পাতার নাম মূলগ্রন্থে নেই।
উপন্যাস শুধুই উপাখ্যান নয়। তাতে বক্তব্যও একটা থাকে। সেই বক্তব্য আশ্রয় ক’রে কতকগুলো চরিত্র ফুটে ওঠে এবং চরিত্রগুলোর উপলখণ্ডে গল্প প্রবাহ ব’য়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর উপন্যাসেও বক্তব্য আছে। সে বক্তব্য বিশেষ বিশেষ চরিত্রকে অবলম্বন ক’রে সমগ্রতা লাভ করেছে। সে বক্তব্য কি, সে চরিত্রগুলো কি এবং এসব আখ্যানের মূল্যই বা কি? বউঠাকুরানীর হাট, নৌকাডুবি, চোখের বালি, গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায়, শেষের কবিতা, চতুরঙ্গ, যোগাযোগ–কেন এবং কিভাবে পরস্পর থেকে পৃথক এবং কোথায় এদের ঐক্য–অথবা এই সকলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ কি বলেছেন এবং রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস উপন্যাস-রাজ্যে কি এবং কতটুকু স্থান অধিকার ক’রে আছে?
এ সব প্রশ্ন তাঁদের মনেই উঠবে যাঁরা সাহিত্যকে একটা আকস্মিক আবির্ভাব মনে করেন না এবং সাহিত্যিককেও নয়। এই গ্রন্থে তারই জবাব দেবার চেষ্টা হয়েছে, স্তুতির পথে নয়, বিশ্লেষণের পথে।
আমাদের দেশে প্রতিভা সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা এই যে, প্রতিভা অন্ধ। প্রতিভা একটি আবেগ। প্রতিভা একটি পাগলাঝোরা। সাহিত্যক্ষেত্রে যাঁরা সৃজনীশক্তিকে নৈর্ব্যক্তিক এবং আধ্যাত্মিক মনে করেন, তাঁদের এই ধারণাটি বদ্ধমূল। প্রতিভাবানের সচেতন বা পরিকল্পিত সৃষ্টিকে তাঁরা স্বীকার করেন না; প্রতিভাবান লেখককে তাঁরা সামাজিক পরিবেশবিমুক্ত উর্ধ্বাকাশে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এই ক’রে তাঁরা প্রতিভাবান লেখককে যে অপমান করেন এবং প্রতিভাকে ছোট ক’রে দেখেন, এই বোধটিও তাঁরা হারিয়ে ফেলেন। এ কথা তাঁরা কেন বলেন না যে, প্রতিভাবানের দৃষ্টি অসাধারণ, সাধারণের দৃষ্টিতে যা এড়ায় ওঁর দৃষ্টিতে তা এড়ায় না, সাধারণ্যে যে গ্রহণক্ষমতা আছে তার চাইতে তাঁর গ্রহণক্ষমতা বেশী এবং সাধারণের দৃষ্টি-গ্রাহ্য জিনিস তিনি দূরদর্শিতায় আত্মসাৎ করেন ও তাই সাধারণের চাইতে বেশী–অনেক বেশী ব্যক্ত করতে পারেন, উপন্যাসে বা গল্পে যখন তিনি তাঁর মানসধৃত ভাব ছক কেটে প্রকাশ করেন তখন তিনি সম্পূর্ণ সচেতন, তাঁর চৈতন্যের উদয় হয়েছে ব’লেই তিনি অ-চেতন জনগণের মধ্যে প্রতিভাবান?
