ঘরে বাইরে সম্পর্কে আমার নিজস্ব একটা থিওরী আছে। কিন্তু সে-কথা পরে। তার আগে আর যে ক’টি সম্ভাব্য তত্ত্ব হতে পারে তাই যাচাই ক’রে দেখি। ঘরে বাইরে অর্থ স্রেফ ঘরে আর বাইরে হতে পারে। ঘরের সীমাবদ্ধতা সঙ্কীর্ণতা বাইরে হয় সীমাহীন উদার। ঘরে নিরাপদ বাইরে বিপদ। ঘরের চারদিকে প্রাচীর, নানারকম সংস্কারের বন্ধন, এখানে গৃহদেবতার প্রাধান্য, ঘরে অবগুণ্ঠিত বধূ। বাইরে প্রাচীর থাকে না, সংস্কার বারে বারে ঘা খায়, গৃহদেবতার উৎপাত নেই, এখানে সকলেই অনবগুণ্ঠিতা। ঘরে স্নেহ, প্রীতি, ভালবাসা; বাইরে সংগ্রাম, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরাক্রম। কিন্তু ঘরে বাইরের লোককে প্রবেশাধিকার দিলে ঘরের শান্তি বিঘ্নিত, সম্পদ অপহৃত ও লুণ্ঠিত হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঘরে বাইরে নিখিলেশদের পরিবারে নিখিলেশের সঙ্গে তার বৌদিদের সম্পর্ক ও পরস্পরের স্থান, নিখিলেশের সঙ্গে তার স্ত্রী বিমলার সম্পর্ক, স্ত্রীকে বাইরে পরিচিত করার জন্য নিখিলেশের উৎকণ্ঠা, বিমলার প্রাথমিক কুণ্ঠা, সন্দীপের আবির্ভাব ও বিমলার চিকের আড়াল সরিয়ে তাকে দেখ, নিখিলেশকে এড়িয়ে সন্দীপ বিমলার নতুন সম্পর্ক, মেজবৌদির উদ্বেগ, সন্দীপের হাতে বিমলার সর্ববিধ লাঞ্ছনার উপক্রম, গৃহের সম্পদ লুণ্ঠন–মিলিয়ে দেখতে হবে।
অথবা ঘর মানে মানুষের অন্তর, বাইরে মানে মানুষের বাইরে যা আভাসিত বা প্রকাশিত। যা আভাসিত বা প্রকাশিত তা সর্বদা ও সর্বথা সত্য নয়, তার অন্তরালে অন্তরের বস্তুই সত্য। প্রায়ই বাইরের আচরণ দেখে আমরা মানুষকে অবিচার করে থাকি, ঘরে সে মানুষটি পৃথক, এমন কি বিপরীত। দীর্ঘকাল ধরে যাকে আমরা দুষ্কৃতকারী বলে জানি তাকে অকস্মাৎ আমরা সাধুরূপে পাই, তার মানে ঘরে বা অন্তরের মানুষটি বাইরের বা প্রকাশিত মানুষটির সঙ্গে এতদিন পেরে উঠছিল না, আর ঘর বাইরেকে পর্যুদস্ত করেছে। সন্দীপের পূর্বাপর চরিত্রে এটি স্পষ্ট। দেখা গেছে সন্দীপ বা বিমলা যখন নিখিলেশের আড়ালে বাহ্যত একটা প্রচণ্ডতম অন্যায়ের সীমায় পৌঁছে গেছে, বিমলার সকল গর্ব গৌরব ধ্বংসোন্মুখ, তখনই হয় সন্দীপ নয় বিমলা আত্মসম্বরণ করে পিছিয়ে গেছে, অন্তর বা ঘর হয়েছে সত্য।
এই দুটো সম্ভাব্য তত্ত্বের মাপকাঠিতে নিখিলেশের কথাগুলো মিলিয়ে দেখা যায়। নিখিলেশ বিমলাকে বলছে : “আমি চাই, বাইরের মধ্যে তুমি আমাকে পাও আমি তোমাকে পাই। ওইখানে আমাদের দেনাপাওনা বাকী আছে।” বিমলা বলেছিল, “কেন ঘরের মধ্যে পাওয়ার কমতি হ’ল কোথায়?” নিখিলেশ জবাব দিয়েছিল, এখানে আমাকে দিয়ে তোমার চোখ-কান-মুখ সমস্ত মুড়ে রাখা হয়েছে–তুমি যে কাকে চাও তাও জান না, কাকে পেয়েছ তাও জান না।…এই ঘর-গড়া ফাঁকির মধ্যে কেবলমাত্র ঘরকরণাটুকু ক’রে যাওয়ার জন্যে, তুমি হওনি আমিও হইনি। সত্যের মধ্যে আমাদের পরিচয় যদি পাকা হয় তবেই আমাদের ভালোবাসা সার্থক হবে।”
