একটা ছোটখাট আলাদা বাড়ি হ’লেই ছিল ভালো, কিন্তু তা পাওয়া গেল না। অগত্যা এই ব্যবস্থাই করতে হ’ল।
একটা মাঝারি গোছের একতলা বাড়ি; এক পাশে টানা পাঁচিল দিয়ে তারই ছোট ছোট দুটো ঘর, খানিকটা রক আর খানিকটা উঠোন আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, একজনের বেশ চলে যায়। বিদেশে চাকরী করতে আসা, আত্মীয়-স্বজন না থাক, একটি পরিবারের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকাও একটা ভরসার কথা। অফিসের লোকের কাছে, আর খানিকটা এদিক-ওদিকেও খবর নিয়ে জানল, পরিবারটি ভদ্র।
নতুন চাকরী নিয়ে এখানে এসেছে সরোজ। পরিচয়াদি হয়নি এখনও। দশটা-পাঁচটা অফিস করে, সকালে কিছু অফিসের ফাইল, বিকালে একটু ঘুরে আসা, তারপর বাকি সময়টা বই। রান্নার পাট অফিসের পিওনের হাতে; সেরে-সুরে সরোজের সঙ্গেই অফিসে চলে যায়, আবার সঙ্গেই আসে। একটা ছোকরা চাকর এনেছে বাড়ি থেকে, চলে গেলে বাড়িতে থাকে, তারপর পাশে ত লোক রয়েছেই।
মন্দ লাগছে না একরকম। বাড়ির জন্য মনটা মাঝে মাঝে বিমর্ষ হয়ে পড়ে একটু, কিন্তু উপায়ই বা কি? এ তবু একটা পরিবারের সঙ্গে এক ছাতের নীচে রয়েছে, জীবনের নিত্য-স্রোতের একটি মৃদু কলধ্বনি নিয়ত এসে কানে পৌঁচচ্ছে, আলাদা হয়ে থাকলে সে ত আরও হ’ত দুঃসহ।
কেটে যায় একরকম, শুধু এক-একদিন বিকাল-বেলাটা বড় কষ্টকর হয়ে উঠে। বর্ষাকাল। সকালে কিম্বা রাত্রে বৃষ্টি নামলে মন্দ লাগে না। সকালে থাকে অফিসের কাজ একটু-আধটু, রাত্রে থাকে বই; নিজেকে নিয়ে বেশ নিবিড় হয়ে বসা যায়। বিকালে কিছু থাকে না হাতে; বই পড়বার সময়ই নয়, অফিস থেকে সদ্য ফিরে আর ফাইলের দিকে চাইতেই ইচ্ছা করে না! বৃষ্টি নামলে পাশের বাড়ির কলধ্বনিও যায় লুপ্ত হয়ে; নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ, নিরুপায় বলে মনে হয় তখন।
এখানে আসবার সপ্তাহখানেক পরে একটি বিকালের কথা। দিনটা আবার রবিবার। অফিসটুকুও নেই, একমাত্র নিজেকে নেড়ে-চেড়ে আর কত বৈচিত্র আনা যায়? বিকালটির দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়েছিল, আজ বেশ বড় করে একটা চক্কোর দিয়ে আসবে; তারপর রোদটা নরম হয়ে আসতে বেরিয়ে পড়বার জন্য পাঞ্জাবি আর ছড়িটা আলনা থেকে পেড়ে নিতে যাবে, জানলা দিয়ে নজর পড়ল পশ্চিম আকাশে তুমুল সমারোহ। মনটা কেমন যেন অপ্রসন্ন আর বিদ্রোহী হয়ে উঠল—যেন অলক্ষ্যে কার একটা অহেতুক বিরূপতা। সরোজেরও জিদ দাঁড়িয়ে গেল একটা, বেরুবেই।
আর একবার মেঘের দিকে চেয়ে নিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসাবেই পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে নিল, তারপর ছাতাটা নিতে যাবে এমন সময় হঠাৎ একটা বেড়াল সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে এক দৌড়ে উঠান পেরিয়ে রক ডিঙিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং চকিতে একটু এদিক-ওদিক দেখেই টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠে গুটিয়ে-সুটিয়ে দরজার দিকে ফিরে বসল।
চমৎকার বেড়ালটি, দেখে মনে হয় কাবুলী, মোটা-সোটা গায়ে সাদা-কালোর বড় বড় ছোপে লম্বা লম্বা চুল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
যেমন নির্ভয়ে এসেছে, বোধ হয় গায়ে হাত বুলাতেও দেবে। হাত বাড়াতে গেছে এমন সময় আর একটি দৃশ্য! একটি বছর দশেকের ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠানে এসে পড়ল এবং চকিতদৃষ্টিতে একবার চারিদিকে দেখে নিয়ে—“তবে রে শয়তানী!”—বলে বেড়ালটির মতনই এক লাফে রক পেরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে তাকে পাঁজিয়ে ধরল, বলল—“এইবার!”
