রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস

গোরা

পুলকেশ দে সরকার

গোরা কাহিনী-প্রধান নয়, বিতর্ক প্রধান। এর কাহিনী একেবারে শেষে, উপসংহারের মুখে।

চোখের বালির ভূমিকায় তিনি আরও বলেছেন : “এর পূর্বে মহাকায় গল্প সৃষ্টিতে হাত দিইনি। ছোট গল্পের উল্কাবৃষ্টি করেছি। ঠিক করতে হ’ল এবারকার গল্প বানাতে হবে এযুগের কারখানা-ঘরে।…এখনকার ছবি খুব স্পষ্ট, সাজসজ্জার অলঙ্কারে তাকে আচ্ছন্ন করলে তাকে ঝাপসা করে দেওয়া হয়, তার আধুনিক স্বভাব নষ্ট হয়। তারপর ক্রমে দেখা দিয়েছে গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ। শুধু তাই নয়, ছোট গল্পের পরিকল্পনায় আমার লেখনী রূঢ় স্পর্শ এড়িয়ে যায়নি। নষ্টনীড় বা শান্তি এর নির্মম সাহিত্যের পর্যায়েই পড়বে। তারপরে পলাতকার কবিতাগুলির মধ্যেও সংসারের সঙ্গে সেই মোকাবিলার আলাপ চলেছে।”

উপন্যাস সৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্র-মানস খুবই স্পষ্ট। তার আঙ্গিক ত সেইভাবে স্থির হয়ে গেছে এবং

“বঙ্গদর্শনের নবপর্যায় একদিকে তখন আমার মনকে রাষ্ট্রনৈতিক সমাজনৈতিক চিন্তার আবর্তে টেনে এনেছিল আর একদিকে এনেছিল গল্পে এমন কি কাব্যেও মানবচরিত্রের সংস্পর্শে।…সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনা পরম্পরার বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আতাতের কথা বের করে দেখানো। সেই পদ্ধতিই দেখা দিল চোখের বালিতে।”

ঠিক এই দৃষ্টিতে নৌকাডুবিতে ঘটনা পরম্পরাই প্রধান। চোখের বালিতে ঘটনা পরম্পরা আছে বিশ্লেষণও আছে; গোরা বিতর্ক বা বিশ্লেষণ-প্রধান, কাহিনী অপ্রধান–যদিও উপসংহারের মুখে এই অপ্রধান কাহিনীকেই সকল বিতর্ক বিশ্লেষণ একটা নতুনতর রঙ ও ইঙ্গিত দিয়েছে; ফলে, বেদনার্ত পাঠককে আর একবার বিতর্ক বিশ্লেষণগুলো নাড়া দেয়। নৌকাডুবি ও গোরার রচনার মধ্যে, সুতরাং কাহিনীকালের প্রভাবের মধ্যে, কয়েকটি ছোটখাট আশ্চর্য মিল আছে। এই দুইটি বইয়েই প্রাথমিক পাঠ হিসেবে “চারু পাঠ” ও বঙ্কিমের বঙ্গদর্শনের উল্লেখ আছে। এথেকে সেকালের শিক্ষিত সমাজের মোটামুটি পরিবেশ বোঝা যায়।

গোরার প্রথম প্রকাশ প্রবাসী পত্রিকায়। ১৩১৪ সাল থেকে ১৩১৬ সালের ফাল্গুনে, অর্থাৎ ইংরেজী ১৯০৮ সালে সুরু হয়ে ১৯১০ সালে শেষ হয়। ৫১ বছর আগের কথা। ঐ বছরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রবাসীতে প্রকাশিত পাঠের বহুলাংশ প্রথম সংস্করণে পরিত্যক্ত হয়। আবার ১৩৩৪ সালে প্রকাশিত বিশ্বভারতী সংস্করণে প্রবাসী থেকে অনেক অংশ নেওয়া হয়। রবীন্দ্র রচনাবলীর সংস্করণে প্রবাসী থেকে আরও কিছু অংশ নেয়া হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “একদিন রামানন্দবাবু আমাকে কোনো অনিশ্চিত গল্পের আগাম মূল্যের স্বরূপ পাঠালেন তিন শ’ টাকা।…লিখতে বসলুম, গোরা আড়াই বছর ধরে মাসে মাসে নিয়মিত লিখেছি, কোনো কারণে একবারও ফাঁকি দিইনি।”

ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথ ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ব্রাহ্মসমাজভুক্ত ছিলেন; কিন্তু হিন্দুসমাজ, ব্রাহ্মসমাজ ও খ্রীষ্টানসমাজ আজ যে মানসিকতায় এত উন্নত তার মূল কারণই হচ্ছে এই যে, যেখানে মানবতার সর্বশেষ মূল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সেখানে এই সমাজ কয়টি আত্মবিশ্লেষণে কুণ্ঠাবোধ করেনি, এক শ্রেণীর গোড়া আপনি-মোড়ল সমাজরক্ষকদের বিরোধিতা সত্ত্বেও সমগ্র সমাজ সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে। গোরা বইয়ে বা কাহিনীর অবতারণায় এই সব সামাজিক প্রশ্ন আছে এবং উঠেছে; কিন্তু তাতে যদি কোথাও বুদ্বুদ উঠে থাকে তবে কালক্রমে সমাজে তা প্রশ্রয় পায়নি। ৫১ বছরের পটভূমিকাকে যদি আর ৪৯ বছর পিছিয়ে নেয়া যায় তবে আমরা শতাব্দীর চিত্রটি হুবহু উপলব্ধি করতে পারি। এই শতাব্দীর সূচনা বিন্দুতে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রমানসে বিগত অর্ধ ও চলতি শতাব্দীর সমাজচিন্তা প্রতিফলিত হতে বাধ্য। একটি প্রশ্নসূচক কাহিনী বা জীবনী অবলম্বনে গোরার এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন সমাজের আবির্ভাব।

সে কালটা কেমন? সেকালে অভিজাতবর্গের মধ্যে মোটরগাড়ীর প্রচলন হয়নি। যানবাহনের আভিজাত্য ঘোড়ার গাড়ীতে। শাড়ির সঙ্গে শেমিজ পরা “যদিও নব্যদলে প্রচলিত হইতে আরম্ভ করিয়াছে তবু প্রবীণা গৃহিণীরা তাহাকে নিতান্তই খৃষ্টানি বলিয়া অগ্রাহ্য করিতেন।” আর শতাব্দী পরে আমরা যখন লিখতে বসেছি তখন প্রবীণা গৃহিণীরাই শেমিজ আঁকড়ে আছেন, নবীনারা তা সর্বাংশে অগ্রাহ করেছেন।

গোরার ভাষা চোখের বালির তুলনায় অনেক উন্নত ও “রাবীন্দ্রিক।” এর সংলাপও চলতি ভাষায়। এবং বলেছি, এর আখ্যানভাগ ও ক্লাইম্যাক্স উপসংহার মুখে। কৃষ্ণদয়াল মুমূর্ষু, গোরা হিন্দুমতে প্রায়শ্চিত্তের জন্য প্রস্তুত, এমন সময় গোরার কাছে গোরার পরিচয় প্রকাশের আহ্বান এল। এই ক্লাইম্যাক্স বা উপসংহার যেন এটকা আর্তনাদের মতো। গোরার কাছে শ্রাদ্ধাধিকারের প্রশ্ন উঠতেই একটা হাহাকার যেন শব্দ-রূপ পেল।

“আমি ওঁর পুত্র নই।”

“না।”

“তুমি আমার মা নও?”

“আনন্দময়ীর বুক ফাটিয়া গেল–তুই যে আমার পুত্রহীনার পুত্র, তুই যে গর্ভের ছেলের চেয়ে অনেক বেশি, বাবা।”

