রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস

যোগাযোগ

পুলকেশ দে সরকার

যোগাযোগের যুগ ‘বিচিত্রা’র যুগ। কল্লোল-প্রগতির পরের যুগ। সবুজ পত্রের যুগ সেখান থেকে অনেক পেছনে। এ প্রথম ধারাবাহিকভাবে বেরোয় বিচিত্রায়। আশ্বিন ১৩৩৪ থেকে চৈত্র ১৩৩৫। প্রথম দুই সংখ্যায় এর নাম ছিল ‘তিন পুরুষ’, তৃতীয় সংখ্য থেকে নতুন নামকরণ হয় যোগাযোগ। এই নামান্তর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি কৈফিয়ত বিচিত্রায় দিয়েছিলেন। তাতে নামকরণ সম্পর্কেই কথা ছিল; যোগাযোগের কাহিনী সম্পর্কে নয়।

“সম্পাদক মশায় যখন গল্পের নামের জন্যে পেয়াদা পাঠালেন তাড়াতাড়ি তখন ‘তিন পুরুষ’ নামটা দিয়ে তাকে বিদায় করা গেল। তার পরক্ষণেই নামটা কাহিনীর আঁচলের সঙ্গে তার গ্রন্থি বন্ধন করে নিয়ে কানে কানে মুহূর্তে মুহূর্তে বলতে লাগল, যদেতৎ অর্থং মম তদস্তু রূপং তব। আমার সঙ্গে তোমার সম্পূর্ণ মিলে চলতে হবে।”

“কর্তা বলেন, তিন পুরুষের তিন-তোরণ-ওয়ালা রাস্তা দিয়ে গল্পটা চলে আসবে এই আমার একটা খেয়ালমাত্র ছিল। এই চলাটা কিছুই প্রমাণ করবার জন্যে নয়, নিছক ভ্রমণ করবার জন্যেই।

“গল্প নিজেই নিজের পরিচয় দেবার সাহস রাখে যেন–নামটাকে যেন জোর গলায় আগে আগে নকিবগিরি করতে না পাঠায়।”

‘তিন পুরুষ’ নাম ঘুচিয়ে আমার গল্পের নাম দেওয়া গেল–‘যোগাযোগ’।

এ কৈফিয়ত তিনি লিখেছেন ১৯২৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর, কিন্তা জাহাজে শ্যামের পথে।

বাংলা ১৩৩৬ সালের আষাঢ়ে বা ইংরেজী ১৯৩০ সালের জুন মাস নাগাদ ‘যোগাযোগ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।

১৯৩০ সালের মার্চ মাস থেকে সারা ভারতব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলন সুরু হ’য়ে গেছে। আরব সাগরতীরে চলেছেন সত্যাগ্রহী গান্ধীজী। লবণ আইন অমান্যের জন্য ডাণ্ডি মার্চ। বাংলায় সুদূরকুমিল্লা অভয় আশ্রম থেকে আসছে কাঁথি লবণ সত্যাগ্রহে স্বেচ্ছাসেবকের দল।

কিন্তু এও সামান্য কথা। ওদিকে ডাণ্ডি মার্চের অহিংস আহ্বান; এদিকে চট্টগ্রামে সহিংস বাঙালী বিপ্লবীদের ব্রিটিশ অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। অহিংস আইন অমান্যে মাথা পেতে পুলিশের লাঠি নিতে, আর সহিংস আইন অমান্যে ব্রিটিশ শাসনের পোষ্যবর্গের প্রাণ নিতে বাংলার সহস্র দামাল ছেলে চঞ্চল।

যোগাযোগের সঙ্গে এর কোন যোগ নেই। হ’তেই হবে এমন কোন কথাও নেই। কেন না, উপন্যাসের রস সৃষ্টি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টিং নয়। এর রাজ্য নতুন, নিয়ম পৃথক। কিন্তু নামকরণ যেন-না গল্পের ভ্রমণকে কোথাও বাধা দেয় এই যে কথা রবীন্দ্রনাথ বললেন, একথার সার্থকতা কি? গল্প বা কাহিনীর নামকরণ পদার্থবিজ্ঞানের মতো সংজ্ঞা না হোক, আদৌ যখন নামকরণ হচ্ছে, তখন তার তাৎপর্যও আছে। মানুষের নামকরণে মানুষটির সংজ্ঞা থাকে না কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে। গ্রামের নামকরণের সংজ্ঞা বা উদ্দেশ্য না থাক ইতিহাস থাকে। গল্প উপন্যাসের নামকরণে সংজ্ঞা বা উদ্দেশ্য না থাক একটা তাৎপর্য থাকেই এবং তা নিরর্থক নয়। ঐ তার পরিচয়! ঐ পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে গল্প ভ্রমণ করে না, করার দরকারও নেই, কিন্তু নামহীন গল্প বা উপন্যাস যখন প্রচলিত নয় তখন গল্পভ্রমণের পর এর সংজ্ঞা নির্দিষ্ট না করলেও কিছু একটা পরিচয়ের নামকরণ চাই। সেটি যখনই করতে যাওয়া যাবে তখন তা অর্থহীনও হবে না। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “আমি তাই বলি গল্পের এমন নাম দেওয়া উচিত নয় যেটা সংজ্ঞা অর্থাৎ যেটাতে রূপের চেয়ে বস্তুটাই নির্দিষ্ট। বিষবৃক্ষ নামটাতে আমি আপত্তি করি। কৃষ্ণকান্তের উইল নামে দোষ নেই। কেন না ও নামে গল্পের কোনো ব্যাখ্যাই করা হয় নি।”

একথা তর্ক-সাপেক্ষ। যোগাযোগের ‘বস্তু’ আলোচনায় এ তর্ক আমাদের বিষয়াস্তরে নিয়ে যেতে পারে, তাই অবান্তর মনে করি।

