ইসলাম দর্পণ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও একত্ব

সৈয়দ আবদুল আগফর

যেমন কারণ ব্যতীত কাৰ্য্যের উৎপত্তি হইতে পারে না, তদ্রূপ এক জন নির্ম্মাতা না হইলে কোন বস্তু নির্ম্মিত হইতে পারে না। এরূপ “ঈশ্বর” নামক জনৈক মহাশিল্পী না থাকিলে চন্দ্র, সূৰ্য্য, মনুষ্য, পশু, পক্ষী, উদ্ভিদাদি যাবতীয় পদার্থ সৃষ্ট হইতে পারিত না। এই সুবিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সকলই সুশৃঙ্খল ও কৌশলময়। ইহাতে কিছুই নিরর্থক ও অসম্বন্ধ নাই, এক সত্য কাম মঙ্গল সঙ্কল্প মহাপুরুষের ইচ্ছা এ বিশ্বসংসারে দেদীপ্যমান প্রকাশ পাইতেছে। ইনি ঈশ্বর, জ্ঞান এবং মঙ্গল স্বরূপ। আমরা মনুষ্যের আকৃতি তাঁহার জ্ঞান ও ধর্ম্মের বিষয় মনে না করিয়া, যেমন সুধু মনুষ্যকে ভাবিলে মনুষ্যের ভাব আমাদের মনে আইসে না, সেইরূপ ঈশ্বরের জ্ঞান এবং তাঁহার মঙ্গল ভাব অবগত না হইলে, ঈশ্বর শব্দের অর্থই বোধগম্য হয় না। এই দুই লক্ষণ তাঁহার অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র অব্যক্ত রহিয়াছে। অতএব তিনিই জগতের কারণ, তিনিই একমাত্র অদ্বিতীয়, সমুদয় বিশ্ব সংসার তাহার সুবৃহৎ কৌশল যন্ত্রের অন্তর্গত। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিপন্ন করার জন্য দূরান্তরে যাইবার আবশ্যক নাই। সন্নিকটস্থ স্বকীয় দেহ রাজ্যের প্রতি অবলোকন করুন। দেহের সৃষ্টি-চাতুর্য্য কি আপনা আপনি হইয়াছে?[১] কোন বিচক্ষণ শিল্পী দ্বারা নির্ম্মিত হইয়াছে?

যদি আপনাকে কেহ প্রশ্ন করে, আপনি কি প্রকারে জাত হইলেন? হয়ত আপনি উত্তর দিবেন যে, আপনি পিতার ঔরসে ও মাতার গর্ব্ভে জাত হইয়াছেন। কিন্তু একথা স্বীকার করিয়াও যদি আপনাকে পুনঃ জিজ্ঞাসা করা যায়, আপনার পিতা কি প্রকারে জন্মগ্রহণ করিলেন? আপনি বলিবেন, আপনার পিতামহের ঔরসে ও পিতামহীর গর্ব্ভে জাত হইয়াছেন। ভাল তাহাও যদি স্বীকার করিয়া আবার জিজ্ঞাসা করা যায়, আপনার পিতামহ কি প্রকারে জন্মগ্রহণ করিলেন? আপনি ঐ প্রকার উত্তর দিতে থাকিবেন। এরূপ যতই উর্দ্ধে উঠুন না কেন, যতই উত্তর দিতে থাকুন না কেন, পরিশেষে আপনার এমন এক স্থানে অবশ্য ঠেকিতে হইবে এবং সর্ব্বশেষে এরূপ এক ব্যক্তিকে দেখিতে পাইবেন যে, যাঁহার পিতার পিতা নাই। এমত স্থলে যদি আপনাকে প্রশ্ন করা যায়, পিতার পিতা নাই তাহার উৎপত্তি কি ভাবে হইল? আপনি বোধ হয় ইহার কোন সন্তোষ জনক উত্তর দিতে পারিবেন না। কারণ, পিতা পুত্র রূপে গণ্য হইয়া আর উর্দ্ধে উঠিতে পারিলেন না। এরূপ যদি ভিন্ন ভাবে উত্তর করেন, যে পিতার পিতা নাই, তিনি পরমাণু সমূহের পরস্পর সংযোগে প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা আপনি জন্ম লাভ করিয়াছেন। এই কথার প্রত্যুত্তরে জিজ্ঞাসা করি, সেই প্রাকৃতিক নিয়মের নিয়ন্তা কে এবং মূলীভূত পদার্থ নিচয়ের নির্ম্মাতা এবং শক্তিদাতা কোন্ ব্যক্তি? হয়ত আপনি আবারও উত্তর দিতে অসক্ত হইবেন। যদি না হন এবং বলেন, শক্তিই সমুদয় পদার্থের মূলাধার, শক্তি হইতে সমুদয় বস্তুর সৃষ্টি হইয়াছে (বৌদ্ধ মতানুযায়ী)। তবে ঈদৃশ উত্তর কখনও যুক্তি সঙ্গত হইতে পারে না। যেহেতু ইহা সৰ্ব্ববাদী সম্মত কথা যে, শক্তি কোন বস্তুর আশ্রয় ব্যতীত বিকাশ হইতে পারে না সুতরাং শক্তির জন্য পদার্থের প্রয়োজন। তবে সেই শক্তিই যদি ঈশ্বর হন তাহা হইলে পদার্থ কি? এবং কোথা হইতে তাহার উৎপত্তি? শক্তি হইতে ত কোন পদার্থের উৎপত্তি হইতে পারে না। তবে সকল পদার্থেরই শক্তি আছে, একথা স্বীকার করি; কিন্তু পরমাণু যাহা সমস্ত পদার্থের মূল, শক্তি ভিন্ন তাহার যে এক জন সৃষ্টিকর্ত্তা আছে, তাহাও ত স্বীকার না করিয়া পারা যায় না। অতএব শক্তি এবং পরমাণু এতদুভয়ের যে এক জন সৃষ্টিকর্ত্তা আছেন, ইহা অবশ্য স্বীকার না করিয়া উপায় নাই। কেন না তাহারা এক বস্তু নহে, প্রত্যেকের ধৰ্ম্ম ও ক্রিয়া স্বতন্ত্র। দুইটী স্বতন্ত্র বস্তুর সংযোগে যখন অন্যান্য বস্তুর উৎপত্তি হয়, তাহাদের সৃজনকর্ত্তা ও বিধাতা এক জন না হইয়াই থাকিতে পারেন না, সেই ব্যক্তি যে কে, তাহা অচিন্ত্যনীয়; কিন্তু তিনি আছেন, ইহা অবশ্য স্বীকার করিতে হইবে। আমাদিগের প্রথম পরিচ্ছেদের লিখিত প্রথম বিচাৰ্য্য বিষয়ের এক প্রকার মীমাংসা হইয়া গিয়াছে। পরমেশ্বর আছেন, একথা স্বীকার না করিয়া থাকা যায় না। এক্ষণে আসুন আমাদিগের বিচাৰ্য্য দ্বিতীয় বিষয়ের আন্দোলন করা যাউক। পরমেশ্বরের লক্ষণ কি? অর্থাৎ তিনি কি অবস্থায় কোথায় অবস্থিতি করিতেছেন, এ বিষয়ের কিছু জ্ঞান লাভ করিতে পারি কি না? পূর্ব মীমাংসান্তেই এক প্রকার স্থির হইয়াছে যে, ঈশ্বর সকল বস্তুতেই আছেন। যেহেতু বস্তুমাত্রেরই শক্তি আছে এবং শক্তিতেই ঈশ্বর আছেন। আর বস্তুমাত্রেই পরমাণু আছে এবং পরমাণুতেও ঈশ্বর আছেন। কেননা, শক্তি ও পরমাণুর যখন ক্রিয়া আছে, তখন তাহাদের সাধনকারী কর্ত্তাও আছে। কৰ্ত্তা না থাকিলে ত ক্রিয়া হইতেই পারে না। নিজে না গেলে যাইতেছে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় কিসে? নিজে না করিলে, করিতেছি ক্রিয়া সম্পন্ন হয় কিসে? যখন কোন ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তখন কর্ত্তা তাহার সঙ্গে থাকিবেই থাকিবে। অতএব পরমাণু এবং শক্তি যখন কোন ক্রিয়ায় লিপ্ত থাকে, তখন তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে কর্ত্তাও থাকে। এখন দেখা যায় যে, এমন মুহূর্ত্ত নাই, যখন প্রত্যেক পরমাণু ও শক্তি আপনাপন কোন না কোন এক ক্রিয়ায় লিপ্ত না আছে। অতএব পরমাণু ও শক্তি যখন যে স্থানে যে ক্রিয়ায় লিপ্ত থাকে, তখন ঈশ্বরও অদৃশ্য ভাবে তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে। এইরূপ অসীম ব্রহ্মাও যখন কেবল কতকগুলি পরমাণুর সমষ্টি এবং শক্তি যখন তাহার প্রত্যেক পরমাণুর চির সহচর, তখন ঈশ্বর যে তাহাদের সঙ্গে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া অদৃশ্য ভাবে অবস্থিতি করিতেছেন, ইহাতে সন্দেহ কি? এক্ষণে দেখা চাই যে, সেই ঈশ্বর এক কি তাঁহার সমশ্রেণীর আর কেহ আছেন।

