রিপোর্ট যা পেয়েছি তা ভুল নয়।
কালীবাড়ির চৌহদ্দিটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ফটক দিয়ে প্রবেশ করেই সামনে একটা প্রশস্ত উঠান, সেটুকু পেরিয়েই একটা কোঠা ঘর, সামনে একটু বারান্দা; মা তাইতেই অধিষ্ঠান করছেন। এই ঘর বা মন্দিরের দু’পাশে খানিকটা করে বাগান, যে সময়ের যা ফুল তার ব্যবস্থা থাকে, কায়েমীভাবে দুটি পঞ্চমুখ রক্তজবার গাছ। এই বরাবর দেখে আসছি। এবারে গিয়ে দেখি, উঠানের এককোণে, চৌহদ্দির দেয়াল ঘেঁষে সত্যই একটি মহাবীরজীর মন্দির উঠেছে; মাত্র বুক পর্যন্ত উঁচু, দরজাটি তদনুরূপ ক্ষুদ্র, বেশ একটু নীচু হয়ে দেখলে বিঘৎ দেড়েকের আগাগোড়া সিঁদুর মাখানো অঞ্জনাননের ছোট্ট মুর্তিটি চোখে পড়ে। রামানুচরকে যথেষ্টই শ্রদ্ধা করি, তবুও, গোপন করার চেষ্টা করব না, মনটা বেশ একটু বিষন্ন হয়ে গেল।
মায়ের মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে আরও ব্যথিত হয়ে উঠল মনটা। হাঁড়িকাঠটা পোঁতা রয়েছে বটে তবে তাতে রক্তের ছিটেফোটাও লেগে নেই কোথাও; সকালে যে চালকুমড়াটা বলি দেওয়া হয়েছিল তার দুটো খণ্ড দু’পাশে আধ-শুকনো হয়ে পড়ে রয়েছে। মূর্তির দিকে চাইতে যেন চোখ ফেটে জল এসে পড়ে; কোথায় ললাটের সেই দম্ভ, চোখের সেই দীপ্তি, বরাভয়ের সেই ঐশ্বর্য? একটা নিস্তেজ করুণভাব যেন আপাদমস্তক সমস্ত অঙ্গখানি ছেয়ে রয়েছে। হাতের সেই বজ্রমুষ্টিও শিথিল, খড়্গ আর দৈত্যমুণ্ড কোন রকমে যেন রয়েছেন ধরে, যেকোন মুহূর্তেই খসে পড়তে পারে।
মূর্তি নিশ্চয় আগেকার মতোই আছে, যা শুনেছি এবং যা দেখেছি তারই ওপর আমার মনের প্রতিক্রিয়ার এমনটা বোধ হচ্ছে, তবুও কোন মতেই সান্ত্বনা পাচ্ছি না। নিজেরাই চেষ্টা করে দু’এক জায়গায় বলি প্রথা তুলে দিয়েছি; কিন্তু সে যেন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মায়ের সঙ্গে একটা রফা করে, মা যেন প্রসন্ন মনে সন্তানের আব্দারে নিজেকে করেছেন বঞ্চনা। এ কিন্তু মনে হচ্ছে একেবারে অন্যরকম ব্যাপার, মায়ের ওপর যেন একটা শাসন, মায়ের অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে, বঞ্চিত করা হয়েছে তাকে, পাছে শাসন-বিধি লঙ্ঘিত হয় সেজন্য ঐ কড়া পাহারার মধ্যে রাখা হয়েছে। নিজেই বন্ধ করিয়েছি কয়েক জায়গায়, কিন্তু এক্ষেত্রে যতই ভাবছি, মনটা ততই যেন বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। এভাবে কেন করা হবে বন্ধ?