যোগাযোগ কাহিনীর সূত্র বাংলা সাহিত্যের পাঠক অথবা বাঙালী সমাজের কাছে খুবই পরিচিত। বাংলাদেশের আধুনিক জীবনের–কি হিন্দু কি মুসলমান সমাজের–সূত্রপাত লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা পার্মানেণ্ট সেটেলমেণ্ট থেকে। এর বাংলা নাম জমিদারী প্রথা। এই জমিদার শ্রেণীকে অবলম্বন করে বাংলাদেশে এক ধরনের গ্রাম্য অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। সেই অর্থনীতির খাঁচায় যারা ধরছিল না তারা সেখানকার ধাক্কায় এবং পাশ্চাত্য শিক্ষাবৃত্তি ও পেশার আকর্ষণে নতুন এক অর্থনীতির সূচনা করল। কেননা এ ছিল অনিবার্য। ইংরেজ শাসকেরা এসেছে সামন্ততন্ত্রের প্রতিভূরুপে নয়, বুর্জোয়া প্রতিভূরূপে; জোড়াতালি কিছুদিন চলতে পারে কিন্তু বুর্জোয়ার সর্বগ্রাসী ক্ষুধার কাছে সামন্ততন্ত্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ জমিদারী দীর্ঘায়ু হতে পারে না। সেই ক্ষুধা জমিদার–জমিদারীর শেকড়শুদ্ধ টান মারল তার মুখের দিকে। কালক্রমে, আমি বলব, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, জমিদারী প্রথা ও গ্রাম্য অর্থনীতি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হ’য়ে এল এবং শেষ পর্যন্ত তা এক অনাচার-সর্বস্ব কুসংস্কারের মতো টিকে থাকল। কিন্তু এই দুর্মদ গতির মধ্যেই সমগ্র বাঙালী সমাজকে এই প্রথা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছিল যে, শীর্ষারোহী জমিদার শ্রেণীর এক বিষম আভিজাত্য ও স্বাতন্ত্র্যবোধ ভাঙা নাটমন্দিরের আশেপাশে এখনও দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলেছে। পক্ষান্তরে যে পাশ্চাত্য শিক্ষা, বৃত্তি ও অর্থনীতি সামাজিক অনাচারের মধ্যে সুরু হ’ল, কালের বিচারে তাও অতি দ্রুত থিতিয়ে গেলে একটা সহজ নতুন রূপ হ’ল বাংলাদেশের (উল্লেখযোগ্য যে, জমিদার শ্রেণী প্রধানত হিন্দু ব’লে এ যখন দুর্নিবার বুর্জোয়া-আকর্ষণের মুখে পড়ল তখন এর পরিপোষক প্রধানত হিন্দু সমাজই পাশ্চাত্যের বিষ ও অমৃত পান করেছিল এবং তখন থেকেই স্বল্পসংখ্যক কিন্তু তড়িৎ গতিতে ক্রমবর্ধমান মুসলমান সমাজের মধ্যে ও নতুন আলোক-প্রাপ্তদের মধ্যে এক, দুস্তর ব্যবধান–হ্যাঁ, মানসিক ব্যবধান–রচনা করতে লাগল)। স্বভাবতই, বাংলার আধুনিক সাহিত্যে, বঙ্কিমোত্তর যুগে এই পড়ন্ত ও পতিত জমিদারীর সমাজ প্রতিফলিত হয়েছে। অবশ্য বঙ্কিমের আমল থেকেই দেবদেবী, রাজাবাদশার বদলে সাহিত্যে এই জমিদার শ্রেণী নায়কের ভূমিকায় বার বার স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু সে-স্বীকৃতির মধ্যে এর মুমূর্ষ অথবা অস্তিম-অন্ত্যেষ্টির বেদনাই বেশী প্রস্ফুট।

রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল বেঁচেছিলেন; তিনি জমিদারীর মধ্যাহ্ন সূর্য না দেখলেও তার উত্তাপ অনুভব করেছিলেন এবং পশ্চিমগামী সূর্যের তেজ প্রদীপ্ত অবস্থায় দেখেছেন। কিন্তু এর অস্তকালও আসন্ন দেখে গেছেন।

যোগাযোগের বিপ্রদাস সেই জমিদারীর অভিজাত্য ও স্বাতন্ত্র্যবোধ নিয়ে জেগে আছে এবং সে মর্যাদার সঙ্গে নবাগত বণিক সভ্যতার নতুন মূল্যবোধকে এড়িয়ে বাঁচতে চায়। মধুসূদন সেই প্রাচীন সভ্যতার বিরোধ। এই বিরোধ বংশানুক্রমিক বা থিসিসের মধ্যেই ছিল এই য়্যান্টিথিসিস। দুই জমিদারের প্রাধান্য নিয়ে লড়াই দুই-পক্ষকেই কাবু করে ফেলেছিল : ‘খুন জখম থেকে মামলা উঠল। সে মামলা থামল ঘোষালদের সর্বনাশের কিনারায় এসে……চাটুজ্যেদেরও বাস্তুলক্ষ্মী ফ্যাকাসে হয়ে গেল।’

এ কাহিনীর মধুসূদন হ’ল ঘোষালদের এবং বিপ্রদাস হ’ল চাটুজ্যেদের উত্তরপুরুষ।

ঘোষাল পরিবার ভিটেছাড়া হয়ে (রজবপুরে) নতুন ভিটে বাঁধল, এবং এদের দুর্গতি ঘুচল মধুসূদনের ভাগ্য-জোয়ারে। (নুরনগরে) বিপ্রদাস ছিল পুরোনো জমিদারী আগলে। এই সময়ে এবং এদের উপলক্ষ্য করেই “ঘোষাল ও চাটুজ্যেদের ভাগ্যের ঘুড়িতে পরস্পরের লখে লখে আর একবার বেধে গেল।”

