শেষের কবিতা সম্পর্কেও আমার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত এজন্য যে, এটি প্রকৃত উপন্যাস নয়, সর্বতোভাবে একটি সুন্দর কবিতা মাত্র, কাহিনী সামান্ত, ঔপন্যাসিক মহৎ সম্ভাবনা অনুপস্থিত। এ শব্দ বিন্যাস চাতুর্যের এবং অতি দক্ষ রূপকারের অঙ্কননৈপুণ্যের অপূর্ব দৃষ্টান্ত মাত্র।
সাধারণত রবীন্দ্রনাথ যে-শ্রেণী থেকে তার নায়ক-নায়িকা বেছে নেন এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। “অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্বিজয়ী ব্যারিস্টার। যে-পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।” এসব নায়ক-নায়িকা লেখাপড়া, বিদ্যা, কালচারেও শীর্ষস্থানীয়! অমিত রায়ও ব্যারিষ্টার। “ইংরেজি ছাদে রায় পদবী ‘রয়’ ও ‘রে’ রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রীগেল ঘুচে।…ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল–আমিট রায়ে।
যে-কাল এই কাহিনীর পটভূমিকা তাই হচ্ছে এই :–“বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে চণ্ডীমণ্ডপের হাওয়ার সঙ্গে স্কুল-কলেজের হাওয়ার তাপের বৈষম্য ঘটাতে সমাজবিদ্রোহের যে ঝড় উঠেছিল সেই ঝড়ের চাঞ্চল্যে, ধরা দিয়েছিলেন জ্ঞানদাশংকর।…তিনি আগাম জন্মেছিলেন।…
“এমন-সকল পিতামহের নাতিরা যখন এই রকম তারিখের বিপর্যয় সংশোধন করিতে চেষ্টা করে তখন তারা এক দৌড়ে পৌঁছায় পঞ্জিকার একেবারে উল্টোদিকের টার্মিনসে। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। জ্ঞানদাশংকরের নাতি বরদাশংকর বাপের মৃত্যুর পর যুগ হিসাবে বাপ-পিতামহের প্রায় আদিম পূর্বপুরুষ হয়ে উঠলেন। মনসাকেও হাতজোড় করেন, শীতলাকেও ‘মা’ বলে ঠাণ্ডা করতে চান।”…
এমনি একটা বিমিশ্র সমাজ থেকে বেরিয়েছে ‘অমিট্ রায়ে’, সিসি লিসি, লিলি গাঙ্গুলী, কেটি মিত্তির ইত্যাদি। তাদের চালবোলের বর্ণনা যে-দক্ষতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হ’য়েছে তার বিশদ উদ্ধৃতি অসম্ভব; কেননা, তাহ’লে বইয়ের অনেকখানিই উদ্ধার করতে হয়।
শেষের কবিতা নিজস্ব গুণে অপূর্ব কার্ব্য–কিন্তু এর মূল সুর সেকালে এক ধরণের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মতিগতি এবং আধুনিক লেখকদের ভাষা ভাব ভঙ্গীর উদ্দেশে উপভোগ্য শ্লেষ। যারা নাম ও উপাধি পাল্টে বসুকে বোস, বোসকে ভোস, বা বাসু, বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যানার্জি, ব্যানার্জিয়া, বোনার্জি, সেনকে স্যেইন ইত্যাদি করেছেন– অমিট রায়ে তাদের প্রতিভূ।
তাব বোন লিসি ও সিসি। আর তাদের বন্ধু কেটি মিত্তির। অস্বাভাবিক ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজ। যেমন তাদের চলন বলন, তেমনি তাদের ন্যায়নীতিবোধ! এ এক শ্রেণীর কালাপাহাড়ী কাণ্ড।
আধুনিক লেখকেরা অনেক আপষ্টার্টের সৃষ্টি করেছেন। তার মূল কারণ এদের অধিকাংশ এমন পরিবেশে মানুষ যে-পরিবেশ অত্যন্ত দরিদ্র কিন্তু হঠাৎ বড়লোক হবার কামনায় অস্থির। ছেঁড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে অর্ধেক রাজত্ব আব রাজ কন্যার কল্পনা। এককালে বাংলা সাহিত্য এমন অশ্রদ্ধেয় হতাশাব কাহিনীতে ছেয়ে গেছল, আজও তার জের কাটেনি।
শেষের কবিতা রচনার কালটা ১৯৩০। ঠিক আইন অমান্য আন্দোলনের কালে। সে-সময় দেশব্যাপী এই যে রাজনৈতিক ভূমিকম্প হচ্ছিল তা সেদিনকার কোন লেখককেই যেন স্পর্শ করেনি। তাঁরা পেটিকোটের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছেন। সমাজ বা দেশের বৃহত্তর কোন ছবি নেই ১৯৩০এর দশ বছর আগেও নয়, ১৯৩০এর দশ বছর পরেও নয়।
