পুরানো সেই দিনের কথা

ত্রয়োদশ অধ্যায়

মুজিবনগর সরকারের বিবর্তন

আকবর আলি খান

মুজিবনগর সরকার প্রথমে শুরু হয়েছিল একটি ছোট সরকার হিসেবে। মন্ত্রিপরিষদে মাত্র পাঁচজন সদস্য ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, এম মনসুর আলী ছিলেন অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কামারুজ্জামান ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু মন্ত্রীদের কাজও আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ১৯৭১ সালের ২০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংগঠন এবং কার্যাবলির ওপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রতিবেদন পেশ করে। এই প্রতিবেদন থেকে বাংলাদেশ সরকারের গঠন সম্পর্কে একটি চিত্র পাওয়া যায়।

  1. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
  2. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
  3. অর্থ ও শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
  4. মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়
  5. সাধারণ প্রশাসন বিভাগ
  6. স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়
  7. তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়
  8. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
  9. ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়
  10. সংসদবিষয়ক বিভাগ
  11. কৃষি বিভাগ
  12. প্রকৌশল বিভাগ[১]

মন্ত্রণালয়ের বাইরে আরও কয়েকটি সংস্থা ছিল, যারা সরাসরি মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীনে কাজ করত। যেমন :

  1. পরিকল্পনা কমিশন
  2. শিল্প ও বাণিজ্য বোর্ড
  3. নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, যুব ও অভ্যর্থনা শিবির
  4. ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি
  5. শরণার্থী কল্যাণ বোর্ড।[২]

এ ছাড়া ১৫টি সংগঠন বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে কাজ করছিল। এই সংগঠনগুলো নিম্নরূপ :

  1. যুব নিয়ন্ত্রণ পরিষদ ও প্রশিক্ষণ বোর্ড
  2. বাংলাদেশ হাসপাতাল
  3. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
  4. জয় বাংলা পত্রিকা।
  5. বাংলাদেশ বুলেটিন
  6. বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী সংগঠন
  7. বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি
  8. স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল
  9. বঙ্গবন্ধু শিল্পী গোষ্ঠী
  10. বাংলাদেশ তরুণ শিল্পী গোষ্ঠী
  11. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কুশলী সমিতি
  12. বাংলাদেশ সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী পরিষদ।
  13. নিউইয়র্ক বাংলাদেশ লীগ
  14. বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি, লন্ডন
  15. লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্টসিয়া।

এ তালিকার বাইরে একটি ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বিভাগ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ডাকটিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনীতে তিন ধরনের সদস্য ছিল। এক ধরনের সদস্য ছিল নিয়মিত বাহিনীর সদস্য। এরা পাকিস্তান বাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের বাঙালি সদস্যদের নিয়ে গঠিত ছিল। মুক্তিবাহিনীকে ১১টি সেক্টরে মোতায়েন করা হয়। তিনজন বিশিষ্ট সেনা অফিসারের আদ্যক্ষর দিয়ে অতিরিক্ত বাহিনীর নামকরণ করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের নামে করা হয়েছিল জেড ফোর্স, খালেদ মোশাররফের নামে করা হয়েছিল কে ফোর্স এবং সফিউল্লাহর নামে করা হয়েছিল এস ফোর্স। এ ছাড়া আর দুই ধরনের বাহিনী ছিল। ছাত্র-তরুণ অসামরিক ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ যারা রাজনৈতিকভাবে শেখ মনি, সিরাজুল আলম খান এবং তোফায়েল আহমেদের অনুগত ছিলেন, তাঁরা ‘মুজিব বাহিনী’ বা ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ নামে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া নৌকমান্ডো এবং নৌবাহিনীর লোকজনও মুক্তিফৌজে ছিল। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অফিসার ও সৈনিকেরা বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গড়ে তোলেন। সব নিয়মিত বাহিনী মিলে কমপক্ষে ২৫ হাজার সৈনিক ছিল।

