ছোট একটি শিশুর অভিশাপে সবার কীর্তি একে একে প্রকাশ হয়ে পড়ল।
অভিশাপ বইকি। কি এমন অপরাধ যার ঐরকম সাজা, যার জন্য চার বছরের একটা ছেলেকে অমন চীৎকার করতে করতে ছুটে বেরিয়ে আসতে হ’ল বাড়ির ভেতর থেকে? হ’তে পারে দাদু এসেছে বলে চীৎকারের আরও বাড়াবাড়ি, তবু, বাদসাদ দিলেও যা বাকি থাকে সেটাকেও ত অগ্রাহ্য করা যায় না। এত কিসের রাগ? একে রাগ বলতে হবে, না, চণ্ডাল?
দাদু বাইরের ঘরে ইজি-চেয়ারে বসে সকাল বেলার চা খাচ্ছিলেন, এক হাতে খবরের কাগজ, “কি হ’ল?”—বলে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এগিয়ে এলেন, তাড়াতাড়িতে খানিকটা চা ছল্কে কাগজের ওপর পড়েও গেল। ততক্ষণে মেয়েও এসেছে বেরিয়ে। শ্বশুরবাড়ি, একেবারে বাড়ির মত অত বেপরোয়া না হলেও, বেশ খানিকটা অসংযতই। মাথা থেকে আঁচলটা অনেকখানি নেমে এসেছে, আলগা খোঁপাটা পড়বে ভেঙে, হাতটা তখনও উঁচানো। গলাটা চাপা হলেও বেশ কর্কশ—
“আজ তোকে আর আস্ত রাখব না হতভাগা! তুই যাবি কোথায় পালিয়ে আমার কাছ থেকে?”
বাপ নাতিকে দু’হাতে কোলে চেপে সিঁধে হয়ে দাঁড়ালেন—
“কি হয়েছে?”
“চুরি করে পালিয়ে এসেছে; এখনও ওর হাত দেখো, মুখ দেখো…”
নাতি চীৎকারের মধ্যেই মুখটা দাদুর জামায় ভাল করে ঘষে নিয়ে ওপর দিকে তুলে ধরে বলল—“আমি ঠায় নি…কৈ?”
দাদু মেয়ের দিকেই কড়া চোখে চেয়ে বললেন—“মানলুম খেয়েছে। তাই বলে মেরে ফেলতে হবে?”
বাপের সঙ্গে বাপের বাড়ির আবহাওয়াও খানিকটা এসে গেছে, মেয়ে রাগটাকে আরও মুক্তি দিয়েই বলল—“হ্যাঁ, মেরেই ফেলব ওকে আমি। শাশুড়ী তোমার জন্যে সেই কোথা থেকে ভাল মনোহরা সন্দেশ আনিয়ে রেখেছেন—এখানে কিছু পাওয়া যায় না—তা কখন কি করে সন্ধান পেয়ে তার আদ্দেকগুলো সাবড়ে ফেলেছে। ওকেও আমি শেষ করব, তবে আমার নাম—কতক্ষণ আগলে রাখবে তুমি?”