“বড়োবাজারের তনসুকদাস হালওআইদের কাছে (বিপ্রদাসের) একটা মোটা অঙ্কের দেনা। “একটা কড়া তাগিদে চাটুজ্যেদের সমস্ত খুচরো দেনা এক ঠাই করে এগারো লাখ টাকা সাত পার্সেণ্ট সুদে” এল মধুসূদন ঘোষালের কব্জায়।

বংশের পুরোনো অপমানের প্রতিশোধ তুলতে অধুনা রাজা খেতাপধারী মধুসূদন ঘোষাল অধমর্ণ বিপ্রদাস চাটুজ্যের বোন কুমুদিনীর পাণিপীড়নের সঙ্কল্প নিল। “ঋণের চোরাবালির উপর দাঁড়িয়ে” বিপ্রদাসের মনে যখন “কুমুর বিয়ে নিয়েও কেবলই প্রশ্ন আসে” আর রাজা মধুসূদনের তাগিদে নীলমণি ঘটক আনাগোনা করতে থাকে তখন কুমুদিনীই এক সময় বিপ্রদাসকে অবাক ক’রে দিয়ে বলল “যাঁর কথা বলছ তাঁর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ঠিক হ’য়েই গেছে।” বোনকে নিরস্ত করার ব্যর্থ চেষ্টার পর বিপ্রদাসের মনে হ’ল, “কী একটা দৈবসংকেত কুমু মনের মধ্যে বানিয়ে বসেছে।”

এ কি ইলিউসান?

ঘটক বলল, “এ প্রজাপতির নির্বন্ধ।…ঠিক এই সময়ে কুমুর আবার বাঁ চোখ নাচল।” এর আগে “কিছু দিন থেকে বার বার তার বা চোখ নাচছে।” “কিনু আচার্যি কতবার তার হাত দেখে বলেছে, রাজরানী হবে সে।”

এতদিন পরে কুমুর মন্দভাগ্যের তেপান্তর মাঠ পেরিয়ে এল রাজপুত্র ছদ্মবেশে।…তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়েই সে পাঁজি খুলে দেখলে আজ মনোরথ-দ্বিতীয়া।” ব্রাহ্মণ কর্মচারীদের ফলার করালে। শিব শিব বলে এবার যখন ঘটক এল তখন “অসম্মতি দিয়ে কথাটাকে শেষ করে দিতে বিপ্রদাসের সাহস হ’ল না।”

তারপর সেই-দৈব সংকেতের অনুমান এল বিপ্রদাসের মনে। এবং “এই জায়গাতেই ভাইবোনের মধ্যে অসীম প্রভেদ।” কিন্তু কুমুদিনী দশ বছর বয়স থেকে বিপ্রদাসের হাতে মানুষ। বাহ্যিক সব শিক্ষা তার বাহ্যিক আচরণও, পরবর্তীকালে রাজা মধুসুদন যাকে তিরস্কারের আখ্যা দিয়েছে ‘নুরনগরী চাল’। যেসব শিক্ষার মধ্যে কখন যে মীরার মনের প্রকৃতিটুকু কুমুদিনীর মনকে অধিকার করে কল্পলোক-বিহারী করে ফেলেছে বিপ্লদাস জানতে পারে নি এবং কুমুদিনী চরিত্রের ঐটিই বৈশিষ্ট্য, ঐ কল্পনা।

ঘরে বাইরে বিমলার কল্পনার রাজপুত্রের সঙ্গে নিখিলেশের রূপ মেলেনি (এবং প্রকৃতিও নয়)। কুমুদিনীর কল্পনা যেন বিয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশী আকাশচারী হয়ে উঠল এবং বারে বারে বাস্তবের সঙ্গে সংঘাত লেগে কুমুদিনীর জীবন বিয়োগান্তক হ’য়ে গেল।

ঊনিশ বছর অবধি কুমুদিনী যে কটি স্বকুমার বৃত্তি নিয়ে বড় হয়েছে তার মধ্যে সঙ্গীত একটি; এবং সে সঙ্গীতের আশ্রয় কেবল এস্রাজই নয়, মীরার ভজনও বটে। মীরার নিজের জীবন এই কারণে সার্থক যে জাগতিক আঘাত পেয়েও তিনি কল্পনার স্বামী থেকে চ্যুত হন নি; কিন্তু আমাদের কুমুদিনী আরও মাটির মানুষ, সে তার মা, বাবার জীবন দেখেছে (দশ বছরের মেয়ে কি করেই বা এত কথা মনে রাখল), তাই জাগতিক জীবনের চেতনা থেকে সে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারে নি, কল্পিত স্বামীর সঙ্গে মধুসূদনের মিল না হলেও সে মীরা হয়ে উঠতে পারে নি। কুমুদিনীর জীবনে এইটেই সব চাইতে বড় দুঃখ, অত্যন্ত নিষ্ঠুর বাস্তবের কাছে সে অভিমানে আত্মসমর্পণ করেছে, তখন তার মন যে-কল্পলোকেই বিহার করে থাকুক, তাকে এই আত্মসমর্পণের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। মধুসূদনের একান্ত যান্ত্রিক দেহ-লালসা অপরিহার্য গর্ভ-ধারণের মধ্যে কুমুদিনীর মানসিকতাকে বিষিয়ে দিয়ে গেছে। সেই প্রথম দিকের ভূপালী সুরের গান, “আজু মোর ঘরে আইল পিয়রওয়া, রোমে রোমে হরখীলা” মিথ্যা হয়ে গেছে।

