কলকাতায় একনাগাড়ে ছিলাম প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস। বদলি হয়ে জুলাইয়ের মাঝামাঝি যখন কলকাতায় এলাম, তখন অনেক মুক্তিযোদ্ধাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকেই আশা করেছিলেন যে বর্ষাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে দুটি কারণে টিকতে পারবে না। প্রথমত, পাকিস্তানি সেনারা সাঁতার জানে না। সুতরাং, বর্ষাকালে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল পানিতে ডুবে গেলে তারা চলাফেরা করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা জলাভূমিতেই বড় হয়েছে। সুতরাং এখানে লুকিয়ে থেকে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অনায়াসে আক্রমণ করতে পারবে। বাস্তবে দেখা গেল বর্ষাকালে পাকিস্তান। সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যন্ত্রচালিত নৌযান দিয়ে তারা পুরো। দেশ পাহারা দিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ফলে এই সময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়।
আবাস
কলকাতায় আমি এসে উঠি আমার চাচাতো বোন হেনা বুজির ৪ নম্বর পার্ক সার্কাস অ্যাভিনিউয়ে সোহরাওয়ার্দী ভবনে। দেশ বিভাগের আগে এই ভবনে থাকতেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সোহরাওয়ার্দী। তাঁর একমাত্র সন্তান ছিলেন আইসিএস কর্মকর্তা ইকরাম উল্লাহর পত্নী শায়েস্তা ইকরাম উল্লাহ। তার মৃত্যুর পর শায়েস্তা ইকরাম উল্লাহ বাড়িটির মালিক হন। পাকিস্তান সরকার তার কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে একজন প্রথম সচিব ও একজন তৃতীয় সচিবকে দুটি ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করেছে। ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন। কলকাতা পাকিস্তান দূতাবাসের প্রথম সচিব রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। নিচের তলায় থাকতেন আমাদের ব্যাচমেট পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিম চৌধুরী। আনোয়ারুল করিম চৌধুরীর বাড়ি আমরা আসার আগেই শরণার্থীশিবিরে পরিণত হয়েছে। দোতলায় আর আই চৌধুরীর বাড়িতে চারটি কামরা ছিল। একটি কামরায় থাকতেন আর আই চৌধুরী এবং তার পরিবারের ছেলেমেয়েরা। আর দুটি কামরায় থাকতেন মিসেস চৌধুরীর বন্ধু সাজেদা চৌধুরী, তাঁর স্বামী পুত্র-কন্যা ও ভাইসহ। কামরার বাইরে বারান্দায়ও অনেককে শুতে হতো। আরেকটি কামরা হেনা বুজি ভেবেছিলেন আমাকে ও কামাল সিদ্দিকীকে থাকতে দেবেন। কিন্তু খসরুজ্জামান চৌধুরী তার স্ত্রী ও শ্যালককে নিয়ে আসার পর কামরাটি তাঁকে দিয়ে দেওয়া হয়। আর যে দুটি কামরা ছিল, তার একটি কামরা ছিল স্টোর রুম। যেখানে সব জঞ্জাল রাখা হতো। আর ছাদের ওপরে একটি রুমে চাকররা থাকত। খন্দকার আসাদুজ্জামান এসে তার। পরিবারসহ চাকরদের কক্ষে থাকা শুরু করেন। ওপরে টিন দিয়ে তিনি। কক্ষটিকে একটু সম্প্রসারিত করেন। এই কক্ষটি ছিল অসম্ভব গরম।
স্টোর রুমটির ছাদ ছিল নিচু। সেখানে কোনো ফ্যান লাগানো সম্ভব ছিল না। কক্ষটির পরিসরও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। দুটি চৌকি সেখানে ঢোকানো সম্ভব হয়েছিল। আর ছিল একটি চেয়ার, আর একটি স্ট্যান্ড ফ্যান লাগানো হয়েছিল। রুমটি এত গরম ছিল যে স্ট্যান্ড ফ্যানের বাতাসে মোটেও ঠান্ডা হতো না। আমি যখন কলকাতায় আসি, তখন শ্রাবণের শেষ দিক। ভাদ্র মাসে গরম সবচেয়ে বেশি হয়। ওই সময়টায় রাত তিন-চারটা পর্যন্ত ওই কক্ষে ঘুমানো অসম্ভব ছিল। আমি এবং কামাল সিদ্দিকী রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে ১০টার দিকে রুমে ঢুকতাম। সবাই মনে করত আমরা ঘুমাতে গেছি। আসলে ঘণ্টাখানেক গল্পসল্প করে আমরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতাম। পার্ক সার্কাসের এই বাড়িতে পাকিস্তানি রাজাকাররা হামলা করতে পারে–এই ভয়ে সন্ধ্যার দিকে গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হতো। কামালের পিঠে চড়ে প্রতি রাতে আমি গেট টপকাতাম। কামাল এরপর নিজে গেট টপকাত। এরপর আমরা চলে যেতাম রাস্তার অপর পাড়ে, যেখানে পার্ক সার্কাসের ময়দান অবস্থিত। এই ময়দানে শারদীয় মেলা হতো। মেলার অধিকাংশ দোকান সারা রাত খোলা থাকত। মেলায় ক্রেতারা রাত তিন-চারটা পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে এসে জিনিস কিনতেন। আমরা মেলায় হাঁটতাম, খিদে পেলে ফুচকা খেতাম। অনেক সময় শীতল পানীয় দিয়ে তৃষ্ণা মেটাতাম।
