মন্থরাহরণ

আট

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

সন্ধ্যার অন্ধকারে কাশীরাজ সুপর্ণ আদিকেশবের মন্দিরে প্রণাম করিয়া পাষাণসোপানশ্রেণী অতিক্রমপূর্বক অন্তঃপুরিকাদের সহিত নৌকারোহণ করিলেন। রাজ্য নিরুপদ্রব, প্রজাগণ রাজভক্ত। বারাণসীর গঙ্গায় কত প্রমোদতরণী তখন কতদিকে চলিয়াছে, তাহার মধ্যে বৈশিষ্ট্যহীন একটি কাঠময় নৌকায় পল্লীজন সুলভ বেশভূষায় সজ্জিত রাজপরিবারকে কাহারও কাহারও লক্ষ করিবারই কথা নহে, সুতরাং বিপদের কোনও সম্ভাবনা সুপর্ণের কল্পনারও অগোচর ছিল। তরণী অগ্রসর হইয়া চলিল, মহিষীরা এবং তাঁহাদের সখীরা পর্যায়ক্রমে ক্ষেপণী চালনা করিতে লাগিলেন, কাশীরাজের বংশী সুললিত স্বরে বাজিতে লাগিল।

তখন নদীতীরস্থ প্রাসাদসমূহে কোথাও দীপ জ্বলিয়াছে, কোথাও জ্বলে নাই। সোপানশ্রেণীর ঊর্ধ্বে প্রশস্ত পাষাণময় চত্বরগুলিতে শত শত নরনারী উপবিষ্ট হইয়া কোথাও পুরাণকথা শুনিতেছে, কোথাও গীতবাদ্য করিতেছে। কোথাও সোপানশ্রেণীতে দাঁড়াইয়া স্নানার্থীরা গল্প করিতেছে বা স্তবপাঠ করিতেছে, কোথাও কেহ নীরবে ধ্যান করিতেছে। প্রতি ঘট্টে বহু পুণ্যার্থী গৃহস্থ ও সাধুসন্ন্যাসী সন্ধ্যাস্নান করিতেছেন। নৃপতির প্রমোদতরণী যেখানেই কোনও ঘট্টের সমীপস্থ হইতেছিল, সেখানেই পাঠ ভুলিয়া, ধ্যান ভুলিয়া, স্নান ভুলিয়া তীরস্থ এবং জলমধ্যস্থ নরনারী উৎকর্ণ হইয়া তরণীস্থ গুণিমুরলীনিঃসৃত বেণুরব শুনিতেছিল। নৌকা ক্রমে মণিকর্ণিকার নিকট আসিলে দেখা গেল, গঙ্গাতীরে দুইটি চিতা জ্বলিতেছে, তাহাদের উজ্জ্বল আলোক গঙ্গাতরঙ্গে প্রতিফলিত হইয়া বহুদূর পর্যন্ত আলোকিত করিয়া তরল অনলবৎ প্রতীয়মান হইতেছে। মৃতব্যক্তিদের আত্মীয়েরা সেই চিতাগ্নির চারিদিকে ছায়ামূর্তির মতো বসিয়াছিল। সেইদিকে চাহিয়া কাশীরাজ সহসা বিমনা হইয়া গেলেন, তাঁহার বংশী থামিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপণী-চালিকারাও ক্ষেপণী-ক্ষেপণে ক্ষান্তি দিলেন। আনন্দের মধ্যে যেন অকল্যাণের ছায়া পড়িল। সকলেই অন্যমনস্ক, সকলেরই মন সাময়িক বিষাদভারাতুর, এমন সময়ে সহসা কে যেন গঙ্গাজলের মধ্য হইতে মাথা তুলিয়া রাজাকে লক্ষ্য করিয়া একটি দীর্ঘ রজ্জুপাশ নিক্ষেপ করিল। পরক্ষণেই নৌকার দুই-পার্শ্ব