পুরানো সেই দিনের কথা

ত্রয়োদশ অধ্যায়

সার্কাস, থিয়েটার, সিনেমা

আকবর আলি খান

বাংলাদেশ সরকার তার কাজ শুরু করে সার্কাস অ্যাভিনিউয়ে পাকিস্তানের দূতাবাস ভবনে। তারপরে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য মন্ত্রীসহ বেশির ভাগ দপ্তর চালু করা হয়। যুব ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রিন্সেফ স্ট্রিটে অফিস ভাড়া নেয়; তথ্য অধিদপ্তর বালুহক্কক লাইনে অফিস খোলে। পরিকল্পনা সেল অফিস খোলে বালিগঞ্জ প্রেসে এবং পার্ক সার্কাস রোডে। শিক্ষা দপ্তর চালু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙা ভবনে। বোর্ড অব ট্রেড অফিস খোলে অন্য জায়গায়। সরকারের কাজ বাড়তে থাকে। ফলে সরকার বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে অফিস করতে থাকে। থিয়েটার রোডের অফিসে স্থানাভাব দেখা দেয়, সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকারের অসামরিক সচিবালয় স্থানান্তরিত হলো শরৎ চ্যাটার্জি অ্যাভিনিউয়ে বন্ধ সিনেমা হল দপ্তশ্রী’তে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান সেনাপতি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থিয়েটার রোডে থাকল। আর অন্য সব দপ্তর স্থানান্তরিত হলো ‘দপ্তশ্রীতে।

দেশের অনেক দূরে আমরা তখন, তবু দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য একের পর এক অফিস খোলা হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে আমরা গভর্নমেন্ট গভর্নমেন্ট খেলা বলতাম। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সরকারের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল সার্কাস অ্যাভিনিউতে। এই সার্কাসের নায়ক ছিলেন ইয়াহিয়া খান নামে এক অসুর, যা কামরুল হাসানের আঁকা পোস্টারে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। এরপর অনেক স্বার্থগোষ্ঠী অভিনয় শুরু করলেন থিয়েটার রোডে। থিয়েটার রোডে সব স্বার্থগোষ্ঠীকে স্থান দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই অফিস শুরু হলো দপ্তশ্রী সিনেমা হলে। ওয়ালিউল ইসলাম যথার্থই লিখেছেন, ‘আমাদের এই যাদুকরি জগৎটি ছিল আপাতঃদৃষ্টিতে সার্কাস, থিয়েটার ও সিনেমার জগৎ।’[১]

যদিও সার্কাস রোড, থিয়েটার রোড এবং সিনেমা হলে বাংলাদেশ সরকার অবস্থিত ছিল, তবু মুজিবনগর সরকার বলতে যে ছবি মুজিবনগরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মনে ভেসে ওঠে, সেটি হলো ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ি। ব্রিটিশ শাসনামলে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে বাংলা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছিল। খাজা নাজিমউদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন তারা এই বাড়িতেই থাকতেন। ভারত বিভাগের পর এই বাড়িটি ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে দেওয়া হয়। তারা এই বাড়িটি অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহার করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই বাড়িটিতেই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত ছিল। যদি কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে তার উপযুক্ত স্থান হবে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ি। বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের কাছে অনেক কিছু চেয়েছে এবং পেয়েছেও। কিন্তু কখনো এই বাড়িটি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে। চাওয়া হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অরবিন্দ আশ্রম এই বাড়িটি তাদের বরাদ্দ দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আবেদন করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার অরবিন্দ আশ্রমকে বাড়িটি বরাদ্দ দেয় এবং এই বাড়িটিতে অরবিন্দ আশ্রমের একটি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এখন যদি এই বাড়িটি কিনতে হয়, তাহলে অরবিন্দ আশ্রমকে রাজি করাতে হবে। অরবিন্দ আশ্রম একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সম্পত্তি তারা বিক্রয় করতে রাজি হবেন কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান স্মরণ করে ঢাকার রেসকোর্সে ইন্দিরা মঞ্চ স্থাপন করেছে। বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশ হাউস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ মুজিবনগর সরকার বলতে যে স্থানটিকে বোঝানো হয়, সে স্থানটি সংরক্ষণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মুজিবনগর সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির মায়াবী জগতে বেঁচে থাকবে কিন্তু বাস্তবে এটি লোপ পেতে যাচ্ছে।[২]

টিকা ও মন্তব্য

  1. ১.↑
    ওয়ালিউল ইসলাম, (প্রকাশিতব্য)। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৯৯
  2. ২.↑
    Faruq Aziz Khan, Op.Cit, 1993, P-194
সার্কাস, থিয়েটার, সিনেমা ❀ ত্রয়োদশ অধ্যায় ❀ পুরানো সেই দিনের কথা ❀ এডুলিচার পাঠশালা