রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস

চোখের বালি

পুলকেশ দে সরকার

কাহিনীপ্রধান নৌকাডুবিতে যে কথাগুলো স্বল্পোচ্চারিত, চোখের বালি ও গোরায় তাই হয়েছে বিশেষ। চোখের বালি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথই বলেছেন : যেন পশুশালার দরজা খুলে দেওয়া হ’ল, বেরিয়ে পড়ল হিংস্র ঘটনাগুলো অসংযত হয়ে। গোরার কথাগুলোর মধ্যে আছে ব্রাহ্মসমাজ বনাম হিন্দুসমাজের দ্বন্দ্ব এবং তার মধ্যে ব্যষ্টি মানুষের স্বাধীনতা, দেশের স্বাধীনতা বনাম দেশীয় আচার সংস্কার ইত্যাদি এবং সর্বোপরি গোরার নিজের কথা, তার জন্মবৃত্তান্ত ও লালনাগার। ওপরেরগুলো বিতর্ক, শেষেরটুকুই কাহিনী এবং এই কাহিনীর ক্লাইম্যাক্সও উপসংহারে।

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস সম্পর্কে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তার নায়ক-নায়িকা, এমনকি পার্শ্ব চরিত্রগুলোও, আর্থিক সঙ্কটের দিক থেকে নিরুদ্বিগ্ন।

নায়ক-নায়িকার অসাধারণ শিক্ষিতও বটে। রমেশের প্রথম পরিচয়েই জানা যায় : ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সরস্বতী বরাবর তাহার স্বর্ণপদ্মের-পাপড়ি খসাইয়া রমেশকে মেডেল দিয়া আসিয়াছেন–স্কলারশিপ ফাঁক যায় নাই।’ এই রমেশ ইচ্ছামতো অর্থ ব্যয় করেছে, বাড়ীভাড়া করেছে, ষ্টীমারে নিরুদ্দেশ-যাত্রা করেছে, বোর্ডিংয়ে কমলাকে রেখেছে, বিদেশে নতুন বাড়ী করেছে–কোত্থেকে টাকা এসেছে কোন প্রশ্ন ওঠেনি। ওটি যেন কোন প্রশ্নই নয়। চোখের বালিতে মহেন্দ্র বিহারী ওরা বা গোরায় গোরা বিনয় ওরা–সবাই অতি সচ্ছল। গাড়ী-ঘোড়া, চাকর-দাসী ইত্যাদির তো কথাই নেই। শেষের কবিতায়ও তাঁর নায়ক অমিতর বাবা যে পরিমাণ টাকা জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।

চোখের বালির মহেন্দ্রর পরিবেশ হচ্ছে এই : ‘মহেন্দ্র শৈশবেই পিতৃহীন। এম-এ পাশ করিয়া ডাক্তারি পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে’ ইত্যাদি। অর্থাৎ, সংসারে টিকে থাকতে গেলে যে, অর্থের প্রয়োজন এবং সে প্রয়োজন মেটাতে উপার্জনের সংগ্রাম করতে হয়, চোখের বালিতে এ প্রশ্ন ওঠেনি। গোরাতেও গোরা ও বিনয়ের আর্থিক অবস্থা যেমন সচ্ছল, বিদ্যার্জনেও তেমনি তারা শেষ ধাপ উত্তীর্ণ হয়েছে; এখন কিছু না করলেও চলে। সুতরাং, তাঁর উপন্যাসের গতিতে আর্থিক চিন্তা কখনও বাধা সৃষ্টি করেনি। তার উপন্যাসের সমস্যা অন্যত্র।

রবীন্দ্রনাথ চোখের বালির ভূমিকায় লিখেছেন : ‘আমার সাহিত্যের পথযাত্রা পূর্বাপর অনুসরণ করলে ধরা পড়বে যে চোখের বালি উপন্যাসটা আকস্মিক, কেবল আমার মধ্যে নয়, সেদিনকার বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে। বাইরে থেকে কোন্ ইসারা এসেছিল আমার মনে সে প্রশ্নটা দুরূহ।’

কিন্তু একেবারে দুরূহও নয়। কেননা, রবীন্দ্রনাথের মনে ইসারা অনেকখানি অনুমান করা যায় তারই এই কথাটিতে, ‘আমরা একদা বঙ্গদর্শনে বিষবৃক্ষ উপন্যাসের রসসম্ভোগ করেছি। তখনকার দিনে সে রস ছিল নতুন।’ তাঁর জীবন-স্মৃতিতে আছে :

“অবশেষে বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙ্গালীর হৃদয় একেবারে লুঠ করিয়া লইল। একে তো তাহার জন্য মাসান্তের প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতাম। তাহার পরে বড়দলে পড়ার শেষের জন্য অপেক্ষা করা আরো বেশি দুঃসহ হইত। বিষবৃক্ষ-চন্দ্রশেখর এখন যে খুসি সেই অনায়াসে একেবারে এক গ্রাসে পড়িয়া ফেলিতে পারে কিন্তু আমরা যেমন করিয়া মাসের পর মাস, কামনা করিয়া, অপেক্ষা করিয়া অল্পকালের পড়াকে সুদীর্ঘকালের অবকাশের দ্বারা মনের মধ্যে অনুরণিত করিয়া, তৃপ্তির সঙ্গে অতৃপ্তি, ভোগের সঙ্গে কৌতুহলকে অনেকদিন ধরিয়া গাঁথিয়া গাঁথিয়া পড়িতে পাইয়াছি। তেমন করিয়া পড়িবার সুযোগ আর কেহ পাইবে না।”

মহেন্দ্র বিহারীর সংলাপেও এক জায়গায় আছে :

মহেন্দ্র–কী জানি, কখন কী সংকট ঘটিতে পারে।

বিহারী কহিল, বল কী? দ্বিতীয় বিষবৃক্ষ।

আরও এক জায়গায় আছে : বারাশতে বিহারীর ‘গদির একধারে বঙ্কিম ও দীনবন্ধুর গ্রন্থাবলী গুছাইয়া রাখিয়াছে।…মেয়েলি অথচ পাকা অক্ষরে বিনোদিনীর নাম লেখা।’

