ঘুরে ফিরে যখন গঙ্গার ধারটিতে এসে বসলাম তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমার পেছনে পড়ে রয়েছে ডায়মণ্ডহারবার শহরটা! রাস্তাটাই হচ্ছে বাঁধ। উত্তরে একটু এগিয়ে গেলে এই বাঁধের নীচে বাঁদিকে পড়বে থানা আর আদালতের বাড়ি গুলা। ডান দিকে সারি সারি দোকান। আরও এগিয়ে বড় খালটা। পুল পেরিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে নূতন বসতি, সম্ভ্রান্ত পল্লী; ডায়মণ্ডহারবারের বালিগঞ্জ। একমুঠি শহর ডায়মণ্ডহারবার শেষ হয়ে গেল।
বেশ লাগে কিন্তু। যখনই আসি, দেখি কিছু-না-কিছু বেড়েছে। কলকাতাও বাড়ছে। বেড়ে হচ্ছে বিকৃত, শ্রীহীন; ডায়মণ্ডহারবারের বৃদ্ধিটা শ্ৰীবৃদ্ধি; এই জন্যে ওখানে হাঁপিয়ে উঠলে এখানে আসি ছুটে মাঝে মাঝে কয়েক ঘণ্টার জন্য; রেলে এসে বাসে ফিরে যাওয়া। জায়গাটাকে ভালবাসি বলে এখানে রাত কাটাতে চাই না, বাসা বাঁধতে চাই না। কে জানে, অতিপরিচয়ে আবার কি গ্লানি বেরিয়ে আসবে। ডায়মণ্ডহারবারের এইটুকু বাস্তবেই আমি সন্তুষ্ট; বাকিটুকু আমার স্বপ্নে থাকে অম্লান অক্ষয় হয়ে।
ছবিটুকু মনের মধ্যে সঞ্চয় করে নিয়ে গঙ্গার ধারটিতে এসে বসেছি। আমার শেষ বাস আটটায়; এখনও দেরী আছে।
ঘুরে ফিরে এসে এই জায়গাটিতে বসবার আমার সময়ও এই। এইখানে ডায়মণ্ডহারবারের বাস্তব আর স্বপ্ন মিলেছে সবচেয়ে নিবিড় হয়ে, যেমন নিবিড় হয়ে মিলেছে দিনের বাস্তবের সঙ্গে সন্ধ্যার স্বপ্ন। এখানে এসে আমি বসি স্থান আর কালের ত্রিবেণী সঙ্গমে। চতুর্বেণী বলাই ঠিক, ত্রিবেণী কথাটা ব্যবহার করলাম চালু বলে, যুগযুগান্তের ট্রাডিশনপূত বলে।
আমার বাঁদিকে এই প্রশান্ত বাঁধের রাস্তা সোজা চলে গেছে কাকদ্বীপ, তার মানে নিবিড় সুন্দরবন আর অনন্ত সমুদ্রের যাত্রী। সামনে আমার বিরাট বিস্তৃত নদী, নিতান্তই একটি ক্ষীণ বনরেখা তাকে অনন্ত আকাশের সঙ্গে করেছে পৃথক্, সন্ধ্যা আর একটু গাঢ় হয়ে এলেই সে পার্থক্যটুকু যাবে ঘুচে।
অনন্তের সঙ্গে আরও একটা যোগ অনুভব করি যখন এখানটিতে এসে বসি,—আমার বাঁয়ে প্রসারিত থাকে দক্ষিণ, সামনেও প্রসারিত থাকে তারই সোদর—অস্তরাগ-লাঞ্ছিত পশ্চিম।