হইতে দুইজন ভীষণাকার সস্তরণকারী লম্ফ দিয়া তরণীমধ্যে উঠিয়া দাঁড়াইল। তন্মধ্যে এক জনের রজ্জুপাশ তৎপূর্বেই রাজার বক্ষঃস্থলের নিকট দুই-বাহুকে আবদ্ধ এবং অক্ষম করিয়া দিয়াছিল, সে এখন তাঁহার সর্বাঙ্গ দ্রুতহস্তে সেই রজ্জু দ্বারা জড়াইয়া বাঁধিতে লাগিল, আর একজন কৌপীন-মাত্র-পরিহিত ঘোরাকৃতি আততায়ী উন্মুক্ত-তরবারি হস্তে তাঁহার বক্ষ লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইল। নিমেষ-মধ্যে এই দুর্ঘটনা ঘটিল। রাজা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া প্রস্তরমূর্তিবৎ বসিয়া রহিলেন, প্রধানা মহিষী এবং অন্য কয়েকজন ভীতিচকিত হইয়া দুই-হস্তে মুখ ঢাকিলেন, সখীরা দুইজন এবং রাজমহিষী সুপ্রিয়া আর্তস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিলেন। ততক্ষণে কালিন্দী নিঃশব্দে অকুতোভয়ে দুইহস্তে দীর্ঘ ক্ষেপণীটি তুলিয়া আততায়ীদিগকে আক্রমণ করিয়াছেন। তাঁহার ক্ষেপণীর প্রচণ্ড আঘাত মস্তকে পড়িতেই একজন আক্রমণকারী ‘বাপ’ বলিয়া ঘুরিয়া নদীজলে পড়িয়া গেল। ক্ষেপণীর দ্বিতীয় আঘাত অপর-ব্যক্তির বাহুতে লাগিতেই তাহার করধৃত তরবারি সশব্দে নৌকাবক্ষে পড়িয়া গেল, পৃষ্ঠদেশে আর একটি আঘাত সহ্য করিয়া সে ঝপাৎ‍ করিয়া জলে লম্ফপ্রদান করিল। নারীকণ্ঠের আর্তনাদ শুনিয়া তীর হইতে কয়েকজন স্নানার্থী দ্রুত সন্তরণ করিয়া আসিল, চারিদিকে আততায়ীদের সন্ধান করিল, কিন্তু কাহাকেও কোথাও পাওয়া গেল না। অন্ধকারের মধ্যে দুঃস্বপ্নের মতো আসিয়া কয়েক-নিমেষের মধ্যেই তাহারা আবার যেন অন্ধকারেই মিলাইয়া গেল। কাশীরাজও নিজ পরিচয় প্রকাশের ভয়ে তখন রাজপুরুষদের কাহাকেও ডাকিয়া সন্ধানকার্যে নিয়োগ করিতে পারিলেন না। নৌকা নীরবে ফিরিয়া চলিল। প্রাসাদে প্রবেশ করিয়া মহাদেবী বহুদিনের বিদ্বেষ ভুলিয়া সাশ্রুনয়নে মন্থরার মুখচুম্বন করিলেন, সুপ্রিয়া এবং শাশ্বতী তাঁহাকে স্নেহভরে আলিঙ্গন করিয়া বিদায় লইলেন। রাজার সে-রাত্রিতে কালিন্দীর গৃহে থাকিবার কথা, তিনি শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া কৃতজ্ঞতায় উচ্ছ্বসিত হইয়া বলিলেন, “প্রিয়ে, আজ তুমি আমার জীবনরক্ষা করিয়াছ। কী দিয়া তোমাকে পুরস্কৃত করিব বলো?”

