চোখের বালি-গোরা-ঘরে বাইরে উপন্যাসের বাইরে মহৎ উপন্যাসের পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের আর কোন উপন্যাস নেই। এদের তুলনায় চার অধ্যায়, শেষের কবিতা প্রভৃতি মহৎও নয়, বিরাটও নয় এবং কাহিনীর বিচারে নৌকাডুবির সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়। এ দুটির একটি রাজনৈতিক শ্লেষ যার প্রথম অধ্যায়টি স্পষ্টত রূপক, বাকী অধ্যায়গুলো ধূম্রাচ্ছন্ন। চার অধ্যায় সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই যে ওঁর প্রেমিসটা যে নির্ভুল নয় তা তিনি প্রথম সংস্করণের পরবর্তী সংস্করণে উপাধ্যায় ব্রহ্মবান্ধব প্রসঙ্গের ভূমিকা প্রত্যাহারেই অনেকখানি স্বীকার করেছেন।
ভূমিকাটি হুবহু উদ্ধৃত করা গেল : “একদা ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় যখন Twentieth Century মাসিক পত্রের সম্পাদনায় নিযুক্ত তখন সেই পত্রে তিনি আমার নূতন-প্রকাশিত নৈবেদ্য গ্রন্থের এক সমালোচনা লেখেন। তৎপূর্বে আমার কোনো কাব্যের এমন অকুণ্ঠিত প্রশংসাবাদ কোথাও দেখি নি। সেই উপলক্ষ্যে তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
তিনি ছিলেন রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসী অপর পক্ষে, বৈদান্তিক, –তেজস্বী, নির্ভীক, ত্যাগী, বহুশ্রুত ও অসামান্য-প্রভাবশালী। অধ্যাত্মবিদ্যায় তার অসাধারণ নিষ্ঠা ও ধীশক্তি আমাকে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় আকৃষ্ট করে।
শান্তিনিকেতন আশ্রমে বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় তাকেই আমার প্রধান সহযোগী পাই। এই উপলক্ষ্যে কতদিন আশ্রমের সংলগ্ন গ্রামপথে পদচারণ করতে করতে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনাকালে যে-সকল দুরূহ তত্ত্বের গ্রন্থিমোচন করতেন আজও তা মনে করে বিস্মিত হই।
এমন সময়ে লর্ড কর্জন বঙ্গব্যবচ্ছেদ-ব্যাপারে দৃঢসংকল্প হলেন। এই উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রক্ষেত্রে প্রথম হিন্দুমুসলমান-বিচ্ছেদের রক্তবর্ণ রেখাপাত হল। এই বিচ্ছেদ ক্রমশ আমাদের ভাষা সাহিত্য আমাদের সংস্কৃতিকে খণ্ডিত করবে, সমস্ত বাঙালি-জাতকে কৃশ করে দেবে এই আশঙ্কা দেশকে প্রবল উদ্বেগে আলোড়িত করে দিল। বৈধ আন্দোলনের পন্থায় ফল দেখা গেল না। লর্ড মর্লি বললেন, যা স্থির হয়ে গেছে তাকে অস্থির করা চলবে না। সেই সময়ে দেশব্যাপী চিত্তমথনে যে আবর্ত আলোড়িত হয়ে উঠল তারই মধ্যে একদিন দেখলুম এই সন্ন্যাসী ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন। স্বয়ং বের করলেন “সন্ধ্যা” কাগজ, তীব্র ভাষায় যে মদির রস ঢালতে লাগলেন তাতে সমস্ত দেশের রক্তে অগ্নিজ্বালা বইয়ে দিলে। এই কাগজেই প্রথম দেখা গেল বাংলাদেশে আভাসে ইঙ্গিতে বিভীষিকাপন্থার সূচনা। বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর এতবড়ো প্রচণ্ড পরিবর্তন আমার কল্পনার অতীত ছিল।
এই সময়ে দীর্ঘকাল তার সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয় নি। মনে করেছিলুম হয়তো আমার সঙ্গে তার রাষ্ট্র-আন্দোলন প্রণালীর প্রভেদ অনুভব করে আমার প্রতি তিনি বিমুখ হয়েছিলেন অবজ্ঞাবশতই।
নানাদিকে নানা উৎপাতের উপসর্গ দেখা দিতে লাগল। সেই অন্ধ উন্মত্ততার দিনে একদিন যখন জোড়াসাঁকোয় তেতলার ঘরে একলা বসে ছিলেম হঠাৎ এলেন উপাধ্যায়। কথাবার্তার মধ্যে আমাদের সেই পূর্বকালের আলোচনার প্রসঙ্গও কিছু উঠেছিল। আলাপের শেষে তিনি বিদায় নিয়ে উঠলেন। চৌকাঠ পর্যন্ত গিয়ে একবার মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, “রবিবাবু, আমার খুব পতন হয়েছে।” এই বলেই আর অপেক্ষা করলেন না, গেলেন চলে। স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, এই মর্মান্তিক কথাটি বলবার জন্যেই তার আসা। তখন কর্মজাল জড়িয়ে ধরেছে, নিষ্কৃতির উপায় ছিল না।
এই তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা ও শেষ কথা।
উপন্যাসের আরম্ভে এই ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য।”
পারিপার্থিক কারণে নিয়ন্ত্রিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের “চার অধ্যায়” সুরু হয়েছে রূপকের খাঁচায়। এলাচের মতো ওপরে নীচে শাসক ও জনসমাজের খোসার চাপে ও আড়ালে জন্ম বা উদ্ভব হয়েছে এলার। এল কোন মেয়ে নয়, কোন ব্যক্তি নয়, একটি ভাব মাত্র। এজন্য চারটি অধ্যায় ছাড়াও রবীন্দ্রনাথকে এই ভাবোদ্ভুতির ভূমিকা লিখতে হয়েছে। একেবারে প্রথম বাক্যেই তা প্রকাশ পেয়েছে।
“এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে।”
এলার যে জীবন তা একটি ভাব মাত্র। এ ভাব বিদ্রোহের ভাব। বিদ্রোহ বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। সুতরাং, ভূমিকায় কেবল এলার জন্মবৃত্তান্তই নেই, পর-শাসনের পরিচয়ও আছে। এই পরশাসন হচ্ছে এলার মা। পরশাসনের গর্ভেই এলার জন্ম। গর্ভ সঞ্চারিত হয়েছে নিপীড়িত জনসাধারণের ঔরসে। তিনি এলার পিতা।
মা বা পরশাসন কেমন?
“মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না।”
বাতিকের কারণ শাসকপক্ষের বিদেশী সত্তার চেতনা। তারা যে বিদেশী ইংরাজ-শাসকেরা একথা এক মুহুর্তও ভোলেনি এবং এই সজাগ চেতনাই তাদের সমগ্র শাসন ব্যবস্থাকে সর্বদা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছে। সুতরাং ঐ উচু-নীচুর, শাসক-শাসিতের বৈরী-চৈতন্য বাতিকে পরিণত হয়েছে। তাদের শাসিতের প্রতি ব্যবহারও তাই “বিচার-বিবেচনার” (সাধারণ আইন-কানুন) “প্রশস্ত পথ” ধরে চলে নি। দক্ষ লেখক রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সচেতন চিত্তে সুনির্বাচিত শব্দ ও ভাষায় তৎকালীন সমাজের ভাব গোপন ও প্রকাশ করেছেন।
এমন যে শাসক পক্ষ তারা–
“বেহিসাবী মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে (শাসিত সমাজকে, এদেশকে, অধিকৃত রাজ্যের পদানত অধিবাসীকে) যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, (আন্দোলনের সৃষ্টি করতেন), শাসন (সত্যিই শাসন) করতেন অন্যায় করে, (যা ন্যায় সঙ্গত নয় তাই করতেন), সন্দেহ করতেন কারণে অকারণে।” (কেননা, বিদেশী শাসকের পক্ষে এই বিচিত্র মানসকূট একান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ও স্বাভাবিক। অর্ডিনান্সই তাই শাসকের পক্ষে সত্য হয়ে ওঠে)।
“মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ, অবিমিশ্র সত্য কথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়।” শাসনের ক্ষেত্রে সত্য কথার স্থান কতটুকু। গোয়েন্দার ঘরে সাধুর অপমান অনিবার্য। তারা সত্যের মর্যাদা জানে না। তারা তাদের স্বার্থের “সত্যকে” (মানে মিথ্যাকে) সত্য প্রমাণ করতে চায়। এজন্য সত্যকে তারা মিথ্যা বলতই; কেননা, ও সত্য তাদের কোন কাজে লাগত না। যে সত্য কাজে লাগে না, তা মিথ্যাই। কিন্তু যে মিথ্যা শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে সত্য, শাসিতের পক্ষে তা মিথ্যাই। সুতরাং, শাসক-পক্ষে যেমন থাকে মিথ্যাকে সত্য করার জেদ, শাসিতের পক্ষে তেমনি জাগতে থাকে সত্যকে সত্য বলে জহির করার জেদ। শাসকের প্রচার-যন্ত্র শাসনের স্বার্থে সাধারণত মিথ্যা প্রচারের যন্ত্র। এই যে ভেদ–
“এ জন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা (সহ্য করা যেখানে অসম্ভব) তার স্বভাবে (প্রকৃতিতেও বটে, নিজ ভাবধারায়ও বটে) প্রবল হয়ে উঠেছে। কিন্তু শাসকের মনে হয়েছে, এই যে অসন্তোষের ভাব, বিরক্তির ভাব “এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।” করুণাশ্রিত পরাধীন দেশের অধিবাসীর পক্ষে শাসকের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বা বিরক্তি প্রকাশ করা অপরাধ–মহা অপরাধ।
শাসনের আবহাওয়ায় এই যে ভাবের শিশু জন্মালো, জন্মাবার পর তার কিছুকাল অগ্রসর হবার পর, অথবা ভাব-পুষ্টির পর এই ভাবের উদয় হল যে–
“দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন।”
জয় ও সঙ্কোচে গণ বা জনসমাজ অথবা শোষিত জনসাধারণ অত্যাচার অন্যায় ও অবিচার সম্বন্ধে উদাসীন থাকে। এই ঔদাসীন্য তাদের অত্যাচারীকে আরও দুঃসাহসী আরও স্পর্ধিত করে তোলে এবং অবাধ অত্যাচার চালিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের রূপকের খাঁচায় এই পাখীটিই ধরা পড়েছে। মায়াময়ীর পরিবারে–
“যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্প বয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।”
সরকারের যারা চাকর এবং নানা খেতাব-উপাধিতে ভূষিত অথবা অন্যায় অপরাধের দণ্ডে দাগী, তাদের দৃষ্টি তো বেশী দূর যেতে পারে না, ওরা শাসকের দৃষ্টিতে দাগ বুলোয়, কিছুতেই দৃষ্টি উদার করতে পারে না, তারাই তোষামোদে-খোসামোদে এদের বাড়িয়ে তোলে, সরকারের অন্ধ (অদূরদর্শী) প্রভুত্বচর্চায় কোন বাধাই দেয় না। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে যে কোন আবহাওয়ায় কারণ-কার্যসূত্রানুসারে অন্য বিরুদ্ধ কিছুর উদ্ভব হয়; এবং এই প্রকৃতি দ্বন্দ্ব-গতির নিয়ামাধীন। যে অবস্থায়ই থাকে, তার গর্ভে আছে তার অসামঞ্জস্যের বা মৃত্যুর বীজ, তাই অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমশ মূল অস্তিত্বকে গ্রাস করে এবং দুইয়ের অনস্তিত্বে এক নূতনের উদ্ভব হয়।
এল স্বাধীনতার দুর্দম আকাঙ্ক্ষা। বিক্ষিপ্ত ব্যষ্টিগত। কিন্তু এল। এল বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে জাতির জীবনের প্রথম সূচনায় পরাধীন ধর্মবিরুদ্ধ অসহিষ্ণুতা ও স্বাধীনতার দুর্দাম আকাঙ্ক্ষা।
সত্যিকার ইতিহাসে এই অসন্তোষ ধূমায়িত হয় প্রথম অত্যন্ত ব্যষ্টিগত ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে, চাকুরী-প্রাণ ভদ্রশ্রেণীর বেকারী হতাশায়, কালো-খলা জজ-ম্যাজিষ্ট্রেটের বৈষম্যে। এখানে জনসাধারণের কথা নেই; গণ-বিক্ষোভের সম্ভাবনা নেই; ব্যষ্টিগত অসহিষ্ণুতার অদম্য পরিণতি ছাড়া আর কোন উপজীব্য নেই।
রবীন্দ্রনাথের “চার অধ্যায়” একাধারে এই উপজীব্য ও পরিপ্রেক্ষিতেই লেখা। এ তাই এলাদের পরিবারের মতোই সংকীর্ণ এবং এলাদের ভদ্র-সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নিঃসন্দেহে আলোচিত কিন্তু কোলক্রমেই নিন্দনীয় নয়। এ শাসকের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র এবং ইতিহাস অনভিজ্ঞের অবিদ্যা মাত্র। ইতিহাসের প্রত্যেকটি স্তর, প্রত্যেকটি মুহূর্তের ঘটনা সত্য, অকারণ নয়, নিষ্ফল নয়। ইতিহাসের প্রতি এই শ্রদ্ধা যার নেই তার ইতিহাস পড়া উচিত নয়, ইতিহাসের কথাও বলা উচিত নয়। ইতিহাস তারা জানে না। “চার অধ্যায়” যে সেই বিচ্ছিন্ন ইতিহাসের এক অধ্যায়ে উর্ধ্বস্তর ভদ্রসমাজেরই প্রতিক্রিয়া মাত্র এ অনুভূতি তাদের হতেও পারে না।