বিনোদিনীর পাঠ্যবস্তুও যে ছিল ‘বিষবৃক্ষ’ এ কথাও এক জায়গায় প্রকাশ পেয়েছে।

আঙ্গিকের দিক থেকেও রবীন্দ্রনাথের এইজাতীয় উপন্যাসে বঙ্কিমী আমলের প্রভাব সুস্পষ্ট। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে কাহিনীকার বহুবার কাহিনীর অন্তরাল থেকে বেরিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হয়েছেন এবং পাঠককে সম্বোধন করেছেন। চোখের বালিতেও মহেন্দ্র আশাকে শিক্ষাদানের যে প্রচেষ্টা করেছিল সে দিকে কাহিনীকার (রবীন্দ্রনাথ) পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন : এমন গম্ভীর-প্রকৃতি শ্রদ্ধেয় মূঢ় থাকিতেও পারেন, যিনি মনে করিবেন, মহেন্দ্র নিদ্রাবেশে পড়াইবার সময় নষ্ট করিয়াছে; বিশেষরূপে তাহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে, মহেন্দ্রর তত্ত্বাবধানে অধ্যাপন কার্য যেরূপে নির্বাহ হয়, কোনো স্কুলের ইনস্পেক্টর তাহার অনুমোদন করিবেন না।

পরিষ্কার বোঝা যায় সেকালে রবীন্দ্রনাথের মতো বিদগ্ধ পাঠকের বিষবৃক্ষের নতুন রস সম্ভোগে মাতাল এবং এ রস তাঁদের চিন্তাধারায় মিশ্রিত হয়েছে, এই জাতীয় প্রশ্নের দোলায় তারা দুলছেন। বিষবৃক্ষের আমলে বহুনিষ্ঠ পুরুষ-সমাজে বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল কিন্তু বিদ্যাসাগরের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও বিধবা বিবাহকে সমাজ অকল্যাণকর বলেই দূরে ঠেলে রেখেছে, বঙ্কিমচন্দ্রের বলিষ্ঠ লেখনীমুখে তা বারে বারে নিন্দিত হয়েছে। জমিদার নগেন্দ্র সাধ্বী স্ত্রী সূর্যমুখী ঘরে থাকতে সুন্দর কুন্দকে নিয়ে এলেন, সূর্যমুখী গৃহত্যাগ করল, কুন্দ বিষ পান করল। সেকালের সমাজনেতারা দুই হাত তুলে বললেন, বিধবা বিবাহের এই তো অকল্যাণ।

চোখের বালি আসলে বিধবা বিনোদিনী। বিনোদিনী যখন বিধবা হয়নি তখন তার সঙ্গে মহেন্দ্রর বিয়ের প্রস্তাব স্বয়ং মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মীই করেছিলেন, কিন্তু মহেন্দ্রর অসম্মতিতে তা হয়নি। হয়েছিল আশার সঙ্গে। আশা মহেন্দ্রর কাকীমা অন্নপূর্ণার বোন-ঝি এবং মহেন্দ্রর বন্ধু বিহারীর সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব ছিল–মহেন্দ্র নিজে যেচে আশাকে বিয়ে করে। ঘটনাচক্রে বিনোদিনী বিধবা হবার পর মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মী তাকে এ-বাড়ী নিয়ে আসেন, বিনোদিনী আশার সঙ্গে চোখের বালি পাতায় এবং বিনোদিনী মহেন্দ্রর হৃদয় অধিকার করে। কিন্তু দেখা যাবে, বিনোদিনীর লক্ষ্য ছিল অপেক্ষাকৃত ধীরবুদ্ধি বিহারী। এ নিয়ে বন্ধু-বিচ্ছেদও হয়। বিনোদিনী যেখানে কুন্দ বা রোহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ, আশা সেখানে ভ্রমরের-ভূমিকা গ্রহণ করে, অপেক্ষা করে সতীর প্রতিষ্ঠা একদিন হবেই–হয়েওছিল। বিনোদিনী বিহারীর ভালোবাসা পেয়েছিল, কিন্তু বিয়েতে রাজী হয়নি। কেননা, সেকালে কুন্দ-রোহিণীর প্রতি বঙ্কিমের মনোভাব সমাজে প্রশমিত হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্র যাকে লালসা বলে ধিক্কার দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ তাকে সহজ প্রবৃত্তি বলে অগ্রাহ্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সহানুভূতির সঙ্গে মানুষকে এই সহজ প্রবৃত্তির উর্ধ্বে তুলতে চেয়েছেন–মানুষ যেন-না কেবলমাত্র প্রবৃত্তিবশে মিলিত হয়। এই কারণেই মহেন্দ্রর প্রবৃত্তিকে তিনি লাঞ্ছিত করেছেন, বিনোদিনীর প্রবৃত্তিকে সংযত বিহারীর দিকে প্রধাবিত করেছেন এবং বিনোদিনীর প্রবৃত্তি যখন পরিশুদ্ধ নিবৃত্তির পর্যায়ে এসেছে কেবল তখনই বিহারী বিনোদিনীর পাণিপ্রার্থী হয়েছে কিন্তু বিনোদিনী তখন নিছক দেহের উর্ধ্বে নিজেকে প্রশান্ত করে এনেছে, বাহ্যিক মিলন সেখানে অবান্তর। বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে বিষপাত্র অথবা আগ্নেয়াস্ত্র তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ সেখানে দিয়েছেন স্নিগ্ধ সহানুভূতি। বঙ্কিমী আমলের বিধবার প্রেম লালসায় পঙ্কিল ও পর্যুদস্ত হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের আমলে সে প্রেম পরিশুদ্ধির পথে সমাদৃত ও স্বীকৃত হয়েছে।

বিনোদ। যে কথা তুমি বলিলে, তাহা তোমার মুখ দিয়া কেমন করিয়া বাহির হইল। একি ঠাট্টা।

(উল্লেখযোগ্য, রবীন্দ্রনাথের এই সব কাহিনী-রচনায় জিজ্ঞাসার স্থানেও জিজ্ঞাসা চিহ্নের ব্যবহার অত্যন্ত বিরল।)