যদি ঈশ্বরের সম শ্রেণীর অন্য কেহ থাকে, তবে তাকে সৃষ্টি করিল কে? এই প্রশ্ন উত্থিত হইতে পারে। সমস্তের সৃষ্টিকর্ত্তাকে যখন ঈশ্বর বলিয়া সাব্যস্ত করা হইয়াছে, তখন ইহাদের সৃষ্টিকর্ত্তা থাকিলে ইহারা কেহই পরমেশ্বরের বাচ্য হইতে পারেন না; এক ঈশ্বর দুই জন হলে প্রত্যেক কাৰ্য্যে বিবাদ বিসম্বাদ হইত। অতএব যিনি পরমেশ্বর, তিনি কখনও দুই হইতে পারেন না এবং কেহ তাহার পিতা (জন্মদাতা) হইতে পারেন না। কেননা যে পিতার পিতা নাই, তাহারই সৃষ্টি কর্ত্তা পরমেশ্বর। অতএব আমাদের এই মীমাংসায় নির্দ্ধারিত হইল যে, পরমেশ্বর অদ্বিতীয় নিরাকার। ন মাতা, ন পিতা, ন বন্ধু, ন বান্ধব এবং সর্ব্বদা সর্ব্বত্র বিরাজিত। জগতের এমন স্থান নাই, যে স্থানে তিনি অদৃশ্য ভাবে না আছেন, এবং এমন ক্রিয়া নাই, যাহার তিনি কর্ত্তা নহেন।[২]

এক রাজা মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ঈশ্বরের অগ্রে কে আছে? মন্ত্রী উত্তর দিলেন, এক সংখ্যার অগ্রে যদি কিছু আকার সম্ভব হয়, ঈশ্বরের অগ্রেও কিছু থাকিতে পারে। সুতরাং একের অগ্রেও কিছু নাই, ঈশ্বরের অগ্রেও কিছু নাই। বস্তুত ঐশ্বরিক বিষয়ে আমরা সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধীন। এজন্য আমরা ঐশী সীমার বাহিরে অর্থাৎ ঈশ্বরের উর্ধ্বে গমন করিতে পারি না। মূলকথা এই, ঈশ্বর আমাদিগকে তদুপযোগী জ্ঞান দেন নাই, দিলে তাঁহার গৌরব থাকিত না। আর কেহ সীমা উলঙ্ঘন করিতে চাহিলে, তিনি কস্মিন্ কালেও তাহাতে কৃতকার্য্য হইবেন না। লাভের মধ্যে তিনি নাস্তিক হইবেন সন্দেহ নাই। যদি কোন প্রকৃতিবাদী কি নাস্তিক বলেন যে, ঈশ্বর নাই, প্রকৃতির শক্তি বলে চন্দ্র, সূৰ্য্য, মনুষ্য ইত্যাদি যাবতীয় বস্তু উৎপত্তি হইয়াছে। তাহার উত্তরে বলি, প্রকৃতি অচেতন, অন্ধ এবং জ্ঞানহীন মৃত্তিকা বৈ নয়। সেই অচেতন বস্তু কখনই চৈতন্যময় বস্তু উৎপাদন করিতে পারে না এবং চৈতন্যময় বস্তুর আশ্রয় ব্যতীত প্রকৃতির শক্তি প্রকাশ হইতে পারে না। প্রকৃতি ছাঁচ স্বরূপ, ছাঁচের গঠন ব্যতীত ভিন্নাকার বস্তু ছাঁচে নিশ্চিত হইতে পারে না। আর নিৰ্ম্মিত হইলেও একাকার বস্তু নিৰ্ম্মিত হয়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রযুক্ত নানাবিধ আকারের প্রাণী ও উদ্ভিদাদি অহরহ নিৰ্ম্মিত হইতেছে। নির্ম্মাতা ব্যতীত কেবল স্ত্রী পুরুষের সঙ্গমে যদি সন্তান হইত; তবে মাংসের একটি পিণ্ডবৎ বস্তু গর্ব্ভে জন্মিত; আকার বিশিষ্ট কখনই জন্মিত না। আর আকার বিশিষ্ট জন্মিলেও অস্বাভাবিক আকারের অর্থাৎ কোন সময় কাহার তিন হাত, কেহ অন্ধ, কাহারও হাত পা বিহীন ও এক গর্ব্ভে চারিটী সন্তান জন্মিত না। যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকে, তবে এইরূপ[৩] সুশৃঙ্খলার সহিত দিবা রাত্রি হইত না, নিয়ম মত সূৰ্য্য কিরণ দিত না, সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইত না; মেঘ হইতে বৃষ্টি বর্ষিত হইয়া ক্ষেত্ৰ উৰ্ব্বরশালী হইত না; বরং সমুদয় কার্য্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্ট হইত। ফলতঃ যখন যাহা আমাদের আবশ্যকীয় ও হিতকর, তাহা[৪] সংগৃহীত হইত না। প্রাকৃতিক ঘটনা গুলি কৌশলময় হইত না, বিশ্রামের জন্য রাত্রি কাল ও পরিশ্রম করিবার জন্য দিবাভাগ নির্দ্দিষ্ট হইত না, স্বভাবের শোভা বিলোকন করার জন্য প্রাতঃকাল, চন্দ্রিমা নিশি, তারকারাজি সমুদিত সুবিস্তীর্ণ আকাশ মণ্ডল দৃষ্ট হইত না। ঈশ্বর আমাদের চিত্তরঞ্জন করার জন্য বিশাল সমুদ্রোপরি সূর্য্যোদয় ও সূর্য্য অস্ত কাল, গম্ভীর সমুদ্র শহরী ও কল্লোল, সমুদ্রের প্রশান্ত মূর্ত্তি সৃজন করিয়াছেন। দিকদর্শন এবং রাত্রির পরিমাণ স্থির করিবার জন্য নক্ষত্র মালা সৃজন করিয়াছেন। প্রকৃতির বিচিত্র শোভা প্রদর্শন করার জন্য বিজন গহন পৰ্ব্বত সৃজন করিয়াছেন। ঈশ্বর সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে মানব জাতির অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, চক্ষু, মস্তিষ্ক ও গঠন প্রণালী নিৰ্ম্মাতার অসীম নৈপুণ্যের পরিচায়ক। হাত, চক্ষু, দন্ত, কর্ণ, নাসিকা যাহা আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় ও সুবিধা জনক, ঈশ্বর আমাদিগকে তাহাই দিয়াছেন। আমরা যখন জননীর গর্ব্ভে বাস করিতেছিলাম, তখন তাহার প্রথমাবস্থায় আমাদিগের এ সকল সম্পদ কিছুই ছিল না। এই পৃথিবীতে আসিবার পূর্ব্বে এক জন জ্ঞানবান্ হইতে আমরা এই সকল প্রাপ্ত হইয়াছি এবং এই সকল সম্পদ লইয়া এই অজ্ঞাত পৃথিবীতে আসিয়াছি। পৃথিবীতে আসিলে আমাদের এ সকল সম্পত্তির প্রয়োজন হইবে, উহা বিবেচনা করিবার কেহ না থাকিলে কি প্রকারে আমরা এই সকল লাভ করিলাম। বিবেচনা ব্যতীত উপযুক্ত বস্তু পাওয়া যায় না। কিন্তু বিবেচনা কাহার? বিবেচনা কখনই শূন্য হইতে আসিতে পারে না; তাহার পাত্র থাকা আবশ্যক। পাত্রই ভাবার্থে ঈশ্বর। যেমন রেলওয়ে এবং ষ্টিমার পরিচালিত হইবার জন্য ইঞ্জিন আছে, সেইরূপ আমাদের পাকস্থলী ইত্যাদি ঠিক ইঞ্জিনের ন্যায় নির্ম্মিত হইয়াছে। হংসের পায়ের পাতাগুলি সাঁতার দিবার উপযোগী করিয়া সৃজন করিয়াছেন; ব্যাঘ্র, বিড়াল ও কুকুরের দন্ত গুলি মাংস খাওয়ার উপযোগী করিয়াছেন; সাঁতার দিবার জন্য মৎস্যের দুই খানা পাখা দিয়াছেন; মূষিক ধরিবার জন্য বিড়ালের দৃষ্টি শক্তি অধিক দিয়াছেন; মরুভূমিতে যাতায়াত করিবার জন্য উষ্ট্রকে কষ্টসহিষ্ণু ও তাদের পা গুলি সেই উত্তপ্ত বালুকাময় প্রান্তরে যাতায়াতের উপযুক্ত নির্ম্মাণ করিয়াছেন। এই রূপ যে দেশের লোক ও পশু পক্ষীর যাহা খাদ্যোপযোগী ও প্রয়োজনীয়, সেই দেশে সেই বস্তু প্রচুর পরিমাণে জন্ম দিয়াছেন। অনেক সময়ে আবার প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে বিচিত্র অলৌকিক কার্য্যগুলি দেখাইয়াছেন; কয়লার ভিতরে হীরকের জন্ম দিয়াছেন; ঝিনুকের মধ্যে মুক্তার বাসস্থান নির্দ্দেশ করিয়াছেন; বৃক্ষোপরি নারিকেলের মধ্যে জলের সৃষ্টি করিয়াছেন; বাদুর পক্ষী (অন্যান্য পক্ষীর বিপরীত) মুখের দ্বারা মল পরিত্যাগ করে; ময়ুর অস্বাভাবিক উপায়ে সন্তানোৎপাদন করে; ময়ূর নৃত্য করিতে করিতে মুখ হইতে জলবৎ তরল বস্তু নির্গত হয়, ময়ূরী তৎক্ষণাৎ তাহা ভক্ষণ করে, তাহাতেই ডিম্ব উৎপন্ন হয়। কিন্তু ময়ূর ময়ুরী পরস্পর সঙ্গম করে না। আবার কোকিল কখনও বাসা নিৰ্ম্মাণ করে না, কাকের বাসায় ডিম্ব প্রসব করে। কাক অপরিচিত ভাবে সেই ডিম্বে তা দেয়, তাহাতেই ডিম্ব ফুটে এবং কোকিলশাবক নির্গত হয়।

