আনন্দ-নট

কালো বাজার

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

অদ্ভুত একটা চঞ্চলতা পড়ে গেছে ছেলেমেয়েগুলোর ভেতর; এই যারা আট-নয় বছরের মধ্যে। পাকা চুল তুলে দেওয়া, পায়ে হাত বুলানো, কি পিঠে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য যাদের ডাক পড়ে; এই ক’রে যারা দু’পয়সা রোজগার করে।

দু’দিন পরে জেঠামশাই আসছেন।

রোজগার কিছু কিছু প্রতিদিনই আছে অবশ্য, দাদু রয়েছেন, দিদিমণি রয়েছেন; যারা অত বড় নন, তাদেরও মাথায় খুঁজে-পেতে দেখলে পাওয়া যায় দু’চার গাছা করে পাকা চুল; তা ছাড়া পায়ে হাত বুলোন, পিঠে সুড়সুড়ি দেওয়া আছে, কিন্তু সে যা আয় তাতে জুত হয় না। ভাগ বসাবে অনেকগুলি। এদিকে দাদুর মাথায় একটা রুটির মত টাকই মাঝখানে। দিদিমণির পাকা চুল বেড়ে যাচ্ছে বলে টাকের ভয়ে কমই তোলান আজকাল। হাত বুলোনি, সুড়সুড়ি দেওয়ার দিকেই ঝুঁকেছেন বেশী। ওতে পয়সা নেই তেমন। পাকা চুলের একটা হিসাব আছে—দাদু দেন বারোটায় এক পয়সা, দিদিমণি দেন ষোলটায়। আর সবাইও তাই; হিসাবের জিনিস, গুণিয়ে দিলে এসে যায় দাম। সুড়সুড়ি কি পায়ে হাত বুলোনোয় মুশকিল হচ্ছে, কখন ঘুমিয়ে পড়েন, এতবার সুড়সুড়ি দিয়েছি, কি এতবার হাত বুলিয়েছি, সেটা চোখের সামনে ধরে দেওয়ার কিছু থাকে না। বাড়িয়েই বলতে হয়; বাড়িয়ে বলছে মনে করে ওঁরা কমিয়েই হিসাব করেন। বিশেষ কিছু থাকে না হাতে। এ দুটোর রেটও কম; দাদু, দিদিমণি, অন্য কেউ—সব কুড়িবারে এক পয়সা। আবার বেগার খাটাও আছে; কেন না, “অন্য কেউ”-এর মধ্যে দাদারা আসে না। বলে—পুণ্যি উপার্জন করছিস, আবার পয়সা কি? বরং বেশী করে দে, দু’হাতে পুণ্যি লুটে যা।”

বাইরে থেকে কেউ এলে সে দেয় ভালো। পিসে-মশাই, কি মামাদের কেউ, কি মেসো-মশাই—এঁরা এলে সুবিধেই হয়, তবে কারুরই চুল পাকা নয়, সুড়সুড়ি কি হাত বুলোন থেকে যা পাওয়া যায়। তা পাওয়া যায় ভালই। অনেক দিন পরে পরে আসেন, কে পড়ায় ফাঁকি দিলে, কে কি দুষ্টুমি করে ফেললে, সেসব দিকে নজর থাকে না ত, কাজেই দয়া-মায়া থাকে একটা। রেটও ভাল দেন, তা ভিন্ন একটু যদি বাড়িয়েই বলা যায় ত মিছিমিছি মিথ্যেবাদী বলে কমিয়ে দেন না।

জ্যেঠামশাই এলেন একেবার অনেক দিন পরে। এমনিসেমনি অনেক দিন নয়। আজমীঢ় থাকেন, সে অনেক দূর। এতদিন পরে এলেন যে টুনী, বাটুল দেখেই নি; হীরু দেখেছিল তবে মনে নেই। সে তখন মাত্র দেড় বছরের। মনে আছে শুধু রত্নার, তার বয়স তখন তিন বছর। জেঠামশাই মানেই ত কাঁচা-পাকা চুল, কিন্তু তখন পাকা চুল তোলা হ’ত না। রত্নার মনে আছে কোলে করে নিয়ে খুব বেড়াতেন, খেলনা, বাঁশি কিনে দিতেন। এতদিন পরে এখন ত আরও ভাল করে জ্যেঠামশাই হয়েছেন, পাকা চুল আরও বেড়েছেই নিশ্চয়। যে অমনিই আদর করে খেলনা-বাঁশি কিনে দেয়, পাকা চুল তুলে দিলে, পায়ে হাত বুলোলে, পিঠে সুড়সুড়ি দিলে সে যে কত কিই না দেবে ওরা ভেবে পাচ্ছে না।…সে খোঁজও নিয়েছে ভাল করে সবার কাছে; না জেঠামশাইয়ের টাক নেই মাথায়; একেবারেই নেই।

