বৃষ্টি এখনও নামেনি। আকাশের যেরকম অবস্থা, যখন নামবে, সৃষ্টি ভাসিয়ে দেবে একেবারে।
সকাল থেকে যে ইলশেগুঁড়ি আরম্ভ হয়েছে, সেই ভাবটা চলছে এখনও। চারিদিক ঝাপসা। সত্যিই মনে হয়, মেঘ যেন গুঁড়ো হয়ে আকাশ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে। খুদে খুদে জলের কণা এক-একবার হাওয়ার ঝাপটায় তোড়ের উপর এসে পড়ছে গায়ে, পুরোপুরি ভিজিয়ে না দিলেও জামাকাপড় স্যাঁতসেঁতে করে দিচ্ছে।
কিনারা থেকে প্রায় তের-চোদ্দ হাত ভিতর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে মাচাটা বাঁধা হয়েছে। যারা মাছ ধরে, ছাতা মাথায় দিয়েই ধরে। তবে নায়েক মশাইয়ের ছেলের শখ, মাচার শেষ দিকটায় একটা ছোট্ট চালা তুলে দেওয়া হয়েছে। নায়েব মশাইয়ের ছেলে হরিবিলাস হুইলের ছিপ পেতে মাছ ধরছে।
মনটা কিন্তু মাছের দিকে পড়ে আছে বলে বোধ হয় না। ইলশেগুঁড়ির কুয়াশায় চারিদিক মুছে একাকার করে দিয়েছে, পিছন দিকে কাছারি বাড়ির একটা সাদা আবছায়া, কুয়াশাটাই যেন জমাট হয়ে উঠেছে; সামনে বিলটা হাত কয়েক পরেই নিশ্চিহ্ন, তবু হরিবিলাসের চোখ দুটো যেন ঘুরে ঘুরে কাকে খুঁজছে। মাঝে মাঝে হঠাৎ চাক হতে ছিপে এক একটা করে টান দিচ্ছে বটে, মাছ কিন্তু তখন টোপ মুখে করে বিলের একেবারে মাঝামাঝি।
অবশেষে মাচাটা একটু দুলে উঠল, ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে শব্দও উঠল গোড়ার দিকে; ফাতনাটা বার কতক গোত্তা দিয়ে আবার ভেসে উঠেছে। ক’ষে টান মারবার মোকা একটা। হরিবিলাস কিন্তু সেদিকে খেয়াল না করে ঘুরে চাইল পিছনে, প্রশ্ন করল, “রাখাল নাকি? এত দেরি হ’ল যে?”
মাচার উপর সাবধানে পা ফেলে ফেলে রাখাল চালাটার নীচে এসে পাশটিতে বসল। বলল, “হয়ে গেল একটু দেরি। বাদুলে মেঘ, শরীরটা আবার একটু খ্যাঁতখ্যাঁত করছে বলছিল। বলে, দাদা, তুমি একটু বস কাছটিতে।”
হরিবিলাস ব্যস্ত হয়ে উঠল। প্রশ্ন করল, “খ্যাঁতখ্যাঁত করছে মানে? জ্বরটর হয় নি ত?”
রাখাল বলল, “না জ্বর নয়। একটু নোনা ধাত ত, বার্ষে লাগলে কেমন যেন একটু এলিয়ে পড়ে ছেলেবেলা থেকেই।”
“এলিয়ে পড়ে, তা চিকিৎসা হয় না কিছু? তোমার দেখছি এসব দিকে বেশ একটু গাফিল আছ।”
“চিকিৎসা আছে, করাও হয় তাই। তা সে ত ওষুধপত্র নয়। গরগরে করে ঝাল মশলা দিয়ে খানকতক মাছের দাগা, কিম্বা গরম গরম মাংসের সুরুয়া একটু; সঙ্গে সঙ্গে চাঙ্গা করে দেয়; নোনা ধাত কিনা। তা মাছ ত দেখছি আপনি গাঁথতে পারেননি একটাও।”
হরিবিলাস ছিপটা টেনে তুলল। বঁড়শি তিনটেই পরিষ্কার। টোপ পরাতে পরাতে বলল, “খাচ্ছে কৈ তেমন জুত করে?”
রাখাল একটু বোকার মত হেসে বলল, “এর চেয়ে আর কত জুত করে খাবে? আসলে টের পেয়েছে শহুরে মানুষ, ওরা টানেই টের পায় কিনা। পড়ত আমার হাতে—”
হরিবিলাসও একটু হাসল; বলল, “ঠাট্টা হচ্ছে?” যেন উপভোগ করছে এইভাবে বলল, “বেশ, হোক।” তারপরেই আবার একটু বেশী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল; বলল, “কিন্তু কখন তোমার হাতের টান বুঝে মাছ আত্মসমর্পণ করবে তার ভরসায় থাকলে চলবে? বর্ষার ভাবটা ত এদিকে বেড়েই যাচ্ছে।…আমি বলছিলাম মাংসের ব্যবস্থাই না হয় করলে হ’ত না একটু?”
