খ্রীষ্টানদিগের পোপ ও অন্যান্য পাদরি, হিন্দুদিগের গুরু, পুরোহিত, সাধু সন্ন্যাসী এবং বৌদ্ধদিগের ধর্ম্মগুরু মাত্রেই স্বকীয় প্রাধান্য ও স্বার্থ, ইন্দ্রিয়াভিলাষিত এবং অহঙ্কারের আভাস দিয়াছেন। কিন্তু মুসলমান ধৰ্ম্মকর্ত্তা পয়গম্বর সাহেব, এমন কি, তদীয় প্রিয় শিষ্য মণ্ডলীর জীবনচরিত পাঠ করিলে তাহার বিন্দুমাত্র কলঙ্ক কালিমা দৃষ্ট হয় না। তাঁহার বাক্যাবলী ও কার্য্যাবলী (হাদিস) গ্রন্থে তিনি যে ঈশ্বরের দাস এবং কোন কাৰ্য্যে ঈশ্বর ব্যতীত তাহার বিন্দু বিসর্গ অধিকার নাই এবং তাহার কবর কি উপাসনালয়কে ধরায় মস্তক লোটাইয়া প্রণাম করিলে মহা পাতকী হইতে হইবে এবং ঈশ্বরের আরাধনা না করিলে, তাহার বংশীয়গণের কোন প্রাধান্য থাকিবে না এবং তাহার বংশজগণের সংশ্রব না হইলে কোন শাস্ত্রিক ক্রিয়া আবদ্ধ থাকিবে না বলিয়া স্পষ্ট রূপে লিখিত আছে। তিনি নম্র প্রকৃতি, সদালাপী, নিরহঙ্কারী, নিরপেক্ষ, সহৃদয়, মুক্তহস্ত, সত্যবাদী, পরহিতৈষী, আতিথেয়, নির্ব্বিবাদী, লজ্জাশীল, অকপট, নিঃস্বার্থপর, সংসার বিরাগ ও ইন্দ্রীয়াভিলাষ বিবর্জ্জিত প্রকৃত ঈশ্বরভক্ত মহাপুরুষ ছিলেন।
পৌত্তলিক হিন্দুদিগের সংস্রবে ভারতীয় মুসলমানদিগের ভয়ানক অনিষ্ট হইয়াছে।
পৌত্তলিক হিন্দু জাতি যে এ দেশের আদিম অধিবাসী, তাহার আর সংশয় নাই। হিন্দু ধর্ম্মে জাতিভেদ আছে। এক জাতির পক্কান্ন অন্য জাতীয় হিন্দুর ভক্ষণ নিষেধ, উচ্ছিষ্ট অপবিত্ৰ, বিধবা বিবাহ দোষণীয়; মৃত দেহ অপবিত্র, কুল গৌরব, জাতীয় বিদ্বেষ বহুল পরিমাণে বর্ত্তমান রহিয়াছে। কিন্তু মুসলমান ধৰ্ম্মে এরূপ বিধান নাই, বরং থাকিলে সমধিক দোষণীয়। পশ্চিম রাজ্য এমন কি, মা মাজ্জমায় এ সকলকে নিতান্ত হেয় জ্ঞান করেন। আরব দেশে জাতিভেদ, কুল গৌরব, ও জাতীয় বিদ্বেষ মাত্রও নাই। সকল মুসলমানই পরস্পর ভাই; যে শিক্ষিত ও ধর্ম্মশীল, সেই গৌরবান্বিত। স্ব ধর্ম্মাবলম্বীর উচ্ছিষ্টকে অপবিত্র মনে করে না। বরং ধর্ম্মশীল মুসলমানের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করিলে রোগ মুক্ত হয়, ঐহিক ও পারত্রিক মঙ্গল হয় বলিয়া তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস। এক খানি বৃহৎ ভোজন পাত্রে ২০/২৫ন একত্রে ভোজন করে। ফলতঃ বিচার করিয়া দেখিতে গেলে, কুল গৌরব, জাতিভেদ এবং ব্যবসাদি জাতি বিশেষের প্রতি একচেটিয়া