এই নিদারুণ পরীক্ষা। বিমলা বলছে তার বাইরের প্রথম পুরুষ “কাল-পুরুষের মতো সন্দীপবাবুর উজ্জ্বল দুই চোখ আমার মুখের উপর এসে পড়ল (কেননা, বিমলা তখন বক্তৃতা শোনার ঝোঁকে চিক সরিয়ে ফেলেছে, ঘরের আর বাইরের যে ব্যবধান তা অপসৃত হয়েছে, সে একমন হয়ে শুনছে সন্দীপের আহ্বান) ইন্দ্রের উচ্চৈশ্রবা তখন আর রাশ মানতে চায় না–বজ্রের উপর বজ্রগর্জন, বিদ্যুতের উপর বিদ্যুতের চমকানি।” সন্দীপের ক্ষেত্রে ‘ইন্দ্র’ কথাটি ভারী মানানসই হয়েছে। ইন্দ্রের কামনা এবং ইন্দ্রের দেবত্ব দুইই প্রকাশ পেয়েছে সন্দীপের মধ্যে এবং বিমলা শেষ পর্যন্ত বিপদোত্তীর্ণ হয়েছে।
ঘরে বাইরে নিয়ে প্রবল বিতর্কের অবতারণা হয়েছিল এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও সেই বিতর্কক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। অন্য কোনো তত্ত্বে যাবার আগে রবীন্দ্রনাথের কথাগুলোও জেনে নেয়া দরকার।
ঘরে বাইরে ৪৫ বছর আগে বাংলা ১৩২২ সালে বৈশাখ থেকে ফাল্গুন মাস অবধি সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়, ১৩২৩ সালে তা গ্রন্থাকার পায়। ইংরেজী ১৯১৬-১৭; অর্থাৎ তখনও প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে এবং গুপ্ত রাজনৈতিক হিংস আন্দোলন সারা ভারতবর্ষে ছড়াবার চেষ্টা চলেছে। বাংলায় স্বদেশী ভাব চলছে। ১৩২২ সালেই সবুজপত্রের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :
“যে-কালে লেখক জন্মগ্রহণ করেছে, সেই কালটি লেখকের ভিতর দিয়ে হয়তো আপন উদ্দেশ্য ফুটিয়ে তুলেছে। তাকে উদ্দেশ্য নাম দিতে পারি না-পারি, একথা বলা চলে যে, লেখকের কাল লেখকের চিত্তের মধ্যে গোচরে ও অগোচরে কাজ করছে। আমি বলছি এ কাজও শিল্পকাজ; শিক্ষাদানের কাজ নয়। কাল আমাদের মনের মধ্যে তার নানা রঙের সুতোয় জাল বুনছে, সেই তার সৃষ্টি, আমি তার থেকে যদি কিছু আদায় করতে চাই তবে সে উদ্দেশ্য আমারই। আমাদের দেশের আধুনিক কাল গোপনে লেখকের মনে যে-সব রেখাপাত করেছে, ঘরে-বাইরে গল্পের মধ্যে তার ছাপা পড়েছে। কিন্তু এই ছাপার কাজ শিল্পকাজ।”
আরও এক জায়গায় :
“ঘরে বাইরে নভেলে যখন সন্দীপের অবতারণা করিয়াছিলাম তখন মুহুর্তের জন্যও আশঙ্কা করি নাই যে সেটা লইয়া আমাদের দেশের উপাধিধারী এত গণ্যমান্য লোকের কাছে আমার এমন জবাবদিহির দায়ে পড়িতে হইবে।…আমার সন্দীপ সীতা সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছে তাহা সন্দীপের যোগ্য–অতএব সেকথা অন্যায় কথা বলিয়াই তাহা সংগত হইয়াছে। এবং সংগতি সাহিত্যে নিন্দার বিষয় নহে।”