রাগের মাথায় রাগ বেড়েই যায়। “আয় হতভাগা!” বলে এক পা এগিয়ে আসতে বাপও উঠলেন একেবারে জ্বলে। নাতিকে সামনে চেপে ধরে কুটুমবাড়ির কথা খানিকটা ভুলেই ধমক দিয়ে উঠলেন—“তা নে, আগলাব না, মেরে ফেল। ওর টানে আসা, সেটা বন্ধ হোক এবার।…ছেলে দুটো সন্দেশ খেয়েছে—কান্নার চোটে এক কণা পেটে গেছে কি না-গেছে, তার জন্য তাকে শেষ করে ফেলতে হবে। মা!…বেশ করেছে চুরি করেছে। আরও করবে, এখানে না সুবিধে হয় সেখানে গিয়ে করবে, আজই নিয়ে যাচ্ছি। করবে চুরি; করবার বয়েস।… তুই তোর বয়েসে করিসনি চুরি?…”
হঠাৎ যেন কোথা দিয়ে কি হয়ে গিয়ে মেয়ে বাপের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল,—যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যা শুনল। বাপেরও হুঁশ হ’ল যে বয়সে করত চুরি, মেয়ে আর সে বয়সে নেই, সে জায়গাতেও যে নেই সেটাও বসেছে ভুলে।…একটু যেন গলাটা শুকিয়ে কথা গেল আটকে—কয়েক সেকেণ্ড, তারপরেই সামলে নিলেন, নিজেকেই টেনে নিয়ে এসে বললেন—“কেন তোর বাপ চুরি করে নি? …ছেলেবেলার রোগ—ও রোগ দেখতে গেলে কার না…”
মেয়ে হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার সঙ্গেই আপসানি—
“তাই নিয়ে যাও…আমি ও হতভাগার মুখ দেখব না… ওর জন্যে আমায় বুড়োবয়সে বাপ-তোলানি শুনতে হ’ল …কি বাকি রইল আর আমার?…কিছু বলব না, কোন সম্বন্ধ নেই ওর সঙ্গে আমার আর…যা কখনও শুনতে হয়নি আমার কারুর কাছে…”
বাপ এগিয়ে গিয়ে মাথাটা বুকে টেনে নিলেন। বললেন—“এই দেখো ছেলেমানুষী! তা তোর বাপই ত তোকে বাপ তুলিয়েছে, না আর কেউ? চুপ কর। দেখো, তবু কাঁদে! বলছিলুম—ছেলেবেলায় কে কবে চুরি করেছে তার জন্যে ত সারাজন্ম চোর হয়েই থাকছে না—চুপ কর মা…মালা শুনছিস?
“শাশুড়ী-টাশুড়ী কেউ এসে পড়বে, মনে করবে—কি না কি বলেছে মেয়েকে…”
নিজের গলাও কি করে যেন ধরে আসে। মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে চেপে ধরেন দীননাথ।
দীননাথের চুরির কথা নিয়ে এখনও আলোচনা হয় বাড়িতে। তার একটা কারণ হয় ত এই যে, মা, বড় বোন এখনও বেঁচে; তবে একথাও ঠিক যে চুরি করায় যে সব প্রতিভার পরিচয় দিতেন দীননাথ তা যেমন মৌলিক তেমনি অসাধারণ, মুখে মুখে পারিবারিক ইতিহাসে বাঁচিয়ে রাখবারই জিনিস। উদাহরণ স্বরূপ লুচি-পায়েসের গল্পটা নেওয়া যেতে পারে। বিকেলে জলখাবারের জন্য কোন পূজা-পর্ব উপলক্ষে সেদিন ছিল বিশেষ বন্দোবস্ত। গরমকাল, ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখলে পায়েস যাবে টকে, লুচিও না টকুক, ভেসে যেতে পারে। হাওয়ায় আদুড় রেখে দেওয়া দরকার।
কিন্তু তাতে বিপদ আছে। দীনুর লুব্ধ দৃষ্টি; একটু নাগালের মধ্যে পেলে আর রক্ষা নেই।
ছোট-বড় ছেলেমেয়েদের মিলিয়ে চারজনের যোগ্য খাবার। বিকেল বেলা দেওয়া হবে সবাইকে। রান্নাঘরের জানলা থেকে প্রায় হাত চারেক দূরে একটা টেবিলের ওপর লুচির রেকাবি আর পায়েসের বাটি রেখে দিয়ে গেরস্ত দোরে তালা লাগিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে খেয়েদেয়ে আরাম করতে গেল।
খান-বারো লুচি, এক বাটি সুজির পায়েস। বিকালে ঘরের তালা খুলে দেখা গেল তিনখানি লুচি আর বাটির কোলে ছটাকখানেক পায়েস পড়ে আছে। আরও আশ্চর্য—যেন উধাও হয়ে গেছে, কোন দিক দিয়ে কিভাবে গেল তার কোন চিহ্ন রেখে যায় নি।
একটা হৈ-চৈ পড়ে গেল। কাজটা যে দীনুর তাতে কারুর সন্দেহ নেই, কিন্তু ধরা-ছোওয়া ত যাচ্ছে না। সমস্ত হাতটা জানলা দিয়ে সাদ করিয়ে দিলেও তবু ত হাত দুয়েক দূরেই থেকে যায়। লাঠি দিয়ে কি আঁকশি করে টেনে আনার প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে?
