একে পাড়াগাঁ, তায় বাড়িটা একেবারেই পুরনো চালের।
পুরনো চালই ভালো, আর রাখতে হবে তাই বজায়। অন্ততঃ ভুবনমোহিনী যতদিন বেঁচে আছেন।…ভগবান মার্কণ্ডেয়ের পরমায়ু দিয়েছেন, যা দেখছেন চারিদিকে, যা সব শুনতে হচ্ছে তাই যথেষ্ট, অনেক নাকি পাপ করেছিলেন আর-জন্মে, তার সাজা; আবার নিজের বাড়িতেও নাকি আমদানি করতে হবে ঐ সব অনাচার?…উনি ম’লে যা খুশি করবে’খন সবাই, সেখান থেকে দেখতে আসবেন না, যতদিন আছেন ততদিন চলবে না; তাহলে ওরা কাশী পাঠিয়ে দিক ওঁকে।
অনাচার বৈকি।…পুরুষেরা যা করে করুক; ওদের ভগবান পুরুষ করে সৃষ্টি করেছেন কেন? তা’বলে তোদেরও ওদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে তাই করতে হবে? ওরা কোঁচা দুলিয়ে স্কুলে যায় বলে, ওদের দেখাদেখি তোদেরও মাথার বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেতে হবে?…ওরা কলেজে যায় ত আমরাই বা কেন যাব না?…তাহলে তোরা এক কাজ কর না—ওদের মত কাছা আঁট্। বলে যে—মেয়েদের দশহাত কাপড়ে কাছা জোটে না, তাই-বা সইবি কেন? কাছা দে, কোঁচা ঝোলা, আপিসে যা, ফিরে এসে সায়েব-মেমের মত মাইডিয়ার বলে হাত-ধরাধরি করে হাওয়া খেগে।…বাড়িতে এসেও হাওয়াই খাস, কেন মরতে হেঁসেলে গিয়ে ঢুকবি?
শোনা যাচ্ছে নাকি শহরে আরম্ভও হয়ে গেছে। তা যাবে; বেঁচে থাকলে আরও সব শুনবেন ভুবনমোহিনী।
শোনা কেন, হয়ত দেখতেও হবে।
গ্রামে কোন বালাই ছিল না। রঘুপণ্ডিতের পাঠশালা, যার শখ হ’ল—ছেলের সঙ্গে মেয়েটাকে দিলে পাঠিয়ে। বাড়িতে পুতুল নিয়ে না খেলা করে সেখানে বই-স্লেট নিয়ে খেলা। তার মধ্যে পুণ্যিপুকুর আছে, যমপুকুর আছে, তুষুলি আছে। বাদসাদ দিয়ে যে কটা দিন বাঁচল, যা শিখতে পারল শিখল; বিয়ের কথা উঠল, ঢের পড়া হয়েছে, এবার এসে ছাঁদনাতলায় ওঠ। এই ছিল ব্যবস্থা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। তারপর হ’ল মেয়েদের খাস ইস্কুল, আর এক ধাপ নাকি উচু। তা ছেলেদের সঙ্গে মিশে মিশে ধিঙ্গি হয়ে যাবে, যাক সেখানে। আবার নূতন ঢো উঠেছে ছেলেদের মতন মেয়েদেরও নাকি আবার একটা পাশ দেওয়ার স্কুল হচ্ছে।
মাঝেরপাড়ার যতীনের কাণ্ড এই সব, ও যেন উঠেপড়ে লেগেছে, গাঁ-খানাকে রসাতলে না দিয়ে ছাড়বে না। ভুবনমোহিনী ডেকে পাঠালেন।
“ও যতীন, একি শুনছি আবার! মেয়েদেরও নাকি পাশ দেওয়ার স্কুল করছ?”
যতীন যেমন বলে, হেসেই বলল—“নৈলে মেয়েরা কোথায় যাবে ঠানদি?”
