দীর্ঘ দ্বাদশবর্ষব্যাপী অহোরাত্র পরিশ্রমের পর দেবালয়ের নির্মাণকার্য সমাধা হ’ল। এইবার আনন্দ-নটের প্রতিষ্ঠা হবে। রাজজ্যোতিষী গ্রহসংস্থান বিচার করে দিন এবং লগ্ন নির্ণয় করে দিয়েছেন, আজ থেকে সপ্তম দিনে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে দেবতার অভিষেক। রাজার আদেশে আজ থেকে অভিষেকের পরে এক সপ্তাহ পর্যন্ত এই পক্ষকালব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে নগরীতে। রাজভাণ্ডার অবারিত; পক্ষকাল ধরে রাজার রন্ধনশালায় ব্রাহ্মণদের অন্য সদাব্রতের ব্যবস্থা।
দিন যতই এগিয়ে যেতে লাগল নগরীর উৎসব-সমারোহ ততই যেতে লাগল বেড়ে। বাইরে থেকে সামন্তগণ আহূত হয়ে নগরে শোভা বর্ধিত করতে লাগলেন। মন্দিরে-মন্দিরে বেদপাঠ, শাস্ত্রালোচনা। অপর পক্ষে নগরের বিশিষ্ট-বিশিষ্ট স্থানে উৎসব-মঞ্চ নির্মাণ করে প্রজাদের চিত্তবিনোদনের জন্য নৃত-গীত-অভিনয়াদির ব্যবস্থা। আনন্দ-কলরোলের মধ্যে দিয়ে দিন এগুতে লাগল অভিষেক-প্রভাতের দিকে।
তারপর যখন একেবারে চরমে উঠে গেছে, সমস্ত উৎসব-চঞ্চলতা যেন অকস্মাৎ অশনি-সম্পাতে একেবারে হয়ে গেল স্তব্ধ।
আনন্দ-নটের বিগ্রহ প্রায় সম্পূর্ণ ই হয়ে গিয়েছিল। অভিষেকের আর মাত্র একটি দিন বাকি, রাজা বিগ্রহ-পরিদর্শনে এসেছেন, আজই বিগ্রহকে বেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত করা হবে। প্রধান ভাস্কর পুরন্দর হাতে একটা ছেদনী নিয়ে মুর্তিটির চারিদিকে ঘুরে ঘুরে শেষবারের মতো একবার পরীক্ষা করে নিচ্ছিলেন। দক্ষিণ বাহুমূলে এক জায়গায় একটু যেন অসামঞ্জস্য চোখে পড়ল। সামান্যই, তাও প্রচ্ছন্নই একরকম, তবু এতদিন ধরে অতন্দ্র তপস্যার মধ্যে গড়া নির্দোষ দেবমুর্তিতে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মও কোন ত্রুটি থাকে সেটা তার সহ্য হ’ল না। খুব লঘু একটা হাতুড়ি নিয়ে ছেদনীর সাহায্যে তিনি সেটুকু সংশোধন করতে প্রবৃত্ত হলেন।
বেশী নয়, মাত্র কয়েকটি ঘা দিয়েছেন, ত্রুটিটুকু প্রায় সংশোধিত হয়ে এসেছে, এমন সময় হঠাৎ একটি আঘাতে বহুমুলে একটা বিদারণ রেখা দেখা দিল এবং কিছু দেখবার বোঝর আগেই নৃত্যচ্ছন্দে উৎক্ষিপ্ত হাতখানি আপন ভারে মুল ছিন্ন করে নেমে এল।
সঙ্গে সঙ্গে হাহাকার পড়ে গেল। অভিষেকের অব্যবহিত পূর্বে এরকম দুর্ঘটনা। প্রধান ভাস্করের অনবধানতাই এর কারণ, ব্যাপারটা এই ভাবেই প্রতিপাদিত হয়ে তাঁর প্রাণদণ্ডই ছিল এর পরিণাম। কিন্তু রাজার একেবারে দৃষ্টির নীচে সংঘটিত হওয়ায় আর ওভাবে নেওয়া গেল না।…একটা চরম অশুভের সুচনা; সুকঠিন কষ্টিপাথরের মূর্তি, নির্মীয়মান অবস্থায় কত রূঢ় আঘাত কাটিয়ে উঠে শেষ মুহূর্তে একটা নিতান্ত লঘু আঘাতে ভেঙে পড়ল। দেবতার অসন্তোষ ভিন্ন এমন ধরনের একটা অনর্থ ঘটতেই পারে না। কী অপরাধ হ’ল? কোথায় ব্যত্যয় ঘটেছে, কী অনাচার প্রবেশ করেছে রাজ্যে?