সন্ধ্যার ছায়া আরও গাঢ় হয়ে আসতে ওপারের নীল তটরেখা মুছে গিয়ে নদীর ওদিকটা হয়ে উঠল সীমাহীন। আকাশে যা একটু মলিন লালচে আভা লেগে ছিল সেটুকুও আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল; সন্ধ্যাতারাটা হয়ে উঠল দীপ্ত। অদুরে খেয়াঘাট থেকে একটি নৌকা বোধ হয় সন্ধ্যার ট্রেনের যাত্রী নিয়ে ওপরের দিকে পাড়ি জমাল। আরও কেউ যাবে নাকি?—পাল তুলে দিয়েও জড়ানে আওয়াজে গোটাকতক ডাক দিল মাঝি—বোধ হয় ওপারেরই কয়েকটা জায়গার নাম করে। আজ হাওয়া একটু জোরেই, আকাশে কয়েক খণ্ড মেঘও রয়েছে, বোধ হয় এই শেষ খেয়া।…একটি যাত্রীবাহী নৌকা ঢেউয়ের দোলা খেতে খেতে এগিয়ে আসছিল—মাঝগঙ্গায় একটি ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে আস্তে আস্তে বড় হতে হতে সেটিও এসে খেয়াঘাটের নৌকার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অনন্তের দু’দিক থেকে এই যে যাওয়া-আসার নিত্যলীলা এর কথা ভাবতে ভাবতে অনেকখানি আত্মবিস্মৃতই হয়ে পড়েছি, এমন সময় একটি ভদ্রলোক আমার বেঞ্চিটার পাশটিতে এসে বসলেন।
বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে, সুপুরুষই এবং সু-স্বাস্থ্য। এদিকে ভাবটা যেন একটু বিষয়, কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে যেন একটু অন্যমনস্ক রয়েছেন, এবং মনে হ’ল ভেতরে ভেতরে একটু অধৈর্যও।
গায়ে পড়ে আলাপ করা আমার অভ্যাস নয়, তবে প্রায় জনহীন জায়গায় পাশাপাশি দুটি লোক একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকাটা অস্বস্তিকর, তা ভিন্ন ভদ্রলোক এমন মনমরা হয়ে বসে আছেন, মনে হ’ল দুটো কথা কয়ে একটু অন্যমনস্ক করে দিলে বোধ হয় সেটা ভালই হয়। একটা আলাপের সূত্র ধরতে যাচ্ছিলাম। উনিই হঠাৎ একটু মুখটা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন—“আপনি কি এখানকারই লোক?”
বললাম—“না, আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি এখানে; এসেছি।”
কথাটা মিথ্যা, একেবারে ষোল আনাই; কেননা যার মূলেই স্ত্রী নেই তার কন্যা থাকতে পারে না, এবং যার কন্যা নেই তার কন্যার শ্বশুরবাড়ি থাকতে পারে না। কিন্তু কোন কাজ নেই, ডায়মণ্ডহারবারের মত একটা অকিঞ্চিৎকর জায়গায় শুধু ঘণ্টা দু’তিনের জন্যে বেড়াতে এসেছি, এ ধরনের সত্যভাষণে শ্রোতার কৌতুহল উদ্রেক করে এমন অবস্থায় পড়তে হয় যে, শেষে হাজারটা মিথ্যা না এনে ফেললে আর সামলে উঠতে পারা যায় না। অনেক অভিজ্ঞতার পর দেখেছি গোড়াতেই এ ধরনের একটি নির্জলা মিথ্যায় বেশ কাজ হয়।
ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন—“আপনার নিজের মেয়ে?”
