ঈশ্বরের এই জগৎ সৃষ্টির আবশ্যকতা কি? যিনি একাধিকারে একমাত্র কর্ত্তা, যাহার সমকক্ষ কেহ নাই, তিনি যে কেবল[১] আধিপত্য করিয়া শ্লাঘনীয় হওনোদ্দেশ্যে জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহা কখনও যুক্তিসিদ্ধ হইতে পারে না। মানাপমান ও প্রাধান্য শ্লাঘা নিন্দা সকলই অন্যের মুখে নিজের তৈয়ারি জিনিসের উপর প্রাধান্য করিতেছে বলিয়া কেহই সুখ শ্লাঘা বোধ করে না। অন্যে তাহাকে প্রাধান্য করিতে দেখে, এই জন্য মনে সুখ ও শ্লাঘার উদয় হয়। আমি যদি নিজে কোন তৈয়ারি জিনিস আবিষ্কার করি, তবে তাহা আবিষ্কার করিয়াছি এইমাত্র কারণে সুখী ও শ্লাঘনীয় হই না। অপরে আমার আবিষ্কৃত বস্তুর প্রশংসা করিল, এই মাত্র কারণেই আপনাকে শ্লাঘনীয় বলিয়া সুখী হই। অতএব ঈশ্বর যে আধিপত্য করণোদ্দেশে জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহা যুক্তিসিদ্ধ হইতে পারে না। তবে কি ঈশ্বরের প্রাধান্য করিবার ইচ্ছা নাই? আমরা তাহাকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া মনে করিব, ইহা কি তিনি অতিপ্রায় করেন নাই? তিনি যখন প্রধান, তখন প্রাধান্য করিতে অবশ্য তাহার ইচ্ছা আছে। আমরা তাহাকে প্রধান বলিয়া মনে করিলে, তিনি তাহাতে শ্লাঘনীয় হন না। যেহেতু তাহার শাখা দেখাইবার যোগ্য সম শ্রেণীর অন্য কেহই নাই। তবে কি না আমরা তাঁহার অভিপ্রেত কাৰ্য্য সম্পাদন করিলাম বলিয়া সন্তোষ বোধ করেন—যাহা আপনার মনে সন্তোষ দেখাইবার জন্য অন্য কাহারও আবশ্যক করে না। অতএব পাঠক মহাশয় এক্ষণে বিবেচনা করুন, আমরা তাঁহার অভিপ্রেত কার্য্য সম্পাদন করিব, ইহা দেখিয়া তিনি সন্তুষ্ট হইবেন, এইমাত্র কারণে জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। আমরা যদি তাহার অভিপ্রেত কার্য্য সম্পাদন না করি, তবে তিনি অসন্তুষ্ট হইবেন সন্দেহ কি? শাস্ত্রকারের এই দ্বিবিধ কাৰ্য্যকে পাপ এবং পুণ্য বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ঈশ্বরের অভিপ্রেত ক্রিয়া করার নাম পুণ্য এবং অনভিপ্রেত ক্রিয়া করার নাম পাপ। এই পুণ্য ক্রিয়াকেই স্থানান্তরে উপাসনা বলিয়া ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। অতএব ঈশ্বরের উপসনা করা কর্ত্তব্য, ইহা স্থির সিদ্ধান্ত। ঈশ্বরের উপাসনা বা অভিপ্রেত কাৰ্য্য সম্পালন না করিলে, আমরা তাহার কোপ-দৃষ্টিতে পতিত হই।
বৈজ্ঞানিক মতে আরাধনার উপকারিতা।
আরাধনার কাৰ্য্য ও আকার প্রকার ওভাব ভঙ্গিতে যে শারীরিক অশেষ উপকার হয়, তাহা ক্রমশঃ লিখিত হইতেছে। প্রথমতঃ অজুর উপকারিতা—হস্ত পদ মুখ নাসিকা দন্ত প্রত্যহ ৫ বার ধৌত করিলে এবং মুছে করিলে (মুছিয়া ফেলিলে) বায়ু পিত্ত কফ প্রশমিত হয়। ২। বাহ্যিক অঙ্গ পরিষ্কার হয়। ৩। আলস্য দূর হয়। ৪। বল বৃদ্ধি হয়। ৫। দৃষ্টি শক্তি প্রসন্ন হয়। ৬। দাঁতন করিলে দন্ত পরিষ্কার হয়। মুখের দুর্গন্ধ দূর হয় এবং কফের লাঘব হয়।
অতঃপর নমাজের উপকারিতা দেখুন।