মন্দিরের রকে বসে পূজারী-ঠাকুরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, দিবানিদ্রা সেরে তিনি বৈকালের কাছাকাছি এসে উপস্থিত হলেন। অনেক দিন পরে দেখা, কুশলাদি প্রশ্নের পর মন্দির খুলে একখানি কম্বল বের করে বারান্দায় পেতে দিলেন; দু’জনে উপবেশন করলাম। একথা সেকথা নিয়ে গল্প চলতে লাগল আমাদের। বয়োজ্যেষ্ঠ, এদিকে সিদ্ধ তান্ত্রিক বলেই জানি, যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি, এতবড় যে একটা ব্যতিক্রম ঘটল তার বর্তমানেই তার প্রসঙ্গটা কিভাবে তুলব মনে মনে ভাবছিলাম, উনি নিজেই এক সময় প্রশ্ন করলেন—“ঠাকুরবাড়িতে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করলে? অনেকদিন পরে ত এসেছ।”
সুবিধাই হ’ল, একটু হেসেই উত্তর করলাম—“আজ্ঞে হ্যাঁ, লক্ষ্য না করলেও চোখে পড়ে যান যে, যদিও চোখে না পড়বার মতন করেই গুটিয়ে এনেছেন দেহটাকে। যোগসিদ্ধ ত।”
এর পরেই একটু কুণ্ঠিতভাবে প্রশ্নটা করে বসলাম—“কিন্তু যা শুনছি তা কি সত্যি ঠাকুরমশাই?”
একটু হাসলেন, বললেন—“তোমার কানেও গেছে তাহলে?…কথাটা যে সত্যি নয় তার একটা প্রমাণ এই যে নানা আকারে উঠেছে, যার যেরকম খুশি বানিয়ে বলছে। তুমি কি শুনেছ সেটাই না হয় শুনি আগে।”
বললাম আমি যা শুনেছি। মাড়োয়ারী পট্টির শেঠ মংনিরামের সঙ্গে পূজারীঠাকুরের বন্দোবস্ত হয়েছে, সে মন্দিরটা বছর বছর ভালো করে মেরামত করে দিয়ে যাবে, যাতে দেবতার নামডাক আরও ছড়িয়ে পড়ে। পীঠস্থানের মতো আয় হয় তারও চেষ্টা করবে, তার বদলে পাঁঠা বলিটা তুলে দিতে হবে মন্দির থেকে। ঠাকুরদেবতা নিয়ে কারবার, তায় মংনিরাম ব্যবসায়ী মানুষ, সমঝে বুঝে এগুনো অভ্যাস, আপাতত ঠিক হয়েছে এককোণে বৈষ্ণবকুলতিলক মহাবীরের ছোট্ট একটি মন্দির তুলে একটি ছোট্ট মুর্তি প্রতিষ্ঠা করা হবে। যদি দেখা যায় যে, বলি বন্ধ করায় কালীমাঈর বিশেষ আপত্তি নেই, নামডাক ছড়িয়ে পড়ছে, বেশী বেশী করে পুজা পড়ছে, আয় বাড়ছে, তাহলে মংনিরাম এর পর তার মন্দিরটা বড় করিয়ে মিনার কাজ-টাজ করিয়ে পীঠস্থানের উপযোগী করে দেবে। মহাবীরজীর ব্যবস্থাটাও তদনুরূপ উন্নত করা হবে। যদি দেখা গেল কালীমার মনঃপুত নয় নূতন বন্দোবস্তটা, তিনি বলি ছেড়ে দিতে নারাজ, অনিষ্ট হচ্ছে, তাহলে ব্যবস্থাটা নাকচ করে দেওয়া হবে, মহাবীর সরে যাবেন, যথারীতি পাঁঠা এসে পড়বে আবার।
সবটা শুনে পুজারী-ঠাকুর আবার একটু হাসলেন, বললেন—“মংনিরামের কাজ অত কাঁচা নয়, তাহলে শহরের মাঝখানে অমন ফলাও ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারত না। ওর মহাবীরকে এখন ঠাঁইনাড়া করে কার সাধ্যি।”
প্রশ্ন করলাম—“কি রকম?”