বাস্তবিক, সাহিত্যে মূর্খ পণ্ডিতদের নিয়েই যত বিপদ। তারা কোনো কাহিনীর চরিত্র বিশ্লেষণে, কাহিনীর মধ্যে সেই চরিত্রের অবস্থান, সমগ্র কাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচার না করতে পেরে কাহিনীর বাইরে লেখককে নিয়ে পড়ে এবং সাহিত্য বিচারে সমাজ-বিচারক হয়ে বসে। আধুনিক উপন্যাসগুলোর অনেকগুলিই আদালতে বা সমাজ নেতাদের রায়ে নয়, সাহিত্যে রসের এবং মহৎ সৃষ্টির বিচারেই অগ্রাহ্য হ’য়ে যাচ্ছে। সন্দীপের মতোই তাদের কাল, সময়, আয়ু–সংক্ষিপ্ত। কিন্তু সন্দীপের পাশে নিখিলেশও তো আছে এবং সে-ই চিরকালের জন্য গ্রাহ্য ও সমাদৃত আছে।
এবার আমার থিওরীটা বলি।
নারী-প্রকৃতি দুইটি উপাদানে গঠিত; একটি উদ্দামতা, আর একটি সংরক্ষণশীলতা। উদ্দামতা জীবনপ্রবাহের একটি মূল নীতি, এরই ক্রিয়ায় জীবজগতের অবিচ্ছিন্নতা বা বংশরক্ষা হয়ে এসেছে। ভবিষ্যৎ বংশ সুনিশ্চিত করার জন্য তারা পুরুষের মধ্যেও এই উদ্দামতা খুঁজে ফেরে। উদ্দাম আবেগপ্রবণ পুরুষ যদি সমাজের নিয়মে পাওয়া যায় ভাল, নতুবা তার একটি সন্ধানী চক্ষু বাইরে থাকে। সেখানে সমাজের সীমা তাকে বাঁধতে পারে না। নিতান্তই যদি সে বাঁধা পড়ে, তবে সে ঘরে শান্তি বিঘ্নিত করে, নতুবা আত্মপীড়ন করে। এই ব্যাপারে সে উপেক্ষিত অনাদৃত হ’তে চায় না। অনেকের অজ্ঞানে বহু সংসারে এই একটি মূল কারণে অশান্তি স্থায়ী বাসা বাঁধে এবং কিছু অনাচারও ঘটতে থাকে। যাকে বলা যায় misalliance.
কিন্তু নারী প্রকৃতির এইটিই একমাত্র উপাদান নয়। হুলো বিড়াল বা বাঘের সঙ্গে বিড়ালী বা বাঘিনীর ক্ষণিক সংযোগেই সেপ্রকৃতি নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। সে তার গর্ভে যে ভবিষ্যৎ বংশধরকে ধারণ করে তাকে সে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে চায়। এ জন্য নীড় চাই, বাসা চাই, আশ্রয় চাই, খাদ্য চাই, রক্ষাব্যবস্থা চাই। কিন্তু একাজ উদ্দাম প্রকৃতির নয়। এজন্য ধৈর্য ও স্থির মতি এবং সংরক্ষণশীল মনোভাব চাই। দুর্মদ প্রকৃতি যেমন নিজেকে নির্বিশেষে ছড়িয়ে নিঃশেষ করতে চায়, সংরক্ষণশীলতা চায় না, সে চায় যা পাওয়া গেল তাকে যত্নে রক্ষা করা, পুষ্ট করা, পূর্ণ পরিণতির সম্ভাবনা সুনিশ্চিত করা। পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের প্রতি স্নেহ একমাত্র এই উপাদান থেকেই উৎসারিত হতে পারে। উদ্দামত যেন প্রবল বন্যার ধ্বংসরূপ নিয়ে আসে, প্রান্তরভূমি যেন দলিত মথিত করে যায়, কিন্তু বন্যাশেষে যে পলি দেখা যায়, তাতে ফসল জন্মায় ও পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতির মধ্যেই এই উদ্দামতা ও সংরক্ষণশীলতা রয়েছে। নারী প্রকৃতির প্রতীক এবং তারও মধ্যে এই প্রকৃতির লীলা রয়েছে। যদি এমন সম্ভব হয় যে, একই