উৎসব-মুখব নগরী একটা দারুণ অমঙ্গলে আশঙ্কায় একেবারে নিথর নিস্পন্দ হয়ে পড়ল। রাত্রে রাজসভায় মন্ত্রী ও অমাত্যবৃন্দ উপস্থিত হয়ে বিচারে বসলেন।
ত্রুটি-বিচ্যুতির ত কোথাও কিছুই হয় নি। সমস্ত রাজপরিবার, সমস্ত পুরোহিত-সেবায়েৎ মণ্ডলী অভিষেকের জন্য এক সপ্তাহ ধরে শুদ্ধাচারে ব্রতচারণ করে আসছেন, বৈদিকে অখণ্ড বেদাধ্যয়নে নিরত। দান-ধ্যানাদি পুণ্যানুষ্ঠান অব্যাহত গতিতেই সংসাধিত হয়ে এসেছে।
অন্য কোনবিধ অপরাধ কি অনুষ্ঠিত হয়েছে নগরী মধ্যে এই অভিষেক সপ্তাহে?—চৌর্য, দস্যুবৃত্তি, ব্যাভিচার?
নগর-কোটাল এর উত্তর দিলেন।—নগরী উৎসবে মত্ত থাকলে দুবৃত্তেরা যে নিজ নিজ ব্যবসায়ে সক্রিয় হয়ে উঠবে এটা স্বাভাবিক জেনে তিনি তাঁর অনুচরবর্গ নিয়ে সবিশেষ সতর্ক ছিলেন। একেবারে যে কিছু হয়নি, এটা বললে একটা মিথ্যা দম্ভ করা হবে। সূত্রপাত হয়েছিল, কিন্তু লঘু অপরাধেও কয়েকটা অতিগুরু দণ্ড দিয়ে সেটা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া হয়, তারপর আর অশোভন কিছু ঘটবার অবসর পায়নি।
অন্য কোন রকম প্রত্যবায়? অস্পৃশ্য চণ্ডালাদি ঘটিত কোন রকম অনাচার?
নগর-কোটালই দিলেন এর উত্তর।—অস্পৃশ্য চণ্ডালাদির দেহ-সৃষ্ট বায়ু যাতে মন্দির অশুচি না করে সেদিকেও তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর তৎপরতা ছিল। নগরের প্রান্তে যেখানে তাদের পল্লী, অভিষেক পক্ষের জন্য, সেখান থেকে আরও ক্রোশ দূরে তৃণাচ্ছাদিত নূতন আবাসস্থলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নগর-কোটাল একটু চুপ করলেন, তারপর কণ্ঠে ক্রোধের আভাস দিয়ে বললেন—“তা সত্ত্বেও একটু অনাচারের সুত্রপাত হয় মহারাজ; ডাহুক নামে এক চণ্ডাল, বেশ পরিবর্তন করে প্রচ্ছন্নভাবে রাজকবি রচিত ভগবান আনন্দ-নটের অভিনয় দেখছিল। ধরা পড়ে যায়। তারও সমুচিত দণ্ডই দেওয়া হয়েছে, তার পক্ষে মৃত্যুর চেয়েও গুরুদণ্ড।
প্রত্যাসন্ন অনিষ্টের আশঙ্কায় সমস্ত নগরী মুর্ছিত-প্রায় হয়ে পড়ে রইল। বিনিদ্র রজনীর শেষাংশে লঘু তন্দ্রার ঘোরে রাজা এক স্বপ্ন দেখলেন; অদ্ভুত সে স্বপ্ন। প্রভাতে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজাদেশে সভা আহূত হ’ল। মন্ত্রী, নগর-কোটাল ও অমাত্যগণ সমবেত হলে রাজা সর্বসমক্ষে আপনার অদ্ভুত স্বপ্নকাহিনী বর্ণনা করলেন—
