ইসলাম দর্পণ

প্রথম পরিচ্ছেদ

পৃথিবী অসার

সৈয়দ আবদুল আগফর

আমরা সচরাচর দেখিতে পাইতেছি—মনুষ্য, পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ, বৃক্ষ ইত্যাদি যাবতীয় চেতন, অচেতন ও উদ্ভিদ পদার্থাদি ক্রমশঃ লয় প্রাপ্ত হইতেছে এবং যাহা বিলীন হইতেছে, তাহা পুনরাগত হইতেছে না। আজ যিনি সসাগরা ধরার অধিপতি, আজ যাঁহার প্রচণ্ড প্রতাপে বসুন্ধরা বিকম্পিত, আজ যিনি জয়লব্ধ নানাবিধ ধনরত্ন দ্বারা কোষাগার পূর্ণ করিতেছেন, কাল হয়ত সেই ধন রত্নাদি রাখিয়া তিনিও পরলোক গমন করিবেন। রাজাধিপতি সম্রাটগণ স্বীয় রাজ্য, সিংহাসন, ধনরত্ন, রাজমহিষী, যুবরাজ ও রাজকুমারীগণকে পরিত্যাগ করিয়া লোকান্তরে চলিয়া গিয়াছেন; যাঁহারা আছেন, তাঁহারাও অচিরে যাইবেন। আজ যে জনক জননী শিশুকে ক্রোড়ে করিয়া বিবিধ প্রকার স্নেহ প্রদর্শন করিতেছেন, কিছু দিন পরে হয়ত সেই জনক জননীর শিশুকে, কিম্বা শিশুর জনক জননীকে হারাইতে হইবে। আজ যে স্বামী, পরমা সুন্দরী রমণীকে প্রাণেশ্বরী মনে করিয়া জীবন সার্থক মনে করিতেছেন, কিছুদিন পরে সেই প্রিয়তমা হৃদয়হারিণীকে পরিত্যাগ করিতে হইবে। আজ যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারী হইয়া বক্ষঃস্ফীত করতঃ বিদ্বান্ সমাজে বিচরণ করিতেছেন, আজ যিনি অনুপম সৌষ্ঠব সম্পন্ন সুবিস্তৃত গৃহ নির্ম্মাণ করিয়া পরম সুখে কালযাপন করিতেছেন, আজ যিনি গৃহ সজ্জার উপযোগী সুন্দর সুন্দর উপকরণে গৃহখানি সুসজ্জিত করিয়া, মনের তৃপ্তি সাধন করিতেছেন, কালে তাহাকে সেই সুখময় গৃহ ও উপকরণ পরিত্যাগ করিয়া অনন্তধামে গমন করিতে হইবে। আজ যিনি সাংসারিক আবল্য জালে আবদ্ধ হইয়া ‘ভূতের বেগার' খাটিতেছেন, কাল তাঁহাকে সেই চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া পরলোক গমন করিতে হইবে। আজ যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়া, পরকীয় কঠিন কঠিন রোগ আরোগ্য করিতেছেন, কিছুদিন পরে তাঁহাকে পীড়িত হইয়া জীবনলীলা সাঙ্গ করিতে হইবে। কিন্তু তিনি স্বীয় মৃত্যু-রোগের কারণ নির্দ্দেশ করিতে পারিবেন না, এবং পূর্ব্বে সূচনা করিয়া ভাবী রোগ নিবারণে সক্ষম হইবেন না। আজ যিনি পুত্র, কন্যা, স্ত্রী, ধনসম্পত্তিকে আমার আমার বলিতেছেন, তাঁহাকে ও সৃজন কৰ্ত্তার অলঙ্ঘ্য আদেশে বাধ্য হইয়া, চিরদিনের জন্য এই সংসার হইতে বিদায় গ্রহণ করিতে হইবে। আমাদের জীবন-প্রদীপ যথাসময়ে নির্ব্বাপিত হইয়া যাইবে। কেহই কাহাকে কী কোন বস্তুকে সঙ্গে লইয়া যাইতে পারিবে না—একাকী বিনা সম্বলে শূন্য হস্তে সমাধিস্থ হইতে হইবে। ফলতঃ পৃথিবীর কোন বস্তুই কাহার নহে; এমন কী—দেহ পৰ্য্যন্তও আমাদের নিজের নহে। সকলই নশ্বর। যে ইংলণ্ডের বৃদ্ধ ও বিচক্ষণ মন্ত্রী মি. গ্ল্যাডষ্টোন ও জৰ্ম্মাণ-মন্ত্রী প্রিন্স বিসমার্ক রাজনৈতিক বিষয় লইয়া রাজ্যবৃদ্ধি কামনায় আজীবন মস্তিষ্ক বিলোড়িত করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগকেও স্বীয় নশ্বর জীবন বিসর্জ্জন করিতে হইয়াছে। যে সম্রাটেরা পর রাজ্য অধিকার মানসে অহরহ চিন্তাকুল আছেন, কিন্তু কালে তাঁহার অতি প্রিয়তম দেহরাজ্য যে অতি ক্ষুদ্রতর পিপীলিকা কর্ত্তৃক অধিকৃত ও ভক্ষিত হইবে, তাহার প্রতি ক্ষেপ নাই। আমাদের যে সাম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া ষষ্ঠী বর্ষাধিক কাল রাজত্ব করিলেন, সেই সাম্রাজ্ঞী এখন কোথায়? এমন স্থলে একটী প্রধান চিন্তার বিষয় এই যে, আমরা কোথায় ছিলাম, কেনই বা এই পৃথিবীতে আসিলাম, আর কেনই বা মরিব; মরণান্তেই বা কি হইবে, আমাদের চিরজীবন লাভের উপায় কি? কি কার্য্য করিলে অনন্ত জীবন লাভ হইবে? পরলাক কি এবং কি কাৰ্য্য করিলে মনুষ্য জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হইবে। ফলতঃ পারলৌকিক বিষয় আলোচনা করাই মনুষ্য জীবনের একমাত্র কর্ত্তব্য কাৰ্য্য এবং ইহাই পশু ও মনুষ্যের মধ্যে একমাত্র ব্যবধান। কিন্তু বড়ই আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, আমরা যে মরণশীল এবং আমাদের পূর্ব্ববর্ত্তীগণও মরিয়া গিয়াছেন, এবং বহুতর লোক আমাদের সম্মুখে নিয়ত মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছে, ইহা সচক্ষে প্রত্যক্ষ করিতেছি এবং মৃত্যুকে ধ্রুব সত্য বলিয়া জানি। তথাপি এমনই যাদু মন্ত্রে মুগ্ধ হইয়া আছি যে, সাংসারিক ক্রিয়াকলাপে জড়িত হইয়া সেই কথা বিস্মৃতি-সলিলে বিসর্জ্জন পূৰ্ব্বক, দুর্গোৎসবের পাঁঠার ন্যায়[১] নিশ্চিন্ত ও পরমানন্দে জীবনাতিবাহিত করিতেছি। হায় হায়! অন্তিম কালের কথা একবারও ভাবি না।

