নভেম্বর, ১৯৭১ থেকে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক সহায়তা অনেক বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভারত এবং পাকিস্তান বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে ভারত আক্রমণের চেষ্টা করে। এর ফলে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রথমে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভুটান সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের অনেক জায়গা দখল করে নেয়। এবং করাচি ও লাহোরের সংযোগ সড়কের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়া হয় এবং ভারতীয় নৌবাহিনী করাচি বন্দরে বারবার আক্রমণ চালায়। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সব বিমান দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিমানবন্দরগুলোতে লুকিয়ে রাখা হয়। এর ফলে পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ভারতীয় নৌবাহিনী একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণের সহায়তায় ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে কয়েকটি সেনাছাউনির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এই অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন গভর্নর আবদুল মোতালেব মালিক ইস্তফা দেন। জেনারেল নিয়াজি ও রাও ফরমান আলী আত্মসমর্পণ করে বাংলাদেশে যুদ্ধরত পাকিস্তানি সৈনিকদের বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা নেন। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলবেলা পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক সর্বাধিনায়ক জেনারেল নিয়াজি ভারতের পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। ১৬ ডিসেম্বর আমি এবং কামাল সিদ্দিকী থিয়েটার রোড অফিসে সকালবেলা খোঁজখবর নিতে যাই। দুপুর ১২টার দিকে সংবাদ আসে যে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য অনুরোধ আসে। ওই দিন বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী একটি হেলিকপ্টারে করে সিলেট সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ পরিচালনা করছিলেন। এ সময়ে পাকিস্তান বাহিনীর গুলিতে হেলিকপ্টারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই আক্রমণে ওসমানীর গায়ে কোনো আঘাত লাগেনি কিন্তু তার সঙ্গী ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ কর্নেল এম এ রব আহত হন। তাই জেনারেল ওসমানীর পক্ষে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। যদি জেনারেল ওসমানী কলকাতায় থাকতেন, তাহলেও তিনি ভারতীয় সেনানায়কের কনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এই অনুষ্ঠানে যেতেন কি না, সন্দেহ রয়েছে।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকারও তখন কলকাতায় ছিলেন না। তিনি ব্যারাকপুরে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁকে দ্রুত কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি যখন ঢাকায় যাওয়ার জন্য থিয়েটার রোডের অফিস থেকে যাচ্ছিলেন, তখন আমরা সেই অফিসে ছিলাম। গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকার যাওয়ার পর আমরা নিশ্চিত হই যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অবশ্যই আত্মসমর্পণ করবে। আমরা বাসায় ফিরে গিয়ে রেডিওর সামনে বসে পড়ি। রেডিওতে ঘোষণা এল শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হলো।[১]
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑মুক্তিযুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনার জন্য পড়ুন : (১) B.Z. Khasru, Myths and Facts Bangladesh Liberation War, 2010 (Rupa Publications India Pvt. Ltd.), () Srinath Raghavan, A Global History of the Creation of Bangladesh, 2013, (Permanent Black) (৩) মেজর জেনারেল (অব.) এস এস উবান, ফ্যান্টমস অব চিটাগং দি ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ, ২০০৫ (ঘাসফুল নদী)