একথা স্বীকার করতে আমাদের অনেকেরই বড় কুণ্ঠা। ঠিক এই বাস্তববোধের অভাবেই প্রতিভাবান মনীষীকে কামিনীকাঞ্চনত্যাগী সন্ন্যাসী করার ব্যগ্রতা দেখা যায়। আমাদের অনেকেরই বলিষ্ঠ চরিত্রের জ্ঞান যৌনলিন্সার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইংরেজের ক্যারেক্টার আমাদের নেই। কামিনীকাঞ্চন সম্পূর্ণ ত্যাগ না করতে পারলে আমরা কাউকে চরিত্রবান ব’লে গ্রহণ করতে চাই না ব’লে গার্হস্থ্যাশ্রমে পরিপুষ্ট পুত্রকলব্রপরিরত মনীষীকেও যতক্ষণ না আমরা কল্পনায় স্ত্রীসঙ্গবর্জিত করতে পারছি ততক্ষণ যেন স্বস্তি পাই না। সুতরাং, প্রতিভাবান ব্যক্তি যেখানে ঋষিকল্প, সেখানে তাঁকে মাটিতে নামাই কেন বা তাঁর প্রতিভাকে পার্থিব চেতনার ধূলায় মাখি কেন? সাহিত্যক্ষেত্রেও যদি এই প্রতিভা প্রবাহ ব’য়ে যায়, তবে ত| ভগবানের আকস্মিক আশীর্বাদ ব’লেই মেনে নিতে হবে–জাগতিক বর্ণমালার সাহায্যে তার বিশ্লেষণ চলবে না। দূর থেকে হীনচিত্তে শুধু এই কথা উচ্চারিত করতে হবে : হে বঙ্কিমচন্দ্র তোমায় প্রণাম, হে রবীন্দ্রনাথ তোমায় প্রণাম, হে শরৎচন্দ্র তোমায় প্রণাম!
অথবা তোমরা রক্তমাংসের নও, তোমরা পৃথিবীর নও, তোমরা অকস্মাৎ স্বর্গচ্যুত দেবতা, মুক্তিকায় তোমরা অমলিন।
এ স্তুতিবাদ সাহিত্যবিচারের রীতি হ’তে পারে না। কেননা, তাতে আর যাই হোক সাহিত্যসৃষ্টিকে আদৌ উপলদ্ধি করা যায় না। অথচ যে-ঐতিহ্য বা পৌরাণিক কাহিনীর মর্মধারা অনুসরণ ক’রে কোন ব্যক্তির কর্মক্ষেত্রে দেবত্বের আরোপ করা হয় সেখানে কিন্তু স্খলিত দেবতার মর্ত্যবেদনাবোধের স্বীকৃতি আছে, জন্ম আছে, জাগতিক দুর্ভোগ আছে, মৃত্যু বা অপমৃত্যুও আছে। প্রতিভাবান অসাধারণ সাহিত্যিকের ক্রমবিকাশে তবে জন্মমৃত্যুর বেদনার মধ্যে জাগতিক অভিজ্ঞতার সত্যটুকু থাকবে না কেন?
আর সত্যি ক’রে তাঁর সাহিত্যসৃজনীশক্তিকে তার ঐ জাগতিক অভিজ্ঞতার সত্যটুকু দিয়েই কেবল সঠিক বোঝা যায়, নান্য পন্থাঃ। যিনি যত বড় প্রতিভাবান ব্যক্তিই হোন, তাঁকে বুঝতে হ’লে তাঁর গায়ের প্রত্যেকটি ধূলিকণা দিয়েই তাঁকে বুঝতে হবে।
সরাসরি উপন্যাস বা গল্পে লেখককে বোঝাব, লেখকের আঙ্গিকউপজীব্য বিচার করা সহজ,– অথচ ঐ যে নির্বিচারের দৃষ্টি তা ঐ অসৎ জিনিষকেই সৎ ক’রে তোলে। এর উদাহরণ হচ্ছে এই যে, শরৎচন্দ্রকে একদল সাধু ব্যক্তি বললেন অশ্লীল, আর একদল বললেন বাস্তববাদী, যেহেতু বাস্তব জীবনে ঐরকম ঘটনা বা চরিত্রের দেখা পাওয়া সম্ভব ছিল, আর একদল অনেক পরে সন্দেহ প্রকাশ করলেন, শরৎচন্দ্রের হয়তো-বা কোন আদর্শ আছে। আজ মনে না থাকতে পারে কারও, কিন্তু স্বর্গত রাজনৈতিক ও পরে সমাজনেতা কৃষ্ণকুমার মিত্রের পরিচালনায় সুনীতি-গোষ্ঠীর প্রতাপ কাটিয়ে