প্রয়াগে স্নান করিয়া তাহারা নগরপ্রান্তে একটি ক্ষুদ্র দ্বিতল গৃহ ভাড়া করিয়া কপোত-কপোতীর মতো আনন্দে বাস করিতে লাগিল এবং নিত্য নানা সাধু দর্শন করিতে লাগিল। প্রয়াগের অনতিদূরে মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রম ছিল, অতীতে একদা সেখানে অতিথি হইয়া কৈকেয়ী এবং ভরত অনেক অলৌকিক ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। মন্থরা উচ্ছিখের সহিত সে তাঁহার সেখানে গিয়া শুনিল মুনিবর তপস্যার্থ হিমালয়ে গমন করিয়াছেন। শিষ্য আয়ুর নিকট কথা প্রসঙ্গে জানিতে পারিল, মহর্ষি চারণের শিষ্য সুরসেননামক যে বৈদ্যপ্রবর পুরাকালে চন্দ্রবংশীয় নৃপতি খ্যাতির জরাজর্জর দেহে তাঁহার যুবক পুত্র পুরুর সঙ্গে গলগ্রন্থি সংযুক্ত করিয়া তাঁহার যৌবন ফিরাইয়া দিয়াছিলেন সেই দীর্ঘজীবী বৈদ্যরাজ তখনও জীবিত আছেন। যযাতির যৌবনলাভের গল্প মন্থরা পূর্বে রামচন্দ্রের মুখে শুনিয়াছিল, এক্ষণে সহসা তাহার আকাঙ্ক্ষা হইল সেও নবযৌবন লাভ করিবে। যতই সুন্দরী হউক, কেহ তাহাকে দেখিয়া সে-সময়ে চত্বারিংশ বর্ষের নিম্নবয়স্কা বলিয়া মনে করিত না, ইহাতে তাহার মনে শান্তি ছিল না। সে বৃদ্ধ বৈদ্যরাজ সুরসেনের নিকট নানা আহার্য-পানীয় লইয়া যাতায়াত করিতে লাগিল, দাসীর মতো তাঁহার গৃহমার্জনা, রন্ধন ও পদসেবা করিতে লাগিল, উচ্ছিখও ভক্তিবশতঃ ভৃত্যবৎ তাঁহার আদেশপালনে তৎপর রহিল। সুরসেন প্রথমতঃ মন্থরার কামনা জানিয়া বহু আপত্তি করিয়াছিলেন, ঈশ্বরের বিধানের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হওয়া অপরাধ বলিয়া নিজের অক্ষমতা জানাইয়াছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মন্থরার নির্বন্ধাতিশয্যে তিনি একবার চেষ্টা করিয়া দেখিতে সম্মত হইলেন। মন্থরা অতঃপর উচ্ছিখকে বলিল, “প্রাণনাথ, একটি পূর্ণযৌবনা যুবতী ভিখারিণী সংগ্রহ করিতে হইবে, যে স্বেচ্ছায় তাহার গলগ্রন্থিতে শস্ত্রোপচার করিতে দিতে সম্মতা হইবে। এ-জন্য যত অর্থের প্রয়োজন তাহা আমি ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছি। অবন্তীতে উৎপলাকে তুমিই আনিয়াছিলে, এ-বিষয়ে তোমার অভিজ্ঞতা আছে। অদ্যই কাজে লাগিয়া যাও, এক সপ্তাহের মধ্যে শস্ত্রোপচার হওয়া চাই। বৈদ্যরাজ অর্থের বশীভূত নহেন, তাঁহার নিকট ঐ নারী নিজমুখে বলিবে, সে আমার আত্মীয়া, স্বেচ্ছায় আমার জরা গ্রহণ করিয়া সে আমাকে যৌবন দান করিতেছে। এরূপ স্বীকৃতি না পাইলে বৈদ্যরাজ কিছুই করিবেন না।” উচ্ছিখ উৎপলার ব্যাপারে অনুতপ্ত ছিল, বলিল, “প্রিয়ে তৃষ্ণা, তোমার তৃষ্ণার কি বিরাম নাই? আমি ভাবিয়াছিলাম দীর্ঘায়ু মহাপুরুষের সেবা করিয়া তুমি পুণ্যলাভ করিতেছ। আবার একটি হতভাগিনী নারীর সর্বনাশ না করিলে — মহাপাপ না করিলে— চলিতেছে