ন্যন্ত থাকাই, জাতীয় বিদ্বেষ ও অবনতির মূল কারণ। আদিম ইসলাম ধর্ম্মাবলম্বিদিগের মধ্যে এই দূষণীয় প্রথা প্রচলিত ছিল না বলিয়াই তাহারা এত অল্প দিনের মধ্যে এক আরব ভূমি হইতে সুদূর স্পেন, পর্ত্তুগাল পর্য্যন্ত ইসলাম-বিজয়-পতাকা উড্ডীন করিতে[১] পারিয়াছিল; অন্য দিকে ভারতবর্ষ ও চীন দেশ পৰ্য্যন্ত ইসলাম ধর্ম্মের প্রভাব বিস্তৃত হইয়াছিল। সমস্ত ইউরোপের খ্রীষ্টান মণ্ডলী জেরুজেলেম নগর হস্তগত করার জন্য বহুবার একযোগে ধর্ম্মযুদ্ধ করিয়াও সফলকাম হইতে পারেন নাই। হিন্দুদিগের সংস্রবে ভারতীয় মুসলমানদিগের মধ্যে নানাপ্রকার কুপ্রখা ক্রমশঃ বদ্ধমূল হইয়াছিল ও আছে এবং হইতেছে। এমন কি কোন কোন অশিক্ষিত মুসলমান, প্রতিবাসী হিন্দুদিগের দৃষ্টান্তানুসারে মাণিকপীর, সত্যপীর, ও শ্যামাই, ওলা দেবী, শীতলা দেবী, মনসা দেবী প্রভৃতির নজর মানস করিয়া থাকে। স্নান না করিয়া ভাত খাওয়াকে দূষণীয় জানে, হল কর্ষণ ও বিধবা বিবাহকে দোষণীয় মনে করে। পায়ে মূত্র কি বিষ্ঠা লাগিলে (তিন বার ধৌত করার পরিবর্ত্তে) স্নান করিয়া থাকে। পায়জামায় পরিবর্ত্তে ধুতি পরিধান করে। মন্তকে টুপি ধারণ করিতে লজ্জিত হয়। আবার যাত্রার শুভাশুভও গণনা করিয়া থাকে। হিন্দু পর্ব্বোপলক্ষে নূতন কাপড় পরিধান করে, মাসের প্রথম দিনে কোন স্থানে গমন করে না। মাসদগ্ধ, দিকশূল প্রভৃতি মানিয়া থাকে।
মুসলমান ধর্ম্মের দ্বারা জগতের প্রভূত উপকার সাধিত হইয়াছে। মুসলমান ধর্মের দ্বারা নরহত্যা, শিশুহত্যা এবং সুরা পান নিবারিত হইয়াছে। অনির্দ্দিষ্ট বহু বিবাহের প্রথা উঠিয়া গিয়াছে; চারি সংখ্যাকে সীমাবদ্ধ করিয়াছে। বেশ্যা বৃত্তি এবং পরদার গমনের পথ রুদ্ধ হইয়াছে। পৌত্তলিক ধর্ম্মের মূলে কুঠারাঘাত করা হইয়াছে, অসভ্যদিগকে সভ্য করা হইয়াছে, উলঙ্গদিগকে পরিচ্ছদ ব্যবহারের নিয়ম শিক্ষা দিয়াছে, নরমাংস এবং মৃত জীব জন্তুর মাংস ও কাঁচা মাংস ভক্ষণ নিবারণ করিয়াছে। পিতা মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অঙ্গীকার পালন, সরলতা, অপক্ষপাত, সতীত্ব রক্ষা, সচ্চরিত্রতা, ক্রীতদাসকে মুক্ত করা, বিপদে ধৈৰ্য্যাবলম্বন, ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন, উপচীকির্ষা, অনিষ্ট করিলে মার্জ্জনা করা, অন্যে মন্দ করিলে তৎপরিবর্ত্তে তাহার উপকার করা, ত্যাগ স্বীকার, পৃথিবীতে প্রশংসা