রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস

নৌকাডুবি

পুলকেশ দে সরকার

নৌকাডুবির প্রথম প্রকাশ ১৯০৬ সালে। বাংলা ১৩৪৭ বা ইংরেজী ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ এর এক ভূমিকা লেখেন। তাতে তিনি মন্তব্য করেন: এর চরম সাইকলজির প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, স্বামী সম্বন্ধের নিত্যতা নিয়ে যে-সংস্কার আমাদের দেশের সাধারণ মেয়েদের মনে আছে তার মূল এত গভীর কিনা যাতে অজ্ঞানজনিত প্রথম ভালোবাসার জালকে ধিক্কারের সঙ্গে সে ছিন্ন করতে পারে। কিন্তু এসব প্রশ্নের সর্বজনীন উত্তর সম্ভব নয়।

নৌকাডুবি রচনার ৩৫ বছর পর ঐ বইয়েরই ভূমিকার ভাষাটি লক্ষ্য করবার মতো।

এই ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ আর একটি উক্তি করেছেন যার ওপর আমি নিঃসঙ্কোচে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করি। তিনি বলেছেন, নিজের রচনা উপলক্ষে আত্মবিশ্লেষণ শোভন নয়।…নিতান্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে একাজ করা অসম্ভব।

একথাটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে চাই এই কারণে যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার দ্বন্দ্বে লেখকের মনে একটি বিশেষ ভাব বা প্রশ্নের উদয় হতে পারে বা হয়ে থাকে। সে ভাব কাহিনীতে রূপান্তর করার একটি নক্সা বা প্যাটার্ণও তিনি স্থির করতে পারেন। মূল ভাব আর নক্সা রেখায় রেখায় যদি মিলে যায় তো সেই ভাব ও ভাবুক লেখক সার্থক হন। কিন্তু যদি নক্সাটি ভাবানুরূপ না হয়, তবে? তবে পাঠকের প্রতিক্রিয়া, সংজ্ঞা ও নামকরণই প্রবলতর ও গ্রাহ্য।

এখানেও, নৌকাডুবির ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের ভাবটি যদি প্রকাশের রেখায় রেখায় মিলে যায়, তবে বলা যাবে ভাবপ্রকাশের দিক থেকে এ সার্থক হয়েছে। কিন্তু সেখানেও আর একটি প্রশ্ন থেকে যায়। ভাবপ্রকাশের অবলম্বন কাহিনীটি রসোত্তীর্ণ হয়েছে কি? প্রবন্ধ থেকে কাহিনীর পার্থক্যই এই যে, কাহিনীর বক্তব্য যাই থাক, কাহিনীর একটি নিজস্ব রস থাকা চাই। সে রসের অভাব থাকলে কাহিনীটিও সর্বাংশে ব্যর্থ হয়ে যাবে। কাহিনীর প্রকাশভঙ্গিকে প্রবন্ধ রচনার ভঙ্গি থেকে পৃথক করে দেখা কঠিন হবে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে সে প্রতিষ্ঠা পাবে না, মহৎ সৃষ্টির সাহায্যেও সে স্থায়ী হবে না।

কিন্তু নৌকাডুবিতে যে-সাইকলজির প্রশ্নই লেখকের লক্ষ্য হোক, কাহিনী হিসেবেও এর একটি স্বতন্ত্র সত্তা আছে এবং সেটি সর্বতোভাবে না-হোক মোটামুটি রসোত্তীর্ণ। এই শ্রেণীর কাহিনী অনেকটা রহস্যসিরিজের মতো হয় এবং আকস্মিকতাই এদের বৈশিষ্ট্য এবং এর ক্লাইম্যাক্স হচ্ছে একেবারে সমাপ্তিতে বা সমাপ্তির মুখে। এতে কিছু কিছু এমন ঘটনারও অবতারণা হয়েছে যা সহসা বাস্তবানুগ ব’লে গ্রহণ করতে বাধে। নৌকাডুবিতেও যেহেতু এই ধরণের রহস্য আছে এবং তার ক্রমোন্মোচন আছে সেজন্য এই কাহিনীও ঐ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।