“ওমা, তুমি যে উল্টো বললে ভাই! এখন ত দিব্যি ঘরেই রয়েছে, পাশ দিলেই বরং কোথায় যাবে সেই ভাবনা। ইস্কুল থেকে কলেজ, তারপর চাকরি খুঁজতে বেরোও। চাও তাই?”
যতীন হেসে বলে—“তা কি চাইতে পারি? তবে তোমার নাতবৌয়ের দল যে চায়, আমি কি করব?”
ভুবনমোহিনী ঠোঁট চেপে মাথাটা দুলিয়ে নেন—অর্থাৎ এতক্ষণে বুঝেছেন।
“তা পড়াবে কারা?”
“আপনার নাতবৌই ত ঝুঁকেছে একজন। বাকি সব বাইরে থেকে আসবে।”
“টেড়ি-কাটা ছোকরা মাস্টারের দল ত? বুঝে-সুঝে এগিও বাপু।”
যতীন হেসে বলে—“ওদের কে তোয়াক্কা করে আর ঠানদি? ন’টি মেয়ে মাস্টারের দরকার, দরখাস্ত পড়েছে একশ’ পাঁচ।”
“বলিস কি গো! এত অধঃপাতে গেছে দেশটা!”
দু’টি নাতনী যে ইস্কুলে পড়ছে,—আগে পাঠশালায় ছিল, নূতন মেয়ে-ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে, তাদের তাড়াতাড়ি সরিয়ে নেন। কোন আপত্তি টেকে না। ভুবনমোহিনী বলেন—“ঠাকুর আজ আমায় নিয়ে নেন, কালই আবার তোদর মেয়েকে পাঠিয়ে দে, দেখতে আসব না।…না হয় এক কাজ কর না, আমায় কাশীতে রেখে আয়, ল্যাটা চুকে যাক একেবারে।”
ঐ ত এক-একটি নমুনা। ঐ চিত্ৰা, যতীনের বৌ, নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরপাক খাইয়ে বেড়াচ্ছে সোয়ামীকে। আসে মেয়েটা মাঝে মাঝে, চোখে চশমা, মুখে খই ফুটছে।…“বিদ্যা সে ত আমাদেরই জিনিশ ঠান্দি, মা-সরস্বতীর এলাকা। পুরুষেরা কত সাধ্যি-সাধনা, কত খোশামোদ করে নিয়ে এখন মৌরলী করে বসে আছে। তোরা হাঁড়ি ঠেলে মর। ঘুচিয়ে দিতে হবে না মৌরলী?”
বড় বৌমা বলেন—“তুমি চটো বলে তোমায় ঔ করে চটায় মা, নৈলে মেয়েটা ভালো। একটু শহুরে ঝাঁজ আছে, তা ও আর কতদিন থাকবে?”
ছোট বৌয়ের কথায় একটু লাগে, মুখটা অল্প ঘুরিয়ে নিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করে—“যা জায়গায় এসে পড়েছেন।”
শাশুড়ীরও লাগে, বলেন—“সে দুঃখু করতে হবে না মা, জায়গার চেহারা পালটে দিচ্ছেন একেবারে। সাধ করে কি বলি—নিজের নিজের ঘর সামলাও সব। আবার ঐ মাস্টারি করতে চললেন।”