দুটো দিন যে কী করে কাটল ওদের তা শুধু ওরাই জানে। যতই জেঠামশাইয়ের গল্প শোনে সবার কাছে, ততই ছটফটানি যায় বেড়ে, কবে আসবেন, কখন আসবেন। তারপর মাঝখান থেকে আর এক দুশ্চিন্তা, যেদিন আসবেন সেই দিন হঠাৎ এক টেলিগ্রাম এসে হাজির—জ্যোঠামশাই প্রয়াগে নেমে একদিন কাটিয়ে আসবেন। সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল—সর্বনাশ প্রয়াগ মানেই যে একেবারে মুড়োনো মাথা। দাদু এই ত সেবারে বড় পিসেমশাইয়ের সঙ্গে গিয়ে মুড়িয়ে এলেন, দু’জনেই। তারপর এই ত সেদিন সবাই গেল এক সঙ্গে—জগুর ঠাকুরমা আর পিসীমা, হারানের মা আর জ্যেঠাই, সনাতনের বড়দিদি, ফটিকের খুড়িমা, ফিরে এল যেন এক ঝুড়ি বেল; একজনেরও মাথায় একগাছি চুল নেই। জ্যেঠামশাই আবার এমন সর্বনেশে জায়গায় নামতে গেলেন কেন? কি হবে, কি দেখতে হবে, যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে আরও একটা দিন কাটাল সবাই। তার পরদিন সকালবেলায় জ্যেঠামশাই এসে উপস্থিত হলেন। বাঁচল সবাই। না, প্রয়াগের ফাঁড়া কাটিয়ে এসেছেন, এক মাথা চুল। একটু অসুবিধে, কিছু বোধ হয় বাদ যাবে, কানের কাছে আর ঘাড়ের কাছেরগুলো বড্ড ছোট; তাহলেও বাকি যা থাকে, তাতে বেশ দু’পয়সা আসবে সবার হাতে। তবে একটা মুশকিল হয়েছে; জেঠামশাই যেন বড় কি রকম। বেশ মোটাসোটা, মুখখানা টকটকে লাল আর এত বড়। কাছে যেতে যেন সাহসই হচ্ছে না। ভেবেছিল মামাদের বেলায় যেমন হয়, ডেকে নেন কাছে, তারও ত কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর মুখে একটুও হাসি নেই। এসে বড় ঘরটায় বসে গল্প করছেন সবার সঙ্গে—দাদু, দিদিমণি, কাকা, দাদারা; এরা চারজন হাঁ করে রয়েছে কখন একটা হাসির কথা হবে, জ্যেঠামশাই হাসবেন একটু, তা যদিবা হ’ল দু’বার; সবাই হাসল, কেউ একটু বেশি, কেউ একটু কম, জ্যোঠামশাইয়ের মুখ কিন্তু সেই এক রকম। এ-জ্যেঠামশাইয়ের অত পাকা চুল তাহলে আর কি কাজে লাগবে, কেউ ভেবে উঠতে পারছে না।

এমন সময় এক ব্যাপার হ’ল।

কাছে ত আসতে ভরসা হচ্ছে না। হীরু, টুনী, বাঁটুল, রত্না দূরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল আর ভাবছিল কি করে কি হবে;—হীরু আর টুনী দোরগোড়ায়। বাটুল আর রত্না জানলার ধারে, জ্যেঠামশাই গল্প করতে করতে একবার ওদের দিকে চেয়ে দাদাদের বললেন—“তা ওরা ওরকম ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন বাইরে বাইরে? বৌমা ডেকে নিয়ে খাবার দিন না হাতে।”

সেজকাকা বললেন—“থামো, খাবারের ভাবনাই যেন বড় ওদের কাছে, ওরা এখন যা হিসেব নিয়ে পড়েছে।”

জ্যোঠামশাই হা করে চেয়ে বললেন—“কিসের হিসেব?”