সরোজের সঙ্গে কোন কথা নেই, নিয়ে ঘুরে বেরিয়েই যাচ্ছিল, সরোজ প্রশ্ন করল—“তোমাদের বেড়াল?”
কথা যখন কইল তখন একনাগাড়ে অনেকখানিই কয়ে গেল ছেলেটি—“হ্যাঁ, দিদিমণির বেড়াল। দেখুন না, যত আগলে আগলে রাখছি সবাই মিলে—আপনি নোতুন ভাড়াটে, জ্বালাতন করবে ত—তা ক্রমাগত পালিয়ে আসবার ফিকির। কেন জানেন ত? এ বাড়িতে কাকীমার কাছে বড় আস্কারা পেত যে! আপনার আগে ওঁরাই ছিলেন ত, মহেন্দ্ৰ কাকা, কাকীমা, টুনী আর সতু—খুব ভাব ছিল ওঁদের সঙ্গে, টুনীর সঙ্গে আমার আরও ভাব ছিল।”
জানাই, তবু প্রশ্ন করল সরেজ—“তোমাদের এই পাশের বাড়ি?”
কেন যে অদ্ভুত লাগল প্রশ্নটা, ছেলেটি একটু হেসেই মুখের ওপর চোখ তুলে উত্তর দিল—“তবে আর কোন্ বাড়ি হবে?”
তারপর বাইরের দিকে ত্রস্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল—“যাই, বৃষ্টি এলো বলে।…চ।”
বুকে চেপে আবার ঘুরতেই সরোজ পিঠে হাত দিয়ে রুখে দিল, বলল—“পাশের বাড়ি যখন, তখন আর ভাবনা কিসের? থাকো না একটু।”
কথা দিয়েই আটকে রাখবার জন্যে বলল—“দরকার কি তোমাদের শয়তানীকে আটকে রাখার? আসতে দিও; আমিও বেড়াল খুব ভালবাসি। জ্বালাতন হ’ব না।”
“ভয়ঙ্কর চোর, আপনি জানেন না তাই! উপোস করিয়ে মারবে। দুধ, মাছ যেখানে রাখুন, খুঁজে বের করবেই।…শেকল খুলতে যায়! দিশী বেড়াল নয় ত। কত রকম ফন্দি জানে! শুধু দিদিমণির আদরের। আমরা সবাই ত শয়তানী নাম রেখেছি।”
বলার ভঙ্গিতে সরোজ একটু হেসে ফেলল, বলল—“তা হোক গে, সাবধান থাকব। তোমাদেরও ত উপোস করিয়ে রাখছে না রোজ। আর তুমিও আস না কেন?—কে কে আছে তোমাদের বাড়িতে?”
“আছি আমি, বাবা, মা, দিদিমণি—দিদিমণি কিন্তু…”
হঠাৎ বড় বড় ফোটায় ছড়ছড় করে বৃষ্টি নামল। সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালের ওদিক থেকে একটি মিষ্টি গলায়
“খোকা! পেলে বেড়ালটাকে? তাহলে চলে এসো, বিষ্টি নামল যে, হুঁশ নেই?