পুরুষের মধ্যে এই দুইটি উপাদানের আবেদনই সার্থক, তবে বাইরের আকর্ষণ গৃহস্থবধূকে ঘর-ছাড়া করে না। সে নিজের কেন্দ্র থেকেই বাইরেটা উপভোগ করতে পারে। কিন্তু এমন সুন্দর যোগাযোগ হয় না। উদ্দামতা ও সংরক্ষণশীলতার অনুপাত প্রায়ই একই পুরুষের মধ্যে সমান সমান থাকে না; কমবেশী থাকে এবং এই কমবেশীর অনুপাতেই ঘরে শান্তি বা অশান্তি থাকে ও নারীর সেই অনুপাতেই ঘরে বা বাইরের আকর্ষণ ঘটে থাকে। যে ক্ষেত্রে একটি জিনিসের সম্পূর্ণ অভাব ঘটে থাকে সেখানে বিপর্যয়েরও অবধি থাকে না।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘চন্দ্রশেখ’র তার একটি প্রথম দৃষ্টান্ত। এখানে চন্দ্রশেখর, শৈবলিনী আর প্রতাপ। চন্দ্রশেখর পণ্ডিত মানুষ; সৎবুদ্ধি বা ধীরতার প্রতীক। কিন্তু শৈবলিনী যদি লরেন্স ফক্টরের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে সন্ধ্যেবেলায় পুকুর থেকে দেরিতেও ফেরে, চন্দ্রশেখরের চিত্তে কোন ব্যতিক্রম ঘটে না বা একবার শৈবলিনীর সৌন্দর্যের দিকে চেয়েও দেখে না। এই উদাসীন সন্ন্যাসীকে নিয়ে শৈবলিনীকে ঘরে থাকতে হবে? তাই তার উদ্দাম প্রতাপের কথা মনে পড়ে। আকস্মিক নয়। কিন্তু চন্দ্রশেখরে যদি প্রতাপের উদ্দামতা থাকত তবে সেই ছেলেবেলাকার প্রণয়াম্পদকে সে অনায়াসেই বিস্মৃত হতে পারত। চন্দ্রশেখরের ঔদাসীন্যে এ বিস্মৃতি অসম্ভব। সে নিজে যেচে অপহৃতা হ’ল–উদ্দেশ্য, প্রতাপের সঙ্গে মিলন। আর চন্দ্রশেখর? জ্যোৎস্না-স্নাত শৈবলিনীর মুখমণ্ডল দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং স্বীকার করলেন, তাকে এ ঘরে আনা ঠিক হয় নি। তারপর যখন শৈবলিনীর অপহরণের সংবাদ পেলেন তখন পাণ্ডিত্যের পুথিপত্র আগুনে নিবেদন করলেন।
শৈবলিনীর অভিসারও সার্থক হয় নি। কেননা, শৈবলিনীর নারীত্ব কেবল প্রতাপকে নিয়ে চিরকাল সুখী হতে পারে না। তার চন্দ্রশেখরকেও চাই। সেই বীরবুদ্ধি সংযত চন্দ্রশেখর। প্রতাপের ভূমিকা যেখানে শেষ চন্দ্রশেখরের ভূমিকা সেখানে আরম্ভ। কিন্তু সে যখন একবার বাইরের আকর্ষণে ঘর ছাড়া হ’ল তখন তার ঘর পুড়ে গেছে। শৈবলিনী অন্ধকার ভবিষ্যতের মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ হ’ল।
নিখিলেশের আদর্শস্নিগ্ধ উদাসীন ভঙ্গী চন্দ্রশেখরের সঙ্গেই তুল্য। সন্দীপের সঙ্গে প্রতাপের। এই প্রতাপকেই (বা সন্দীপকেই) বিমলা ঘরের চিক সরিয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে দেখেছে এবং আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু যখনই লক্ষ্য করেছে সন্দীপ কেবলই উদ্দামতা, লালসার স্থূল প্রতিমূর্তি, এ কোথাও স্থির হয়ে দাঁড়ায় না, কোন কিছুতেই গভীর বিশ্বাস নেই, এর পক্ষে সংগঠন সংরক্ষণ অসম্ভব তখনই সঙ্কুচিত হয়ে উঠেছে, পশ্চাদপসরণ করেছে। সন্দীপ এরই নাম দিয়েছে হিপনটিজম–মোহ। কিন্তু মোহই নারীর একমাত্র প্রকৃতি বা একমাত্র উপাদান নয়। বিমলাও যেদিন সে কথা বুঝল সেদিন নিখিলেশ আহত। নিখিলেশের বিদেহী ভাবটাই সেখানে অক্ষয়।
পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্রের মহিম-অচলা-সুরেশেও এই কথারই পুনরাবৃত্তি। সেখানেও বাইরের আকর্ষণে গৃহদাহ হয়েছে। মহিমও চন্দ্রশেখর-নিখিলেশের গোত্রান্তর্গত, অচলা শৈবলিনী-বিমলার এবং সুরেশ (ইন্দ্র?) প্রতাপ-সন্দীপের। ঘরে বাইরের প্রত্যেক সংলাপ, প্রত্যেক উক্তির রেখায় রেখায় যদি এ তত্ত্ব না মেলে ক্ষতি নেই; কেননা, এই তিনটি উপন্যাসেরই কাহিনীর বহিরঙ্গ ভিন্ন–সেখানে কাহিনীগুলোরই নিজস্ব ভঙ্গী রূপ ও গতি আছে। কেননা সেটা “শিল্পকাজ”। তাদের সঙ্গে তত্ত্বের যেটুকু বৈষম্য সেটুকু নিতান্তই স্থূল ও নগণ্য। চরিত্রগুলোর মূল মর্মকথা এই তত্ত্বকেই সমর্থন করবে।
এই তিনটি বইয়ের নামকরণও উল্লেখযোগ্য–কেননা, এঁরা সকলেই সচেতন লেখক। চন্দ্রশেখর অর্থ শিব; শিব চরিত্র সম্বন্ধে শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেরই একটা বিশেষ শ্রদ্ধার ভাব আছে। প্রতাপ অর্থ পরাক্রম, তেজ, উত্তাপ। শৈবলিনী অর্থ নদী–যা প্রবহমান, যা বর্ষার ভরা যৌবনে দুরন্ত, বর্ষান্তে যা ক্লান্ত ম্রিয়মান। নিখিলেশ অর্থ বিশ্বেশ্বর–নিখিলের উদার ব্যাপ্তির যিনি স্বামী বা অধিকারী। সন্দীপ অর্থ সন্দীপন থেকে করলে হয়, যা জ্বালায়, সন্দীপন অর্থ প্রজ্জ্বলন। কিন্তু আমার ঝোঁক যায় একটা ব ফলা বসিয়ে দিতে এবং ইচ্ছে হয় সন্দীপকে সঙ্কীর্ণ দ্বীপে আবদ্ধ জীবের সঙ্গে তুলনা করি। বিমলা অর্থ যাতে মল নেই। বস্তুত, সন্দীপের আবির্ভাবই তাকে পঙ্কিল ক’রে তুলেছিল, কালক্রমে তাও থিতিয়ে পড়ে তার বিমল স্বভাব ফিরে এসেছে। গৃহদাহের নামকরণেও ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। মহিম অর্থ মহিমময়, যা মহিমান্বিত। সুরেশ ইন্দ্রের নামান্তর এবং প্রকৃতিতেও তাই–কামাসক্তিই যেখানে প্রবল। অচল অর্থ দোটানায় যা ডেডলক সৃষ্টি করে।
ঘরে বাইরের আলোচনার এও প্রাসঙ্গিক মনে করি।
বিমলার কথা থেকেই সুরু করা যাক।
“স্বামীকে দেখলুম তার (কল্পিত রাজপুত্রের) সঙ্গে ঠিক মেলে না। এমন কি তাঁর রঙ দেখলুম আমারই মতো। নিজের রূপের অভাব নিয়ে মনে যে সংকোচ ছিল সেটা ঘুচল বটে কিন্তু সেই সঙ্গে একটা দীর্ঘনিশ্বাসও পড়ল।”……
কেন এই দীর্ঘনিশ্বাস? জীব প্রকৃতির best selection (শ্রেষ্ঠ স্বয়ম্বর) এর পথে কোথাও বাধা ঘটেছে। বিমলা কোন ঘরে এবং কার কাছে এল? বিমলার বয়ানে আছে : “আমার শ্বশুর পরিবার সাবেক নিয়মে বাঁধা।…কিন্তু আমার স্বামী একেবারে একেলে (কালটা হ’চ্ছে স্বদেশী কাল–আমার মন্তব্য)। এ বংশে তিনিই প্রথম লেখাপড়া শিখেন, আর এম, এ, পাশ করেন। বড়ো দুই ভাই মদ খেয়ে অল্প বয়সে মারা গেছেন–তাদের ছেলেপুলে নেই। আমার স্বামী মদ খান না, তার চরিত্রে কোনো চঞ্চলতা নেই…”