ছোট কাকা বললেন—“তুমি যে মস্ত বড় এক বেসাতি নিয়ে এসেছ মাথায় করে। দেখছ না, কি করে চেয়ে আছে সব। ওদের নাকি এখন খাবারের কথা ভাববার সময় আছে।”

জেঠামশাই মাথায় হাত দিয়ে বললেন—“বেসতি কি এনেছি? পাঞ্জাবীদের মতন পাগড়ি বাঁধতে হয়, তাও ত সেখানেই রেখে এসেছি।”

ছোটকাকা বললেন-—“অনেক চুল পাকিয়ে এসেছ যে, পাগড়ি বেঁধে বড়দা। কি রকম লাভের ব্যবসা টের পাওনি ত এখনও। বারোটা তুলে দিলে এক পয়সা। নেহাত দাঁড়িয়ে নেই চুপ করে কেউ, মাথার কোনখানটায় কি রকম মাল রয়েছে…”

অত গম্ভীর ত জ্যেঠামশাই, হঠাৎ এত জোরে হেসে উঠলেন যে, সবাই যেন চমকে উঠল। হাসি আর থামতেই চায় না, ওদিককার বাজে গল্প থেমে গেল। ওদের সবাইকে ডাকলেন। ততক্ষণে লজ্জায় পড়ে ওরা ত লুকিয়ে পড়েছে, দাদারা গিয়ে ধরে নিয়ে এল এক-এক করে।

কী চমৎকার যে জেঠামশাই! প্রকাণ্ড কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে একসঙ্গে চারজনকেই আদর করতে লাগলেন।… “আমি কোনটিকে দেখে গিয়েছিলাম সেবার?…এইটিই ত সেই রত্না না?…কোলে কোলে থাকত।…হ্যাঁগো মা, তা তুমিই ত বুড়ী হয়ে গেছ, আমাকেই পাকা চুল তুলে দিতে হবে যে তোমার।” আবার সেই রকম করে হেসে ওঠেন।…“আর কাকে দেখে গিয়েছিলাম?”…

ছোটকাকা বলেন—“ঐ যে, হীরু, যখন গেলে তুমি তখন মাত্র দেড় বছরেরটি ত।”…হাত দিয়ে মাথাটা একটু ঠেলে ধরে জ্যেঠামশাই চোখ বড় বড় করে বললেন—“আরে, এই নাকি সেই হীরুবাবু?—দেড় বছরের থেকে এমন করে চুপি চুপি সাত বছরের হয়ে গেলে কি করে চিনব? আমি বেচারী ত এক বছরও বাড়তে পারি নি।”…আবার হেসে উঠে ছোটকাকার দিকে চেয়ে জিগ্যেস করলেন—“পেরেছি বাড়তে?”…রত্না ত বড় হয়েছে, এত হাসি দেখে সাহসও গেছে বেড়ে, খুব চালাক হতে ইচ্ছে হয়ে বলে দিল—“মোটা ত হয়েছেন আপনি।”…সবাই একেবারে হো-হো করে হেসে উঠল। জ্যেঠামশাই ত মনে হ’ল যত হাসি পেটের মধ্যে এতক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিলেন, সবগুলোকে একসঙ্গে ছেড়ে দিলেন। দিদিমণি কেউ কাউকে মোটা বললে রেগে যান, তার ওপর জ্যেঠামশাই তাঁর ছেলে, কিন্তু ধমক দিতে গিয়ে তিনিও একটু হেসে ফেললেন। টুনী-বাটুলের কথাও জিগ্যেস করে ঐ রকম মজার কথা বলে বলে হাসলেন জ্যেঠামশাই, আরও সবাই হাসল, তারপর পকেট থেকে চারটে টাকা বের করে সবার হাতে একটা একটা করে দিয়ে বললেন—“এই নাও, আমি বাপু দাদন দিয়ে রাখছি, খেয়ে দেয়ে যেই গিয়ে বিছানায় শোব, সবাই আসবে পাকা চুল তুলতে, হাত বুলিয়ে দিতে। যাও, বৌমার কাছে খাবার রয়েছে, খাওগে।”