দেখ, ঈশ্বর মানব জাতিকে কিরূপ কৌশলময় প্রণালীতে সৃজন করিয়াছেন। যখন ঈশ্বর মানব প্রাণীর জন্ম দিবার মানস করেন, তখন দম্পতি প্রেমে আকৃষ্ট হইয়া পরস্পরের সঙ্গমে অপবিত্র জল নিঃসৃত হয়। সেই অপবিত্র জল বিন্দু স্ত্রীলোকের জননেন্দ্রিয়ে প্রবিষ্ট হয়, সেই জল বিন্দু হইতে সন্তান ক্রমশঃ মনুষ্যাকারে নির্ম্মিত হইতে থাকে। সন্তান ৯ মাস ৯ দিন গর্ব্ভাবস্থায় অবস্থিতি করে। বিধাতা গর্ব্ভ মধ্যে অদৃশ্য ভাবে চক্ষু, মুখ, কর্ণ, নাসিকা, হাত, পা বিশিষ্ট একটী মানব মুর্ত্তি নির্ম্মাণ করিয়া প্রাণ দান করেন এবং তাহার আহার যোগান, জরায়ু মধ্যে সন্তানকে জলোপরি ভাসমান রাখেন এবং শিশুর নাভিমূলে সংযুক্ত দুইটা রক্ত বাহিনী শিরা দ্বারা রক্ত যোগাইয়া শিশুকে জীবিত রাখিয়া থাকেন। তদন্তর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। ভূমিষ্ঠ সন্তান নিতান্ত কোমল এবং পরিপাক শক্তি বিরহিত। এজন্য জাত হইবার ৫ মাস পূর্বেই তিনি মাতৃ স্তনে দুগ্ধের সঞ্চার করিয়াছেন। মাতৃ স্তন অতি কোমল এবং বহু সূক্ষ্ম ছিদ্র বিশিষ্ট। যদি ছিদ্র বড় হইত, তবে এক সঙ্গে বেশি পরিমাণ দুগ্ধ শিশুর উপরস্থ হইয়া অপকার করিত। সুতরাং মৃদু ভাবে দুগ্ধ যোগাইবার জন্য স্তনাগ্র সূক্ষ্ম ছিদ্র বিশিষ্ট করিয়াছেন। যখন ২ বৎসর সময় অতিবাহিত হয়, এবং দুগ্ধ পানের অনাবশ্যকতা অনুভব করেন, তখন তাহার মুখ গহ্বরে কোমল দন্ত প্রদান করিয়া থাকেন। শিশুরা আশ্রয় ব্যতীত আহার নিদ্ৰা করিতে পারে না, এজন্য পিতা মাতার অন্তঃকরণে স্নেহের সঞ্চার করিয়া দিলেন। অতঃপর শিশু ক্রমশঃ বাড়িয়া কার্য্যক্ষম হইবার উপক্রম হইল। ক্রমে ক্রমে পিতা মাতার দয়ার হ্রাস হইতে লাগিল এবং শিশুর পঞ্চেন্দ্রিয়ও সতেজ হইতে লাগিল। দেখিতে চক্ষু দিলেন, শুনিতে কর্ণ দিলেন, নিশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ এবং আঘ্রাণ লইতে নাসিকা দিলেন। নাসিকা রন্ধ্র গুলি লোমে পরিপূর্ণ। যদি নাসিকা রন্ধ্রে  (বিবরে) লোম না হইত, তবে কে বায়ু বিশোধিত করিয়া লইয়া যাইত? বরং বায়ু প্রশ্বাসে ধূলা প্রভৃতি অনিষ্টকারী বস্তু অভ্যন্তরে নীত হইয়া প্রাণ বিনাশ করিত। তিনি বাক্য উচ্চারণের জন্য রসনা দিয়াছেন, মন্তকের শোভা বন্ধনের জন্য চুল দিয়াছেন; বায়ু প্রবিষ্ট হইবার জন্য কর্ণে ছিদ্র দিয়াছেন। কীটাদি প্রবিষ্ট না হইতে পারে এবং প্রবিষ্ট হইবামাত্র টের পাওয়া যায়, এই উদ্দেশ্যে কর্ণের রন্ধ্র বক্র করিয়া নির্ম্মাণ করিয়াছেন। মুখের শোভা সম্পাদন এবং খাদ্য দ্রব্য চিবাইবার জন্য দন্তাবলী প্রদান করিয়াছেন। কোন দন্ত সূক্ষ্মাগ্র বিশিষ্ট, কোন দন্ত জাঁতার ন্যায়। সূক্ষ্মাগ্র দন্ত দ্বারা মাংসাদি কর্ত্তন করা যায় এবং তার দ্বারা পেষণ ও চূর্ণ করার কাৰ্য্য সাধিত হয়। শরীর চুলকাইবার জন্য নখ দিয়াছেন, আঁকড়াইয়া ধরিবার জন্য পঞ্চাঙ্গুলী দিয়াছেন। দূরের বস্তু ধরিবার জন্য এবং স্পর্শ করিবার জন্য হস্ত দিয়াছেন; খাদ্য দ্রব্য সঞ্চিত করার জন্য পেট দিয়াছেন; পরিপাক করার জন্য পিত্তাগ্নি প্রদান করিয়াছেন। চলিবার জন্য পা দিয়াছেন, পরিচয় করার জন্য প্রত্যেক মনুষ্যের স্বর এবং আকার ভিন্ন ভিন্ন প্রদান করিয়াছেন। চক্ষু না থাকিলে আমাদের সম্বন্ধে বাহ্য জগৎ থাকা না থাকা সমান হইত। আবার বাহ্য জগতের নানা প্রকার ঘটনাতে সেই সুন্দর কোমল চক্ষু বিনষ্ট হইতে না পারে, এজন্য অতি সুন্দর কৌশলময় দুইটী কপাটে তাহা আবৃত হইয়া রহিয়াছে। আবার চক্ষু ২টী যে দিয়াছেন, তাহার উদ্দেশ্য এই যে, একটী নষ্ট হইলে অপরটা দ্বারা কাজ চলিতে পারে। চক্ষুর কপাট এমন সুন্দর কৌশলে ব্যবস্থাপিত যে বিপদ উপস্থিত হইলে আপনা হইতে চক্ষুকে রক্ষা করে; কৰ্ত্তার কিছু চেষ্টার প্রয়োজন করে না। আবার সেই পার্শ্বস্থ কপাট সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কৃষ্ণ লোমরাজিতে সজ্জিত রহিয়াছে। তাহা দ্বারা বাহিরের আলোক উত্তাপ কীট বালুকাদি হইতে চক্ষু রক্ষিত হইতেছে। দয়াময় জগৎপিতা এই রূপে প্রত্যেক বস্তুই আমাদের আবশ্যকীয় করিয়া সৃজন করিয়াছেন।