রায়-গিন্নী ত শুধু কাঁদতে বাকি রাখেন, তার তবু বড় ইস্কুলে পড়া বৌ নয়। বলেন—“কি বলব খুড়িমা, মনে করলাম, তা হোকগে, আমরা একেবারে মুখ্যু, ধোবার হিসেবটা লেখাব তাও এর-ওর খোশামোদ করে, একটু লেখাপড়া জানে, আজকালকার মেয়ে, তা ওটুকু সংসারের কাজেই লাগবে। বয়েস হয়েছে, রামায়ণ মহাভারতটাও ত পড়ে শোনাতে পারবে নিদেনপক্ষে।…শোনাচ্ছেন! কুটোটা নেড়ে উপকার করবে না, যখনই দেখো বই মুখে করে বসে আছেন রাণী। আর নিত্যি একটা-না-একটা অসুখ লেগেই আছে। ছেলেটা ত আর কিছু পদাৰ্থ রাখলে না! সোয়ামী, কোথায় একটু সমীহ-ভক্তি করবি, পেয়াদার বেহদ্দ করে তুলেছে; খালি বই যোগাও আর ওষুধ যোগাও।…এখন আবার সুর ধরেছেন, যতীনের বৌ নাকি ইস্কুল খুলছে, তাইতে পড়বেন। নাও, ষোলকলা পূর্ণ হ’ল এবার।”
ভুবনমোহিনী বলেন—“আমাদের ছোট বৌমাকে বলোগে একটু। মেয়ে দুটোকে ছাড়িয়ে নিয়েছি তা কত রাগ!…মেয়েদের দোষ ঢুকছে তার জন্যে লেখাপড়াকে দায়ী করলে চলবে কেন? বরং লেখাপড়া করছে বলে অনেক কেটে যাচ্ছে দোষ, বুঝতে শিখছে, ভাবতে শিখছে। একবার শোননা বসে লেখাপড়ার হয়ে ওকালতিটা। সেকালের মুনি-ঋষিদের পরিবারের শিখতেন লেখাপড়া, ছড়া তোয়ের করতেন মুখে মুখে।…বলি—তা করতেন বৈকি, নৈলে সোয়ামী-পুত্রকে বাকলা পরিয়ে ছাড়বেন কি করে? আমরাও মুনি-ঋষির পরিবার না হই, বছরে চারখানা কাপড়ের সুতো কেটে গিয়েছি সোয়ামী-পুতের জন্যে, পুজোর ঘর সামলে, হেঁশেল সামলে, কুঁচোকাঁচাদের তদারক করে। আর যার দাসী করে ঠাকুর পাঠিয়েছেন, তার জন্যে কি কি যে করতে হয়েছে তা পাপ মুখে আর নাই বা বললাম।”
এত গেল নতুন যারা বৌ হয়ে আসছে গ্রামে। শহরের চাল, বাপ-মা নজর রাখে নি, দোষই বা কি ওদের? কিন্তু গাঁ-ও যে এদিকে বিগড়ে যাচ্ছে, এমন সোনার গাঁ।
আবার শোনা যাচ্ছে বড় ইস্কুলের টাকা তোলা হবে, তার জন্যে মেয়েরা নাকি থিয়েটার করবে।
হুজুগে মাতবার লোক আছে বৈকি গ্রামে, নৈলে ঢুকছে কি করে এসব অনাচার? তবে বোঝবার লোকও যে একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে এমন নয়। রায়-গিন্নী আছেন, ঘোষাল-গিন্নী আছেন, পুরুষোত্তমের খুড়ী আছেন, সদানন্দের পিশী আছেন, আরও সব আছে, চারপো কলি ত এখনও হয় নি।
সবার ওপরে আছেন ভুবনমোহিনী।
শিবানীকে কচি বলেই ধরা যায়, কিন্তু অনাচারের ভয়ে ইস্কুল থেকে সরিয়ে আনার পর ভুবনমোহিনী যেন হঠাৎই আবিষ্কার করে ফেললেন যে, মুক্ত অর্থাৎ মুক্তকেশীর বয়স হয়ে গেছে। যুগের প্রভাব বলে একটা জিনিস আছেই, ঘরে ঘরেই পনেরো, ষোল, সতেরো, আঠারো পর্যন্ত অনুঢ়া মেয়ে, তার মধ্যে দৃষ্টির নীচেই চৌদ্দ বছরের একটি যে ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে, সেটা অতটা নজরে পড়ে নি। একটা যে আসন্ন বিপদ এসে পড়ছে গ্রামের মধ্যে তার পরিপ্রেক্ষিতে, বয়সটা হঠাৎ যেন তার ভয়াবহ গুরুত্ব নিয়ে ভুবনমোহিনীর চোখের সামনে এসে দাঁড়াল। এই পরিবারেরই প্রাক্তন ইতিহাসটা হঠাৎ তিরস্কারের ভ্রূকুটি নিয়ে উঠল জেগে।