বিমলার কালে “ভাবুক পুরুষেরা, সধবার পাতিব্রত্যে এবং বিধবার ব্রহ্মচর্ষে কী অপূর্ব কবিত্ব আছে, সে-কথা প্রতিদিন সুর চড়িয়ে বলছেন।” বিমলা যে-ঘরে এসেছে সেই ভাগের সংসারে “খুব অল্প স্ত্রীই যথার্থ স্ত্রীর সম্মান পেয়েছেন।” এখানে এসে এই ঘরে আবদ্ধ থেকে বিমলা কি প্রকৃত সুখী হয়েছে? এই প্রশ্নই নিখিলেশ করেছে–“আমি চাই, বাইরের মধ্যে তুমি আমাকে পাও।” কেন? না, “তুমি যে কাকে চাও তাও জান না।”
বিমলা সম্বন্ধে নিখিলেশ বলছে : “পুরুষের মধ্যে সে দুর্দান্ত, ক্রুদ্ধ; এমন কি অন্যায়কারীকে দেখতে ভালবাসে।”
নিখিলেশ বুঝতে সুরু করেছে : “ঘরের চতুঃসীমানায় যে ব্যবস্থাটুকুর মধ্যে বিমলের জীবন বাসা বেঁধে ছিল, ঘরের বাইরে এসে হঠাৎ সে-ব্যবস্থায় কুলোচ্ছে না।”
এবং–
“আজ একথা স্পষ্ট বুঝেছি বিমলার জীবনে আমি আকস্মিক মাত্র; বিমলের সমস্ত প্রকৃতি যার সঙ্গে সত্য মিলতে পারে সে হচ্ছে সন্দীপ।”
কিন্তু কেন এমন হ’ল? নিখিলেশ জমিদার, অর্থের অভাব নেই। এম-এ পাশ। শিক্ষিত, ভদ্র, ধীর স্থিরমতি, রুচিসম্পন্ন। বিমলার ভাষায় তার “কোন চঞ্চলতা নেই।” শুধু তাই নয়। বিমলা নিজেই নিখিলেশের উদ্দেশে বলছে : তুমি আমাকে সাজিয়ে ভালোবেসেছ, শিখিয়ে ভালোবেসেছ, যা চেয়েছি তা দিয়ে ভালোবেসেছ, যা চাইনি তা দিয়ে ভালোবেসেছ, আমার ভালোবাসায় তোমার চোখের পাতা পড়েনি তা দেখেছি; আমার দেহকে তুমি এমন ক’রে ভালোবেসেছ যেন স্বর্গের পারিজাত, আমার স্বভাবকে তুমি এমন ক’রে ভালোবেসেছ যেন সে তোমার সৌভাগ্য।”
তবু কেন এমন হ’ল? নিখিলেশের এ ধারণা কেন হ’ল যে, বিমলার সমস্ত প্রকৃতি সন্দীপের সঙ্গে মিলতে পারে?
বিমলাই অনেকবার আপসোস করে বলেছে, তার স্বামী, বড় ভালো, বড় বেশী ভালো, এত ভালো না হলেই ভালো হত। অর্থাৎ সে নিখিলেশকে অতিরিক্ত ভালো হিসেবে তো চায় নি, সে চেয়েছে সন্দীপের মন্দও কিছু থাক নিখিলেশের মধ্যে–তবেই সে নিখিলেশকে পরিপূর্ণরূপে পেতে পারে। নিখিলেশের একথা ঠিক নয় যে, বিমলার সমস্ত প্রকৃতি যার সঙ্গে মিলতে পারত সে সন্দীপ। এ কথা অর্ধসত্য। বিমলা নিখিলেশকেও চায় যেমন চায় সন্দীপকে; কিন্তু এমন আদর্শ সমন্বয় হয় না বলেই তো এই ঘরে বাইরে ট্রাজেডি– এই অনিবার্য বিপর্যয়।
নিখিলেশ জানে : “সন্দীপের প্রকৃতির মধ্যে একটা লালসার স্থূলতা আছে। তার সেই মাংস-বহুল আসক্তিই তাকে ধর্ম সম্বন্ধে মোহ রচনা করায় এবং দেশের কাজে দৌরাত্ম্যের দিকে তাড়ন করে।”