বিহারী। না, আমি সত্যই বলিয়াছি, তোমাকে আমি বিবাহ করিব।

বিনোদ। এই পাপিষ্ঠাকে উদ্ধার করিবার জন্য।

বিহারী। না, আমি তোমাকে ভালবাসি বলিয়া, শ্রদ্ধা করি বলিয়া।

বিনোদ। এই আমার শেষ পুরস্কার হইয়াছে। এই যেটুকু স্বীকার করিলে, ইহার বেশি আমি আর কিছুই চাই না। পাইলেও তাহা থাকিবে না, ধর্ম কখনো তাহা সহ্য করিবে না।

অনেক কষ্টে বার বার বিহারীকে নিরস্ত করতে হয়েছে।

–ছি ছি, বিধবাকে তুমি বিবাহ করিবে।…আমাকে বিবাহ করিলে তুমি সুখী হইবে না, তোমার গৌরব যাইবে–আমিও সমস্ত গৌরব হারাইব।

সামাজিক প্রশ্নটি এখানেই এবং এইভাবেই উপন্যাস-গল্পে সামাজিক প্রশ্ন কাল-বিধৃত। নতুবা সমাজে শৃঙ্খলা থাকে না। ব্যক্তি উদ্দামতা সমাজের নিয়মে সংযত এবং তাই ব্যক্তি স্বাধীনতা। কিন্তু যেখানে সমাজের নিয়ম ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্বকে খর্ব করতে যায়, বিষ বা আগ্নেয়াস্ত্রে তাকে বিনাশ করতে চায়, সেখানে ব্যক্তিচেতনায় সংঘাত জাগে, প্রশ্ন ওঠে। মহৎ প্রাণ ঔপন্যাসিক এই প্রশ্নটিই সেই হৃদয়হীন সমাজের সামনে রাখেন, দণ্ড দেন না। মহেন্দ্রর অনুশোচনার মধ্যেই তার অসংযত প্রবৃত্তির দণ্ড, তাকে প্রশান্ত সংযমের কাছে নতি স্বীকার করতেই হয়। বিহারী সমাজের মানবাত্মারূপে বিনোদিনীর প্রেমকে সমাদর জানিয়েছে, স্বীকার করেছে। নিছক একটা আনুষ্ঠানিক ও বাহ্যিক মিলনে তা লাঞ্ছিত হয়নি। সেইখানেই তার দণ্ড বা পুরস্কার। সমাজ ও এখানে অস্বীকৃত নয়।

মহেন্দ্রর প্রকৃতি উদ্দাম। “বাল্যকাল হইতে মহেন্দ্র দেবতা ও মানবের কাছে সর্বপ্রকারে প্রশ্রয় পাইয়াছে। তাহার ইচ্ছার বেগ উচ্ছৃঙ্খল।” বিহারীর জন্য আশাকে দেখতে গিয়ে সে বিমুগ্ধ হয়ে গেল। “আশা! মহেন্দ্রর মনে হইল নামটি বড় করুণ। কণ্ঠটি বড় কোমল। অনাথা আশা!” তারপর পরোক্ষে বিহারীকে নিবৃত্ত করে নিজেই এগিয়ে গেল : “কাজ কী এত কষ্ট করিয়া। তোমার বোঝা না হয় আমিই স্কন্ধে তুলিয়া লই। কী বল?…রাত্রে মহেন্দ্রর ভাল নিদ্রা হইল না।” তারপর “যেই বিবাহের প্রস্তাবে মহেন্দ্র মন লাগাম ছাড়িয়া দিল, সেই তাহার পক্ষে ধৈর্য রক্ষা করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল।” মহেন্দ্র আশাকে এমন উদ্দামতার সঙ্গে সর্বক্ষণ ঘিরে রাখল যে একদিকে মহেন্দ্রের মা রাজলক্ষ্মীর আর একদিকে বিনোদিনীর ঈর্ষা অপরিমেয় হয়ে উঠল।

কিন্তু যেই মাত্র “সর্বগুণশালিনী বিনোদিনীর জোড়া ভুরু, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, নিখুত মুখ, নিটোল যৌবনের” ওপর মহেন্দ্রর দৃষ্টি নিবদ্ধ হ’ল অমনি আশার চারদিকে মহেন্দ্রর “বাহুপাশ শিথিল এবং তাহার মুগ্ধ দৃষ্টি ক্লান্ত” হ’ল। শুধু তাই নয়, আশার সাংসারিক অপটুতা ক্ষণে ক্ষণে বিরক্তির সৃষ্টি করতে লাগল। মহেন্দ্র তখন বিনোদিনীর রূপের মদিরাপাত্র সবে তুলতে সুরু করেছে।

মহেন্দ্র। তোমার সখীর যেরকম রূপের বর্ণনা কর, সে তো বড় নিরাপদ জায়গা নয়।

তারপর একদিন “ছবি তুলিতে তুলিতে আলাপ পরিচয় বহুদূর অগ্রসর হইয়া গেল।” “বিনোদিনী রচিত পশমের জুতা তাহার পায়ে এবং বিনোদিনীর বোনা পশমের গলাবন্ধ তাহার কণ্ঠদেশে একটা যেন কোমল মানসিক সংস্পর্শের মতো বেষ্টন করিল।”

এই বর্ণনায় লক্ষণীয় যে, এখানকার প্রকৃত সংস্পর্শ দৈহিক, অন্তরের কিছু নয়, বাহ্যিক বস্তুর দৈহিক সংস্পর্শ মনে বিনোদিনীর শারীরিক সংস্পর্শেরই কামনা জাগ্রত করে তুলছে। মহেন্দ্রর এই বল্লাহীন প্রবৃত্তির প্রকাশ সংযত প্রকৃতি বিহারীর দৃষ্টি এড়ায় নি; সে মহেন্দ্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, “বিনোদিনী তোমাকে ইচ্ছা করিয়া অধর্মের দিকে টানিতেছে এবং তুমি না জানিয়া মূঢ়ের মতো অপথে পা বাড়াইতেছ।”

কিন্তু মহেন্দ্রর তখন ধর্মকথা শোনবার মতে অবস্থা নয়। আশার বকলমে পর পর কয়েকখানি চিঠি পাবার পর মহেন্দ্র গৃহ প্রত্যাবর্তনের পর বিনোদিনীর ঘর ফেরার প্রস্তাবে “মুহূতের মধ্যে বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া রুদ্ধ সজল স্বরে কহিল, যদি তাহাতে আমার আসে যায়, তবে তুমি থাকিবে?”