না? ” মুক্তাপাণ্ডু কৃত্রিম দন্তপংক্তি ঈষৎ বিকশিত করিয়া আয়তলোচনে কটাক্ষ হানিয়া মন্থরা বলিল, “প্রিয়তম, এতদিনে বুঝিলাম, তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না। নচেৎ আমার রূপযৌবন বৃদ্ধিতে তুমি আনন্দিত হইবে না কেন? নারীর যৌবন পতির সুখের জন্য—তাহা কি তুমি জানো না? তদ্ভিন্ন তুমি পাপের ভয় করিতেছ কেন? দ্রব্য মূল্য দিয়া ক্রয় করিলে পাপ হয় না, আমরা যাহার যৌবন ক্রয় করিব তাহার চিরজীবনের জন্য অর্থচিন্তা থাকিবে না। যাও, অবিলম্বে ব্যবস্থা করো।” উচ্ছিখকে আর কথা বলিতে না দিয়া মন্থরা দ্রুত আসিয়া তাহাকে বাহু বেষ্টনে বদ্ধ করিল, চুম্বনে চুম্বনে তাহাকে বিহ্বল করিয়া দিল, তাহার পর তাহাকে আদেশ পালন করিতে পাঠাইল। উচ্ছিখ আর দ্বিরুক্তি না করিয়া পথে বাহির হইল এবং অচিরে চন্দনানাম্নী একটি দরিদ্রা নারীকে সংগ্রহ করিয়া আনিল। চন্দনা অষ্টাদশী, অবিবাহিতা, অর্থাভাবে তাহার দরিদ্র পিতা তিনজন পুত্রকন্যা ও পত্নীসহ উপবাসী ছিলেন, যুবতী তাহাদের জন্য ভিক্ষা করিতে বাহির হইয়াছিল, একটি রৌপ্যমুদ্রা দিয়া উচ্ছিখ তাহাকে বিস্মিত করিল। তাহার গৃহ দেখিয়া তাহার ভ্রাতা, ভগ্নী ও মাতা-পিতাকে জীর্ণ-বস্ত্রের পরিবর্তে নববস্ত্ৰ দিয়া, তাহাদের মাসাধিককালের উপযোগী আহার্য কিনিয়া দিয়া উচ্ছিখ সমস্ত পরিবারটিকে একদিনের মধ্যে বশ করিয়া ফেলিল। অতঃপর কয়েকদিন যাতায়াত করিতে করিতে সে একদিন চন্দনার পিতার নিকট মন্থরার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিল। সহস্র স্বর্ণমূদ্রার বিনিময়ে চন্দনার পিতা কন্যার গলগ্রন্থিতে শস্ত্রোপচার করিতে দিতে সম্মত হইলেন, পরিবারের মুখ চাহিয়া চন্দনাও সেই প্রস্তাবে সম্মতা হইল। সে বৈদ্যরাজের নিকট মিথ্যা পরিচয় দিল, আত্মীয়ার জন্য স্বেচ্ছায় জরা লইতেছে বলিয়া জানাইল। আবার সেই পূর্বের ঘটনার পূনরাবৃত্তি, আবার শস্ত্রোপচার, আবার পাশাপাশি দুইটি পর্যঙ্কে দুইটি নারীর সেবাশুশ্রূষা। অদ্ভুত কথা, বৈদ্যরাজ চন্দনার গলগ্রন্থি মন্থরার গলদেশে যুক্ত করিতেই প্রৌঢ়া নারী সহসা অষ্টাদশীতে পরিণত হইল, মন্থরার গলগ্রন্থি লাভ করিয়া কিন্তু যুবতী চন্দনা প্রৌঢ়া হইল না, মন্থরার বহুসাধনালব্ধ কৃত্রিম বয়স উত্তীর্ণ হইয়া সে তাহার প্রকৃত রূপ, শুক্লকেশা জরতীর রূপ ধারণ করিল। শস্ত্রচিকিৎসার ক্ষতচিহ্ন মিলাইয়া যাইবার পর চন্দনা তাহার বলিরেখাঙ্কিত মুখ দর্পণে দেখিয়া কাঁদিয়া ফেলিল, কম্পিত হস্তে যষ্টি ধারণ করিয়া সে যখন গৃহত্যাগ করিল তখন উচ্ছিখ অনুতাপানলে দগ্ধ হইয়া তাহাকে প্রতিশ্রুত অর্থের অপেক্ষা একশত স্বর্ণমুদ্রা নিজের সঞ্চয় হইতে অধিক দিয়া রথে তুলিয়া দিল, ভবিষ্যতে কোনো সহায়তা প্রয়োজন হইলে জানাইতে বলিল।

চার ❀ মন্থরাহরণ ❀ এডুলিচার পাঠশালা