মন্থরা বলিল, “মহারাজ, জীবিতেশ্বর, ও-কথা বলিয়া আমাকে লজ্জা দিবেন না। আপনি আমার জীবনের জীবন, আমার ইহ-পরলোকের আশ্রয়। আপনাকে অদ্য রক্ষা করিতে না পারিলে আমাকে কল্য কে রক্ষা করিত, মহারাজ? আপনার অন্যান্য মহিষীরা রাজকন্যা, তাঁহারা আপনার বিপদে নিশ্চেষ্ট ছিলেন, কারণ তাঁহারা জানিতেন, আপনার আশ্রয়চ্যুতা হইলেও তাঁহাদের পিতৃগৃহে স্থানাভাব হইবে না। আমার মতো অনাথার তো আপনি ভিন্ন গতি নাই, তাই নিরুপায় হইয়া আমি অদ্য দস্যুদের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছি। আামি কর্তব্য করিয়াছি, পুরস্কারের আশা রাখি না।”

সুপর্ণ বলিলেন, “আমি পুরুষ হইয়া পাশবদ্ধ পশুবৎ মৃত্যুবরণ করিতেছিলাম, তুমি নারী হইয়া অসীমসাহসে দুইজন ভীমকায় আততায়ীকে পরাজিত করিয়া আমাকে বাঁচাইয়াছ। কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ তোমাকে কিছু না দিতে পারিলে আমি শান্তি পাইব না। বর প্রার্থনা করো।”

মন্থরা কহিল, “তবে আমাকে চিন্তা করিতে সময় দিন। একমাস পরে আমার প্রার্থনা আপনাকে জানাইব।”

পূর্ববর্ণিত সাক্ষাতের এক পক্ষকাল পরে উচ্ছিখের সহিত অমাত্য ভদ্রের যথানির্দিষ্ট স্থানে সাক্ষাৎ হইল। উচ্ছিখ প্রণাম করিয়া বলিল, “প্রভু, আপনার নির্দেশমতো আপনার শিষ্যের সহায়তায় আমার পত্নী ও পুত্রকে বারাণসীতে আনাইয়াছি। পুত্র শীঘ্রই দেশে ফিরিবে, পত্নী আমার সহিত কাশীবাস করিবেন। দীর্ঘদিনের বিরহে এবং অর্থসাচ্ছল্যে তাঁহার স্বভাবের পরিবর্তন হইয়াছে, তিনি মধুরভাষিণী হইয়াছেন। ইহার সমস্তই আপনার আশীর্বাদ। সে-দিন রাজাকে আক্রমণ করার পুরস্কারস্বরূপ তৃষ্ণা আমাকে একশত স্বর্ণমুদ্রা পাঠাইয়াছে। অমাত্যপদপ্রাপ্তির পর অর্থচিন্তা ঘুচিয়াছে। এখন কী কর্তব্য? আদেশ করুন।”

ভদ্র বলিলেন, “আমিও তোমার কল্যাণকামনায় হোম এবং মন্ত্রপাঠ করিতেছি, দেবতারা প্রসন্ন হইয়াছেন মনে হইতেছে। ওদিকে মহারাজ্ঞী কালিন্দী কাশীরাজের জীবনরক্ষা করিয়া একটি বর পাইবেন, আর একটি বরের তাঁহার প্রয়োজন, সে জন্য আবার তোমার সাহায্য প্রয়োজন হইবে। রাজার অন্নে বিষ মিশাইতে হইলে তুমি বিষ সংগ্রহ করিয়া দিবে, রাজার জীবনরক্ষা করিয়া কালিন্দী আর একটি বর লাভ করিবেন। ভয় নাই, এবারেও তুমি তাঁহাকে সাহায্য করিবে।”