“একটা মানুষের জন্যে? পো’টাকও বোধ হয় টানতে পারবে না।”
“কেন, আর খাবার মানুষ নেই? এমন চমৎকার বাদুলে দিন, পাঁঠা বেটারা জন্মেছে কী করতে। হারাধন পাইককে ডেকে নিয়ে এস আমার ঘরে। একটা কচি দেখে কিনে নিয়ে আসুক গাঁ থেকে।”
হুইলে সুতো গোটাতে গোটাতে উঠে পড়ল।
গোড়ার দিক থেকে না বললে সবটুকু পরিষ্কার হবে না। একটু বিশদ করেই বলা ভাল তাহলে।
এক একটা পরীক্ষা দিয়ে ওঠার পর ছেলেরা সময় নিয়ে প্রথমটা যেন একটা সমস্যায় পড়ে যায়। একেবারে অতটা আত্মনিরোধের পর অতখানি মুক্তি, যেন থৈ পেয়ে ওঠে না। তারপর আবার আস্তে আস্তে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে। লক্ষ্য করলে এরও বেশ একটি পদ্ধতি বাঁধা আছে বলে মনে হয়।
ম্যাট্রিক দেওয়ার পর ঝোঁকটা যায় ঘুরে-ফিরে বেড়ানোর দিকে। তার কারণ স্কুলের ঐ টানা কয়েকটা বছর ছেলেদের সবচেয়ে বেশি করে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকতে হয়; সুযোগের অভাব, তার উপর বয়সটাও স্বাধীনতার পরিপন্থী, ম্যাট্রিকের দরজার বাইরে পা দিতেই দিকচক্রটা হঠাৎ যেন বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ে, টানে হাতছানি দিয়ে।
ইণ্টারমিডিয়েটের পর এ-ভাবটা কমে আসে। কলেজের খানিকটা মুক্ত জীবনে অনেকখানি দেখেছে শুনেছে ছেলে; ঠিক ওরকম অজ্ঞ, আদেখ্লো ভাবটা নেই। খানিকটা গাম্ভীর্যও এসেছে জীবনে, মন একটা বিশেষ দিক ধরে এগুতে শিখেছে। সময়টা যে হাতে এল, সেটাকে কতকটা সুপরিকল্পিত ভাবেই কাজে লাগাতে পারছে। কোনও কাজের মত কাজে, কিংবা কোন শখের কাজেই, এমন কি ঘুরে ফিরে বেড়াতেও; শুধু সে-ঘোরাফেরার একটা অনির্দিষ্ট এলোমেলো ভাব নেই আর।
বি. এ. পরীক্ষা যখন দিয়ে উঠল, তখন একটা আমূল পরিবর্তন এসে গেছে জীবনে। এদিককার যা দেখার তা বেশ খানিকটা দেখে শুনে নিয়েছে; খানিকটা পুরনো হয়ে গেছে, তাই জীবনের এদিকটা অনেকখানি সুনির্দিষ্ট সুসংহত। এখন এদিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে ছেলেরা একটা একেবারেই নূতন পথে পা বাড়াবার জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। বয়সটাও ততদিনে হয়ে উঠেছে অনুকূল, মনে রং ধরতে আরম্ভ করেছে; বি. এ. পরীক্ষা দেওয়ার পরের ঢালা অবসরটা ছেলেরা যতটা পারে রোমান্স দিয়ে ভরে দেওয়ার চেষ্টা করে।
হরিবিলাসও করবে বলে ঠিক করল। বাড়িতে চারিদিকের ভিড়ের মধ্যে রোমান্স চর্চা করতে যাওয়ায় পদে পদে প্রতিবন্ধক, হরিবিলাস অন্য পরিবেশ বেছে নিল। ওর বাবা মথুরানাথ জমিদারের নায়েব। সুদূর এক পাড়াগাঁয়ে জমিদারের কাছারি-বাড়ি। সেইখানেই থাকেন; একাই। হরিবিলাস লিখে দিল, পরীক্ষার পড়ার চাপে শরীরটা একটু ভেঙে পড়েছে, দিন কতক গিয়ে থাকতে চায়। মথুরানাথ খুশীই হলেন। এর আগে একবার নিয়ে এসেছিলেন ছেলেকে, সেই স্কুলের যুগে, তারপর এতদিন ধরে আর আতঙ্কটা কাটাতে পারেননি। চিঠি পেয়ে স্টেশনে একটা হাতি পাঠিয়ে দিলেন, হরিবিলাস এসে উপস্থিত হ’ল।