“কি রকম গোড়া বেঁধে কাজ দেখছ না? মায়ের যত শক্তি সে তো ঐ ছাগ-মাংস আর ছাগ-রক্ত থেকে, তা সেটাই যখন বন্ধ তখন আর ভয়টা কিসের? মা কালীর বারোটা বেজে গেছে এখানে, এখন ঐ মহাবীরজীরই জয়-জয়কার।”
হাসতে লাগলেন। বললেন—“সবে এসেছ অনেক দিন পরে, মহাবীরের আবির্ভাব নিয়ে অনেক গল্প শুনবে ঐ রকম, একসে এক চটকদার, মাথাটা ত আমাদের খুবই উর্বর।”
একটু চুপ করে থেকে বললেন—“মহাবীর এসেছেন অন্য পথে। অবশ্য মংনিরামেরই হাত ধরে এসেছেন, তবে পথটা মা নিজেই করে দিয়েছেন। আরও মর্মান্তিক কাহিনী।”
কাহিনীটা শুনলাম। পুজারী-ঠাকুর বললেন—“মায়ের পুজো যেমন আর পুজো নেই, শুধু উৎসব-আলো, বাজনা, নাচগান, আবৃত্তি, তারপর ঘটা করে বিসর্জন—তেমনি বলিও আর বিধিমত বলির মধ্যে ছিল না। প্রথমতঃ মংনিরামের দল ওখানেও ঢুকে পড়েছিল। মংনিরামরা যে মাড়োয়ারীই হবে তার মানে কি? বাঙালী হতেই বা বাধা কি? একদিন দেখলাম একটি ছোকরা, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স হবে, পুজো আরম্ভ হওয়ার আগেই একটা পাঁঠার দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথম দু’তিন দিন কিছু বলল না। বলির সময় হলে উচ্ছগু করে দিলাম, নিজেই খাঁড়া ধরে কাটল, তারপর চারটে ঠ্যাং বেঁধে নিয়ে চলে গেল। কেমন যেন ঠেকে একটু। একটা লোক রোজ বলি দিয়ে যাচ্ছে, এ কিরকম উগ্র মানসিক, এ কতদিন চলবে? তারপর একদিন একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল—বলিটা গোড়ার দিকে সেরে নিলে হয় না? অনেক দূর থেকে আসতে হয়। সে কিরকম কথা! বলির একটা সময় আছে, তোমায় দূর থেকে আসতে হয় বলে তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে ঐটেই আগে সেরে নিতে হবে? তখন কথাটা ভাঙল, কোন রকম মানসিকের বলি নয়ত, বাজারে একটা পাঁঠার ষ্টল নিয়েছে। বলি দেওয়া মাংস, চাহিদা বাড়ছে, বোধ হয় শিগগিরই দুটো করে কাটতে হবে, তবে সকালের দিকেই টান মন্তর-টন্তরের অত দরকার নেই; কপাটটা খুলে খাঁড়াটা বের করে দিলে ও নিজেই একটা কোপ বসিয়ে নিয়ে যাবে।
আপত্তি করলাম বৈকি—একি কাণ্ড, বলি, না ব্যভিচার!…তার পরদিন জন চার-পাঁচ এসে উপস্থিত। সব ব্যবসা বিদেশীদের হাতে চলে যাচ্ছে, যখন একতিয়ার রয়েছে আমার, সাহায্য করব না কেন? আর অনুরোধ নয়, হুমকি। দেখে নেবে এমন কালীঠাকুর পাড়ায় কতদিন টেকতে পারেন।”
পূজারী-ঠাকুর মুখের দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। বললেন,—“ঘটাতে সাহস হয় না, যুগ একবারে পালটে গেছে ত। দিলাম কয়েকদিন খাঁড়াটা বের করে। মনের দুঃখ মাকেই জানাই, চারপো কলি এনে ফেলেছ মা, আমার আর দোষ কি? তারপর মা নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিলেন। ওরা ক’জন মিলে লিমিটেড কোম্পানী খুলেছে, বিক্রি বেড়ে গিয়ে একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে তিনটেয় দাঁড়াল, এতদুর থেকে কেটে নিয়ে যেতে বিস্তর অসুবিধে, রিক্সাভাড়াও লেগে যাচ্ছে, ওরা ষ্টলের পেছনেই একটা শ্যামামুর্তি বসিয়ে কাজ সেরে নিতে লাগল।