চমৎকার মানুষ জ্যেঠামশাই, এত আদর ওরা জন্মে আর কারুর কাছে পায় নি। আর, সব রেটও বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেক—পাকা চুল চারটে তুলতে পারলেই এক পয়সা, গায়ে সুড়সুড়ি আর পায়ে হাত বুলোন আটবারেই এক পয়সা। একদিনেই যে টাকাটা জেঠামশাই দিয়েছিলেন সেটা শোধ হয়ে গেল। কত রাত জেগে এসেছেন, তার ওপর খুব ভাল বলে ওরা সবাই খুব যত্ন করে সেবা করল, পাকা চুল তুলে দিল, একটুর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন, কিন্তু সত্যি এত ভাল যে ওরা যখন বলল এতবার করে হাত বুলিয়েছে, সুড়সুড়ি দিয়েছে, এতগুলি করে পাকা চুল তুলে দিয়েছে, একবারও তিনি দাদু, দিদিমণি কি কাকাদের মত বললেন না যে, তোরা মোটে এতবার দিয়ে, এত বেশি করে বলছিস্। ছোটদার কাছে ওরা সবাই হিসেবটা করিয়ে নিলে—এত পাকা চুল, এতবার করে সুড়সুড়ি, এতবার হাত বুলুনো, এত করে রেট্; একটাকা শোধ। জ্যেঠামশাই উঠলে ওরা সবাই দেখাল শ্লেটটা, দেখে একটু হাসলেন, তারপর বললেন—“বেশ, আবার কাল দুপুরে।”

বেশ রোজগার হ’ত, তবে ছোটদা শত্রুতা করল। ছোটদা বলে ও হিসেব করে দেবে, তার জন্যে জনা-পিছু ওকে আট আনা করে দিতে হবে। ওরা চার আনা করে দিলে; নৈলে আর থাকে কি ওদের? ছোটদা জেঠামশাইকে বলে দিলে—দাদু, দিদিমণি কাকারা সবাই পাকা চুল গুণিয়ে নেন; সুড়সুড়ি, হাত বুলেনি যতবার বলবে তার থেকে দশটায় পাঁচটা করে বাদ দেন—এই বাড়ির নিয়ম; জেঠামশাইও যেন তাই করেন, নৈলে ওরা বড় ফাঁকিবাজ, দু’দিনে পকেট খালি করে ছেড়ে দেবে। জ্যেঠামশাই ত সব তাতেই আজকাল হাসেন ঐ রকম করে; বলেছেন—আচ্ছা, সে দেখা যাবে। ওরা আর ছোটদার কাছে হিসেব করাবে না, সেজবৌদি চার আনাতেই রাজী হয়েছে, তার কাছেই করিয়ে নেবে।

সুড়সুড়ি আর হাত বুলোনতেই বেশী পয়সা, সবার ইচ্ছে ঐদিকেই থাকে; কিন্তু মুশকিল হয়েছে অত পা আর অত গা কোথায় জেঠামশাইয়ের? তাই ঠিক হয়েছে দু’জন দু’জন করে থাকবে দু’দিকে। এ দু’জনের পাকা চুলের পালা শেষ হলে, গায়ের দিকে, পায়ের দিকে চলে যাবে; ও দু’জন আসবে চুলের দিকে।

চুলের দিকে আর একটা মুশকিল যে, মাথায় অত পাগড়ি বেঁধেও জেঠামশাই খুব বেশি চুল পাকাতে পারেন নি। তা ভিন্ন দাদুর মত এক রকমের বড় বড় চুল ও ত নয়, কানের কাছে, ঘাড়ের কাছে এত ছোট যে, ধরতেই পারা যায় না ভাল করে। অথচ উপায়ও ত নেই; অমন করে পালা বেঁধে দেওয়া হ’ল—তুলতেই হবে। চুলের দিকটা নিয়ে সবাইকে যেন একটু মনমরা করে দিয়েছে। ভাবছে সবাই।

আরও ভাবনার কথা হয়েছে, জেঠামশাই রেট্ খুব ভাল দিচ্ছেন, হিসেবের ওপরও একবার একটু হেসে চোখ বুলিয়ে নিয়ে তখুনি যা হোক ফেলে দেন, রোজগার ভালোই হচ্ছে, কিন্তু থাকছেন না ত বেশী দিন উনি। শিগগিরই কলকাতায় চলে যাবেন, তারপর ফিরে দুটো দিনও থাকেন কি, না-থাকেন; তারপরেই আবার আজমীঢ়। সামনেই জন্মাষ্টমীর মেলা, জেঠামশাইকে পেয়ে তবু কত মতলব আঁটছে সবাই, কি কি কিনবে, কি করবে; কিন্তু সময় কোথায় আর? খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। বাড়ির অনেকেরও নজর পড়ল। ছোটকাকা প্রশ্ন করল—“হ্যাঁ রে, খাচ্চিস-দাচ্চিস তার ওপর রোজগারও করছিস ভালই, তবু যত ভাবনা যেন তোদরই ওপর এসে পড়েছে, ব্যাপারখানা কি?”