…ভুবনমোহিনী নিজে এ-বাড়িতে আসেন এগারো বছর বয়সে। তিনটি বধূ, তার প্রথম দুটি তেরোর আগেই পা দিয়েছে শ্বশুরবাড়িতে। ছোটছেলের বেলায় হতে-করতে কি করে হয়ে গেল একটু দেরি; ছোট-বৌ এসেছে ষোল বছর পেরিয়ে। অবশ্য কড়া শাশুড়ীর পাল্লায় পড়ে আর মাথা তুলতে হয় নি, তবু আড়াল-আবডাল থেকে মাঝে মাঝে একটা-আধটা নমুনা ছাড়বার চেষ্টা করেন বৈকি।
না, পরের ঘরে যাবে মেয়ে, ভুবনমোহিনী বিচলিত হয়ে উঠলেন। বাড়ির যা চাল সেই অনুযায়ী ঠিকঠাক করে তোয়ের করে দিতে হবে। যা গাফিলতি হয়ে গেছে একটু তার আর চারা নেই, ভুবনমোহিনী উঠে-পড়ে লাগলেন।
এদিককার যা সব তা বাড়ির সাধারণ চাল হিসাবে কিছু কিছু হয়েই আসছিল,—ঠাকুরঘর, ব্রত, হেঁসেলের দিকের ছোটখাট পাট, শিক্ষা হিসাবে; ঘর-দোর ঝাড়-মোছ—হয়ে আসছিল সব, শুধু আরও বাড়িয়ে দিয়ে বই-কাগজের সময়টা একেবারে সঙ্কুচিত করে দেওয়া হ’ল মাত্র; কিন্তু এই নূতন পর্যায়ে ভুবনমোহিনী সবচেয়ে বেশী অভিনিবিষ্ট হলেন অন্য এক দিকে।
আজকালকার মেয়েরা যদি বা কুঁতিয়ে-কাঁতিয়ে কোনরকমে একটু-আধটু গৃহিণী হয়ে উঠছে, সংসারের চাপে, শান্ত্রমত বধূ কিন্তু হতে পারছে না একেবারে। স্বামীভক্তি বলে জিনিসটা নেই বললেই চলে, কেমন যেন একটা হেলাফেলা ভাব। বলেন চিত্রাকে, ঐ মেয়েটা এ-যুগের যেন প্রতিনিধি ভুবনমোহিনীর কাছে, যত নূতনত্বের আমদানি করছে ঐ, যত অঘটন ঘটাচ্ছে ঐ। চিত্রা চোখ দুটো বড় বড় করে বলে,—“ভক্তি কি ঠান্দি! আমরা একালে বুঝি ভালোবাসা। ঠাকুর-দেবতার ওপর ভক্তি, সে বোঝা যায়, বাপ-মা আর যারা বড় তাঁদের ওপর ভক্তিও বোঝা যায়, তাঁরা দেবতা, এরা গুরুজন। তা’বলে সোয়ামী, যার সঙ্গে নাকি ভাগাভাগি করে ঘর-সংসার করছি, অষ্টপ্রহর পাশাপাশি থেকে, তাকেও যদি ভক্তি করতে হয় তো ভক্তির চাপে যে দম বন্ধ হয়ে যাবে!”
ভুবনমোহিনী বলেন—“আমরা সব দম বন্ধ হয়ে মারা গেছি!”…চিত্রা হেসে বলে—“মারা ত গেছেনই ঠান্দি, এ বরং আরও সাঙ্ঘাতিক মারা যাওয়া। ‘গুরুদেব-গুরুদেব’ করে ভক্তির চোটে যদি ভালোবাসাটাকেই ফেললাম মেরে, আমাদের জীবনে নাকি সবচেয়ে যা বড় পুঁজি, তাহলে শুধু কাঠামোটা রেখে ফল কি?”
