জুন মাসে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীরা কলকাতায় আশ্রয় নেন। এই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, প্রফেসর খান সরওয়ার মুরশিদ, প্রফেসর মোশাররফ হোসেন এবং ড. স্বদেশ রঞ্জন বোস। এঁদের নিয়ে বাংলাদেশ প্ল্যানিং বোর্ড স্থাপন করা হয়। এই বোর্ডের কয়েক জায়গায় অফিস ছিল। একটি অফিস ছিল পার্ক সার্কাসে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের উল্টো দিকে। আমি মাঝেমধ্যে ড. মোশাররফ হোসেনের অফিসে যেতাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা করতাম। নভেম্বরের দিকে যখন ভারত সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে, তখন ভারতীয় প্ল্যানিং কমিশন বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশনের সঙ্গে ছিন্নমূল মানুষদের ত্রাণ এবং পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সম্বন্ধে তাদের বক্তব্য জানতে চায়। এই আলোচনার সময় ভারতীয় পরিকল্পনা কমিশন জানায় যে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সব শরণার্থীকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। অনেক হিন্দু শরণার্থী রয়েছে, যাদের সম্পত্তি বাংলাদেশে অবস্থানরত মুসলমানরা দখল করেছে। হিন্দুরা ফিরে গেলে তাদের সম্পত্তি উদ্ধার করা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে হিন্দু শরণার্থীরা বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইবে না। তাই তাদের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ড. মোশাররফ হোসেন এ সম্পর্কে আমার মত জানতে চান। আমি তাঁকে বলি যে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধে জয়ী হলে এ ধরনের সমস্যা উদ্ভবের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ভারতীয় পরিকল্পনা কমিশন এ ব্যাপারে অবশ্যই একটি আইনি কাঠামো চান।
১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর মুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে উপপরিষদের বৈঠকে নিম্নরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—
- রাজনৈতিক নির্দেশ–জনাব এ এফ এম ফতেহ (সভাপতি)
- পুলিশ যন্ত্রপাতির পুনরুদ্ধার–স্বরাষ্ট্রসচিব
- শত্রুপক্ষের সম্পত্তি নিষ্পত্তি এবং উদ্বাস্তু মানুষদের সম্পত্তির পুনরুদ্ধারবিষয়ক আইন–জনাব আকবর আলি খান
- সৈন্যবাহিনীর বেসামরিক যোগাযোগ, এফ এফ এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণের আত্তীকরণ–প্রতিরক্ষাসচিব।
- হানাদারদের সহযোগীদের ব্যবস্থাকরণ এবং বেসামরিক কর্মচারীদের সেবা প্রদান–মন্ত্রিসভা সচিব এবং প্রতিরক্ষাসচিব
- সরকারি চাকরির জন্য কমিশন, সরকারি চাকুরেদের নিয়োগ, নির্দিষ্ট স্থানে নিযুক্তি, বদলি ইত্যাদি– সচিব, মন্ত্রিসভা
- ছিন্নমূল মানুষদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন–ড. মোশাররফ হোসেন, সদস্য, পরিকল্পনা।
- অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং এর সঙ্গে জড়িত সমস্যাবলি–ড. মোশাররফ হোসেন, সদস্য, পরিকল্পনা
- উপায় এবং পথসমূহ–অর্থসচিব
- বেসামরিক প্রশাসন গঠন–অর্থসচিব।[১]
অনেক খেটে আমি শত্রুপক্ষের সম্পত্তি নিষ্পত্তি এবং উদ্বাস্তু মানুষদের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারবিষয়ক আইনের খসড়া তৈরি করি। মন্ত্রিসভায় খসড়াটিকে নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এটিকে চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা জজ এবং ত্রাণ কমিশনার জয়গোবিন্দ ভৌমিককে। এপ্রিল মাসে এই আইনটি জারি করা হয়, তত দিনে আইন ছাড়াই হিন্দু উদ্বাস্তুরা তাদের সম্পত্তি পুনর্দখল করেন। আইনটি বিশেষ কোনো কাজে লাগেনি।
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑আফসান চৌধুরী, মুজিবনগর কাঠামো ও কার্যবিবরণ, ২০২১, (ঢাকা : কথাপ্রকাশ), পৃষ্ঠা-২৬৬