এই সকল বিষয়ের পর্য্যালোচনা করিতে হইলে প্রথমে দেখিতে হইবে যে, এই পরিদৃশ্যমান জগন্মণ্ডলীর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কোন আদি কর্ত্তা আছেন কি না? দ্বিতীয়তঃ যদি থাকেন, তবে তাঁহার লক্ষণ অর্থাৎ অবস্থানের কৌশল কি? তৃতীয়তঃ তাঁহার উপাসনা অর্থাৎ অভিপ্রেত ক্রিয়া সম্পাদন করা আমাদের কর্তব্য কি না? এবং তাঁহাকে পাইবার সহজ উপায় কি?

টিকা ও মন্তব্য

  1. ১.↑
    দুর্গোৎসবের সময় বলি দানার্থে উৎসর্গীকৃত পাঁঠাগুলিকে সারি সারি বাঁধিয়া রাখিয়া ক্রমশঃ এক একটা করিয়া বলি দান করে। এক পাঁঠা অন্য পাঁঠার মুণ্ডপাত করিতে দেখে, তথাপি সেই সময় কোন কোন পাঁঠা নিশ্চিন্ত মনে তৃণাদি ভক্ষণ করিতে থাকে। আবার ঐ অবস্থায় কাহারও কাম ভাব উদ্দীপিত হয়। উহারা ভাবী বিপদের বিষয় একটুও চিন্তা করে না।