বড় বোমা বলেন—“তুমি চটো বলে তোমায় আরও ক্ষেপায় মা, নৈলে মেয়েটা ভালো, শুনি ত ওদের বাড়িতে। ঠাকুর ঘর থেকে নিয়ে যতীন পর্যন্ত সব দিকে নজর।”
হোক ভালো, তবে ওদের এই ভালোবাসা-ভালোবাসা যে এক অনর্থ হয়েছে একালে এতে আর সন্দেহ থাকে না ভুবনমোহিনীর। আমরা ভালোবাসি—আমরা একালে সব সমান-সমান।…সমানটা কিসে আমায় বুঝিয়ে বল; বয়সে, বিয়ে, না ক্ষমতায়, না বুদ্ধিতে। একটা গালভরা কথা শিখে শাস্ত্ৰ-পুরাণ সব উড়িয়ে পুড়িয়ে দিলে। ভুবনমোহিনী বলেন—“তোরা সমানই বা কোথায়? পা থেকে একেবারে মাথায় উঠেছিস। সমান হলেও ত বুঝতাম।” চিত্রা হেসে বলে—“সেটা আমাদের এ-যুগে এদের একটু বুদ্ধিসুদ্ধি হয়েছে বলে ঠান্দি; বুঝতে পেয়েছে ঐটেই আমাদের ঠিক জায়গা। দেখ না, শিবঠাকুর কত আগে সেটা ধরতে পেরেছিলেন।”
ভালো লাগে না ভুবনমোহিনীর। কড়া হাতেই ধরে আছেন সংসারের লাগাম, তবু ভয় হয়। ওপরে-ওপরে ঠিক থাকলেও ভেতরে-ভেতরে যেন বদলে আসছে বাড়ির হাওয়া। বড় বৌমার পর্যন্ত যেন চিত্রার দিকে টান। চাপবার চেষ্টাই, তবুও কথাবার্তায় প্রকাশ হয়েই পড়ে মাঝে মাঝে। ছোট বোমার সঙ্গে ত গলায়-গলায়।
সবাই যাবে। তবু প্রথম নাতনীটিকেও যদি নিজের হাতে বিদেয় করে যেতে পারেন, নিজের মনের মত করে, তাহলেও একটা সান্ত্বনা থাকে। ঘটক লাগিয়েছেন চারিদিকে। এদিকে মুক্তকে একেবারে নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। মেয়েটি খুবই ভালো। একে এই বাড়ির রসে পুষ্ট, তার ওপর পিতামহীর খাস তত্ত্বাবধানে, দু’দিন ইস্কুলে গিয়ে, মনে কোথাও যদি ছোপ-ছাপ একটু ধরেছিল, সব নিঃশেষে মুছে গিয়ে সেবাময়ী ভক্তিমতী বধূ এবং নিষ্ঠাবতী গৃহিণী জীবনের জন্য তোয়ের হয়ে উঠতে লাগল।
বিবাহেরও ঠিক হ’ল। অনেকগুলি পাত্রের মধ্যে থেকে নিজেই একটিকে বেছে নিলেন ভুবনমোহিনী।
বাড়ির চাল একেবারে পুরনো, যতদূর খবর পেলেন ছোট বৌয়ের মত কেউ এখনও ঢুকতে পায় নি বাড়িতে। এদিকে ভুবনমোহিনী একা, ওদিকে ছেলের পিতামহ-পিতামহী উভয়েই বেঁচে।
ছেলেটিকেও দেখলেন, ফটো আনিয়ে। বেশ লম্বা-চওড়া, এদিকে উঠতি বয়সে যে গুম্ফ-শ্মশ্রুর আবির্ভাব হয়েছে মুখে, তার কোনটিতেই হাত দেয় নি। সব মিলিয়ে যে একটা অটল গাম্ভীর্যে সৃষ্টি হয়েছে তাতে বোঝা যায়, একালের মেয়েদের মিনমিনে ভালোবাসায় ভোলবার পাত্র নয়; কড়ায় গণ্ডায় ভক্তি-নিষ্ঠা সেবা-বাধ্যতা আদায় করে নিয়ে তবে ছাড়বে। এদিকে বিদ্যেরও ওজন আছে, চারটে পাশ।
