আনন্দ-নট

রাজকন্যা

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

ভেতর দিকে আর ভালো জায়গা নেই, শহরটা তাই এবার বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তর দিকে যে একটা বস্তি ছিল, বস্তির মালিক সেটা পরিষ্কার করিয়ে নিয়ে জমিটা টুকরো টুকরো করে বিলি করে দিয়েছেন। বাড়ি-ঘর উঠছে; কোনটার বনেদ পর্যন্ত উঠেছে, কোনটার আর একটু বেশী; একখানা শেষ হয়ে গেছে। দোতলা নূতন ফ্যাশানের ভালো বাড়ি। দোর গোড়ায় ভরা কলসি, কলা গাছ। আর অন্য সব মাঙ্গলিক। বাড়িওলা কৃষ্ণধনবাবু নূতন গৃহ প্রবেশ করেছেন।

জায়গাটা খুব ফাঁকা। শহরের দিকে একটা জল পড়ে, কলোনীটা গড়ে উঠলে এটাকে নাকি লেক করে দেওয়া হবে; পেছনের দিকটায় টানা ক্ষেত। লোকজনও নেই; বস্তির লোকেরা উঠে গেছে, এদিকে নূতন বাসিন্দাও আসে নি; সমস্ত দিন এক রকম খাঁ-খাঁ করতে থাকে, রাত্রে একেবারে নিঝুম।

কৃষ্ণধনবাবুর পরিবারটি মাঝারি গোছের। ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, পুত্রবধূ প্রভৃতি নিয়ে জন দশেক। এদিকে সোফার, পাচকঠাকুর, চাকর, ঝি, আরদালী, মালী নিয়ে জন ছয়। কুকুর আছে এক জোড়া, এ্যালশেসিয়ান; বন্দুক আছে।

আর আছে রাখু, নাতি। লোকজন কুকুর বন্দুক থাকা সত্ত্বেও গৃহিণী শহর ছেড়ে এই তেপান্তরে এখন এসে উঠবেন কিনা ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না, রাখু সাহস দিল—“তুমি চল, কিছু ভয় নেই, এই যে আমি আছি।”

ছেলেটির মনটা এ্যাড‍্‍ভেঞ্চারে ঠাসা একেবারে। এমনি তার কাজ হ’ল দুপুরে আর সন্ধ্যায় ঠাকুরমার কাছে গল্প শোনা আর বাকি সময়টা খেলনা বন্দুক নিয়ে ডাকাত আর রাক্ষসদের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো; এখানে এসে—বোধ হয় ঠাকুরমা তার ভরসায় এসেছে এই ধারণায়; খোঁজাখুঁজিটা আরও গেছে বেড়ে। নূতন জায়গা, সবাইকে একটু অন্যদিকে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাইতে অবাধে খোঁজাখুঁজির একটু সুবিধাও হয়েছে। জায়গাটাও এমন যে দৈত্য, ডাকাত—এদের প্রাচুর্য্য কল্পনা করে নিতে মোটেই বাধে না। লোকজন নেই, তার কারণ এরা সব এখানে-ওখানে যে লুকিয়ে আছে,—ঐ নূতন বাড়িটার এলোমেলো দেয়ালের পেছনে, দূরের ঐ তেঁতুল গাছটার ঝাঁকড়া মাথার মধ্যে। আরও দূরে ঐ যে চিকচিক করছে জল, ওর মধ্যে।

জলাটাই সবচেয়ে বেশী করে রাখুর মনকে দেয় নাড়়া, ওর কল্পনাকে তোলে জাগিয়ে। ঠাকুরমার কাছে শোনা গল্পটা ঐখানটায় এসে যেন সত্য হয়ে ওঠে। ঐখানে জলের মধ্যে দিয়ে অনেক নীচে, অনেক নীচে ডুবে গেলে, গিয়ে দেখা যাবে প্রকাণ্ড বাড়ি, তার চারিদিকে দৈত্যরা দিচ্ছে পাহারা; তাদের চোখ এড়িয়ে সেই একটা ঘরে পৌঁছে গেলে দেখা যাবে, রাজকন্যা সোনার পালঙ্কে শুয়ে ঘুমুচ্ছে, তার মাথার কাছে সেই সোনার কাঠি, রূপার কাঠি…