মহেন্দ্র মাকে ভুলেছে, আশাকে ভুলেছে, সমাজ ভুলেছে, প্রবৃত্তির এমনই অন্ধ আবেগ। বিনোদিনীও তাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে, কিন্তু কখনও সম্পূর্ণ ধরা দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ উভয়েরই প্রকৃতিকে ও প্রবৃত্তিকে অবাধ স্ফুর্তি দিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই চরম মুহূর্তে বলেছেন, ও মহেন্দ্র ও বিনোদনী, তুমি তো সবটাই প্রকৃতি সবটাই প্রবৃত্তি নও, তুমি এরও অতিরিক্ত। তাই, আশা, মা, সমাজ সকল কিছু বিস্মত হয়ে মহেন্দ্র যখন বিনোদিনীর গ্রামে পাগলের মতো ছুটে গেছে, কিংবা পৃথক গৃহ করেছে, অথবা সঙ্গোপনে মিলনের সকল সুযোগ ও আয়োজনই যখন উপস্থিত ঠিক তখনই ওদের অন্তর সদ্ভাবে জেগে উঠেছে, বিনোদিনী মহেন্দ্রকে নিরস্ত করেছে, নতুবা নিজে নিরস্ত হয়েছে। মহেন্দ্রও অনেকবার জবরদস্তির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। রবীন্দ্রনাথ যেন এই কথাটাই বারবার দেগে দিতে চাইছেন যে, না, তোমরা বাহ্যিক প্রকাশটাকে, এই ক্ষণিক উন্মাদনায় এর পরিচয় নিও না, এর অন্তঃপ্রবাহটাকেও দেখ–সেই চাপা-পড়া আসল মানুষটাকে। রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই স্বীকার করতে চান না যে, মানুষ একান্তভাবে প্রবৃত্তিব দাস। সে শুধুই তা নয়–এই কথার ওপরই তার জোর বেশী।

মহেন্দ্র তার চরম অবস্থায় বিনোদিনীর মৃত্যু কামনা করল।

বিনোদিনী। তাহা জানি, যতদিন বিহারীর আশা আছে ততদিন আমি মরিতে পারিব না।

মহেন্দ্র। যতদিন তুমি না মরিবে, ততদিন আমার প্রত্যাশাও মরিবে না–আমিও নিষ্কৃতি পাইব না। আমি আজ হইতে ভগবানের কাছে সর্বাস্তঃকরণে তোমার মৃত্যু কামনা করি। তুমি আমারও হইয়োনা, তুমি বিহারীরও হইয়োনা। তুমি যাও। আমাকে ছুটি দাও। আমার মা কাঁদিতেছেন, আমার স্ত্রী কাঁদিতেছে–তাহাদের অশ্রু আমাকে দূর হইতে দগ্ধ করিতেছে। তুমি না মরিলে, তুমি আমার এবং পৃথিবীর সকলের আশার অতীত না হইলে, আমি তাহাদের চোখের জল মুছাইবার অবসর পাইব না।

এ যে গোবিন্দলাল।

বিহারী অন্তরের মধ্যে আছে বিনোদিনী এমন কথা বলায় মহেন্দ্র বলেছিল, “ছুরি দিয়া কাটিয়া তোমার বুকের ভিতর হইতে তাহাকে বাহির করিব।”

এ যে গোবিন্দলালের আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন।

কিন্তু এখানে কেউ-ই নিহত হয়নি; সকলেই ক্ষণিক ক্ষুদ্রকে ডিঙিয়ে গেছে, সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত হয়েও পূর্ণ মানবিক সত্তাকে ফিরে পেয়ে পুনরধিষ্ঠিত হয়েছে।

বিনোদিনীর তুলনায় মহেন্দ্রর অনেক সরল অবলম্বন ছিল। স্নেহময়ী মা ছিলেন, পতিব্রতা স্ত্রী আশা ছিল, কাকীমা ছিলেন। বিনোদিনীর কিছুই ছিল না, সে নিঃস্ব।

মহেন্দ্র আর একদিন হাত চেপে ধরে বলেছিল, “বন্ধন যখন স্বীকার করিয়াছ, তখন যাইবে কোথায়।”

“বিনোদিনী কহিল, ছি ছি ছাড়ো। যাহার পালাইবার রাস্ত নাই, তাহাকে আবার বাঁধিবার চেষ্টা কেন?”

মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রর সঙ্গে বিনোদিনীর বিয়ের প্রস্তাব পেড়েছিলেন। “বাবা মহিন, গরিবের মেয়েটিকে উদ্ধার করিতে হইবে।” বিনোদিনী ধনীপুত্রী ছিল না; কিন্তু তাহার পিতা “একমাত্র কন্যাকে মিশনরি মেম রাখিয়া বহু যত্নে পড়াশুনা ও কারুকার্য শিখাইয়াছিলেন। কন্যার বিবাহের বয়স ক্রমই বহিয়া যাইতেছিল তবু তাহার হুঁশ ছিল না।” মহেন্দ্র বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় “রাজলক্ষ্মী গ্রাম-সম্পর্কীয় এক ভ্রাতুষ্পুত্রের সহিত বিবাহ দিলেন। অনতিকাল পরে কন্যা বিধবা হইল।” সেই বিধবা কন্যাকেই রাজলক্ষ্মী নিজ গৃহে ঠাঁই দিলেন।

