বছর তিরিশ আগে যখন এই উপন্যাসটি লিখতে আরম্ভ করি তখন সাধুভাষায় ভারতের আদিকবির রচনাবহির্ভূত, নিজের-কল্পিত-বিষয়বস্তু নিয়ে কিছুটা কৌতুক সৃষ্টিই ছিল আসল উদ্দেশ্য। আট দশদিন পরে লেখা শেষ হ’তে দেখি, হাস্যরসের সঙ্গে বেশ খানিকটা করুণরস মিশে গেছে। মন্থরা বিধাতার অবিচারে কুব্জা কুরূপা দাসী হয়ে জন্মেছিল, দেহের কুশ্রীতার জন্য আজন্ম মানুষের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে নিশ্চয় তার মনটা বিষিয়ে গেছল। কবির ভাষায় ‘সবারে চাহে বেদনা দিতে বেদনা-ভরা প্রাণ’, তাই অন্যের শ্রীবৃদ্ধি সে সহ্য করতে পারত না। কৈকেয়ীকে সে মানুষ করেছিল, একমাত্র তা’র প্রতি এবং তা’র সস্তানের প্রতি ছিল তা’র প্রাণের টান। নিজের আদর্শ-অনুযায়ী তাদের কল্যাণকামনায় পরামর্শ দিতে গিয়ে সে চিরকলঙ্ক কিনে গেছে; ঋষিকবিও তাকে দয়া করেননি। আমি নিজে অনেকক্ষেত্রে অন্যের উপকার করতে গিয়ে অপকার করেছি, অহেতুক দুর্নাম কিনেছি, তাই বোধ হয় মন্থরার সম্বন্ধে আমার মনে কিছু সমবেদনা-বোধ ছিল, সেইটেই প্রকাশ পেয়েছে এই রচনায়। এদেশের যোগীদের যোগবিভূতির বহু চাক্ষুষ প্রমাণ আমি পেয়েছি। ‘অঘটন আজও ঘটে’, সুতরাং ত্রেতায় ঘটাতে দ্বিধাবোধ করিনি। ‘প্লাস্টিক সার্জারী’-পারদর্শী ডাক্তার স্নেহাস্পদ মুরারিমোহন মুখোপাধ্যায় অনেক বিকৃতাঙ্গ নরনারীকে শোভন রূপ দিয়েছেন দেখেছি। যে দু’চারজন বন্ধুকে গল্পটা বলি, দু’চারপাতা প’ড়ে শোনাই, তাঁরা বললেন, “প্লট ভালোই, তবে বিদ্যাসাগরী বাংলা আজকের দিনে চলবে না, ভাষা বদলাও লেখাটার।” মন সায় দিল না, লেখাটা তখনকার মতো ফেলেই রাখলুম। তারপর উদয়াস্ত বিশ্বভারতীর বৈতনিক অবৈতনিক কাজের চাপে এবং ঘরে-বাইরে অতিথিপরিচর্যার ও রোগীর সেবার অবিরাম ব্যস্ততায় এটার কথা ভুলেই গেলুম। এর কয়েক বছর পরে একটা আকস্মিক অচিন্তিতপূর্ব দুর্বিপাকে আমার জীবনের গতিপথ বদলে যায়। ১৯৬৩ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে শ্রীনিকেতনে পল্লীউন্নয়নশিক্ষায়তনের অবিচার ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের অবস্থান ধর্মঘট ভাঙতে কর্তৃপক্ষ আশিজন বেয়নেট-বন্দুকধারী গুর্খা পুলিশ আমদানী করেন। ভূমিশায়ী ছেলেমেয়েদের অস্ত্রের অরণ্যে ঠেলে দিয়ে কর্তৃপক্ষ এবং শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের (একজন-ভিন্ন) সমস্ত কর্মী ও অধ্যাপক অনুপস্থিত থাকলেও, বোলপুর শহর ও নানা গ্রাম থেকে কয়েকশ’ দর্শক এসেছিলেন মজা দেখতে, তাঁদের সঙ্গে অ্যাসিড বাল্ব্ এবং ছোরাছুরিও এসেছিল খবর পেয়েছিলুম। কবিগুরু একদিন আমাকে বলেছিলেন, “তোমরা আমার পুরানো