বেশ একটু সচকিত হয়েই ফিরে চাইলাম মুখের দিকে। হঠাৎ এ ধরনের প্রশ্ন? আমি যে অকৃতদার এটা জানলেন কি করে? দৈবজ্ঞ নাকি? একটু বেশ অপ্রতিভও হয়ে পড়েছি। তবে সে ভাবটা চেপে হেসে বললাম—“পরের মেয়েকে নিজের বলে চালাতে অন্য কোথাও সাহস হলেও তার শ্বশুরবাড়িতেও চালাতে গেলে…”
ভদ্রলোকই এবার অপ্রতিভ হয়ে গেলেন, তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললেন—“না, না, সে কথা বলছি না…মানে—মানে…”
বার দুই এই রকম আমতা আমতা করে হঠাৎ আগের মত বিষন্ন-গম্ভীর হয়ে বললেন—“একটা ব্যাপার হয়েছে…বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি তাইতে…”
“কি ব্যাপার?”—আমি বেশ উদ্বিগ্ন হয়েই প্রশ্ন করলাম।
“আমার একটি মেয়ে আসবে, ওপারে সুহৃৎগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে…”
আমি বাধা দিয়ে বললাম—“কিন্তু আর কখন আসবে?”
“আসবেই; আসতেই হবে তাকে, আর সেইটেই হয়েছে ভাবনার কথা। দেখে এলাম, এইমাত্র যে নৌকোটা এল তাতে আসে নি। এর পরে আসা মানে…অবিশ্যি পাড়ি এখানে রাত করেও জমায়, কিন্তু আজ যে রকম আকাশের অবস্থা…”
কথাটাকে স্পষ্ট করতে ভয় পেয়েই যেন দু’বার থেমে থেমে গেলেন। একটু চুপচাপ যে গেল তার মধ্যে পকেট থেকে একটা ছোট্ট ডিবে বের করে বাঁ হাতে একটু নস্য ঢেলে নাকে চালান দিলেন। তারপর সামনে একটু মুখটা বাড়িয়ে সন্ধ্যার ছায়ার মধ্যে দিয়ে দৃষ্টিটাকে ঠেলে আমায় প্রশ্ন করলেন—“দেখুন দুরে নৌকোর মতন কি কিছু নজরে ঠেকছে? আমার দৃষ্টি এখন আর বেশীদূর যায় না।”
বললাম—“না, কিছুই নেই। ঢেউগুলোর জন্যে মনে হচ্ছে ও রকম। আপনি কিন্তু নিশ্চিন্দি থাকুন। এরকম আকাশ দেখে কোন মাঝিই নৌকো ছাড়বে না। বিশেষ করে মেয়েছেলে নিয়ে।”
“কিন্তু ছাড়তেই হবে, ঐ মেয়েছেলে রয়েছে বলেই।”
আমায় মূঢ়ভাবে চেয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলেন—“আপনি নিয়তি বলে জিনিসটাকে বিশ্বাস করেন না?”
একটু যেন কেমন কেমন ঠেকছে। আমি উত্তর করলাম—“করি। কিন্তু তার চেয়ে বেশী করি মানুষের বিচার-শক্তিকে।…আপনি অযথাই বড় বেশী ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন যেন; এটা ঠিক নয় ত।”
ভদ্রলোক আমার যুক্তি থেকে কিছু সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছেন কিনা বুঝতে পারলাম না, তবে একটু চুপ করে রইলেন; তারপর হঠাৎ কতকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই বললেন—“আমি রেবাকে ঠিক এইখানটিতে একদিন এই রকম সন্ধ্যায় কুড়িয়ে পাই; সেদিনও নদী এই রকম …এখুনি সে রকম হয়ে উঠবে আর কি…”
আশ্চর্য নিয়তি বন্দী ত। আমি কথাটা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলাম—“আপনার নিজের মেয়ে নয় তা হলে?”
