পুরানো সেই দিনের কথা

ত্রয়োদশ অধ্যায়

দিল্লি-আজমির ভ্রমণ

আকবর আলি খান

আগস্ট ১৯৭১ সালের শেষ দিকে হেনা বুজির একমাত্র ছেলে বাপ্পীর কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ কোর্সে ভর্তির সুযোগ হয়। কানাডাতে তার সব খরচের দায়িত্ব নেন রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই ড. চৌধুরী, যিনি তখন মন্ট্রিয়লে একজন বিশিষ্ট হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কানাডায় যাওয়ার জন্য নয়াদিল্লির কানাডিয়ান হাইকমিশনে বাপ্পীকে ইন্টারভিউ দিতে হবে। তাই তার নয়াদিল্লি যাওয়া প্রয়োজন। ভারতে তখন অনেক মুসলমান পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছে। এদের কেউ টের পেলে বাপ্পীকে ছিনতাই করতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত হয় যে বাপ্পীকে একা নয়াদিল্লি যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। বাপ্পীর সঙ্গে আমিও যাব। আমি এক সপ্তাহের ছুটি নিলাম। আমি এবং বাপ্পী রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি রওনা হই। রাজধানী এক্সপ্রেস একটি বিলাসবহুল ট্রেন ছিল। এই ট্রেনের সুযোগ-সুবিধা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশন কনট প্লেসে হোটেল ‘জনপথ’ নামে একটি হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে। হোটেলটিতে এয়ারকন্ডিশনের ব্যবস্থা ছিল। তাই কোনো অসুবিধা হয়নি। বাপ্পীর সঙ্গে আমি বাংলাদেশ দূতাবাসে যাই। নয়াদিল্লিস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি কে এম সাহাবুদ্দিন ও প্রেস কাউন্সিলর আমজাদ হোসেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়ে বেরিয়ে আসেন। নয়াদিল্লিতে একটি বাড়ি ভাড়া করে সেখানে সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের দূতাবাস খোলেন। আমরা যখন দিল্লিতে ছিলাম, তখন প্রতিদিনই দূতাবাসে যেতাম। একদিন বিকেলবেলা দূতাবাসে বসে আছি, তখন দেখতে পেলাম যে একজন। বাঙালি ভদ্রলোক ও একজন বাঙালি ভদ্রমহিলা সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন। তারা সাহাবুদ্দিনের কক্ষে এলে তাদের পরিচয় দিয়ে বললেন। যে ভদ্রলোক হচ্ছেন ছোট ভাই, যিনি মধ্যপ্রদেশে একটি কারখানার জেনারেল ম্যানেজার আর মহিলাটি হচ্ছেন তার দিদি, যার স্বামী রাজস্থানে অধ্যাপনা করেন। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভাই-বোনের কোনো দেখা হয়নি। এই ভাই-বোনের বাড়ি ছিল বরিশালে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তাঁরা ভারতে চলে আসেন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাই ভাই-বোন খুবই উৎফুল্ল হন। তারা ঠিক করেন যে তারা একসঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসে। আসবেন। তাঁরা দিল্লিতে একত্র হয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য এবং তারা দুজন ১০ হাজার টাকা বাংলাদেশ দূতাবাসকে দান করেন। তারা বলছিলেন যে তারা বরিশালে ফিরে যেতে চান না কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ সফল হলে বরিশালে সবাই সুখে শান্তিতে থাকতে পারবে–এটিই হবে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

বাপ্পীর ভিসার কাজ শেষ হলে আমরা প্রথমে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার জিয়ারত করতে যাই। মাজারের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা এবং মাজারে ঢোকার পথে অসংখ্য কুষ্ঠরোগী ভিক্ষা করছিল। নিজামউদ্দিন। আউলিয়ার মাজারে ঢুকতে গিয়ে মোটেই শান্তি পাচ্ছিলাম না। তবে ঢোকার পর মনে হলো যে এই মাজারে শাহজাহানের কন্যা জাহানারার মাজারও অবস্থিত। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করায় মাজারের বাইরে তারা একটি কবর দেখিয়ে বলেন এটি জাহানারার কবর। কবরে একটি প্রস্তরস্তম্ভে ফারসিতে কী যেন লেখা আছে। পড়তে পারিনি। তবে বাঙালি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কল্যাণে আমরা এর মর্মার্থ জানি, ‘গরিব ঘরে দীপ জ্বেলো না ফুল দিয়ো না কেউ ভুলে, শ্যামা পোকায় না পুড়ে পাখ, দাগ না পায় বুলবুলে। এরপর আমরা আজমির শরিফে মঈনুদ্দীন চিশতির মাজার জিয়ারত করতে রওনা হই। রাত ১০টার দিকে আমরা ট্রেনে আজমিরের উদ্দেশে যাত্রা করি। সারা রাত ট্রেনে ভ্রমণ করে পরদিন সকালে আমরা আজমির শরিফে যাই। রাত তিনটার দিকে লোকজনের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায়। লোকজনের চিৎকারের কারণ হলো যে তখন বাইরে মরুভূমিতে অসংখ্য ময়ূর দেখা যাচ্ছিল। আমরা। সবাই ময়ূর দেখে উত্তেজিত। একটু পরপর ময়ূরের ঝক দেখা যাচ্ছিল। আমরা মরুভূমিতে ময়ূরের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে যাই। আজমির শরিফে মাজার ছিল অনেক পরিচ্ছন্ন। সেখানে মাজার জিয়ারত করে আমরা দিল্লি হয়ে কলকাতায় ফিরে আসি।