খোকা বেড়ালটাকে আবার বুকে চেপে ধরে বলল—“যাই এখন।”
“আবার আসবে।”
“আচ্ছা।”—রক থেকে ঘুরে বলল খোকা।
“বেড়ালটাকেও আটকিয়ো না আর।”
দোরের কাছে চলে গেছে, একটা সুবিধা হ’ল যে কথাটা বেশ চেঁচিয়েই বলতে হ’ল সরোজকে; দেয়ালের এ দিকেই থেকে যাবে না।
“ভয়ানক চোর কিন্তু, তা বলে দিচ্ছি।” মুখ ফিরিয়ে আর একবার সাবধান করে দিয়ে বেরিয়ে গেল খোকা।
বৃষ্টি বেশ জোরেই নামল। নামুক যত জোরে পারে। যতক্ষণ পারে, আজ আর সরোজের একা-একা বোধ হচ্ছে না।
দু’টো দিন আবার শয়তানীর দেখা নেই। খোকারও নয়। এক-একবার মনে হয় চাকরটাকে পাঠিয়ে ডেকে নেয়। কিন্তু মাঝখানে দিদিমণির বেড়াল থেকে কি একটা যে হয়েছে, এত সহজ একটা ব্যাপারেও অলঙ্ঘ্য সঙ্কোচ এসে যায়, হয়ে ওঠে না। সর্বদা যে ঐ দিকেই মনটা পড়ে রয়েছে এমনও নয়, কাজ, অফিস, বিকালে একটু বেড়িয়ে আসে, রাত্রে বই—বাঁধা রুটিন ধরে দিন যাচ্ছিল কেটে। তৃতীয় দিন বিকালে আবার আকাশটা যেন বিরূপ হয়ে উঠল। বেশি নয়, মনে হ’ল যেন পরিষ্কারই হয়ে যাবে, কিন্তু তিনদিন আগেকার স্মৃতিটিকে হঠাৎ এত স্পষ্ট করে দিল যে, সরোজ বেশ একটু দোমনা হয়ে পড়ল।…ডেকেই পাঠাবে না কি ছেলেটিকে? ক্ষতিটা কি? আসে না, ছেলেমানুষের একটা স্বাভাবিক কুণ্ঠা রয়েছে, সেটা ত কাটিয়ে দেওয়াই উচিত, তবু যাহোক একজন কথা কওয়ার সঙ্গী পাওয়া যায়, এই রকম বাদুলে দিনে। আর, এক বাড়িতেই রয়েছে, অথচ শুধু ভাড়া ঠিক করা নিয়ে সেই যে কর্তার সঙ্গে একবার কথা হয়েছিল, তারপর পরিবারটির সঙ্গে বরাবর একটা অপরিচয়ের বাধা থেকে যাবে, এটাও কেমন যেন বোধ হতে লাগল সরোজের। একটু অগ্র-পশ্চাৎ করল, তারপর চাকরটাকে পাঠিয়ে দিল খোকাকে ডেকে আনতে, বলবে একটু কাজ আছে।
পাঠিয়ে একটু উৎকর্ণ ই হয়ে রইল। একটু পরে সেদিনকার সেই কণ্ঠের আওয়াজ—“খোকা তুমি কোথায়?”
ওদিকে কোথা থেকে উত্তর এল—“এই যে!”
“এদিকে এসো!”
এর পর বেশ একটু চাপা গলাই। সরোজ নেহাত রকে বেরিয়ে দেয়ালের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাই শুনতে পেল।
“নোতুন ভাড়াটেবাবু ডেকে পাঠিয়েছেন। যাও, কিন্তু জ্বালাতন করবে না। বাবা এলে বলে দেব তাহলে। আর মেলা বকবে না, বড় বাচাল তুমি।”
খোকা যখন এল, সরোজ তখন ঘরের মধ্যেই একটা কাগজ পড়ছে মনোযোগ দিয়ে।
প্রশ্ন করল—“আমায় কাজের জন্যে ডেকেছেন? কি কাজ?”
“কাজ আর কি?”—হঠাৎ কি রকম মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সরোজের; প্রশ্ন করল—“কি কাজ করতে পার তুমি?”