ভদ্রলোক বললেন—“মাপ করবেন। আমি অকৃতদার। নিজের মেয়ে নয় বলেই তখন আমি ওরকম একটু অভদ্র ভাবেই প্রশ্নটা করে বসি আপনাকে। এর জন্যেও ক্ষমা চাইছি। এটা একটা রোগে দাঁড়িয়ে গেছে আমার,—কারুর মেয়ের কথা শুনলেই ফস্ করে যেন আপনি মুখ থেকে বেরিয়ে যায়—আপনার নিজের মেয়ে? বড় লজ্জায় পড়ে যাই, আপনার কাছে ত তবু ক্ষমা চাইবার সুযোগ পাওয়া গেল একটা, সব ক্ষেত্রে ত পাওয়াও যায় না…”
হেসে বললাম—“ক্ষমা চাইবার আর কি হয়েছে এতে?…”
ভদুলোক ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টি ঠেলে একটা উদ্বিগ্ন নিঃশ্বাস মোচন করে বললেন—“না, ঢেউই।”
আমার কথাটা বোধ হয় কানে যায় নি। ডিবেটা বের করে এক টিপ নস্য নিলেন—বেশ বিচলিত হলে ওটা বোধ হয় ওর অজ্ঞাতসারেই হয়ে যায়—তার পর নিজের কথার জের ধরেই বলে চললেন—“নিজের মেয়ে কি জিনিস জানি না বলেই কথাটা বেরিয়ে যায় আমার মুখ দিয়ে। আমি রেবাটাকে সত্যি বড় ভালবাসি মশাই। আমি নিজে সংসার করি নি—এর পরে আর করবার সাহসও নেই। কিন্তু ঢেউয়ের দয়ায়-ই বলুন বা নিষ্ঠুরতাই বলুন—কুড়িয়ে পাওয়া এই মেয়েটাকে নিয়ে আমার এতই ভালবাসার একটা অশান্তি যে, আমার মনে সর্বদাই একটা প্রশ্ন লেগে থাকে— তা হলে যাদের নিজের মেয়ে আছে, তাদের কি করে দিন কাটে! আচ্ছা আপনার পুত্রসন্তান আছে?
মিথ্যাটা যথাসম্ভব ছোট করেই বললাম—“আছে…একটি।”
“মেয়ে?
“দুটি।”—মনে হ’ল সবই একটি বলতে গেলে মিথ্যাটা যেন ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কোথায়।
“তিনটির মধ্যে ছেলে মাত্র একটি, তা হলে ত আপনি আরও ঠিক করে বলতে পারবেন—আচ্ছা, আপনারা কি ছেলের চেয়ে মেয়েকে বেশী ভালবাসেন?”
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকায় পরোক্ষ যুক্তির আশ্রয় নিলাম, বললাম—“দেখেছি মেয়ের উপর টানটা যতদিন থাকে ততদিন ছেলের চেয়ে বেশীই থাকে, অর্থাৎ যতদিন না শ্বশুরবাড়ি গিয়ে চোখের আড়াল হচ্ছে, তারপর স্বভাবতই কমে আসবাব কথা ত?”
“তাই আমিও ভেবেছিলাম। কিন্তু কৈ? বিয়ে দেওয়ার পর এ যে আরও অসহ্য হয়ে উঠেছে— পরের মেয়ে নিয়ে এ কি জ্বালা বলুন ত? চোখের আড়াল হয়েছে, কোথায় নিশ্চিন্দি হব, না আরও অষ্টপ্রহর অশান্তি।”
প্রশ্ন করলাম—“কি ধরনের অশান্তি?”
ভাবলাম, মনস্তত্ত্বের ব্যাপার, দেখি যদি কোন চিকিৎসা বাতলাতে পারা যায়। উত্তর হ’ল—“মনে হয় হারাব। যেমন কোথা থেকে কে হাতে তুলে দিয়ে গেল, তেমনি কোথা থেকে কে এসে নিয়ে যাবে…”
ভদ্রলোক চঞ্চল হয়ে এক টিপ নস্য নিলেন। তন্ময়-করা আমাদের অদ্ভুত আলোচনার মধ্যে ইতিমধ্যে আকাশের খণ্ড মেঘপুঞ্জ স্থানে স্থানে যুক্ত হয়ে উঠেছে। হাওয়াটা একটু বেড়েছে, বাঁধের পাকা শানের গায়ে ঢেউয়ের আছড়ানি গেছে বেড়ে। নদীর অর্ধেকটাও আর দেখা যায় না।
বেশ বিচলিত হয়ে উঠেছেন ভদ্রলোক। হাতটা ঝেড়ে বললেন—“অন্য কেউ নয়—এই ঢেউ। এই ঢেউই সেদিন যেমন তুলে দিয়েছিল হাতে, তেমনি কেড়ে নেবে…”
মুশকিলে পড়া গেল। এ দৃশ্য থেকেই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার ভদ্রলোককে। বললাম—“বড় বেশী ভালবাসেন, মেয়েটিকে, তাই আপনার ও রকম মনে হচ্ছে। চলুন ওঠা যাক। আজ আর কখনও আসে?”