কয়েকদিনের মধ্যেই জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী ফলিল। মন্থরার পত্র পাইয়া উচ্ছিখ বিষ ক্রয় করিয়া পাঠাইল। পট্টমহিষীর প্রাসাদে ভোজনে বসিয়া কাশীরাজ যথারীতি পালিতা বিড়ালীকে একমুষ্টি অন্ন দিলেন, বিড়ালী অন্ন গলাধঃকরণ করিয়া কিছুক্ষণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করিল, তারপর রাজার আসনের কাছেই পড়িয়া মরিয়া গেল। কিছুদিন হইতে মন্থরা মহারাজকে রাজনীতি শিখাইতেছিল। বহুপত্নীক রাজগণের পক্ষে পত্নীদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা উচিত নহে—এ-কথা বুঝাইয়াছিল। নিজের কক্ষে কাশীরাজকে আহার্য দিবার সময়েও সে একটি বিড়ালীকে প্রথমতঃ সেই অন্ন খাওয়াইত। সেই নিয়মানুযায়ী রাজা আজকাল সর্বত্রই সেই বিড়ালীর দ্বারা পরীক্ষা না করাইয়া অন্ন গ্রহণ করিতেন না। আজ পট্টমহিষীর পাকশালায় সূপকার যখন রন্ধন করিতেছিল সেই সময় মন্থরার পরিচারিকা সুদতী যথারীতি তাহার সহিত কিছুক্ষণ হাস্যপরিহাস করিয়া গিয়াছিল, পাচক ব্যঞ্জনের বাটি সাজাইবার সময় তাহার অন্নপাত্রে সে যে কখন বিষ মিশাইয়াছিল তাহা হতভাগ্য জানিতে পারে নাই। বিষভক্ষণে বিড়ালী প্রাণত্যাগ করিলে রাজা আসন ছাড়িয়া উঠিলেন, রোষকষায়িত লোচনে সম্মুখে দণ্ডায়মান পাচকের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “পাপিষ্ঠ, আমাকে হত্যা করিবার জন্য তুমি কাহার দ্বারা নিযুক্ত হইয়াছ? কালসর্পের বিবরে হস্ত প্রবিষ্ট করাইবার দুর্মতি তোমার কেন হইল?”

পাচক কম্পান্বিত-কলেবরে ভীতি-গদগদ কণ্ঠে বলিল, “মহারাজ, সত্য বলিতেছি, আমি কিছুই জানি না।”

রাজাজ্ঞায় প্রহরী আসিয়া পাচককে বাঁধিয়া লইয়া গেল। পট্টমহিষা এতক্ষণ ব্যজনীহস্তে পাষাণপ্রতিমার মতো বসিয়াছিলেন, তিনি কাঁদিয়া বলিলেন, “মহারাজ, বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানি না। আমার কোন মহাশত্রু আজ আপনার এবং আমার সর্বনাশ সাধনের জন্য এই ষড়যন্ত্র করিয়াছে। আমি যদি সতী নারী হই, তবে সে ইহার প্রতিফল পাইবে।”

কাশীরাজ ব্যঙ্গহাস্য করিয়া বলিলেন, “মহিষী, সতীত্বের আস্ফালন এখন বৃথা। তুমি যে রাজমাতা হইবার জন্য এত উদ্‌গ্রীব হইয়াছ, তাহা জানিতাম না। সেদিন নৌকাবক্ষে যে আততায়ীরা আমাকে আক্রমণ করিয়াছিল, তাহারা কি তোমারই অনুচর? যাহা হউক, তোমার সহিত দীর্ঘকালের সম্বন্ধ, তোমাকে সামান্যা নারীর মতো প্রাণদণ্ড আমি দিব না। তুমি এই গৃহেই থাকিতে পারো, ইচ্ছা করিলে পিতৃগৃহেও যাইতে পারো। আমি অতঃপর আর তোমার মুখদর্শন করিব না।”

রাজা সবেগে কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতে গিয়া থামিয়া গেলেন। কালিন্দী আলুলায়িতকেশে ছুটিয়া আসিতেছিল, সে কাতর কণ্ঠে বলিল, “মহারাজ, এ কি শুনিতেছি? আপনার জীবন নাশ করিবার ষড়যন্ত্র রাজান্তঃপুরেও প্রবেশ করিয়াছে! ভগবান্ বিশ্বনাথের কৃপায় আজ আপনার জীবন—”