খোকা কৌতুক-ভরা হাসি-হাসি চোখ দুটো তুলে ধরল, বলল—“বা—রে! ডেকে এখন কি কাজ করতে পারো!”
কথাটা ঘুরিয়ে নিল সরোজ। বলল—“বলছিলাম আসনি কেন? তুমি ও তোমাদের শয়তানীও?”
খোকা চৌকাঠ টপকে ভেতরে চলে এল; একবার বাইরের দিকে ঘুরে চেয়ে নিয়ে আর এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল—“বেঁধে রেখেছিল।”
সরোজও মুখটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল—“তোমায়?”
হেসে ফেলল খোকা। সেই রকম গলায় বলল—“আমায় নয়, শয়তানীকে।” সরোজও আবার সেই রকম গলায় বলল—“খুলে দিও।”
এরকম মনের মতো পরামর্শ আর এভাবে দেওয়ায়, খোকা খুবই অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে; বাইরের দিকে আর একবার দেখে নিয়ে গলাটা আরও নামিয়ে বলল—“দিয়ে এসেছি খুলে। দেখুন না, কোথায় কি আছে একবার ঘরগুলোতে ঘুরে দেখে নেবে, তারপর…”
সরোজের দৃষ্টি অনুকরণ করে উঠানের দিকে চেয়েই—“ঐ এসে গেছে?” বলে আর ফিসফিসিনি নয়; গলা ছেড়েই চেঁচিয়ে উঠল খোকা।
এবার ত তাড়া খেয়ে নয়, লেজটি সোজা করে তুলে শরীর দোলাতে দোলাতে মন্থরগতিতে চলে আসছে শয়তানী, খোকাই লাফিয়ে গিয়ে পাঁজায় করে নিয়ে এল। সরোজের সামনে বাড়িয়ে ধরে বলল—“তুলোর বস্তা। দেখুন না হাত দিয়ে, কিছু বলবে না। কোলক্যাংলা, দিদিমণির কোলে-কোলেই ত ঘোরে।”
হাত বাড়িয়ে নিতেই যাচ্ছিল, তারপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা সঙ্কোচ এসে পড়ায় বিরত হয়ে পিঠের ওপর হাতটা টেনে দিতে একটা ঘড়-ঘড় শব্দ উঠল শয়তানীর বুকের মধ্যে থেকে। খোকা উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল। শব্দটার নকল করে বলল—“ঘড় ঘড়—ওটা কি জানেন? বলছে—তোমার সঙ্গে ভাব হয়ে গেল, এবার খেতে দাও।”
সরোজ বলল—“নৈলে চুরি করব।”
দু’জনেই হেসে উঠল। এমন সময় ওদিক থেকে আবার সেই কণ্ঠে—“খোকা! বেড়ালটা আবার পালিয়েছে, কে খুলে দিলে ওকে?”
সরোজ বলল—“বলে এসো এখানেই আছে, আমি নিয়ে আসব।” নিজেও উঠে পড়ল। রকের ধারে দেয়ালের কাছ থেকে কথাটা বলে যখন ফিরে এল খোকা, দেখে সরোজ একটা ছোট ডেকচি কাত করে দুধ ঢালছে একটা প্লেটে। চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করল—“দুধ দিয়েছেন শয়তানীকে? নিজের খাবার দুধ থেকে?”
“নতুন ভাব হ’ল নয়তো যদি চুরি করে খায় তখন দুধও থাকবে না, ভাব ও থাকবে না, নয় কি?”
শয়তানী অনুমতির অপেক্ষা না করে কোল থেকে নেমে আরম্ভ করে দিয়েছে। খোকা একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছে। সরোজের কথায় শুধু ঠোঁট কুঁচকে একটু হাসল, তারপরে শয়তানীর পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে মাথা নীচু করে তার পরিতৃপ্ত আহার লক্ষ্য করে যেতে লাগল।
অভিভূত হয়ে পড়েছে বলেই ভুলে গিয়েছিল, হঠাৎ মনে পড়ে যেতে সেই রকম অন্তরঙ্গতার সুরে বলল—“এক্ষুণি কি শুনে এলুম দেওয়ালের ওদিকে, বলুন ত?”