ঠিক এখানেই একটি প্রশ্ন ওঠে। একবার যার যার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব ওঠে, তাদের যদি আবার কখনো মুখোমুখি দেখা হয় তবে তাদের মানসিক কি প্রতিক্রিয়া হবে? যদি তাদের কেউ বিধবা অথবা মৃতদার হয় তবে তাদের পরস্পরের প্রতি কি মনোভাব হবে? এবং যদি তার মৃতদার বা বিধবারূপে একই গৃহে বাস করতে থাকে তবেই বা কি মানসিক ক্রিয়া হবে তাদের মধ্যে? সম্ভবত, এরও সর্বজনীন উত্তর সম্ভব নয়। কিন্তু একটা তুলনা যে এদের মনে জাগবে এ বিষয়ে কোন সংশয়ের অবকাশ নেই। এ আমার স্ত্রী বা স্বামী হতে পারত। আজ ষে আমার স্ত্রী সে যে-আমার-স্ত্রী-হতে পারত তার তুলনায় ভাল অথবা ভাল নয়; যদি ভাল মনে হয়, তবে যে-পেয়েছে তার প্রতি ঈর্ষা হতে পারে– হয়ই। বিনোদিনীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

মহেন্দ্র বিহারীকে আশা সম্বন্ধে একখানি চিঠি লিখেছিল। সে চিঠিখানি বিনোদিনী পড়েছিল। “বার বার করিয়া পড়িতে পড়িতে তাহার দুই চক্ষু মধ্যাহ্নের বালুকার মতো জ্বলিতে লাগিল, তাহার নিশ্বাস মরুভূমির বাতাসের মতে উত্তপ্ত হইয়া উঠিল।”

বিনোদিনী আশাকে এই বলে প্রথম সম্ভাষণ কবল : “ভাই, তোমার সৌভাগ্য চিরকাল অক্ষয় হ’ক, কিন্তু আমি দুঃখিনী বলিয়া আমার দিকে একবার তাকাইতে নাই।”

সরলা আশা বিনোদিনীকে তাদের দাম্পত্য-প্রেমের সকল কথাই বলত। “ক্ষুধিতহৃদয়া বিনোদিনীও নববধূর নবপ্রেমের ইতিহাস মাতালের জ্বালাময় মদের মতো কান পাতিয়া পান করিতে লাগিল। তাহার মস্তিষ্ক মাতিয়া শরীরের রক্ত জ্বলিয়া উঠিল।” মানুষের একান্ত অন্ধ প্রবৃত্তির আবেগ এর চাইতে সুন্দরতর শাব্দিক সজ্জায় প্রকাশ করা দুরূহ। “বিনোদিনী বুকের নিচে বালিশ টানিয়া উপুড় হইয়া শুইয়া গুনগুন-গুঞ্জরিত কাহিনীর মধ্যে আবিষ্ট হইয়া রহিত, তাহার কর্ণমূল আরক্ত হইয়া উঠিত, নিশ্বাস বেগে প্রবাহিত হইতে থাকিত।”

এই কি বিনোদিনীর আসল রূপ বা আসল প্রকৃতি? না, এ নিতান্তই বঞ্চনার প্রতিফল মাত্র–যা আপাতত অনিবার্য? বিহারী কিন্তু একদিন বিনোদিনীর মানবিক স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছিল। দমদমের বাগান-বাড়িতে বিহারী আবিষ্কার করেছিল তৃষ্ণার্ত ঈর্ষাদগ্ধ কামকম্পিত বাহ্যিক বিনোদিনীর অতিরিক্ত অন্তরের একটি বিনোদিনীও আছে। “এই দীপ্তিমণ্ডলের কেন্দ্রস্থলে কোমল হৃদয়টুকু এখনো সুধা ধারায় সরস হইয়া আছে, অপরিতৃপ্ত রঙ্গরস কৌতুক বিলাসের দহন-জ্বালায় এখনো নারী প্রকৃতি শুষ্ক হইয়া যায় নাই। বিনোদিনী সতী স্ত্রী ভাবে একান্ত ভক্তিভরে পতিসেবা করিতেছে, কল্যাণপরিপূর্ণা জননীর মতো সন্তানকে কোলে ধরিয়া আছে, এ ছবি ইতিপূর্বে মুহূর্তের জন্যও বিহারীর মনে উদিত হয় নাই–আজ যেন রঙ্গমঞ্চের পটখানা ক্ষণকালের জন্য উড়িয়া গিয়া ঘরের ভিতরকার একটি মঙ্গল দৃশ্য তাহার চোখে পড়িল।”…

সেই–সেই মানুষটি। রবীন্দ্রনাথ যে অন্তর্দৃষ্টি বলে সুদকামী কঠোরমূর্তি কাবুলিওয়ালার গোপন হৃদয়স্থলে দেশে-ফেলে-আসা-মেয়ের পাঞ্জার ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন, সেই দৃষ্টির সন্ধানী আলো ফেলেই তিনি সকলের অন্তর আবিষ্কার করেন।…“প্রকৃত আপনাকে মানুষ আপনিও জানিতে পারে না, অন্তর্যামীই জানেন; অবস্থা বিপাকে যেটা বাহিরে গড়িয়া উঠে, সংসারের কাছে সেইটেই সত্য!” এই সত্য রবীন্দ্রনাথ মানতে রাজী নন। যতখানি নেমে যায় যাক, যে-অবস্থায় যায়, সে-অবস্থাটিকে দূর করলে, তাকে তোলা যায়; কিন্তু রবীন্দ্রনাথে তার চাইতেও বড় বিশ্বাস। সে বিশ্বাস এই যে, মানুষের অন্তরেই এমন একটি দ্বন্দ্ব আছে যা তাকে আপন সত্তায় ফিরিয়ে আনে। বিহারী একদিন এই সত্যকে আবিষ্কার করেছিল এবং বিনোদিনীর প্রগল্ভ উদ্দামতার মধ্যে তার মাতৃরূপ প্রত্যক্ষ করেছিল।

বিনোদনী অবস্থা বিপাকের মানুষ। আশাই তাকে বলেছিল, “একবার মনে করিয়া দেখে দেখি ভাই বালি, যদি আমার স্বামীর সঙ্গে তোমার বিবাহ হইয়া যাইত। আর একটু হইলেই তো হইত।”

“তা তো হইতই। না হইল কেন। আশার এই বিছানা, এই খাটতো এক দিন তাহারই জন্য অপেক্ষা করিয়া ছিল।”……