এই নিয়মিত বাহিনীর বাইরে ছিল যুব ক্যাম্প। সারা দেশে সীমান্ত ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরে ১০০টি ইয়ুথ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিটি ইয়ুথ ক্যাম্পের ধারণক্ষমতা ছিল ১ হাজার। সুতরাং ইয়ুথ ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ তরুণকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। এই ইয়ুথ ক্যাম্পগুলোর পরিচালনার দায়িত্বে ছিল প্রফেসর ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে একটি বোর্ড। প্রতিটি ইয়ুথ ক্যাম্পে কমপক্ষে একজন জাতীয় পরিষদ সদস্য ও একজন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য যুক্ত থাকতেন। ইয়ুথ ক্যাম্পকে সমর্থন করার জন্য প্রতিটি ক্যাম্পে অসামরিক কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই বাংলাদেশে নিম্নলিখিত প্রশাসনিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হয় :

(১) দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল (১), সদর দপ্তর : সাবরুম

(ক) চট্টগ্রাম (খ) পার্বত্য চট্টগ্রাম (গ) নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমা

(২) দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল (২), সদর দপ্তর : আগরতলা

(ক) ঢাকা (খ) কুমিল্লা (গ) ফেনী মহকুমা ব্যতীত নোয়াখালী জেলা

(৩) পূর্ব অঞ্চল, সদর দপ্তর : ধর্মনগর।

(ক) হবিগঞ্জ (খ) সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মহকুমা

(৪) দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল (১), সদর দপ্তর : ডাউঁকি

(ক) সদর (খ) সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমা

(৫) দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল (২), সদর দপ্তর : তুরা

(ক) ময়মনসিংহ (খ) টাঙ্গাইল

(৬) উত্তর অঞ্চল (১), সদর দপ্তর : কোচবিহার

(ক) রংপুর

(৭) পশ্চিম অঞ্চল (১), সদর দপ্তর : বালুরঘাট

(ক) দিনাজপুর, (খ) বগুড়া, (গ) রাজশাহী

(৮) দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল, সদর দপ্তর : কৃষ্ণনগর

(ক) পাবনা, (খ) কুষ্টিয়া, (গ) ফরিদপুর, (ঘ) যশোর

(৯) দক্ষিণ অঞ্চল, সদর দপ্তর : বারাসাত

(ক) বরিশাল (খ) পটুয়াখালী, (গ) খুলনা[৩]

প্রতিটি অঞ্চলে সব জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়। প্রতিটি আঞ্চলিক পরিষদে একজন জাতীয় পরিষদ সদস্যকে সভাপতি করা হয়। আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আঞ্চলিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। আঞ্চলিক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে সহায়তা করার জন্য নিম্নলিখিত সাতটি কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করা হয় :

  1. আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
  2. আঞ্চলিক শিক্ষা কর্মকর্তা
  3. আঞ্চলিক ত্রাণ কর্মকর্তা
  4. আঞ্চলিক প্রকৌশলী
  5. আঞ্চলিক পুলিশ কর্মকর্তা
  6. আঞ্চলিক তথ্য কর্মকর্তা
  7. আঞ্চলিক হিসাব কর্মকর্তা।

সরকারের নতুন পদ সৃষ্টি ২০ অক্টোবরের পর শেষ হয়ে যায়নি। ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকারের মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেলের পদ সৃষ্টি করা হয়। এর আগে এম নুরুল কাদের সেক্রেটারি, জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পদে নিযুক্ত ছিলেন। অনেক সময় তিনি সেক্রেটারির পরে ‘কমা না দিয়ে সেক্রেটারি জেনারেলের পরে কমা’ ব্যবহার করতেন, যাতে অনেকের মনে হতো এম নুরুল কাদেরই বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। আসলে নুরুল কাদের কখনো সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন না, তার পদমর্যাদা ছিল সচিবের। ১২ ডিসেম্বর সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয় আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলার আসামি এবং ১৯৪৯ ব্যাচের সিএসপি অফিসার রুহুল কুদ্সকে।

টিকা ও মন্তব্য

  1. ১.↑
    এইচ টি ইমাম, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, ২০০৪ (ঢাকা : আগামী প্রকাশনী), পৃষ্ঠা-৬৫-৬৬।
  2. ২.↑
    এইচ টি ইমাম। ২০০৪। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৫২
  3. ৩.↑
    এইচ টি ইমাম। ২০০৪। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫১৯-৫২৪।