দূরের দিকে গেলেন না ভুবনমোহিনী। দুটো গ্রাম পেরিয়েই ছেলের বাড়ি। ওদিকে দাদাশ্বশুর দিদিশাশুড়ী রইলেনই, এদিক থেকে ইনিও এক রকম দিনের-দিনের হিসাব রেখে যেতে পারবেন।
ঠিকুজি মিলিয়ে দেখা গেল—রাজঘোটক। তা হবেই, নইলে এত তোড়জোড় করলেন কিসের জন্য ভুবনমোহিনী।
যথাপদ্ধতি দিন ক্ষণ দেখে বিবাহ হয়ে গেল।
কিন্তু ভম্মে ঘি ঢালা হ’ল।
ছেলেটি মন্দ ত নয়, বরং আর সব দিক দিয়ে ভালোই, তবে ভুবনমোহিনীর সন্দেহ কোন্ ফাঁকে কি করে ভক্তির জায়গায় ভালোবাসা সাঁদ করিয়ে বসে আছে। প্রথম ত মাসখানেক না যেতে যেতে ভক্তি নিষ্ঠা আদায় করবার দুটো অস্ত্র একেবারে ঘুচিয়ে ফেলল। একটা আঘাত পেলেন ভুবনমোহিনী।
“হ্যাঁ রে মুক্ত, একি তোর আবদার নাকি? গোঁফ দাড়িতে অমন দিব্যি পুরুষালি চেহারা ছিল নাতজামাইয়ের…”
মুক্ত বলে—“আমি কেন বলতে গেলুম?”
কোথা থেকে চিত্রার ওপর গিয়ে রাগটা পড়ে, তাকেই ঠেস দিয়ে বলেন ভুবনমোহিনী –“না, তোদের মুখে আজকাল সমান-সমানের বুক্নি বড় শুনি কিনা, তাই জিগ্যেস করছি। …আর আলাদা কিছু রইল না ত। এবার নাকে নাকছাবি দিয়ে কানে দুটো দুল ঝুলিয়ে দিলেই হব।”
দিন যায়। ভুবনমোহিনী যেন কেমন-কেমন মনে হয়! মেয়েটা ভাবে গতিকে যেন চিত্রার দিকেই আস্তে আস্তে এগুচ্ছে। সর্বনাশের সূচনা হয়েছে। ভুবনমোহিনীর মনটাও যেন অন্য রকম হয়ে আসছে। তেমন স্পষ্ট কিছু নয়, তবু যেটা চিত্রার মধ্যে খারাপ লাগত, মুক্তর মধ্যে যেন তত খারাপ লাগতে চাইছে না, ভয় পান। ভয় পান বলেই, নিজের ওপর কড়া হয়ে ওঠেন, আরও আগ্রহ করে জিগ্যেস করেন
—“তা হ্যা রে মুক্ত, যেমন যেমন বলে দিয়েছি, করে যাচ্ছিস ত?…সকালে পায়ের ধুলো নিয়ে ওঠা। রাত্তিরে শোবার আগে একটু পা দুটো টেনে নিয়ে টিপে দিলি …”
বলতে চায় না মুক্তকেশী। তারপর শপথ দেওয়ায় বিরক্ত হয়ে বলে— “দিলে তবে ত ও-সব করব।”
—“দেবে না কি রে! ও-সব যে ওদের পাওনা। সেই কোন্ রামায়ণ-মহাভারতের যুগ থেকে পেয়ে এসেছে।…বলে কি?”
বলতে চায় না মুক্ত, তারপর শপথ দেওয়ায় বলে—“বলে, ওসব কেন? দাসী নাকি?”
—“দাসী নয়। হ’ল কি এরা কালে-কালে!”
—এত বিস্মিত হয়ে পড়েন ভুবনমোহিনী যে আর বাক্যস্ফুর্তিই হয় না।
এদিকেও চেষ্টার ত্রুটি করেন না। কাছেই শ্বশুরবাড়ি, যাওয়া-আসা লেগেই রয়েছে নাতজামাইয়ের। খানিকটা ঠাট্টার ওপর দিয়েই চলে।
—“এই বেশ হয়েছে, সইকে ত আর সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারল না নাতনী আমার।… …তা কি পাতানো হ’ল নাতজামাইয়ের সঙ্গে—আতর, না গঙ্গাজল?”