পাইবার আশা না করিয়া পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ধর্ম্মপথে চলা, এই সমস্ত কাৰ্য্য শিক্ষা দেয়। নম্রতা শিক্ষা এবং রিপু সমূহকে দমন করা, মৃত্যুর পূর্ব্বে কৃত পাপের জন্য অনুতাপ করা, আরাধনা যে ধৰ্ম্ম কার্য্যের একমাত্র স্তম্ভ এবং স্বর্গের চাবি, পৃথিবী অসার, পরকাল সার, এই সকল অমূল্য উপদেশ দিতেছে।
তরবারি দ্বারা ইসলাম-ধৰ্ম্ম প্রচারের অপবাদ খণ্ডন।
বিধর্ম্মীরা বলেন, মুসলমানেরা তরবারি দ্বারা ধর্ম্ম প্রচার করিয়াছে। প্রথমে নুতন মত মাত্র এক জনের মস্তিস্কে থাকে। সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে এক জন ইহা বিশ্বাস করে। এক জন মানুষ সমস্ত মানুষের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয়। সে যদি তরবারি ধরিয়া তাহার মত প্রচার করে, তাহার কৃতকাৰ্য্য হইবার আশা বৃথা। ফলতঃ ঈশ্বর কৃপায় সত্যধর্ম্ম প্রচারিত হইয়াছে। বিধৰ্ম্মীর উক্তি মিথ্যা। জগতের সত্য ইতিহাস তাহার সাক্ষী। তরবারি দ্বারা কোন ধৰ্ম্ম কখনই প্রচারিত হইতে পারে না; দু দশ জন লোক ভয়ে ঐ মত অবলম্বন করিলেও, পৃথিবীর কোটি কোটি নর নারীর সেই ধর্ম্মের আশ্রয় গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
পয়গম্বর (স) সাহেব যখন ইসলাম ধর্ম্ম প্রচারের প্রারম্ভে, বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন ও সহায় সম্বল হীন ছিলেন। এমন কি, যখন তাহা আত্মীয় কুটুম্ব ও পরিবারস্থ লোকগণ ঘোর বিরোধী এবং প্রাণনাশক শত্রু রূপে দণ্ডায়মান হইয়া, তাহাকে নানাবিধ বিপদ জালে আবদ্ধ ও নানা উপায়ে লাঞ্ছিত এবং অবমানিত করিতে কুণ্ঠিত ছিল না, তখন তিনি যে একাকী কিরূপে এতাধিক বীৰ্য্যবন্ত দুর্দান্ত পরাক্রমশালী আরব সন্তানদিগকে তরবারির সাহায্যে স্বীয় মতানুবর্ত্তী করিয়াছিলেন, এ কথা কি সরল ভাবে একবার চিন্তা করিয়া দেখা উচিত নহে? বরং এই কথা ঐতিহাসিক জ্ঞানী মাত্রেই স্বীকার করিতে বাধ্য যে, তিনি কেবল ধৈৰ্য্য, সহিষ্ণুতা, যুক্তিপূর্ণ প্রমাণ, নিৰ্ম্মল চরিত্র ও অলৌকিক ঘটনাবলী দেখাইয়া এবং সর্ব্বোপরি জ্বলন্ত ঈশ্বর-ভক্তির অটল প্রমাণ প্রদর্শন করিয়া, সৰ্ব্বসাধারণের মনাকর্ষণ করেন। এই সকল গুণ জালে আবদ্ধ হইয়াই দলে দলে জনসাধারণ তাহার মতানুবর্ত্তী হইতে থাকেন। আত্মরক্ষার্থে জেহাদ প্রথা প্রচারিত হইবার পূর্ব্বে