উঠতে শরৎসাহিত্যকে কঠিন বেগ পেতে হয়েছে। ঠিক একই রকম বেগ পেতে হয়েছে এই সংশয়টুকুমাত্র প্রকাশ করায়ও যে, তিনি বাস্তববাদী বা বাস্তবধর্মী (বা দক্ষ রিপোর্টার) নন, তিনি আদর্শবাদী। আমাদের মনে আদর্শ বলতেই বিবেকানন্দকে মনে আসে, আদর্শ বলতে কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যের কথা মনে আসে না। যেন আমাদের কাছে আদর্শের বাহ্যিক আচরণটি বড়, আদর্শ বা লক্ষ্য নয়। সুতরাং আদর্শবাদী বলতে শরৎচন্দ্র নিজে কামিনীকাঞ্চন ও আনুষঙ্গিক অসঙ্গত আচরণবর্জিত সন্ন্যাসীর আদর্শজীবন পালন করছেন কিনা এবং তাই সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা, এই অভ্যস্ত ভাবনাটিই মনে আসে। এই কারণেই, বহুদিন শরৎচন্দ্রকে আদর্শবাদী বলে গ্রহণ করতে মাত্রাহীন কুণ্ঠ দেখা গেছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের যে-সব উপন্যাস নিঃসংশয়ে মৌলিক, তার মধ্যে অকাতরে নাম করা যায় চন্দ্রশেখর, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল, দেবী চৌধুরাণী, কপালকুণ্ডলা, আনন্দমঠের।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস কয়টির নাম করি : গোরা, চোখের বালি, নৌকাডুবি, ঘরে বাইরে, যোগাযোগ।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নামগুলিও করি : দত্তা, পল্লীসমাজ, গৃহদাহ, দেনাপাওনা, চরিত্রহীন, শেষ প্রশ্ন, বিপ্রদাস, পথের দাবী।
আরও নাম করি : তারাশঙ্করের কালিন্দী, গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম। বিভূতি বন্দ্যোর পথের পাঁচালী, অপরাজিত। মাণিক বন্দ্যোর পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, সহরতলী ১ম, ২য়। বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের নীলাঙ্গুরীয়, কাঞ্চনমূল্য। বিমল মিত্রের সাহেব-বিবি-গোলাম। সতীনাথের জাগরী।
এই অসম্পূর্ণ সংক্ষিপ্ত তালিকার মধ্যে কি একটি সচেতন ধারা আবিষ্কার করা যায় না? লেখকের সামাজিক-চেতনার স্তরও কি বোঝা অসম্ভব?
না। চন্দ্রশেখর থেকে ঘরে বাইরে, ঘরে বাইরে থেকে গৃহদাহ পর্যন্ত সুর ও সুরকারের মধ্যে একটি সহজগ্রাহ্য সংযোগ থেকে গেছে–যাকে বিভূতি মুখোর নীলাঙ্গুরীয় পর্যন্ত টেনে আনা চলে। আনন্দমঠ থেকে পথের দাবী, পথের দাবী থেকে চার অধ্যায়ে পাওয়া যায় আর একটি সুস্পষ্ট সুর যার জের টান চলে তারাশঙ্করের ধাত্রীদেবতা ও সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী পর্যন্ত। কৃষ্ণকান্তের উইল থেকে চোখের বালিতে, চোখের বালি থেকে বিপ্রদাসে আসা যায়। পল্লীসমাজ থেকে পঞ্চগ্রামে যাতায়াত করা যায়। কালিন্দী থেকে সহরতলী, সহরতলী থেকে সাহেব-বিবি-গোলামের কাছে আসা যায়–আর এদের মধ্যে যে আনাগোনার রাজপথ রয়েছে সেখানে পাওয়া যায় পথের পাঁচালী আর চলমান জীবনে বলিষ্ঠ আশাবাদ অপরাজিত।