মধুসূদনের বাড়ীর মুখপাতটা হাল ফ্যাসানের এবং অন্দরটা সংস্কারের শ্যাওলায় বিবর্ণ ও জীর্ণ। “এই দুই মহল যদিও সংলগ্ন তবুও এর সম্পূর্ণ আলাদা দুই জাত।” বিপ্রদাসের পুরোনো জমিদার ঘরে বিলাত প্রবাসী কনিষ্ঠের কল্যাণে অথবা কালের প্রভাবে হালফ্যাসানের আসবাবও স্থান পেয়েছে। “বিপ্রদাসের মনের গতি হালের, তবু জাত-কুলের হীনতায় তাকে কাবু করে।” মধুসূদনের বাইরেটা হাল আমলের, ভেতরটা প্রাচীন সংস্কারে আচ্ছন্ন। সে স্ত্রীকে ভালবাসতে পারে, কিন্তু সে নিজের রীতিতে, নারীর যথাযথ মূল্য দিয়ে নয়, তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে নয়, ভোগ্যপণ্য ও দাসীরূপে।

কুমুদিনীর ঐখানেই অভিমান। দাদার শিক্ষাকে খোটা দিলে সে আহত হয়, মায়ের অলঙ্কারকে এবং দাদার দেওয়া আংটিকেই সে মহামূল্য মনে করে–মধুসূদনের অর্থগৃধ্নু মানসিকতার উপহার হীরের আংটি সেখানে তুচ্ছ। কিন্তু শোচনীয় পরিণতি এই যে, মধুসূদন যেখানে marriage, a legalised prostitution (কথাটা মূলত ফ্রিডরিশ এঙ্গেলসের, বার্ণার্ড শর নয়) এই তত্ত্বকে সত্য করতে চাইছে সেখানে কুমুদিনীর প্রতিরোধ স্থায়ী হ’তে পারে নি, একটা বিষম দ্বন্দ্ব তাকে অস্থির করে তুলেছে। অথচ এ শুধু প্রবৃত্তি প্রকৃতি ও সংযমের দ্বন্দ্ব নয়; তাহ’লেও বোঝা যেত; কেননা, কুমুদিনীর মনে ব আচরণে প্রবৃত্তি একেবারেই সক্রিয় নয় (যা বিমলার মধ্যে পাওয়া যায়), এ দ্বন্দ্ব রুচির। কুমুদিনী কল্পলোকে যে রাজপুত্রের গলায় মালা দিয়েছে সে সুরুচির সন্ত্রমে শ্রদ্ধেয়, মধুসূদনের কৃত্রিম রৌপ্যরূপের এবং স্থূল আচরণের সঙ্গে তার মিল নেই।

স্থূল জগতের রাজা মধুসূদন এল চোখ-ধাঁধানো ঐশ্বর্যের অহঙ্কার নিয়ে, ঘোষাল দিঘির চারি ধারের বন-জঙ্গল সাফ করে–মধুপুরী বসল পূর্ব-পুরুষের ভিটেয় (আজ যা হাত ছাড়া)।

কুমুদিনীর মনে এই লাগল প্রথম খটকা। কিন্তু বিয়ে ভেঙে দিতেও সে রাজী নয়–“ছি ছি, সে কি হয়?” আশা–দেবতা সব ঠিক করে দেবেন। “মনে মনে জোরের সঙ্গে জপতে লাগল, তিনি ভালোই হন, মন্দই হন তিনি আমার পরম গতি।” কুমুদিনী আরও ভাবল : “সতীধর্ম নির্ব্যক্তিক, যাকে ইংরেজীতে বলে ইম্পাসোনাল। মধুসূদন ব্যক্তিটিতে দোষ থাকতে পারে, কিন্তু স্বামী-নামক ভাব-পদার্থটি নির্বিকার নিরঞ্জন।” কিন্তু এই ভাবনা কি তার খুব গভীর ছিল?

আঘাতে আঘাতে এই বিশ্বাসের তীর তার ক্ষয়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে। বারে বারে সে প্রতিজ্ঞা করে, মন্ত্র জপে, ধৈর্য রাখতে চেষ্টা করে, কিন্তু সব ভেঙে যায়।

বিয়ের অনুষ্ঠানেও ভদ্রতা ও সৌজন্যের রকমভেদ ও বিরোধ ঘটেছে এবং তা কুমুদিনীকে আরও সংশয়িত করে তুলেছে : “ঠাকুর কি তবে আমাকে ভোলালেন?” কি ভুল? যেদিন সে বিপ্রদাসকে বলেছিল “তাঁর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ঠিক হয়েই গেছে” সেইদিন সকালে ঠাকুরকে উদ্দেশ করে মনে মনে বলেছিল, এই বেজোড় সংখ্যার ফুলে জোড় মিলিয়ে সব-শেষে যেটি বাকী থাকে তার রঙ যদি ঠাকুরের মতো নীল হয় তবে বুঝব তার ইচ্ছা। সব শেষের ফুলটি হল নীল অপরাজিতা।”

এ কি ইলিউসান? মোহ? এবং এখন থেকে সেই মোহমুক্তির সূচনা? ট্রাজেডি সেইখানে যেখানে মোহের মুক্তি ঘটতে পারে, কিন্তু বাস্তবজীবনের কঠোর বন্ধন থেকে মুক্তি নেই এবং কুমুদিনীর জীবনে তা হয়ও নি। আর পাঁচটি কন্যা পতিগৃহে যাবার সময় যে একটি অস্থায়ী বিষন্ন সুর ধ্বনিত করে, এতো তা নয়, এ যে একটা ট্রাডিসন, একটা মজ্জাগত ঐতিহ্যের চেতনাকে পীড়ন করা, ছিঁড়ে ফেলা। কুমুদিনী ঠাকুরের কাছে মাথা কুটছে আর বলছে : “আমি তো তোমাকেই বিশ্বাস করে সমস্ত স্বীকার করে নিয়েছি।’ কিন্তু সত্যিই সে নতুনকে, পরিবর্তনকে স্বীকার করতে পারে নি। ঠাকুরের উদ্দেশে এ তার অসত্য উক্তি। বাস্তব স্বামীর সঙ্গে প্রথম বিরোধ দেখা দিল তো ঐ নিয়েই, দাদার দেওয়া নীলার আংটি নিয়ে। পক্ষান্তরে মধুসূদনের সংস্কার এই নিয়ে একবার তলিয়ে যাচ্ছিল। কুমুদিনীর সংস্কার–এই নিয়েই সংসারে ভেসে থাকবে। কিন্তু সেই আংটি খুলে রাখতে হ’ল রাজা মধুসূদনের দাপটে। রাজার এই দাপট কুমুদিনীকে বিদ্রোহী করে তুলতে লাগল–এবং এই বিদ্রোহের আগুনে একের পর আর ইন্ধন পড়তে লাগল। কুমুদিনী নিজেই সে বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে পরাস্ত হয়।