কাহিনীটি সংক্ষেপে এই :

ঝড়বাদলে দুইটি বরযাত্রীদল নৌকাডুবিতে বিক্ষিপ্ত হ’য়ে গেল। রমেশ বালুতটে আর একটি বধূকে আবিষ্কার করল। রমেশ বা বধু কেউ কাউকে আগে দেখেনি। কিন্তু বধূর পরিচয় যখন ক্রমশ প্রকাশ পেল, তখন থেকে রমেশের মনে দ্বন্দ্ব জাগল। বধূও একদিন জিগ্‌গেস করল, আচ্ছা, তোমরা সকলেই আমাকে সুশীলা বলিয়া ডাক কেন? এরপর রমেশের হ’ল বিপদ। এই পরের বৌকে কোথায় রাখা যায়? ক’লকাতা এবং লেখাপড়ার অছিলায় বোর্ডিংয়ে। কিন্তু কতকাল এরকম চলবে? বিদেশেও শান্তি নেই, সমাজ জুটে যায়। তারপর একদিন বধূও জানতে পারে রমেশ তার বর নয়। আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে আসে। এদিকে তার আসল বরও নৌকাডুবির পর এই আশায় আছে যে, বৌ কোথাও বেঁচে আছে। তারপর এক অসম্ভব যোগাযোগের মধ্যে বধূর প্রকৃত বরের সঙ্গে মিলন হয়। কিন্তু এর মধ্যে আরও জট আছে। রমেশ এই অজ্ঞ অপরিচিত বধুর ক্ষেত্রে মহৎ সংযমের পরিচয় দিতে লাগল বটে কিন্তু হেমনলিনী নামে আর একটি অপরিণীতা শিক্ষিত মেয়ের প্রতি তার মনপ্রাণ দুর্নিবারবেগে ধাবিত হ’ল। অথচ কমলার কোন একটা সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত এই প্রণয় পরিণয়ে চূড়ান্ত হতে পারে না। হেমনলিনীর রমেশের মতো সমস্যা ছিল না, সে যখন রমেশকে ভালবেসেছে তখন কিছু আর বাকী রাখেনি। অন্নদাবাবু-হেমনলিনীর ব্রাহ্মসমাজ ও রমেশের হিন্দুসমাজের মধ্যে সেকালের বিরোধের সম্পর্ক নৌকাডুবিতে আছে, কিন্তু গোরার মতো তা অসামান্য নয়। রমেশের সহাধ্যায়ী যোগেন্দ্রের রমেশ-কমলা সম্পর্ক আবিষ্কারের পর থেকে কাহিনী অনেকাংশে রহস্য-রোমাঞ্চের আকার নিয়েছে। ডিটেকটিভ হচ্ছেন অক্ষয়; এই অক্ষয় গোপনে হেমনলিনীর পাণিপ্রার্থী, অতএব রমেশের প্রতিদ্বন্দ্বী। রমেশও এই ডিটেকটিভকে এড়িয়ে ষ্টীমারে অনির্দেশ যাত্রা করল। পথে জুটল উমেশ নামে এক বালক-চাকর আর চক্রবর্তী খুড়ো নামে এক সামাজিক সদালাপী মানুষ। রমেশের স্ত্রী হিসেবে কমলাকে এড়িয়ে যাওয়ার অস্বাভাবিকতা চক্রবর্তী-পরিবারের দৃষ্টি এড়ালো না। কমলা গৃহত্যাগ করল। আত্মহত্যার উপক্রমণিকায় স্বামীর বেঁচে থাকার সম্ভাব্যতা তাকে নিরস্ত করল। তারপর গঙ্গাতীরে এক আপাতঃ কোমল কঠোর গৃহণীব আশ্রয়ে। সেই আশ্রয়ে স্বামী সন্দর্শন–ইত্যাদি।