সত্যিই তে, “না হইল কেন।” হ’ল তো না-ই, যে বিকল্প ঘর সে বেঁধেছিল তাও পুড়ে গেল, তার কপাল পুড়ল, বিধবা হ'ল। তাও সম্ভবত সহ্য হ’ত। এমন কেন হ’ল যে, একদিন যে-সম্ভাবনা মিথ্যে হয়ে গেছে সে সম্ভাবনার ক্ষেত্রেই তাকে আসতে হ’ল? যে-ভূমিকায় তার অবতীর্ণ হওয়ার কথা, এমন কপাল কেন তার হ’ল যে, তাকে চোখ মেলে দেখতে হবে সেই ভূমিকায় আর একজন অবতীর্ণ হয়েছে– এমন একজন যে সে তার চাইতে অপটু ও অযোগ্য? কেন এমন হয় যে, কপাল পুড়তে তারই পুড়বে, কপাল খুলতে আর একজনার খুলবে? “সে যেদিকে চায়, তাহার চোখে যেন স্ফুলিঙ্গ বর্ষণ হইতে থাকে। এমন সুখের ঘরকন্না–এমন সোহাগের স্বামী। এ-ঘরকে যে আমি আমার রাজত্ব, এ-স্বামীকে যে আমি পায়ের দাস করিয়া রাখিতে পারিতাম।…আমার জায়গায় কিনা এই কচি খুকি, এই খেলার পুতুল।”

ঈর্ষা–দুর্দমনীয় ঈর্ষা। কিন্তু এখানেই বিনোদিনীর সাংসারিক ব্যর্থতার চিত্রটি বড় করুণ। সে কল্পনায় নিজেকে আশার জায়গায় স্থাপন করে ক্ষণিক আনন্দ পায়, কিন্তু পরক্ষণেই সে-যে সত্য নয়, কল্পনাই, এই চেতনা তাকে আরও অস্থির আরও অসহিষ্ণু আরও কামাতুর ক’রে তোলে। নেই, নেই, সব কিছু সে হারিয়েছে। এখন তাকে যদি কিছু পেতে হয় তো সে লুণ্ঠন ক’রে, ডাকাতি ক’রে, অপরকে প্রতারিত, বঞ্চিত, পীড়িত ক’রে। তাতে কল্যাণ নেই, কিন্তু এমন জীবন যাপন করেই বা সে কি কল্যাণ পেয়েছে? শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রতারণাই তার সাময়িক অবলম্বন হয়। “অপরাহ্ণে বিনোদিনী নিজে উদ্‌যোগী হইয়া অপরূপ নৈপুণ্যের সহিত আশার চুল বাঁধিয়া সাজাইয়া তাহার স্বামী-সম্মেলনে পঠাইয়া দিত। তাহার কল্পনা যেন অবগুণ্ঠিত হইয়া এই সজ্জিত বধুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ মুগ্ধ যুবকের অভিসারে জনহীন কক্ষে গমন করিত।”

আশাকে বলে : “তোমাদের ভালবাসার কথা শুনিলে আমার ক্ষুধা তৃষ্ণ থাকে না ভাই।”

কিন্তু বঞ্চিত জীবনের পক্ষে এ মরীচিকা মাত্র। “মহেন্দ্রবর্জিত আশা তাহার (বিনোদিনীর) কাছে নিতান্তই স্বাদহীন। যে কারণেই বল, দগ্ধ হইতেই হউক বা দগ্ধ করিতেই হউক, মহেন্দ্রকে তাহার একান্ত প্রয়োজন।”

মহেন্দ্র যখন বাড়ী ছেড়ে আলাদা আস্তানার ব্যবস্থা করেছিল তখনই বিনোদিনীর মনে এই সব তরঙ্গ উঠতে থাকে এবং সে বলে, “সে (মহেন্দ্র) যাইবে কোথায়। সে ফিরিবেই। সে আমার।”

কিন্তু এজন্য আশাকেই তার চাই। আশাকে সামনে রেখেই, তারই আড়ালে সে মহেন্দ্রকে লক্ষ্য ক’রে পত্রযোগে বাণ নিক্ষেপ করতে লাগল। সচেতন মহেন্দ্রও চমৎকৃত হ’ল। উভয়ে মিলে গৃহদাহের ইন্ধন বাড়িয়ে যেতে লাগল। যিনি বহুলাংশে এই ইন্ধনবৃদ্ধির পথে বিঘ্ন হতে পারতেন তিনি, রাজলক্ষ্মী, পুত্রের এই ভ্রান্তি ও পথচ্যুতিতে পরোক্ষে সহায়তা করেছেন, তার অভিমান এবং তার আত্মসুখও বটে, আশাকে লাঞ্ছিত ও বিনোদিনীকে সমাদর জানিয়েছে। রাজলক্ষ্মী অন্ধ না হ’লে তিনিই বিনোদিনীকে নিরস্ত ও সংযত করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ তার ভূমিকায় বলেছেন, “চোখের বালির গল্পকে ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে দারুণ করে তুলেছে মায়ের ঈর্ষা। এই ঈর্ষা মহেন্দ্রর সেই রিপুকে কুৎসিত অবকাশ দিয়েছে যা সহজ অবস্থায় এমন করে দাঁত-নখ বের করত না।”

তাই কাহিনীর এক জায়গায় আছে : “এইরূপে রাজলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণা এবং মহেন্দ্রর মধ্যে নিষ্ঠুর নিগূঢ় নীরব ঘাত প্রতিঘাত চলিতে চলিতে বিবাহের দিন সমাগত হইল।” আশা-মহেন্দ্রর “বিবাহ।” আশা মহেন্দ্রর কাকীমা অন্নপূর্ণার বোন-ঝি। মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মী যাকে পুত্রবধূ করতে চেয়েছিল সেই বিনোদিনীকে মহেন্দ্র প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপরই এসেছে আশার প্রস্তাব। মহেন্দ্র বিহারীর কাঁধের সম্ভাব্য ভার নিজেই বইবে বলে এগিয়ে এল। রাজলক্ষ্মীর মনে হ’ল এ তাঁকেই বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র। এ সম্বন্ধ ভাঙতে চেষ্টা করলেন। মহেন্দ্র “দীনহীন ছাত্রাবাসে গিয়া উঠিল।” শেষ পর্যন্ত মহেন্দ্রর “ইচ্ছার বেগই” প্রাধান্য পেল। বিয়ে হ’ল। আশা যখন নতুন সংসারে পদার্পণ করল তখন “তাহার এই কুলায়ের মধ্যে কোথাও যে কোন কণ্টক আছে, তাহা তাহার কম্পিত কোমল হৃদয় অনুভব করিল না।”

