পুরানো সেই দিনের কথা

ত্রয়োদশ অধ্যায়

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দুটি অনুমান

আকবর আলি খান

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হলেও মুজিবনগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল সীমিত। মূলত দেশরক্ষা সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর করাই ছিল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। যুদ্ধের রণকৌশল এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন মন্ত্রিসভা এবং সেনাবাহিনীর প্রধান। এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো কাজ হচ্ছিল না। আমি আমার নিজের উদ্যোগে এ সম্পর্কে কিছু পড়াশোনা করি এবং দুটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই। সিদ্ধান্ত দুটি নিয়ে তখন অনেকের সঙ্গে তর্কবিতর্কও করি।

৮ নম্বর থিয়েটার রোডের উল্টো দিকে ব্রিটিশ কাউন্সিলের পাঠাগার ছিল। তাই যেদিন মন্ত্রণালয়ে কাজ কম থাকত, সেদিন দুপুরের খাবার খেয়ে আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল পাঠাগারে চলে যেতাম। সেখানে আমার প্রথম অনুসন্ধানের বিষয় ছিল মুক্তিবাহিনী কতটুকু কার্যকরভাবে কাজ করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে গেরিলাযুদ্ধে যদি প্রতিপক্ষের কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি শক্তি থাকে, তাহলে গেরিলাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। নিয়মিত বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্য নিয়ে বাংলাদেশের কমপক্ষে ১ লাখ ২৫ হাজার সৈনিক ছিল। এ ধরনের বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কমপক্ষে ১২ লাখ ৫০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের প্রয়োজন ছিল। ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পর দেখা যায় যে পশ্চিম পাকিস্তানের সৈনিক এবং পুলিশ মিলে প্রায় ৯৩ হাজার জনবল ছিল। যদি ১ লাখ ২৫ হাজার গেরিলা কার্যকর হতো, তাহলে পাকিস্তান বাহিনীর কোনোমতেই টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। এ তথ্য থেকে দেখা যায়, অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী খুব কার্যকর হয়নি। এর কারণ ছিল মুক্তিবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল ছাত্র। ছাত্ররা বয়সে তরুণ এবং অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়। আবেগপ্রবণ হয়ে যারা গেরিলাযুদ্ধ করতে আসে, তারা আশা করে যে অল্প দিনের মধ্যে জয় অর্জিত হবে। দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চললে এ ধরনের গেরিলারা টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশে কিছু বয়স্ক সৈনিক ছিল কিন্তু নিয়মিত বাহিনীর এসব সদস্য চিরাচরিত যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। গেরিলাযুদ্ধের পদ্ধতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। চিরাচরিত পদ্ধতির যুদ্ধ হতে গেরিলাপদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রশিক্ষণ এবং মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। এই পরিবর্তন তখন পর্যন্ত হয়নি। যদি দীর্ঘদিন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই চলত, তাহলে প্রকৃত গেরিলাদের সংখ্যা অনেক কমে যেত। এর ফলে পাকিস্তান বাহিনীর বিপক্ষে এদের পক্ষে তাৎক্ষণিক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব ছিল না। গেরিলাযুদ্ধ সম্পর্কে চে গুয়েভারার বইটি আমার এই অনুসন্ধানে কাজে লেগেছে। চে গুয়েভারা যে দেশেই গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, সেখানে তিনি তরুণ ছাত্রদের বদলে বয়স্ক ব্যক্তিদের নির্বাচন করতেন। বয়স্কদের মধ্যে যাদের নির্ভরশীল স্ত্রী এবং সন্তান ছিল, তাদের অগ্রাধিকার দিতেন। এ ধরনের গেরিলারা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, সবকিছু জেনেশুনে গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিতেন।

দ্বিতীয় অনুসন্ধেয় বিষয় ছিল ভারতের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব কি না? প্রথম অনুসন্ধেয় বিষয়টি সম্পর্কে গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের একার পক্ষে অদূর ভবিষ্যতে জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। সুতরাং ভারতের সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব ছিল। না। বরং বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর লুণ্ঠন ও অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এখানে প্রশ্ন হলো যে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করবে কি না? পাকিস্তান ভেঙে গেলে ভারতের জন্য সেটি একটি বড় বিজয়। এ জন্য সবাই আশা করছিল ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করবে। আমার কাছে মনে হয় যে শুধু পাকিস্তানকে দুর্বল করার জন্য নয়, ভারতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল অপরিহার্য। এক কোটির বেশি শরণার্থী নিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ছিল প্রায় অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন প্রায়ই উত্থাপিত হতো; অনেকে বলতেন প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামরিক বাহিনীর হতাহত হওয়া এবং অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে প্রচুর ব্যয় হতো। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য এবং ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগকে বাতিল করার জন্য ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা না দিয়ে তার অঙ্গীভূত করতে পারে। এই আশঙ্কাও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। সাত কোটি বাঙালিকে গণতান্ত্রিক কাঠামোতে ভারতের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। এতে ভারতে মুসলমান এবং বাঙালি জনসংখ্যা বেড়ে যেত। এর ফলে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। তাই আমার বক্তব্য ছিল ভারতের সহায়তা নিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আমার কাছে তাই মনে হয় ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা যেভাবে চলছে, সেটি সন্তোষজনক। আমার এ বক্তব্য সম্পর্কে আমি কোথাও লিখিনি, তবে সে সময়ে যেসব মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে, তাঁদের কাছে এই বক্তব্য তুলে ধরেছি।