ফলতঃ ঈশ্বর কর্তৃক একটী ইন্দ্রিয়ের আবশ্যকতা বর্ণন করিতে গেলে ন্যূনকল্পে একখানা বৃহদায়তন Welester ডিকসনারি হইয়া পড়ে। পশু পক্ষীকে ইন্সটিংট (Instinet) বুদ্ধি অর্থাৎ সীমা বিশিষ্ট স্বভাব জাত বুদ্ধি প্রদান করিয়াছেন। যেমন মাংস খাওয়া, বাচ্চা দেওয়া এবং সময়ানুসারে গৰ্ব্ভ রক্ষা করা ইত্যাদি। কিন্তু মানব জাতিকে উত্তরোত্তর বর্ধিষ্ণু বুদ্ধি প্রদান করিয়াছেন, তারা পার্থিব কার্য্যের যথেচ্ছ উন্নতি করিতে পারে। কিন্তু পশুগণ তাহা পারে না। যদি পশুদিগের সীমা বিশিষ্ট বুদ্ধি না থাকিত, তবে কখনও তাহারা মনুষের আনুগত্য স্বীকার করিত না। মানুষের সন্তান প্রসব করিতে যত কষ্ট হয়, পশুব তদ্রুপ হয় না; কারণ তাহা হইলে পশুর শুশ্রূষাকারী পাওয়া যাইত না। বুদ্ধি বিহীন পশুদিগের ঘন ঘন রোগ হইলে চিকিৎসা করা কঠিন হইত। শস্যাদি নাশক কীটাদির বিনাশ জন্য বক, গনাকোটী প্রভৃতি কতকগুলি পক্ষীর সৃষ্টি করিয়াছেন। গবাদি পশুর গাত্রস্থ পোকা ধ্বংস করার জন্য কাক এবং শালিক পক্ষীর সৃষ্টি করিয়াছেন। ভাই প্রতিবাদী, বল দেখি, ভূত ভবিষ্যৎ দৃষ্টি করিয়া সৃষ্টি করা কি অচেতন প্রকৃতির কাৰ্য্য? মাকড়সা, মৌমাছি এবং ভীমরুল, কুমারিকা কিরূপ নিপুণতার সহিত জাল ও চক্ৰ নিৰ্ম্মাণ করে। বাবুইর বাসা নিৰ্ম্মাণ কার্য্য দেখিলে আরও অধিকতর বিস্ময়াবিষ্ট হইতে হয়। লাউ এবং সিম গাছের প্রকৃতি দৃষ্টি করিলে ঈশ্বরের অপার মহিমার প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। তার ছোট ছোট আকড়া রেখা গুলি বিনা সাহায্যে আপনা আপনি বাঁশে জড়াইয়া ধরে। ফুল বাগানে গোলাপ, জুই, চামেলী, মালতী, বেলী প্রভৃতি নব প্রস্ফুটিত ফুলের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে এবং তাহাদের আঘ্রাণ লইলে কোন্ সহৃদয় ব্যক্তির অন্তঃকরণ ভক্তি রসে আপ্লুত না হয়? আহা! শুক্ল পক্ষ নিশিতে সরোবরে জলোপরি কুমুদিনী প্রভৃতি জলজ পুষ্পাবলী প্রস্ফুটিত হইয়া কি নয়ন তৃপ্তিকর আনন্দ দায়ক দৃশ্যই না প্রতিভাত করে। মহাপ্রভু পরমেশ্বর নাস্তিকদিগের চিন্তা শক্তি বিলুপ্ত করার জন্য শূন্যে শূন্যলতার[৫] জন্ম দিয়াছেন। ফলের উপরিভাগ মিষ্ট অথচ কোমল এবং অভ্যন্তর ভাগ শক্ত। রোপণ করিবার অভিপ্রায়ে ফলের আঁটি গুলি শক্ত এবং বিস্বাদ সৃষ্টি করিয়াছেন। যদি সুস্বাদ হইত, তবে মনুষ্যেরা উদরসাৎ করিত। সাইবিরিয়া, ফিনল্যাণ্ড, ল্যাপল্যাণ্ড, গ্রীনল্যাণ্ড, আইসল্যাণ্ড প্রভৃতি শীত প্রধান দেশের পশুগুলির লোম বেশী। গ্রীষ্মপ্রধান দেশের পশুর লোম পাতলা, তথাকার অধিবাসীর খাদ্যও লঘুপাক বস্তু নির্দ্দেশ করিয়াছেন। মৎস্য লঘু পথ্য, এজন্য তাহা দুৰ্ব্বল বাঙ্গালীর খাদ্য নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। শীত বাত বৃষ্টি হইতে রক্ষা পাইবার জন্য নিরাশ্রয় পশু পক্ষীদিগের গাত্রে লোম ও পালক দিয়াছেন। কোমল চিংড়ি মৎস্যের গাত্রে কঠিন আবরণ দিয়াছেন। পশুর আহারের জন্য পৃথিবী ব্যাপিয়া সবুজ বর্ণ ঘাস দিয়াছেন। এইরূপ পরম্পর কৌশলময় কাৰ্য্য দৃষ্টে হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিতে থাকে।