এর আগেও আনন্দময়ীর বুক ফেটেছে কিন্তু মুখ ফোটেনি; তাই গোরার জীবনে কোন আঘাত দূরস্থান, কোন সংশয়ের বাষ্পমাত্রও জমেনি। আজ যখন মুখ ফুটল তখন আনন্দময়ীর কথাগুলো নিতান্ত কথাই শোনালো; কেননা কথা যত কোমল হোক, স্নেহরসসিক্ত হোক, এই কঠোর সত্য কিছুতেই ঢাকা যায় না যে, এতদিন সে যাঁকে ম। বলেছে তিনি মা নন, এতদিন যাঁকে পিতা বলে জেনেছে তিনি পিতা নন। গোরার সমস্ত পৃথিবী, সমস্ত অস্তিত্ব দুলে উঠেছে, পায়ের তলায় মাটি নেই, সে একান্ত বায়ুভূত নিঃসঙ্গ। এবং সব চাইতে বড় কথা, এতদিন সে যে-দেশের গৌরব, জাতির গৌরব, ধর্মের গৌরব, সমাজের গৌরব করে এসেছে সে সকলই মিথ্যা; এই মিথ্যার পিছনে অন্ধবিশ্বাসে ছুটে আর এতখানি জীবনও তো তবে মিথ্যা হ’য়ে গেছে! “তাহার মা নাই, বাপ নাই, দেশ নাই, জাতি নাই, নাম নাই, গোত্র নাই, দেবতা নাই। তাহার সমস্তই একটা কেবল ‘না’।”

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি যদি উদার এবং মানবিকতার ভাবে মহৎ না হ’ত, তবে যে-কোন প্রাচীন বা নবীন সাধারণ ব্যর্থ লেখকের মতো এখানে তিনি গোরাকে নিয়ে একটা অশুভ মারাত্মক কাণ্ড ক’রে বসতেন। কেননা, সাধারণের মনে এর পর জীবনের আর কি মূল্য থাকতে পারে? এমন নামগোত্রহীন জীবনের অবসানই ভাল।

কিন্তু বলিষ্ঠ আশাবাদ না থাকলে রবীন্দ্রনাথ–রবীন্দ্রনাথ হতেন না। আগাগোড়া তিনি গোরাকে বলিষ্ঠ করেই গড়েছেন; তার বিস্তৃত বক্ষ ও নির্ভরযোগ্য কাঁধের পক্ষেই এই আঘাত সহ্য করা সম্ভব। তাই তার স্রষ্টা প্রথম সস্নেহ আলোকপাত করলেন। কৃষ্ণদয়ালের শুচিতার বাড়াবাড়ি তাকে বরাবর পীড়িত করত, যুক্তি ছাড়া “পিতা-পুত্রের” মধ্যে কোন স্নেহবন্ধনই ছিল না। তাই তার জীবন যখন সকল কিছু ‘না’ হয়ে গেল, তখন প্রথম “কৃষ্ণদয়ালের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধ নাই ইহা স্মরণ করিয়া সে আরাম পাইল।”

তাই ব’লে সে জীবনকে একেবারে নোঙরহীন করল না। যে-কোন ক্ষুদ্রদুষ্টি লেখক তাই করতে পারত, হতাশায় সবরকমে অসামাজিক ও ভ্রষ্ট হ’তে পারত। কিন্তু গোরাকে সে ধাতুতে গড়া হয়নি। গোরা সেই সৌম্য প্রকৃতি কল্যাণ চিন্তায় উৎসর্গীকৃত জীবন পরেশবাবুর কাছে গিয়ে বলল, “পরেশবাবু, আমার কোন বন্ধন নেই।…আজ আমি মুক্ত।”

যত সময় যাচ্ছে ততই তার ব্যক্তিত্ব পরিস্ফুট হচ্ছে। সে দৃঢ়কণ্ঠে কিছুকাল আগেও যা শূন্য এবং কেবলমাত্র একটা ‘না’ ছিল তাকে পূর্ণ করল, তাকে মূর্তি দিল : “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দুমুসলমান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকল জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।”

আজ থেকে ৫১ বছর আগে। আজ যখন সারা ভারতবর্ষে বাংলার অধিবাসীরা সর্বত্র লাঞ্ছিত, অনাদৃতও অবাঞ্ছিত এবং অযথা নিন্দার কাদায় সর্বাঙ্গ লিপ্ত, তখন সারাভারতের দৃষ্টিতে একথা মূল্যহীন। কিন্তু এই উদার আহ্বানই সেদিনকার বাঙালী পাঠককে নাড়া দিয়েছে।

পরেশবাবুর কাছে গোরা আরও নিবেদন করল : “আমাকে আপনার শিষ্য করুন। আপনি আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান ব্রাহ্ম সকলেরই–যার মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে কোনো ব্যক্তির কাছে অবরুদ্ধ হয় না– যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন, ভারতবর্ষের দেবতা।”