বহুসংখ্যক লোক সনাতন ইসলাম ধর্ম্মে দীক্ষিত হইয়াছিল। মদিনা যাওয়ার পরেই জেহাদ বিধান অবতীর্ণ হয়, কিন্তু তিনি মক্কা নগরে অবস্থান কালীন অনেক তেজ বীৰ্য্য শালী আরব সন্তান তাহার মতানুবর্ত্তী হইয়াছিলেন। তাঁহার প্রধান প্রচারক বন্ধু চতুষ্টয় মক্কা নগরে স্বেচ্ছায় ইলাম ধর্ম্ম গ্রহণের কথা জগৎ বিদিত। মহাবীর হামজা (রাজিঃ) মক্কা নগরেই পবিত্র ইসলাম ধর্ম্ম গ্রহণ করেন। আবুজর ও ওনাইছ এবং তাহার মাতা ইসলাম ধর্ম্ম গ্রহণ করিয়া যখন নিজ দলে যাইয়া উপস্থিত হইলেন, তখন তাহাদের বাচনিক ইসলাম ধর্ম্মের সৌন্দর্য্যের কথা শুনিয়া দলে দলে লোক মুসলমান হইতে লাগিলেন। এমন কি, হজরত মক্কা নগরে থাকিতে বিধর্ম্মীগণের অত্যাচার পরম্পরায় ৮৩ জন মুসলমান দেশত্যাগী হইয়া হাবশ (আবিসিনিয়া) রাজ্যে চলিয়া যান। তাহা ছাড়া তৎকালে অনেক লোক অমানুষিক কষ্ট ও অত্যাচার সহ্য করিয়াও মক্কায় ছিলেন। হাবশ-রাজ হজরতের ধৰ্ম্মতত্ত্বের কথা শুনিয়াই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। হজরত মোহাম্মদ (সা:) মদিনায় হেজরত করার পূৰ্ব্বে, মক্কা নগরে এক দল মদিনাবাসী, তাহার যুক্তিপূর্ণ ধৰ্ম্ম-বক্তৃতা শুনিয়া মুসলমান হন এবং তাহারা স্বদেশে আসিয়া একেশ্বরবাদ ধর্ম্মের প্রশংসা করেন। তৎপর ক্রমশঃ আরও কয়েক দল মদিনাবাসী লোক ইসলাম ধর্ম্মের আশ্রয় গ্রহণ করেন।
ইসলাম ধর্ম্মের প্রাধান্য সম্বন্ধে পাদরী সি, এন, সরকারের মতামত।
ইসলাম আত্মার উচ্চতর অস্তিত্ব ও অবস্থা প্রাপ্তির নিয়ত আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্তির জন্য বিজ্ঞান ও হেতুবাদ সম্মত ধৰ্ম্মনীতি। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে তৎকৃত কাৰ্য্য চিন্তা ও ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত ভাবে দায়ী করে। মধ্যস্থ রূপে কোন প্রায়শ্চিত্ত উপস্থিত করিয়া পাপ-ভীতি হইতে কাহাকেও নিষ্কৃতি দেয় না। জগৎ পত্তনাবধি যে কোন ব্যক্তি দ্বারা জগতে ধৰ্ম্মনীতি ও ঈশ্বর তত্ব প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাদের কোন ব্যক্তি দ্বারা কোন সময়ে ঈশ্বরের একত্ব সম্বন্ধে কোন ভ্রান্তিমূলক শিক্ষা প্রকাশিত হয় নাই। শাস্ত্রাচারী খ্রীষ্টিয়ান ভ্রাতৃগণ যে ত্রিত্ববাদ প্রচার করেন, ও বিশ্বাস করেন, হজরত ঈশা কদাচ তন্মত কোন শিক্ষা দেন নাই। হজরত