এই যে ঘটনা-পরম্পরার জটিল গ্রন্থি এর স্বাভাবিকতা বা বাস্তবসম্ভাবনা মন সর্বত্র সহসা গ্রহণ করতে চায় না। বাস্তবজীবনের অনেক ঘটনা উপন্যাসের চাইতেও বিস্ময়কর (স্ট্রেনজার দ্যান ফিকসান) হতে পারে কিন্তু গল্প বা উপন্যাসের একটা নিজস্ব লজিক, ন্যায়শাস্ত্র বা রীতি আছে। তা লঙ্ঘন করলে মন মানতে চায় না। পাঠকের মন যেখানে সায় দেয় না বা বিদ্রোহ করে, সেখানে গল্প বা উপন্যাস ব্যর্থ হয়েছে একথা বলতে দ্বিধা নেই। নৌকাডুবি সমগ্রভাবে বহুলাংশে রসোত্তীর্ণ হলেও ওরকম এমন অনেক ব্যর্থতা আছে এবং ঐ ব্যর্থতার উপলখণ্ডে ব্যাহত গল্পপ্রবাহকে লক্ষ্য করে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনা স্বাভাবিক এবং বালুতটে নবকুমারের মতো একা ঘুরতে ঘুরতে অকস্মাৎ রমেশের কমলাকে আবিষ্কার চমৎকার স্বাভাবিক গতিতে এগিয়েছে এবং এখানে সাফল্যের সঙ্গে সমগ্র কাহিনীর কৌতূহল জাগিয়ে তোলা হয়েছে। নিরাশ্রয় বালিকাবধূর রমেশের অঙ্কাশ্রয় গ্রহণও বড় সুন্দর। রমেশ যদি নিজের বধূকেই এভাবে আবিষ্কার করত, বাকী কাহিনীর গ্রন্থিমোচন অপ্রয়োজন হ’ত। কিন্তু এ সুশীলা নয় কমলা, অপর বরযাত্রীদলের বধূ। রমেশের বুঝতে দেরি হয়নি, বুঝতে দেরি হয়েছে কমলার। সে তার কাহিনী পরিচয় বলে গেছে এবং একবার বিস্ময়ে জিগগেস করেছে : তোমরা সকলেই আমাকে সুশীলা বলিয়া ডাক কেন? হয়তো রমেশ আগাগোড়া চেপে যেতে পারত। রমেশের পক্ষে কমলাকেই সুশীলা বলে বা সজ্ঞানে বধু বলে গ্রহণ করার পথে বাইরের কোন বাধা ছিল না। যত বাধা অন্তরের, সামাজিকবোধের–এবং সব চাইতে বড় বাধা–রবীন্দ্রনাথ মানুষকে কেবলমাত্র প্রবৃত্তিতাড়িত না করে সংযমের সৌন্দর্যে মহৎ ক’রে তুলতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ মানুষের সহজ প্রবৃত্তিকে কোথাও কখনও অস্বীকার করেন নি, কিন্তু প্রবৃত্তিকেই একান্ত করে দেখার মতো রুচিবোধ তার ছিল না। তাই রমেশ আমাদের সম্মুখে প্রথমেই পরিচিত হ’ল তার সামাজিক বিবেক নিয়ে এবং কঠিন সংযমে সুন্দরতর প্রতিভাত হ’ল। অথচ রমেশ মানুষই এবং প্রবৃত্তিকে সংযত করা অর্থ প্রবৃত্তিমুক্তি নয়। তার সেই প্রবৃত্তির প্রকাশ পেয়েছে হেমনলিনীর সান্নিধ্যে এবং সেখানেও নারীর প্রতি নরের স্বাভাবিক আকর্ষণ সাংস্কৃতিক স্নিগ্ধতার মধ্যে নম্র উচ্চারণের মতো। কমলা তার স্ত্রী নয়, এই জ্ঞান, যে স্ত্রী নয় তার সঙ্গে স্ত্রীর মতো ব্যবহার করতে নেই, সুযোগ পেয়েও নয়, পরস্ত্রীর অজ্ঞানতাবশত সম্মতি সত্ত্বেও নয়, রমেশের এই সামাজিকবোধ যতখানি তাকে কমলার প্রতি বিমুখ করেছে, ততখানি প্রবলবেগে সে হেমনলিনীর দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। একদিকে পথ যখন রুদ্ধ তখন অন্যদিকে উন্মুক্ত পথের দিকে মানুষ দ্বিগুণ আগ্রহে ছুটে যায়। কিন্তু যে-কোন পথ নয়, যদি সে উন্মুক্ত গবাক্ষ রমেশকে পঙ্কিল নর্দমায় নিক্ষেপ করত, তবে রমেশের এই সামাজিকবোধ ও সংযম মহৎ হ’ত না। সুতরাং, দুর্ঘটনাজনিত বঞ্চনায় রমেশের রুচি ও শালীনতা ক্ষুন্ন হয়নি। আজ যে-কোন নবীন লেখকের হাতে পড়লে রমেশের দুর্গতির সীমা থাকত না; নিতান্তই যদি পরস্ত্রীসম্পর্কিত সামাজিক বোধ থাকত তো রমেশকে হতাশার অন্ধকূপে কোনো করুণাময়ী গণিকার হাত থেকে বিস্মৃতির তরলপাত্র নিতে দেখতাম। রমেশ বলিষ্ঠ পুরুষের মতো ঐ সমস্যা কাঁধে নিয়ে দেশবিদেশ ঘুরে ফিরেছে যদি কোথাও এই দুঃসাধ্যয সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়। সরলা কমলার অভিমান বা ঘনিষ্ঠ-সান্নিধ্য তাকে এই উঁচু জায়গাটি থেকে টেনে নামাতে পারেনি।