ছেলেটি মুখচোরা, মাথা নীচু করে শুধু হাসে। উপদেশ-পরামর্শও চলে—“সময় থাকতে কাজ বাগিয়ে নাও ভাই; এই যে বয়েস, এই সময় মনটা থাকে নরম, যেদিকে নোয়াবে সেদিকেই নুইবে। দেখচ ত অবস্থা চারিদিকে, দেখে শিখতে না পার, ঠেকে শেখা, সে বড় ঝঞ্ঝাট।”
ওসকানিও থাকে—“শিখিয়ে-পড়িয়ে হাতে তুলে দিয়েছি। এখন শুধু নজর রেখে যাওয়া। কড়া হাতে আদায় করে নেবে। তোমাদের দাদু-দাদামশাইরা জানত। ওকি, পুরুষের হাতও যদি চুড়ি-পরা হাতের মতন নরমই হ’ল ত তফাতটা আর রইল কোথায়?…মাঝে মাঝে উপদেশ দেবে সোয়ামী-স্ত্রীর সম্বন্ধটা কি—গীতায় শ্রীকৃষ্ণ সোয়ামীকে কি বলে গেছেন…”
উত্তরে সেই এক ধরনের হাসি।
রাগ ধরে বৈকি; করে-কর্মে দিলেন এত করে, সব নষ্ট হতে বসেছে; চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, কোন ফল হচ্ছে না, শুধু ঐ হাসি। রাগই ধরে, তবে কিছু বলতে পারেন না, ঝালটা ঝাড়েন নাতনীর ওপর
—“বিগড়ে দিচ্ছ বাপু। মেয়েছেলে সে পুরুষের সঙ্গে ঘর করবে এই হ’ল নিয়ম। ‘দাসী নও, মাথার মণি’—ওসব এখন শুনতে বেশ মিষ্টি। কথায় ভুলে, নিজের কাজ ভুলে যদি সত্যি মাথার মণি হয়ে বসো, তখন ঐ পুরুষই বলবে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচি। তার চেয়ে যেখানে ঠাঁই নিবে সেখানেই থাকি সেই ভালো।…আর বলে ও-সব কথা?”
উত্তর দেয় না মুক্ত, তার পর পীড়াপীড়ি করায় বলে—“এখন উল্টো বলে।”
“উল্টো মানে!…উনিই দাস তোমার, এই ত?”
মুক্তকেশীর মাথাটা একটু নীচু হয়ে যায়।…খুব এমন রাগের কথা নয়, বোধ হয় কিছু মনেও পড়ে যায় ভুবনমোহিনীর। তবে রেগেই যান; সে ছিল প্রবল অধিকারবোধের মধ্যে, এক-আধবার শুধু মুখে বলে ফেলা; আর এ হ’ল সত্যিই হীন দাসত্ব—এত চেষ্টা সত্ত্বেও যার উপায় করতে পারছেন না ভুবনমোহিনী। রেগেই যান, মুখটা কুঞ্চিত করে বলেন—“ঘেন্নায় মরি! কি! হ’ল এরা গো! পুরুষ, না, কি?…তা বলুক গে, তোকে যেমন বলে দিয়েছি জোর করে পা দুটো টেনে নিয়ে…”
“দেয় না যে কোন মতেই—আমি কি করব?”
ভুবনমোহিনী একেবারে ফেটে পড়েন—
“কিচ্ছু করতে হবে না তোমায়। বলবে তুমি, এবার ভোলানাথ শিবের মতন বুক পেতে শোও, আমি রণরঙ্গিনী হয়ে ধেই ধেই করে নাচি। এ সব মেনীমুখে পুরুষদের বরাতে তাই আছে।…এত বলছি, এত করছি, কোনমতেই ধাতে আনতে পারছি না গা।”