স্কুলের যুগের মনটা যখন অন্যদিকে বিক্ষিপ্ত, তখন জায়গাটা যতই মন্দ মনে হোক, হরিবিলাস দেখল মনের এই পরিবর্তিত অবস্থায় বাছাইটা তার বেশ ভালই হয়েছে। শ্রীপুরের একদিক দিয়ে ইছামতী নদী। একটা বড় বাঁকের পাশে, নদী থেকে একটু সরে একটা খুব বড় বিল। নদীরই পুরনো খাত। তারই ধারে কাছারিবাড়িটা। কাছারি থেকে বেশ খানিকটা সরে শ্রীপুর গ্রাম, পাশে বিল, সামনে নদী। সুবিধামত দুটোই ব্যবহার করে গাঁয়ের লোকে, যার যেটা কাছে কেউ স্নান করে, কেউ জল ভরে নিয়ে যায়, ছেলেরা সাঁতার কাটে, রাখালেরা গোরুর পাল নামিয়ে দেয়, মাঝি জমায় খেয়ার পাড়ি। দুটি জলাশয়কে আশ্রয় করে ছোট্ট গ্রামটি সমস্ত দিন চঞ্চল হয়ে থাকে। পড়ার ভাবনা গিয়ে একটা যে নূতন চিন্তা মনে উঁকি মারছে সেটাকে পক্ষাবৃত করে পুষ্ট করে তুলবার বেশ চমৎকার একটি পরিবেশ।
এর উপর বিধিও হলেন অনুকূল। আসার দিন দুই পরেই এমন একটা ব্যাপার হ’ল, যাতে হরিবিলাসের আর নিছক চিন্তা নিয়েই কাটাতে হ’ল না, একটা নিরেট অবলম্বন পাওয়া গেল রোমান্সের।
কাছারি-বাড়ির উত্তর দিকের অংশটায় মথুরানাথের বাস। এই অংশটার উত্তর দিকের বারান্দায় বসলে বিল, আর পাশে গ্রাম, তার সামনে ইছামতীর বাঁক এক নজরে বেশ খানিকটা দেখা যায়। তাই দেখছিল হরিবিলাস। বিকেল বেলা, রোদটা হলদে হয়ে এসেছে, তারই আভায় বোধ হয় মনের মতো কাউকে গ্রামের কোথাও বসিয়ে বা চলা-ফেরা করিয়ে কোন স্বপ্ন রচনা করছিল। এমন সময় দেখল, বিলের যেখানটা ঘাটের মত ব্যবহার করে গাঁয়ের লোকে, তার খানিকটা উপরে পাকুড় গাছের ভাঙা বাঁধানো চাতালটায় একটি বছর বার-তেরর মেয়ে এসে হাতের কলসীটা নীচে নামিয়ে বসল। একলাই। গাঁয়ের মেয়েরা আসেনি এখনও, একটি যুবতী যে জল নিতে নেমেছিল, ঘড়া ভরে নিয়ে কাঁকালে বসিয়ে ডাঙায় উঠল, পাকুড় গাছের সামনাসামনি এসে মেয়েটির দিকে ঘুরে কী বলল, কী একটা উত্তর হ’ল, তারপর আবার দুলতে দুলতে উঠে গ্রামের দিকে চলে গেল। এ-মেয়েটি বসেই রইল। নীচে থেকে খড়-কুটো কী একটা খুঁটে নিয়ে অলসভাবে দাঁতে কাটতে লাগল, আর গা দুলিয়ে দুলিয়ে চাতালে গোড়ালি দুটো ঠুকতে লাগল, মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে গ্রামের দিকে চেয়ে দেখছে।
কিছুক্ষণ গেল, তারপরেই হঠাৎ মেয়েটি চাতাল থেকে পিছলে নেমে পড়ে কলসীটা দু’হাতে চেপে ধরে কতকটা যেন রোখের সঙ্গেই উপরের দিকে চেয়ে রইল। কারণটা সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গেল। একটি ছেলে তীরের ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে হনহন করে নেমে আসছে। চালু মুখে গতিবেগ আরও বেড়েছে। এসেই কলসীটা চেপে ধরল। একটু কাড়াকাড়ি পড়ে গেল কলসীটা নিয়ে। ছেলেটিই অবশ্য জিতল, বিলে নেমে কলসীটা ভরে নিয়ে ডান হাতে কানাটা ধরে উপরে উঠে গেল। তারপর অদৃশ্যও হয়ে গেল। বেশ খানিকটা দূরে; মনে হ’ল পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে ভেংচি কাটল, তারপর হেলতে-দুলতে ভারী চালে যেন মুখটা গোঁজ করেই উঠে গেল।
সেদিন যতক্ষণ পর্যন্ত সন্ধ্যার আলো একটুও আকাশে লেগে রইল, হরিবিলাস একভাবে এক জায়গায় রইল বসে। এক কলসী জলেই একটা গৃহস্থের প্রয়োজন মিটে যায় কখনও?