ও-ফাঁড়াটা এভাবে কেটে গেলেও সমস্যা কিন্তু মিটল না। সর্বনাশটা এই হয়েছে যে, লোকের ভক্তি-নিষ্ঠা এক দিক কমে গিয়ে, এক দিক দিয়ে যেন আরও বেড়েছে। ঠাকুর যখন একজন রয়েছেন তখন পাঁঠাটাকে এমনি জবাই না করে একটা কোপ মেরে নিয়ে আসতে দোষটা কি?—ভাবটা কতকটা যেন এইরকম। ধর্মটা সস্তা হয়ে পড়ে একটা হুজুগে দাঁড়িয়েছে—যখন-তখন বলির পাঁঠা ডাক দিয়ে এসে হাঁড়িকাঠের সামনে দাঁড়াতে লাগল; ফীষ্ট হবে, কি বনভোজন হবে, কি কারুর ছেলের অন্নপ্রাশন—ছোট পাঁঠা, বড় পাঁঠা, শাদা পাঁঠা, কালো পাঁঠা, লাল পাঁঠা—এক রকমারি কাণ্ড। অত দেখি না, মনের দুঃখ মনে চেপে খাঁড়াটা বের করে দিই; একদিন শুনলাম একটা খাঁশির ঘাড়ে কোপ মেরে নিয়ে গেছে। মনে বললাম, আর কত ভোগান্তি লেখা আছে কপালে? ‘জয় মা কালী’ বলে বলি দিয়ে যাচ্ছে, সেটাও ত একটা মহামন্ত্রই।
বলতে পারি না ব্যাপারটা আসলে কি ছিল। তোমরা নিশ্চয় তোমাদের নতুন শাস্ত্রের কথা ধরে থাকবে—মনোবিজ্ঞান কি ঐরকম কিছু একটা; কিন্তু আমরা ত বংশ-পরম্পরায় মায়ের পুজারী, আমাদের বিশ্বাস ত অন্যরকম; বাড়তে বাড়তে ব্যাপারটা যখন একেবারে চরমে এসে ঠেকেছে, একদিন হঠাৎ মায়ের প্রত্যাদেশ হ’ল, মা যেন কত কাতর হয়ে এসে বলছেন—“বাবা নকুলেশ্বর…”
কিন্তু সেটা বলবার আগে, ব্যাপারটা কি হয়েছিল তাই বলি।
শরীরটাও তেমন ভালো ছিল না সেদিন, পূজো হোম সেরে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেল, মন্দিরে তালা দিয়ে যখন বাড়ির ভেতর গেলাম ঘড়িতে টং টং করে বারোটা বাজল। একটু ভোগ মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। প্রায় আধঘণ্টাটাক হয়েছে, তন্দ্রার ঘোর এসেছে চোখে, এমন সময় বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারটি গলায় একসঙ্গে হাঁকাহাঁকি আর তারই মধ্যিখানে থেকে থেকে একটা পাঁঠার ডাক। ছেলেটাকে বললাম —“দেখতো গিয়ে কি ব্যাপার।”
এসে বলল—“বলি দেবে, আপনাকে ডাকছে।”
“তাই দিক এবার বেটারা, আর পারি নে।”—বলে মায়ের উদ্দেশ্যে একটা প্রণাম করে বাইরে এলাম।
জন পাঁচ-ছয় জড়ো হয়েছে, মাঝখানে একটা কালো ছাগল, বোকা হয়ে গেছে, উৎকট গন্ধ ছড়িয়েছে। জিগ্যেস করলাম—“ব্যাপার কি? এই দুপুর রাত্তিরে…”
বলল, দক্ষিণপাড়ার রূপচাঁদ মাইতির বাড়ি থেকে আসছে, পাঁঠাটাকে বলি দিতে হবে।
একবার মনে হ’ল খাঁড়াটা বের করে দিই ঝামেলা মিটিয়ে। কিন্তু অন্যায় হয়ে যায় ত। দিনের বেলা যা হচ্ছে তা ত হচ্ছেই, কি আর করা যাবে? এ একেবারে সমস্ত দিনের পুজো সারা হয়ে যাওয়ার পর মা এখন শয়নে, মন্তর না বললেও একটা ব্যাঘাত হবেই ত; কি করে সাহস করা যায়?