ভগবান আনন্দ-নট এসে দাঁড়িয়েছেন তার নট-মুর্তিতে, ভাস্কর পুরন্দর ঠিক যেমনটি করে তোয়ের করেছেন…হঠাৎ কোথা থেকে যেন দেবসভার বাদ্য-সঙ্গীতের সঙ্গে মৃদঙ্গের বোল উঠল…সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ-নটের নৃত্য হ’ল শুরু…তারপর রাগতালের সঙ্গে নৃত্যচ্ছন্দ যখন চরমে বিকশিত, দশদিক প্লাবিত করে আর সব অনুভূতিকে ভাসিয়ে যখন একটি অবিচ্ছিন্ন আনন্দের অনুভূতিই রয়েছে জেগে, হঠাৎ একটা দারুণ অনর্থ; মৃদঙ্গের বোল গেল স্তব্ধ হয়ে, কে যেন কঠিন অস্ত্রাঘাতে তার চর্মাবরণ ছিন্ন করে দিয়েছে; সমস্ত সঙ্গীত গেল থেমে, এবং সবচেয়ে যা বড় অনর্থ, নৃত্যপর আনন্দ-নট ছিন্নবাহু পাষাণ-পুত্তলি হয়েই গেলেন স্থাণু হয়ে।…এর পর আরও যা বিস্ময়কর, আনন্দ-নট আর নেই, তার স্থানে তিনিই রূপান্তরিত হয়ে যেন একটি শিশুতে পরিণত হয়েছেন; নিরানন্দ, নিষ্প্রভ একটি শিশু, আকুলঅসহায়! পৃথিবীর সব আনন্দ যেন তার সুকুমার দৃষ্টি থেকে এক মুহূর্তে নিবে গিয়ে তাকে বিস্মিত বিমুঢ় করে দিয়েছে।
কাহিনী শ্রবণ করে সভা স্তব্ধ হয়ে রইল। একটু পরে নগর-কোটাল ভঙ্গ করলেন সে স্তব্ধতা, প্রশ্ন করলেন—“মহারাজ, শিশুটি কি ধরণের যদি জানতে পেতাম…”
—“সেও এক অদ্ভুত ব্যাপার!”—রাজা বলে চললেন, “দেবতা রূপান্তরিত হলেন সে কোন আর্য-শিশুতে নয়। কষ্টিপাথরেরই মতন কৃষ্ণবর্ণ এক অনার্য শিশু, একেবারেই নগ্ন, বেশভূষাহীন, শুধু কণ্ঠে সূত্রধৃত একটি ব্যাঘ্র-নখ তার ব্যাধ বা চণ্ডালত্ব সূচিত করছে, আর কটিদেশ ঘেরে রক্ত-কুঁচের মেখলা…”
নগর-কোটালের ললাটে স্বেদবিন্দু জমে উঠেছে! আবেগে তনু ঈষৎ কম্পিত, করজোড়ে নিবেদন করলেন—“মহারাজ, আমি চিনেছি এই দেব-শিশুকে।”
সমস্ত সভা বিস্মিত দৃষ্টি তুলে নগর-কোটালের মুখের উপর নিবদ্ধ করল। তিনি বলে যেতে লাগলেন—
“ছদ্মবেশী চণ্ডাল ডাহুকের কথা গোচর করেছি মহারাজের; কিন্তু কিভাবে সে ধৃত হয় তা অপ্রয়োজন বোধে মহারাজকে বলা হয় নি। ডাহুকের ছদ্মবেশ এতই কৌশলপূর্ণ ছিল যে, তাকে সেই প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে কোন মতেই আবিষ্কার করা যেত না যদি—তখন যা আনন্দ-নটের করুণা বলে মনে করেছিলাম—তার নিদর্শন পেতাম…”
“সে কিরকম?” প্রশ্ন করলেন রাজা।
“ছদ্মবেশী ডাহুক তার শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে অভিনয় দেখছিল, অবশ্য নিজের মতো তাকেও ছদ্মবেশে আবৃত করে। সে ছদ্মবেশকে ভেদ করা সম্ভব ছিল না, কিন্তু শিশুর কণ্ঠকাকলিকে ত আবৃত করা যায় না। আনন্দ-নট রঙ্গমঞ্চে এসে যখন নৃত্যে বিভোর হয়ে উঠেছেন, শিশু হঠাৎ উল্লাসে করতালি দিয়ে তার অস্ফুট আধ-আধ-ভাষায় চিৎকার করে উঠল। চণ্ডালদের ভাষা, বিশেষ করে উল্লাসের আবেগে তারা যে অনার্য-ভাষা প্রয়োগ করে তা সম্পূর্ণ পৃথক। ডাহুক শিশুপুত্রসহ ধরা পড়ে গেল।”
“অতঃপর?”