ঈশার ৩০০ বৎসর পরে আন্তিওক নগরের বিশপ দ্বারা ত্রিত্ববাদ কল্পিত ও প্রচারিত হয় এবং তজ্জন্য তৎকালে খ্রীষ্টিয়ান জগতে যে বিপ্লব সংঘটিত হইয়াছিল, জগতের ইতিহাস তাহার সাক্ষী। প্রতিমা পূজা এবং ঈশ্বরের বহুত্ব কল্পনাই ভ্রান্ত মানব বুদ্ধির ভ্রান্তি বিজড়িত আবিষ্কার; কিন্তু ঈশ্বর নিশ্বসিত কিম্বা প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত ধৰ্ম্ম প্রবর্ত্তকেরা কেহ কোন কালে ঈশ্বরের একত্বের বিরুদ্ধে কোন শিক্ষা দেন নাই। বরং তদ্বিপরীত প্রত্যেক জন প্রায় প্রাণান্ত পর্য্যন্তও স্বীকার করিয়া মহা সংগ্রাম করিয়াছেন। এই পরিদৃশ্যমান জগৎ সংসারের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া, প্রত্যেক পদার্থের উৎপত্তি, স্থিতি ও লয় প্রভৃতি ঘটনা পরম্পরা পৰ্য্যবেক্ষণ করিলে, সৎজ্ঞান বিশিষ্ট কোন ব্যক্তির ঈশ্বরের একত্ব সম্বন্ধে কোন সংশয় কি থাকিতে পারে? যাবতীয় বিজ্ঞান এবং যাবতীয় প্রকৃতি মিলিয়া এক স্বরে ঈশ্বরের একত্ব ঘোষণা করিতেছে। আমাদের শারীরিক গঠনে আমাদের প্রকৃতিতে আমাদের দৈহিক জীবনে আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্ত্তার একত্ববাদ প্রচার করিতেছি। হজরত আদম (আলা.) অবধি হজরত নোহ (আলা.) পৰ্য্যন্ত, হজরত নোহ (আলা.) হইতে হজরত ইব্রাহিম (আলা.) পর্য্যন্ত, হজরত ইব্রাহিম (আলা.) হইতে হজরত মুসা (আলা.), দায়ূদ (আলা.) এবং ঈসা (আলা.) পৰ্য্যন্ত ও তদবধি বর্ত্তমান মুহূর্ত্ত পর্য্যন্ত যাবতীয় বিশ্বাসী ব্যক্তি দ্বারা ঈশ্বরের নিভাজ একত্ব নিত্যত্ব স্বীকৃত ও প্রচারিত হইয়া আসিতেছে। ইসলাম ধর্ম্মনীতি সর্ব্বাগ্রে আমাদিগকে ধ্রুব রূপে সেই মহান্ সতত্য বিশ্বাস করিতে শিক্ষা দেয়। হজরত মহম্মদের (সা.) শিক্ষাতে এমন কিছুই নাই, যাহাতে মানব বুদ্ধি ভ্রান্ত হইয়া মানব কল্পিত কোন রীতি নীতিকে পালনীয় ব্যবস্থা বলিয়া গ্রহণ করিতে প্রবৃত্তি পায়। তাহার শিক্ষাতে এমত কিছুই নাই, যাহাতে ঈশ্বরের একত্ব সম্বন্ধে মানব মণ্ডলীর কোন ভ্রান্ত জ্ঞান জন্মিতে পারে। এই সকল কারণ বশতঃই বলি, হজরত মোহাম্মদ (দঃ) আপনিই আপনার প্রমাণ; তিনি প্রার্থনাকে ইসলাম ধৰ্ম্মনীতির প্রধান স্তম্ভ স্বরূপ নিরূপণ করিয়াছেন। প্রার্থনার গুরুত্ব উপলব্ধি করণার্থে ও অন্যবিধ উচ্চতর উদ্দেশ্য সাধনাৰ্থে প্রার্থনার পূর্ব্বে হস্ত, পদ, মুখমণ্ডল, মস্তক, গলদেশ, কর্ণমূল এবং শরীরের গুপ্তাংশ অতি পরিষ্কার রূপে প্রক্ষালনের (ওজুর) ব্যবস্থা নিরূপণ করিয়াছেন।