তাঁহার প্রত্যেক কাৰ্য্যই কৌশলময়[৬] তবে কোন কাৰ্য্যে যে অকৌশল ও অমঙ্গল দৃষ্ট হয়, তাহার মর্ম আমরা বুঝিতে অক্ষম। কিন্তু ভাবিয়া দেখিলে তাহার কৌশল বিলম্বে প্রকাশ হয়। ঈশ্বর আমাকে আহার দেন মঙ্গলের জন্য, শাস্তি দেন মঙ্গলের জন্য, পীড়া দেন মঙ্গলের জন্য, দুঃখ দেন মঙ্গলের জন্য। যেমন শিক্ষক ছাত্রকে পাঠ অবহেলার জন্য শাস্তি দিলে এবং পিতা মাতা শিশুকে অনিষ্টকারী খাদ্য না দিলে এবং কুপথে যাইতে দেখিয়া প্রহার করিলে, (সন্তোষের পরিবর্ত্তে) বিষাদিত হয় এবং গালি দেয়, সেইরূপ আমরাও না বুঝিয়া পরমেশ্বরের কার্য্যে অমঙ্গল ভাবি। যে বস্তু যত প্রয়োজনীয়, সে বস্তু তত সুলভ, আর যে বস্তু যত অল্প প্রয়োজনীয়, সে বস্তু তত দুর্ল্লভ। লৌহ বড় প্রয়োজনীয়, অধিক পরিমাণে ব্যবহার না করিলে চলে না, এজন্য তাহা অতীব সুলভ। উহা যত ব্যবহার করিতে পারি, ততই সহজে পাই। যে দেশে যে বস্তুর উৎপত্তি অধিক, সে বস্তুর উপকারিতাও সেই দেশে অধিক। বাদাম, পেস্তা, আখরোট প্রভৃতি উষ্ণতা সাধক; এজন্য তাহা গ্রীষ্ম প্রধান দেশে জন্মে না। ইক্ষু, আনারস, আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা প্রভৃতি শৈত্য সাধক; এজন্য ইহারা গ্রীষ্ম প্রধান দেশের প্রধান উৎপন্ন বস্তু। আবার শীত কালে যে সকল বস্তু জন্মে, তাহা উষ্ণবীৰ্য্য এবং গ্রীষ্ম কালে যে ফল জন্মে, তাহা শীতবীর্য্য গুণ বিশিষ্ট। বায়ু, পিত্ত, কফ এই তিন বস্তু দ্বারা মানব শরীর নির্ম্মিত হইয়াছে। যখন বায়ু কুপিত হয়, তখন বায়ু নিবারক বস্তু, আর যখন কফ কুপিত হয়, কক নিবারক বস্তু খাওয়ার প্রবৃত্তি জন্মে। ফলতঃ যে বস্তু যাহার অনুপকারী, সে বস্তু তাহার প্রাণে চাহে না। যাহা হউক, ইহা দ্বারা সম্পূর্ণ রূপে বুঝিতে পারি, এই বিশাল পৃথিবী কেবল মনুষ্য জাতির মঙ্গল সাধনার্থেই সৃষ্ট হইয়াছে। নাস্তিক মানুন আর নাই মামুন, আমরা সগর্ব্বে মুক্তকণ্ঠে বলিব, জগতের প্রতি পরমাণু হইতে ঈশ্বরের মঙ্গল ভাব এবং অস্তিত্বের প্রমাণ প্রদর্শিত হইতেছে। যদি কেহ বলেন, আমরা ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখি না কেন[৭], তদুত্তরে বলি, তুমি যোগ্য হইলে অবশ্য দেখিবে। রাজপ্রতিনিধি গবর্ণর জেনেরল বাহাদুরের সহিত যে সে লোক সাক্ষাৎ করিতে পারে না; সাক্ষাৎ করিতে হইলে তদ্রূপ যোগ্যতার প্রয়োজন। বায়ু ও প্রাণ এই দুইটী অদৃশ্য বস্তু, কিন্তু ইহাদের কার্য্য প্রযুক্ত বুঝিতে পারি, নিশ্চয়ই বায়ু ও প্রাণ এই দুইটা বস্তুর অস্তিত্ব আছে। ইহা অপেক্ষা ঈশ্বরের কার্য্য কত কোটি গুণ বড়। কিন্তু চর্ম্মচক্ষে দেখা যায় না বলিয়া কি বুঝিব যে, ঈশ্বর নাই। সক্রেটিস (সেক্ৰাত) প্লেটো (আফলাতুন) এরিষ্টটল (আরাস্ত) প্রভৃতি গ্রীস দেশীয় মহাজ্ঞানী পণ্ডিত মণ্ডলী ও ঈশ্ববের অস্তিত্ব বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়া গিয়াছেন। আর এক প্রমাণ এই যে, যে বস্তু বিদ্যমান আছে, সেই বস্তুর নামও পৃথিবীতে আছে। আর যাহা নাই, তাহার নামোল্লেখ হয় না। লোক বিপদ কালে ও অন্তিম সময়ে ঈশ্বরের নাম গ্রহণ করিয়া থাকে। ফলতঃ যত ধর্ম্মাবলম্বী লোক আছে, সকলেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া থাকে। যাহারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে না, তাহারা ধর্ম্মাবলম্বী শব্দে বাচ্য হইতে পারে না। নাস্তিকের অন্তঃকরণে কখনও শান্তি সুখ বিরাজিত নাই। মৃত্যু কালেও কোন কোন নাস্তিক ঈশ্বরের নাম গ্রহণ করিয়া থাকে। যোসেফ বারকার নামক প্রধান নাস্তিকও নিতান্ত দুঃখিত হইয়া অন্তিম কালে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া গিয়াছেন।

ঈশ্বরের কোন ভৌতিক আকার নাই। ঈশ্বরকে নিরাকার বলিলে ইহা বুঝা যায় না যে, তাঁহার কিছুই নাই। তাঁহার যাহা আছে, তাহাই সমস্ত জগতের মূল কারণ। কিন্তু ইহা ইন্দ্রিয়গণের প্রত্যক্ষ বহির্ভূত। ভৌতিক বস্তু বা সৃষ্ট বস্তুর প্রতিই ইন্দ্রিয়গণের অধিকার। সৃষ্টির অতীত বস্তুর প্রতি ইন্দ্রিয়ের কর্ত্তৃত্ব চলে না। ঈশ্বর সকলের স্রষ্টা; তিনি সৃষ্ট নহেন। সুতরাং তিনি সৃষ্টির অতীত। সৃষ্টির অতীত ঈশ্বর ব্যতীত আর কিছুই নাই। এজন্য তাঁহার নিকট ইন্দ্রিয়গণের কোন ক্ষমতা নাই। ইন্দ্রিয় আমাদের জ্ঞান লাভের প্রধান উপায়। যে স্থানে ইন্দ্রিয়ের কোন অধিকার নাই, সে স্থানে আমাদের জ্ঞানও অচল। তবে কি আমরা ঈশ্বকে অনুভব করিতে অক্ষম? চিন্তা করিলেই প্রতীতি হইবে যে, আমরা তাঁহাকে অনুভব না করিয়া থাকিতে পারি না। জ্ঞান বা জগতের কাৰ্য্য করিতে গিয়া যেমন ইন্দ্রিয়দিগের মুখাপেক্ষা করে, অন্তর্জগতেও তাহাকে তাহাই করিতে হয়। ঈশ্বরের নিকট যাইতে ইন্দ্রিয়গণের সাহায্যে পরস্পর সম্বন্ধে; সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নহে। প্রথম ইন্দ্রিয়গণের সাহায্যে বাহ্য বস্তু, বাহ্য বস্তুর সাহায্যে আত্মা; আত্মার সাহায্যে পরমাত্মাকে পাইয়া থাকি। ইহাতেও ঈশ্বর স্বতঃসিদ্ধ রূপে জ্ঞানের আয়ত্ত। এ কথার কোন বাধা উপস্থিত হইল না। কারণ বাহ্য জ্ঞান এবং আত্মজ্ঞান যেমন যুগপথ প্রস্ফুটিত হইতে থাকে, তেমন আত্মজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর জ্ঞান প্রস্ফুটিত হয়।

