সারা শহরে হৈচৈ পড়ে গেছে।
হৈচৈ অবশ্য এদিকে কয়েক বছর ধরেই হচ্ছে এ-সময়টা, পূজায় বলিদান হবে কি হবে না এই নিয়ে। এই প্রশ্নকেই কেন্দ্র করে পূজার মিটিং, কমিটি গঠন, প্রেসিডেণ্ট-সেক্রেটারি প্রভৃতির নির্বাচন। মাসখানেক ধরে শহরের এদিকটায় আর অন্য কোন আলোচনাই থাকে না। ছেলে-ছোকরাদের প্রায় সবাই বিপক্ষে, বড়দেরও অনেকেই, কিন্তু পুরাতন পন্থীদের মধ্যে এমন জনকয়েক প্রভাবপ্রতিপত্তিশালী রয়েছে যে কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না বলি। আন্দোলনটা অবশ্য বেড়েই চলেছে। গত বৎসর বলি-বিরোধীরা একটা আলাদা পূজার ব্যবস্থাও করেছিল, এরা ক’জন কলকাঠি নেড়ে বিভেদ সৃষ্টি করে এমন অবস্থা দাঁড় করাল যে ভেস্তেই গেল পূজা বলা চলে; কয়েক জন ত এদিকেই চলে এল, কয়েক জন জিদের ওপর করলে ঘটে, কিন্তু তা এতই দুর্বল আর নিষ্প্রভ যে একটা বছরেই তার আয়ু নিঃশেষ হয়ে গেল।
ও-হৈচৈটা এবারও উঠেছিল, কিন্তু ও বাৎসরিক হৈচৈয়ের কথা হচ্ছে না। ও যেমন ওঠবার উঠেছিল, তারপর ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল, তারপর এ একেবারেই নূতন ব্যাপার। মা নাকি নিঃসন্দেহ ভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর পশুবলি চান না। স্বপ্নাদেশ বা ঐজাতীয় কিছু নয়, ওসব হুজুগ এর আগে এরা কয়েকবারই তুলেছে নানা আকারে, কোন ফল হয় নি। কাল সপ্তমী পূজা ছিল, তাইতেই নাকি এই নির্দেশটা স্পষ্ট পাওয়া গেছে দেবীর কাছ থেকে।
এসব ক্ষেত্রে যেমন হয়ে থাকে—বিবরণটা নানা মুখে নানা আকারে আত্মপ্রকাশ করছে। কেউ বলছে বলির পাঁঠাগুলার মধ্যে হঠাৎ একটা দাঁড়িয়ে উঠে ঠিক মানুষের মতো কথা কয়ে বলল—“মা, আমরা নিরীহ ছাগের দলই বিশেষ করে কি এমন দোষ করেছি যে, আমাদের রক্ত না হলে তোর তেষ্টা যাবে না?”…কেউ বলছে—ছাগলট নিজে কিছুই বলেনি। পুরুতমশাই যথারীতি মন্ত্র পড়ে পাঁঠাটাকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন, বলিদানের বাজনা বেজে উঠেছে, এমন সময় একটা বুড়ী ছাগলী কোথা থেকে গটগট করে এসে ছাগলটার পাশে দাঁড়াল, তারপর,—দু’পায়ে দাঁড়িয়ে ওঠা ওসব বাজে কথা, মাকে তো ঢু মেরে চটাতে আসেনি—তবে ব্যাঁ-ব্যাঁ করে সে প্রায় মানুষের মতন করেই বললে—“যদি আমার ব্যাটা খাবি, মায়ের ব্যথা না বুঝবি ত জগজ্জননী নাম নিয়েছিস্ কেন বল?”