আজকাল এমনই ভয় হয়, তারওপর দল বেঁধে এসেছে বুঝিয়েই কথাটা বললাম।
ওরই মধ্যে বেশি রোগা গোছর একজন সামনে এগিয়ে এল, বললে—“আপনি যে হাসালেন পণ্ডিতমশাই, মা খেয়ে দেয়ে নিশ্চিন্দি হয়ে ঘুমোচ্ছন এসব কথা আর এ যুগে চলে?”
পুজো-পদ্ধতিটা একটু বোঝাবার চেষ্টা করলাম। এমনি ত মা খানও না, নিদ্রাও যান না, তবে, আমাদেরই মনগড়া একটা মেনে নিয়ে ত করতে হয় তার সেবা-আরাধনা; সেটা ভেঙে দেওয়া কি উচিত হয়?
বললে—“তেমনি আর একটা মনগড়া কথা মেনে নিলেই ত নিশ্চিন্দি মশাই,—মায়ের এতগুলি ছেলে ধর্না দিচ্ছে, তিনি কি রে তোরা চাস কি বলে ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন।”
একজন জোগান দিলে—“আপনি মানুষ হয়ে বেরিয়ে এলেন, আর তিনি ত মা-ই, সোজা মা নয়, বিশ্বজননী।”
কি ঠাট্টা করতে কি করে বসবে, ওদিকে যেতে আর প্রবৃত্তি হ’ল না—একটু হেসেই বললাম—“না হয় ছেলেরাই মায়ের কথা ভাবলে একটু।”
অন্য একজন বললে—“এ একটা ন্যায্য কথা বলেছেন। ছিলও উচিত, তবে বড় ঠ্যাকায় পড়েছি যে পুরুতমশাই। মা কি সেটা টের পাচ্ছেন না?”
“ঠ্যাকাটা-কি?”
বললে—“জামাইবাবু এসেছেন।”
খবরটার গুরুত্বটুকু উপলব্ধি করতে পারলাম কিনা দেখবার জন্যে পাঁচ জোড়া চোখ তুলে সবাই মুখের দিকে চেয়ে রইল।
বললাম—“ভালো কথাই। কিন্তু ফীষ্ট সে ত দিনের বেলায়; কাল সকালে এসেই বলি দিয়ে নিয়ে গেলে হবে।”
বিরক্ত হয়ে উঠেছে। সেই রোগা ছেলেটা বলল—“কত আর তর্ক করবি ওর সঙ্গে, ব্যাপারটা কি সব বলে দে না, এতদিন ধরে পুরুতগিরি করছেন, এটুকু আর বুঝতে পারবেন না?”
