রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস

বউঠাকুরানীর হাট

পুলকেশ দে সরকার

বউঠাকুরানীর হাট উপন্যাসটির উল্লেখ করিনি। কেননা, রবীন্দ্র পটভূমিকায় অথবা যে রাবীন্দ্রিক মানদণ্ডের দিকে লক্ষ্য রেখে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস বিশ্লিষ্ট করতে চাইছি সেদিক থেকে বউঠাকুরানীর হাট আদৌ উল্লেখযোগ্য নয়। এমন অনেক বই বাংলাসাহিত্যে ঝরে পড়ে গেছে, ঝরে পড়ে যাবে, এবং ঝরে পড়াই বাঞ্ছনীয়। বউঠাকুরানীর হাট রবীন্দ্র রচনাবলীতে স্থান পেতে পারে বা না পারে, কিন্তু বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের তালিকায় এর স্থায়ী আসনের দাবি থাকা উচিত নয়। এর প্রথম প্রকাশ ১২৮৯ সালের পৌষে; আজ থেকে ৭৮ বছর আগে। অথবা ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে। রবীন্দ্রনাথ নিজে এর কোন সংস্কার করেন নি, ১৩৩৯ সালেও নয়। ইতিহাসের দিক থেকে, রবীন্দ্রনাথের রাবীন্দ্রিক পরিণতির দিক থেকে তার মূল্য আছে। কেননা, এযুগ বঙ্কিমচন্দ্রের রোমাটিক যুগ; দামোদর শ্রেণীর অনেকে তাঁর অনুকরণ করেছেন, ভাব-ভাষা, আঙ্গিক উপজীব্য সব কিছু। রবীন্দ্রনাথের বউঠাকুরানীর হাট সে-যুগের ব্যতিক্রম নয়। এর নায়ক যশোরাধিপতি প্রতাপাদিত্য। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র উদয়াদিত্য, উদয়াদিত্যের স্ত্রী সুরমা, বসন্ত রায় প্রতাপাদিত্যের কাছে অসহায়। প্রতাপাদিত্যের বাৎসল্যের চাইতে রাজকীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রবলতর, পুত্রবধূকে বিষ খেতে হয়, এজন্য রাজপরিবারে কোন অনুশোচনা নেই, প্রতাপাদিত্য পাঠান ঘাতক পাঠিয়ে ছেলেকে বন্দী করেন, বন্দীশালায় রাখেন; পিতৃব্যকে পাঠানের ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। পুত্র যেমন বিদ্রোহ করে না, পিতার বন্দীশালায় আত্মসমর্পণ করে, পিতৃব্যও তেমনি ঘাতককে আঘাত করার জন্য আহ্বান করেন। কোন প্রতিকার নেই। প্রতাপাদিত্যের একমাত্র কন্যা প্রতাপের দম্ভের পোষণে পতিগৃহে যেতে পারে না, যখন যায় তখন তার পতিগৃহে অনাদর শুধু নয়, পতি দ্বিতীয় পত্নী ঘরে আনছেন। উদয়াদিত্য নিজের বোনকে নিয়ে কাশী গেল। বউঠাকুরানীর হাট প্রতিষ্ঠা করল। কাহিনীর সঙ্গেও এর সামঞ্জস্য, বিধান কঠিন। আগাগোড়াই গল্পের ছন্দ কেমন দুর্বল। বঙ্কিমচন্দ্রে যেমন অলৌকিকতা বা সন্ন্যাসীর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে, বউঠাকুরানীর হাটেও তেমনি এক মায়াবিনী ডাইনী আছে। তবে এ ডাইনীর আচরণ মূলত মানবিক প্রবৃত্তিজাত ঈর্ষার তাপে নিয়ন্ত্রিত।

বউঠাকুরানীর হাটের যে-কোন সংলাপে এই কাহিনীর প্রকৃতি ধরা পড়ে।

“বসন্ত রায় অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন; পরে ধীরে ধীরে উঠিয়া কহিলেন, ভালো প্রতাপ, আজ সন্ধ্যাবেলায় তবে আমি চলিলাম। আর একটি কথা না বলিয়া বসন্ত রায় ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন।”

সকল ঔপন্যাসিক ক্রটি সত্ত্বেও যে-কৌতুহলের মধ্যে পাঠককে বরাবর আকর্ষণ করে সেটি একটি মহৎ ভাব এবং সে-মহৎ ভাবের প্রতীক বসন্ত রায়। তার জীবন সঙ্গীতময়, সুর ও ছন্দে নন্দিত, সঙ্গীত ও সঙ্গীতের যন্ত্র তাঁর সাথী, তাঁর হৃদয় ভালবাসা ও ক্ষমায় পরিপূর্ণ, তাঁর হৃদয় কুম্ভে বাৎসল্য রস উপচীয়মান। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা–তিনি সর্ব অবস্থায় নির্ভীক, মৃত্যুভয়হীন। এই নির্ভীকতায় অহেতুক কোন আড়ম্বর বা গর্জন নেই, প্রশান্তসাগরের মতো সে নির্ভীকতা নিস্তরঙ্গ ও স্নিগ্ধ। নাতি নাতনীকে লোকে যে-ভাবে আহ্বান করে, তিনি মৃত্যুকেও তেমনি অকুণ্ঠ স্নেহে ডাকেন, এসো এসো। প্রতাপাদিত্য তাঁর পেছনে ঘাতক লাগিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই মহৎ ব্যক্তিটির সংস্পর্শ ঘাতকের নিষ্করুণ হৃদয়েও দ্বিধা ও অনুতাপ আনে। মরতে ইচ্ছে বলে যেমন উত্তেজনা নেই, বেঁচে গেলেন বলেও তেমনি উল্লাস নেই। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভ্রাতুষ্পুত্র প্রতাপাদিত্য যেখানে হিংসায় উন্মত্ত, প্রতাপাদিত্যের জ্যেষ্ঠপুত্র যেখানে নিবীর্য, সেখানে বসন্ত রায় মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ দেখে বলেন, “রোসো, ইস্টের নাম নি। তারপর নিজেই ঘাতককে ডাকেন, “সাহেব, এইবার!” এ যেন সেই একই আচরণের পুনরাবৃত্তি–সেই যখন জানা গেল, প্রতাপাদিত্য পিতৃব্যকে হত্যার আয়োজন করেছেন, জানা গেল, ঘাতকের মুখেই, সে-কথা শুনে ছুটলেন প্রতাপাদিত্যকে আশীর্বাদ করতে।

আগাগোড়া সঙ্গতিপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাড়া প্রতাপাদিত্যের চরিত্রে রাজকীয় অভিজাত কোন গুণ প্রকাশ পায় নি–প্রতাপাদিত্য অতি সাধারণ চরিত্র, উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্তির জন্য একটি একরোখা ও কুটিল কেরানী যা করতে পারে এ যেন তাই।

সুরমার নম্রতা বা উদয়াদিত্যের বাধ্যতার মধ্যে কোনো বীর্যের পরিচয় নেই, একটা কুৎসিত অবাঞ্ছিত ভীতিই তাদের আচরণকে সর্বাংশে হেয় করেছে। এক বসন্ত রায়ই এই গ্যাস বাষ্পের বদ্ধজলায় আকস্মিক পঙ্কজ। কিন্তু উপন্যাসটি ব্যর্থ–বসন্ত রায় একটি অনবদ্য গল্পেরও শ্রী হ’তে পারত। বসন্ত রায় বউঠাকুরানীর হাটের জিনিস নয়।