কামাল সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর মোনায়েম খানের ওপর যে হামলা হয়, কামাল সিদ্দিকী তার আসামি ছিলেন। তিনি পুলিশের হুলিয়া থেকে বাঁচার জন্য তখন সলিমুল্লাহ হলে মান্নান ভূঁইয়ার রুমে আশ্রয় নেন। তবে তার সঙ্গে তখনো আমার বন্ধুত্ব হয়নি। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় কলকাতায়। এসে। পাশাপাশি দুই চৌকিতে ঘুমাতে গিয়ে। বেশির ভাগ বিষয়েই আমরা একমত ছিলাম। তবে কোনো কোনো বিষয়ে মতভেদও ছিল। মতভেদ এই বন্ধুত্বকে কখনো শিথিল করেনি। আমার সব বিপদ-আপদে আমাকে রক্ষা করার জন্য সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কামাল সিদ্দিকী। সারা জীবন তিনি আমার উপকারই করেছেন, আমি অতি অল্প প্রতিদানই দিতে পেরেছি। তাঁর কাছে আমার ঋণের শেষ নেই।
আহার
সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ে হেনা বুজি বিনে পয়সায় আমাদের আহারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার বাড়িতে তখন প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতি বেলায় খাবার খেত। প্রত্যেক বেলায় খাবারের মেনু ছিল অভিন্ন। প্রতি বেলায় থাকত ভাত, গরুর মাংস, সবজি এবং ডাল। আমরা রাতের বেলা সাধারণত বাসাতেই খেতাম কিন্তু দিনের বেলায় অফিস অঞ্চলে খেয়ে নিতাম। তখন কলকাতায় খাবার ছিল অত্যন্ত সস্তা। দুটি শিক কাবাব, দুটি নান ও এক কাপ চা খেতে কলকাতার ফুটপাতে ১৪ আনা খরচ পড়ত। যেদিন কাবাব খেতে ইচ্ছে করত না, সেদিন রাস্তার আশপাশের রেস্টুরেন্ট থেকে তামিলনাড়ুর খাদ্য দোসা অথবা স্যান্ডউইচ খেতাম। রাতে খাবার একঘেয়ে লাগলে কখনো কখনো আমরা পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। সেখানে বিরিয়ানি খাওয়া হতো, সঙ্গে সঙ্গে গানও শোনা যেত। আগস্ট মাসের পর কামাল সিদ্দিকীর আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কামাল সিদ্দিকীর বড় ভাই মহসিন সিদ্দিকী তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রকৌশলশাস্ত্রে ডক্টরেট করছিলেন। দেশে থাকতে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক মোটেও ভালো ছিল না। কামাল সিদ্দিকী ছিলেন পিকিংপন্থী, মহসিন সিদ্দিকী ছিলেন মস্কোপন্থী। তাই দুই ভাইয়ের মধ্যে ঠোকাঠুকি লেগেই ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মহসিন সিদ্দিকী তার ছোট ভাইয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি এটাসেটা (odd jobs) করে ওয়াশিংটনে অতিরিক্ত অর্থ অর্জন করেন এবং কামাল সিদ্দিকীকে ডলার পাঠান। সেই অর্থ কামাল সিদ্দিকী তার দুর্গত বন্ধুদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। কোনো কোনো দিন সে অর্থ দিয়ে তিনি আমাদের খাওয়াতেন। এবং সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। কলকাতায় থাকতে আমরা বার চারেক সিনেমা দেখতে গিয়েছি। তবে কলকাতায় বাংলাদেশের সব শরণার্থীর জীবন একই ধরনের ছিল না। যারা দেশ থেকে টাকা লুটপাট করে নিয়ে এসেছিল, তাদের অনেকে কলকাতায় চূড়ান্ত বিলাসিতা করেছে। বগুড়ার ট্রেজারি থেকে লুট করা অর্থ নিয়ে এসে একজন অভিনেতা কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলের বার’ একদিন সম্পূর্ণরূপে নিজের জন্য ভাড়া করেছিলেন। তিনি মুম্বাইয়ে গিয়ে বিলাসবহুল হোটেলে রাত কাটিয়েছেন। এ ধরনের অতি অল্পসংখ্যক বাংলাদেশি শরণার্থী সব শরণার্থী সম্পর্কে অনেকের মনে কলঙ্কিত ধারণার জন্ম দেন।