উদাসীন জন-সমাজের আবছায়া-প্রতীক এলার বাবা নরেশ দাশগুপ্ত মনস্তাত্ত্বিক হিসাবে আত্মভোলা মানুষ। জনসাধারণের মতো “সাংসারিক উন্নতির দিকে লোভ কম,” কিছুতেই যেন জীবনের মান বাড়াবার প্রচেষ্টা নেই, “দক্ষতাও সামান্য”। সুতরাং, পরাধীন জাতির বুদ্ধিবৃত্তির অপযশ শাসকগোষ্ঠীর মুখে স্বাভাবিক। প্রাচীন সভ্যতায় গৌরবান্বিত ভারতবর্ষ এই ক্ষেত্রে সাইকলজির পণ্ডিত “বিষয়বুদ্ধির ক্রটি নিয়ে স্ত্রীর কাছে কখনো ক্ষমা পান নি, খোঁটা খেয়েছেন প্রতিদিন।”
ভারতের অতীত ইতিহাস সম্বন্ধে বিদেশী-পর্যটকেরা ভারতীয়দের যে অজস্র রকমের প্রশংসা করেছেন তার মধ্যে ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস। লোকে বলে, বিদেশীদের হামলায় এ বিশ্বাস ক্রমে ক্রমে ভেঙেছে। সুতরাং, তখন একথা খাটত যে, “ভুল করে লোককে বিশ্বাস করা ও বিশ্বাস করে নিজের ক্ষতি করা বার বারকার অভিজ্ঞতাতেও তার (নরেশ বাবুর) শোধন হয়নি।…বিশ্বাসপরায়ণ ঔদার্যগুণেই তার বাপকে কেবলই ঠকতে ও দুঃখ পেতে দেখে বাপের উপর এলার ছিল সদাব্যথিত স্নেহ…
প্রথম যুগের বিপ্লবীরা এই সদাব্যথিত স্নেহেই অত্যাচারীর প্রতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। “সবচেয়ে তাকে আঘাত করত যখন মায়ের কলহের ভাষায় তীব্র ইঙ্গিত থাকত যে, বুদ্ধি-বিবেচনায় তিনি তাঁর স্বামীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” শাসিত জাতির প্রতি শাসক জাতির এই মনোভাবই তো প্রথম যুগের মেকলে থেকে চার্চিল পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদশের বিপ্লবীদের এই তো ইতিহাস যে, “নানা উপলক্ষে মায়ের কাছে তার বাবার অসম্মান দেখতে পেয়েছে, তা নিয়ে নিস্ফল আক্রোশে চোখের জলে রাত্রে তার বালিশ গেছে ভিজে। এ-রকম অতিমাত্র ধৈর্য অন্যায় বলে এলা অনেক সময় তার বাবাকে মনে মনে অপরাধী না করে থাকতে পারেনি।”
এদেশে একই রাস্তায় একই ফুটপাথ দিয়ে সাদা আদমী আর কালো আদমী যাতায়াত সম্ভব ছিল না। কালো আদমীকে সাদা আদমীর বুটের ঠোক্কর খেতে হ’ত। সাহেবেরা অনায়াসে কুলিদের পিলে ফাটাতো–বৈষম্য, বৈষম্য, আদালত থেকে রাস্তা পর্যন্ত কেবলই বৈষম্য। তবু জনসাধারণ নীরবে সহ্য করে। বিপ্লবীর পক্ষে এ অসহ্য। অপরাধ তো তাদের যারা সহ্য করে।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানস পুত্র নরেশবাবুর মুখ দিয়ে এর এই জবাব দিয়েছেন যে, “স্বভাবের প্রতিবাদ করাও যা আর তপ্ত লোহায় হাত বুলিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করতে যাওয়াই তাই; তাতে বীরত্ব থাকতে পারে, আরাম নেই।”
সাইকলজিষ্ট নরেশ দাশগুপ্তের এই জবাবের মধ্যেই সমগ্র “চার অধ্যায়ের” ভবিষ্যৎ রামায়ণ রয়েছে। তাই তো এ অন্যায়ের প্রতিকার হবে কোন পথে? শাসকের স্বভাব আর তপ্ত লোহার স্বভাব, তুলনা মাত্র। আগুনের স্বভাব বদলায় না বটে কিন্তু শাসকের স্বভাব বদলায়, বদলানো যায়। তা সে তপ্ত লোহায় হাত বুলিয়েই হোক, তপ্ত লোহায় জল ঢেলে হোক, অথবা তপ্ত লোহাকে পিটিয়ে নুতন রূপে পরিণত কবেই হোক, বদলানো যায়। সে বীরত্বের ভূমিকা নিতে হবে, তাতে আরাম নেই বলে পালালেও তো চলবে না। আর নির্ভয় বীর বিপ্লবীর যে জন্ম হয়, তা তো সমাজের কামনায় এই স্বভাব নিয়েই জন্মায় যে, সে আরাম চায় না, বীরত্বই তার স্বভাব।
এই অবস্থায়ই বিদ্রোহীর জন্ম হয় যেখানে “যারা মায়ের মন জুগিয়ে চলার কৌশল জানে তাদের চক্রান্তে নিষ্ঠুর অন্যায় ঘটে অপরাধহীনের প্রতি ” “বিচার কর্ত্রীর সামনে” “সত্যি উপস্থিত” করলে কি হবে, “কর্তৃত্বে অহমিকার কাছে অকাট্য যুক্তিই দুঃসহ স্পর্ধা।”
এই শাসন-ব্যবস্থার আর “একটি উপসর্গ” ছিল, সে হচ্ছে “শুচি বায়ু” বা ভেদবুদ্ধি। ইডেন গার্ডেনে একদিন সাহেব-মেম ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করতে পারত না–কুকুর ও ভারতীয়ের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ট্রেনে প্রথম শ্রেণীর কামরা নেটিভদের পক্ষে ছিল দুর্গম্য, ডালহৌসী স্কোয়ারে প্রকৃতির আহ্বানে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারেও আয়োজন ছিল পৃথক।
ইংরেজের ট্র্যাডিসনে অন্ধ, তাই তাদের হাত-কড়ি লাগানো মন, হোয়াইট ম্যানস বাডেন বলে এর নেটিভদের ঘৃণাই করত। এই ট্র্যাডিসান “তারা মানবে, প্রশ্ন করবে না–এইটেতেই সমাজ মনিবদের কাছে বকশিশ” পায়। একথা পুলিশের পক্ষেও সত্য এবং তাদের “মানাটা যত বেশি অন্ধ হয় তার দাম তাদের (সমাজ মনিবদের) কাছে তত বড়ো হয়ে ওঠে।”
এই কৃত্রিম ভেদবুদ্ধির নিরর্থকতা সম্বন্ধে প্রশ্ন জাগতে পারে, যারা এ মেনে চলে তাদের কাছে সাহস করে জিজ্ঞাসাও হয়ত করা যায়, কিন্তু তার উত্তর ভর্ৎসনা ছাড়া আর কি পাওয়া যাবে?
শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী এই প্রতিকুল পরিবেশ থেকে পরিত্রাণের জন্য অপসৃত হ’ল। আপাতত পলায়নে মুক্তি। কিন্তু এই সমাজব্যবস্থার শেকড় ছড়িয়েছে অনেক দূর পর্যন্ত। বিদ্রোহীর মুক্তি নেই। আর ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত, সেই দিন হবে শান্ত, যবে অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ আকাশে বাতাসে’ আলোড়ন তুলবে না। জনগণ রইল আত্মনিমগ্ন, শাসক রইল তেমনি উদ্যত, কেবল বিদ্রোহীর আনুগত্যের অভাবে দেখা দিল অতিরিক্ত শঙ্কা। “মেয়ের ব্যবহারে কলিকালোচিত স্বাতন্ত্র্যের কুলক্ষণ দেখে এই আশঙ্কা তার মা বার বার প্রকাশ করেছেন।” কিন্তু মেয়ের ধারণা হয়েছিল (বিয়ের জন্যে) রাষ্ট্রানুগত্যের খাতিরে (মেয়েদের) প্রজাদের প্রস্তুত হ’তে হয় “আত্মসম্মানকে পঙ্গু করে, ন্যায়-অন্যায় বোধকে অসাড় করে দিয়ে।”
এলা যখন ম্যাট্রিক পার হয়ে কলেজে প্রবেশ করেছে তখন মায়ের মৃত্যু হ’ল। রূপক অপ্রকাশের মাধ্যম মাত্র, এর শৈথিল্যও তাই অত্যন্ত সহজ। এলা বা বিদ্রোহী যখন বিদ্রোহের প্রথম প্রবেশ দ্বার পার হ’ল তখন তাব জীবনে মা, মায়ের শাসন বা রাষ্ট্র-শাসন অসত্য হ’য়ে গেল, অর্থাৎ সে তখন শাসনের বাইরে এল। যে শাসন মানে, তাকেই না শাসন করা চলে; যে শাসন মানে না?