নানা মুখে এই রকম বিভিন্ন প্রকারের কাহিনী। তবে সব বাদসাদ দিয়ে একটা জিনিস এই দাঁড়াচ্ছেই যে একটা ছাগল নিয়ে নূতন গোছের কিছু একটা হয়েছেই, তার ভীতত্রস্ত অঙ্গচালনার জন্যই হোক বা যে জন্যই হোক—সেটা একটু অস্বাভাবিক ঠেকায় বলিটা বন্ধ গেছে কাল।
কিন্তু আবার প্রতিক্রিয়াও হতে আরম্ভ হয়েছে। ব্যাপারটা যখন হয় তখন প্রেসিডেণ্ট, সেক্রেটারী এদের কেউ ছিল না। একটা বিগ্ন হ’ল। বলির সময়টাও উতরে গেল; আজ কিন্তু হবে বলি, কালকের পাঠাগুলোসুদ্ধ নিয়ে। এই ওদের ইচ্ছা, আরও সবার, যারা ওদের দিকে। তারা অর্থও করছে অন্যভাবে; বলছে—কথা কওয়া, ও সমস্ত বাজে, একেবারেই অবিশ্বাস্য—ব্যাঁ ব্যাঁ করে ডেকে থাকবে, সেটাকে যে যেমন খুশি ভেবে নিয়েছে—রেলগাড়ির শব্দ থেকে যেমন নিজের নিজের মনের মতো বুলি তোলে লোকে; তবে গড় করার মতো যদি কিছু করেই থাকে ও তার মানে ত এও হতে পারে, মা তোমার পায়ে আত্মসমর্পণ করলাম।
বলি দেওয়াই ইচ্ছা বটে, ওপরে ওপরে সেটা জাহিরও করছে বটে, কিন্তু এটাও বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে যে, সুর আর সেরকম চড়া নেই, ক্রমেই খাদে নেমে আসছে। তার কারণ, ব্যাপারটা ক্রমেই কমিটি আর পূজার অন্যান্য উদ্যোক্তাদের এখতিয়ারের বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্দোলনটা প্রতি মুহূর্তেই যাচ্ছে বেড়ে; একটা অশুভের আশঙ্কায় বলির বিপক্ষেই শহরের জনমত পুষ্ট হয়ে উঠছে।
আজ কর্তারা নিজেরাই উপস্থিত থাকবে। মুখে বলছে বটে বুজরুকিটা ভাঙবার জন্যই আসছে, কিন্তু, বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যে আর সম্ভব হবে না, এটা সকলেই বেশ টের পাচ্ছে।
শহরের আর-সব পুজা-মণ্ডপ একরকম খালি, যত ভিড় জমা হচ্ছে এ পাড়ার পূজায়। একটা গুজব রটে গেছে, অনেকে স্বপ্ন দেখেছে আজও নাকি ঐরকম কাণ্ড হবে।
দলাদলির জন্য পূজার ব্যাপারে থাকি না। বলিটা যে পছন্দ করি না সেটাও জানিয়ে দিই অনুপস্থিত থেকে; আজ কিন্তু আমিও বেরিয়ে পড়লাম অলৌকিক কিছু যে একটা দেখব এরকম প্রত্যাশা নিয়ে নয় অবশ্য, নিতান্ত একটা সহজ কৌতুহলের বশে যে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
চাপ ভিড়, পথ চলা যায় না। পূজামণ্ডপের যতই কাছাকাছি হচ্ছি, ভিড়টা আরও চাপ বেঁধে উঠছে; কোনরকমে রাস্তা করে এগিয়ে চলেছি, এমন সময় বেশ খানিকটা পেছনে একটা গোলমাল উঠল—“এই পাঁঠা!…এই পাঁঠাই ছিল। সরে যাও!…রাস্তা করে দাও!…তফাৎ! তফাৎ!…রাস্তা ছেড়ে!…জয় মা!… বুঝিয়ে দাও ভাই নাস্তিকদের!…”