ইসলাম প্রার্থনা-পদ্ধতি মানবকে সর্ব্বদা প্রস্তুত রাখে। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) আমাদিগকে দিবা রাত্রির মধ্যে পাঁচ বার প্রার্থনা করিতে দৃঢ় আদেশ দিয়াছেন। প্রত্যেক ধর্ম্মপরায়ণ মুসলমান আদেশটা শিরোধার্য্য করিয়া পালন করেন। কিন্তু ৫ পাঁচ বার নমাজ পড়িবার দৃঢ় আদেশ না থাকিয়া, “নিরন্তর প্রার্থনা করা ভাল” কিম্বা “সতত প্রার্থনা করা কর্ত্তব্য” প্রার্থনা সম্বন্ধে মোহাম্মদ (দঃ) যদি এই প্রকার কতকগুলি কথা কহিতেন, তাহা হইলে বর্ত্তমান প্রার্থনাশীল মুসলমান বর্ত্তমান খ্ৰীষ্টিয়ান সমাজের ন্যায় প্রার্থনা হীন হইয়া পড়িত, তাহাতে কোনও সন্দেহ নাই। তোমরা নিরন্তর প্রার্থনা কর, অবিশ্রান্ত প্রার্থনা কর, এবম্বিধ অনেক আদেশ থাকিলেও খ্ৰীষ্টিয়ান জনসাধারণ প্রার্থনা করণ জন্য কতকগুলি বেতনভোগী প্রার্থনাকারী মিশনারী প্রিষ্ট (পুরোহিত) নিযুক্ত করিয়া, আপনারা প্রার্থনা করণের দায় হইতে মুক্তি পাইয়াছেন। কেবল রবিবার দিনে একবার প্রার্থনা গৃহে মুখ দেখাইলেই তাহাদের যথেষ্ট। কিন্তু ভাই খ্ৰীষ্টিয়ান, তাহা নহে। প্রার্থনার আবশ্যকতা ও গুরুত্ব এবং কেমন সর্বদা আপনাকে প্রার্থনা নিহত রাখিতে হয়, পবিত্র ইসলাম এই সকল বিষয় আমাদিগকে উচ্চতর শিক্ষা প্রদান করেন এবং প্রত্যেক প্রার্থনার পূর্ব্বে নিয়মিত ওজু মানবকে প্রার্থনা সম্বন্ধে এক উচ্চ ভাবে পরিচালিত করে।
জমাতে নামাজ পড়া সম্বন্ধে পাদরি সি, এন সাহেবের মত।
সমবেত প্রার্থনার উচ্চতর অনেক উদ্দেশ্য আছে। সে সমস্ত এই প্রবন্ধে আলোচনা করা সম্ভাবিত নহে। আমরা বাহ্য দৃশ্যে সমবেত প্রার্থনাতে ভ্ৰাতৃভাব ও সাম্যের কেমন মনোমোহন সুন্দর চিত্র দেখিতে পাই। রাজা প্রজা, ধনী দরিদ্র, মুটে সওদাগর, জ্ঞানী অজ্ঞান, মুর্খ বিদ্বান, সকলে মিলিয়া একই সৃষ্টিকর্ত্তার একই উপাস্য মহান্ ঈশ্বরের সাক্ষাতে স্কন্ধে স্কন্ধ মিলাই, ভক্তি সহকারে চমৎকার ভ্ৰাতৃভাবে যখন দাঁড়ায়, তখন কি তথায় এক অপূর্ব্ব স্বর্গীয় প্রভা উদ্ভাসিত হয় না? বাস্তবিক ইসলাম সমবেত প্রার্থনা স্থল স্বর্গীয় ভাতৃভাবের চমৎকার অঙ্গণ। এই স্থলে পার্থিব সামাজিক পদমর্য্যাদা কি পদহীনতা কিছুই নাই। সৃষ্টি কর্ত্তার সাক্ষাতে রাজা, প্রজা, ইতর, ভদ্র সকলেই সমান। উনি বড় সাহেব উহার পায়ে জুতা থাকিলে কোন দোষ নাই, এই খ্রীষ্টানী ভাব তথায় এখন পৰ্য্যন্ত প্রবেশ পথ পায় নাই এবং অনন্ত কালেও পাইবে না।