একদিন বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল এবং সমগ্র ভারতবর্ষই তাদের কাছে ধর্মের চাইতে বড় দেবতাস্বরূপ ছিল–সে দেবতার বেদীমূলে প্রাণবিসর্জনেও তারা কুণ্ঠা বোধ করেনি। তবে একথা সত্য যে, এই আবেদন মুসলমান সমাজে সর্বতোভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তারা ভারতবর্ষকে স্বদেশ বলে গ্রহণ করতে পারেনি।

সম্ভবত সেকালে গোরার মতই নির্লিপ্ত সন্ন্যাসীর দরকার ছিল, যার বাপ মা, নাম গোত্র, ধর্ম-সম্প্রদায়ের বন্ধন নেই; বন্ধন একমাত্র দেশজননীর–যারা দেশকে শুধু মাটি নয়, মা বলে শ্রদ্ধা করে, বিদেশীর শৃঙ্খলে বন্দিনী এই মাকে যারা সর্বস্ব পণ করে মুক্ত করতে চায়। গোরা সেই সন্ন্যাসীদলের প্রতীক।

মনে রাখতে হবে কালটা ১৯০৮-১০ সাল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, স্বদেশী ও বিদেশী বর্জনের ঢেউ চলেছে। ক্ষুদিরাম-প্রফুল্ল চাকীর আত্মবিসর্জন ঘটে গেছে, মাণিকতলা বোমার মামলা, ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা, স্বদেশী ডাকাতি ইত্যাদিরও সে মরশুম। গোরার মধ্যে তার স্পর্শ-আছে, তার মন্ত্র আছে,–এবং সকল দুঃখকে উত্তীর্ণ হওয়ার অবিচল বলিষ্ঠ-আশাবাদ আছে।

কাহিনীর দিক থেকে গোরার প্রকৃত পরিচয় পাঠকের কাছে আকস্মিক নয়, তার কাছে এর লজিকটাই অনুসরণীয়। লেখক বহুবার পাঠকের কাছে এ ইঙ্গিত রেখে গেছেন যে, গোরা হিন্দু সমাজের নয়, গোরার পিতামাতা কৃষ্ণদয়াল আনন্দময়ী নন। গোরা গোরাই তার এই ধর্মাচরণ ও বিতর্ক অজ্ঞান অচেতন মনের। তার কাছে পরিচয় উদ্ঘাটনের পর তার যে জীবন সে জীবন জ্ঞানের, সে জীবন সচেতন। আনন্দময়ী গোরাকে বলেছিলেন, “তুই যা করছিস তা জ্ঞানে করছিস নে, তা আমি তোকে বলে দিলুম।”

আনন্দময়ীর কথাগুলো এমনই দ্ব্যর্থব্যঞ্জক যে, গোরার মনে কখনো সংশয় জাগেনি। সে মনে করেছে মা’র এসব স্নেহের কথা অথবা সংস্কারের কথা। গোরা “খ্রীষ্টান দাসী লছমিয়াটাকে না বিদায় ক’রে দিলে” আনন্দময়ীর ঘরে তার খাওয়া চলবে না একথা বললে, আনন্দময়ী বলেছিলেন, “আমি যদি খ্রীষ্টান বলে ছোটো জাত বলে কাউকে ঘৃণা করি তবে ঈশ্বর তোকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবেন।” পাঠকের কাছে এ ইঙ্গিত মোটেই ধোঁয়াটে নয়, কিন্তু গোরার কাছে? তার কাছে এ কথাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, মা ঐ কাজটাকে পাপ মনে করেন এবং ভয় করেন ঐ পাপে তার সন্তানকেও হারাতে হবে। তার বন্ধু বিনয়ের মনে একটা “অস্পষ্ট সংশয়ের আভাস দেখা” দিয়েছিল, কিন্তু তা কখনও স্পষ্ট নিঃসংশয় ও প্রত্যক্ষ হ’য়ে দেখা দেয়নি। গোরাকে একবার বলেছিল, “মা যেন কিসের জন্য একটা ভাবনা পুষে রেখেছেন।” কিন্তু এর বেশী নয়, কেননা, গোরা একথায় কোন আমল দেয়নি। গোরার এই সব কথায় কান দেবার মতো অবস্থাও ছিল না; সে ভাবাকাশে বিচরণ করত; তার কাছে বাস্তবের চাইতেও সেই ভাবই বেশী সত্য।