রাজা কালিন্দীর কম্পিত দেহ বক্ষে ধারণ করিয়া বলিলেন, “প্রিয়তমে, আজও তুমি আমার জীবন রক্ষা করিয়াছ। তোমার পরামর্শানুযায়ী বিড়ালীকে প্রথমে খাইতে দিয়াছিলাম বলিয়াই জানিতে পারিলাম— আমার অন্ন বিষমিশ্রিত। তোমার ঋণ কি করিয়া শোধ করিব জানি না।”

মন্থরা রাজার বাহুবন্ধন হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে পট্টমহিষীর দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার পর বলিল, “মহারাজ, আপনি আর-একদিন আমাকে একটি বর দিতে চাহিয়াছিলেন, আমি লইতে চাহি নাই। আজ আবার আপনি প্রসন্ন হইয়াছেন, বর দিতে চাহিতেছেন। যদি আপনার, আমার এবং রাজ্যের কল্যাণার্থ আমি আপনার কাছে কোনও বর প্রার্থনা করি—তবে তাহা পাইব তো? যদি দুইটি বরই চাই?”

কাশীরাজ বোধহয় তাহার দৃষ্টিতে সপত্নীবিদ্বেষের বহ্নি জ্বলিয়া উঠিতে দেখিয়া ভয় পাইয়াছিলেন, হয়তো কৈকেয়ীর কথা মনে পড়িয়াছিল, সেজন্য মুখভাব এবং কণ্ঠস্বর অপরিবর্তিত রাখিয়াই বলিলেন, “এ-কথা আবার জিজ্ঞাসা করিতেছ, মহারানী? স্ত্রীহত্যা এবং ব্রহ্মহত্যার অনুরোধ ভিন্ন তোমার সমস্ত অনুরোধ আমি রক্ষা করিব। বলো, কি চাও?”

রাজার বচনবিন্যাসে সতর্কতা মন্থরার বুঝিতে বিলম্ব হইল না, কিন্তু তাঁহার সাধ্য কি প্রপিতামহীর বয়সী পত্নীকে চাতুর্যে পরাস্ত করেন? মন্থরা যুগপৎ স্বামীকে এবং পট্টমহাদেবীকে বিস্মিত করিয়া করপুটে বলিল, “আমি চাই, এক-বরে আমার যাবজ্জীবন নির্বাসন, অন্য-বরে কুমার ঋতুপর্ণের যৌবরাজ্যে অভিষেক।”

সুপর্ণ কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে রাজ্ঞীর মুখকমল নিরীক্ষণ করিলেন। তারপর বলিলেন, “সহসা এ বাসনা তোমার মনে কেন উদয় হইল জানিতে পারি কি?”

মন্থরা কহিল, “মহারাজ, সিংহাসন অতি সাংঘাতিক বস্তু। উহার লোভে পুত্র পিতৃহত্যা করে, পত্নী স্বামীহত্যা করে। আপনার উপর পূর্বে তো এত ঘন ঘন আক্রমণ হইত না। অভাগিনী আমি আপনার সংসারে আসিবার পর হইতে, পাছে আমার সন্তান ভবিষ্যতে অন্য কাহারও সন্তানকে বঞ্চিত করিয়া সিংহাসনে বসিতে চায়, তাহার পথ বন্ধ করিবার জন্যই এই সব ষড়যন্ত্র এবং উপদ্রব আরম্ভ হইয়াছে! আপনি নিমিত্তমাত্র, আপনার অবর্তমানে একটা সহায়সম্বলহীনা বিধবাকে অবলীলাক্রমে পিষিয়া মারিবার জন্যই আপনার মৃত্যু কয়েকজনের প্রয়োজন। রাজকুমার ঋতুপর্ণের জন্যই যখন আপনার প্রাণহানির চেষ্টা চলিতেছে, তখন তাঁহাকে সিংহাসন দান করিলে আপনার সহিত তাঁহার আর স্বার্থের সংঘাত বাধিবে না, পুত্রের দ্বারা পিতৃহত্যা ঘটিবে না। এ-দিকে আমি আপনাদের রাজপুরী হইতে বিদায় লইলে আমিও কিছুদিন প্রাণে বাঁচিতে পারি; শত্রুপুরীতে বাস, কখন কি ঘটে বলা যায় না। আপনার এবং নিজের জীবনরক্ষার এবং আপনার সংসারের কল্যাণের জন্যই আমি ঐ দুইটি বর চাহিয়াছি। উহাতে বিরোধবিদ্বেষের মূলোৎপাটন হইবে।”