কিন্তু শাশুড়ীর কল্যাণে এল চোখের বালি। এই নিয়ে সংসারে অনর্থ ঘটতে লাগল। কাঁটা বিঁধতে লাগল পদে পদে। অবশ্য চোখের বালি একেবারে বেপরোয়া না হওয়া পর্যন্ত আশা সে কাঁটার বেদন অনুভব করেনি। গৃহত্যাগী মহেন্দ্রকে আশার নামে নিজের কথা লিখেছে বিনোদিনী। “আমার জন্যও কি তোমার ঘর ছাড়িয়া যাওয়ার কোন প্রয়োজন ছিল।…ভাসিয়া আসিয়াছি, ভাসিয়া যাইতাম।” স্পষ্টতই এ আশার কথা নয়। মহেন্দ্রর বুঝতে দেরি হয়নি। তার “ভিতরে ভিতরে একটা হর্ষসঞ্চার হইতে লাগিল।…এই প্রচ্ছন্ন অথচ ব্যক্ত, নিষিদ্ধ অথচ নিকটাগত, বিষাক্ত অথচ মধুর, একই কালে উপহৃত অথচ প্রত্যাহৃত, প্রেমের আভাস মহেন্দ্রকে মাতাল করিয়া তুলিল।” দ্বিতীয় চিঠিতে বিনোদিনী আশার নামে লিখল : “দুঃখিনীর বিল্বপত্রখানি চরণতলে বোধ করি স্থান পাইয়াছে।” তৃতীয় চিঠি আরও স্পষ্ট : “শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সব কথা মনে করিয়া দেখো দেখি, যাহা বুঝিয়াছিলাম সে কি তুমি বোঝাও নাই।”

পত্রালাপে এই উৎকণ্ঠা এই অসংযম কিন্তু মহেন্দ্র বাড়ী ফিরে এলে বিপরীত গতি নিল। বিনোদিনী সমাজের বিরুদ্ধে, সঙ্কীর্ণতম কেন্দ্র মহেন্দ্রর বিরুদ্ধে, প্রতিহিংসার ভাব পোষণ করত; তাই আশাকে ধরে রেখে “আশার স্বামী ছাদের উপরকার শূন্য ঘরের কোণে বসিয়া আকাশে ছটফট করিতেছে, ইহা কল্পনা করিয়া বিনোদিনী মনে মনে তীব্র কঠিন হাসি হাসিত।” বিনোদিনীর মনের বাসনা এই যে, “যাহারা তাহার সকল স্বখের অন্তরায়……তাহাদিগকে পরাস্ত ধূলি-লুণ্ঠিত করিলেই তাহার ব্যর্থ জীবনের কর্ম সমাধা হইবে।”

কিন্তু ধরা সে দিবে না। প্রকৃতির অসহ্য তাড়নায় সে মরিয়া হয়ে ওঠে, সে মহেন্দ্রকে স্পষ্ট করেই আহ্বান জানায়, কিন্তু মহেন্দ্র কাছে আসতেই তার সকল সমাজ-চেতনা ও নারীত্ব জেগে ওঠে। সে কি সমাজের বাইরে যাবে, সমাজকে বুদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে এর নিয়ম-শৃঙ্খল দুই পায়ে মাড়াবে? মহেন্দ্রর কাছে আত্ম-সমর্পণের অর্থ তো এই, তার প্রবৃত্তির কাছে আত্ম-সমর্পণ। স্থির বুদ্ধি থাকলে মহেন্দ্র তো আশাকে নিয়েই সংসারে প্রতিষ্ঠা ও সুখলাভ করতে পারত। মহেন্দ্র তো আগুন-লাগা মানুষের মতো দাপাদাপি করতে চায়–এবং এই অস্থিরচিত্ত মহেন্দ্র তাকে একদিন অনায়াসে ফেলে যেতে পারবে। মহেন্দ্রর মধ্যে স্থিরতা নেই, ধীরতা নেই। বিনোদিনীর নারীমন প্রকৃতির মতো আকৃষ্ট হয়েও অকল্যাণকর পরিণামে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। মহেন্দ্র যে শুধুই অসংযম, সে তো বিন্দু থেকে বিন্দুতে ছুটে বেড়াবে। আজ পায়নি বলেই এই আগ্রহ। আশার জন্যও মহেন্দ্র এই অস্থিরতা দেখিয়েছে; বন্ধুকে নিরস্ত করে নিজে কাঁধ পেতে দিয়েছে; দিনরাত তার সঙ্গলাভ করেছে; কিন্তু চোখের বালিকে দেখার পর সেই আসক্তির আলিঙ্গন শিথিল হয়ে গেছে। বিনোদিনীর ক্ষেত্রেও তাই হবে না এমন প্রতিশ্রুতি কে দেবে? সত্যি সত্যি মহেন্দ্রর জীবনেই তা হয়েছে। তারও একদিন এক সময় মোহ-মুক্তি হয়েছিল। বারে বারে কাছে টেনেও যখন বিনোদিনী ধরা দেয় না, শ্রান্ত-ক্লান্ত-পীড়িত মহেন্দ্রর মনে তখন এই উপলব্ধি হয়েছিল যে, “বিনোদিনী একটি স্ত্রীলোক মাত্র, আর কিছুই নহে–তাহার চারিদিকে সমস্ত পৃথিবীর সৌন্দর্য হইতে, সমস্ত কার্য হইতে কাহিনী হইতে যে একটি লাবণ্য জ্যোতি আকৃষ্ট হইয়াছিল, তাহা আজ মায়া-মরীচিকার মতো অন্তর্ধান করিতেই একটি সামান্য নারী মাত্র অবশিষ্ট রহিল, তাহার কোন অপূর্বত্ব রহিল না।”