সেই ভাব হচ্ছে ভারতবর্ষের ধান, ন্যায়-অন্যায়ের ভাল-মন্দর সর্বাত্মক ভারতবর্ষ। “সবই ভালো, যাহাকে দোষ বলিতেছে, তাহা কোনো একভাবে গুণ, ইহা যে গোরা কেবল উকিলের মতো প্রমাণ করিত তাহা নহে, ইহাই সে সমস্ত মন দিয়া বিশ্বাস করিত।”

যে বলত : “ভারতবর্ষের সর্বাঙ্গীণ মূর্তিটা সবার কাছে তুলে ধরো–লোকে তাহলে পাগল হয়ে যাবে…প্রাণ দেবার জন্য ঠেলাঠেলি পড়ে যাবে।” সে বলেছে, “এখন আমাদের একমাত্র কাজ এই যে, যা-কিছু স্বদেশী, তারই প্রতি সংকোচহীন সংশয়হীন সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রকাশ করে দেশের অবিশ্বাসীদের মনে সেই শ্রদ্ধার সঞ্চার করে দেওয়া।”

আবার সেই কালের কথা স্মরণ করতে চাই–যে কালে গোরার এই কথাটির একটি বিশেষ মূল্য ছিল। দেশকে ঐ রকম নিঃসংশয়ে সর্বতোভাবে ভালবাসতে না পারলে, দেশের প্রতি অশ্রদ্ধা থাকলে দেশোদ্ধারে সর্বস্ব পণ করবে কে? সে কালে যদি এই প্রগাঢ় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা নিয়ে একদল মানুষ এ বাংলাদেশে না বেরোত তবে দেশপ্রেমের কোন মর্যাদাই হ’ত না। গোরার মতো অনেকেই সেকালে “রাস্তায় ঘাটে কোনো সুযোগে ইংরেজের সঙ্গে মারামারি করিতে পারিলে জীবন ধন্য মনে করিত।” এর প্রয়োজন ছিল। সেদিন বিদেশী শাসক-প্রতিভূদের উদ্দেশে একটা ছোট টিলও উল্লেখযোগ্য ছিল। ভুল হোক যাই হোক, ক্ষুদিরামের লক্ষ্য ছিল বিদেশী শাসক, শাসকশ্রেণীর পক্ষে তাই ছিল যথেষ্ট। বাঘা যতীনের বাঘমারা নয়, সাহেব-মারার, নৈতিক দৃষ্টান্তেই ছিল তখন কাম্য। দুধর্ষ, দুর্মদ, হ্রস্ত, কৃচ্ছসাধক, কষ্টসহিষ্ণু, মৃত্যুভয়হীন মহৎ ভাবোদীপ্ত দেশপ্রেমিকেরই সেদিন প্রয়োজন ছিল। “সংশয়হীন সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা।” ৫১ বছর আগে এর মূল্য ছিল। আজ নেই। আজ দেশকে বিচার বিশ্লেষণের সময়, নির্বিচারে সব কিছু ভালো বলার সময় আজ উত্তীর্ণ।

গোরার পরিবেশটি কেমন? এককালে অনাচারে অভ্যস্ত “পিতা” গৃহে “সাধনাশ্রম” প্রতিষ্ঠা করেছেন, অত্যন্ত আচারনিষ্ঠ হয়েছেন। এককালে আচার-বিচারে অভ্যস্ত “মা” এমনই আচারমুক্ত হয়েছেন যে খ্রীষ্টানী লছমিয়ার হাতে জল খেতে তাঁর বাধে না। “পিতা” কৃষ্ণদয়ালের পশ্চিম সফরকালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় কোন এক পালানো মেমের গর্ভে যে গোরার জন্ম সে গোঁড়া হিন্দু হয়ে উঠেছে এবং তার বন্ধু বিনয়কেও সে গোঁড়ামির কাছে নতি স্বীকার করিয়েছে।