সুতরাং, সাইকলজির প্রশ্ন শুধু কমলার ক্ষেত্রে নয়, রমেশের ক্ষেত্রেও বটে। রমেশ যদি সজ্ঞানে প্রতারণা করত, তবে অজ্ঞান কমলার মাঝে মাঝে সংশয়ের বাতাস ছাড়া এই আস্বাভাবিক সংসারকে কোনকিছু বিক্ষুব্ধ করতে পারত না। কিন্তু রমেশের মনে বরাবর একটা স্টেইন (strain), একটা ন্যায়-অন্যায়বোধের কাঁটা বিঁধে থাকত, হয়তো তারই কোন একটা স্ফুট বা অস্ফুট বেদনার্তিতে কমলার সাইকলজি উত্তাল হয়ে উঠতে পারত, ভয়ঙ্কর একটা অসুস্থ ট্রাজিডি পাঠককে আহত করে দিত। দীর্ঘকাল সর্বতোভাবে স্ত্রীরূপে ব্যবহৃত হবার পর কমলা যদি জানত যে, রমেশ তার বিবাহিত স্বামী নয়, তবে কি হতে পারত সেইটে যেমন কমলার সাইকলজির প্রশ্ন, বিবাহিত স্বামী নয় বলেই রমেশ তাকে স্ত্রীর আদর দেয়নি এই আকস্মিক আবিষ্কারও কমলার সাইকলজির প্রশ্ন।

রমেশকে আমরা পেয়েছি সামাজিক জীব হিসাবে–যার মধ্যে সামাজিক সংস্কারগুলো সজীব এবং মানুষ হিসাবে মানবিক প্রবৃত্তি ও সংযমও অতন্দ্র। কমলা বিদ্যায় বা কালচারে সমোজ্জ্বল না হলেও তার সংস্কার যাবে কোথায়? তারও সামাজিক সংস্কার এবং প্রবৃত্তি ও সংযমগুণ আছে। প্রকৃত সমাজের অজ্ঞানতা সত্ত্বেও কমলার ধৈর্যচুতি ঘটেনি, অসংযত হয়নি; শৈলজার স্বামীপ্রীতিতে চঞ্চল হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু রমেশের বিমুখতাকে সে কোন ছলাকলায় ভাঙতে চেষ্টা করেনি।

