পাতার নাম মূলগ্রন্থে নেই।
রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে যে বিশেষণই প্রয়োগ করি না কেন, দেখা যাবে, বহুবার তার প্রয়োগ হয়ে গেছে। যদি বলা যেত, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস এক স্বতন্ত্র রাজ্য, তাহলে হয়তো কিছু নতুন বলা হ’ত; কিন্তু সে-কথা সত্যি হ’ত না। কেননা, তাঁর উপন্যাসের উপাদান ও সংগঠনে পূর্ববর্তীদের অনুসৃতি আছে। অথবা যদি বলা যেত, রবীন্দ্রনাথেরই সমগ্র সাহিত্যের মধ্যে–তাঁর কবিতা, গান, নাটক, প্রবন্ধ, এমন কি গল্পগুচ্ছ থেকেও তার উপন্যাসের জগৎ আলাদা, হয়তো তাতে একটা নতুন জিজ্ঞাসার অবলম্বন পাওয়া যেত, কিন্তু সেও সত্যি হ’ত না; কেননা, সেখানেও রবীন্দ্রনাথের মৌলিক স্বরটি প্রতিধ্বনিত।
এই উপন্যাসের ক্রমিক ধারার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের গদ্য ভাষার ক্রমবিকাশও অত্যাশ্চর্যরকমে দৃশ্যমান। শব্দ-নির্বাচন ও বিন্যাস-কৌশলে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা সূর্যালোকের মতো স্বীকৃত, কিন্তু এই নৈপুণ্য সূচনাকালেই অথবা একই কালে প্রস্ফুটিত হয়নি, কালক্রমে পুষ্টিলাভ করেছে। তাঁর কাব্য-কবিতায় তিনি বহু বিচিত্র সুদৃশ্য বর্ণের যে পুষ্পোদ্যান সাজিয়েছেন তা এই স্বনির্বাচিত ও সুসন্নিবিষ্ট শব্দ-সম্ভারেরই বাঙ্ময় রূপ। তাঁর প্রবন্ধ রচনায়ও শব্দ-সমষ্টি সার্থক যোজনাবলে ব্রহ্মশক্তি লাভ করেছে। কিন্তু তার উপন্যাসের ভাষা সম্পর্কে সর্বত্র এ কথা খাটে না। মাঝে মাঝে এখানেও কাব্যরূপ আছে, কেননা, তাঁর মন প্রধানত বিশ্লেষণধর্মী কবি-সুলভ; প্রকৃতি অথবা পরিবেশ-বর্ণনায় এই ধর্ম স্বতঃপ্রকাশ, পাছে কাহিনী কাব্যোচ্ছ্বাসে ব্যাহত হয় সেজন্য তা পরিমিতির সীমায় সুন্দরও সন্দেহ নেই; কিন্তু নৌকাডুবি, চোখের বালি, গোরা-কে লক্ষ্য ক’রে বলতে পারি, তাঁর উপন্যাসের ভাষা, এমন কি বর্ণনারীতি, কাব্য বা প্রবন্ধের মতো বলিষ্ঠ নয়, কোথাও কোথাও দুর্বল ও ক্লান্ত। চার অধ্যায় বা শেষের কবিতার জাত আলাদা; প্রথমটিকে রাজনৈতিক, দ্বিতীয়টিকে সামাজিক শ্লেষ বলে গণ্য করলেও, এ দুটোয় ভাষার গতিতে দ্বিধা বা শব্দ-দৈন্য নেই; অবাধ প্রপাতের মতো অনর্গল নেমে গেছে। একটু আগে যে তিনখানি উপন্যাসের নাম করা গেল তাদের ক্ষেত্রে একথা খাটে না। রবীন্দ্রনাথের অভিব্যক্তিসৌকর্যে অভ্যস্ত আমাদের মনে ঐসব বইয়ের কোন কোন জায়গা অরাবীন্দ্রিক বলে প্রত্যাখ্যান করতে ইচ্ছে জাগে। এই ‘প্রত্যাখ্যান’ শব্দটিই তিনি নৌকাডুবিতে যেখানে ব্যবহার করেছেন সেখানে ‘প্রত্যাহার’ শব্দটিই উপযুক্ত : “এই অবস্থায় যখন ক্ষেমংকরী