“আসবেই…আমাকে হারাতেও হবে আজ …”
চোখ দুটো অন্ধকারেও দীপ্ত হয়ে উঠেছে। কাঁপছেন একটু একটু। আমি পিঠে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললাম—“এত অন্ধের মতন নিয়তিকে মেনে নিতে আছে?—এ যুগে যখন প্রত্যেক ব্যাপারেই একটা বিজ্ঞানসম্মত কারণ…”
“তা যদি না হবে ত তাকে এই নদীর ওপারেই বিয়ে দিতে গেলাম কেন? না দিয়েই পারা গেল না কেন? এ নদীকে, এ জায়গাটাকে আমার এত ভয় করা সত্ত্বেও?…বলুন।”
নাকে নস্য টিপে ধরলেন।
বিমুঢ় হয়ে গেছি, এ বাতুলতার কি উত্তর দিই?…তারপরেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত শিউরে উঠলাম। নদীর যেটুকু দেখা যাচ্ছে তার ওদিকে অন্ধকারের গহ্বর থেকে একটা করুণ আর্তনাদ—“বাবা!…”
ঝড়ের দোলায় দোল খাওয়া, টানা, দীর্ঘ; আর নিঃসংশয় ভাবে স্পষ্ট।
উঠে দাঁড়িয়েছেন ভদ্রলোক। ডান হাতটা আওয়াজ লক্ষ্য করে গঙ্গার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন-—“ঐ শুনুন, শুনছেন?…ডাকছে!…কি হ’ল?…কি ওটা দেখুন ত!…নৌকো নয়? ঐ যে সাদা পাল উলটে পড়ল, ঐ!…ঐ!”
নৌকার পাল নয়। যেখান থেকে অন্ধকারে লুপ্ত তার ঠিক এদিকে সংঘর্ষ লেগে দুটো ভেঙে পড়ল! বললাম। বলতে বলতেই উঠে পড়েছি কিন্তু, এগিয়ে সামনে ঝুঁকে চোখ দুটো ঠেলে দিয়েছি। নৌকা নয়, কিন্তু শব্দটা স্পষ্ট, আরও স্পষ্ট যেন-—“বাবা!…বাবা!…বাবা!…গেলুম!”
শেষ আকুতি ঝড়ের শব্দটাকে যেন ঠেলে উঠেছে। তারপরেই সমস্ত শরীরটা আবার নূতন করে ছমছম করে উঠল—কানের পাশেই— “যাই মা!—আসছি!…”
আমি ঘুরে শক্ত করে ওঁর একটা হাত ধরে ফেললাম, একটু রুক্ষভাবেই প্রশ্ন করলাম—“কোথায় যাবেন?”
অদ্ভুত এক বিমুঢ় দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলেন। সব চেয়ে আশ্চর্য সে উগ্র উৎকণ্ঠার ভাবটা একেবারেই নেই আর, সে কম্পন নেই, বাঁ হাতে নস্যের ডিবেটাও শিথিল ভাবে ধৃত। একটু চেয়ে থেকে ফিরলেন, একটু হাসি ঠোঁটে করে বললেন —“না, ও ত যাবেই—কি হবে গিয়ে আর?”