লেখকেরা এই সৃষ্টির কাজে সচেতন ও সতর্ক।
চন্দ্রশেখরের চরিত্রগুলিকে একবার আনি : চন্দ্রশেখর, শৈবলিনী, প্রতাপ। বিষবৃক্ষে–নগেন্দ্রনাথ, কুন্দ, সূর্যমুখী। কৃষ্ণকাস্তের উইলে গেবিন্দ, রোহিণী, ভ্রমর। কপালকুণ্ডলায় নবকুমার, কাপালিক, কপালকুণ্ডলা। বঙ্কিমচন্দ্রকে জানতে বা বুঝতে এই যথেষ্ট।
ঘরে বাইরে আছে বিমলা, নিখিলেশ, সন্দীপ। চোখের বালিতে আছে বিনোদিনী, মহেন্দ্র, আশালতা। গোরায় আছে গোরা, বিনয়, পরেশবাবু, ললিতা, সুচরিতা। রবীন্দ্রনাথকে জানতে বা বুঝতে এই যথেষ্ট।
গৃহদাহে আছে অচলা, মহিম, সুরেশ। পল্লীসমাজে রমা ও রমেশ, বেণী ও জ্যাঠাইমা। দত্তায় আছে বিজয়, নরেন, বিলাসবিহারী। চরিত্রহীনে আছে সাবিত্রী, সতীশ, উপেন, দিবাকর, কিরণময়ী। বিপ্রদাসে আছে বন্দনা, বিপ্রদাস, দ্বিজদাস, সতী। শরৎচন্দ্রকে জানতে বা বুঝতে এই যথেষ্ট।
নারীর অবস্থান বা মর্যাদা অথবা নারীর প্রতি পুরুষ প্রধান-সমাজের আচরণে যদি সমাজের প্রকৃতি বিচার করতে হয়, তবে শৈবলিনীর সমাজটি কি? কুন্দ-সূর্যমুখীর? রোহিণীর? কপালকুণ্ডলার? তা নিঃসন্দেহে বঙ্কিম-সমাজ। বিমলা-বিনোদিনীর সমাজ নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রসমাজ। অচলা-রমা-বিজয়া-সাবিত্রী-কিরণময়ী-সতীর-সমাজ নিঃসন্দেহে শরৎ-সমাজ। সমাজ-চেতনাই যার যার সমাজ। সমাজের সীমাবদ্ধতা, সমাজের সংস্কার লেখকের চিত্তে জুড়ে থাকে। তার প্রতিক্রিয়ায় লেখক প্রচলিত সংস্কারের কাছে নতি স্বীকার করতে পারেন, নিরুপায় বোধ থেকে পরিতাপ করতে পারেন–প্রচলিত সংস্কারের সংশোধন-কামনা করতে পারেন, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করতে পারেন। এই প্রতিক্রিয়া-বৈচিত্র্য তাই লেখকের জীবনেতিহাসে খুঁজতে হবে। লেখক কিভাবে কি পরিবেশে বড় হয়েছেন তাই নয়, কি শিক্ষা লাভ করেছেন, কি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং সর্বোপরি, নিজের সামাজিক সংস্কারের গণ্ডির বাইরে আর কোন্ সমাজের আর কোন্ ব্যক্তির আর কোন্ সংস্কারের সংস্পর্শে এসেছেন, তার বিশদ ইতিহাস সংগ্রহ করতে হবে। সেই হ’ল লেখকের সমাজ-চেতনা।
একথা স্পষ্ট ক’রে বলা দরকার মতলব বা অভিসন্ধি সমাজ-চেতনা নয়, আর ঐ দুটো অপদার্থে উপন্যাসের সৃষ্টি হয় না। সমাজ-চেতনা লেখকের সংস্কারে আবদ্ধ থাকতে পারে, সৃষ্টিকালে ওটি বারে বারে বা প্রতি মুহূর্তে উঁকি মারবে–এমন নয়। লেখকের পরিচিত সামাজিক ব্যক্তি বা পরিবেশই লেখককে তার রসদ যোগায়–সার্থক লেখকের পক্ষে তাই অসামাজিক অস্বাভাবিক অবাস্তব চরিত্র-সৃষ্টি সম্ভব নয়। নইলে তার সূচনায়ই ঐ অসামাজিক অস্বাভাবিক অবাস্তব পরিবেশকে মেনে নিয়ে এগোতে হবে–যেমন আমরা রাক্ষস-খোক্কসের প্রাসাদে ঘুমন্ত রাজকুমারীর দিকে এগোই।