বিলের তীর যখন অন্ধকারে মিশে গেছে, গ্রামের শেষ কলসীটি হয়ে গেছে ভরা, তখন একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল হরিবিলাস।
দীর্ঘনিঃশ্বাস এই জন্য যে, এক কলসীতেই মিটে গেছে গৃহস্থের প্রয়োজন, নয় ত যার সন্ধানে এত কষ্ট করে আসা শ্রীপুরে, তাকে ত পেয়েই গেছে হরিবিলাস।
ছেলেটিকে চেনে। আলাপ নেই। তবে দু’দিন যে এসেছে, দু’দিনই সকালে কাছারিবাড়িতে দেখেছে। তার পরদিনও দেখল। একটা কৌতুহল জেগেছে বলে বেশ ভাল ভাবেই দেখল লক্ষ্য করে। ছেলেটির বয়স বছর পনরো-ষোল হবে। হরিবিলাসের ঠিক সমবয়সী বলা যায় না, তবে খুব বেশী ছোটও নয় ওর চেয়ে। বেশ সুশ্রী; পাড়াগেঁয়ে ছেলের একটা অবহেলার ভাব আছে দেহে-পরিচ্ছদে, তবে তার মধ্যে দিয়েও রংটা যেন আভা দিয়ে ফুটে বেরুচ্ছে। গায়ে একটা আধময়লা মোটা তাঁতের কাপড়ের কুর্তা, তার নীচের দিকে একটা ময়লা পৈতের খানিকটা বেরিয়ে থাকতে দেখে হরিবিলাস বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠল।
ছেলেটি গাঁয়ের দিক থেকে বিলের ধারে ধারে এসে কাছারিবাড়ির দিকে চলে গেল। হরিবিলাস উপরের বারান্দা থেকে দেখছিল। কখন আবার বেরয়, তার প্রতীক্ষায় চুপ করে বসে রইল।
প্রায় ঘণ্টা দুই ঠাঁয় বসে থাকতে হ’ল—তারপর কাছারি থেকে ছেলেটিকে বেরুতে দেখে হরিবিলাস আস্তে আস্তে নেমে এল।
নেমে এল এমন আন্দাজ করে যাতে ছেলেটি একটু এগিয়ে যায়, তারপর পিছন থেকে ডাক দিল, “এই যে, শুনুন।”
ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি; প্রশ্ন করল, “আমায় ডাকছেন?”
হরিবিলাসের যেন ভুল ভাঙল একটা, বলল, “ও, আপনি?…না, আমি মনে করেছিলাম বুঝি ইয়ে—”
ছেলেটি একটু অপ্রতিভভাবে হেসে বলল, “না, আমার নাম রাখাল।”
যেন অন্যমনস্কভাবেই এগিয়ে গেল হরিবিলাস। বলল, “ও, আপনার নাম রাখাল? নতুন এসেছি কিনা, গোলমাল হয়ে যায়। নামেও গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। নাম, পদবী। শহরের দিকে একটু অন্যরকম ত।”
যেন অন্যমনস্ক হয়ে পায়চারি করতে করতেই এগলো। ছেলেটি দাঁড়িয়ে পড়েছিল, সেও পা বাড়াল। বলল, “পদবী ত একই, নামগুলোই যা সেকেলে। রাখাল নামটা দেখুন না, আজকের?”
একটু বোকার মত হাসল। হরিবিলাসও নেহাত অজ্ঞের মতই প্রশ্ন করল, “পদবী সব শহরের মতনই বুঝি?…আপনি ত দেখছি ব্রাহ্মণ।”
“হ্যাঁ, আমাদের পদবী চাটুজ্যে।”
“তাই নাকি?” খুবই আশ্চর্য হয়ে ঘুরে চাইল হরিবিলাস। বলল, “ওদিককারই মতন দেখছি ত। আমরা হচ্ছি বাঁড়ুজ্যে।”
“জানি। তাই ত বলছিলাম, পদবী সব এক।…তা, আমায় ‘আপনি’ বলছেন কেন? কত ছোট আপনার চেয়ে…”
হরিবিলাস একটু হাসল। বলল, “তা বলতে পার। ওটা একটা শহুরে অব্যেস। তোমার বাড়ি এই গ্রামেই নাকি?”
“হ্যাঁ, এই ত বিলের পাশ দিয়ে পাশ দিয়ে গিয়ে…বিলের উপরই…ঐ যে জোড়া নারকোল গাছ দেখা যাচ্ছে—”
“ও! ঐখেনটায়?…তাহলে কালকে বিকেল বেলায় যে মনে হচ্ছিল তোমারই মতন কে একটি ছেলে”…
ছেলেটি হঠাৎ লজ্জিত হয়ে গিয়ে ওর মুখের দিকে চোখ তুলেই ঘাড়টা আবার নিচু করল।
আর ওকথা নিয়ে না এগুনোই উচিত; কিন্তু আর লোভ কি ছাড়া যায়? হরিবিলাস প্রশ্ন করল, “তুমিই ছিলে তা’হলে?
তারপর সামান্য একটু বিরতি দিয়ে বলল, “আর যেন মনে হ’ল একটি মেয়েও। অনেকখানি দূর থেকে দেখা ত, মনে হ’ল সাত-আট বছরের একটি মেয়ে যেন।”
কলসী কাড়াকাড়ির কথাটা আর তুলল না। বলল, “আমি যখন দেখলাম বই পড়তে পড়তে একটু বাইরে বেরিয়ে এসেছি—দেখলাম তুমি কলসীটা হাতে ঝুলিয়ে ওপরে উঠছ। একটি যেন সাত-আট বছরের মেয়ে তোমার পেছনে পেছনে যাচ্ছে।…বোন নিশ্চয়?”
ছেলেটি যেন নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে শুনছিল, অপ্রতিভ ভাবটা একটু লেগে থাকলেও কলসী কাড়াকাড়ির দিকটা বাদ পড়ায় বেশ নিশ্চিন্ত হয়েই একটু হেসে মাথা দুলিয়ে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
তারপর একটা যেন কী ভেবে নিয়ে বলল, “অত ছোট কোথায়?”