দু’দিন পরে হঠাৎ যেন ভাবটা বদলে গেছে মনে হ’ল। ছোটকাকারই নজরে পড়ল আগে, সবদিকে তাঁর নজরটাই ত একটু বেশী থাকে। সন্ধান নিয়ে টের পেলেন যে, সবার আয় হঠাৎ বেড়ে গেছে। ছোট ভাইপোকে ডেকে বললেন—“ওরে একটু খোঁজ নিয়ে দেখ ত ব্যাপার কি? এমনি ত বড়দাকে যেমন খুশি ঠকাচ্ছে, তার ওপর আবার হঠাৎ আয় বাড়িয়ে ফেলল কি করে?”

বাপ অডিটার, ছোট ভাই বলল—“সেজবৌদি ওদের হিসেব করে দেন দাদা, অডিট করে দেখব?”

অডিট করে কিছুই পাত্তা পাওয়া গেল না। যেতও না পাওয়া, কারুর ট্রেড সিক্রেট বের করে নেওয়া ত সোজা কথা নয়। তারপর কিন্তু একদিন আপনিই সমস্তটা বেরিয়ে পড়ল।

— সেই পুরনো ইতিহাস, যা নিত্য ঘটছে বাঙালীর ব্যবসায়। নিজেদের মধ্যে অনৈক্য। কার ভাগে একটু বেশী পড়ছে তাই নিয়ে ঈর্ষা, অন্তর্দাহ, তাই থেকেই এ-ওর কেচ্চা ছড়াতে আরম্ভ করলে, সব কথা পড়ল বেরিয়ে, কোম্পানী ও গেল রসাতলে।

আয়টা সর্বপ্রথম বাড়িয়ে ফেলল রত্নাই; সব চেয়ে বড়, আগে তার মাথাই ত খুলবে। একটি দিনের হিসেবে দু’গুণ আয় করে নিল একেবারে, তাও হাত বুলনো বা সুড়সুড়িতে নয়, পাকা চুল গুণিয়ে দিয়ে।

রহস্যটা ধরতে পারল আগে হীরু, দিদির পরে ত ওই। তক্কে তক্কে থেকে রহস্যটা বের করল; কিন্তু একেবারে নকল না করে সেই পথেই একটা মৌলিক উপায়ে সেও দু’দিন পরে আয়টা প্রায় আড়াই গুণ করে নিলে। টুনীর আরও একটা দিন লাগল, তবে সে যা উপায় বের করল তাতে প্রায় তিনগুণ টেনে নিয়ে গেল। চার-পাঁচ গুণ ও স্বচ্ছন্দে করে ফেলতে পারত, অত সুবিধা সত্ত্বেও যে করল না, তার জন্য তার আত্মসংযমের প্রশংসাই করতে হয়।

কথাটা বেরুল প্রথমে রতেনার মুখ দিয়েই। দু’জনে ছোট অথচ দু’জনেই হঠাৎ বাড়িয়ে নিলে আয় তার চেয়ে, লেগেছে ত মনে। তার ওপর বোধ হয় লেনদেনের কথাও কিছু তুলেছিল, ওরা রাজী হয়নি।

চারজনে সেবা করছে, জ্যোঠামশাই পাশ ফিরে শুয়ে একটা বই পড়ছেন। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন পড়তে পড়তে। অন্যদিকে ওরা গল্প করে, মাঝে মাঝে তাকেও টানে, আজ কিন্তু যেন অন্যরকম ভাব। কি যেন ইশারা বিনিময় হচ্ছে তিনজনের মধ্যে; মাথা নাড়ানাড়ি শাসান, আঙুল উঁচানো। একবার ফিসফিসিনিও কানে গেল—“বলে দিই?”