উদাসীন জনগণের আকাঙ্ক্ষারূপে এই বিদ্রোহীর জন্ম হয়, সে কালক্রমে তাদেরকেও ছাপিয়ে যায়। তখন সে হয়ে দাঁড়ায় তত্ত্বকথা, কর্মসূচী, কর্ম। আর এখানে এলা পরীক্ষাগুলো পাশ করার পর পিতামাতার নির্ভরতা থেকে স্বতন্ত্র হ’ল। এলার ব্যক্তিত্বের হ’ল জন্ম।
এরই নাম তত্ত্ব বা আদর্শ। আক্রোশ, অভিমান, কিছু নয়। শাসকগোষ্ঠীর অনাচারেও কিছু হয় না, যদি না, এই শাসক-গোষ্ঠীর গোটা পদ্ধতি গ্রাস করার মতো পালটা কোন পদ্ধতি উদ্ভব হ’তে থাকে। ১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম নির্বাচনে একথা খুবই স্পষ্ট হয়েছে যে, শাসক-শক্তির অপকীর্তি জনগণের সচেতন শক্তি নয়। বামপন্থী দলগুলি এই ভুলই করেছে। তারা ভেবেছে, শাসকগোষ্ঠী এক একটা অনাচার করেছে, আর বামপন্থীরা কাজ এগিয়ে গেছে। এই আত্মসন্তুষ্টির ফলে তারা জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে কোন গণ-সংগঠন গড়েনি, প্রকৃত বৈপ্লবিক তত্ত্বকথাও তাই প্রকাশ পায়নি, তারা মনে করেছে, শাসক-শক্তির অত্যাচারে শাসিতের মনে যে তিক্ততা এসেছে বামপন্থীদের ঐ হবে যথেষ্ট পাথেয়। কিন্তু দিন যতই যাবে ততই বোঝা যাবে ওটা কেবলই নঙ্র্থক, ওটা সংগঠন ও কোন সুস্পষ্ট পাল্টা আদর্শও নয়। সুতরাং ও কিছুতেই দুর্গত জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষিত হ’তে পারে না। জনসাধারণ প্রথমত বিভ্রান্ত তো হবেই, দ্বিতীয়ত আপদকালে পরিত্যক্ত হয়েছে বলে মনে করবে। তৃতীয়ত নৈরাশ্যে ও হতাশায় শাসক-শক্তিকেই শক্তি মনে করে প্রণতি জানাবে।
এলা অবশ্য ভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে জন্মালো। এলার দীক্ষা-পরিবেশ ছিল বিদ্রোহেরই মধ্যে, বিপ্লবের নয়। এলার প্রথম দীক্ষাগুরু ইন্দ্রনাথ।
ইন্দ্রনাথ কে? আমাদের দেশে প্রকাশ্য বিদ্রোহীদের সম্বন্ধে যা ধারণা তাই। তিনি সুরেন্দ্রনাথও হতে পারেন, সুভাষচন্দ্রও হতে পাবেন। একবার আমার সন্দেহ হয়েছিল ইন্দ্রনাথ চিন্তানায়ক রবীন্দ্রনাথই; কিন্তু সেটি সন্দেহমাত্র তথ্য নির্ভয় নয়। নামকরণে ও চরিত্র বর্ণনায় সুরেন্দ্রনাথের প্রভাব চোখে পড়ে।
“দেশের ছাত্রেরা তাঁকে মানত রাজচক্রবর্তীর মতো। অসাধারণ তাঁর তেজ, আর বিদ্যার খ্যাতিও প্রভূত।”
ইন্দ্রনাথ যুরোপে কাটিয়েছেন অনেকদিন, বিশেষ খ্যাতি পেয়েছেন। যথেষ্ট উচ্চপদে প্রবেশের অধিকার তাঁর ছিল; য়ুরোপীয় অধ্যাপকদের প্রশংসাপত্র ছিল উদার ভাষায়। য়ুরোপে থাকতে ভারতীয় কোনো একজন পোলিটিক্যাল বদনামির সঙ্গে তাঁর কদাচিৎ দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল, দেশে ফিরে এলে তারই লাঞ্ছনা তাঁকে সকল কর্মে বাধা দিতে লাগল।…(ক্রমে) বুঝতে পারলেন এদেশে তার জীবনে সর্বোচ্চ অধ্যবসায়ের পথ অবরুদ্ধ…ইন্দ্রনাথ জার্মান, ফরাসি ভাষা শেখবার একটা প্রাইভেট ক্লাস খুললেন, সেই সঙ্গে ভার নিলেন বটানি ও জিয়লজিতে কলেজের ছাত্রদের সাহায্য করবার। ক্রমে এই ক্ষুদ্র অনুষ্ঠানের গোপন তলদেশ বেয়ে একটা অপ্রকাশ সাধনার জটিল শিকড় জেলখানার প্রাঙ্গণের মাঝখান দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল বহুদূরে।
“অপরিচয় সত্ত্বেও অসংকোচে” এলা তাঁর নিকট এল; কেননা, “আজকালকার দিনে (মানে, সেই টেররিষ্ট যুগে) এরকম আবেদন বিশেষ আশ্চর্য্যের নয়।” সে “সংসারের বন্ধনে কোনোদিন বদ্ধ হবে না এই প্রতিজ্ঞা” স্বীকার করল। ইন্দ্রনাথই বিদ্রোহী এলার তত্ত্বকথা।
এর পর পটপরিবর্তন হ’ল। কেননা, ঐটুকু ভূমিকা বা বিদ্রোহীর ভূমিষ্ঠ হবার ইতিহাস মাত্র। ভূমিকা থেকে ঘটনার পাঁচ বছরের ব্যবধান কালের হিসাবে স্বল্পব্যাপ্ত। এইখান থেকেই চার অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায় সুরু।
চায়ের দোকানের পাশে, সেকেণ্ড হ্যাণ্ড বইয়ের দোকান; স্বত্বাধিকারী কানাই গুপ্ত, পুলিশের (অথবা স্বত্বাধিকারী কানাই গুপ্তপুলিশের) পেনশনভোগী–সাবেক সাব-ইন্স্পেক্টর।
এবার তত্ত্বকথা সুরু। যে তত্ত্বকথাই চার অধ্যায়ের মর্মকথা। ইন্দ্রনাথের “বাঁ হাত দিয়ে কাঁচা করে লেখা; বুদ্ধির পরিচয় নেই, সদুপদেশ আছে।” বে-নামে এলার অননুমোদিত নামে লেখা। কিন্তু এলা বলেছে, “আপনি যা লিখেছেন সেটা যে একেবারেই আমার কথা হোতে পারে না তা আমি বলব না…সত্যি কথা বলব। যতই দিন যাচ্ছে, আমাদের উদ্দেশ্যটা উদ্দেশ্য না হয়ে নেশা হয়ে উঠছে। আমাদের কাজের পদ্ধতি চলেছে যেন নিজের বেতালা ঝোঁকে বিচার-শক্তির বাইরে। ভাল লাগছে না। অমন সব ছেলেদের কোন অন্ধ শক্তির কাছে বলি দেওয়া হচ্ছে। আমার বুক ফেটে যায়।”
লেখক যত বড়োই হোন্, তার গণ্ডীতে তিনি সীমাবদ্ধ। তিনি সে গণ্ডী উত্তীর্ণ হতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ যখন ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের পদ্ধতিকে নিন্দা করেন তখন তার মনে এসব যুক্তির সঞ্চার হয়েছিল। যুবসমাজের প্রতি তার স্বাভাবিক স্নেহ সে-যুক্তিকে খণ্ডন করতে পারে নি। এ-যুক্তি ও পুস্তক তাঁর অকৃত্রিমতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। স্নেহবশত এই গ্রন্থখানি তিনি প্রত্যাহার করেন নি। ঠিক এই কারণে ইন্দ্রনাথের যুক্তি ও এলার যুক্তিতে কোন বিরোধ নেই, মৌলিক কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। কেননা এলা নিমিত্ত মাত্র, ইন্দ্রনাথই তত্ত্বকথা, এলা বাঁশী, ইন্দ্রনাথ বংশীধারী। তাই ইন্দ্রনাথ বাঁ হাতে কাঁচা করে লিখলেও তা স্বয়ং ইন্দ্রনাথের ও তার মানস-কন্যা এলার কথা। সেই ইন্দ্রনাথ এলার নামে লিখছেন : “ছেলেরা অকাল বোধনে দেশকে মারতে চলেছে।” এজন্য “বঙ্গ নারীদের কাছে সকরুণ আপীল এই যে, তারা যেন লক্ষ্মীছাড়াদের মাথা ঠাণ্ডা করে।…দূর থেকে ভর্ৎসনা করলে কানে পৌঁছবে না। ওদের মাঝখানে গিয়ে পড়তে হবে, যেখানে ওদের নেশার আড্ডা (আর তাই ক’রে ওদের কাজ সাবোটাজ বা পণ্ড করতে হবে)। শাসনকর্তাদের সন্দেহ হোতে পারে, তা হোক।…মায়ের জাত; ওদের শাস্তি নিজে নিয়েও যদি ওদের বাঁচাতে পারে, মরণ সার্থক হবে।”