“তা হবে। দূর থেকে দেখা ত। তার ওপর নজরও যায় না বেশী দূর, এই দেখ না চশমা নিতে হয়েছে। ভাই বোনে বুঝি পিঠোপিঠি?”
রাখাল আবার একটু হেসে ঘাড় নাড়ল।
“তাই দেখছিলাম…”
পিঠোপিঠি ভাই-বোনের কলসী কাড়াকাড়ির মধুর দৃশ্যটির কথা বলে ফেলতে যাচ্ছিল হরিবিলাস; হঠাৎ সংবিৎ হ’ল—আরও লজ্জায় পড়ে যাবে। কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “তোমাদের বাবা আছেন নিশ্চয়।”
রাখাল ঘাড়টা বেঁকিয়ে জানাল, আছেন।
“কী করেন?”
“পণ্ডিত। বাড়িতেই লোয়ার প্রাইমারি পাঠশালা আছে।”
“বাঃ, তাহলে বিদ্যেচর্চা নিয়েই থাকেন। ছেলেমেয়ে সবাই পড়ে নিশ্চয় এক সঙ্গে?”
রাখাল মাথা দুলিয়ে জানাল, হ্যাঁ।
একটু সময় নিতে হ’ল হরিবিলাসকে, তারপর প্রশ্ন করল, “বাড়ির ছেলেমেয়েরাও ত পড়ে?”
“আমি আর পড়ি না। পড়তাম আগে।”
হরিবিলাসের একটু ঠাট্টা করবার লোভ হ’ল। বলল, “তুমি ত লায়েক হয়ে গেছ।…ইয়ে তোমার বোন পড়ে ত?”
“ওত পড়ায়…প্রথম দ্বিতীয় ভাগের ছেলেমেয়েদের।”
বেশ একটু গর্বের সঙ্গেই কথাটা বলে রাখাল দৃষ্টিটা নত করল।
ঠাট্টার মধ্যে আরও একজনকে টেনে আনবার লোভটা সংবরণ করতে পারল না হরিবিলাস; বেশ একটু শিউরে উঠেই বলল, “আরে, বিদুষী যে একেবারে!…তারপর? ঘরের কাজও ত সামলাতে হয় একটু একটু?”
“মা দেন না বেশী করতে। ছেলেমানুষই ত? শরীরও খুব ভাল নয়, ভোগে মাঝে মাঝে।
অনেক কথা আছে, অথচ যেন হাতড়ে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার একটু ভাবল হরিবিলাস, তারপর মনে পড়ে গেল ভাল কথাই। একটু আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল, “ছেলেমানুষ… হ্যাঁ, ছেলেমানুষই বৈকি…তা এদিকে ত পেকে গেছে…মাষ্টারি করছে…ছেলেমানুষের মতন খেলার দিকে ঝোঁক-টোক আছে, না, তাও শেষ হয়ে গেছে?…খেলনা-টেলনার শখ? মানে, একেবারে বুড়িয়ে যাওয়া ত ভাল নয় এই বয়সে?”
“পুতুল-টুতুল খেলে। নিজেই গড়ে নেয়।”
“তাদের বিয়ে-টিয়েও দেয় ত? দাদার নেমন্তন্ন হয়?”
আবার হেসে একটু ঠাট্টা। রাখাল হাসল। হঠাৎ কেমন নিজের কাছেই একটু লজ্জিত হয়ে পড়ল হরিবিলাস। ও-প্রসঙ্গটা ছেড়ে দিল। প্রশ্ন করল, “তা হ্যাঁ, ইয়ে, বোন ত গুরুমশাইগিরি করে, তুমি নিজে কী কর? কাছারিবাড়িতে রোজ কী করতে আস? কাজ-টাজ কিছু যদি চাও ত বাবাকে না হয় বলে দেখি। বামুনের ছেলে…”
রাখাল মাথাটা একটু নিচু করে নিয়ে বলল, “কাজই শিখতে আসি।”
“বাঃ! তবে ত ভালই। কার কাছে—কেউ আত্মীয় আছেন?”
“হ্যা।”
“কে?…কাকা?”
রাখাল মাথাটা নিচু করেই বলল, “হ্যাঁ।”
“বাঃ, বেশ! কী কাজ করেন তিনি?”
“খাজাঞ্চি।”
“ভাল কাজ। শেখ। আমি বাবাকেও বলে দোব। বেশ ত?”
রাখাল লজ্জিতভাবে ঘাড়টা নাড়ল। তারপর ঘাড়টা তুলে একটু চকিত হয়েই বলল, “এসে গেলাম বাড়ি। আসুন না, আসবেন?”