বারবার দণ্ডায়মান হওয়া, নত হওয়া, বসা প্রভৃতি পুনঃ পুনঃ ক্রিয়াতে অঙ্গচালনা হয়, এমন কি ব্যায়ামের কাৰ্য্য সম্পাদিত হয়। কিন্তু হিন্দু দিগের আরাধনায় কখনও ব্যায়ামের কার্য্য সম্পাদিত হয় না। বরং জানু পাতিয়া দীর্ঘকাল বসিয়া থাকিতে ও জলে থাকিতে থাকিতে শরীরের জড়তা বৃদ্ধি হইয়া বাতব্যাধি পীড়ায় আক্রান্ত হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। মুসলমানদিগের নামাজে যে কেবল ধৰ্ম্ম কাজ সম্পাদিত হয় তাহা নহে। বরং শারীরিক বল বৃদ্ধি হইতে থাকে। ফলতঃ সূক্ষ্মরূপে দেখিতে গেলে প্রত্যেক কাৰ্য্যই কৌশলময় এবং হিতজনক।
মুসলমানদিগের জমাতে (এক হইয়া) নমাজ পড়ার এক সাধারণ উদ্দেশ্য পরস্পরে মধ্যে প্রীতি, ভালবাসা, একতা ও ভ্রাতৃভাব স্থাপিত ও দৃঢ়ীভূত হওয়া। প্রতিনিয়ত সাক্ষাতে পরস্পরের মধ্যে যে একতা ও ভ্রাতৃ ভাব স্থাপিত হয়, অন্য কোনও উপায়েই তাহা হইতে পারে না। বহুকাল পর্য্যন্ত দেখা সাক্ষাতের অভাবে আত্মীয় জনও পর হইয়া যান, ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা। সুতরাং মুসলমানদিগের নমাজের মধ্যে যে এক বৈজ্ঞানিক কৌশল নিহিত রহিয়াছে, একথা সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে।
পঞ্চ নামাজের পঞ্চ নির্দ্ধারিত সময়।
ইহা সৰ্ব্ববাদী সম্মত যে, যে সকল কার্য্যে সময়ের কোন নির্দ্দিষ্টতা নাই, সেই সকল কাৰ্য্য কখনও সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না। যদি আরাধনার কাৰ্য্যে সময়ের নির্দ্দিষ্টতা না থাকিত, তবে কখনই ঐ কাৰ্য্যগুলি নিৰ্ব্বাহিত হইত না, বরং করিব করিব বলিয়া চিরকাল অসম্পন্ন থাকিত। ২। উপাসনার সময়ে কাৰ্য্যের শ্রান্তি ও মানসিক বৃত্তির উন্নতি হয়। মনে করুন, আপনার ২ জন চাকর আছে। একজন নির্দ্দিষ্ট মতে আপনার কার্য্য সম্পন্ন করে, অপরজন করিব করিব বলিয়া কাৰ্য্য মুলতবি রাখে, কি অসময়ে কার্য্য নির্ব্বাহ করে। এ অবস্থায় আপনি প্রথমোক্ত চাকরের প্রতি সন্তুষ্ট এবং শেষোক্ত কাৰ্য্যকারকের প্রতি অসন্তুষ্ট হইবেন সন্দেহ নাই। এইরূপ ঈশ্বর যথাসময় নমাজ আদায়কারীর প্রতি সন্তুষ্ট হইবেন। তজ্জন্য মুসলমান ধৰ্ম্মে সময়ের বাঁধাবাঁধি হইয়াছে। সূর্য্যোদয়ের পূর্ব্বে গাত্রোত্থান করিলে শরীর সবল, রক্ত পরিষ্কার, মন প্রফুল্ল এবং শরীরের জড়তা ও গ্লানি বিদূরিত হয়। এতদ্ব্যতীত সকল কাৰ্য্যে প্রচুর সময় পাওয়া যায়। বাহুল্য বিধায় অন্যান্য সময়ের উপকারিতা লিখা হইল না।
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑প্রার্থনা বিরোধিগণ বলেন, ঈশ্বরের সকল কার্য্য নিয়মাধীন, অনুরোধ উপরোধ প্রভৃতি দ্বারা যখন কোন প্রতীকারের এক চুলও ব্যাঘাত হইবে না, তখন প্রার্থনায় ফল কি? বিশ্বের সকল কার্য্যের যে নিয়ম ও শৃঙ্খলা আছে, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এক প্রকার কাৰ্য্য বিভিন্ন উপায়ে সাধিত হইতে পারে এবং একবিধ নিয়মের দ্বারা অপরাপর নিয়মের প্রতিরোধ হইতে পারে, তাহা কি সকলে দেখে নাই? বাষ্পের বলে কোন বস্তু চালাইতে পারা যায়, এবং হস্ত দ্বারা ঠেলিয়া শক্তি সঞ্চার করিয়াও চালান যায়। অগ্নি সংযোগে যে জ্বালা উৎপন্ন করা যায়, পদার্থান্তর সংযোগে তাহা নিবারণ করা যায়, এরূপ দৃষ্টান্ত রাশি রাশি মিলে। এখন প্রশ্ন করি, অধোগতির নিয়মাধীন হইয়া আধ্যাত্মিক অবনতি হইয়াছে, প্রার্থনা রূপ নিয়ম থাকা যে সেই অনিষ্ট ফল নিবারিত হয় না, তাহা কে বলিতে পারে? —(প্রার্থনার আবশ্যকতা পুস্তক হইতে উদ্ধত।)