“কুমুর যেদিন বাঁ চোখ নাচল সেদিন সে তার ভক্তি নিয়ে, আত্মাৎসর্গের পূর্ণ সংকল্প নিয়ে প্রস্তুত হ’য়ে দাঁড়িয়েছিল। কোথাও কোনো বাধা বা খর্বতা ঘটতে পারে একথা তার কল্পনাতেই আসে নি। দময়ন্তী কী করে আগে থাকতে জেনেছিলেন যে, বিদর্ভরাজ নলকেই বরণ করে নিতে হবে! তাঁর মনের ভিতরে নিশ্চিত বার্তা এসে পৌঁছেছিল–তেমনি নিশ্চিত বার্তা কি কুমু পায় নি? বরণের আয়োজন সবই প্রস্তুত ছিল, রাজাও এলেন, কিন্তু মনে যাকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল, বাইরে তাকে দেখলে কই? রূপেতেও বাধত না, বয়সে ও বাধত না। কিন্তু রাজা? সেই সত্যকার রাজা কোথায়?”

সে “চোখ বুজে খুব জোর করে নিজেকে” বলে, ‘স্বামীর বয়স বেশি বলে তাকে ভালবাসি নে একথা কখনোই সত্য নয়–লজ্জা, লজ্জা! এ যে ইতর মেয়েদের মতো কথা?’

কুমুদিনীর মন রুচির এমনই একটি উঁচু গ্রামে বাঁধা। এই তার দুঃখ, প্রবৃত্তি তৃপ্তির আয়োজন কেমন, এইটে বড় কথা তো নয়। এ চিন্তা তার মনে উদয় মাত্রই সে ছি ছি করে উঠেছে। আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, ঠাকুরের উদ্দেশে নিবেদন জানিয়েছে এবং “মধুসূদনকে যতই সে হৃদয়ের মধ্যে গ্রহণ করতে বাধা পায়, ততই তার দেবতাকে দিয়ে সে তার স্বামীকে আবৃত করতে চায়। স্বামীকে উপলক্ষ করে আপনাকে সে দান করছে তার দেবতাকে।” “মেরে গিরিধর গোপাল, ঔর নাহি কোহি’– দাদার কাছে শেখ মীরাবাই-এর এই গানটা বার বার মনে মনে আওড়াতে লাগল মধুসূদনের অত্যন্ত রূঢ় যে পরিচয় সে পেয়েছে তাকে কিছুই নয় বলে, জলের উপরকার বুদবুদ বলে উড়িয়ে দিতে চায়…

একি সহজ কথা? মোতির মা (মধুসূদনের ছোট ভাই নবীনের বৌ) কুমুদিনীর এই ধ্যানমূর্তি দেখেছিল। সে মনে মনে বলেছিল : “আমাদের যখন বিয়ে হয়েছিল তখন আমরা তো কচি খুকি ছিলুম, মন বলে একটা বলাই ছিল না। ছোটো ছেলে কাঁচা ফলটাকে যেমন টপ্ করে বিনা আয়োজনে মুখে পুরে দেয়, স্বামীর সংসার তেমনি করেই বিনা বিচারে আমাদের গিলেছে, কোথাও কিছু বাধে নি।…কিন্তু এ মেয়ের পক্ষে সে কতো বিড়ম্বনা।”

“একরকম জাতি ভেদ আছে যা সমাজের নয়, যা রক্তের–যে জাত কিছুতে ভাঙা যায় না। এই যে রক্তগত জাতের অসামঞ্জস্য এতে মেয়েকে যেমন মর্মান্তিক করে মারে পুরুষকে এমন নয়।” এতখানি উপলব্ধি ক’রেও মোতির মা কিন্তু কুমুদিনীর পরবর্তী কঠোর অসহযোগী মূর্তি সহ্য করতে পারে নি।

ফুলশয্যারাতে কুমুদিনী মূর্ছা গেছে।

শ্যামাসুন্দরীর মুখে একথা শুনে মধুসূদনের মনটা দপ ক’রে জ্বলে উঠল; বললে, “কেন তার হয়েছে কী।” সুস্থ হয়ে কুমুদিনী মধুসূদনের ঘরে এলে মধুসূদন বলল, “ওই নুরনগরি চাল ছাড়তে হবে।” এটি মধুসূদনের পক্ষে যেমন স্বাভাবিক ক্ষোভের কথা, কুমুদিনীর পক্ষেও তেমনি সহজেই আহত হওয়ার কথা।…কুমুদিনী নিজেকে অনেক কষ্টে সংযত করল। তার এই মৌনতায় মধুসূদনের ক্ষোভ বাড়ল এবং ক্রোধের বশবর্তী হলে সে কতটা নেমে যেতে পারে তার পরিচয় দিয়ে বলল, “তুমি তোমার দাদার চেলা…আমি তোমার সেই দাদার মহাজন, তাকে এক হাটে কিনে আর এক হাটে বেচতে পারি।”

এই হ’ল আসল জাতিভেদ–এ জাত কিছুতে ভাঙা যায় না।

তার দাদার আশীর্বাদী (নীলার) আংটি চুরি গেল। চোর স্বয়ং মধুসূদন। চুরি নয়, ডাকাতি। জবরদস্তিই মধুসূদনের জাতি-বৈশিষ্ট্য। মোতির মা ক্ষুব্ধ কুমুদিনীকে বলল, “জান না, চিঠিতে দাসী বলে দস্তখত করতে হবে?” কুমুদিনী বলেছিল, “স্ত্রী যাদের দাসী তারা কোন্ জাতের লোক?”