হরিবিলাসও চকিত হয়ে উঠল। বলল, “না, না, আসব’খন। আসব না কেন? তবে আজ আর নয়, একটা হাতের কাজ ফেলে এসেছি।”
বেশ হঠাৎই ঘুরে পা বাড়াল, তারপর আবার ফিরে ডাকল, “শোন।”
রাখাল এগিয়ে আসতে বলল, “কথা হচ্ছে…ইয়ে, সেই ছেলেটি, যাকে তুমি ভেবে ভুল করছিলাম, তোমাদের পাড়াগেঁয়ে নাম আমার মনে থাকে না বাপু, তা সে ক’দিন থেকে না আসতে বড় একলা পড়ে গেছি। তুমি না হয় আসবে, যে-কটা দিন আছি। সঙ্গী পাই তাহলে। খাজাঞ্চিবাবুকে তাহলে বলে দেব।…আরে কাজ ত পালাচ্ছে না।”
রাখাল হেসে ঘাড় কাত করল।
খাজাঞ্চিবাবু নিজেই কথাটা পাড়লেন তার পরদিন।—“রাখাল বলছিল, বড় একলা পড়ে গেছেন, চান যে একটু কাছে কাছে থাকে! তা থাকবে, তার হয়েছে কি? এমন ভাল সঙ্গ…”
নায়েবের ছেলে, বেশ কৃতার্থ হয়েই বললেন।
হরিবিলাস বলল, “না, সকাল বেলাটা কাজ শিখুক যেমন শিখছে। বিশেষ করে আপনি যখন শেখাচ্ছেন। বিকেলের দিকটা বড় একলা বোধ হয়; সেই সময়টা যদি আসে…”
ভবিষ্যৎ ভেবে কাকাকেও একটু হাতে রাখা দরকার ত।
মুখে একটু খাতির দেখালেও সকাল-বিকাল সর্বক্ষণই কাছে টেনে রাখল রাখালকে। ছেলেটি বেশ মিষ্টি। এদিকে কতকটা যেন হাঁদা গোছের, তাতে ওর বোনকে নিয়ে আলোচনা করতে বেশ যেন একটা আড়াল পাওয়া যায়, চক্ষুলজ্জাটা আসতে পায় না। আলোচনার মাত্রাটা বেশী হয়ে যাচ্ছে কিনা সেদিকে রাখালের হুঁশ নেই, নিজেই গায়ে পড়ে কখনও কখনও তোলে তার কথা। পাড়াগেঁয়ে ছেলে, ওর বোন ত সে যেন দুনিয়ার সবার বোন, শহুরে ভালবাসা বলে যে একটা আলাদা জিনিস আছে তার যেন কিছুই জানে না, বোঝে না।
হরিবিলাস সুযোগ বুঝে সূত্র ধরিয়েই রেখেছিল, খেলনা দিয়েই আরম্ভ করল। একটু ঘনিষ্ঠতা করতে দিন চারেক গেল, তারপর বেড়িয়ে আসার পর সন্ধ্যায় রাখালকে বাড়ি যেতে না দিয়ে নিজের ঘরেই নিয়ে গেল এবং ঘরটা ভেজিয়ে দিয়ে বাক্স খুলে বেশ কতকগুলি নানারকমের খেলনা বের করল। সেলুলয়েডের, রবারের, কাচের, প্ল্যাসটিকের, টিনের। নানারকমের পুতুল। পাখি, জানোয়ার, চেয়ার টেবিল, পালকি—সব মিলিয়ে গোটা পনরো। রাখালের লুব্ধ বিস্মিত দৃষ্টির দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল, “কার জন্যে বল দিকিন?”
চোখ দুটো বড় বড় করে রাখাল প্রশ্ন করল, “নবর জন্যে?”
মেয়েটির নাম নবদুর্গা।
হরিবিলাস মাথা দোলাতে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, “উঃ কী খুশী যে হবে।”
“পুতুল এত ভালবাসে! এসব ত চোখেও দেখেনি, পাওয়া যায় ত এখানে। উঃ, শুনলে কী ভালবাসবে সে আপনাকে।”
হরিবিলাস একটু শিউরে উঠল।
“আমার নাম কখনও করে। খবরদার!”
তারপর সে-ভাবটা সামলে নিয়ে একটু হেসে বলল, “কী বোকা তুমি? নিজের নাম করবে। দাদা হচ্ছ…বাঃ!”
“হাতে পয়সা কোথায়? আর অল্প ক’টি নয় ত?”
একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল হরিবিলাস। বলল, “তা বটে। অবিশ্যি এর পরে আমার নাম করতে পার, খেতি হবে না। তবে এখন সদ্য সদ্য—”
একটু সচকিত হয়ে প্রশ্ন করল, “হয়েছে! তুমি কাজ শিখছ, মাইনে পাও না?”
রাখাল সঙ্কুচিতভাবে বলল, “শিখছি ত মোটে…”
হরিবিলাস একটু রেগেই উঠল। বলল, “বাঃ, শিখছ, তা একটা হাতখরচ পাবে না? বড় বড় সব কোম্পানীতে অ্যাপ্রেন্টিস নিলেই একটা করে অ্যালাউন্স পায়। তোমরা চাইতেও জান না, পাও-ও না। শিখছ সে ওদের জন্যেই ত। আমি বাবাকে বলব; দিতেই হবে। বাঃ!”