দীনু ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে—“মারো দীনেকে ধরে—একে ক্ষিদেয় পেট জ্বলছে—ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো দীনেই ত—বেড়ালে থাক, কুকুরে থাক, ধর তেড়ে দীনেকে…”
বেড়ালে লুচি খাবে না। টেবিলের মাঝখানে কি আছে টের পেয়ে যদি পায়েস খায়ই ত ছড়ানো-লেপানো থাকবে।
টের পাওয়া গেল—নেহাত নাকি ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, তাই হাত আড়াইয়েক লম্বা চাঁচাড়ি, প্রায় আধা-আধি পর্যন্ত দু’ফাঁক করে চেরা। শেষের দিকে একটি ছোট্ট গোজ লাগানো রয়েছে, যাতে চিমটের মত চেরা, মুখটা হয়ে রয়েছে ফাঁক। কাঠিটা দীনুদের পড়বার ঘরের এককোণে দাঁড় করানো রয়েছে, যেখানটায় দীনুর পড়বার টেবিল।
তবুও কি অত খেয়াল হ’ত কাকুর? পিসীমা ঘরে কি করতে গিয়ে দেখেন একটা চেরা চাঁচাড়ি, তার মুখে রাঙা ক্ষুদে ক্ষুদে পিঁপড়ের ডাঁই। কি রকম কৌতুহল হতে তুলে নিয়ে নাড়া দিতেই মনে হ’ল ভেতরটা যেন সাদা সাদা কি মাখানো, হাত দিতেই টের পাওয়া গেল পায়েস! শুকিয়ে গেছে, কিন্তু বুঝতে ভুল হয় না। তবু কি স্বীকার করে? পিসীমা বলেন—“এ তোরই কাজ। ঐ চাঁচাড়ি চিমটে মতন করে দূর থেকে লুচির গোছার মধ্যে সাদ করিয়েছিস, গোজটা টেনে নিতেই খামচে ধরেচে লুচির গোছাকে, তারপর সেই চাঁচাড়ি সুদ্দু, লুচি পায়েসে উলটেপালটে নিয়ে বের করে করে খেয়েছিস—একবারে নয়—সবাই ঘুমুচ্ছে, সকাল সকাল ছুটি হয়েছে, তুই নিশ্চিন্দি হয়ে এই কর্ম করেছিস। ছিটে-কোট। যা এদিক ওদিকে পড়েছে, কাটিতে ন্যাকড়া জড়িয়ে মুছে নিয়েছিস। ব্যস, আর টের পাওয়ার ত লোক নেই!…এ ছেলে বড় হলে কি হবে গো!”