সুপর্ণ বলিলেন, “তুমি মহীয়সী, তোমার উপযুক্ত কথাই বলিয়াছ, কিন্তু আমার পক্ষে কাজটা রাজোচিত বা ক্ষত্রিয়োচিত হইবে না। অন্যায়কারীদের নিকট আত্মসমর্পণ ভীরুতার নামান্তর। বিরোধের মূলোৎপাটন এ-ভাবে হয় না। আমি ভাবিয়াছিলাম, অদ্যকার অপরাধও উপেক্ষা করিব, কারণ, স্ত্রীপুত্র আমার মৃত্যু কামনা করে এ-কথা আমার কর্মচারীদের বা প্রজাদের কাছে প্রকাশ করা আমার পক্ষে লজ্জার কথা। কিন্তু দেখিতেছি, পাপ ক্রমেই প্রশ্রয় পাইয়া বাড়িয়া উঠিতেছে, আমি আর শত্রুপক্ষের স্পর্ধাকে ক্ষমা করিব না। প্রতিহারী, এখনই কুমার ঋতুপর্ণকে সংবাদ দাও, আমি তাঁহার দর্শনপ্রার্থী। না, থাক, সেই সুন্দর মুখ চক্ষে দেখিলে আবার হয়তো কর্তব্য বিস্মৃত হইব। আমার লেখনী ভূর্জপত্র এবং লাঞ্ছনমুদ্রা আনয়ন কর।” প্রতিহারী আদেশ পালন করিলে কাশীরাজ দ্রুতহস্তে একখানি আজ্ঞাপত্র লিখিয়া মুদ্রাঙ্কিত করিলেন। বলিলেন, “এই পত্রখানি প্রাসাদরক্ষীদের প্রধানকে দাও। আমার আদেশ যেন অবিলম্বে পালিত হয়।” প্রতিহারী “যে আজ্ঞা, মহারাজ” বলিয়া বিদায় লইল।

মন্থরা করজোড়ে প্রশ্ন করিল, “মহারাজ কী লিখিলেন জানিতে পারি কি?”

কাশীরাজ বলিলেন, “অন্তঃপুররক্ষীরা অন্তঃপুরে এবং নগরপাল বাহিরে অপরাধীদের সন্ধান করিবে, তাহাদের অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করিয়া আমাকে জানাইবে। সপ্তাহকালের মধ্যে আমি বিচারসভা করিয়া দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দিব। অপরাধী আমার যত আপনজন এবং প্রিয়পাত্রই হউক— অব্যাহতি পাইবে না। প্রয়োজন হইলে অন্তঃপুরিকাদের সমস্ত পেটিকা এবং মঞ্জুষা খুলিয়া দেখিবে, দাসদাসীদের প্রহার এবং নির্যাতন করিয়াও গুপ্ত তথ্য সংগ্রহ করিবে, সেই অধিকার আমি তাহাদের দিলাম। যতদিন আমার বিচার শেষ না হয়, ততদিন কুমার ঋতুপর্ণকে বন্দী করিয়া রাখিতে আদেশ দিলাম।”