দৃষ্টি উৎফুল্লই হয়ে উঠল রাখালের। কিন্তু সঙ্কুচিত হয়ে বলল, “কিন্তু সে কবে পাব…”
“শিগগিরই পাবে।”
“কিন্তু পাইনি ত এখনও…”
“তুমি একটু বোকা বাপু। হাতখরচ দেওয়ার কথা হচ্ছে, টের পেয়েছ, আহ্লাদ হয়েছে, ধার করেই বোনের জন্যে কিছু খেলনা আনিয়ে দিয়েছ। তাতে বরং আমারই নাম করতে পার, ধার দিয়েছি, আনিয়েও দিয়েছি খেলনা। তবে হ্যাঁ, তোমার বাবা-মা এখন কেউ জানবেন না! লুকিয়ে বের করবে, লুকিয়ে খেলবে।”
তারপর একটু টেনে টেনে যেন কী চিন্তা করে বলল, “পরে সে তখন যদি টের পান, তাতে খেতি হবে না।”
রোমান্স বেশ জমে উঠতে লাগল। এই পাড়াগাঁয়ের এত আনন্দ যে কোথায় ছিল হরিবিলাস বুঝে উঠতে পারে না। এর মাঠঘাট, বিল, নদী, এর যেখানে লোক নেই, সেখানে লোকের গাদাগাদি, সব যেন স্বপ্নময় বলে মনে হচ্ছে। এত মধু যে কোথায় লুকনো ছিল! রাখালকে আরও ভাল লাগছে। একদিন প্রসঙ্গক্রমে বলল, “তোমার নামটা পুরনো বলে তোমার অপছন্দ, কিন্তু আমার ত ভালই লাগে বেশ। ভাল বলেই না এত পুরনো হয়েও আজও চলে আসছে।…তাহলে ত নবদুর্গাও পুরনো, তা বলে কম মিষ্টি?”
মাঠে পথে ঘুরে বেড়ায় রাখালকে নিয়ে, নদীর তীরে নির্জন দেখে বসে। সর্বদাই যে নবদুর্গার কথাই হচ্ছে এমন নয়, তবে অনেকক্ষণ ধরে বাদও থাকে না; বেশী দেরি হলে রাখালই তুলল প্রসঙ্গটা, এমনও হচ্ছে মাঝে মাঝে।
দেখলও বার দুই নবদুর্গাকে। দিবালোকে নয়। যার রোমান্সের একটুও জ্ঞান আছে সে দেখেও না অতি-স্পষ্ট দিবালোকে। বার চারেক বেড়িয়ে ফেরার পথে রাখালকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়ে বার দুই দেখে ফেলল। দেখে ফেলা, সন্ধ্যা যখন গাঢ় হয়ে এসেছে, সন্ধ্যার মতই ঘন কেশরাশি নবদুর্গার দেহখানিকে চারিদিক দিয়ে আচ্ছন্ন করে আস্তে আস্তে গেছে মিলিয়ে। একটি মুহূর্তের চকিত দেখা, কিন্তু সেই মুহূর্ত যা সমস্ত জীবন নিয়ে থাকে ছড়িয়ে।
“শরীর মাঝে মাঝে খারাপ হয়?…সে ত ভাল কথা নয়। একটা ভাল টনিক খাওয়াও, অবিশ্যি নুকিয়ে, পরে তখন টের পেলে ক্ষেতি হবে না।”
“টনিকের সঙ্গে ভাল খাবারেরও ত দরকার।” বোকার মত মুখটা একটু নিচু করে বলেই ফেলে রাখাল।…সে-ব্যবস্থাও হয়, অতি সহজেই। হরিবিলাসের পাড়াগাঁয়ে এসে স্বাস্থ্য ফিরেছে, বেশ ক্ষিধে হয়েছে। এখন প্রায় তিনটে হরিবিলাসের জলখাবার খায় সে। খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের লুচি, ছানাবড়া, সরভাজা রসকরা, রসবড়া যেদিন যেমন সখ হয়।
একটু চতুর হাসির সঙ্গে রাখালের সঙ্গে কথা হয়। হরিবিলাস বলে, “কেন, তুমি ত জলপানি পাচ্ছ এখন, বোনের জন্যে এটা-ওটা ফরমাল দিয়ে নিয়ে যেতে সাধ হয় না? যদি টের পাই কেউ, ত বলবার কী আছে? আমার নাম কর না ত? কেউ জানে না তো যে আমিই পাঠাচ্ছি?”
রাখাল বোকার মত হেসে বলে, “তা কখনও করি?”
একদিন ঐ প্রশ্নের ঐ উত্তর দিতে হঠাৎ একটু বেশীরকম বোকার মত হেসে উঠল রাখাল। হরিবিলাস একটু বিমূঢ়ভাবেই প্রশ্ন করল, “হঠাৎ অত হাসি যে?”
হাসতেই লাগল রাখাল। তারপর হরিবিলাস একটু ধমকের মত দিতে হেসেই বলল, “নাম না করলেও ওর কাছে নুকুনো থাকে নাকি?”