ইন্দ্রনাথের বাঁ হাতের লেখায় শাসনকর্তাদের সন্দেহ মোটেই হয়নি। সন্দেহ হয়েছিল সেকালের বিপ্লবীদের যাঁরা তখন বন্দী শিবিরে সহস্র সংখ্যায় বন্দী। রবীন্দ্রনাথের লোভ ছিল ছেলেদের ওপর, ওদের বাঁচাবার লোভ। সেই লোভেই, সেই বিশ্বাসেই বইয়ের যুক্তি। কৃত্রিম তো নয়। “কলকাতার রসিক ছেলেদের মতো যাদের রস গাঁজিয়ে-ওঠা নয়, মৃত্যুদূতের পিছন পিছন মরিয়া হয়ে ছোটে যে বাঙাল ছেলেরা তাদেরকে রক্ষার জন্য দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশও একবার এদের মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, অকৃত্রিম বিশ্বাসে এদেরকে অকাল বোধন থেকে সরিয়ে এনেছিলেন এবং ছয় মাসে স্বরাজ আনার প্রতিশ্রুতিতে টেনে এনেছিলেন। শাসনকর্তাদের হাতে এজন্য তাঁর দণ্ডও হয়েছিল। তার যুক্তি কৃত্রিম ছিল না। পরিপূর্ণ বিশ্বাসেই তিনি চেয়েছিলেন ছেলেদের চিন্তাধারার মোড় ফিরিয়ে দিতে। গান্ধীজীও চেয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রও এদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন–পড়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ সেন। আজও অনেকে নানা আদর্শের নাম করে এদের মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সুতরাং শাসনকর্তাদের সন্দেহে কি আসে যায়? বিপ্লবীদের বিশ্বাস ভাঙা বা তাদের প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করার চেষ্টা অকৃত্রিম বলেই তো তা ভয়ঙ্কর। সেদিন এ সংঘাত ছিল অনিবার্ষ–এক ভাব আর এক ভাবকে গ্রাস করতে চায়। এদেশের বিপ্লবীদের ভাবের ভিত্তি ছিল অস্থির আবেগ, অচঞ্চল ভাববস্তুতে নিরেট নয়–তাই ধাক্কায় ধাক্কায় তারা পরাজিত হয়েছেন।
ইন্দ্রনাথ-এলার তর্ক ভূমিকাশেষে প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয়-চতুর্থ পাদেই শেষ হয়ে যেতে পারত, কিন্তু সে যুক্তি হত একই ব্যক্তির যুক্তি। তারও বাইরে যে যুক্তি তাকেও আহরণ করে খণ্ডন করা চাই, নিজের প্রশ্নেই তা করা চাই এবং তাই নিয়েই চার অধ্যায়ের বাকীটুকু। একথাও ভুললে চলবে না যে, প্রশ্নের প্রকৃতির মধ্যে উত্তরের প্রকৃতি নিহিত থাকে। সুতরাং, বাইরেকার আয়োজন বা পরিচ্ছদ যাই থাক এলা-ইন্দ্রনাথের মূল জিনিস এক।
ইন্দ্রনাথ মেয়েদের “মায়ের জাত” করতে নারাজ, কেন না, তার মতে “কথাটা গৌরবের নয়।” “তার চেয়ে বড়ো কথা তোমরা শক্তিরূপিণী, এইটেকেই প্রমাণ করতে হবে দয়ামায়ার জলাজমি পেরিয়ে গিয়ে শক্ত ডাঙ্গায়। শক্তি দাও, পুরুষকে শক্তি দাও…তোমাদের আমরা যা বিশ্বাস করতে থাকব তোমরা তাই হয়ে উঠবে।” শরৎচন্দ্রের ওরফে অনিলা দেবীর নারীর মূল্য মনে পড়ে।
নারী শক্তিরূপিণী–সে কি পুরুষকে ভেঙে ফেলায়? উমার প্রতিজ্ঞায় ইন্দ্রনাথের বিশ্বাস নেই। ওকে বিয়ে দিয়ে সরিয়ে দিতে চান। মিথ্যা প্রতিজ্ঞার নামে “মেয়েদের বিয়ের আগেকার কান্না প্রভাতে মেঘডম্বরং।” সে “সুকুমারকে ভালোবাসে” “সেইজন্যেই ওকে তফাৎ করতে চাই।” সুকুমারের সঙ্গে উমার বিয়ে দিতে তিনি রাজী নন। “ওর মতে ছেলে আমাদের মধ্যে কজন আছে।…ওর মতো উঁচুদরের পুরুষের মনে বিভ্রম ঘটানো মেয়েদের পক্ষে সহজ।” যে অবাঙালী ভোগীলাল (ভোগেই যার আনন্দ) উমার স্বামীরূপে নির্বাচিত হয়েছে “বাঙালির মেয়েমাত্রকেই সে বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি বলে জানে।” ইন্দ্রনাথের মতে “জঞ্জাল ফেলবার সবচেয়ে ভালো ঝুড়ি বিবাহ।”
একেবারে বৈরাগী দিয়েও কোন কাজ হবে না। “শরীরটাতে ছাই দিয়েছে যে-সন্ন্যাসী, আর প্রবৃত্তিকে ছাই করেছে যে-ভস্মকুণ্ড সেই ক্লীবদের নিয়ে কাজ হবে না বলে” তিনি “মেয়ে-পুরুষকে একত্র করেছেন।” কিন্তু “যখন দেখব আমাদের দলের কোন অগ্নি-উপাসক অসাবধানে নিজের মধ্যেই অগ্নিকাণ্ড করতে বসেছে–দেব তাদের সরিয়ে।”
এদিকে এলার খদ্দরেও “রং লেগেছে।” কোন “পায়ের শব্দের প্রত্যাশায় তোমার কান পাতা থাকে।” কিন্তু ইন্দ্রনাথ এলাকে জঞ্জালের ঝুড়িতে ফেলতে রাজী নন। “ভালোবাসার গুরুভারে তোমার ব্রত ডোবাতে পারে তুমি তেমন মেয়ে নও।” “এর মধ্যে কিন্তু কিছুই নেই–তুমি কিছুতেই নিষ্কৃতি পাবে না।…কেমন করে তুমি নিজে বুঝবে তোমার হাতের রক্তচন্দনের ফোঁটা ছেলেদের মনে কী আগুন জ্বালিয়ে দেয়।…যেখানে কামিনীর প্রভাব সেখানে কামিনীকে বেদীতে বসিয়েছি।…দেশ অর্ধনারীশ্বর–মেয়ে-পুরুষের মনে তার উপলব্ধি।…ভালোবাসার শুষ্ক রুদ্ররূপ” যারা সইতে পারে না ইন্দ্রনাথ তাদেরই গঙ্গাযাত্রায় পাঠান।
এলার নারীত্ব-রক্ষার আন্তরিকতা অথবা অতীনের প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসার পরীক্ষার জন্য ‘‘ডাকাত”ও পাঠিয়েছিলেন ইন্দ্রনাথ এলার ঘরে। “শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই কথাটাই বুঝিয়েছিলেন। নির্দয় হবে না কিন্তু কর্তব্যের বেলা নির্মম হতে হবে।”
ইন্দ্রনাথ এখানে নারীর মূল্য নিরূপণ করেছেন। ইন্দ্রনাথ এখানে সেকালের স্বদেশীর মূল্য নিরূপণ করেছেন। কিন্তু এ মূল্য কি মর্যাদার?