সমস্ত শরীরটা আলগা হয়ে গিয়ে বেঞ্চে বসে পড়লেন।
ওর হতাশ নিষ্ক্রিয়তাই আবার হঠাৎ সাড়া এনে দিলে শরীরে; যথাসাধ্য ত করতে হবে, মৃত্যুর সামনে জীবনের প্রতি জীবনের শেষ কর্তব্য, বৃথা জেনেও। খেয়াঘাটের দিকে পা বাড়ালাম।
এবার উনি উঠে আমায় ফেললেন ধরে।
“কোথায় যান?”
বললাম—“দেখি যদি দু’একটা নৌকো বের করে দিতে পারি।”
“আমার কথা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না?…বেশ, দেখুন”— বলে নিতান্ত নির্লিপ্তভাবে হাতটা আলগা করে দিয়ে বসে পড়লেন।
ছুটেছি। সঙ্গে সেই আর্ত কণ্ঠ। কয়েকটা লাফেই খেয়াঘাটে নেমে পড়লাম, কি রকম হয়ে গেছি একেবারে।
“ওগো, তোমরা নৌকো খুলে দেবে না? শুনতে পাচ্ছ না ডাক?”
কয়েকটা নৌকার মাল্লা ছৈয়ের মধ্যে থেকে একটু ত্রস্তভাবেই গলুইয়ে এসে দাঁড়াল।
“কৈ বাবু? ও ত বাতাসের শব্দ—তুফান উঠবে এখুনি।”
“আমি স্পষ্ট শুনছি—বাবা!…বাবা!…গেলুম!” সেই শব্দটাই যেন আকাশবাতাস ছেয়ে রয়েছে।
“কি আশ্চর্য!… শুনতে পাচ্ছ না তোমরা? কারুর কানে যাচ্ছে না—বাবা!—বাবা! …গেলুম ঐ ত…”
“কৈ বাবু?…ও ত হাওয়া।…মানুষের আওয়াজ চিনব না?”
“তোমরা যাবে না। তোমরা ভীতু! তোমরা মানুষ নয়।”…
রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে বকেই চলেছি যা মুখে আসছে। জড়াজড়ি করে হালকা মন্তব্য করতে করতে ওরা যে যার কাজে চলে গেল!
যাবে না। একটা অসহ্য অবস্থা, লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম একটা নৌকায়, জোর করে কিছু একটা করতেই হবে, কিন্তু পা বাড়িয়েই হঠাৎ মনটা আবার ঘুরে গেল। যে হাতে আছে এখনও, তাকে ছেড়ে দিয়ে যে সত্যই নিয়তি-কবলিত তার দিকে হাত বাড়িয়ে একি ভুল করতে বসেছি!
কিন্তু তখন ভুলের যা হবার হয়ে গেছে। এসে দেখি বেঞ্চিটা শুন্য, কেউ নেই, শুধু ছড়িগাছটা বেঞ্চিতে আগের মতই ঠেস দিয়ে রাখা রয়েছে।
ক’দিন থেকেই মনটা বড় খারাপ রয়েছে, কিছুই ভাল লাগছে না।
এই রকম কিছু না-ভাল লাগার অবস্থায় বাইরে থেকে একটু বেড়িয়ে আসি। বেশীরভাগ ডায়মণ্ডহারবারের দিক থেকে।
ডায়মণ্ডহারবার কিন্তু বোধ হয় চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল আমার কাছে। জাহাজ, খাল, প্রশস্ত গঙ্গা, গঙ্গার ধারের বিস্তীর্ণ রাজপথ—কিছুই আজ টানে না; মনে পড়ে যায় মাঝ-গঙ্গা থেকে সেই করুণ আহ্বান, আর সেই শুন্য বেঞ্চি।
এবার ফিরে যাব ঠিক করেছি। বসুধা আপিসে একটা কাজ ছিল, ভাবলাম আজ গিয়ে সেরে ফেলি ওটা। আমি আর আমার এক বন্ধু পাশাপাশি দুটি চেয়ারে বসে আছি। সামনে সম্পাদক; টেবিলে বাঁদিকে রয়েছেন লালকুঠির রাজা শিকার-পোশাকে। শিকারের গল্প হচ্ছে।
ডান দিকের ভদ্রলোকটিকে আমি চিনি না, কিন্তু মনটা যেন বড় আকর্ষণ করছেন। বেশ গোলগাল চেহারাটি, সাহেবী স্যুট পরা, বয়স চল্লিশের ভেতর। আমাদের মত গল্পই শুনছেন, মাঝে মাঝে এক-আধটা সংক্ষিপ্ত মন্তব্য।
সম্পাদক জিজ্ঞেস করলেন, ওঁকেই—“কৈ, আইসেনহাওয়ারের সঙ্গে ট্রাঙ্ক-কনেকশানটা পেলেন?”