—এই রকম আরও সব কীর্তি। এখনও আলোচনা হয় সবাই একত্র হয়ে বসলে। ছেলেমেয়েদের ঠাট্টার সম্বন্ধ, বলে—“দিদিমণি—মানে তোমার পিসশাশুড়ীও তাহলে নিশ্চয় কম ছিলেন না মা। পাকা চোরেই গোয়েন্দা হতে পারে, সব আঁৎঘাৎ থাকে ত জানা…”
মা চুপ করে গিয়ে কি যেন একটু ভেবে নেন, তারপর হাসিমুখেই একটু রাগের ভাব দেখিয়ে বলেন-—“হ্যাঁ, অমনি তোমাদের কাছে চোর হয়ে গেলেন তিনি!… বললুম ত, ছেলেবেলায় অমন একটু-আধটু দোষ কার না থাকে?…শুনি তারাও নাকি দুই ভাই-বোনে মিলে থাক বাপু, গুরুজন, স্বর্গে গেছেন, তাদের টেনে এনে আর ব্যাখ্যানা করে কাজ নেই। ওঠো সব তোমরা। মস্ত বড় সাধু একএকজন।”
বেহান, অর্থাৎ মেয়ের শাশুড়ী সুরধুনী—বড় আমুদে মানুষ। আমোদের সন্ধান পেলেন ত তার শেষ রসটুকু পর্যন্ত নিঙড়ে নিয়ে তবে ছাড়েন। সেদিন রাত্রেই সদ্য সদ্য একটু হয়ে গেল।
স্বামী আর বেহাইকে বসে খাওয়াচ্ছেন। বধূও রয়েছে, ফরমাশ মত এনে দিচ্ছে। শেষের দিকে পায়েস এলে হঠাৎ একটু বেশী জিদ ধরে বসলেন
“না বেহাই আর দুখানা লুচি দিক, আরও একটু পায়েস। তুমি যাও বোমা, নিয়ে এস, আমি শুনব না।…ওরা রাবড়ি করতে চেয়েছিল, তার সঙ্গে ঘি-ভাত, আমিই জোর করে বললুম—না, লুচি আর সুজির পায়েস বড় পেয়ারের জিনিস বেহাইয়ের আমার… আমি জানি এর জন্যে কত…”
খুব আমুদে লোক যেমন হয়ে থাকে-—খুব হালকা, বলতে বলতেই হেসে দুলে উঠে ঘাড়টা ফিরিয়ে নিলেন। দীননাথও একবার চোখ তুলে দেখে নিয়ে মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগলেন, মেয়ে মালতী পায়েস নিয়ে আসছিল, হঠাৎ একটু যেন জড়োসড়ো হয়ে তাড়াতাড়ি আবার ফিরে গেল রান্নাঘরে। শ্বশুর প্রিয়নাথ ভেতরকার কথাটা জানেন না, বললেন—“কি হ’ল আবার।…মিছে হাসির রোগটা আপনার বেহানের সারাতে পারেন বেহাই? আমার দ্বারা ত হ’ল না…”
রাত্রে মেয়ে যখন মশারি গুঁজে দিতে এল, দীননাথ বলল—“হ্যাঁ রে মালা, তুই বেহানের কাছে কীর্তি সব ফাঁস করে দিয়েছিস, ওঁর ত জানবার কথা নয় সে-সব।”
মেয়ে মুখটা গোঁজ করে বসল বাপের শিয়রের কাছে। এমনিই অভিমানী, তার ওপর অনেকদিন পরে বাপকে পেয়ে এবং আরও যা যা হয়েছে তাতে অভিমানটা আরও গেছে বেড়ে; চোখ দুটি ছলছল করে উঠল, মুখখানি আরও ভারী হয়ে উঠল—অভিমান, তার সঙ্গে খানিকটা যেন রাগও। রাগ কিংবা আক্রোশ। বাপ চেনেন ত, সামলে নেওয়ার জন্যে পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন —“তা বলেছিস ত বলেছিস, তাতে হয়েছে কি? আমুদে লোক, খানিকটা ফুর্তির খোরাক পেলেন বেহান তোর বাপের ঘাড় দিয়ে।”
মেয়ের ঠোঁট দুটি ফুলে উঠল—
“আমি ইচ্ছে করে বলেছি নাকি বাবা?—সেই পাত্তোর আমি!…সমানে তুমি যখন বকছিলে আমায়, নিজের মুখেই ত বললে, উনি এদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন, দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনলেন আড়াল থেকে, তারপর আর রক্ষে আছে?—হ্যাঁ গা বৌমা, কি চুরির কথা বলছিলেন বেহাই। আমায় বলতে হবে বাপু।…আমিও বলব না, উনিও ছাড়বেন না, শেষকালে একেবারে দিব্যি দিয়ে বসলেন। কি করি বলো?”
“তা বলছি ত, বেশ করেছিস বলেছিস, তার জন্যে দুঃখ কি এত?”