ভিড়টা হঠাৎ পেছন দিকে মাথা করে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর যেন আপনাআপনি রাস্তার ঠিক মাঝখানটায় লম্বালম্বি একটা গলির মতো হয়ে গেল। দেখি তার একেবারে শেষ দিকে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার প্রায় শ’খানেক হাত পেছনে একটা কালো পাঁঠা মাথা দোলাতে দোলাতে গটগট করে চলে আসছে, কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, গলায় একটা জবাফুলের মালা। এগিয়ে আসতে আরও ভালো করে দেখলাম। এদিককার পাঁঠা বলে মনে হ’ল না। কান দুটো ঝোলা, নাকটা একটু ধনুকাকার। শিং দেখে মনে হয় খুব বেশী বয়স নয়, পাঁঠা হিসাবে নবযুবক, কিন্তু আকারে এদিককার পাঁঠাকে এর মধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে। রংটা কুচকুচে কালো একেবারে, ক্ষুর থেকে নিয়ে শিঙের গোড়া পর্যন্ত কোনখানে এতটুকু শাদা বা অন্য দাগ নেই। লোমগুলা একটু বড় আর মসৃণ, এদিকে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হওয়ায় মনে হয় গায়ে মাছি বসলে যেন পিছলে পড়বে।
সবচেয়ে আশ্চর্য, চলার ভঙ্গিটা। এত যে ভিড়, এত চেঁচামেচি, কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ ত নেই-ই, তার ওপর এমন একটা শান্ত অথচ ব্যস্তসমস্ত ভাব—মনে হয় কোথা থেকে যেন একটা কি মিশন্ নিয়ে এসেছে, সময় অল্প, সেটা সেরে আবার অন্যত্র চলে যেতে হবে। যদি বলা হয় যে, আমার মনটা হঠাৎ সেরকম একটা দৃশ্যে অভিভূত হয়ে পড়েছিল এবং এটা তারই প্রতিক্রিয়া, তবু একটুকু মানতেই হয় যে, ছাগলটা এইরকম ভিড়, এইরকম সমারোহে যেন অভ্যস্ত; বিচলিত হওয়ার মতো নূতন এমন কিছু পাচ্ছে না দেখতে এর মধ্যে।
আরও গোটা দুই মালা এসে পড়ল গলায়, পুষ্পবৃষ্টিতে পথ ত প্রায় ছেয়ে এসেছে। তারপর একটা ব্যাপার যে হ’ল তাতে হিন্দুরই মন ত, স্বীকার করতে লজ্জা নেই—আমার গায়েও কাঁটা দিয়ে উঠল।
হ’লও আমার একেবারে কাছাকাছি এসে। পাঁঠাটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। পূজার মণ্ডপটা এখান থেকে বেশ দেখা যায়, একবার মুখটা তুলে যেন দেখে নিল, তারপর পেছনকার পা দুটো মুড়ে মাটিতে নাক চেপে এক ভঙ্গি করল—তাকে সরাসরি প্রণাম ভিন্ন আর কি নামই বা দেওয়া যায়?
একটা তুমুল কলরব উঠল—“জয় মা!!…মহাবীরজী কি জয়!!…”
ভ্রূক্ষেপ নেই। উঠল। তারপর এবার আবার এক নূতন কাণ্ড; কয়েক পা যায় আর ঐ ব্যাপার। আমি পাশে পাশেই রয়েছি, গুণে দেখলাম, আশ্চর্য! —আগের পা ধরে ঠিক এগার পা যাচ্ছে আর ঐ প্রণাম।
“দণ্ডী কাটছে।…মায়ের কাছে দণ্ডী কাটতে কাটতে যাচ্ছে!…মা, মা, রক্ষে করো!…জগন্মাতা!!…”