“না, এখনও…”
সঙ্গে সঙ্গেই ক্রিং-ক্রিং করে টেলিফোনের ট্রাঙ্ক কলের টানা ঝনঝনানি। “এই যে, এসে গেছে”–বলে ভদ্রলোক এগিয়ে মাউথপীসটা তুলে নিলেন।
“Hallo! Is that the President?” (ইজ দ্যাট দি প্রেসিডেণ্ট?)
সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির কণ্ঠস্বরও ভেসে এল, অতি ক্ষীণ, কিন্তু স্পষ্ট—
“Speaking” (স্পীকিং)।
“This is Sorkar. Arranging a tour of the U. S. A. Could you help?” (দিস ইজ সোরকার। অ্যারেজিং এ টুর অফ দি ইউ. এস. এ.। কুড, ইউ হেল্প?)।
“Sure” (শ্যূওর)।
“Thanks” (থ্যাঙ্কস)।
“No mention” (নো মেনশ্যান)।
রিসিভারটা রেখে দিয়ে গম্ভীরভাবে আবার চেয়ারটাতে বসে পড়লেন। অতি চমৎকার কাটা কাটা ইংরেজী। একেবারে নিখুঁত স্টাইল।
মনে হ’ল আর সবাই-ই চেনেন, তেমন কোন বিস্ময়ের ভাব নেই। অস্বীকার করব না, আমি শুধু বিস্মিতই নয়, বেশ একটু অভিভূত হয়ে পড়েছি। এত দূরের ট্রাঙ্ক-টেলিফোন কখনও শোনা নেই, তার উপর একেবারে প্রেসিডেণ্ট আইসেনহাওয়ারের সঙ্গে!…এমন অবস্থা হয়েছে যে, অসঙ্গতিটুকু ধরবার ক্ষমতাও সাময়িক ভাবে হারিয়ে বসে আছি।
সম্পাদক আমার বিমূঢ় ভাবটা বেশীক্ষণ থাকতে দিলে না, পরিচয় করিয়ে দিলেন—“বিশ্বখ্যাত যাদুসম্রাটের ভাই।”
বিমূঢ় ভাবটা কিন্তু অত শীঘ্র ত যাওয়ার নয়, আমি ওঁকেই প্রশ্ন করলাম—“কবে যাচ্ছেন আপনি আমেরিকায় তা হলে?”
যাদুকর শুধু একটু ঠোঁট চেপে হাসলেন। আরও সবাই। সম্পাদক আবার একটু হেসে বললেন—“কথাটা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হয় নি, ওদিকেও ইনি, এদিকেও উনি।”
“মানে?…”
সঙ্গে সঙ্গে উত্তরটাও নিজের কাছেই পেয়ে গেছি, নস্য নেওয়ার অজুহাতে মুখের কাছে হাত নিয়ে যাওয়ার রহস্যও। প্রশ্ন করলাম—“ভেট্রোলোকিজম?”