বিমলাও জানে : কিছুদিন থেকে দেশের কথা বন্ধ হ’য়ে গেছে। এখনকার আলোচনা মডার্নকালের স্ত্রীপুরুষের সম্বন্ধ। “এই দুর্দান্ত ইচ্ছার প্রলয় মূর্তি দিনরাত আমাকে টেনেছে। সন্দীপের মধ্যে যে-জিনিসটাকে পৌরুষ বলে ভ্রম হয়, সেটা চাঞ্চল্য মাত্র তবু আমার রক্তমাংসে এইভাবে গড়া বীণাটা ওঁরই হাতে বাজতে লাগলো।”
বিমলার মনের মধ্যে “পুলক আর ভয় দুইই সমান হয়ে উঠল।” “সে সন্দীপের ফোটোকে হীরে মাণিক মুক্তোর নীচে চাপা দিয়ে চাবি বন্ধ ক’রে রাখে। সে এ জিনিস কাউকে দেখতে দিতে চায় না, কিন্তু এ তার প্রকৃতির অংশ, তাই অপরিহার্য। সমাজে এ জিনিস নিষিদ্ধ বলেই এতো লুকোচুরি, ভাষার কারচুপি এবং ছদ্মবেশ।
কেন?–সেই এক কথা। নিখিলেশের মধ্যে সংরক্ষণশীলতা আছে, উদ্দামতা নেই, যে উদ্দাম নারী-প্রকৃতির সমান কাম্য। নিখিলেশের মধ্যে এই অভাবই বিমলাকে অনায়াসে সন্দীপের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সন্দীপ বলছে বিমলা একদিন নিজেকে সন্দীপের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ ক’রে বলল, “ওগো প্রলয়ের পথিক, তুমি পথে বেরিয়েছ।… রাজা আমার দেবতা আমার…সর্বনাশ গো সর্বনাশ, কী তার প্রচণ্ড শক্তি। যতক্ষণ না সে আমাকে সম্পূর্ণ মেরে ফেলবে ততক্ষণ আমি তো আর বাঁচিনে, আমি তো আর পারিনে, আমার যে বুক ফেটে গেল। বলতে বলতে সে চৌকির উপর থেকে মাটির উপর পড়ে গিয়ে আমার দুই পা জড়িয়ে ধরলে। তার পরে ফুলে ফুলে কান্না, কান্না, কান্না। এই তো হিপনটিজম।”
বিমলা এই সন্দীপকে বাইরের বৈঠকখানায় এবং নিজের অন্তরে আদরের আসন দিয়ে নিখিলেশের সঙ্গে বিরোধ করতে লাগল, সন্দীপকে মুগ্ধ করার জন্য বিশেষ সাজ-সজ্জা করতে লাগল, তার জন্য জমিদারীর টাকা নিজের ঘর থেকে চুরি করল, নিখিলেশের অতিভালমানুষিতে বীতশ্রদ্ধ হ’য়ে সন্দীপের কাছে সে স্পষ্টতই নিজেকে সর্বতোভাবে নিবেদন করল।
নিখিলেশের প্রকৃতি ও সন্দীপের প্রকৃতি ‘স্বদেশী’ সম্পর্কে উভয়ের মনোভাবেই ধরা পড়ে। নিখিলেশ একদিন বিলাতী বস্ত্র বহ্নুৎসব সম্পর্কে বিমলাকে বলছিল : “গড়ে তোলবার কাজে তোমার সমস্ত শক্তি দাও, অনাবশ্যক ভেঙ্গে ফেলবার উত্তেজনায় তার সিকি পয়সা বাজে খরচ করতে নেই।”
সন্দীপ তার নিজের চরিত্র সম্বন্ধে সচেতন ছিল, তবু অনেকসময় নিজেকে সামলাতে পারত না। সে বলে, “যা আমি কেড়ে নিতে পারি সেইটেই যথার্থ আমার, এই হ’ল সমস্ত জগতের শিক্ষা।…লজ্জা? না, আমি লজ্জা করি নে।…আমরা পৃথিবীর মাংসাশী জীব, আমাদের দাঁত আছে, নখ আছে। আমি যে চালে চলি তাতে মেয়েদের হৃদয় জয় করতে আমার দেরি হয় না। ওরা আমার চোখেমুখে দেহে মনে কথায় ভাবে প্রবল ইচ্ছা দেখতে পায়, সে একেবারে ভরপুর ইচ্ছা, চাই-চাই খাই-খাই করতে করতে কোটালের বানের মতো গর্জে চলেছে। বার বার দেখলুম আমার সেই ইচ্ছার কাছে মেয়েরা আপনাকে ভাসিয়ে দিয়েছে, তারা মরবে কি বাঁচবে তার আর হুঁশ থাকে নি।”