আমাদের রসুল (দঃ) আমাদিগকে কে ঠিক নিরূপিত সময়ে প্রার্থনা করিতে আদেশ দিয়াছেন, তাহারও মহৎ উদ্দেশ্য আছে। তাহাতে অভ্যাস পরিপক্ক হয় ও নমাজে যাবতীয় সাধু, বিশ্বাসী নমাজীদিগের সহযোগী হওয়া যায় এবং নিরূপিত কর্ত্তব্য পালনে ত্রুটী হয় নাই বলিয়া হৃদয়ের প্রফুল্লতা অক্ষুন্ন থাকে। মুসলমান যে অবস্থায় যে স্থানে থাকুক না কেন, নমাজের নিরূপিত সময় তাহাকে জানু পাতিয়া প্রার্থনা করিতেই হইবে। ইহাতে কোনও আপত্তি নাই। ইসলাম প্রার্থনা-পদ্ধতির সৌন্দর্য্য ও প্রভাব সমস্ত জগৎ সংসারে নিত্যই বিকসিত হইতেছে। চক্ষু উন্মীলন করিলেই তাহা দেখিতে পাইবে। একটা মাত্র দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা গেল।
সৃষ্টিকর্ত্তা ঈশ্বরের সাক্ষাতে যাবতীয় মুসলমান পরস্পর ভ্রাতা। হজরত রসুলের (দঃ) স্বর্গীয় শিক্ষার প্রভাবে এই জগতে যেমন, পর জগতেও তেমনি তাহারা পরস্পর ভ্রাতা। এই ভ্রষ্ট ও'-দ্বেষ-বিদ্বেষ পরিপূর্ণ জগতী তলে মাত্র দুটি স্থানে অর্থাৎ ইসলাম ধৰ্ম্ম মন্দিরে ও সমাধি স্থানে সাম্য ও ভ্ৰাতৃভাবের জ্বলন্ত চিত্র দেখিতে পাই। আমাদের রসুল (দঃ) আমাদিগকে দান করিবার ব্যবস্থা প্রদান করিয়াছেন। এতৎ সম্বন্ধে আমরা বলিতে বাধ্য যে, এই ব্যবস্থাটা নুতন নহে। হজরত মুসা সম্পত্তির কিম্বা উপার্জ্জনের দশমাংশ দান করিতে দৃঢ় আদেশ দিয়াছেন। হজরত ঈসা যথা সৰ্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়া দরিদ্রদিগকে দান করতঃ তাহার পশ্চাদগামী হইতে আদেশ দেন। শেষ ধৰ্ম্ম প্রচারক মানব মণ্ডলীর দুর্ব্বলতা লক্ষ্য করিয়া, আমাদের রসুল (দঃ) তাঁহার অনুগামীদিগের জন্য জাকাৎ দানের ব্যবস্থা নিরূপণ করিয়াছেন, তাহা সহজ সম্পাদ্য। সমাজের দীন দরিদ্র লোকদিগের উপকারার্থে, ইসলাম নীতি প্রচার ও বিস্তারার্থে, ঐশ্বরিক গৃহাদি স্থাপন, সংস্কার ও সুসজ্জিতাবস্থায় রাখিবার জন্য অনাথ মুসলিম বালক বালিকাদিগের ভরণ পোষণ ও শিক্ষার্থে প্রভূত পরিমাণে অর্থের প্রয়োজন। অতএব মুসলমান যে আমরা—আমাদের রসুলের আদেশানুযায়ী দানশীল হই, সর্ব্বম্বের দাতা মহান আল্লাহ তাআলার নামে যেন কোন মোসলেম হস্ত কার্পণ্য সঙ্কুচিত না হয়, ইহা অতি বাঞ্ছনীয়।