রবীন্দ্রনাথকে কেউ কেউ প্রকৃতির পূজারী ব’লে অপমান ক’রে থাকেন। তাঁরা একথাটি আদৌ বুঝতে পারেন না, প্রকৃতির সৌন্দর্যে যে একটি সংগঠনাত্মক ধৈর্য নিষ্ঠা আছে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি সেখানে মহিমাময়, নিছক প্রকৃতিতে নয়। মানুষকে তিনি সেখানে র‍্যাশনাল, সেখানে সুন্দর ও মহান্ করতে চেয়েছেন যেখানে কেবলই প্রকৃতির উদ্দামতা, কালবৈশাখীর রুদ্রতাণ্ডব সক্রিয় নয়, যেখানে শস্যশ্যামলা পৃথ্বী এবং রসসিঞ্চিত বসুন্ধরায় বসন্ত জাগ্রত। এ যেন দীর্ঘ কঠোর তপস্যার ফল। রবীন্দ্রনাথ তাই বারে বারে মানুষকে একান্ত প্রকৃতি থেকে, অনিয়মিত প্রবৃত্তি থেকে উর্ধ্বে রাখতে চেয়েছেন; তিনি চেয়েছেন, নর-নারীর সহজ মিলন সেও যেন হয় কালচারের মধ্যে, কেবলমাত্র প্রকৃতি বা প্রবৃত্তিই যেন না সেখানে আপাতঃমিলনের বন্ধন-গ্রন্থি হয়। উভয়ের সমগ্রতার মধ্যে উভয়ের সর্বাত্মক মিলন হবে, পরস্পরের সংস্কার, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, আদর্শ ও লক্ষ্য মিলিয়ে হবে বন্ধন–এবং যেখানে সহজ প্রবৃত্তিটুকু অনস্বীকার্য অস্তিত্বের প্রাপ্য মর্যাদার অতিরিক্ত দাবী করতে পারবে না।

নৌকাডুবি ঔপন্যাসিক সৌকর্যের হিসাবে প্রথম শ্রেণীর নয়, সর্বতোভাবে রসোত্তীর্ণও নয়, কিন্তু এমন একটি মহৎ ভাব এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে, উপসংহারে তো বটেই, অন্যত্রও পাঠককে পীড়িত বোধ করতে হয় না। আজকালের কোন কোন উপন্যাস পাঠের পর, কেবল ব্যর্থতার জন্য নয়, বিকৃত সাইকলজির অভিব্যক্তির জন্যও, কেমন অশুচি মনে হয়। কোন কোন আধুনিক লেখক এমনই স্বায়ুদৌর্বল্যের পরিচয় দেন যে, যা তার মাত্র কল্পনার বা কামনার তাই ভাষায় দ্রুতগতিতে কাহিনীর আকার দিয়ে যতক্ষণ না একটা ক্লেদাক্ত অশুচিতে পৌঁছোনো যাচ্ছে ততক্ষণ যেন একটা অস্বস্তির মধ্যে থাকেন। তাতে ভাব তো বটেই শিল্পকাজও ব্যর্থ হয়। নৌকাডুবি সেই দৃষ্টিতে মহৎ, বাস্তবতার নামে মানুষের সকল সদ্গুণ ও মহদ্ভাব দমন করার, এমন কি অস্বীকার করার, যে-ঝোঁক আধুনিক উপন্যাসগুলিতে প্রবল, নৌকাডুবি তা থেকে বহু দূরে।