শৈবলিনী রাক্ষস-খোক্কসের প্রাসাদে কল্পিত রাজকুমারী নয়। বাংলার অতি-পরিচিত হিন্দু সামাজিক পরিবেশে শৈবলিনী প্রতাপ বড় হয়েছে এবং তাদের প্রণয় জন্মেছে। কিন্তু তখন দেশে ইংরেজ নামে এক বিদেশী জাত এসেছে। মোগলের আধিপত্য তখন অস্তাচলগামী হ’লেও বিরাজমান। প্রণয়ীরা জলে ডুবে আত্মহত্যার চেষ্টা থেকেও ফিরে এসেছে। শৈবলিনার প্রবৃত্তির আগুন তাকে ঘরছাড়া করেছে–কিন্তু এবার? আর কি তাকে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া যাবে? ফিরিয়ে নেয়া যাবে তাকে যে ধীরসংযত স্বামীর নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বাল্যপ্রণয়ীর অভিসারে বেরিয়েছিল? আজ হ’লে, জানি না, শক্তিমান বঙ্কিমচন্দ্র আজকের দুর্বল লেখকদের পথ মাড়িয়ে শৈবলিনীকে সিনেমায় নিয়ে যেতেন কিনা, কিন্তু সেদিন তিনি তা পারেন নি। মোগল-ইংরেজ আধিপত্য পরিবেষ্টিত ব্রাহ্মণ-নেতৃত্বের হিন্দু সমাজে বাংলার অন্নজলপুষ্ট টোলবিমুক্ত আধুনিক শিক্ষার প্রথম গ্রাজুয়েট বঙ্কিমচন্দ্রও তার সামাজিক পরিবেশকে অস্বীকার করতে পারেন নি। এ তার সীমাবদ্ধতা নয়, স্বাভাবিকতা। নারী চরিত্রের আবেগ সমাজের সংস্কারের প্রাচীরে প্রাচীরে কিভাবে আঘাত করে এইটি ফুটিয়ে তুলতে তিনি যদি সার্থক হ’য়ে থাকেন, তবে তিনি কেন যাবেন সমাজের দেয়াল ভাঙার মিস্ত্রীর কাজে? তাই গৃহত্যাগের অপরাধে শৈবলিনীর আর সমাজে ফেরা হ’ল না, শৈবলিনী পাগলিনী হ’ল। কিন্তু প্রবৃত্তির তাড়না যেখানে এক নয় সেখানে কিন্তু সূর্যমুখীকে ঘরে ফেরানো গেছে। কিন্তু বাঁচেনি। সতীনের ঘরে কুন্দও বিষ খেয়েছে। বুনো পরিবেশ থেকে ঘরে এনেও অসামাজিক কপালকুণ্ডলাকে ঘরে রাখা গেল না, সমাজ-অসমাজের দ্বন্দ্বোত্থিত ঘূর্ণিপাকে নবকুমার-কপালকুণ্ডলা কোথায় তলিয়ে গেল? তুমি কি রোহিণী? বলে গোবিন্দলাল তাকে গুলি করে মেরেছিল–ভ্রষ্ট বিধবার কাছেও সমাজের একনিষ্ঠার দাবী, কেননা ভ্রমরই একনিষ্ঠার প্রতীক–সমাজের একান্ত কামনার বস্তু। সতীনও নয়, পরকীয়া প্রেম; পরকীয়াও নয় দেহজ আকর্ষণ; এ বঙ্কিম-সমাজের কাম্য নয়।
রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম সমাজের–ব্রাহ্মণ্য সমাজের নন। ইংরেজ আধিপত্য তখন অবিসংবাদী। ইংরেজী শিক্ষার অগ্রগতি ঘটেছে অনেক। মোগলের সম্পূর্ণ বিলীন। বিনোদিনী বিমলাও ঐ কালের ঐ পরিবেশের। সিনেমা-যুগের নয়। সেখানে বিনোদিনীর প্রেমের পরিণতি সামাজিকতার গণ্ডিমধ্যে অসামাজিক হ’তে পারে অসামাজিক গণ্ডিমধ্যে সামাজিক হতে পারে না। হয়ও নি।