মেয়ের পুরুষদের ভোলা এইটেই কি বড় কথা, না, মেয়েরা ছেলেদের শক্তি দেয় এইটে বড় কথা? ছেলেরা মেয়েদের কথায় ভোলে, এইটেই বড় কথা, না, ছেলেরা মেয়েদের উপেক্ষা করতে পারে এইটে বড় কথা? উমার মতো মেয়েরা উঁচুদরের পুরুষের মনে বিভ্রম ঘটায়, উমার ভালোবাসা ভালোবাসা নয়, ও ভোগীলালের ভোগ্যবস্তু মাত্র, বিয়ের আগে তার কান্নাও তাই মেঘডম্বরং। এলার শাড়ীতে রং লেগেছে, এলা অতীনকে ভালোবাসে, কিন্তু সে ভালোবাসা শুষ্ক রুদ্র, তার নিষ্কৃতি চাওয়াটা সত্য নয়। অতীন যদি কখনো সকলকে বিপদে ফেলে তখন সে তাকে নিজের হাতে মারার কথা ভাবতে পারে না। এলার প্রয়োজন ছেলেদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, কামিনীর প্রভাব যতটুকু প্রযোজ্য ততটুকুই।
একথা সত্য যে, এককালে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা শ্মশান-বৈরাগ্য অবলম্বন করতেন, নিজের প্রয়োজনে কামিনী ও কাঞ্চন ত্যাগ করলেও দলের প্রয়োজনে কাঞ্চনের প্রভাবকে অবজ্ঞা করেন নি। কামিনীর প্রভাবকে তারা বহুদিন এড়িয়ে এসেছেন। তবে যেকালে রবীন্দ্রনাথ চার অধ্যায় লেখেন সেকালে এই সব সন্ত্রাসবাদী আগুনের খেলায় মেয়েরাও নেমেছেন। লেবংয়ের ঘোড় দৌঁড় মাঠে যে শেষ সন্ত্রাসবাদের চিহ্ন আঁকা হয়েছে সেখানেও মেয়েদের অস্তিত্ব উদ্ঘাটিত হয়েছে। এ বিশ্লেষণও অসত্য নয় যে, পরবর্তীকালে, ১৯১২-২২ এর পর থেকে, বিশেষ ক’রে ১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেসের পর দলে মেয়ের আকর্ষণে ছেলেরা এসেছে। কিন্তু ছেলেদের আকর্ষণে মেয়েরা আসেনি এও তো সত্য নয়? দলে মেয়েরা এসেছে কোথাও কোথাও মায়ের রূপে, স্নেহে সন্তানের রাজনীতি মায়ের রাজনীতি হয়, সন্তানের ক্রিয়াকলাপে মার যেন অনিবার্য সমর্থন থাকে–সেই মায়ের রূপে। তারপরও যারা এসেছে তারা এসেছে বৈরাগী পুরুষের আকর্ষণে। সন্দেহ নেই অনেকে ভাবের তাড়নায়ও এসেছে। ভাবের তাড়নাকে ছাপিয়ে রিপুর তাড়না যেখানে প্রবলতর কেবল সেইখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। মেয়েদের রক্তচন্দনের ফোঁটা কপালে নিয়ে আত্মোৎসর্গ করেছে এরকম পৌরুষ-প্রকাশের দৃষ্টান্ত বিরল নয়, কিন্তু এ রক্তাশীর্বাদ গ্রাহ্য করেনি এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। সুতরাং, যে কোনো ভাবের প্রেরণায় আত্মবলির জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছে তার সঙ্গে মেয়ের আকর্ষণে যে এসেছে তার তুলনা সুবিচার নয়–কিন্তু প্রাণদানের ক্ষেত্রে উভয়ের পরিণতি এক।
এক্ষেত্রে ইন্দ্রনাথের বিচার-বিভ্রান্তি ঘটেছে সন্দেহ করি; কেন না, এক্ষেত্রে তার কল্পনার আশ্রয় নেওয়া বা যুক্তির কসরত অবলম্বন করা ছাড়া উপায় ছিল না। এসব গুপ্ত জগতের স্বদেশী ছেলেদের সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল সীমাবদ্ধ। সুতরাং, বিশ্লেষণে কোথাও কোথাও যে অমর্যাদার ভাব ফুটে উঠেছে তা ইচ্ছাকৃত নয়, স্বাভাবিক। সঙ্গে সঙ্গে তার এ বিশ্বাসও প্রকট যে, ওপথ পথ নয়। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে যে বিচার-বিভ্রান্তি ঘটে থাকে এখানেও তার বেশী কিছু হয়নি।
এই বিচার-বিভ্রান্তি বা একদেশদর্শিতার জন্য চার অধ্যায়ের মূল স্বর রাজনীতি হয়নি, হয়েছে যেন বা প্রেমতত্ত্বের প্রশ্নোত্তর। স্বদেশী তার অবলম্বন মাত্র। কিন্তু প্রকৃত স্বদেশী অবলম্বন স্বাবলম্বী, যৌনাচ্ছন্ন নয়।
এলা ও ইন্দ্রনাথের কথোপকথনে বার বার পথের দাবীতে ভারতী ও সব্যসাচীর কথাবার্তা মনে করিয়ে দেয়। প্রশ্নের ধরণ ও উত্তরে বেশ মিল আছে। কেন না, এই দুখানি গ্রন্থই বিতর্কমূলক, ক্রিয়ার বা য়্যাক্সানের নয়। নিতান্তই বৈচিত্র্যের জন্য অপর চরিত্রের আনাগোনা হয়েছে যেন। তথাপি পথের দাবীতে গল্পের বা উপন্যাসের বহু ধর্মই আছে, চার অধ্যায়ে তা বিরল, চার অধ্যায় প্রবন্ধ-ধর্মী, সুতরাং, এখানে ইন্দ্রনাথের বক্তব্যই প্রধান। পথের দাবী রাজনীতিপ্রধান, চার অধ্যায় তা নয়।
কানাই গুপ্ত বাস্তবিক পক্ষে একঘেয়ে আলাপের ছেদ মাত্র। ইন্দ্রনাথের বাক্সংযমের প্রহরী। ইন্দ্রনাথ এলাকে এও শুনিয়ে দিলেন যে, তিনি দলের লোকের কাছে এলার নিন্দে করে থাকেন (সম্ভবতঃ দলের লোকের ওঁর প্রতি আকর্ষণকে প্রতিহত করার জন্য)। এ অভিযোগ করলেন যে, অতীনকে সে ভাঙিয়ে নিচ্ছে, “সেই ভাঙলে আরও কিছু ভাঙবে।”
বাংলাদেশের নিন্দুক সমাজের ওপর ইন্দ্রনাথের কিছু অভিযোগ আছে। সে অভিযোগ অকারণ নয়। এখানে এলার নিন্দা উপলক্ষে বলছেন : তোমার বারো আনা অনুরক্তের বাংলাদেশী মন নিন্দা বিশ্বাস করবার আগ্রহে লালায়িত হয়ে ওঠে। এই নিন্দাবিলাসীরা নিষ্ঠাহীন।…জন্মকাল থেকেই এদের অহেতুক শত্রুতা বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের সমস্ত চেষ্টাকে কেবলই ধূলিসাৎ করছে।”
অভ্যুত্থানের সমস্ত চেষ্টাকে কেবলই ধূলিসাৎ করেছে একথা সর্বাংশে সত্য নয়, ব্যর্থও হয়েছে। নইলে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর প্রদীপ্ততেজে তো পেতামই না, পেতাম না রামমোহন রায়কে, দয়ার-সাগর বিদ্যাসাগরকে, স্বামী বিবেকানন্দকে, সেদিনকার চিত্তরঞ্জন দাশকে। তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই। কিন্তু ইন্দ্রনাথ নিন্দুক দলে যাদের সত্যই ফেলতে পারতেন তারা ঐ কড়া টেররিষ্ট স্বদেশীদের ভিড়েই ভিড়েছিল। ইন্দ্রনাথ একথা হয়তো জানতেন না, বাংলাদেশে টেররিষ্ট দলে সব চাইতে বড় দোষ ছিল যৌন-কামনা নয়, যৌন-কামনার সাময়িক বিকৃত প্রকাশও নয়, এ-দলগুলির সব চাইতে বড় পাপ ছিল ভিন্ন দলের অহেতুক নিন্দা, শত্রুতা–ভিন্ন দলের লোককে, লোক-বিশেষকে পুলিশের চর বলে প্রচার করা। এসব নিপুণ অপযশ প্রচারের প্রবৃত্তি উৎসারিত হ’ত দল-নেতাদের মাথায়, অপর কারও জনপ্রিয়তা এদের ছিল অসহ্য এবং সেই জনপ্রিয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি মাত্র কৌশলই তারা জানত–সে কৌশল হচ্ছে তাকে পুলিশের চর বলে ঘোষণা করা। দলনেতৃবৃন্দের এই যে দুর্মতি বা বৈরিতা তার ব্যাপক সূচনা হয়েছে অসহযোগ আন্দোলনের পর–যখন দেশবন্ধুর ডাকে সব স্বদেশী দাদারা, প্রকাশ্যে ভেসে উঠলেন এবং কংগ্রেসের কয়েকখানা ভাঙা কুটির নিয়ে টানাটানি সুরু করলেন। যাদের অজ্ঞাতবস্থায় মৃত্যুই ছিল কাম্য তাঁরা নাম-প্রচারের জন্য লালায়িত হ’য়ে পড়লেন বলেই অপরের নিন্দা বিশ্বাস করবার আগ্রহে লালায়িত হ’য়ে উঠলেন। এ রোগ ইন্দ্রনাথের জানার কথা নয়। কারণ, এ-কাঁটা তার গায়ে লাগেনি। কিন্তু ওতে বহু স্বদেশীর জীবন ধূলিসাৎ হয়েছে।