“তুমি শুনলে, আমি কি করে বলব?”
খোকা আর একটু গলাটা নামিয়ে নিল।
“মা বলছে—থাক না বাপু, ছেলেটি যদি ভালোবাসে বেড়াল, না জ্বালাতন হয় ত তোর অত মাথাব্যথা কেন? ও বলেছে—আমি আর ঢুকতেই দেব না পোড়ারমুখীকে, দেখি, জ্বালাতন হন কিনা!… শুনলাম আমি, হ্যাঁ?”
“ভালোই ত। তোমাকেও না ঢুকতে দেয় তোমার দিদি, আরো ভালো হয়, আমরা তিনজনে বেশ থাকি, তুমি, আমি আর শয়তানী। কি বলো?”
“উঃ, তাহলে যা মজা হয়!”
চাকরটা একটা বিস্কুটের টিন কাটতে কাটতে উপস্থিত হ’ল। খোকা কতটা উৎফুল্ল, কতকটা বিস্মিত হয়ে উঠল, প্রশ্ন করল—“আবার বিস্কুট ও খাবে?”
সরোজ একটা প্লেটে খান আষ্টেক রেখে ওর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল—“ওকে জিগ্যেস করতে হবে পছন্দ কিনা, তোমায় ত জিগ্যেস করতে হবে না, খাও।”
প্রবল আপত্তি তুলল খোকা, লুব্ধদৃষ্টিতে প্লেটটার দিক থেকে শরীরটাকে একটু পিছিয়ে নিয়ে বলল—“না, কক্ষনো না। আমায় হ্যাংলা বলবে দিদি।”
“তাই জন্যেই ত আরও দিচ্ছি আমি, হ্যাংলা ভাইকেও আর বাড়ি ঢুকতে দেবে না। তিনজনে বেশ থাকব আমরা—আমি, তুমি আর শয়তানী।”
তাই প্রায় দাঁড়াল, যদিও বাড়ি ঢুকতে না দেওয়ার জন্য নয়। আরও দুটো দিন ওদিকে একটু কড়াকড়ি চলল, তারপর যেন এলে গিয়ে রাশ ঢিলে দিয়ে দিল। খোকার তবুও ইস্কুল আছে, তার জন্য পড়াশুনা আছে, শয়তানী ত একেবারে এ-বাড়ির বেড়াল হয়ে গেল। অবশ্য অমনি নয়—আলাদা দুধের ব্যবস্থা হয়েছে, একসঙ্গে ঘন করে জ্বাল দেওয়া। মাছ ত আছেই, মুড়ো থাকলে সেটা শয়তানীর; যদি বাজারেই কোনদিন মাছ না রইল ত চাকরটাকে পাশের ডোবা থেকে পুটুলে ছিপে ধরতে হয় গোটাকতক শয়তানীর জন্য। চা বিস্কুট দু’বেলা।
খোকা চোখ বড় বড় করে—“উস!” করে একটা ঝোলটানা গোছের শব্দ করে বলে—“এত আদর, চা-বিস্কুট! কাকীমার কাছেও এত আদর পাননি কখনও, দিদিমণির কাছেও নয়!”
বেড়ালটাকে মাঝে রেখে দু’বাড়ির মধ্যে অন্য দিক দিয়েও আড়ষ্ট ভাবটা অনেকখানি কেটে এসেছে। মন্তব্য হয় মাঝে মাঝে, এ দিকে পৌঁছায়, ওদিকেও নিশ্চয়ই পৌঁছে দেয় খোকা, একটা সূক্ষ্ম আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়ে বাড়ির দুটো অংশ যেন আস্তে আস্তে এক হয়ে আসছে।
সরোজ প্রসঙ্গটা থামতে দেয় না, বলে—“এমন আর কি আদর দেখলে, একটা পোষা বেড়াল…”
খোকা চোখ দুটো কপালে তুলে বলে—“চা-বিস্কুট। বাস রে!…নবাব একেবারে শয়তানী!…বাদশাজাদী।”
গলাটা খাটো করে নিয়ে মাথাটা দুলিয়ে ফিসফিস করে বলে—“কে বলে জানেন, বাদশাজাদী?”