“মহারাজের আদেশে অভিষেক-পক্ষে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ, তাই অন্যবিধ এক কঠিনতম দণ্ড তাকে দেওয়া হয়েছে মহারাজ। যে-পুত্রের জন্য সে নগরীর বাতাস কলুষিত করে দেবানুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটাল, বৎসরাবধি কাল সে এবং তার পরিবারভুক্ত সকলে তার দর্শন থেকে বঞ্চিত থাকবে। শিশুকে রাজ্যের অন্যত্র এক চণ্ডালপরিবারের তত্ত্বাবধানে রেখে উভয়ই কঠিন প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।…আমি আনন্দ-নটের সন্তোষ বিধানের জন্যই এ-ব্যবস্থা করেছি মহারাজ; কিন্তু দেখছি অজ্ঞানতাবশতঃ আমি অসন্তোষ বিধানই করেছি তার। আমি দণ্ডার্হ, মহারাজ তাঁর সন্তোষকল্পে যে-শাসন দেন আমি নতশিরে তার জন্য প্রস্তুত আছি।”
সভায় মন্ত্রী, অমাত্য, পুরোহিত, বৈদিক, দৈবজ্ঞ প্রভৃতি স্বপ্ন-বিচারে প্রবৃত্ত হলেন।… যিনি সর্বভূতের, আচণ্ডাল-ব্রাহ্মণ সর্বজাতির স্রষ্টা, তার কাছে উচ্চনীচ কোথায়? শিশুর নিষ্কলঙ্ক, শুদ্ধ হৃদয় হ’ল আনন্দের পীঠস্থান, আনন্দময়ের আবাস সেখানেই, তাই চণ্ডাল-শিশুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে তিনি ওভাবে স্বপ্নে প্রকট করলেন নিজেকে; তার আনন্দেই লীন হয়ে তাই না শিশুও নৃত্যোশ্লাসে কণ্ঠকাকলি তুলেছিল।
নূতন দৃষ্টি খুলে গেল সবার। মহারাজ নগর-কোটালকে সম্বোধন করে বললেন—“তুমি দণ্ডনীয় হলে আমরা সকলেও ত দণ্ডনীয়, যুগ যুগ ধরে ভেদাভেদের প্রাচীর তুলে তাঁর আনন্দকেই ত খণ্ডিত, বিঘ্নিত করে এসেছি। এসো, সম-দণ্ডভাগী আমরা সকলেই তার প্রায়শ্চিত্ত করি; মুক্ত হই আমাদের সঞ্চিত কলুষ থেকে।”
রাজাদেশে চণ্ডাল-পল্লীকে আর সব পল্লীর মতোই শ্রীসম্পন্ন ক’রে, সাম্যের সমাদরে তাদের দূর নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা হ’ল।
যতদিন আনন্দ-নটের নূতন বিগ্রহ না সৃষ্ট হয়, ততদিন নগরী থাকবে উৎসব-লীন।
চণ্ডাল ডাহুক-পরিবারের স্থান আপাততঃ হ’ল রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গণে। সেখানে অন্য সব শিশুদের সঙ্গে ক্রীড়ারত ডাহুকের শিশুপুত্রের মুক্তচ্ছন্দ মূর্তি দৃষ্টিপথে রেখে ভাস্কর পুরন্দর শিশুরূপী আনন্দ-নটের মূর্তি গড়ে তুলবেন।