বিবাহের প্রস্তাবটাকে কতকটা প্রত্যাখ্যান করিয়া লইলেন তখন হেমনলিনীর মনে দুই বিপরীত ভাবের উদয় হইল।” আর এক জায়গায় : “এই বলিয়া রমেশ নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের কার্যভার লইয়া প্রস্থান করিল।” এখানে প্রকৃত অর্থ এই যে, ইতিমধ্যে যে নিমন্ত্রণ হয়ে গেছে তা প্রত্যাহার ক’রে অন্য কোন দিন স্থির করা।
ভাষার দিক থেকে নৌকাডুবি-চোখের বালি-গোরাকে এক প্রান্তে এবং চার অধ্যায়-শেষের কবিতাকে যদি আর এক প্রান্তে রাখা যায় তবে ‘ঘরে-বাইরে’ দিয়ে এই দুয়ের ব্যবধানের ওপর সেতু গড়া যায়। কেননা, ‘ঘরে বাইরে’র রচনা স্পষ্টতই সূচনার ভাষাকে ছেড়ে আসা এবং শেষের কবিতায় পরিণত হওয়ার নির্ভুল ইঙ্গিত। শুধু তাই নয়, নৌকাডুবি-চোখের বালি-গোরার ভাষায় যে প্রাক-রবীন্দ্র উপন্যাসের ভাষার অনুসৃতি অনস্বীকার্য, ঘরে বাইরেতে তার অস্বীকৃতি নিঃসন্দেহ। ঘরে-বাইরের ভাষা একান্তভাবে রাবীন্দ্রিক এবং পররর্তীকালের দিগদর্শন। ইচ্ছে হচ্ছে এও বলি, ভাব-রাজ্যেরও এখানে বিচ্ছেদ সুরু হয়েছে, যদিও ঘরে-বাইরে-কে আমি ভাবরাজ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখরের সগোত্র মনে করি। ঘরে-বাইরে সম্পর্কে লেখকের যে-মনোভাবই থাক অথবা যে-প্রেরণা থেকেই এর জন্মলাভ হয়ে থাক না কেন, পাঠকের কাছে যেভাবে তা উৎসারিত বা প্রতিভাত হয়েছে তা যদি যুক্তিগ্রাহ্য হয় তবে তাও সমান সত্যের মর্যাদা দাবী করতে পারে, সম্ভবত বেশীই পারে, কোন কোন ক্ষেত্রে সর্বাংশে পারে। এর আপেক্ষিকতা নির্ভর করে সৃষ্টিক্রিয়ায় লেখক কতখানি সচেতন এবং পাঠক কতটা গ্রাহ্যশক্তি ধরে না তার ওপর। প্রবাদ আছে, বিশ্বস্রষ্টা বিশ্বকর্মা নিজের পুত্র সৃষ্টিকালে চামচিকা নামে এক নগণ্য জীবের অতিরিক্ত সৃষ্টি করতে পারলেন না। স্বর্গকে লক্ষ্য করেও ত্রিশঙ্কু অবস্থা হ’তে পারে এবং বিশ্বামিত্রের মতো ঋষিও সৃষ্টিকার্যে ব্যর্থ হতে পারেন। পক্ষান্তরে, সৃষ্টির তাৎপর্যকে না বুঝে পাঠকও কোন নির্বোধ উপসংহারে পৌঁছোতে পারেন। সুতরাং, বিচারকালে লেখকেরই কি, পাঠকেরই কি, সম্ভাব্য সিদ্ধান্তগুলো দ্বিতীয়বার ভেবে দেখতে হবে।
কিন্তু ভাষা বা বাহ্যিক আবরণ বিচার-বিশ্লেষণের পরই অন্তরের বস্তু উন্মোচন ও উপলব্ধির চেষ্টা সমগ্রকে পাওয়ার সহজ পথ মনে করি।
নৌকাডুবির জন্ম বা আবির্ভাবকাল ১৯০৬। তার কাহিনীর ভাষা এই :
“এ পর্যন্ত বিবাহ সম্বন্ধে কোনো পক্ষ হইতে কোনো প্রস্তাব হয় নাই। অন্নদাবাবুর দিক হইতে না হইবার একটু কারণ ছিল। একটি ছেলে বিলাতে ব্যারিস্টার হইবার জন্য গেছে, তাহার প্রতি অন্নদাবাবুর মনে মনে লক্ষ আছে!”