সরোজ স্বর অনুকরণ করে আন্দাজটা ইচ্ছা করেই উল্টে দিয়ে বলে—“মা নিশ্চয়।”
“বয়ে গেছে মার।”
তারপর এমন রূঢ় মন্তব্য কে করতে পারবে, ঠোঁটের কোণে একটু হাসিতে, চোখের একটু ইশারায় সে সম্বন্ধে যেন মন-জানাজানি হয়ে গেল দু’জনের মধ্যে এইভাবে প্রশ্ন করে—“আর কি বলে বলুন ত?”
“কি করে বলব?”—সকৌতুক হাসির মধ্যে দিয়ে বলে সরোজ।
বলে—“বোকাকে ঠকিয়ে খেয়ে নিতে দে খুব।…বলবেন না কাউকে যেন।”
সরোজ বলে—“অত বোকামি করি? …বোকাকে নিয়ে আর কিছু কথা হয় নাকি?—ভালো-মন্দ?”
“ভালো! সেই পাত্তোর কিনা! নাক সিটকেই আছে ত।” “তবু…”
একবাব বাইরের দিকে চেয়ে নেয় খোকা, যার প্রসঙ্গ চলছে বোধ হয় তার মতো করেই নাকটা সিটকে নেয়, বলে—“ম্যাগগো! বেটাছেলে কোথায় ভালো একটা কুকুর পুষবে—ঘাউ-ঘাউ করে বাড়ি মাতিয়ে ডাকবে, না, মেয়েদের মতন মেনী বেড়াল কোলে মিউমিউ মিউ।…দু’চক্ষের বিষ!”
আড়াআড়িটাও কম উপভোগ্য হয়ে ওঠে না, বিকেলে অফিস থেকে উঠানে পা দিয়েই সরোজ হাঁক দেয়—“খোকা, শয়তানীকে নিযে এসো, চা-বিস্কুট খাওয়ার সময় হয়ে গেছে ওর।”
—নিশ্চয়, একজনের মুখটা কুঞ্চিত হয়ে উঠল; সরোজ একটা দুষ্ট, হাসি ঠোঁটে করে বোধ হয় দেয়ালের দিকে একটু কান পেতেই আস্তে আস্তে গিয়ে ঘরে ওঠে।
অন্য দিকও আছে। ও-বাড়ি থেকে তরকারিটা আসটা আসছেই দু’বেলা। একটা নতুন কিছু হ’ল ত তাও। নতুন কিছু করবার জন্য কি তাগিদও জাগছে দেওয়ালের ওদিকে কারুর মনে?
প্রতিদানে এদিক থেকে কি দেওয়া যায়?
সরোজ প্রশ্ন করে—“খোকা—ইয়ে, বলছিলাম—মা বই-টই পড়েন নাকি?”
খোকা একটু মাথা দুলিয়ে বলে—“পড়েন। এখন মহাভারত পড়ছেন।”
এর পর আসল উদ্দেশ্যটা কি করে প্রকাশ করা যায়, এই চিন্তা করছে সরোজ; খোকা দিদির কথা তুললে যেন গলা খাটো করে নেয়, সেইভাবে বলল—“দিদি জিজ্ঞেস করছিল—খোকা নতুন ভাড়াটে, তোমার সরোজদা বই-টই পড়েন না?”