মনে হ’ল মণ্ডপের ভেতর ভিড়টাকে আর সামলানো যাবে না, কিন্তু এখানেও একটা আশ্চর্য কাণ্ডই হ’ল বলতে হবে। পূজার জায়গার সামনে খানিকটা দূর পর্যন্ত একটা বাঁশের বেড়া রয়েছে বটে, কিন্তু সেটা অত উত্তেজিত জনস্রোতের সামনে একটা কুটো; ভেসেই যেত, কিন্তু সমস্ত স্রোতটা ঐ পর্যন্ত এসে হঠাৎ গেল থেমে। একটা সমীহ, একটা সম্ভ্রম; রব উঠল—“উনি কি বলেন, কি করেন, নিশ্চিন্দি হয়ে বলতে দাও, করতে দাও!…বলো বাবা, তুমি বলো মাকে। শুনতে হবে মাকে।…আমরা রয়েছি তোমার পেছনে।…জয় মা!!…”
ছাগলটা বেড়ার মধ্যেকার ফাঁকা জায়গায় এসে একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। এই সময় এদিকে ও একটু বিশৃঙ্খলা হতে যাচ্ছিল। ভলণ্টিয়াররা গিয়ে বেড়াটা আগলে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গেছে। লোকগুলাও সংযতই ছিল, কিন্তু গেটের মুখ আলগা করে পূজা সংক্রান্ত কয়েক জনকে, এবং তাদের সঙ্গে বিশিষ্ট কয়েক জনকে যেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে, চাপ দিয়ে হুড়হুড় করে আরও কয়েক জন পড়ল সেঁদিয়ে। সবাই অবশ্য ছাগলটাকে বাঁচিয়েই গেল। ধাক্কা দূরের কথা, স্পর্শ পর্যন্ত কেউ করল না। কিন্তু এই ঝোঁকেই যেন ছাগলটার সেই দ্বিধার ভাবটা গেল কেটে। একবার মুখ তুলে সামনে প্রতিমার দিকে চাইল, তারপর যা করল, একেবারে চরম।
সেইরকম ভাবে গটগট করে এগিয়ে গেল। তারপর হাঁড়িকাঠটার সামনে গিয়ে পেছনের দুটো পায়ে ভর দিয়ে, সামনের দুটো একত্র করে সে যা দাঁড়ানো—প্রায় সেকেণ্ড দশ-বারো—তাকে হাত-জোড় করে দাঁড়ানো ভিন্ন আর কিছুই বলা যায় না; তারপরেই ব্যাঁ-ব্যাঁ দুটো শব্দ করে সেইরকম কপাল চেপে মাটিতে পড়া…যেন, এতেও যদি না শুনিস ত বল্, হাঁড়িকাঠ সামনেই আছে, নিজেই মাথাটা গলিয়ে দিই।
এবার যে একটা আওয়াজ উঠল তাতে “মা! মা!” ভিন্ন কিছুই আর স্পষ্ট করে কানে আসে না। প্রেসিডেণ্ট লোকনাথবাবু আলাদা কয়েক জনের সঙ্গে পূজার বেদীর কাছে দাঁড়িয়েছিলেন বলে তার আওয়াজটা স্পষ্ট। “মা! মা! সন্তানের অপরাধ হয়েছে।” বলে তিনি কাঁপতে কাঁপতে সংজ্ঞা-রহিত হয়ে পড়ে গেলেন।
লুকাই নি, লুকাবও না, একটা যে একটু বিশৃঙ্খল হ’ল তার মধ্যে আমি ছাগলটার ক্ষুরের সামনে থেকে একটু মাটি খুঁটে নিয়েছিলাম; দিতেও যাচ্ছিলাম কপালে, এমন সময় নজর পড়ে গেল গেটের কাছে, ভলণ্টিয়ারদের মধ্যে ভলাণ্টিয়ারের সাজেই গোবরা আমার দিকে মিট্ মিট্ করে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতটা কপালে না তুলে আস্তে আস্তে পকেটে পুরে ফেললাম।
পরদিন সকালে ইজিচেয়ার হ্যালান দিয়ে এই ব্যাপারটা নিয়েই নিজের মনে তোলপাড় করছি, মনে হচ্ছে একটা যেন ঠাহরও করেছি, এমন সময় গোবরা এসে কাঁচুমাঁচু হয়ে সামনে বসল।
বললাম—“কি রে, তুই আছিস মনে হচ্ছে এর মধ্যে। তা যোগাড় করলি কোথা থেকে ওটাকে?”