ছাত্র; যেদিন আমি থাকব না সেদিন আমার আশ্রমের সম্মানরক্ষার ভার তোমাদের ওপর থাকবে।” সেদিন তাঁর তপস্যাক্ষেত্রকে অমর্যাদা থেকে বাঁচাবার জন্য আমি এবং আমার সহধর্মিণী সারাদিন সাধ্যমতো চেষ্টা করি; ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে শান্ত করলেও কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাবের জন্য বিরোধের মীমাংসা হয়নি। সেদিন রক্তপাত-ঠেকানোর-জন্য-কৃতজ্ঞ মহকুমা-শাসক ও জেলাপ্রহরী-অধ্যক্ষের প্রশংসা অর্জন করলেও, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্দিত্ববরণ ক’রে হাজতে যাওয়ার এবং সিউড়িতে মোকর্দমার সময় তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেওয়ায় অপমানিত ও তিরস্কৃত হয়ে আমাকে চাকরী ছাড়তে হয়। আমি যে অধ্যাপক, ছাত্র ও কর্তৃপক্ষ সকলের হ’য়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিলুম— সে-কথা পুলিশ-কর্তৃপক্ষ কয়েক-ঘণ্টার পরিচয়ে বিশ্বাস করলেও বিশ্বভারতী-কর্তৃপক্ষ করেননি, ফলে কুড়ি-বৎসরের অক্লান্ত-পরিশ্রমে গ’ড়ে-তোলা ভারতব্যাপী পরীক্ষাকেন্দ্র ও পাঠচক্রযুক্ত প্রতিষ্ঠানের শতশত ছাত্রছাত্রীর স্নেহবন্ধন ছিন্ন ক’রে বৃদ্ধবয়সে শূন্যহস্তে নিজের শ্রীনিকেতনের অসমাপ্ত বাড়িতে সপরিবারে উঠি। (বিশ্বভারতীর পেনসনও পাইনি)। কয়েক বছর খুবই দুঃখ-কষ্টে কাটে, সহধর্মিণী ভগ্নস্বাস্থ্যে ঘরে-বাইরে কঠিন পরিশ্রম ক’রে সংসারে সাহায্য করেন,— একেবারে শয্যাগত না হওয়া পর্যন্ত। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর শিল্পচর্চার সময় পাইনি, এইবার দু’ বছরে ‘চিত্রে প্রাচীন ভারত’ চিত্রমালার পঁচিশখানা ছবি আঁকি। ওরই মধ্যে অগ্রজপ্রতিম রতনমণি চট্টোপাধ্যায়ের আহ্বানে কলকাতায় গান্ধী-শতবার্ষিকী-প্রকাশনের সম্পাদনার এবং গ্রন্থচিত্রণের কাজে একবছরে কিছু উপার্জন করি। সেই সময় একদিন সৌরীনমামাকে (ভূতপূর্ব ‘ভারতী’-সম্পাদক সুসাহিত্যিক শ্রীসৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, মা’র মাসতুতো ভাই) তাঁর রোগশয্যায় ‘মন্থরাহরণ’ প’ড়ে শোনাই। তাঁর ভালো লাগে লেখাটা; তিনি তৎক্ষণাৎ কবিবন্ধু সুধীর চৌধুরী মশাইকে চিঠি দেন, উপন্যাসটা অবিলম্বে প্রবাসীতে ছাপাবার জন্য অনুরোধ ক’রে। আমার অনেক দেশাত্মবোধক কবিতা একসময়ে প্রবাসীতে প্রকাশিত হয়েছিল; খ্যাতি পেয়েছিলুম, দক্ষিণা চাইওনি, পাইওনি। ঐ সময়ে আমার টাকার প্রয়োজন অত্যধিক, তাই সুধীরবাবুর কাছে না গিয়ে অগ্রজপ্রতিম বলাইদা’কে (বনফুল) গিয়ে মন্থরাহরণের পাণ্ডুলিপি দিই। তাঁর ভালো লাগায় তিনি নিজে ‘নবকল্লোল’-এ পাঠান। তাঁর নির্দেশে