“তুমি কি বললে?”—একটা অবলম্বন পেয়ে খুব আগ্রহের সঙ্গেই প্রশ্নটা করল সরোজ।
“বললাম, পড়েন ইংরিজী বই, শুনে সেই রকম নাক সিঁটকোয়—ম্যাগগো? বেড়াল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তাঁর আবার ইংরিজী বই না হলে চলবে না। কত দেখব।”
এমনভাবে নাকটা কুঁচকে নকল করে বলে যে, বিরূপ মন্তব্য হলেও একটু হেসে উঠতে হয় সরোজকে। তারপর বলে—“কেন, তুমি আমায় বাংলা বই পড়তে দেখোনি?—দেখোনি নিশ্চয়; বাংলাই বেশী পড়ি আমি, অনেক রাত পর্যন্ত।”
লাইব্রেরীর গ্রাহক হয়েছে। পড়ার শখ আছে, সুতরাং কিছু আনিয়েও নিয়েছে বাংলা বই।
বই মাঝে করে দু’ বাড়ির, কিম্বা আরও ঠিকভাবে বলতে গেলে দু’জনের সম্বন্ধটা আরও নিবিড় হয়ে উঠছে।
কিন্তু ওদিককার ভাবটা সত্যই কি তাই? কেমন একটা অস্বস্তিকর সন্দেহ ওঠে মনে, খোকা যখন নাক তুলে ওদিককার মতটা জানায়—“খোকা নতুন ভাড়াটে তোমার সরোজদার সব ভালো; শুধু বেড়াল ঘাঁটাটা ছাড়তে বোল দিকিনি।…ম্যাগগো! ব্যাটাছেলে হয়ে পারেন কি করে? আমারই গা ঘিনঘিন করে।”
দোমনা হয় এক-একবার। আবার মনকে প্রবোধ দেয়—ওটা নিশ্চয়ই মনের কথা নয়, একটা ভান মেয়েছেলের। যেটা সবচেয়ে বেশী চায় সেইটে নিয়েই সবচেয়ে বেশী নাক সিঁটকায় না?
তা ভিন্ন শয়তানীকে নিয়েই ত সব; এমনই কী চমৎকারটি, তার ওপর একজনের ভালোবাসায়ই ভালোবেসে ফেলেছে সরোজ; সে মুখে যাই বলুক না কেন। ছাড়ে কি করে?
মুড়ো খাওয়ায়, ঘন দুধ, চা-বিস্কুট। বুকে চেপে চেপে ধরে। খোকার সামনেই। চলুক ত তারপর একদিন এর ফয়সালা হয়েই যাবে।
মাসখানেক কেটে গেল। দু’দিন নিমন্ত্রণও খেয়ে এল সরোজ। মা বসে খাওয়ালেন, পরিবেশন করল মেয়ে।
তারপর একদিন ফয়সালাটাও হঠাৎ হয়ে গেল—
একটা ফটো নিচ্ছিল সরোজ। কোথায় একটা বাধা রয়েছে বলে আরও যেন ভালোবেসে ফেলেছে বেড়ালটাকে। দুধের প্লেটের সামনে বসিয়ে একটা পোজ নিয়েছে, আর একটার যোগাড় করছে, খোকা এসে উপস্থিত হ’ল।
“ফটো নিচ্ছ সরোজদা? শয়তানীর?” উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠল।
সরোজ গোটা দুই পোজ তুলে বলল—“এবার তুমি বোস চেয়ারটাতে শয়তানীকে কোলে নিয়ে। বেশ চমৎকার হবে!”
ঠিকঠাক করে দু’তিন রকমে বসিয়ে ফটো তোলা হয়ে গেলে খোকা একেবাবে উৎফুল্ল হয়ে উঠল।
“এবার দিদিমণির কোলে দিয়ে একটা…হ্যাঁ সরোজদা’—নিশ্চয়ই তুলতে হবে—কোন মতেই শুনব না আমি—কোন মতেই না—তুলতেই হবে”
প্রবল বেগে মাথা দোলাতে লাগল, কোন আপত্তিই শুনবে না।
আপত্তি তেমন কিছু করেনি সরোজ, শুধু কিসের ঘোরে যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। একটু হেসে বলল—“সে কি কবে হবে?…ইয়ে, তোমার মা রাজী হবেন?”
“হবেন না। ইশ!—দেখো মার ফটোও তোলাব, শয়তানীকে কোলে করে…!”
ঘোরটা যেন কেটেও কাটতে চাইছে না।…আশা, না দূরাশা?