বাইবেল হইতে ইসলামের সত্যতা প্রমাণিত।
হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর রেছালত অর্থাৎ পৃথিবীতে আগমন সম্বন্ধে ১৩০৬ বাং বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের প্রচারক পত্রিকায় বাইবেল হইতে উদ্ধত করিয়া যাহা লিখিত হইয়াছে, তাহা এ স্থানে অবিকল উদ্ধত হইল।
আল্লা (আরব দেশীয়) পারণ পৰ্ব্বত হইতে আপন তেজ (অগ্নি) প্রকাশ করিলেন। দ্বিতীয় বিবরণ ৩৩/২ পদ এবং যোহন ভাববাদী (ইয়াহান্না আলায়হেচ্ছালাম) বলিতেছেন—
কিন্তু যিনি [মোহাম্মদ (দঃ)] আমার পরে আগমন করিতেছেন, তিনি আমা অপেক্ষা ক্ষমতাবান, যাহার পাদুকা বহন করিতেও আমি যোগ্য নহি, তিনিই তোমাদিগকে পবিত্র আত্মাতে এবং অগ্নিতে (অগ্নির ন্যায় জলন্ত ধর্ম্মে) বাপ্তাইজ (দীক্ষিত) করিবেন। কুলা (জেহাদীয় করবাল) তাহার হস্তে রহিয়াছে। তিনি আপনার খামার (মণ্ডলী) নিঃশেষে পরিষ্কার করিবেন, আপনার গোম (মোসলমান লোক) তিনি গোলায় (মণ্ডলীতে) সংগ্রহ করিবেন, এবং আগরা (কাফের) সকল তিনি অনিৰ্ব্বাপনীয় অগ্নিতে (অনন্ত নরক অগ্নিতে) দগ্ধ করিবেন। (ইঞ্জিল) মথি (বম ওয়েচ সাহেব, অনুবাদিত বাইবেল) ৩, ১১, ১২, পদ। কেহ কেহ বলেন, যোহন ভাববাদী যীশুখ্রীষ্টের আসিবার কথা বলিতেছেন। কিন্তু ইহা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কারণ যোহন ভাববাদী বলিতেছেন, “যিনি আসিবেন তিনি”। বাইবেল পাঠে জানিতে পারা যায়, তখন যীশু এসেছেন। আসিবেন এ কথা বলার সময় তখন অতীত হইয়া গিয়াছিল। আর যোহন ভাববাদীর এই ভাবোক্তির সঙ্গে যীশুখ্রীষ্টের কোনই মিল দেখিতে পাওয়া যায় না। যেহেতু যোহন ভাববাদী বলিয়াছেন, তিনি খামার (মণ্ডলী) পরিষ্কার করিবেন। কিন্তু যীশু মণ্ডলী পরিষ্কার করিবার স্থলে বলিয়াছেন, শামা খাস (মন লোক) থাকিতে দাও। সুতরাং যোহন ভাববাদীর কথা, যীশুখ্রীষ্টের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত।
পক্ষান্তরে ভাববাদীর অগ্রগণ্য হজরত মোহাম্মদের (দঃ) সঙ্গে প্রত্যেক কথায় মিল জলন্ত ভাবে রহিয়াছে। তবে বর্ত্তমান খ্রীষ্টিয় ধর্মে যাহারা অন্ধ বিশ্বাসী, তাহারা দেখিতে পান না।
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑খোদার ফজলে এখন পৃথিবীতে এমন স্থান নাই, যেখানে মুসলমান ধর্ম্ম বিস্তৃত না হইয়াছে।