“তুমি ত বলছ দুঃখু কি, কিন্তু অন্যায় নয়? মাথার দিব্যি দিয়ে বাপ কবে কি করেছেন সে-সব বের কবে নেওয়া! তা আমিও ছাড়ছি না…”
হঠাৎ মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। দীননাথ একটু শঙ্কিতই হয়ে উঠলেন, বললেন—“তা বলে ঝগড়া করবি নাকি? খবরদার!”
“ঝগড়া করতে গেলুম কেন?”
উঠে ভেতরে দরজার কাছে চলে গেল, একটু ফাঁক করে গলা বাড়িয়ে দেখে নিয়ে আবার ফিরে এসে বলল—“ঝগড়া কেন, যেমন তোমার কথা বলিয়ে নিয়েছেন, তেমনি ওঁর কথাও ফাঁস করে দিচ্ছি, রোস না।”
“চুরি কবে খান?”—হঠাৎ কৌতুকে মুখটা দীপ্ত হয়ে উঠেছে দীননাথের।
“আহা খান নি যেন! তবে আজকাল কি? ঐ তোমার মত বয়সে। নতুন কনে-বৌ হয়ে এসেছেন, তখন ত একেবারে ছেলেবেলায় বিয়ে হত—এগার বছরের কনে-বৌ…অবিশ্যি ক্ষীরও নয়, সন্দেশ রসগোল্লাও নয়—”
দ্বিধাভরে চুপ করে যেতে দীননাথ তাগাদা দিলেন—“তবে?”
“দক্ষিণের মেয়ে ত শাশুড়ী-নোনা ইলিশের দেশের—ইদিকে ত অত রেওয়াজ নেই—একবার কি করে এসেছে বাড়িতে, ব্যস্, আর কি নোল সামলানো যায়?”
“চুরি?”—কৌতূহলটা আর সামলাতে পারছেন না দীননাথ।
“চুরি নয় ত কি? তবে নিজের হাতে কি? অমন ভোলানাথ শ্বশুর কি করতে রয়েছেন। তাকে দিয়ে রাত দুপুরে রান্নাঘর থেকে…”
বাড়ির ওদিক থেকে ননদ হাঁক দিল—“বৌদি, হয়ে থাকে ত এস, ছেলে উঠেছে!”
দীননাথও সদ্য সদ্য শোধটা নিলেন।
পরদিন দুপুরে আহারের সময়। থালা-বাটির ওপর চোখ বুলিয়ে বললেন—“এবেলাও দেখছি লুচি পায়েস বাদ যায় নি। কি বলে যে ধন্যবাদ দেব বেহানকে ভেবে উঠতে পারছি না। কিন্তু আর একটা জিনিস যে আমার আরও পেয়ারের সেটার সন্ধান পান নি বেহান? আর তাইতে ওঁর সঙ্গে আমার পছন্দর যে আশ্চর্য রকম মিল রয়েছে।”
“কি বেহাই, কৈ আমায় বলে নি ত বৌমা!”
“কেন, নোনা ইলিশ।”
গল্পটা নেপথ্যেই রইল। প্রথমে একটু অপ্রতিভ হাসি। কিন্তু অতি-আমুদে মানুষ, সে ঠাট্টা নিতেও জানে, নিজেকে উপলক্ষ্য করে হাসতেও তার বাধে না। হাসিটা আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে প্রায় লুটোপুটি, ক্রমে স্বামীও, আর দীননাথ ত আছেনই; মনে হ’ল আশেপাশে বৌ-ঝিদের মধ্যেও পৌঁছে গেছে হাওয়াটা—কোন কথা নেই, চাপা খিলখিল খলখলে সমস্ত বাড়িটা যেন লুটিয়ে লুটিয়ে পড়ছে।
কিন্তু ছাড়বার পাত্রী নয়। সুযোগের সন্ধানেই ছিলেন, বিকেলবেলা একা পেয়ে বেহান এসে ধরলেন দীননাথকে।
“কে বলেছে বলতে হবে বেহাই—আমার কাছে ছাড়া নেই।”
দীননাথের মুখটা একটু শুকিয়েই গেল। কৌতুকের হঠকারিতায় এ সম্ভাবনাটা তখন ভেবে দেখা হয় নি। কিন্তু বিপদটা আপনি আপনিই গেল কেটে। বেহান ঠোঁটে হাসি টিপে মুখের দিকে একটু চেয়ে রইলেন, তারপর উত্তর না পেয়ে বললেন-—“তাহলে আমিই না হয় বলি?”