সরোজ কতকটা দুরাশার নিরুৎসাহ কণ্ঠেই বলল—“তা বেশ, জিজ্ঞেস কর মাকে।”
দেরি সয় আর? খোকা কয়েকটা লাফে বেরিয়ে গেল। সরোজ এগিয়ে গিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। একটু পরে হাততালি দিতে দিতে ছুটে এল খোকা —“রাজী!—রাজী!—রাজী!—রাজী!—রাজী!—রাজী!…”
শুনেছে সরোজ, শুধু যার ফটো তার মুখের দুটো উল্লসিত কথা শুনতে পাবে ভেবেছিল।…সে নিশ্চয়ই সামনে দাঁড়িয়ে পরখ করে দেখছে, কি পোজে ফটোটা তুললে কি রকম দেখতে হবে।
এ ক্যামেরাটা বড় ছোট; ইঞ্চি দুয়েকের একটা ফটো ওঠে। ভালো ক্যামেরাটা বাড়িতে আছে। তা হোক, আর কি খরচের কথা ভাবা যায়? সন্ধ্যার সময়ই বাজারে গিয়ে একটা বেশ ভালো দেখে ক্যামেরা কিনে নিয়ে এল সরোজ।…থাক, একটা বিশেষ প্রয়োজনে একটা বিশেষ দিনে কেনা হয়েছিল; জীবনের একটা বিশেষ সঞ্চয়।
“একটা ভালো ক্যামেরা কিনে আনলাম খোকা, ওটা বড্ড এতটুকু ত… তোলা হবে কবে?”
দু’বাড়িতে একটা যেন সব জানাজানি হয়ে যাচ্ছে কি করে; নূতন ক্যামেরার কথাটা বলতে আজ আর মোটেই সঙ্কোচ হ’ল না সরাজের।… কবে? খোকা ত এখনি হলে আর অন্য দিন চায় না। কিন্তু তা ত আর সম্ভব নয়।
তবে দেরিও হ’ল না। পরদিন সকালেই খোকা এসে হাজির, উঠে প্রথমেই তার সঙ্গে দেখা, সেই তুলল জোরে ধাক্কা দিয়ে। কি করবে, কি বলবে যেন বুঝে উঠতে পারছে না—
“ও সরোজদা—কী পয়মন্ত যে তোমার ক্যামেরা কি বলব। তোল না—কত ফটো তুলবে, কালই টেলিগ্রাম এসে গেছে—ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ত আমি—আজই…এক্ষুণি”…টানা হর্ণ দিয়ে দোরগোড়ায় একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াবার শব্দ হ’ল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল খোকা …“ঐঃ, বললাম না—ট্যাক্সি এসে গেল দিদিমণির ভোঁ—ও—ও—ও…”
শব্দটা মুখে করে হাততালি দিতে দিতে তিন লাফে উঠোন ডিঙিয়ে চলে গেল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত স্বপ্ন নিয়ে জেগে থাকা, ঘুমের জড়িমা এখনও লেগে রয়েছে সরোজের চোখে—ঠিক যেন বোঝা যাচ্ছে না কিছু।
শয়তানী ল্যাজের পতাকা তুলে প্রাতঃকালীন চা খেতে উঠানে এসে ঢুকল।
তারপরেই খোকার সঙ্গে খোকার চেয়েও হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন শয়তানীর মনিব খোকাদের দিদিমণি
“তুই পোড়ারমুখী এখানে! …আয় এদিকে…শুনলাম ভাই তোমার কথা—কী বলে আশীর্বাদ করি? আমি যেখানেই যাই এক ভাবনা—এ করে তীত্থিধম্ম হয়?—দু’চক্ষে দেখতে পাবে না শৈলীটা, কী হ্যানস্তা যে হচ্ছে আমার সুনুব—নামই রেখেছে শয়তানী…এসেই শুনলাম তোমার কথা…নেই তীত্থি-মাহাত্ম্যি?”
গরদের থানপরা, প্রয়াগ থেকে নিশ্চয় সদ্য মাথা মুড়িয়ে এসেছেন সদ্য পুণ্য অর্জন করে।
আর মনে হচ্ছে যেন সমস্ত পুণ্য উজাড় করে ঢেলে দিচ্ছেন সরোজের মাথায়।