বিনয়সহ এই হিন্দু পরিবারের সঙ্গে প্রথম সংঘাত ঘটল পরেশবাবুর ব্রাহ্মপরিবারের। এবং সে সংঘাত ঘটল প্রেমের মধ্য দিয়ে। গোরার বন্ধু বিনয়ের দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ছিল না। যতদিন গোরার প্রভাব ছিল ততদিন সে গোরাময়, এবং গোরার কথার প্রতিধ্বনি। কিন্তু যখন পরেশবাবুর বাড়ীর সুচরিতা ও লীলার সঙ্গে এবং কিছুকাল সমগ্র পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হ’ল তখনই লাগল বিরোধ। ব্রাহ্মবাড়ী আনাগোনা গোরার মনঃপূত নয়। বন্ধুত্ব শিথিল হতে লাগল। কিন্তু গোরাও যেদিন থেকে সুচরিতার সঙ্গে পরিচয় হতে লাগল সেদিন থেকে তারও মনে লাগল আর এক সংঘাত। এককালে স্বদেশভক্তির ক্ষেত্রে নারীর কোনো স্থান ছিল না, নারীবর্জনই ছিল রীতি। কেবল ব্রাহ্ম বলে নয়, নারীসংস্পর্শ এড়িয়ে যাওয়াও গোরার আচরণের অঙ্গ ছিল। তাই বিনয়ের পরিচয় যেমন ক্রমশ লীলার সঙ্গে তার পরিণয়ের দিকে এগিয়ে গেল, গোরার সঙ্গে সুচরিতার পরিচয় অনুরূপ পরিণতির দিকে গেল না। একদিন সুচরিতার কাছে গোরার ভাবটাই এত বড় হয়ে উঠল যে, গোরাকে তার বিদেহী অলৌকিক অস্তিত্ব বলে মনে হ’ল! গোরা তার কঠোরতা থেকে অনেকখানি নেমে এসেছিল বটে কিন্তু সে আত্মনিয়ন্ত্রণের হালটি ছাড়েনি। তার স্বভাবের প্রয়োজনেও বটে, কাহিনীর প্রয়োজনেও বটে, জেলে যাওয়ার জন্য সেকালের প্রায়শ্চিত্তের কথাটা এসেই পড়ল। এবং এই প্রায়শ্চিত্তই ঘটনা ও কাহিনীর মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিল।

বিনয় অতি সাধারণ ছেলে এবং তার পরিণতিও সাধারণ; কিন্তু এই পরিণামে পৌঁছোতেও তাকে অনেক দাম দিতে হয়েছে, বারংবার ছোটখাট ঘটনায় প্রমাণ দিতে হয়েছে যে, তার আর ললিতার মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে উঠতে চাইছে তা প্রগল্ভ প্রকৃতিমাত্র নয়। একই স্টীমারে ললিতাকে নিয়ে বিনয় এসেছে, সেখানে নিদ্রিতা লীলাকে পাহারা দিতে দিতে বিনয় প্রবৃত্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। পরেশবাবুও যতদিন না নিঃসংশয় হয়েছেন যে, বিনয় ললিতার এ নিছক জৈবিক আকর্ষণ নয় ততদিন সম্মতিদান স্থগিত রেখেছেন, এবং যেইমাত্র নিঃসংশয়ে সম্মতি দিয়েছেন, অমনি স্ত্রীর সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এই প্রশ্ন মীমাংসার জন্য দ্বন্দ্বে প্রস্তুত হয়েছেন যে, ব্যক্তিপেষণ নয়, ব্যক্তি-পোষণই সমাজের কাজ! এ কাজ না করলে সমাজের ধর্মও মিথ্যা।

বিনয় থেকে ভিন্ন প্রকৃতির গোরা তা বুঝেছিল। তাই সে ললিতার প্রতি বিনয়ের প্রেমকে লক্ষ্য করে বলেছে : “তুমি এতদিন বই পড়া প্রেমের পরিচয়েই পরিতৃপ্ত ছিলে–আমিও বই-পড়া স্বদেশ-প্রেমকেই জানি–প্রেম আজ তোমার কাছে যখনি প্রত্যক্ষ তখনি বুঝতে পেরেছ বইয়ের জিনিসের চেয়ে এ কত সত্য–স্বদেশ প্রেম যেদিন আমার সম্মুখে এমনি সর্বাঙ্গীনভাবে প্রত্যক্ষ গোচর হবে সেদিন আমারও আর রক্ষা নাই।”