দীননাথ একটু শুষ্ক কণ্ঠেই বললেন—“বলুন না।”
“আপনার গুণনিধি বেহাই ঠাকুরটি আর কে? সকালে দু’জনে যে অত হাসাহাসি হচ্ছিল সেটা নিশ্চয় এই নিয়ে, এখন ত বুঝতে পারছি। তাহলে আমিও বলি বেহাই, জয়নগরের মোয়াও নয়, বর্ধমানের সীতাভোগও নয়; কী না একটু নোনা ইলিশ, আমাদের মেয়েছেলেদের অমন একটু আদাড়ে লোভ হয়ই—টক বলুন, ঝাল বলুন, নোনতা বলুন—নুকুনো নেই কারুর কাছে। তাও কত বয়স তখন?—দশ কি এগারো—সেকাল বলেই না কনে-বৌ, আজকালকার মেয়েরা ত ও-বয়সে ফ্রক পরে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। আর উনি,— আপনার বেহাই!…”
চুপ করে মুখের দিকে চেয়ে আছেন, দুষ্ট হাসিটা চোখে-মুখে যেন লুকোচুরি খেলে বেড়াচ্ছে। দীননাথের মুখেও সে হাসির ছোঁয়া লেগেছে, একটু কুণ্ঠিত ভাবে জিগ্যেস করলেন—“বেহাইয়েরও এ দোষ ছিল নাকি?”
“ছিল মানে?”
—বেহান একবার সন্তর্পণে উঠে গিয়ে দরজার মধ্যে মাথাটা গলিয়ে ভেতর দিকটা দেখে নিয়ে আবার এসে বসলেন। চাপা গলায়ই কথা হচ্ছিল, আরও একটু চেপে বললেন—“ছিল কি বলছেন বেহাই!…এককালে ছিল, এখন নেই তাহলে ত বাঁচতুম…এই কালকের কথা, এখনও মুখ শুঁকলে মনোহরার গন্ধ পাওয়া যাবে…”
“সত্যি নাকি?”
—এতবড় গোপন কথাটা শুনে একটু যেন অপ্রতিভও হয়ে পড়েছেন দীননাথ, তবু বিস্ময়ে-কৌতুকে মুখটা আরও দীপ্ত হয়ে উঠেছে। বেহানের ত কথাই নেই, একটু আক্রোশ ছিলই, তার ওপর, হাউহাউয়ে মানুষ, আমোদ পেলে আর কিছু চান না—তা নিজেকে নিয়েই হোক বা অপরকে নিয়েই হোক—স্বামী হলেও বাধা নেই। চাপা হাসিতে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীরটা উঠছে দুলে দুলে—
“বুঝলেন না?—ডাইবিটিস রুগী সে, মিষ্টির ত্রিসীমানার মধ্যে যাওয়া বারণ ডাক্তারের; কড়া শাসনের মধ্যে রাখতে হয়েছে। কিন্তু কচি ছেলে মতন মিষ্টির লোভ বেহাই, আর বলবেন না—সে মানুষ কখনও শাসন মানে?—তায় বাড়িতে হাঁদু ময়রার দোকানের মনোহরা…সকালবেলা বাক্সর চাবি বের করতে গিয়ে, পকেটে হাত দিতেই—ওমা! এ যে মনোহরার গুঁড়ো! হাগা, বলি একি কাণ্ড!”
হাসির দমকে কথাগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে—
“গুণের কথা আর কত গুনবেন বেহাইয়ের? মাঝখান থেকে খোকাটার নিগ্রহ—আমি ভেবে সারা আধাআধি সন্দেশ…একটা শিশুতে…তা ইদিকে সে বুড়ো খোকা লুকিয়ে লুকিয়ে…উঃ, বাবা গো! কত হাসব?…পেটে খিল ধরিয়ে দিলে!…”