সম্পাদকমশাই অবিলম্বে অগ্রিম সম্মানদক্ষিণা দু’শ টাকা পাঠান। বছরের পর বছর কাটে, লেখা আর বেরোয় না। শেষে খোঁজ করায় জানতে পারি, দৃষ্টিহীন সম্পাদকমশাইকে কেউ প্ৰথম পৃষ্ঠা পড়েই বুঝিয়েছে, বইটাতে রামচন্দ্রকে নিয়ে তামাশা করা হয়েছে, তাই তিনি ছাপতে পারেন নি। আমি প্রায় চার পৃষ্ঠা প’ড়ে শোনানোয় তাঁর ভুল ভাঙে, বলেন, “আপনার লেখাটা তো চমৎকার, কিন্তু আমার পাঠিকাই বেশি, তাঁরা আপনার ভাষা পছন্দ করবেন না। টাকা ফেরত দিতে হবে না, আমি অনেক-দিন লেখাটা ফেলে রেখে আপনার ক্ষতি করিয়ে দিয়েছি। লেখাটা অন্য কোনও পত্রিকায় ছাপান, তারপর আমি একেবারে বই ক’রে ছেপে দেব।” সৌরীন-মামা ততদিনে দেহ রেখেছেন, তাঁর পুরানো চিঠি নিয়ে সুধীরবাবুর কাছে গেলুম। তাঁর নিজের, সম্পাদক অশোকদা’র এবং তাঁদের বিদগ্ধ বন্ধুদের কয়েকজনের ভালো লাগে। মন্থরাহরণ ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ১৩৮০ সালের বৈশাখ থেকে পৌষ পর্যন্ত ন’মাসে প্রকাশিত হওয়ার সময় কয়েকজন সুশিক্ষিত এবং অল্পশিক্ষিত পাঠক-পাঠিকার অভিনন্দন লাভ করে। সাংসারিক নানা দুশ্চিন্তায় বিব্রত থাকায় তারপরেও বহুদিন কোনো প্রকাশকের সন্ধান করতে পারি নি। ‘নবকল্লোল’-সম্পাদক মধুসূদন বাবুর মৃত্যুসংবাদ পাবার পর আর দেব সাহিত্য কুটিরে যাইনি। সম্প্রতি স্ত্রীবিয়োগের পর আমার চব্বিশপরগণার জাতীয় বিদ্যালয় ও গ্রামসেবাশ্রম ‘পল্লীভারতী’র বাড়ি ও জমি (যা সাতাশ বছর উদ্বাস্তুদের দখলে ছিল) সরকার কিনে নেওয়ায় কিছু আর্থিক সাচ্ছল্য এসেছে।
বিশ্বভারতীর বর্তমান কর্তৃপক্ষ শ্রীনিকেতনের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উৎসবে ভাষণ দেবার জন্য বর্ধমানের বাসার রোগশয্যা থেকে লোক পাঠিয়ে ডেকে এনেছেন। শান্তিনিকেতনের যে বাড়ি অর্থাভাবে ত্রিশ বৎসর ভাড়া দেওয়া ছিল সেইখানে প্রায় শয্যাগত আছি; মৃত্যুর পূর্বে কিছু বই নিজ-ব্যয়ে প্রকাশ ক’রে যাবার চেষ্টা করছি। আখ চিবিয়ে তা’র রস উপভোগ করবার মানুষ এখনও দেশে আছেন, তা’র প্রমাণ পেয়েছি। ‘মন্থরাহরণ’ ছাপার অক্ষরে দেখবার আগ্রহ যার সবচেয়ে বেশী ছিল—তাঁর পুণ্যস্মৃতিতে বইটি উৎসর্গ করলুম। যদি কয়েকজন সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাকে বিমল আনন্দ দিতে পারে তবে এর প্রকাশন সার্থক হয়েছে ব’লে মনে ক’রব। ‘আনন্দবাজার’, ‘দেশ’, ‘কথাসাহিত্য’, ‘মৌচাক’, ‘সন্দেশ’ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত ও প্রশংসিত বড়োদের এবং ছোটদের হাসির গল্প ও কবিতার সঙ্কলন (সচিত্র) পুস্তকাকারে ছাপতে আগ্রহী প্রকাশক পত্রযোগে জানালে সুখী হব।
বিনীত
লেখক