এর সংলাপের ভাষা :
অন্নদাবাবু কহিলেন, “এই যে রমেশ, ভাগ্যে পথে দেখা হইল। আজকাল চিঠি লেখাই বন্ধ করিয়াছ, যদি বা লেখ তবু ঠিকানা দাও না। এখন যাইতেছ কোথায়? বিশেষ কোনো কাজ আছে?” রমেশ কহিল, “না, আদালত হইতে ফিরিতেছি।”
এর সঙ্গে আর এক প্রান্তের শেষের কবিতার ভাষা মিলিয়ে পড়লেই অসাধারণ রূপান্তর দৃষ্টিগোচর হবে :
“অমিত বলে, ফ্যাশানটা হল মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী। ওর মতে, যারা সাহিত্যের ওমরাও দলের; যারা নিজের মন রেখে চলে, স্টাইল তাদেরই। আর যারা আমলা দলের, দশের মন-রাখা যাদের ব্যবসা ফ্যাশান তাদেরই।”
এর সংলাপ :
লিসি–এম. এ.তে বটানিতে ফার্স্ট। বিদ্যেকেই তো বলে কালচার।
অমিত–কমল-হীরের পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে-আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার।
শেষের কবিতার রচনাকাল বাংলা ১৩৩৬ (ইং ১৯৩০) ভাদ্রমাস।
যাকে আমি এই দুইয়ের ব্যবধানের ওপর সেতু বলেছি সেই ‘ঘরে-বাইরে’র ভাষা হচ্ছে এই :
“স্বামীকে দেখলুম তার সঙ্গে ঠিক মেলে না। এমন কি তাঁর রঙ দেখলুম আমারই মতো। নিজের রূপের অভাব নিয়ে মনে যে সংকোচ ছিল সেটা ঘুচল বটে কিন্তু সেই সঙ্গে একটা দীর্ঘ নিশ্বাসও পড়ল।”
এর সংলাপ :
নিখিলেশ–আমি চাই, বাইরের মধ্যে তুমি আমাকে পাও আমি তোমাকে পাই। ওইখানে আমাদের দেনা-পাওনা বাকী আছে।
বিমলা–কেন, ঘরের মধ্যে পাওয়ার কমতি হ’ল কোথায়?
নিখিলেশ–এখানে আমাকে দিয়ে তোমার চোখ-কান-মুখ সমস্ত মুড়ে রাখা হয়েছে। তুমি যে কাকে চাও তাও জান না, কাকে পেয়েছ তাও জান না।
‘ঘরে বাইরে’র রচনাকাল ১৯১৬ (বাং ১৩২২)।
তাহ’লে একপ্রান্তে ১৯০৬, আর একপ্রান্তে ১৯৩০, মাঝখানে ১৯১৬।
গোরার ভাষা :
“তখন কলিকাতার গঙ্গা ও গঙ্গার ধার বণিক সভ্যতার লাভলোলুপ কুশ্রীতায় জলে-স্থলে আক্রান্ত হইয়া তীরে রেলের লাইন ও নীরে ব্রীজের বেড়ি পরে নাই। তখনকার শীত সন্ধ্যায় নগরের নিঃশ্বাস কালিমা আকাশকে এমন নিবিড় করিয়া আচ্ছন্ন করিত না।
এর সংলাপের ভাষা :
পরেশবাবু–আমি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে মানি। ব্যক্তির সেই স্বাধীনতার দ্বারা আঘাত করেই আমরা ঠিক মতো জানতে পারি কোনটা নিত্য সত্য, আর কোনটা নশ্বর কল্পনা–
এখানে লেখকের কাহিনী বর্ণনার ভাষা “নিবিড় করিয়া আচ্ছন্ন করিত না,” অর্থাৎ এতাবৎ অনুসৃত গ্রন্থের ভাষা, কিন্তু সংলাপের ভাষা “আঘাত করেই আমরা ঠিক মতো জানতে পারি,” অর্থাৎ কথ্যভাষার অনুগত।
১৯০৮ সালে, ১৯০৬ থেকে দু’বছরের মধ্যেই এই অধাংশিক রূপান্তর ঘটেছে। চোখের বালিতে কিন্তু নৌকাডুবিরই অনুসৃতি বিরাজমান :
“বাল্যকাল হইতে মহেন্দ্র দেবতা ও মানবের কাছে প্রশ্রয় পাইয়াছে।…পরের ইচ্ছার চাপ সে সহিতে পারে না।”
সংলাপ : মহেন্দ্র কহিল, পরামর্শ কিছুই না, পান লইতে আসিয়াছি।
মা কহিলেন, তোর পান তো আমার ঘরে সাজা আছে।
ভাষার বিচারে নৌকাডুবি ও চোখের বালি বঙ্কিমের কালকে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ভাবের বিচারেও বহুলাংশে তাই; কিন্তু গোরায় ভাষার ক্ষেত্রেও বটে, ভাবের ক্ষেত্রেও বটে, তর্ক বেধেছে। ঘরে-বাইরেতে ভাষার তর্ক মিটেছে কিন্তু তা ভাবানুসৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। চার অধ্যায় ও
শেষের কবিতা পূর্ববর্তী ভাষা ও ভাব থেকে মুক্ত।