কুমুদিনীর শিক্ষার বয়ানের সঙ্গে এ বাস্তব সত্যের মিল নেই। গৃহিণীসচিবঃ সখীমিথঃ প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌ। তবু সে বলল, “আমি সেই গোলামিই করব।” মোতির মাকে বলল, “নিজেকে দেব বলেই তৈরি হয়ে এসেছিলুম, কিন্তু ও কিছুতেই দিতে দিলে না। এখন দাসী নিয়েই থাকুক। আমাকে পাবে না।”

কিন্তু জাতি স্বাতন্ত্র্য যাবে কোথায়, সে যে তার রক্তে? গোলামি করব বলেই যেমন কুমুদনীর পক্ষে গোলামি করা যায় না, ভদ্র হব বললেই তেমনি মধুসূদনের ভদ্র হওয়া সম্ভব নয়। মধুসূদন সব জিনিসই বিচার করে মণিমুক্তোহীরের আলোয়, অর্থোপার্জনের কষ্ট ও অর্থের কদর সে জানে। বিপ্রদাস ঋণগ্রস্ত হলেও তার, সুতরাং, কুমুদিনীর অর্থাগম হয়েছে সহজ পথে, তাদের কাছে অর্থটা আলো জল হাওয়ার মতই গৌণ, প্রতি মুহূর্তে মনে ক’রে রাখবার জিনিস ছিল না, তাই তাদের মনোবৃত্তি বিকাশ পেয়েছে ভিন্ন প্রকৃতির আওতায়। মধুসূদন কুমুদিনীকে অর্থের লোভ দেখিয়ে বশ করতে চায়, তার স্থির ধারণা, কুমুদিনী তাকে বড়ো জেনে আসেনি, এসেছে টাকার লোভে। মধুসূদনের এ ধারণাটা যে একেবারেই সত্য নয়, একথা বুঝবে কি করে মধুসূদন? তার রক্তে সে বোধশক্তিই যে নেই। এরা যে দুই পৃথক জাত। মধুসূদন ললে, “এ বাড়িতে তোমার স্বতন্ত্র জিনিস বলে কিছু নেই।” তাই সে অনায়াসে নীলার আংটি অপহরণ করতে পারে। এক্ষেত্রে মধুসূদনের পক্ষে বলার কথা এই যে, যদি তার সংস্কার থাকে যে নীলার আংটি সর্বনেশে তবে সে তা অপসারণ করতে পারে; সেখানে কুমুদিনীকে বুঝিয়ে বলার অবকাশ ছিল। কিন্তু জবরদস্তিতে যে অভ্যস্ত সে বুঝিয়ে বলার পথ বাছবে কি করে?

কুমুদিনীর অসহযোগিতা সুরু হ’ল। সেজ বাতির ঘরে সে দাসীপনা সুরু করল। মধুসূদন বলল, “দেখি কতদিন থাকতে পারে।” মধুসূদনের মনে একথা হতেই পারে। তার বিচারের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার সঙ্গে এর সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রয়েছে। কিন্তু মধুসূদন অর্থোপার্জনে অসাধারণ হলেও সাধারণ মানুষ। বয়স পার হয়ে যাবার পর একটু বেশী বয়সে একবার যখন বিয়ে করলই, তখন আর ধৈর্যের বাঁধ রক্ষা করা দায় হয়ে উঠল। অর্থোপার্জনে যে রুক্ষতা ও বেপরোয়া ভাব, এখানেও তাই; একটি নারীদেহকে বিবাহসূত্রে যখন আনা গেছে তখন ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির সকল কিছু এর কাছ থেকে পুরো আদায় ক’রে নিতে হবে। সে আশ্চর্য হ’য়ে গেল, ঐ মেয়ে স্বর্ণালঙ্কার বা হীরের আংটিতে বশীভূত নয়। না হোক, উপেক্ষাও সে সইতে পারে না–বাইরে রাজা বাহাদুরকে কেউ উপেক্ষা করতে সাহস পায় না, ভেতরের লোকে ভয় পায়। কুমুদিনী তার ব্যতিক্রম হবে?

তারপর বিপ্রদাসের চিঠি-টেলিগ্রাম নিয়ে মধুসূদনের কারচুপি। এও তার প্রকৃতিগত এবং এ সহ্য না করাও কুমুদিনীর প্রকৃতিগত। মধুসূদন চায় এই ভাবেই বন্য বাঘিনীকে আয়ত্তে আনবে, কুমুদিনী আশা ক’রে থাকে মধুসূদনের ইতরপনা একদিন ঘুচবে, কুমুদিনী তার প্রাপ্য মর্যাদা পাবে। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একবার যদি বা সে আত্মসমর্পণের জন্য এগোয়, আবার আহত হয়ে ফিরে আসে।