“তার মানে।” বেশ বিস্মিত হয়েই প্রশ্ন করল হরিবিলাস।
“আমায় বোকা বলেন বলুন, কিন্তু দাদা বোকা হলে বোনকেও বোকা হতে হবে নাকি? ধরে ফেলেছে।”
“কবে থেকে গো? কী করে?”
“ভয়ানক চালাক যে। ধরে ফেলেছে অনেকদিনই। সেই যেদিন খেলনাগুলো নিয়ে যাই সেইদিনই। আপনাকে বলিনি, রাগ করবেন আপনি।”
রাগ করবার কোন লক্ষণই না দেখিয়ে হরিবিলাস বলল, “রাগ করব বৈকি। বলতে হয় আমাকে। তাহলে কি আর দিই কিছু? কি বলে জিনিসগুলো পেয়ে?”
“সে শুনলে আপনি আরও রাগ করবেন। ফরমাস করে কত—তা কি আপনাকে বলছি? বলে, আমার দাদার বন্ধু যখন, তখন তিনি আমারও দাদা, কেন দেবেন না?”
রাগই করল হরিবিলাস। কেন এতদিন বলেনি রাখাল? যেমন টের পাওয়ার কথা বলা উচিত ছিল রাখালের, তেমনি আবদার করে চাওয়ার কথাও বলা উচিত ছিল। ছেলেমানুষই ত বেচারী।
অনেক আবদারই করে রেখেছিল নবদুর্গা। সিল্কের রুমাল, এসেন্স, সাবান, খোঁপার শৌখিন ক্লিপ। দাদার যেমন পছন্দ। একে একে সব যোগান হতে লাগল।
তারপর লেখার খাতা, চিঠির প্যাড্, ঝরনা-কলম…
রোমান্স যেন নিজের পথ করে ক্লাইম্যাক্সের দিকে এগিয়ে চলেছে। হরিবিলাস এত সৌভাগ্য কল্পনাও করতে পারেনি কখনও। জোগায়। বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করে, “এসব কী করবে? বিদ্যে ত দ্বিতীয় ভাগ শিশুশিক্ষা পর্যন্ত।
রাখাল আরও বিস্মিত করে তোলে, বোকার মত চতুর হাসি হেসে বলে, “নভেল কিনে দিতে বলেছে।…চেনেন না ত ওকে?”
একদিন নদীর তীরে অনেকক্ষণ বসে থেকে থেকে হরিবিলাস হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “নভেল পড়ে পদ্যটদ্য বুঝতে পারে?”
রাখাল বলল, “জিজ্ঞেস করছিল সে-কথা। দাদা অত বিদ্বান, পদ্য লেখেন না?”
লিখত না হরিবিলাস; ক’দিন থেকে আরম্ভ করেছে। নবদুর্গা শুনছে, ফরমাশ করে করে।
বোকা ভাই, অত বুঝছে না, বেশ একটা পর্দাও রয়েছে। বেশ কৌতুক লাগে হরিবিলাসের। মাঝখানে ভাইকে বসিয়ে দু’দিক থেকে দু’জনের লুকোচুরি খেলা চলছে।
ওদিকেও নজর আছে। হুইলের ছিপ নিয়ে ইলশেগুঁড়ির মধ্যে বসে থাকে। রাখাল বলে, “নোনা ধাত ত, ঝাল-মশলা দিয়ে দুটো মাছের দাগা পেটে গেলে ঠিক হয়ে যাবে। কিম্বা একটু গরম গরম মাংসের সুরুয়া!” তাড়াতাড়ি সুরুয়ারই ব্যবস্থা হচ্ছে।
রোমান্সটাকে যতদূর সম্ভব ক্লাইম্যাক্সের কাছাকাছি এনে রেখে একদিন আবার শহরে ফিরে গেল। রাখাল বলল, “বড় মুশড়ে পড়বে নবদুর্গা।” আরও নানারকম মনভোলানো জিনিসপত্র দিয়ে গেল হরিবিলাস।
নিজেও কি কম মুশড়ে পড়েছে? আর বিলম্ব করল না। বাড়িতে জানিয়ে দিল, অমুক গ্রামে, অমুক পণ্ডিতের মেয়ে, এই নাম বিয়ে করতে হয় ত তাকেই বিয়ে করবে।
এতদিনে মত হয়েছে তার উপর পাশটাও করেছে সদ্য সদ্য, মা, পিসী, ভাজ সবাই উৎসাহ করে লিখে দিল হরিবিলাসের বাপকে। চিঠি এল, অমুক পণ্ডিতের কোন মেয়ে নেই ত। অমুক নাম সে তাঁর পুত্রবধুর, খাজাঞ্চি শ্রীনাথ বাঁড়ুজ্যের মেয়ে। হরিবিলাস বোধ হয় অন্য কারুর মেয়ের সঙ্গে গোলমাল করে ফেলে থাকবে। খোঁজ নিচ্ছেন তিনি।
পাড়াগাঁ সম্বন্ধে আতঙ্কটা আবার চতুর্গুণ হয়ে ফিরে এসেছে হরিবিলাসের।
সেখানে ভেড়ার চামড়া গায়ে দিয়ে রাখালের মত নেকড়ের দল ঘুরে বেড়ায়!!