শরৎবাবু কিরণময়ীকে ঘুম পাড়াতে চেয়েছেন, সে যেন-না বহুতত্ত্বের তর্কজালে নিজেকে জড়িয়ে প্রচলিত সংস্কারমুক্ত আবেগ প্রকাশ করে, সে যেন দিবাকরকে নিতান্ত বালক ব’লেই উপেক্ষা করে, সমাজনিষ্ঠ উপেনের দৃষ্টি আকর্ষণের বেশী কিছু যেন সে না করে। আর, সাবিত্রী সতীশকে যতই আকৃষ্ট করুক, ও যেন সমাজের বাইরেই থাকে–ও তো সমাজের মেয়ে নয়। নটীদের দেবী ব’লে গ্রহণ করার ঔদ্ধত্য বা সামর্থ্য এ সমাজের ছিল না। কমলকে তাই নগরের বাইরে রাখতে হয়, নগরের নিয়মে সে যেন না শৈবাচারে ব্যতিক্রম ঘটায়–প্রশ্ন যা বা যত তোলার তুলুক। জবাব দেবে বিপ্রদাস–আশুতোষবাবুও নন।
বিপ্রদাস শরৎচন্দ্রের সমাজ-চেতনা যত পরিস্ফুট অথবা শরৎচন্দ্র বিপ্রদাসের প্রত্যেকটি চরিত্র সৃষ্টিতে, এমন কি, নামকরণে যত সচেতন, এমন আর কোথাও কোন উপন্যাস বা চরিত্র সৃষ্টিতে নন। বিপ্রদাসই শরৎচন্দ্রের আদর্শ। শেষ প্রশ্ন অবধি তিনি মায়ের মমতা আর ঋষির অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে সমাজকে পর্যবেক্ষণ ক’রে গেছেন–সেই মমতা ও দৃষ্টি সংহত বা কেন্দ্রীভূত হয়েছে ‘বিপ্রদাসে’।
এর পর বুঝতে কষ্ট হয় না, লেখক যদি প্রতিভাবান হন, হ্যাঁ, লেখা হবে; কিন্তু তিনি যদি সচেতনও হন, তবে সে লেখা কেবল ধূম্রপায়ীদের সাময়িক তৃপ্তির মতো রসোত্তীর্ণ হবে না, স্থায়ী সাহিত্যের পঙ্ক্তিতে অবিসংবাদিত স্থান অধিকার করবে। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে সচেতন লেখকের পরিচয় নেই ব’লে ও অনেকটা রূপক-রোমাঞ্চ সিরিজের কাছ ঘেঁষে গেছে, সহরতলীর প্রথম খণ্ডে ব্যক্তিগত অভিমানের প্রাধান্য, কিন্তু সহরতলীর দ্বিতীয় খণ্ডে সমাজগত সম্বন্ধের প্রাধান্য–লেখক সহরতলীয় দ্বিতীয় খণ্ডে সমাজ-সচেতন, সমাজের মধ্যে তাঁর আত্মাভিমান বিলীন, তাই দ্বিতীয় খণ্ড অধিকতর রসোত্তীর্ণ ও স্থায়িত্বে সার্থক। নয় বছরে গৌরীদান আজ নেই, কিন্তু আজও শরৎচন্দ্রের অরক্ষণীয়া পড়লে চোখে জল আসে। মনেও হয় না ও অতীত, গত দুঃস্বপ্নের রাত্রি মাত্র।
লোকে বলে কাঁচা লেখা, পাকা লেখা। মানে কি? সোজা কথায়, অভিজ্ঞতার অভাব বা অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য। কিসের অভিজ্ঞতা? জীবনের অভিজ্ঞতা। জীবন কোথায় কাটে? সমাজে। তাহলে জীবনে এই সামাজিক অভিজ্ঞতার কম-বেশীর ওপর কাঁচা-পাকা লেখা নির্ভর করে। অবশ্য সকলেরই শরৎবাবুর মতো চিত্তস্পর্শী ভাষা থাকে না–যেমন মাণিকবাবু বা তারাশঙ্করবাবুর নেই। প্রবোধ সান্যাল ও অচিন্ত্য সেনের ভাষা চমৎকার, কিন্তু মাণিকবাবু তারাশঙ্করবাবুর মতো সার্থক ঔপন্যাসিক নন। ওঁরা গাল্পিক।