এদিকে মধুসূদনের দিকে “যে বিবাহিত স্ত্রীর দেহমনের উপর তার সম্পূর্ণ দাবী সেও তার পক্ষে নিরতিশয় দুর্গম। ভাগ্যের এমন অভাবনীয় চক্রান্তকে সে কোন দিক থেকে কেমন করে আক্রমণ করবে ভেবে পায় না।” ক্রমে সে বেপরোয়া হ’য়ে ওঠে। ব্যবসায় কাজেও শৈথিল্য ঘটতে লাগল। একদিন সে নিজেই তেলবাতির কুঠুরির ঘরে গিয়ে কুমুদিনীর সঙ্গে সন্ধি করল, কুমুদিনী মধুসূদনের আহ্বান উপেক্ষা করতে পারল না, ঘরে এল। সে মনকে বোঝালো এ সেই ঠাকুরেরই আহ্বান। “নিমেষে নিমেষে তার হাতে তাঁর হাত আছে, তার সমস্ত শরীরে তাঁর সর্বব্যাপী স্পর্শ অবিরাম বিরাজমান।” “তিনি রইবেন ছদ্মবেশে।”

এ কি সত্য? এবং এ কি সম্ভব? তবে খুঁটিনাটি নিয়ে বিতর্ক বিবাদ বাধে কেন রোজ? দেহ নিবেদনের পর কেন এই অশুচিতার সংশয় জাগে? “যে আহ্বানকে সে দৈব বলে মেনেছিল, সে কি ওই অশুচিতার মধ্যে, এই আন্তরিক অসতীত্বে?…যে-শরীরটার মধ্যে মন নেই সেই মাংসপিণ্ডকে করবেন তাঁর নৈবেদ্য?”

ঠাকুরের প্রতি বিশ্বাস গেল নড়ে, আর তো ভক্তি অচঞ্চল রইল না। তার কল্পনার সঙ্গে যে কোথাও মিল নেই।

এ কি ডিস-ইলিউসান? মোহমুক্তি?

“একটা কালো কঠোর ক্ষুধিত জরা বাহির থেকে কুমুকে গ্রাস করছে রাহুর মতো…যা লীলায়িত, যার সংযমের শক্তি শিথিল, যার প্রেম বিষয়াসক্তিরই স্বজাতীয়, তারই স্বেদাক্ত স্পর্শে কুমুর এত বিতৃষ্ণা।”

আর “মধুসূদন যা চায় তা পাবার বিরুদ্ধে ওর স্বভাবের মধ্যেই বাধা।” এ স্বভাবকে বদলাবার চেষ্টায় তার ছোটভাই যে ফন্দী এঁটেছিল তার ফলও স্থায়ী হয় নি।

কুমুদিনী যখন কিছুতেই মন দিয়ে মধুসূদনকে গ্রহণ করতে পারল না, মধুসুদনও কুমুদিনীকে সর্বতোভাবে পেল না কিন্তু তার মধ্যে ক্ষুধিত বাঘ সারাক্ষণ তাকে যন্ত্রণা দিতে লাগল এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায় সামলাবার জন্য সেদিকে মনোযোগ দিতে হ’ল তখন কুমুদিনীর লাঞ্ছনা সুরু হ’ল অন্যভাবে। শ্যামাসুন্দরী হ’ল বাঘের শিকার। এই সংকটের মুখেই কুমুদিনী গেল দাদার কাছে। কথা ক্রমে বিপ্রদাসের কাছে এবং কুমুদিনীর কানেও গেল। বিপ্রদাস আর কুমুদিনীকে লাঞ্ছনার মধ্যে ফিরে যেতে বলতে রাজী নয়। বিপ্রদাস কুমুদিনীকে বলল, “আমি দেখতে পাচ্ছি, মেয়েদের যে অপমান, সে আছে সমস্ত সমাজের ভিতরে, যে কোন একজন মেয়ের নয়।…কুমু, অপমান সহ্য করে যাওয়া শক্ত নয়, কিন্তু সহ্য করা অন্যায়। সমস্ত স্ত্রীলোকের হয়ে তোমাকে তোমার নিজের সম্মান দাবী করতে হবে, এতে সমাজ তোমাকে যত দুঃখ দিতে পারে দিক।” বিপ্রদাস লড়াইয়ের সঙ্কল্প জানাল। “যে সমাজ নারীকে তার মূল্য দিতে এত বেশি ফাঁকি দিয়েছে তার সঙ্গে লড়াই।”

মোতির মা যখন কুমুদিনীকে স্বামীর ঘরে ফিরে যাবার কথায় বলল, “পুরুষেরা ভেসে বেড়াতে পারে; মেয়েদের কোথাও স্থিতি চাই তো।” বিপ্রদাস বলল, স্থিতি কোথায়? অসম্মানের মধ্যে? মোতির মা বলেছিল “একদিন ওখানে যেতে তো হবেই, আর তো রাস্তা নেই।” বিপ্রদাস বলেছিল, “যেতেই হবে এ কথা ক্রীতদাস ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষে খাটে না।”

মোতির মার সঙ্গে আলাপ করে “বিপ্রদাস বুঝতে পারলে মেয়েদের সম্মান মেয়েদের কাছেই সবচেয়ে কম।” কুমুদিনীকে সে যখন বোঝাতে চেষ্টা করেছে কুমুদিনীও জানতে চেয়েছে : “দাদা তুমি কি বল স্ত্রী স্বামীকে অতিক্রম করবে?” বিপ্রদাস জবাব দিয়েছিল, “অন্যায় অতিক্রম করা মাত্রকেই দোষ দিচ্ছি। স্বামী ও স্ত্রীকে অতিক্রম করবে না–এই আমার মত।”

মোতির মার দৃষ্টিতে এসব বাড়াবাড়ি। সে বিরক্ত হ’ল।

মধুসূদন যখন নিজে এসে কুমুদিনীকে ঘরে ফিরতে বলল, কুমুদিনী বলল, না। মধুসূদনের তখন অর্থের জবরদস্তিটাই একমাত্র হাতিয়ার হিসাবে মনে পড়ল। পুলিশের ভয় দেখাল। বিপ্রদাসকেও বলে গেল “তোমার নুরনগরের নুর মুড়িয়ে দেব তবে আমায় নাম মধুসূদন।