তাঁহার শেষ কথাটি শুনিবামাত্র মহাদেবী, “মহারাজ!” বলিয়া চীৎকার করিয়া গৃহকুট্টিমে লুটাইয়া পড়িলেন। মুহূর্তের জন্য কাশীরাজ বিচলিত হইলেন, তাঁহাকে ভূমিশয্যা হইতে উঠাইবার জন্য দুইপদ অগ্রসরও হইলেন, তারপর আত্মসংবরণ করিয়া দাসীকে ডাকিয়া বলিলেন, “নিপুণিকা, তোমার কর্ত্রী বোধ হয় অজ্ঞান হইয়া গিয়াছেন, ইহার পরিচর্যা কর। মহারানী, চলো আমরা অন্যত্র যাই। আমার মন বড়ো দুর্বল।”

মন্থরা ততক্ষণে জলপূর্ণ ভৃঙ্গার লইয়া নিপুণিকার পার্শ্বে গিয়া বসিয়াছে। মহাদেবীর কেশে এবং মুখমণ্ডলে জলসেচন এবং ব্যজন করিতে করিতে বলিল, “আমার তো এখন যাইবার উপায় নাই। কিন্তু মহারাজ, সহসা সন্দেহবশে এতটা কঠোরতা অবলম্বন না করিলেই ভালো হইত না? কয়েকজন অপরাধীর জন্য বহু নিরপরাধের উপর হয়-তো নির্যাতন হইবে। আমার দাসী সুদতী চিরদিন স্নেহে এবং সম্মানে অভ্যস্তা, এমন হইবে জানিলে আমি তাহাকে বিবাহের পর রাজপুরীতে আনিতাম না।”

স্বপর্ণ বলিলেন, “তুমি এবং তোমার দাসী সকল সন্দেহের উর্ধ্বে। তোমাদের উপর যাহাতে কেহ কোনও অত্যাচার না করে সে জন্য আমি বিশেষভাবে বলিয়া দিব। আমার চরেরা এখন রাজবৈদ্য সন্দীপনের সাহায্যে খাদ্যে মিশ্রিত বিষের স্বরূপ নিরূপণ করিয়া নগরে কোন্ বৈদ্য উহা কয়েকদিনের মধ্যে কাহাকে বিক্রয় করিয়াছে তাহা বাহির করিবে। রাজপ্রাসাদের কোনও দাস বা দাসীর সাহায্যে নিশ্চয় উহা অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে, তাহার সন্ধান পাইলেই প্রকৃত অপরাধী ধৃত হইবে। নির্যাতন ও প্রলোভনের সাহায্যে তাহাদের নিকট সত্য উদ্ধার করিতে বিলম্ব হইবে না।”

মন্থরা বলিল, “আমার প্রার্থিত বর তাহা হইলে দিবেন না? মহারাজ সত্যভ্রষ্ট হইবেন?”

সুপর্ণ বলিলেন, “প্রথমে অপরাধীদের বিচার হইবে, তাহার পরেও যদি তোমার মত অপরিবর্তিত থাকে, তাহা হইলে তখন তোমার প্রার্থনা বিবেচনা করিব। প্রয়োজন হইলে দুইজনে একত্রেই নির্বাসনে যাইব।”

শেষ কথাটায় লঘু পরিহাসের আভাস পাইয়া মন্থরা বলিল, “মহারাজ, আপনার হৃদয় কঠিন, রাজকার্যে আপনার কোমলতা দুর্বলতার স্থান নাই জানি, কিন্তু আমি নারী, শত্রুর প্রতিও নির্যাতন আমি সহ্য করিতে পারি না। আমি কয়েকদিন স্থানান্তরে যাইবার অনুমতি পাইব কি? আমার পিতৃবন্ধু নগরেই আছেন। আমি তাঁহার গৃহে কয়েকদিন অবস্থান করিলে কি আপনার সম্মান-হানি হইবে?”