আসলে সংবাদপত্রের রিপোর্টার আর লেখকে যে পার্থক্য, প্রতিভাবান আর সচেতন প্রতিভাবান লেখকের মধ্যে সেই পার্থক্য। সংবাদপত্রের রিপোর্টার কেবল সংঘটিত ঘটনার যথাযথ বিবরণ দিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু লেখককে তার প্রত্যেক ঘটনা বা চরিত্রের একটি ন্যায়সম্মত রীতি (লজিক) অনুসরণ করতে হয়, চরিত্র “সৃষ্টি” করতে হয়। প্রতিভাবান লেখকের পক্ষে তা সম্ভব, সুতরাং তার কাছে একটি নির্ভরযোগ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সচেতন প্রতিভাবান লেখক সেখানেই ক্ষান্ত হবেন না, বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের গতি পরিণতি সম্বন্ধেও তার দৃষ্টি প্রখর–তিনি বহুদূরদর্শী, তাই তার চরিত্রগুলোর আচরণে ঐ ভবিষ্যৎ ইতিহাসের সঙ্কেত পাওয়া যায়, অথবা বর্তমানে দুঃখে কাতর হতে দেখা যায়–এগোও, নয়তো পিছোও–এই দ্বিধা ইঙ্গিতও ব্যক্ত হয়। ঠিক এই কারণে সচেতন লেখক মতলববাজ লেখক নন, সচেতন প্রতিভাবান লেখক ঐতিহাসিক গতিপরিণতি সম্বন্ধে সজাগ–ওয়াকিবহাল। রূপকথার সেই নদীর জলধারায় ভাসমান দীর্ঘ কেশ দেখে রাজকন্যার সন্ধানে ছোটার মতো আধুনিক ‘প্রগতি’ কালের ‘শাড়ী’ দেখে গল্পফাঁদার ছেলেমানুষী তাঁর মগজে স্থান পায় না। বা গোঁড়ার মতো দাগে দাগ বুলোনোর কূপমণ্ডুকতাও তার চিন্তাকে খর্ব করে না। তিনি চাকা পেছনপানে ঘুরোবার অপবাদে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা পেতে পারেন, সুমুখপানে ঘুরন্ত চাকায় নিজের হাল ছেড়ে দিয়ে সাধারণ অর্থে অদৃষ্টবাদী হ’তে পারেন, ঘুরন্ত চাকার সঠিক গতি নির্ণয় ক’রে বলিষ্ঠ হাতের নিয়ন্ত্রণ চেষ্টায় বিপ্লবী অভিধা পেতে পারেন–কিন্তু অচেতন অন্ধ লেখক তিনি কিছুতেই নন। তিনি সচেতন সার্থক লেখক, তার সঠিক বিচার হবে সামাজিক পরিবেশে, তার সমাজ-চেতনার পরিমাপ নির্ণয়ে।
পরিশেষে কিছু কৈফিয়ত কিছু সঙ্কল্প জানাবার আছে। মূল বইয়ের আকৃতি বা ব্যাপ্তির অনুপাতে আলোচনা সমাকৃতি বা সমব্যাপ্তি পায়নি। এরকম কোনো প্রয়োজনবোধও আমার মনে জাগেনি। কোন একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের মূল সুর ধরতে গিয়ে যা দাঁড়ালো তা প্রবন্ধের গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন আবার গ্রন্থের কলেবরসদৃশও নয়। লেখার মধ্যেও স্ফীতিপ্রবণতা সংযত করার লক্ষণ প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ, বহু কথা আরও স্পষ্ট ক’রে বলার এবং এদের ঐতিহাসিক পরিবেশকে স্ফুটতর করার অবকাশ আছে। এ-বিষয়ে সচেতন থেকেও এবার রবীন্দ্র শতাব্দীতে মূল সুরটিই ধ্বনিত করলাম; অবকাশ পূর্ণ করার সময় ও সুযোগ যদি আসে তবে বক্তব্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাবো এ সঙ্কল্পও জানিয়ে রাখছি।