এই আধুনিক লেখকেরা কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৃষ্টির সীমায় ভাষাকে বহুলাংশে সংস্কৃত শব্দাধিক্য থেকে মুক্ত ক’রে ঝরঝরে ক’রে এনেছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু মহৎ উপাদানের অসামান্য কার্পণ্য অথবা দারিদ্র্য প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ঐ ভাষার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যে গুরু-চণ্ডালীপনা ছিল শেষের কবিতায় তারও সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। সব মিলিয়ে শেষের কবিতা এক বিস্ময়কর সাবলীল গতি পেয়েছে। ইংরেজি শব্দ যেমন অনর্গল মিশিয়ে দিয়েছেন তেমন দিয়েছেন দেশী গ্রাম্য কথাও। ঠাকঠমকটা, ঘাড়ে গর্দানে, স্টাইল, বেখাপ, ওরিজিন্যাল বেদস্তুর, পাসমার্ক, ওয়েটিং রুম, স্পেশালট্রেনের সেলুন-কামরা; সেলাম, কায়দা, হাম্বাগ, পিলপেগাড়ি ইত্যাদি অবাধে ব্যবহার করেছেন। শ্লেষ আর হাস্যরস কোথাও কোথাও সুন্দর সমন্বিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বনাম নিবারণ চক্রবর্তী এককালে একদল আধুনিক কবি রবীন্দ্র-প্রভাব-মুক্ত হওয়ার যে আন্দোলন চালিয়েছিলেন কিন্তু রবীন্দ্র-গণ্ডীকে অতিক্রম করতে পারেন নি। এতে তাদের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতে যদি কেউ একটি ক্ষেত্রে কিছুকাল রবীন্দ্রনাথকে ম্লান ক’রে দিয়ে থাকে তো সে কাজী নজরুল ইসলাম, সে ক্ষেত্রটি স্বদেশী সঙ্গীতের ক্ষেত্র। সেকালে নজরুল-সঙ্গীতের একটা ব্যাপক আবেদন ছিল। কিন্তু কালক্রমে সে ভাঙার গান, বিষের বাঁশী থেমে গেছে, ভাঙার খেলা ও সাপুড়ে মৃত্যতে শেষ হয়েছে। আজ আবার রবীন্দ্র সঙ্গীত চারদিকে। ঐ ক্ষেত্রটি ছাড়া অন্যত্র কবিকুল রবীন্দ্রনাথের ছায়ায়ই বড়। অমিতর আড়ালে নিবারণ চক্রবর্তীর মধ্যে আসলে রবীন্দ্রনাথেরই অস্তিত্ব বিরাজমান। সমাজে ও সাহিত্যে নানারকম রুচি বিকৃতি ও মতিবিভ্রান্তি এই কাহিনীর নিজস্ব গতি ও লেখকের বর্ণনায় আভাসিত হ’য়ে উঠেছে, কবিতাগুলো যে অনবদ্য একথা নতুন ক’রে বলা বাহুল্য। কিন্তু আমরা যে পর্যায়ের মহৎ উপন্যাসের কথা ভাবি, শেষের কবিতা এবং তার পূর্ববর্তী চার অধ্যায় সে পর্যায়ভুক্ত নয়। নৌকাডুবি চোখেরবালি গোর ঘরে বাইরেতে আমরা রবীন্দ্রনাথের মহদ্ভাবকে লক্ষ্য করে এসেছি, এখানেও তা অক্ষুণ্ণ। লাবণ্য-অমিতর অবাধ কোর্টশিপ সত্ত্বেও লাবণ্য একটি অতি সাধারণ সাংসারিক সম্পর্ক পাতাতে রাজী হয়নি। যার যার স্বাতন্ত্র্য রেখে এ সম্পর্ক কি মহৎ থাকে, না, কারও স্বাতন্ত্র্যই কারও ঘুচিয়ে দেওয়া উচিত? “যে-মানুষ মাটির মানুষ একেবারেই নয়, সে আপনার স্বাতন্ত্র্য কিছুতেই ছাড়তে পারে না। সে যোগমায়াকে বলেছিল : “বিয়ের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে স্ত্রীপুরুষ যে বড়ো বেশি কাছাকাছি এসে পড়ে–মাঝে ফাঁক থাকে না, তখন একেবারে গোটামানুষকে নিয়েই কারবার করতে হয়, নিতান্ত নিকটে থেকে। কোনো একটা অংশ ঢাকা রাখবার জো থাকে না।” অমিতরও এমনি একটা অভিমত ছিল : “অধিকাংশ বর্বর বিয়েটাকেই মনে করে মিলন, সেই জন্যে তারপর থেকে মিলনকে করে এত অবহেলা।”
লাবণ্যর শেষের কবিতা :
মত্যের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত মূরতি
যদি সৃষ্টি ক’রে থাক তাহারি আরতি
হোক তব সন্ধ্যাবেলা––
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবেনা মোর প্রতাহের মানস্পর্শ লেগে
কিন্তু যোগমায়ারও একটা জবাব আছে :
“ভালোবাসা যেখানে আছে সেখানে সেই সৃষ্টি সহজ–যেখানে নেই সেখানে হাতুড়ি পিটোতে গিয়ে তুমি যাকে ট্রাজেডি বল, তাই ঘটে।”
এখানেও সেই এডজাস্টমেন্ট ও মিস-এলায়ন্সের প্রশ্ন। সেই ঘরে বাইরের বিরোধহীন সহাবস্থানের প্রশ্ন। মনে হচ্ছে এ প্রশ্ন অনাদি। রবীন্দ্র উপন্যাসে এই অনাদি প্রশ্নই তার কযেকটি উপন্যাসকে মহৎ মর্যাদা দিয়েছে।