বিমলা সম্পর্কে সন্দীপ বলছে : জীবনে অনেক অ্যাফিনিটি পেয়েছি…আর একটি…স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সেও আমার অ্যাফিনিটি দেখতে পেয়েছে।”
বিমলা বলে সন্দীপের “যেমন জোর বক্ততায় তেমন ব্যবহারে।”
আর একটি চমৎকার প্রতীক সৃষ্টি করেছেন রবীন্দ্রনাথ–যেটি আমার থিওরীর সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়। সন্দীপ বিমলার ছবি অপসারণ ক’রে নিখিলেশের পাশাপাশি তার নিজের ছবি রেখে দিল; বিমলা কোনো বাধা দেয় নি; বরং সমাদরে তাকে রক্ষা করেছে। এই তো বিমলার কাম্য, এই দুই বিপরীতের বিন্যাস (জাকসটাপজিসন)। “সন্দীপের চরিত্র নেই, সন্দীপের শক্তি আছে। সেই জন্যে ও যে মুহুর্তে প্রাণকে জাগিয়ে তোলে সেই মুহূর্তেই মৃত্যুবাণও মারে।”
আরও একটি সুন্দর ইঙ্গিত আছে। অমূল্যের সংস্পর্শে এসে বিমলার “নারী হৃদয়ে যেখানে মায়ের আসন সেইখানকার জানলাটি হঠাৎ একবার খুলে গিয়েছিল। (কিন্তু সন্দীপের পুনরাগমনে) প্রেয়সী নারী এসে মাতার স্বস্ত্যয়নের ঘরে তালা লাগিয়ে দিলে।”
বিমলা মা হয়নি।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সন্দীপকে প্রকৃতির উদ্দামতার প্রতীক করেছেন বটে, সম্পূর্ণ শয়তান করেন নি।
“আমি বিমলার হাত চেপে ধরলুম, আমার দেহবীণার ছোটো বড়ো সমস্ত তার ভিতরে ভিতরে ঝঙ্কার দিয়ে উঠল; কিন্তু ওই অস্থায়ীতেই কেন থেমে গেল, অন্তর পর্যন্ত কেন পৌঁছল না?”
বিমলা সন্দীপের এই দুর্বলতা ঘৃণা করে এবং তার সেই জবরদস্তি ভাবটি যেখানেই দ্বিধা করেছে, বিমলা ধিক্কার দিয়েছে। তাতে বিমলার চরিত্রটি আরো ফুটে উঠেছে; বিমলা সন্দীপের কাছে কি চায় অথবা, নিখিলেশের মধ্যে সন্দীপকে কিভাবে চায় তা আরও ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু সন্দীপের বিবেক ছিল বলেই বিমলার চুরি-করা গিনিগুলো ফেরত দিয়েছে নিখিলেশের কাছে–যেমন ফিরিয়ে দিয়েছে অক্ষত বিমলাকে। এবং বিমলার উদগ্র কামনাকে ফিরিয়ে দিয়েছে বিমলার কাছেই। নিখিলেশ বিমলাকে ছুটি দিয়েছিল যাতে সে সন্দীপের কাছে যায়, কিন্তু বিমলা যেতে পারে নি। সন্দীপ জানত আজ যদি সে বিমলাকে কেড়ে নিয়ে যায়, সে একদিন তার ভেতরে নিখিলেশকে খুঁজবে; আজ বিমলা খেলার পুতুল, কিন্তু সে যদি সেদিন সংসার বাঁধতে বসে? সন্দীপের তাই দুর্নিবার উদ্দাম মুহুর্তেও–দেহবীণার ঝঙ্কার অন্তরা পর্যন্ত পৌঁছায়নি, অস্থায়ীতেই থেমে গেছে। তারপর বিমলার ক্লান্তি এসেছে, সন্দীপের দুর্বলতায় একাধারে বীতশ্রদ্ধ ও উল্লসিত হয়েছে, তারপরই নিখিলেশের তুলনা মনে এসেছে। সেখানে সে আবেগে নিখিলেশকে ডেকেছে –প্রিয়তম। এই কারণেই বিমলার চরিত্রটি এত করুণ এবং পাঠকের মনে একটা সহানুভূতির মোটা দাগ রেখে যায়।