“মা ই জুগিয়ে দিলেন স্যার। এই থেকেই বোঝা যায়, পাঁঠায় তাঁর অরুচি ধরে গেছে, আর খেতে চান না, নৈলে সার্কাসে ছাগলের খেলা কতদিন থেকে ত দেখছি, কৈ, মাথায় আসেনি ত।…আর সাবাস ট্রেনিংও দিয়েছে বেটা! স্বচক্ষেই ত দেখলেন। অবিশ্যি খানিকটা আমাদের দরকার মাফিক খাপ খাইয়ে নিয়েছে—তা সেটা ওরা পারে স্যার; ধরুন, যে-ছেলেটা এম-এ পাস করেছে, সে যেমন কেরানী হতে পারবে, তেমনি প্রফেসারিও করতে পারবে। ছাগলটার হয়েছে তাই, তালিম ছিলই, দু’দিন খেটে একটু আমাদের যুগ্যি করে দিলে লোকটা…”
“তাহলে সার্কাসেরই, না? কিন্তু ট্রেনার বা অ্যানিমেল-মাস্টার কাছে না থাকলে ত ওরা করতে পারে না কিছু।”
“ছিল স্যার, একটা চাষী গেরস্তর বেশে, মাথায় লাল গামছা বাঁধা, হাতে একটা ছোট্ট ছড়ি। বরাবর ছিল ছাগলটার সামনে সামনে ভিড়ের মধ্যে। ঐ সামনে চেয়ে তন্ময় ভাব, সেটা ট্রেনারের ছড়ির দিকে নজর থাকবার জন্যেই ত। নৈলে ছাগলে গুণে এগারো-বার পা ফেলছে, কে কবে শুনেছে বলুন। একবারটি শেষের দিকে ছিল না, আলাদা হয়ে পড়েছিল ভিড়ের চাপে, তাইতে মামলা প্রায় কাঁচিয়ে ফেলেছিল আর কি!”
“কখন্?”
“নজরে পড়েনি কারুর এতটা, আমি তখুনি ছুটে গিয়ে লোকটাকে গেট পার করিয়ে দিলাম কিনা খানিকটা ভিড়ের সঙ্গে। এই সবের জন্যেই ত এবার ঢুকেছিলাম ভলেণ্টিয়ার হয়ে। নৈলে জানেনই ত, ছেড়েই দিয়েছিলাম সব সংস্রব।”
একটু চুপ করে কুণ্ঠিত হয়ে মাথাটা নীচু করে বলল—“কিন্তু বড্ড খরচ পড়ে গেল স্যার, তাই ভাবলাম…”
“কত নিলে?”
“পাটি বর্ধমানে খেলা দেখাচ্ছে, ওদিক থেকে বেহারের দিকে চলে যাবে। নিশ্চিন্দি। ট্রেনারটার সঙ্গে তিন দিনের চুক্তি ছিল—ভোরের গাড়িতে নেমে ওর শো দেখিয়ে আবার ফিরে যাবে; ভাড়া, একটা ভাতা, খাইখরচ হিসেবে, আর দিন পঁচিশ টাকা—তা মার দয়ায় দু’দিনেই কাজ হয়ে গেল। কিছু অবশ্য যোগাড় হয়েছে, তবু কুড়িটে টাকা বাকি; পাঁচ কান করা যায় না ত।… ওকে অবিশ্যি সবটুকু দিয়েই বিদেয় করতে হয়েছে।”
এক জায়গায় একটু আটকাচ্ছে, এতবড় ব্যাপার, এত জানাজানি হয়ে গেল, শেষটা সামলাল কি করে গোবরা। প্রশ্নটা করতে গোবরা আরও যেন কাঁচুমাঁচু হয়ে উঠল; একটু হেসে বলল—“সেটা হ’ল ট্রেড-সিক্রেট স্যার, অবিশ্যি আপনার কাছে আর সিক্রেট কি? তবে যদি রাগ করেন, তাই…”;
হেসেই বললাম—“রাগের কারণ ত আগেই যথেষ্ট হয়ে গিয়েছ গোবর, কিন্তু করতে পারছি কৈ?”
হেসে, আর একটু মাথাটা নীচু করে বলল—“ঐ জবার মালা স্যার।
দু’দিনের পাঁঠা একত্র হয়েছে—বারোটা, সব কুচকুচে কালো—ঐ জাতের ও খুঁজে পেতে গোটা তিনেক মিশিয়ে দিয়েছিলাম শেষের গোলমালটাতেও। গোবরার হাত ছিল স্যার-প্রেসিডেণ্ট মা-মা করে যখন জমি নিলেন—সেই গোলমালের মধ্যেই একটু হাতসাফাই দেখিয়ে মালাটা এ-গলা থেকে ও-গলা করে দেওয়া…বেচারী চাষী গেরস্ত নিজের পাঁঠা নিয়ে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। কত অপরাধই হয়ে গেল স্যার, মা যে কী ভাবছেন জানি না!”