শুধু তাই নয়, নিছক বিয়োগাশ্রুও রবীন্দ্রনাথের বলিষ্ঠ দৃষ্টিকে করুণ ক’রে তুলতে পারেনি। কমলা যখন নিসংশয়ে জানল–এতদিন সে যাঁকে নিয়ে ঘর বাঁধবে পরিকল্পনা করছিল এবং যাঁকে সে সেভাবেই তার হৃদয়াসনে সভক্তি আহ্বান জানাচ্ছিল তিনি তার স্বামী নন, তখন দীর্ঘকালানুসৃত হিন্দুমেয়ের সংস্কার তাকে গঙ্গাতীরে তাড়িত করল, এই অবস্থায়, এই কলঙ্কময় জীবনকে নিশ্চিহ্ন করতে গঙ্গাগর্ভে প্রাণ বিসর্জন ছাড়া তার গত্যন্তরই বা কি? নিশ্চিত মৃত্যুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একবার একটা ক্ষীণ আশা উঁকি মারল : যদি তিন বেঁচে থাকেন! একদা এক বালিয়াড়িতে বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার সন্ন্যাসিনী কপালকুণ্ডলাকে আবিষ্কার করেছিল, সে “বি-বা-হ কাকে বলে” জানে না, সে ঘর বাঁধতে চায়নি, পারেনি, অরণ্য তাকে ডেকেছে এবং নবকুমার বৃথাই তাকে ঘরের দিকে টেনেছে, নদীতট ভেঙে তার অন্তিম যেখানে করুণ–সেখানে যে-জানে বিয়ে কাকে বলে এবং যে ঘর বাঁধতে চেয়েছে, অথচ রমেশের বিমুখতাই যেখানে বাধা হয়েছে সেই গৃহীকন্যা কমলার নদীগর্ভে আত্মবিসর্জন করুণতর হতে পারত মাত্র, সুসঙ্গত হ’ত না। সমস্যার সহজ সমাধানে মৃত্যুর আবেদন রবীন্দ্রনাথের-সৃষ্টিকে ক্ষুণ্ণ করেনি। ডাক্তারের মধ্যে একটি বৃহত্তর মহত্তর হৃদয়কে তিনি সিদ্ধিলাভে অপেক্ষমান তপস্বীর মতো একদিন পাঠকের সামনে উপস্থিত করলেন। অত বড় হৃদয় ছাড়া কমলার এই দুর্ভাগ্যতাড়িত পরপুরুষ সান্নিধ্যের নারীজীবনকে কে নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করবে? রমেশ যেখানে সামাজিকবোধে কমলার প্রতি বিরূপ (ও প্রবৃত্তির উর্ধ্বে) এবং হেমনলিনীর দিকে আকৃষ্ট হয়েও কমলার জীবনভার বহন-অস্বীকারে কুণ্ঠিত, সেখানে অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বলিষ্ঠ প্রত্যাশায় কমলার প্রতি একনিষ্ঠ ও একাগ্রচিত্ত ডাক্তারের চরিত্র-সমন্বয় নৌকাডুবির মতো দুর্বল কাহিনীকেও শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়েছে। কমলাকে বাদ দিলেও এবং সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দ্বিধা থাকলেও রমেশের প্রণয়ের একটি সুপাত্রী ছিল হেমনলিনী, কমলার স্বামী ডাক্তার সে বিষয়েও নিরবলম্ব ছিল। তার জীবনে কমলা সর্বগ্রাসী–এমন প্রস্তুত ক্ষেত্রেই দৈবক্রমে পরপুরুষাশ্রয়ী কমলাকে সহজে স্থাপিত করা সম্ভব।