এইখানেই রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব। যে-কোন জিনিসকে তিনি এক উচ্চগ্রামে তুলে ধরতে পারেন; অথচ কোনটারই অস্বীকৃতি নেই, ক্ষুদ্র প্রদীপেরও নয়, সূর্যেরও নয়। নারী প্রেমও নয়, স্বদেশ প্রেমও নয়। আজ পর্যন্ত অস্বীকার করবার কারণ ঘটেনি যে, স্বদেশ প্রেম নারী প্রেম অপেক্ষা মহত্তর। অথবা বিনয়ের প্রকৃতির পক্ষে যা সত্য, গোরার প্রকৃতির পক্ষে তা সত্য নয়। আপন আপন ক্ষেত্রে উভয়ই সুগভীর সত্য। বিনয়ের প্রেম যেখানে ললিতাতেই শেষ, গোরার প্রেম সেখানে সুরুচিতায় শেষ হতে পারে না–তাকে অর্থাৎ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। সুচরিতা তা জানত, সেও গোরাকে টেনে তার সীমায় আবদ্ধ রাখতে চায়নি; বরং গোরার কথার সে প্রতিধ্বনি হয়ে গেছে। সে তার ছোট ভাইকে (নিজেকে বোঝাবার জন্য) বলছে : “আমাদের যে-দেশ, আমাদের যে-জাত, সে কত বড়ো তা জানিস? এ-এক আশ্চর্য দেশ। এই দেশকে পৃথিবীর সকলের চূড়ার উপরে বসাবার জন্যে কত হাজার হাজার বৎসর ধরে বিধাতার আয়োজন হয়েছে, দেশবিদেশ থেকে কত লোক এসে এই আয়োজনে যোগ দিয়েছে, এদেশে কত মহাপুরুষ জন্মেছেন, কত মহাযুদ্ধ ঘটেছে, কত মহাকাব্য এইখান থেকে বলা হয়েছে, কত মহাতপস্যা এইখানে সাধন করা হয়েছে, ধর্মকে এদেশ কত দিক থেকে দেখেছে এবং জীবন সমস্যার কত রকম মীমাংসা এই দেশে হয়েছে। সেই আমাদের ভারতবর্ষ।”

সব ব্যক্তি একাকার হয়ে গেছে। সব সীমা ধুয়ে মুছে গেছে। বিনয়ের সম্মুখে উন্মুক্ত পথ ললিতাদের বাড়ী অবধি; হিন্দুত্বের প্রাচীর তাকে রোধ করতে পারে নি। ললিতার পথও উন্মুক্ত তারও সমাজের প্রাচীর নিশ্চিন্ত। গোরার পথও আজ পরেশবাবু-সুচরিতার বাড়ীতে সংযুক্ত, গোরার হিন্দুয়ানী বা সুচরিতার সমাজ-আনুগত্য কোনো বাধা তো সৃষ্টি করতে পারে নি। সর্বশেষ গোরার চারদিকে যে আচারের বাধা ছিল, বাবা-মা’র বাধা, হিন্দুসমাজের বাধা তাও ভূমিসাৎ হ’য়ে গেল। পিঞ্জরাবদ্ধ ব্যক্তির মুক্তি ঘটল। সকল অভিমানের কাঁটা উপেক্ষা ক’রে গোরা প্রসন্ন মনে পরেশবাবুর ছায়ায় এসে মিশল যে-পরেশবাবু বলেন : “আমি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে জানি। ব্যক্তির সেই স্বাধীনতার দ্বারা আঘাত করেই আমরা জানতে পারি কোনটা নিত্য সত্য, আর কোনটা নশ্বর কল্পনা–সেইটে জানা এবং জানার চেষ্টার উপরই সমাজের হিত নির্ভর করছে।”

গোরাকে সবরকমে মুক্ত করে স্বদেশ কল্যাণের প্রতীকরূপে উপস্থিত করা হয়েছে, সুচরিতায় সেভাব সঞ্চারিত হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তি চেতনা হারায় নি।