এই গল্পটাই বেশী করে আজকাল শোনে ঠাকুরমার কাছে রাখু, মনে হয়, কোথা থেকে ঘুরে ঘুরে, কি করে ঠিক সেই জায়গাটায় এসে গেছে, এইবার একদিন নেমে গেলেই হয়। তারপর কি করে কোথা দিয়ে যেন কিসব হয়ে যাবে, দেখবে সে একেবারে দৈত্যে-ঘেরা পুরীর মধ্যে রয়েছে দাঁড়িয়ে। ঠাকুমার গল্প উঠবেই একদিন সত্যি হয়ে এবার।

—ঐ জলের অতলে কিম্বা ঠিক উল‍্‍টো দিকে ঐ ঝাঁকড়া-মাথা প্রকাণ্ড তেঁতুল গাছের তলায়, দিনের বেলাও সেখানে দৈত্যরা অন্ধকারে ছায়া মুর্তি ধরে থাকে লুকিয়ে, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আরও দৈত্যরা ছায়া-রূপ ধরে এসে জড়ো হয়।

একদিন বিকালে হঠাৎ বাড়িতে সোরগোল পড়ে গেল,—রাখুকে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর ঘুরে বেড়ানো একটা রোগ আছে জানে সবাই। আগেকার বাড়িতে অদৃশ্য হয়ে যেত মাঝে মাঝে। কিন্তু সে অল্প পরিসর জায়গা, একটু খোঁজাখুঁজির পর সন্ধান মিলে যেতো; চিলের ছাতের সিঁড়িতে, কিম্বা অন্য কোন নিরিবিলি জায়গায় চুপটি করে বসে আছে, হাতে বন্দুকটা, কিম্বা হয়তো পাশে রাখা, দৃষ্টি কোন সুদূরে। ক্ৰমে গা সওয়াও হয়ে গিয়েছিল, কেউ আর খুঁজত না; খুঁজলেও জায়গা গুলো চেনা থাকায় উৎকণ্ঠিত ভাবটা কেটে গিয়েছিল একেবারে। এখানে এই নির্জন পল্লীতে এসে ওর ঐ যাযাবর বৃত্তিটা যে কত বিপজ্জনক সবাই এই যেন প্রথম উপলব্ধি করল। বেশ একটু হৈ-হৈ পড়ে গেল।

রাখুকে পাওয়া গেল ঝিলের ধারে। একটা বাবলা গাছের চারিদিকে কিছু আগাছার ঝোপ-ঝাড় হয়ে একটা আড়াল সৃষ্টি করেছে, তার ওদিকে ঝিলের সামনাসামনি হয়ে বসে আছে রাখু।

একচোট খুব বকাবকি হ’ল—বাবা-কাকাদের হাতের চাপড়টা-আসটাও পড়ল গোটাকতক, কড়া পাহারার মধ্যে এ্যাডভেঞ্চার কটা দিন পঙ্গু হয়ে রইল। তারপর আবার একদিন সবার দুশ্চিন্তাটা চতুর্গুণ হয়ে এল ফিরে। এবার ঝিলে জাল পর্যন্ত টানতে হ’ল। রাখু অদৃশ্য হয়েছে আবার।

কাহিনীর এ অংশটা রাখুর দিক থেকে বললেই বুঝতে সুবিধা হবে—

দুপুরবেলা। খাওয়া-দাওয়া করে বাবা কাকা আর দাদারা অনেক আগে বেরিয়ে গেছে—বাবা আর কাকারা চামড়ার ব্যাগ হাতে করে, দাদারা বই নিয়ে, যেমন যায় রোজ। বাড়ির আর সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমুচ্ছে, ঠাকুরমাও গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ল। অন্য দিন রাখুও পড়ে ঘুমিয়ে, আজ কি হয়েছে ঘুমের পরী তার চোখের কাছ দিয়েও যায় নি। ঘরের মধ্যে বিলাতী খেলার সরঞ্জাম, খানিকটা নাড়াচাড়া করল নিয়ে, তারপর জানালার ধারটিতে গিয়ে বসল।