কিন্তু কমলা? কমলার জীবনে একটা উৎকণ্ঠা ছিল। রমেশের ইচ্ছা ছিল যে, সে কমলাকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করার জন্যই সকল কথা কমলার স্বামীর কাছে খুলে বলে। কমলা এ পরিকল্পনায় সায় দেয়নি। তার একান্ত কামনা, কমলার এই জীবনটুকু তার স্বামীর কাছে অকথিতই থাকে। হয়তো সে নিজেই কোনকালে সুযোগমতো স্বামীর কাছে তা নিবেদন করবে এবং তার ফলাফল সহজেই গ্রহণ করবে, কিন্তু আর যেন-না কেউ এ কাহিনী তার স্বামীকে জানায়–এবং রমেশ তো নয়ই। কি জানি, আজ এতদিন দুঃখকষ্ট উত্তরণের পর যে ফলপ্রাপ্তি হ’ল তা যদি সামান্য সংশয়ের বাতাসেই বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়! এখানে তার নারীসুলভ সংস্কার কাজ করেছে। পুরুষ যত সহজে সকল কথা খুলে বলতে ব্যস্ত হয়, মেয়েরা তত সতর্ক, কারণ প্রচলিত সমাজে পুরুষের এই বলায় কোন দায় নেই, তাদের ছোটবড় চ্যুতি বরাবর কেবল মার্জনা নয় প্রশ্রয়ও লাভ করেছে, মেয়েদের সামান্য চ্যুতিও নৈর্ব্যক্তিক সমাজের সহস্রদৃষ্টিতে অমার্জনীয় বলে গণ্য হয়েছে, এবং এ মত সর্ববাদী সম্মত। কমলার মনে সে-ভয় থাকা স্বাভাবিক। সেই ভয়ে সে পূর্ববর্তী রমেশ-কমলার জীবনকে আকুল হৃদয়ে অস্বীকার করতে চেয়েছে, ভুলতে চেয়েছে। তাই এই কাকুতি–রমেশ যেন-না এ কাহিনী প্রকাশ করে। সমগ্র কাহিনীতে রমেশের যে সংযম ও সামাজিক আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে তাতে একথা ধরে নেওয়া যায় যে, সে আধুনিক কোন নায়কের মতো নায়িকার বিব্রত অবস্থায় ব্লাকমেল করবে না। কমলা রমেশকে এতদিন যতটা জেনেছে তাতে সে এ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে–আর, সত্যি, রমেশ তো কমলার হাত থেকে নিষ্কৃতিই শুধু চায় নি, সে চেয়েছে কমলা কোন নিরাপদ স্থানে–রমেশ থেকে দূরে–থাকুক, স্বস্থানে পুনরধিষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা থাকলে তো কথাই নেই।

কিন্তু এ কমলার নঙর্থক দিক। তার একটা স্বীকারার্থক দিকও আছে। সেটিই হ’ল রবীন্দ্রনাথের সাইকলজির প্রশ্ন। রমেশ-সান্নিধ্যমুক্ত কমলা স্বামী সনদর্শন ও মিলনের সম্ভাবনাকালে বলছে : আমি যে স্বামীকে কখনো দেখি নাই বলিলেই হয় আমার সমস্ত মনের ভক্তি তাঁহার উদ্দেশ্যে যে কেমন করিয়া গেল, তাহা আমি বলিতে পারি না।

রবীন্দ্রনাথের মনেও এই প্রশ্ন : স্বামীর সম্বন্ধের নিত্যতা নিয়ে যে সংস্কার আমাদের দেশের সাধারণ মেয়েদের মনে আছে তার মূল এত গভীর কি না যাতে অজ্ঞানজনিত প্রথম ভালোবাসার জালকে ধিক্কারের সঙ্গে সে ছিন্ন করতে পারে।

সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জবাব দিতে চেষ্টা করেছেন এই বলে যে, এসব প্রশ্নের সর্বজনীন উত্তর সম্ভব নয়।