পণ্ডিত কোমত বলেন, নিয়মেই সমস্ত বিশ্ব ব্যাপার চলিতেছে। নিয়ম ভিন্ন কিছুই হয় না ও হইতে পারে না, এবং নিয়ম ভিন্ন মনুষ্যের জ্ঞাতব্য আর কিছুই নাই। যেমন বিদ্যুৎ নির্ঘোষিত হয় নিয়মে, পক্ষী সকল উড়িয়া কুলায় নির্ম্মাণ করে নিয়মে, ডিম্ব প্রসব ও শাবক পোষণ করে নিয়মে, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয় নিয়মে। সুতরাং আমরা কোমতের শাসন মান্য করিতে পারি না। কেন না, উৎপন্ন বলিলে উৎপাদক, সৃষ্টি বললে স্রষ্টা, নিয়ম বলিলে নিয়ন্তা, স্বাভাবিক রূপে আসিয়া পড়ে। আর বলি, নিয়ম ভিন্ন মনুষ্যের অতি সহজ জ্ঞাতব্য নিয়ন্তা। নিয়ন্তাই প্রকারান্তে ঈশ্বর।

এস্থলে ইহা বলা অত্যুক্তি নহে যে, আত্মজ্ঞানই তত্ত্বজ্ঞানের কুঞ্জি। যিনি নিজকে চিনিয়াছেন, তিনি নিরঞ্জনকে চিনিয়াছেন। যিনি খোদকে চিনিয়াছেন, তিনি খোদাকে চিনিয়াছেন। মনুষ্য আপন অস্তিত্ব হইতে বিশ্বকর্ত্তা খোদাতাআলার অস্তিত্ব জানিতে পারে; স্বীয় গুণ দেখিয়া খোদাতাআলার গুণ চিনিতে পারে। মনুষ্য আপন শরীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রূপ রাজত্বের উপর যে প্রকার প্রভুত্ব ও ক্রিয়া পরিচালনা করে, তাহা দেখিয়া সমস্ত বিশ্ব জগতের উপর সৃষ্টিকর্ত্তার প্রভুত্ব ও ক্রিয়া কিরূপে পরিচালিত হয়, তাহা বুঝিতে পারা যায়। আত্মা যেমন দেহের বাদশাহ স্বরূপে অধিষ্ঠান করিতেছে, দেহ ও দেহস্থিত সমস্ত আকার বিশিষ্ট পদার্থও তদ্রুপ আত্মার আজ্ঞায় চলিতেছে,অথচ নিজে নিরাকার। সেইরূপ বিশ্ব জগতের বাদশাহ খোদাতায়ালা স্বয়ং নিরাকার ও অচিন্ত্য হইয়া এই জড়ময় বিশ্ব জগৎ চালাইতেছেন। খোদাতাআলা যদিও সৰ্ব্বত্ৰ সৰ্ব্বদা বিদ্যমান, তথাপি কোন এক বিশেষ স্থানে আবদ্ধ নহেন। আমাদের জীবনও কোন এক বিশেষ অঙ্গে আবদ্ধ নহে। জীবন না হস্তের মধ্যে, না পদে, না অন্য কোন অঙ্গেই বর্ত্তমান। দেহের সকল অঙ্গ বিভক্ত হইতে পারে, কিন্তু প্রাণ বিভক্ত হইতে পারে না। কেন না, যদি সমাবেশ হইতে পারিত, তবে উক্ত বিভাজ্য পদার্থের সহিত উহাও বিভক্ত হইয়া যাইত। সুতরাং ইহাতে বুঝা যাইতেছে, কোনই অঙ্গে প্রাণের সমাবেশ নাই। কিন্তু পক্ষান্তরে কোন অঙ্গই প্রাণের অধিকার হইতে বহির্ভূত নহে। জীবন সমস্ত দেহের বাদশাহ। খোদাতাআলা কোন এক বিশেষ স্থানে আবদ্ধ নহেন। সমস্ত বিশ্ব জগৎ খোদাতলার পরিচালনাধীনে আছে।

ক্রমে বিকাশ স্বীকারকারী ব্যক্তিগণ evolutionist বলেন, প্রাকৃতিক প্রত্যেক বস্তুই সুবিধা এবং ঘটনাক্রমে, ক্রমে ক্রমে বিকাশ হইয়াছে। তাহারা ঈশ্বরের আবশ্যকতা স্বীকার করেন না। তদনুসারে আমি বলিতে পারি, আগ্রার তাজমহল যাহা বহুদিনে নির্ম্মিত হইয়াছে, তাহাতে নির্ম্মাতার অস্তিত্বের কোন পরিচয় দেখা যাইতেছে না। ঐ গৃহটা অকস্মাৎ পৃথিবী হইতে উত্থিত হয় নাই। আমি বলি, তাহার নির্ম্মাতা নাই। ইষ্টকগুলি ক্রমশঃ নির্ম্মিত, সংগৃহীত এবং সুসজ্জিত হইয়াছে। কড়ি কাষ্ঠ আন্তে আস্তে আনীত হইয়াছে। যদি তাহারা বলেন, তাজমহলের নির্ম্মাতা আছে, তবে আমাদেরও নির্ম্মাতা ঈশ্বর আছেন। ক্রম বিকাশবাদীরা আরও বলেন, মনুষ্য প্রথমে বানর ছিল; 'পরে কালক্রমে লাঙ্গুল খসিয়া গিয়া মানবাকৃতি ধারণ করিয়াছে। মনুষেরা প্রথমতঃ চতুষ্পদে বিচরণ করিত, পরে ক্রমশঃ দ্বিপদে হাটিতে শিখিয়াছেন ইত্যাদি। ডারউইন সাহেব এই মতের প্রচারক ছিলেন।[৮] মানব শরীরের অবয়বগুলি যে ভাবে সংযোজিত আছে, তাহা দেখিলে যে ইহা সৌন্দৰ্য্যজ্ঞ কোন বুদ্ধির সাহায্যে হইয়াছে, তাহা স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। অবয়বের মধ্যে যে গুলির সংখ্যা এক, তাহারা দেহের ঠিক মধ্যস্থলে সংন্যস্ত, কিন্তু যে গুলি সংখ্যায় দুইটা তাহারা দুই ধারে সমান দূরে সংস্থাপিত; যথা—নাসিকা, ওষ্ঠ, চিবুক, গাল, বক্ষস্থল, নিম্নভাগ, নাভি ইত্যাদি সংখ্যায় একক হওয়াতে শরীরের ঠিক মধ্যস্থলে সংস্থাপিত। সেইরূপ ভ্রূ, চক্ষু, গণ্ড, হস্ত, স্তন ইত্যাদি সংখ্যায় দুই হওয়াতে উক্ত মধ্যস্থলস্থ অঙ্গ হইতে দুই প্রান্তে সমান দূরে অবস্থিত। এইরূপে সমুদয় অঙ্গগুলি সুসজ্জিত রূপে আবদ্ধ হওয়াতে কি পরম শোভা বিস্তার করিতেছে। সুতরাং কোন সৌভাগ্য পুরুষের অসামান্য চিন্তা ইহাদের মূলে কি স্পষ্ট ভাবে অবস্থান করিতেছে। কিন্তু যে স্থলে চিন্তা তথায় মন এবং এই অসামান্য মনই ঈশ্বর।

ধার্মিক চূড়ামণি মহাত্মা থিওভার পার্কার বলেন, আমাদের মনে যতগুলি প্রবৃত্তি আছে, বাহিরে তাহাদের বস্তু অবলোকিত হয়। আমাদের মানসে দয়া আছে, বাহিরে দয়ার বস্তু আছে; ক্রোধ আছে, ক্রোধের বস্তুও আছে; ভয় আছে, ভয়াবহ বস্তুও রহিয়াছে; হিংসা আছে, হিংসোদ্দীপক নানাবিষয়ও আছে। বস্তুতঃ বিষয় হীন প্রবৃত্তি থাকিতে পারে না।