বিনোদিনী মন দিয়ে বুঝত মহেন্দ্রর একদিন মোহমুক্তি ঘটবেই, তখন মহেন্দ্রর উদ্দাম ভালবাসারও শেষ হবে।

তাই বিনোদিনী সর্বতোভাবে মহেন্দ্রকে গ্রহণ করতে পারে না। মহেন্দ্র তার অবলম্বন। তার উষ্ণ চুম্বন স্থির-ধার-বুদ্ধি বিহারীর জন্য উদ্যত হয়, মহেন্দ্রকে সঙ্গী ক’রে সে বিহারীকে খুঁজে ফেরে। হুবহু শৈবলিনীর মতো নয়, শৈবলিনীর উদ্দামতা তার ছিল, শৈবলিনীর মতো সংযত ধীরবুদ্ধি স্বামী চন্দ্রশেখর ছিল না, সে বিধবা, তার কোন অবলম্বন নেই। তাই বিহারীর প্রত্যাখ্যানের পর মহেন্দ্র ভালোবাসা নিবেদন করলে বিনোদিনী বলেছিল, “মাথায় করিয়া রাখিব। ভালোবাসা আমি জন্মাবধি এত বেশি পাই নাই যে, ‘চাই না’ বলিয়া ফিরাইয়া দিতে পারি।”

ভালোবাসার কাঙাল, তবু এমন ভালোবাসা চাই যা স্থায়ী হবে। ধুমকেতুর পুচ্ছলাঞ্ছনা নয়; সে বিহারীর ভালোবাসা চায়। বিহারীর দুঃখের সীমা নেই। সে অনায়াসে আশাকে বন্ধুর অঙ্কশায়িনী করে দিয়েছে কিন্তু সন্দিগ্ধ মহেন্দ্র নিজের চিত্তদর্পণে বিহারীকেও আশার প্রণয়প্রার্থী রূপে দেখেছে। বিহারী লজ্জায় পালিয়ে ফিরেছে, আর, বিনোদিনী তার পেছনে ফিরেছে। বিনোদিনীর “ঊর্ধ্বোৎক্ষিপ্ত ব্যাকুল মুখের চুম্বন-নিবেদন” বিহারীকেও কম ক্ষত-বিক্ষত করেনি। কিন্তু বিনোদিনী যেন দুশ্চর তপস্যায় নিমগ্ন ছিল, মার আসে, লোভ আসে, মোহ আসে তার বিভ্রান্তি ঘটে, কিন্তু পর মুহুর্তেই সে যেন সত্তা ফিরে পায়। তাই যে বিহারী তার লক্ষ্য ছিল, সেই বিহারী যখন বিনা শর্তে আত্মনিবেদন করল, বিনোদিনী তখন শুদ্ধতার নাগাল পেয়েছে, সে বলল, না, যে-আদর্শকে লক্ষ্য ক’রে সে অনেক সঙ্কট উত্তীর্ণ হয়েছে তাকে কিছুতেই পাকে নামানো চলবে না। দুর্দান্ত বিনোদিনীর মধ্যে এই সংযমের অভিব্যক্তি বিস্ময়কর। কিন্তু মানুষের মাহাত্ম্যে রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ বিশ্বাস।

চোখের বালির আগে ভ্রমরা-রোহিণী-গোবিন্দলালের, প্রতাপ-শৈবলিনী-চন্দ্রশেখরের, কুন্দ-সূর্যমুখী-নগেন্দ্রের যুগ প্রবাহিত হয়ে গেছে। সুতরাং, ভাবের দিকে চোখের বালির রবীন্দ্রনাথে সেকালের অনুসৃতি আছে; কিন্তু অনুসৃতি সত্ত্বেও একটা বলিষ্ঠ আশায় সিঞ্চিত বলে এদের বিয়োগান্ত ঘটেনি। এখানে কাহিনী বিয়োগান্ত নয়, মৃত্যুতে নয়, হত্যায় বা আত্মহত্যায় নয়। জীবনের কোথায় ট্রাজেডি রবীন্দ্রনাথ শুধু সেইটিই দেখিয়েছেন, বাহ্যিক ট্রাজেডি দেখিয়ে কি মঙ্গল সাধিত হবে? রাজলক্ষ্মী, বিনোদিনী, আশা, মহেন্দ্র, বিহারী, সকলেরই জীবন বিচ্ছিন্নভাবে বিয়োগান্তক, কিন্তু সমগ্রভাবে সামগ্রিক দৃষ্টিতে? বিনোদিনী যেখানে নিজেকে রক্ষা করল, নিজেকে সংযত করল, সেখানে সে কি মহেন্দ্রকেও রক্ষা ও মোহমুক্ত করল না? মহেন্দ্রর মুক্তিতে কি আশার তপস্যা সার্থক হল না এবং রাজলক্ষ্মীরও? এবং সর্বোপরি বিহারী? বিনোদিনী আত্মনিবেদন করেছে, ভালবাসার প্রতিভালবাসা পেয়েছে, এর বেশী যদি প্রত্যাশা করত, তবে এতদিন সে যা মিথ্যা ক্ষণিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে তাকেই সত্য করে তুলত এবং তাতে তার সব কিছু মিথ্যে হয়ে যেত। মহৎপ্রাণ উপন্যাস লেখকের এই বৈশিষ্ট্য যে, ক্ষুদ্রকে বৃহৎ, সামান্যকে অসামান্য দৃষ্টিতে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। প্রবৃত্তির আগুনে দগ্ধ বিনোদিনীর মহদ্ভাবটাকেই উজ্জ্বল ক’রে দিয়ে বিনোদিনীকে সমাদরের শ্রদ্ধার পাত্র ক’রে তুলেছেন। বিনোদিনীকে আজ আমরা যত ভালবাসি এত ভাল কোন কালেই বাসতাম না। তাই এ কাহিনী বিয়োগান্ত হয়নি।