দোতালার ঘর, নীচে অনেক দূর পর্যন্ত যায় দেখা। বাড়ি থেকে খানিকটা এগিয়ে আর একখানা যে বাড়ি তোয়ের হচ্ছে তাতে লোকজন খাটছে, তার পরেই যতদুর দৃষ্টি যায় একেবারে নির্জন। সাদা রোদ রয়েছে চারদিকে ছড়িয়ে, এত বেশী করে ঘুমন্তপুরীর কথা মনে পড়ছে, রাখুর সে মনটা যেন আইঢাই করছে। ওর বদ্ধ ধারণ’, ঝিলের দিকে পা বাড়ানো যে কড়া রকমের বারণ, নৈলে এতদিন কোন না-কোন উপায়ে আনতই উদ্ধার করে রাজকন্যাকে।

ভাবছিল বসে; ভাবতে-ভাবতে বন্দিনী রাজকন্যার জন্য মনটা করুণায় ভরে উঠেছে, এমন সময় এক আশ্চর্য ব্যাপার হ’ল। রাখু বসেছিল বিলের ঠিক উলটো দিকে মুখ করে; ঝিলের দিকে চাইতে পর্যন্ত মানা করে কাকা ওদিককার জানলা সব বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকেও যে দেখবার কিছু নেই এমন নয়; সেই তেঁতুল গাছটা রয়েছে নিজের গায়ে অন্ধকার জড়িয়ে। তারই গোড়ায় দৃষ্টি ফেলে বসে ছিল রাখু—এমন সময় একটি মেয়ে গাছতলার ঝোপের মধ্যে থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল, তারপর কিসের জন্যে বেরিয়ে আসা সেটা টের পাওয়ার আগেই তেমনি হঠাৎ আবার ঝোপের মধ্যে গেল সেঁদিয়ে।

এইটুকু, কিন্তু এইতেই রাখুর চিন্তার স্রোত একেবারে গেল ঘুরে। ওর মনে হ’ল ঠাকুমার মুখের গল্পটা আরও সত্যি হয়ে উঠে, ওর একেবারে কাছাকাছি গেছে এসে। রাজকন্যাকে কেউ উদ্ধার করে এনেছে।

কিন্তু উল্লাসের চেয়ে করুণায় রাখুর মনটা গেল আরও যেন গলে। ঐ এক নজরে যতটুকু পেল দেখতে তাতে মনে হ’ল কন্যার গয়নার ঘটা ত নেই-ই, গায়ে একখানা জামা পর্যন্ত নেই, আর তার চেয়েও যা মর্মান্তিক, ওর কোমরে নিতান্তই মলিন, ছিন্ন একখানি যেন ন্যাকড়া জড়ানো। রাজকন্যা মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু একেবারে রিক্ত হয়ে। অস্থির হয়ে পড়ল রাখু। ইচ্ছা করে নেমে ছুটে যায়, জিগ্যেস করে—তোমার এ দশা কে করেছে? কিন্তু সে নিজেই ত বন্দী। সমস্ত দুপুরটা জানলায় নিরুপায় ভাবে বসে চিন্তা করতে লাগল। নিজে বন্দী বলে আরও যেন আপন বলে মনে হচ্ছে ওকে, ক্রমে এও মনে হ’ল সেও মুক্ত নয়। জলের মধ্যে ও এক দেশের দৈত্যদের কবলে ছিল, এখন অন্য দেশের দৈত্যরা ওকে তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনে এই রকম নিঃস্ব করে দিয়ে নিজেদের পাহারায় রেখেছে আটকে, তেঁতুল গাছের অন্ধকার হয়ে সে দৈত্যরা থাকে লুকিয়ে।

সেদিন আবার বাড়িতে একচোট সোরগোল উঠল। ঝিলের ধারের সেই ব্যাপারটার পর কয়েকটা দিন কেটে গেছে। রাখু তার বন্দুক নিয়ে বাড়িতেই অশেপাশে থাকে, বন্দুকের শব্দ হয় মাঝে মাঝে, সবাই নিশ্চিন্ত থাকে, নজর রাখার দরকারই হয় না, সেদিন কিন্তু হঠাৎ কাজকর্মের মধ্যে কারুর কারুর খেয়াল হ’ল শব্দ যেন অনেক ক্ষণ কানে আসে নি। খোঁজ পড়ে যেতে দেখা গেল, কাছে পিঠে কোথাও নেই রাখু।