যাদুকরের দিকেই চেয়ে প্রশ্নটা করেছি। উনি একটু হাসলেন। এত নিখুঁত হরবোলার অভিনয় আগে কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। ঘণ্টিটা পর্যন্ত ওরই। মুখের দিকে দৃষ্টিটা কয়েকবারই ঘুরে ফিরে গিয়ে পড়তে লাগল। তার পরে একটা ব্যাপার হ’ল। প্রশংসার দৃষ্টিটা হঠাৎ যেন অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠল—দেখা মুখ নয়?
আমার বিমূঢ় ভাবটার জন্যে টেবিল-মজলিসের কথাবার্তা একটু চেপে গিয়েছিল, আবার চালু হ’ল। বন্ধু বললেন—“এবার কিছু খেলা দেখান্; ইনি নতুন লোক…”
তাসের খেলা, রুমালের খেলা, টাকা ওড়ানো, সঙ্গে সঙ্গে রহস্য ও পরিষ্কার করে দিয়ে যাচ্ছেন যাদুকর। সঙ্গে সঙ্গে নিজের পশার সম্বন্ধে মন্তব্যও করে যাচ্ছেন—অন্য সাধনার মতই সর্বদাই নিয়ে পড়ে থাকতে হয়—যখন যেটায় সুবিধা সেই অনুযায়ী—নয় ত হাত নষ্ট হয়ে যায়, গলা নষ্ট হয়ে যায়…বোলচালের সিচুয়েশন সৃষ্টির ক্ষমতা যায় কমে।
মাঝে মাঝে কানে যাচ্ছে মন্তব্যগুলো, একটানা নয়; কেননা আমি ভয়ানক অন্যমনস্ক হয়ে গেছি। সমস্ত মনটাকে জড়ো করেছি আমার স্মৃতির গোড়ায়।… একটু একটু যেন আলো এসে পড়ছে কোথা থেকে। আমার চোখ আর কান একেবারে উদগ্র হয়ে উঠেছে—কণ্ঠস্বরের প্রত্যেকটি পর্দা, বলার প্রত্যেকটি ভঙ্গী দেখেছি—দেখেছি—হয় ত এত স্পষ্ট নয়, হয় ত আধা-আলোয়, কিন্তু দেখেছি ঠিক।…করবই বের। ভদ্রলোক যেন একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়ছেন আমার মনোনিবেশে, যেন—কি বলব?—লুকাতে চান?
“ভেনট্রোলোকিজমের রহস্য হচ্ছে…”
কি বলতে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক, আমি আস্তে আস্তে ডান হাতটা বাড়িয়ে ওর বাঁ হাতের উপর রাখলাম, একটু গলা নামিয়ে প্রশ্ন করলাম—“আচ্ছা, গত রবিবার সন্ধ্যায়…আপনি ডায়মণ্ডহারবারে গিয়েছিলেন?”
যাদুকর ধরা পড়ে যাওয়ার ভাবে একটু লজ্জিত হয়ে হেসে মাথা দোলালেন।
আমার সমস্ত চৈতন্য যেন একটি চিন্তায় এসে জড়ো হয়েছে। প্রশ্ন করে চললাম—“সেই খেয়াঘাটের কাছে—মাঝগঙ্গায় সেই শব্দে—আপনার ডুবন্ত মেয়ে—আপনার পালিত কন্যার…”
সবাই কুতুহলী হয়ে মুখ বাড়িয়ে এসেছেন। বাইরে থেকে একজন কর্মচারী এসে বললেন—“মেয়েরা সবাই এসে গেছেন, ডাকছেন।”
পাশের ঘরেই বাড়ির মেয়েরা এসেছেন। যাদুকর একটা বৈঠকী অভিনয় দেবেন; হাতের খেলা, হরবুলি…
উঠে পড়ে আমার পিঠে একটা হাত দিয়ে আবার একটু হাসলেন। বললেন—“প্রাক্টিশ…কিন্তু বড় শক্ দিয়ে ফেলেছিলাম আপনাকে সেদিন, মাফ করবেন!”
বার-দুই মুখটা ঘুরিয়ে হাসতে হাসতেই বেরিয়ে গেলেন।