রত্নাই জিগ্যেস করছে। হীরু সেই রকম ফিসফিসিনিতেই বেপরোয়াভাবে উত্তর করল—“দাও গে।…ইশ।”

বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। একটু চুপচাপ গেল। তারপর আবার—“তোমার কথাও।”

রত্নাই শাসাচ্ছে, এবার টুনীকে। বইয়ের আড়াল থেকে দেখা গেল টুনী ঠোঁট দুটো জড়ো করে মাথাটা দুলিয়ে দিল, বেপরোয়া ভাবেই। আবার একটু চুপচাপ গেল।

রত্না পায়ে হাত বুলাচ্ছিল, হাতটা আরও খুব মোলায়েম করে দিল, বেশ লম্বা লম্বা গোটাকতক টান, তারপর আরম্ভ করল—“জেঠামশাই, ঘুমিয়ে পড়লেন?”

“না মা, কিছু বলবে?”

বইয়ের আড়াল থেকে সন্তর্পণে দেখা গেল হীরুর ওপর আবার তীর্যক গিয়ে পড়েছে। হীরুও আবার বেপরোয়াভাবেই ফিরিয়ে দিল দৃষ্টিটা।

“বলছিলাম জ্যেঠামশাই—এই, আপনাকে ভালোমানুষ পেয়ে ঠকাচ্ছে হীরু।” (টুনীর দিকেও দৃষ্টি নিক্ষেপ, সেও ফিরিয়ে দিতে)—“আর টুনীও। ওদের দেবেন না অত করে পয়সা।”

হাসি গুড়গুড়িয়ে উঠছে জেঠামশাইয়ের পেটে। বললেন—“ঠকাবার পদ্ধতিটা কি, না হয় শুনি একবার, তবে ত বুঝব।”

আর একবার সেইরকম দৃষ্টি বিনিময় হ’ল।

“আপনি ভেবেছেন নাকি সবগুলো আপনার চুল? ব’য়ে গেছে। এই দেখুন এই কাঁচি। নিয়ে এসেছি আমি।”

“বুঝলাম না ত; কাঁচি ত কি?”

“ওগুলো সব নাকি আপনার চুল? দিদিমণির চুল বিকেলবেলা বসে বসে তোলে। তারপর কাঁচি দিয়ে আপনার মতন করে কেটে কেটে গুণে দেয়। একটাতে পাঁচটা, ছটা, সাতটা, আটটা যেমন হয়। সেখানেও পয়সা নেয় এখানেও আপনাকে ভালোমানুষ পেয়ে…”

হাসি চাপা কষ্টকর হয়ে পড়েছে জ্যেঠামশাইয়ের। কোন রকমে প্রশ্ন করলেন —“তাই নাকি?”

ওদিকেও যে নালিশ জমছে সেই প্রত্যাশায় কোন রকমে চেপে রেখেছেন হাসিটা।

রত্নাই বলছে—একবার যেন তীর্যক দৃষ্টিতে টুনীকে শেষবারের মতো সতর্ক করে দিয়ে—

“আর টুনীই কম নাকি—ঐটুকু দেখতে হলে কি হয়?”

“ব্যাপারখানা কি?

“আপনি কি ভেড়। জ্যেঠামশাই? আমাদের কতো গুরুজন ত? দাদু, দিদিমণি ছাড়া সবারই গুরুজন। টুনী কম্বল থেকে বেছে বেছে শাদা শাদা ভেড়ার লোমগুলো…”

আর বুঝি পারা যায় না; বুকটা চেপে ধরতে হয়েছে।

টুনীর একটা অগ্নিবর্ষী কটাক্ষ গিয়ে পড়ল রত্নার ওপর। মাথাটাও একটু দুলে গেল। তারপর—

“হ্যা জ্যেতামছাই, তা’বলে আপনি কি গোরু? বলুন না।”

ভালো করে জিভের আড়ও ভাঙে নি।

শরীরটা দুলে উঠছে, তবু কোনরকমে বইয়ে মুখটা ঢেকে প্রশ্নটুকু করতে পারলেন জ্যোঠামশাই—“কেন গা মা?”

“ওগুলো আপনার ঘাড়ের চুল মনে করেছেন নাকি? ধবলীর পিত থেকে আঁচলে আঁচলে নিয়ে আসে দিদি…”

— দুই বোনে কুদ্ধ দৃষ্টি বিনিময়ও হয়ে যায়। টুনী নাকমুখ একটু সিটকে নিয়ে বলে—“ইশ, ছবাই যেন জ্যেতামছাইয়ের মতন বোকা!”