সেদিন ত কি হয়েছিল, তার চতুর্গুণ হৈ চৈ পড়ে গেল বাড়িতে। কর্তারা আফিস থেকে ছুটে এলেন, ছেলেরা স্কুল কলেজ থেকে। চারদিকে লোক ছুটিয়ে দেওয়া হ’ল, থানায় খবর দেওয়া হ’ল, ঝিলে জাল ফেলাও হ’ল, কোন স্থানেই কোন সন্ধান না পেয়ে সবাই হাত পা এলিয়ে দিয়েছে, কান্নাকাটিও পড়ে গেছে বাড়ির ভিতর, এমন সময় সামনের বাড়িতে যে মজুরেরা খাটছে, তাদের একজনের মুখে খবর পাওয়া গেল, সে একটি ছেলেকে রতন বাউড়ির বাড়ির দিকে যেতে দেখেছে, জুতা জামা পরা, হাতে একটা বেশ বড় খেলনার বন্দুক, সঙ্গে একটা বড় কুকুর। সবার হুঁশ হ’ল, এ্যালসেশিয়ানের একটা রয়েছে বাঁধা, আর একটা—সেটাকে নিয়ে রাখু বেশী ঘাটাঘাটি করে, সেটা ত নেই।

কিন্তু রতন বাউড়ি কে? তার বাড়িই বা কোথায়?

ওর কাছেই খোঁজ পাওয়া গেল—বুড়ি রতন বাউড়ি দিনমজুরি করে খায়, একেবারে শেষের দিকে যে বাড়িটা উঠছে, আজকাল সেই বাড়িটাতে খাটছে, সংসারে নিজের বলতে ছোট্ট একটি নাতনী; রতনের বাড়ি ঐ তেঁতুল গাছের নীচে।

একদল ছুটল সেই দিকে। হতে-করতে এদিকে রোদও প্রায় মিলিয়ে এসেছে আকাশে।

রতন বাড়ির বাড়ি বলতে—তেঁতুল গাছের ওপাশটার ঝোপঝাড়ের মাঝে একটু জায়গা পরিষ্কার করে একখানি কুঁড়ে ঘর, কঞ্চি আর খড়ের ওপর মাটি লেপা দেওয়াল, চালে আছে কিছু খড় কিছু তালপাতা, আর একখানা ছেঁড়া মাদুর।

নীচে এক টুকরো ছেঁড়া মাদুরে রতন বাউড়ির নাতনী ঘুমুচ্ছে। ফুটফুটে না হোক, ধুলো-ময়লার নীচে রংটা একটু কটাই, মাথার চুলটা রুক্ষ, আর সেই জন্যেই তামাটে। কোমরে যে ছেঁড়া ন্যাকড়াটুকু রয়েছে সেটা না থাকলেও ক্ষতি ছিল না।…রতন বুড়ি এখনও মজুরি খাটছে নিশ্চয়।

পাঁচ রকম ডালপালা দিয়ে ঘেরা ছোট্ট উঠোনটুকুর মাছখানে প্রকাণ্ড এ্যালসেশিয়ানটা থাবা পেতে বসে আছে। ও-জাতের কুকুর একজন লোককেই চেনে, একটা হুকুমই মানে। এরা গিয়ে পড়তে একবার ঘুরে দেখে নিয়ে ল্যাজটা একটু নেড়ে আবার থাবায় মুখ চেপে বসল।

রাখুও পাশে দাঁড়িয়ে। হাতে বন্দুকটা রীতিমতো ট্রিগার টেনে ধরা। গম্ভীরভাবে একেবারে তদ্‌গত হয়ে সামনে ছিল চেয়ে, এরা গিয়ে পড়তে একবার হাত উঁচিয়ে ফিসফিস করে বলল—“চুপ, এখন ঘুমুচ্চে।”

সবাই অবাক হয়ে রইল দাঁড়িয়ে।

রাজকন্যা ঘুমুচ্চে। কঞ্চি-খড়ের দেয়ালের ছেঁদা দিয়ে পড়ন্ত রোদের একটা রেখা সেঁদিয়ে গায়ের ওপর আস্তে আস্তে যাচ্ছে মিলিয়ে।

রাজকন্যা ❀ আনন্দ-নট ❀ এডুলিচার পাঠশালা