যখন সকল প্রবৃত্তির এক একটা বিষয় আছে, তখন কেবল অলৌকিক কোন পুরুষের প্রতি ভক্তি প্রবৃত্তির বিষয় নাই, ইহা যুক্তিতেই আইসে না। যখন হৃদয়ে মাতৃভক্তি আছে, এবং উহার পাত্র মাতা জগতে আছেন দেখিতে পাই, তখন মানসে ঈশ্বরভক্তি রহিয়াছে, অথচ ঈশ্বর নাই, ইহা বিবেচক মাত্রেই অস্বীকার করিবেন।

টিকা ও মন্তব্য

  1. ১.↑
    প্রাণ হইতে প্রাণ। জড় হইতে প্রাণীর উৎপত্তি হয় না। বিগত উনবিংশ শতাব্দীর ইহা একটী অমূল্য আবিষ্কার। পূর্ব্বে এক জন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জীবাণু সমূহ উষ্ণ জলে নষ্ট করিয়া, সেই জল একটা বোতলে পূরিয়া রাখেন। কতক দিন পরে বোতলটী খুলিয়া অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখিতে পাইলেন, সেই জলে জীবাণু জন্মিয়াছে। তখন তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন যে, জড় হইতে জীবের উৎপত্তি হয়। কিছুকাল পরে টিণ্ডাল প্রভৃতি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকগণ জলকে ভয়ানক রূপে ফুটাইয়া ও চাপ দিয়া জীবাণু নষ্ট করেন এবং সেই জল বোতল পূরিয়া রাখেন, কতক দিন পরে অণুবীক্ষণ দ্বারা দেখিতে পান, জলে একটাও জীবাণু জন্মে নাই। তখন তাঁহারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, জড় হইতে জীবাণু উৎপত্তি হয় না। আমরা আশা করি, উনবিংশ শতাব্দী এই যে একটী অমূল্য সত্য মানব জাতিকে শিক্ষা দিয়াছেন, তাহা যেন কেহ ভুলিয়া না যান। বিজ্ঞানের এই নব আবিষ্কারে ধর্ম্মজগতের ভিত্তি সুদৃঢ় হইয়াছে।
  2. ২.↑

    বাস্তবিক সহজ জ্ঞানে ও সরল বিশ্বাসে ঈশ্বর সম্বন্ধে চিন্তা করিলে মনে যেমন সহজেই তাঁহার অস্তিত্বের অনুভব ও ধারণা হয়, যুক্তি তর্কের দ্বারা প্রমাণ প্রয়োগ তদ্রূপ হওয়া সম্ভবপর নহে। বলতে কি, বিবেকের আশ্রয় লইলে, ঈশ্বর বিশ্বাস যেন আপনা হইতেই আসে।

    যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে না, সে নাস্তিক। নাস্তিকদিগের মত যে কতদূর মূল্যবান তাহা এই সামান্য যুক্তি দ্বারা বিশেষ রূপে প্রমাণিত যথা—শূন্য অর্থাৎ কিছুই নয়; আমরা সমস্ত পদার্থের মূলে একমাত্র সৃষ্টিকর্ত্তা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি। কিন্তু নাস্তিকগণ বলেন, আদৌ ঈশ্বর নাই, অর্থাৎ শূন্য। প্রিয় পাঠক এক বার স্থির চিত্তে বিচার করিয়া দেখুন যে, কোন একটী নির্ণয়াত্মক রাশি স্থাপন করিয়া উহার দক্ষিণ ক্রমান্বয়ে শূন্য যোগ করিলে দেখা যায় যে, শেষ শূন্যটী দ্বারা উহার পূর্ব্ববর্ত্তী রাশিটী দশ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। যথা ১০০০০০ এই প্রকার শূন্য যোগ করিলে, ক্রমান্বয়েই ঐরূপ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে। কিন্তু ঐ সকল শূন্য রাশির প্রথমে কোন নির্ণয়াত্মক রাশি না থাকলে ঐ শূন্য গুলি কিছুই নহে; উহা কেবল শূন্য শূন্যই মাত্র। অতএব নাস্তিকদিগের মত ঐরূপ মূল্য শূন্য৷ এক্ষণে এতদ্দ্বারা প্রমাণ হইতেছে যে, সমস্ত পদার্থের সৃষ্টি মূলে এক নির্ণীত সৃষ্টিকর্ত্তা আছেন, অর্থাৎ তিনি ঈশ্বর। মানবগণ দর্শন ও কল্পনা বলে এ যাবৎ যত প্রকার শক্তির পরিচয় প্রাপ্ত হইয়াছেন, তন্মধ্যে যে সৰ্ব্ব শ্রেষ্ঠ বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছে, তাহার আধারই ঈশ্বর নামে অভিহিত হইয়াছে।

  3. ৩.↑

    ফলের বীজে ভবিষ্যদৃষ্টি প্রকাশ পায়। যাহাতে প্রত্যেক জাতীয় বৃক্ষ নষ্ট হইয়া গেলে জগতে সেই জাতীয় বৃক্ষের অভাব না হয়, যাহাতে ভাবী বংশীয় জীবগণ সেই জাতীয় বৃক্ষের ফল ভোজনে বঞ্চিত না হয়, তজ্জন্য ফলের ভিতরে বীজ রহিয়াছে। ঐ বীজে এমন শক্তি নিহিত রহিয়াছে যে, উহা হইতে আশ্চর্য্য প্রণালীতে নূতন বৃক্ষ সকল উৎপন্ন হইতেছে। প্রকৃতির অন্তর্গত শক্তি কেবল যে বর্ত্তমান বংশীয় জীবগণকে ফল শস্য দান করিতেছে, এমন নহে; ভাবী বংশীয়দিগের জন্যও আয়োজন করিতেছে। ইহাতে সুস্পষ্ট ভবিষ্যদৃষ্টি ভাবী জ্ঞান প্রকাশ পাইতেছে। প্রাকৃতিক শক্তি জ্ঞানময়ী—অন্ধ শক্তি নহে।

    সন্দেহবাদী বলিবেন, জড় পরমাণুর সংযোগে বিয়োগে জগৎ সংগঠিত হইয়াছে বলিলেই হয়। এক জন জ্ঞান সম্পন্ন স্রষ্টা আছেন, ইহা বলিবার প্রয়োজন নাই। এই পরমাশ্চর্য্য কৌশলপূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড কি অন্ধ জড় পরমাণু বা জড় শক্তি হইতে উৎপন্ন হইতে পারে? কৌশলে জ্ঞান প্রকাশ পায়, বুদ্ধিশূন্য চেতনা বিহীন জড় পরমাণু কি এই দূর গ্রাহ্য কৌশল পরম্পরা সৃষ্টি করিতে পারে? এই যে মানব দেহ আমরা ধারণ করিতেছি, ইহা কি সামান্য আশ্চর্য্য ব্যাপার!! বিজ্ঞানের সাহায্য লইয়া অথবা সহজ বুদ্ধিতে যেরূপেই হউক আলোচনা কর, মানব দেহের প্রত্যেক অঙ্গ তোমার নিকট তাহার স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রতিপন্ন করিবে। প্রসিদ্ধ ডাক্তার বেলী বলিয়াছেন, আমি মানব দেহ পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি যে, আমাদের জীবন এক অলৌকিক ব্যাপার।