কিন্তু অপর একটি লক্ষণ অনুমান করেছিলেন, যার সম্ভাব্যতা আছে, কিন্তু স্বদেশীদের ক্রিয়াকলাপের তুলনায় যার সংঘটন সামান্য। সেটি হচ্ছে “জন বৃষভেরই পুষ্যি বাছুর”দের উস্কানি বা প্ররোচনা অথবা প্রয়োজন। “নিশ্চয়ই অভয়চরণ রক্ষিত এদের উপাধি।” শব্দ সমাবেশের মধ্যে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। এই বৃষভের পুষ্যি বাছুর অভয় পেয়েছে সরকারের কাছে, এরা সরকারের আশ্রিত; এরাই স্বদেশীর নাম করে স্বদেশীদলে চুকত এবং ক্রমে দলের “ঢাকনির ফুটে দিয়ে গন্ধ বেরিয়ে” পড়ত, “মাছির আমদানি শুরু” হ’ত। কিন্তু গোয়েন্দার লোক স্বদেশীদলে ঢুকে স্বদেশীদের প্ররোচনা দিয়ে কিছু ক্রিয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ধরিয়ে দিয়েছে একথা আংশিক সত্য মাত্র। নিজেদের দুর্বলতায় বিপ্লবীরা ধরা পড়েছেন এও অসত্য নয়। পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে স্বদেশীরা তাদের কাজ করেছেন, প্রাণোৎসর্গ করেছেন এইটে আরও বড় সত্য। সেই সত্যের জোরেই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বনিয়াদ ক্রমশ দৃঢ়তর হয়েছে। সেখানে–সেখানে ইন্দ্রনাথের ছিল স্নেহমিশ্রিত বিদ্রুপ। একেবারে ‘পথের দাবীর’ সব্যসাচীর নিষ্করুণ প্রতিধ্বনি। “এলার মতো সুন্দরী সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না,” তবু ওকে দলের মধ্যে রাখার কারণ ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, সৃষ্টিকর্তা আগুন নিয়ে খেলা করে। নিশ্চিত ফলের হিসাব করে সৃষ্টির কাজ চলে না; অনিশ্চিতের প্রত্যাশাতেই তার বিরাট প্রবর্তন।…ওই যে অতীন ছেলেটা এসেছে এলার টানে, ওর মধ্যে বিপদ ঘটাবার ডাইনামাইট আছে,–ওর প্রতি তাই আমার এত ঔৎসুক্য।”
এ যেন সেই কামানের খোরাক জোগানো। স্বদেশী ছেলেদের আর কোন তাৎপর্য বা সার্থকতা নেই। ওদের সুন্দরী মেয়েদের টানে আনতে হবে, ডাইনামাইটের মতো বিস্ফোরিত করতে হবে, তাতে কাজ হাসিল হোক কি দল ভাঙ্গুক, “সৃষ্টিকর্তার” কোনো মনোবিকৃতি নেই। স্বদেশী ছেলেরা দলে সুন্দরী মেয়েদের টানে এসেছে একথা স্বদেশীর প্রথম যুগে একেবারেই সত্য নয়, সর্বাংশে মিথ্যা এবং সম্পূর্ণ বিপরীত। এদের শপথ নিতে হ’ত মেয়েদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার। এই শপথ রেখেই তারা প্রাণোৎসর্গ করেছে। বলেছি, পরবর্তীকালে মেয়েরা এসেছে, বিশেষ যেকালে রবীন্দ্রনাথ “চার অধ্যায়” লিখেছেন তার প্রাক্কালে গুপ্ত দলে এসেছে অনেক নয়, কিছু মেয়ে। মেয়েরা বহু সংখ্যায় এসেছে কংগ্রেসে, আরও অনেক পরে কম্যুনিষ্ট পার্টিতে। কিন্তু মেয়েরা কি দেশাত্মবোধ নিয়ে, লোক কল্যাণের প্রেরণায় দলে ভিড়তে পারে না? মেয়েদের প্রতি এই কটাক্ষ কি সত্য বলে মানতে হবে? আসল ব্যাপার হচ্ছে, ইন্দ্রনাথের কল্পনা ও সংস্কার যেখানে প্রাধান্য পেয়েছে সেখানে দল গঠনের ইতিহাস, দলের গুণাগুণ প্রকট হতে পারে না, হয়ও নি।
ইন্দ্রনাথ কানাইয়ের এই অভিযোগ অস্বীকার করেন নি যে, এ নিতান্ত জুয়োখেলা। ইন্দ্রনাথ একটি ব্যক্তি মাত্র, নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার দম্ভ মাত্র, অহংয়ে পরিপূর্ণ এক অসামাজিক অভিব্যক্তি মাত্র এবং এই রসেই ইন্দ্রনাথ রসিয়ে তুলেছিলেন এলা আর অন্তুকে–তাঁর স্বার্থে বলি দেবার জন্য :
“প্রকাণ্ড কর্মের ক্ষেত্রে আমি কর্তা, এইখানেই আমাকে মানায় বলেই আমি আছি, এখানে হারও বড়ো জিতও বড়ো। ওরা চারিদিকের দরজা বন্ধ করে আমাকে ছোটো করতে চেয়েছিল, মরতে মরতে প্রমাণ করতে চাই আমি বড়ো। আমার ডাকশুনে কতো মানুষের মতো মানুষ মৃত্যুকে অবজ্ঞা করে চারিদিকে এসে জুটল……কেন। আমি ডাকতে পারি বলেই। সেই কথাটা ভালো করে জেনে এবং জানিয়ে যাব, তার পর যা হয় হোক।…ঐতিহাসিক মহাকাব্যের সমাপ্তি হোতে পারে পরাজয়ের মহাশ্মশানে। কিন্তু মহাকাব্য তো বটে।”
এই। এইটেই আসল কথা। একান্ত অসামাজিক ব্যক্তির ভয়ঙ্কর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা। এখানে সমাজ নেই, সমাজের ইতিহাস নেই, সমাজের গতি নেই, দ্বন্দ্ব নেই, সমন্বয় নেই, মানুষ সামাজিক জীব কিনা তারও মীমাংসা নেই, সমাজের ক্ষোভ ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সঞ্চারিত হয়ে তা সামাজিক আন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে কিনা, সমাজের ভেতর কোন বিশেষ শক্তি সমাজকে অনবরত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং ‘নিতুই নব’ রূপ দিচ্ছে, সমাজের মানুষের প্রাণে নানা ভাবের প্রেরণা জাগাচ্ছে, রাজনীতির কাঠামো কোন্ অর্থনীতির ইটে গড়া, সমাজের অর্থনৈতিক বা উৎপাদিকা সম্পর্ক অথবা সমাজের প্রত্যেক স্তরের প্রতিটি একে অপরের সঙ্গে কোন্ সুরে বাধা, এসব কোনো কথা নেই চার অধ্যায়ে। চার অধ্যায়ে সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্বের কথা সম্পূর্ণ অনুচ্চারিত। এখানে অভ্রংলিহ এক ব্যক্তির কথা সোচ্চারে ঘোষিত। ব্যক্তিই কি ইতিহাস? ব্যক্তি ইতিহাস–সে মহাকাব্যের রীতিতে। মহাকাব্য ব্যক্তি-প্রধান কিন্তু এই মহাকাব্যের দিক থেকেও ‘চার অধ্যায়’ সম্পূর্ণ বা বিরাট নয়। মহৎ নয়। কিন্তু আজও, ব্যক্তির কথা হবে মহাকাব্য! সমষ্টি সমাজ হবে নীরব দর্শক, নতুবা ব্যক্তির যুপকাষ্ঠে বলিদানের উপাচার?