তথাপি এর মধ্যে একটি সর্বজনীন সত্য আছে। সেটি এই যে, যদি কখনও কোন মেয়ে বা ছেলে, তা সে যে দেশের যে কালের বা যে সমাজেরই হোক, কখনও হঠাৎ আবিষ্কার করে যে, সে দৈববশত বা ঘটনাচক্রে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, এই মুহুর্তে যাকে সে স্বামী বা স্ত্রী বলে কল্পনা করছিল সে স্বামী নয় বা স্ত্রী নয়, তার স্বামী বা স্ত্রী আর কোথাও আছে, তবে সে নিঃসন্দেহে সেই অদৃশ্য স্বামী বা স্ত্রীর দিকেও আকৃষ্ট হবে এবং একটি কল্পিত মূর্তি ও কিছু কল্পিত আচরণ সাগ্রহে, সস্নেহে ও সগৌরবে লালন করবে। যদি কখনও অ-দৃষ্টকে দেখার এতটুকু সম্ভাবনাও উঁকি মারে, তবে সেই আগ্রহ প্রবলতর হয়ে থাকে, সন্ধান পাওয়া গেলে আরও প্রবল হয় এবং যেখানে পাওয়ার সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে দেখা দেয়, সেখানে মিলনের আকাঙ্ক্ষাও প্রবলতম হয়। যারা শিক্ষিত, মার্জিত, সংযত তাদের কিছু-না-কিছু অবলম্বন থাকে, তাদের কেউ কেউ হয়তো সব পরিস্থিতিই নিরাসক্তভাবে গ্রহণ করতে পারে, অবস্থা অনুসারে মানিয়েও নিতে পারে। কিন্তু কমলার যেখানে দৃশ্যমান কল্পিত স্বামীর অনাদরে সংসার সুচনা সেখানে মোহমুক্তির পর অদৃশ্য কল্পিত স্বামীই তার প্রবলতর আকর্ষণ হবে দুটি কারণে–জন্মান্তর-বিশ্বাসী সেই শিবপূজার সংস্কার ও অদৃশ্য স্বামীর অস্তিত্ব তারই কল্পনার রঙে সুন্দরতর। কমলা তাই অনায়াসে অজ্ঞানজনিত ভালোবাসার জালকে ধিক্কারে ছিন্ন করতে পেরেছে এবং বিবাহিত স্বামীর খড়ম জোড়ায় তার ভক্তি অর্ঘ্য নিবেদন ক’রে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করেছে। এই পরম প্রাপ্তি হারাবার ভয়ে পরপুরুষ রমেশের সান্নিধ্যের ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার আকুলতা যতখানি সত্য, নিজের সুকুতিবলে হারানো স্বামীকে ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষাও তেমনি সত্য। কমলার ভাগ্য ভাল যে, তার অদৃশ্য কল্পনার স্বামী বাস্তব স্বামীর রেখার রেখায় মিলে গেছে–সম্ভবত কিছু বেশী। কমলার জীবনে ঐ সাইকলজির প্রশ্নের উত্তরটি স্পষ্ট। সে অজ্ঞানজনিত ভালবাসার জালকে কৃতজ্ঞতার ফুলে ফুলে ঢেকে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করেছে এবং হৃদয়ের সকল অর্ঘ্য কোন অধিকার নয়, কোন দাবী নয়, প্রকৃতি বা প্রবৃত্তির তাড়না নয়, ভক্তির পাত্রে উৎসর্গ করেছে।

সত্য কথা। যে-মেয়েরা শৈশবে ও কৈশোরে শিবপূজা করে শিবের মতো বর পাবে বলে এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে জন্মজন্মান্তরে অচ্ছেদ্য বলে জানে, জানে তাদের বিয়েটা প্রজাপতির নির্বন্ধ ছাড়া কিছু নয়, জানে পতি পরম দেবতা এবং এই দেবতাকে তপস্যা ক’রে পেতে হয়, পাপপুণ্য সুকৃতি দুষ্কৃতি যার কর্মফল বলে জানে–তারা যেভাবে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে, অন্য পরিবেশে লালিত পরিবর্ধিত মেয়েরাও সেভাবে একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে এমন না হওয়াই সঙ্গত ও স্বাভাবিক। কিন্তু কমলার মতো মেয়েদের পক্ষে, ঘটনাচক্রে যাকে স্বামী বলে জানতে হয়েছিল সে স্বামী নয় একথা জানতে পারলে, ‘অজ্ঞানজনিত ভালোবাসার জালকে’ ধিক্কারে ছিন্ন করা সম্ভব। কেননা, প্রকৃত সত্য না জেনে সে যে-কল্পিত সত্যের পেছনে ছুটেছিল তা মিথ্যা হ’ল সত্যের আবিষ্কারে। এ অনেকটা বিদ্যার্জনে জ্ঞানলাভের মতো। অজ্ঞান অবস্থা ও জ্ঞান অবস্থার মধ্যে এই পার্থক্য যে, অজ্ঞান অন্ধকারের মতো, জ্ঞান আলোকের মতো, অন্ধকারে যে মোহ বা যে কল্পিত অবস্থা থাকে, তা আলো জ্বললে দূর হয়, সত্য আপনিই প্রতিভাত হয়। কিন্তু এখানেও সেই সংস্কারের কথা–সর্বজনীন উত্তর সম্ভব নয়।

নৌকাডুবি ❀ রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ❀ এডুলিচার পাঠশালা