নিজেই বলে গেল সবটুকু।
কেরানী জামাই নয় পথে-ঘাটে যা আখছার দেখা যাচ্ছে, জামাই ষষ্ঠী দিন রাস্তায় একটা লাঠি চালালে যার পাঁচটা এক সঙ্গে গড়িয়ে পড়ে। মিলিটারি জামাই—কাশ্মীর, বাঙ্গালোর, মীরাট, সেকেন্দ্রাবাদ—কত জায়গায় ঘুরে দু’দিনের জন্যে এসেছে, কেল্লায় রয়েছে, ভোর চারটের সময় আবার রওয়ানা দল নিয়ে, কোথায় তা কেউ বলতে পারে না—মিলিটারি কাণ্ড কারখানা ত। অনেক চেষ্টা করে ঘণ্টা চারেকের ছুটি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি এসেছে, তার এক মিনিট এদিক ওদিক হলে কোর্ট মার্শেল, না, কি একটা বললে। এসেছেও যে জামাই সেটা শ্বশুরবাড়ির টানে বা অন্য কিছুর জন্যে নয়, পাঁঠা খেতেই আনানো হয়েছে তাকে। মিলিটারিতে প্রাণটি হাতে করে কাজ করা তো, বিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওর শাশুড়ী মানৎ করে রেখেছিলেন পাঁঠাটা। তা দু’বছর ত জামাইয়ের দেখা সাক্ষাৎ নেই, কোথায় পুণা, কোথায় বাঙ্গালোর, কোথায় কাশ্মীর—ঘুরে বেড়াচ্ছে, অপেক্ষা করে করে পাঁঠাটা বোকা বনে গেল। ও পাঁঠা এখন মা-কালি ভিন্ন কেউ বরদাস্তও ত করতে পারবে না।
নিরুপায়, তবু একবার শেষ চেষ্টা করলাম, বললাম—“তোমাদের কথাই ধরে বলি, যখন মা ভিন্ন কেউ বরদাস্ত করতে পারবে না ও বোটকা গন্ধ, তখন তোমাদের জামাইবাবুও ত বাদ পড়ে যাচ্ছেন, তাহলে বলিটা…”
শেষ করতে দিলে না, এক পা বাড়িয়ে দিয়ে বললে—“পেঁয়াজ-রসুন কি করতে রয়েছে মশাই? শালা বোকাকে ঢিট করে দেব না। নিন, আপনার কাজ আপনি ত করে দিন।”
অগত্যা আর করি কি? বের করে দিলাম খাঁড়াটা।
তারপর, যা তোমায় বলছিলাম—তোমরা বলবে নিজের মনেই অনাচারটার জন্যে যে ভয়, যে দুশ্চিন্তা, যে মনোকষ্ট এসে জড়ো হয়েছিল সেইগুলোই একটা রূপ ধরে ঐ রকমটা হ’ল। হতেও পারে, কতটুকুই বা আমরা জানতে পাই মা চৈতন্যরূপিণী কি রূপ ধরে কি খেলা খেলছেন, তবে বংশপরম্পরায় যা বিশ্বাস করে আসছি—আমার ত মনে হ’ল মায়েরই প্রত্যাদেশ।
সেই রাত্তিরেই। ঘুম ত আসতে চায় না, তারপর কখন একটু আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি—এলোমেলো নানারকম স্বপ্ন, তারপর মনে হ’ল মা যেন শিয়রের কাছটিতে এসে দাঁড়ালেন। প্রথমে তো চিনতেই পারি না। মুখটা গেছে শুকিয়ে, অমন চুল-ফুলে ফেঁপে ঘেঁটে গিয়ে যেন একশা হয়ে গেছে, অমন যে চোখের জ্যোতি, একেবারে যেন নিবে গেছে; যেন কতদিন ঘুমোন নি মা, টানা টানা দুটি চোখ যেন রাজ্যের ঘুমে এলিয়ে আসছে।
কাতর হয়ে বলছেন—“বাবা নকুলেশ্বর। আর পাঁঠা খাওয়ার শখ নেই, বলিটা উঠিয়ে দে তুই। সব ভুয়োবলি, মন্তর নেই, খেতেও ত পাই না, সে ত চেহারা দেখেই টের পাচ্ছিস, একটু যে নিশ্চিন্দি হয়ে ঘুমোব তারও উপায় রাখলে না এরা।”