ইন্দ্রনাথ একথার জবাব দিয়েছেন; জবাব দিয়েছেন নৈরাশ্ববাদের অতি দুর্বল জীবন-দর্শনে।
‘আমার স্বভাবটা ইম্পাসোনাল (যে কথা একেবারেই সত্য নয়)। এই অনিবার্যতাকে আমি অক্ষুব্ধমনে স্বীকার করে নিতে পারি। ইতিহাস তো পড়েছি, দেখেছি কত মহা মহা সাম্রাজ্য গৌরবের অভ্রভেদী শিখরে উঠেছিল আজ তার ধুলোয় মিলিয়ে গেছে–(কেন?) তাদের হিসাবের খাতায় কোথায় (ইন্দ্রনাথ তা জানেন না) মস্ত একটা দেনা (কিসের, তাও জানা নেই) জমে উঠেছিল যা তারা শোধ করে নি। (এই সামাজিক ইতিহাসের নির্যাস?)…বৈজ্ঞানিকের নির্মোহ মন নিয়ে মেনে নিই যার মরণদশা সে মরবেই।’ ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে ছাড়িয়ে আনলে এ উক্তি ইন্দ্রনাথের সত্যিই মূল্যবান যে, “আত্মার অবসাদ ঘটতে দেব না মরবার সমস্ত লক্ষণ দেখেও।”
নৈরাশ্যবাদের জাহাজে ইন্দ্রনাথ পাল তুলে দিয়েছেন। ‘মাঝদরিয়ায়’ তাঁর ‘জাহাজের তলা গিয়েছে সাত জায়গায় ফাঁক হ’য়ে এ তিনি ধরেই নিয়েছেন। ডুবো জাহাজেই ঝড়ের মুখে সাংঘাতিক পাল তুলে দিয়েছেন, যে কজনকে পান ডুবতে ডুবতে তাদের নিয়েই ইন্দ্রনাথের জিত। ইন্দ্রনাথের জাহাজের সমাপ্তি এইখানেই। তারপরে? “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।”
ইংরেজ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠেই বহু অনুকূল অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, শরৎচন্দ্র প্রতিকূল বিদ্বেষ প্রকাশ করেছিলেন ‘পথের দাবীতে’, রবীন্দ্রনাথ বলছেন চার অধ্যায়ে : ইংরেজের ‘পরে রাগ নয়। ‘যে জোয়ান মদ খেয়ে চোখ লাল না করলে লড়তে পারেই না, সেই গ্রাম্যকে আমি অবজ্ঞা করি। রাগের মাথায় কর্তব্য করতে গেলে অকর্তব্য করার সম্ভাবনাই বেশী। সমস্ত যুরোপের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, আমি ইংরেজকেও জানি। যত পশ্চিমী জাত আছে তার মধ্যে ওরা সব চেয়ে বড়ো জাত। রিপুর তাড়ায় ওরা যে মারতে পারে না তা নয় কিন্তু পুরোপুরি পারে ন–লজ্জা পায়।…(ইন্দ্রনাথ বলছেন) ওদের উপরে যতট রাগ করলে ফুল্ (বোকা?) ষ্টীম (ধোঁয়া?) বানিয়ে তোলা যায় ততটা রাগ করা আমার দ্বারা সম্ভব হয় না।’
এবার যে পরিপ্রেক্ষিতে এই চার অধ্যায় লেখা তা স্মরণ না করলেই নয়। ১৯৩২ সালে বাংলাদেশে চূড়ান্ত সন্ত্রাসবাদের পর ১৯৩৪ সালে তার ধোঁয়া ছড়িয়ে আছে। নৈরাশ্য জমে উঠেছে। কিন্তু ইংরেজ বিদ্বেষ আরও তীব্রতর হয়েছে। কয়েক হাজার বাংলার জোয়ান বিনা বিচারে বন্দী। কয়েক হাজার তরুণ নানা হিংসাত্মক মামলায় কারারুদ্ধ। কয়েকজনের ফাঁসী মঞ্চে জীবনাহুতি হয়েছে। কয়েকজন সংগ্রামে আত্মবলি দিয়েছে। ইংরেজকে কিছুতেই বরদাস্ত নয়।
তেমন অবস্থায় সন্ত্রাসবাদী কারা? যারা মদ খেয়ে চোখ লাল না করলে লড়তে পারেই না? যাদের ইংরেজ বিদ্বেষে আর সকল বিবেচনা লোপ পায়? ঐ এক বিদ্বেষ মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে? তারা কারা? তারা গ্রাম্য? ইন্দ্রনাথ এই সব গ্রামকে অবজ্ঞা করেন এই কারণে যে, তারা রাগের মাথায় অকর্তব্যই করেছে বেশী। আর যে ইংরেজের ’পরে এত বিদ্বেষ সে ইংরেজের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকার কারণ আছে। ‘ষোলো আনা মারের চোটে আমাদের মেরুদণ্ড ওরা চিরকালের মতো গুঁড়িয়ে দিতে পারত। সেটা ওরা পারলে না। আমি ওদের মনুষ্যত্বকে বাহাদুরি দিই।
ইন্দ্রনাথ এখানে জাতিবিচার করেছেন। ইংরেজ জাতি বনাম ভারতীয় জাতি। কোন শাসনের ‘জাত’ নয়, কোন শাসন প্রথা নয়। মানুষ বনাম মানুষ–সাহেব বনাম দেশী। সুতরাং, ‘ওরা ভালো কি মন্দ সেট তর্কের বিষয় নয়’, ‘ওদের রাজত্ব বিদেশী রাজত্ব, সেটাতে ভিতর থেকে আমাদের আত্মলোপ করছে–এই স্বভাববিরুদ্ধ অবস্থাকে নড়াতে চেষ্টা করে আমার মানব স্বভাবকে আমি স্বীকার করি।’
হয় জাতি বিদ্বেষ, নয়তো দেশী বিদেশীর বিচার–সমাজ গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ের এই কি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি, না সর্বাংশে সত্য? একটা জাতি খারাপ বলেই কি আর একটা জাতি পর্যুদস্ত করে, না ঐ নিপীড়ন বিদেশীর স্বভাব? এতে তো সমাজের গতি প্রকৃতির সবটা জবাব পাওয়া যায় না, মূল তো পাওয়া যায়ই না। জাতের অভ্যন্তরেও কি এই পরবশ্যতার দুঃখ নেই, পরজাতির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও? বিদেশী পর্য্যদস্ত রাজ্যেই তো কেবল রাষ্ট্রবিপ্লব হয় না–একান্ত আপন গণ্ডীতেও তো এই দাহ দেখা দেয়। তবে সে কোন্ শক্তির প্রেরণায়? সমাজের অভ্যন্তরে সেই দ্বন্দ্বটি কি? সেইটে জানতে পারলে তবেই না নির্লিপ্ত ভাবে একথা বলা চলে যে, ওরা ভালো কি মন্দ সেটা তর্কের বিষয় নয়? নইলে স্বদেশী বিদেশী অথবা জাতি বনাম জাতির বিচারে এ কেবলই জাতিবৈরী অথবা কোন জাতির পক্ষে সানুকূল ওকালতি হবে মাত্র। সামাজিক ঐ সূত্রটির অভাবেই চার অধ্যায় অহেতুক অসংলগ্ন ওকালতির দোষে দুষ্ট হয়েছে, যেমন হয়েছে আনন্দমঠ; আবার জাতি দ্বেষে দুষ্ট হয়েছে যেমন ‘পথের দাবী’। ইন্দ্রনাথ নিজের আত্মলুপ্তিকে ‘আমাদের আত্মবিলোপে’ পরিণত করেছেন, এককে ব্যাপ্ত করেছেন মাত্র, ওঁর স্বভাবকে তিনি মানব-স্বভাব বলে প্রচার করেছেন। প্রাণপণ সে স্বভাবকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাবেন এই ঘোষণায়ই চার অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে।
বাকী অধ্যায়গুলো গল্পের জের মাত্র।
‘আনন্দমঠ’ একভাবে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাতে আধুনিক সন্তানদের কতখানি কল্পনা ছিল এবং সেই কল্পনার সঙ্গে আনন্দমঠের কতখানি মৌলিক যোগ ছিল–একথা তর্ক সাপেক্ষ। ‘পথের দাবী’ আর একভাবে প্রেরণা যুগিয়েছে, কিন্তু সে প্রেরণা পথের দাবীর য্যাকসন-হীনতার মতই নিষ্ফলা। তাতে পথের দাবী ছিল, পথের নিশানা পাওয়া যায় নি। কিন্তু চার অধ্যায় টেররিষ্ট সাপ্রেসান র্যাকেটর তপ্ত আবহাওয়ায় প্রতিকার-প্রত্যাশী তরুণ সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। চার অধ্যায়কে তৎকালীন বঙ্গসমাজ উপন্যাস হিসাবে গ্রহণ করেনি–সদুপদেশ হিসাবেই গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য করেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্নেহভাজন সুভাষচন্দ্রকে নেতাজীরূপে দেখে যাননি। দেখলে ইন্দ্রনাথকে আমরা অন্যভাবেও পেতে পারতাম।