কাশীরাজ বলিলেন, “রাজমহিষীদের সাধারণতঃ আত্মীয়গৃহবাসের প্রথা নাই। তবে আমি আজ তোমার ইচ্ছা অপূর্ণ রাখিব না। সপ্তাহকালের জন্য তুমি অমাত্য যজ্ঞদত্তের গৃহে থাকিতে পারো। কবে যাইতে চাও বলো, আমি, নিজে রথে করিয়া তোমাকে রাখিয়া আসিব এবং ফিরাইয়া আনিব।”

মন্থরা কহিল, “মহারাজের অসুবিধা না হইলে আজ অপরাহ্ণেই আমাকে লইয়া গেলে সুখী হইতাম। এ পুরীর চারিদিকে যেন অমঙ্গলের ছায়া পড়িয়াছে, কখন কি হয় বলা যায় না। আপনিও কিছুদিনের জন্য আমার সঙ্গে চলুন না, মহারাজ? আপনাকে এই শত্রুপুরীতে রাখিয়া আমি কেমন করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিব?”

কাশীরাজ হাসিয়া বলিলেন, “মুগ্ধে, আমি গেলে এখানে সমস্ত কার্যে অব্যবস্থা ঘটিবে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকিবে, আমি সর্বদা সতর্ক থাকিব, বাহিরে গেলে দেহরক্ষক সঙ্গে লইব। মহাদেবীর জ্ঞান ফিরিতেছে মনে হয়, আমি উহার সহিত এখন বাক্যব্যয় করিতে ইচ্ছা করি না। আমি নিজ বহিঃপ্রাসাদে চলিলাম। অপরাহ্ণে রথ প্রস্তুত হইলে তুমি সংবাদ পাইবে।”

মহাদেবী চক্ষুরুন্মীলন করিয়া কিছু প্রশ্ন করিবার পূর্বেই কাশীরাজ দ্রুতপদে কক্ষ ত্যাগ করিলেন। মহাদেবী উঠিয়া বসিলেন, কয়েক পল নির্নিমেষনেত্রে মন্থরাকে লক্ষ করিলেন। তারপর বলিলেন, “আমার পরিচর্যা করিতেছিলি? সর্বনাশী, আমার পুত্র তোর কাছে কী অপরাধ করিয়াছে বল্? কেন তাহার প্রাণনাশের চেষ্টা করিতেছিস?”

মন্থরা সস্নেহে তাঁহার সিক্ত কেশ ঝাড়িয়া দিতে দিতে বলিল, “দিদি, আপনি গুরুতর মানসিক আঘাত পাইয়া অপ্রকৃতিস্থা হইয়াছেন, কী বলিতেছেন জানেন না, সে জন্য আমিও মনে কোনও ক্ষোভ রাখিব না। আপনি সুস্থ হউন, আমি এখন আসি।”

মহাদেবী নিজের কেশ মন্থরার হস্ত হইতে সবেগে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইলেন, বলিলেন, “আমাকে স্পর্শ করিস না, রাক্ষসী। হাঁ রে, চন্দ্রসূর্য কি উঠিতেছে না? আমাদের নামে এত বড়ো মিথ্যাপবাদ দিতে তোর পাপজিহ্বা খসিয়া গেল না? তুই মানবী, না ডাকিনী?”

মন্থরা তাঁহাকে আর কোনও কথা না বলিয়া নিপুণিকাকে বলিল, “কিঞ্চিৎ ঈষদুষ্ণ দুগ্ধ পান করাইয়া এখন উঁহাকে পর্যঙ্কে শয়ন করাইয়া দাও। আমার উপর যে-কারণেই হউক, উনি যখন ক্রুদ্ধা হইয়াছেন তখন আর কাছে থাকিয়া লাভ নাই।” সে নিজের মুক্ত কেশরাশি আলোলকবরীবদ্ধ করিতে করিতে উঠিয়া দাঁড়াইল এবং মৃদুহাস্যোদ্ভাসিত মুখে গজেন্দ্রগমনে প্রস্থান করিল।