    ধাত্রী বিদ্যা অধ্যয়ন করিলে যে সকল আশ্চর্য্য ব্যাপার অবগত হওয়া যায়, তাহা আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করিবার প্রয়োজন নাই; কেবল প্রসব সম্বন্ধীয় একটী যুক্তি বলিব। মনে কর, একটী জঙ্গলময় সঙ্কীর্ণ পথ দিয়া তোমাকে গমন করিতে হইবে। এরূপ স্থলে পথের অবস্থা যেখানে যেমন তোমার শরীরকেও সেখানে সেই ভাবে রক্ষা করা আবশ্যক। মনে কর, এক স্থানে একটা বৃক্ষের শাখা নিম্নের দিকে নত হইয়া পড়িয়াছে, সেখানে তুমি কখনই মস্তক উচ্চ করিয়া গমন করিতে পার না; অবনত মস্তকে যাইতে হইবে। মনে কর, আর এক স্থানে দুই দিক হইতে বৃক্ষ শাখা সকল পতিত হইয়া, পথ এরূপ সঙ্কীর্ণ করিয়া দিয়াছে যে, সোজা চলিতে হইলে তোমার দুই স্কন্ধ বাঁধিবে। সেখানে তুমি কি করিবে? তোমার মুখ ও সমস্ত শরীর ফিরাইয়া পার্শ্ব পরিবর্ত্তন করিয়া গমন করিতে হইবে।

    মাতৃগর্ব্ভ হইতে প্রসব কালে অবিকল তাহাই ঘটে। প্রসব পথের যে স্থান যেরূপে সংগঠিত, মাতৃগৰ্ব্ভস্থ অদৃশ্য শক্তি দ্বারা শিশু শরীর সেখানে সেই ভাবে সংস্থিত হয়। নতুবা প্রসব কাৰ্য্য অসম্ভব হইত। প্রসব পথে স্থান বিশেষে যখনই শিশুর স্কন্ধদ্বয় আটকাইয়া যায়, তখন গর্ব্ভস্থ শক্তি দ্বারা উহার পার্শ্ব পরিবর্ত্তন হয় এবং শিশু সহজে গম্য স্থানের দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। এস্থলে জিজ্ঞাস্য এই যে, মাতৃগৰ্ব্ভস্থ শক্তি যদি অন্ধ শক্তি হয়, তাহা হইলে উহা কেমন করিয়া জানি যে শিশুর পক্ষে প্রসূত হওয়া আবশ্যক? উহা কোন কবিয়া জানিতে পারে যে, প্রসব পথের স্থান বিশেষে শিশুর শরীর আটকাইয়া যায়? কেমন করিয়া বা জানিতে পারে যে, শিশুর শরীরকে বিশেষ ভাবে সংস্থাপন করলে উহা সহজে নির্গত হইতে পারে? ইহা কি অচৈতন্য অঙ্গ শক্তির কার্য্য?

    মহাত্মা কার্লাইল বলিয়াছেন, যাহারা তর্ক করিয়া পরমেশ্বরের স্বত্তা প্রতিপন্ন করতে চায়, তারা সূর্য দেখিবার জন্য লণ্ঠন জ্বালে।

    ভগবান মানবাত্মার মধ্যে তাহার আদেশ প্রকাশ করেন, ইহা কি আপনারা বিশ্বাস করেন? আমি মনে করি, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিষয়ে যেমন তিনি আমাদিগকে আদেশ করেন, তেমনি শারীবিক বিষয়েও তিনি এক প্রকার আদেশ করিয়া থাকেন। উপযুক্ত সময় আহার পান করিবার জন্য ক্ষুধা তৃষ্ণা তাহার এক প্রকার আদেশ। আমাদের কল্যাণের জন্য প্রতিদিন তিনি ক্ষুধা তৃষ্ণা দ্বারা আমাদিগকে জানাইয়া দিতেছেন যে, আহার পানের উপযুক্ত সময় হইয়াছে।

  4. ৪.↑
    বজ্রাঘাতের মধ্যে ও পরমেশ্বরের শুভাভিপ্রায় বিদ্যমান রহিয়াছে। ঝটিকা, বজ্রাঘাত ও বিদ্যুতে বায়ুকে বিশুদ্ধ করে। যে বিষ জীবের প্রাণ সরক, তাই বিকারগ্রস্ত রোগীর পক্ষে অমৃত হইয়া তাহার প্রাণ রক্ষা করে। যখন কোন জীব হিংস্র জন্তুর মুখে পতিত হয়, তখন তা মেসমেরাইজড’ হইয়া যায়। এক প্রকার হিংস্র সর্প আছে, তাহা কোন বৃক্ষ তলে থাকিয়া বিশেষ কোন শব্দ করিলে বৃক্ষ শাখায় উপবিষ্ট পক্ষী আপনা আপনি আকৃষ্ট হইয়া উক্ত সাপের মুখে পতিত হয়। তখন সর্প উহাকে ভক্ষণ করে। সর্পের সূক্ষ্ম শক্তিতে পক্ষী “মেসমেরাইজড্” হইয়া যায়। কোন জন্তু “মেসমেরাইজড্” হইলে উহার আর বাহ্য জ্ঞান থাকে না; কোন প্রকার যন্ত্রণা বোধ থাকে না। মি. গ্লাডষ্টোন বলিয়াছেন, লোকে যখন আমার কথা বুঝে না, তখন ঈশ্বরের বিষয় কি বুঝিবে? আমি কি অভিপ্রায়ে কি কৰ্ম্ম করি, ইংলণ্ডবাসিগণ কি তাহা বুঝিতে পারে? আমার অভিপ্রায়ের মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারিয়া নানা কথা বলে।
  5. ৫.↑
    ত্রিপুরাস্থ হোমনাবাদ পরগণায় এক প্রকার লতা আছে, যাহা মৃত্তিকা ও বৃক্ষের আশ্রয় অবলম্বন না করিয়া কুল বৃক্ষোপরি জড়াইয়া ধরে। তাহাদিগকে শূন্যলতা বলে।
  6. ৬.↑
    এক জন বট বৃক্ষ তলে বসিয়া ঈশ্বরের কাৰ্য্য সমালোচনা করিয়া ভাবিতে লাগিল, ঈশ্বরের এ কেমন বিবেচনা। কুমড়া, লাউ প্রভৃতি সামান্য লতা মাত্র, অথচ ইহাদের ফল কত বড়; আর বট বৃক্ষ এমন প্রকাণ্ড, ইহাদের ফল কত ক্ষুদ্র। ঈশ্বরের সামঞ্জস্য বোধ নাই। এমন সময় হঠাৎ তাহার মস্তকে একটী বটের ফল পতিত হইল। তখন সে বলিয়া উঠিল, বুঝিয়াছি বাবা তোমার ভুল নয়, আমার ভুল। কুমড়া প্রভৃতি যেমন বড়, যদি সেই হিসাবে বট বৃক্ষের ফল বড় হইত, তবে আজ আমার মস্তক চূর্ণ হইত।
  7. ৭.↑
    ঈশ্বর নিরাকার ও সর্ব্বব্যাপী; সুতরাং ঈদৃশ বস্তু চর্ম্মচক্ষে কিরূপে দেখিবে? জ্ঞানচক্ষে অবশ্য দেখিতে পায়। ফলতঃ অদ্রষ্টব্য বস্তু মাত্রেই ঘোর ঘোর বলিয়া বোধ হয়।
  8. ৮.↑
    আমরা যদি কোন যন্ত্র অবলোকন করি, এবং উহার উপযোজ্যতা স্পষ্ট দেখিতে পাই, তবে আমাদের মনে সহসা এই ভাবের আবির্ভার হয় যে, উক্ত যন্ত্র নির্ম্মাণ কোন চিন্তার উপর নির্ভর করিতেছে। অগ্রে চিন্তা, পরে যন্ত্রের আবির্ভাব। যে স্থানে যেরূপ কৌশল দেখা যায়, তাহার আবিভাবের পূর্ব্বে যে তাহা কোন ব্যক্তি দ্বারা চিন্তিত হইয়াছে, তদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকে না। সেইরূপ এই জগন্মণ্ডলে যাহা কিছু অবলোকিত হয়, সমুদয়ই চিন্তার বিষয় বোধ হয়। মনুষ্য শরীরের আভ্যন্তরিক যন্ত্রগুলি এমনি ভাবে গঠিত যে, তাহা স্থির করা যে কিছু অসামান্য বুদ্ধির প্রয়োজন হইয়াছে, তাহা যে ব্যক্তি একবার চিন্তা করেন, তিনিই বুঝিতে পারেন।