বরাবর এই-ই মধুসূদন; গ্রাম্য, ইতর, দাস্তিক, সংস্কৃতি-সৌজন্যে চিহ্নমাত্র নেই, কিন্তু একান্ত স্বাভাবিক। কালুদা শুনে বলল, সর্বনাশ। বিপ্রদাস বলল, “সর্বনাশকে আমরা কোনো কালে ভয় করি নে, ভয় করি অসম্মানকে।”

কিন্তু ইতিমধ্যে যে চবম সর্বনাশের সংবাদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল তা তো ওরা ভাবতে পারে নি। ক্ষেমা পিসির সঙ্গে মোতির মা লক্ষণ মিলিয়ে সন্দেহ করছে–“কুমুগর্ভিণী। মোতির মা খুশি হয়ে উঠল।…এযে নাড়িতে গ্রন্থি লাগল, শুধু তো আঁচলে আঁচলে নয়, পালাবে কেমন করে!”

শুনে কুমুর মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। ‘স্বামীর সঙ্গে কুমুর অল্পকালের পরিচয় দিনে দিনে ভিতরে ভিতরে কী রকম যে বিকৃত মূর্তি ধরেছে গর্ভের আশঙ্কায় ওর মনে সেটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠল। মানুষে মানুষে যে ভেদটা সবচেয়ে দূরতিক্রমণীয় তার উপাদানগুলো অনেক সময়ে খুব সূক্ষ্ম। ভাষায় ভঙ্গিতে, ব্যবহারের ছোটো ছোটো ইশারায়, যখন কিছুই করছে না, তখনকার অনতিব্যক্ত ইঙ্গিতে গলার সুরে, রুচিতে, রীতিতে, জীবনযাত্রার আদর্শে, ভেদের লক্ষণগুলি আভাসে ছড়িয়ে থাকে। মধুসূদনের মধ্যে এমন কিছু আছে যা কুমুকে কেবল যে আঘাত কবেছে তা নয়, ওকে গভীর লজ্জা দিয়েছে। ওর মনে হয়েছে সেটা অশ্লীল। মধুসূদন তার জীবনের আরম্ভে একদিন দুঃসহভাবেই গরিব ছিল, সেই জন্যে পয়সার মাহাত্ম্য সম্বন্ধে সে কথায় কথায় যে মত ব্যক্ত করত সেই গর্বোক্তির মধ্যে তার রক্তগত দারিদ্রের একটা হীনতা ছিল। এই পয়সা পূজার কথা মধুসূদন বার বার তুলত কুমুর পিতৃকূলকে খোঁটা দেবার জন্যেই। ওর সেই স্বাভাবিক ইতরতায়, ভাষায়, কর্কশতায়, দাম্ভিক অসৌজন্যে, সবসুদ্ধ মধুসূদনের দেহ মনের। ওর সংস্কারের আন্তরিক অশোভনতায় প্রত্যহই কুমুব সমস্ত শরীর মনকে সংকুচিত করে তুলেছে।…(সেই) মধুসূদনের সঙ্গে ওর রক্তমাংসের বন্ধন অবিচ্ছিন্ন হ’য়ে গেল, তার বীভৎসতা ওকে বিষম পড়া দিলে।”

খবরটা বিপ্রদাসের কানে গেল। মধুসূদনের তরফ থেকে ভয়দেখানো চিঠি আসতেও লাগল। কিন্তু বিপ্রদাসের আর সংগ্রামের সকল্প নেই। শেষ পর্যন্ত কুমুদিনীকে সে এই বলে সান্ত্বনা দিল, “তোর ভালোই লাগবে। আর কিছুদিন পরেই তোর মন ভরে উঠবে।”

সেই অসম্মানের সেই লাঞ্ছনার সেই দাসত্বে এবং সেই মধুসূদনের অশ্রদ্ধেয় স্থূল legalised prostitution এর ঘরে ফিরে যেতে হবে–“তোকে নিষেধ করতে পারি এমন অধিকার আর আমার নেই। তোর সন্তানকে তার নিজের ঘর ছাড়া করব কোন স্পর্ধায়?”

এ নিতান্তই ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ, অন্যায় জেনেও অন্যায়ের কাছে আত্মবলিদান, মধুসূদনের কুরুচির কাছে নতিস্বীকার–একটি মাত্র যুক্তিতে, কুমুদিনী গর্ভিণী। ঘোষাল-চাটুয্যের দ্বন্দ্ব-সমাস এইখানে এসে মিলল এবং এই কি যোগাযোগ?

তবু কুমু জেদ করে বলছে, “চলে আসবই এ তুমি দেখে নিয়ো মিথ্যে হয়ে মিথ্যের মধ্যে থাকতে পারব না। আমি ওদের বড়ো বউ তার কি কোনো মানে আছে যদি আমি কুমু না হই।”

কিন্তু এই পরিণত বয়সের, ১৯-২০ বছরে পরিণত স্বাতন্ত্র্যবোধ, এই তো ছোট ছোট পবিবারে সঙ্কট সৃষ্টি করছে। এ টানছে এদিকে, ও টানছে ওদিকে, বন্ধন শুধু অবাঞ্ছিত বালগোপালগোষ্ঠী। এ যে আরও অস্বস্তির কারণ। সব যুক্তির পরও তাই কেমন একটা বিষণ্ণতার নিস্তব্ধ সুর যোগাযোগের উপসংহারে। বিপ্রদাসের নির্ভাবনার আশ্বাস অন্তহীন ভাবনারই নামান্তর। কিছুরই যেন প্রয়োজন নেই। একটা পরম ঔদাসীন্য। রোদ আসছে আসুক। বিছানার নীচে টম কুকুরটা গুমরে গুমরে কেঁদে উঠল।

এ কি নিদারুণ অবসন্ন বিষন্ন সমাপ্তি!