বললাম—“তা যেন বন্ধ করলাম মা, আমারও এ অনাচার আর সহ্য হচ্ছে না, কিন্তু এরা সবাই দেবে কেন বন্ধ করতে? কত বড় একটা সুবিধে।”
একটু ভাবলেন যেন মা, তারপর বললেন—“হয়েছে। তুই এক কাজ কর। শেঠ মংনিরাম খুব একটা বড় দাও মেরে চারিদিকে মহাবীরের প্রতিষ্ঠা করে দিচ্ছে। রামানুচর, সে ত আমারই অংশ, শুধু খাওয়ার ব্যাপারেই যা একটু প্রভেদ আছে, তা ওটুকু আমি…”
ছ্যাৎ করে ঘুমটা ভেঙে গেল।
তোমরা বোধ হয় বলবে মংনিরামের কথাটা আসলে আমিই ভাবছিলাম, মন্দিরটা ক’বছর থেকে মেরামৎ হচ্ছে না, এদিকে একটা লোক ধর্মের নামে অমন দাতব্য করে যাচ্ছে চারিদিকে; মনে হবারই কথা ত। অস্বীকার করব না, দু একবার হয়েও ছিল মনে। স্বপ্নটা পেতে একটু দোমনাও হয়ে পড়েছিলাম, তাহলে না হয় পাড়ব একবার কথাটা! কিন্তু আর দ্বারস্থ হতে দিলেন না, নিজেই ব্যবস্থাটুকু করে দিলেন।
ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে সকাল থেকে, মন্দিরে লোক আসেনি। পুজো সেরে মন্দিরে চাবি দিয়ে ভেতরে যাব, একটি ছাতা মাথায় দিয়ে মংনিরাম এসে উপস্থিত। মনের অবস্থাটা আন্দাজ করতেই পার, জিগ্যেস করলাম—“কি খবর শেঠজী? হঠাৎ এ দুর্যোগে?”
বলে—“এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম মাঈকে একটা প্রণাম করে যাই; দুর্যোগ সুযোগ সব ত ওঁরই হাতে।”
দোরটা খুলে দিলাম, প্রণাম করে উঠলে হাতে মার চরণামৃত দিলাম। ভক্তিভরে মাথায় ঠেকিয়ে মুখে দিয়ে একবার চারদিকটায় দেখে নিয়ে বললে—“আহ মায়ের অপার করুণা; কিন্তু নিজের এরকম দশা করে রেখেছেন কেন বঢ়মচারী বাবা?”
বললাম—“আপনি ভক্ত শেঠজী, ওটা ত বুঝতেই পারেন। বিশ্বের মা, ওঁর কি নিজের দিকে চাইলে চলে। সে দেখবে ওর ছেলে, ওর সেবকেরা; তা এ সেবকের অবস্থা ত দেখছেনই না।”
মুখটা একটু নামিয়ে নিয়ে মাথা চুলকাতে লাগল; তারপর আস্তে আস্তে তুললে কথাটা।…তারপর যা হ’ল, শুনেছই, দেখছও চোখে।
বিশ্বাস, নিশ্চিন্ত, তার সঙ্গে বোধ হয় কোথায় একটু যেন দুঃখও,—একটু অদ্ভুতভাবে আমার মুখের দিকে চেয়ে হাসলেন পুরুতমশাই। আমার দৃষ্টিতে নিশ্চয় তখনও শেষ প্রশ্নটা লেগে রয়েছে, বোধ হয় লক্ষ্য করেই একটু সচকিত হয়ে বললেন—
“ও! হ্যাঁ, তুলেছিলাম বৈকি কথাটা, তা সে সমস্যাটা শেঠজী নিজেই মীমাংসা করে দিলে, বললে—’মাই ওটা নিজেই ছেড়ে দেবেন, দেখবেন আপনি বঢ়মচারী বাবা। আবে বজরংবলী মহাবীরজীও ত ঔরই সন্তান; ছেলে চালকলা খেয়েই দিন গুজরান করছে আর আমি মা হয়ে তার সামনেই পাঁঠা খেয়ে যাচ্ছি—একটা চক্ষুলজ্জা ত আছে।”