লেক‍্শন্

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

জায়গাটি আবার বেশ ভাল করে সাজানো হয়েছে।

একটি মাঝারি সাইজের শামিয়ানা। খুঁটি গুলা দেবদারু পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। রঙীন কাপড়ের ঝালর, রঙীন কাগজের শেকল, পতাকা। একটি বেশ বড় টেবিল গেরুয়া রঙের কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দু’দিকে দুটি ফুলদানি, পাশেই পেতলের স্ট্যাণ্ডে ধূপকাঠির গুচ্ছ; সমস্ত জায়গাটি ধূপের গন্ধে বেশ একটি সাত্ত্বিকভাবে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে বিজলীবাতি, বসার জন্য চেয়ার। যাতে অবাঞ্ছিতদের ভিড় না হয় তার জন্য সমস্ত জায়গাটা কানাত দিয়ে ঘেরা।

ব্যবস্থাটা সেবারের চেয়ে যথাসাধ্য আরও ভালোই করা হয়েছে। তার কারণ মহারাজ সেবারে এসে বেশ বড় গোছের একটি ভক্তমণ্ডলী তোয়ের করে যান। তার মধ্যে অনেকেই পরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। সেবারের আকর্ষণ ছিল শুধু তাঁর নাম ডাক, এবার তার ওপর রয়েছে পরিচয়ের বিশ্বাস। ব্যবস্থাও যেমন ভালো, সমাবেশ ও তেমনি বিশিষ্ট এবার। শহরের অনেক ভালো ভালো লোকই এসেছেন, চেয়ারগুলি প্রায় সবই ভরে গেছে।

যে সংঘের পক্ষ থেকে আয়োজনটা করা হয়েছে, তার সম্পাদক উঠে মহারাজের পরিচয়টা দিয়ে দিলেন। আজ দু’বৎসর পরে তাঁকে আবার বহু কষ্টে পাওয়া গেছে। কর্মযোগী পুরুষ, তাঁর বাণী ধারণ ও প্রচার করবার জন্যে বারাণসীতে যে আশ্রম গড়ে তুলছেন তাই নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, সবার আকুল আহ্বান আর অগ্রাহ্য করতে না পেরে মাত্র একটি দিনের জন্য আবার এসেছেন প্রত্যক্ষভাবে আবার তাঁর উপদেশ দিয়ে যেতে, এবার তাঁর বক্তব্য হবে মানব-জীবনের সঙ্গে সত্যের সম্বন্ধ।

মহারাজ উঠলেন। প্রকৃতই সাধু পুরুষ, শরীর থেকে যেন সত্যেরই জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। গোড়া থেকেই সভামণ্ডপ তার প্রভাবে যেন গমগম করে উঠল। শ্রোতারা, সব ভাবস্তব্ধ, মহারাজ তাঁর ভাষণ আরম্ভ করলেন—

সত্যই ব্রহ্ম, ব্ৰহ্মই একমাত্র সত্য। নদীর প্রবাহ যেমন সমুদ্রের দিকে, জীবাত্মার প্রবাহও তেমনি এই সার সত্য ব্রহ্মের দিকে। কিন্তু এই প্রবাহের গতি ঋজু নয়। যা অলীক, যা অসত্য তা ক্রমাগত বাধাস্বরূপ হয়ে এই গতিকে করেছে ব্যাহত—স্রোত হয়ে উঠছে জটিল, পথ দীর্ঘীকৃত, ফলে পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার যে বিলয়, যা নাকি জীবনের মূল উদ্দেশ্য, তা হয়ে পড়ছে বিলম্বিত।

জীবের আত্মোপলব্ধির পথে প্রধান অন্তরায় এই যে মিথ্যা, একে চেনবার জন্য দৃষ্টিকে একেবারে করে ফেলতে হবে মুক্ত—মোহমুক্ত, দ্বিধামুক্ত। এই যে মোহ, এই যে দ্বিধা, এর মূল আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থে। এই স্বার্থের প্রকৃত রূপ চেনা চাই, বোঝা চাই, তা না হলে একে অতিক্রম করা ত সম্ভব নয়। কিন্তু এর জন্যে অন্তর্দৃষ্টি বা দিব্যদৃষ্টির প্রয়োজন, তা পাওয়া যায় কি করে? জীবনের প্রতি মুহূর্তই ত এই স্বার্থের দ্বারা গঠিত। যা আমাদের নিত্য সহচর, নিত্য আচ্ছন্ন করে রেখেছে যা, তাকে আমরা আলাদা করে উপলব্ধি করতে পারি না, যেমন ধরাপৃষ্ঠের জীব আমরা আকাশমণ্ডলকে পারি না উপলব্ধি করতে, জলের জীব পারে না তার জলাবরণকে।

তবুও চিনতেই হবে এই স্বার্থজ-মোহকে, চেনবার জন্যে দৃষ্টিকে করে আনতেই হবে স্বচ্ছ, নইলে জীবের গতি নেই।

এই দিব্যদৃষ্টির জন্যে চাই তপস্যা। তপস্যার আলোকেই এই মিথ্যাকে আমরা চিনে নিতে পারি। তপস্যার অগ্নিতেই একে করতে পারি দগ্ধ।

আমাদের আর্য ঋষিরা এই সত্যের স্বরূপ পেরেছিলেন চিনতে। তাই কর্মে, বাক্যে, চিন্তায়, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই এই সত্যকে দিয়ে গেছেন সর্বোচ্চ আসন। তারা যে একে কত উচ্চ আসন দিয়ে গেছেন তা এই থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাবে যে আমাদের পূর্বজদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ পুরুষ, মহারাজ যুধিষ্ঠির, মিথ্যার অতি সামান্য ইঙ্গিত ও উচ্চারণের জন্যে তাঁকেও নরক দর্শন করতে হয়েছিল। সত্যের এর চেয়ে বড় আদর্শ আর কোথাও সৃষ্ট হয়নি। আমরা যখন সেই বিরাট আদর্শের উত্তরাধিকারী তপন মিথ্যা যতই দুর্নিরীক্ষ হোক, সত্য যতই হোক দুর্লভ, আমরা আমাদের তপস্যায় জয়ী হবই…

শাস্ত্র থেকে নানা রকম উদ্ধৃতি দিয়ে, উদাহরণ দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার পর মহারাজ আসন গ্রহণ করলেন। অভিভূত সভামণ্ডপ একটু নিস্তব্ধ হয়ে রইল। সংঘের তরফ থেকে ধন্যবাদাদি দেওয়ার পর সভা ভঙ্গ হ’ল। উদ্যোগীরাই আশ্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থাও করেছিলেন। একটি বড় পিতলের পরাত, টাকা আর নোটে প্রায় ভরে গেল; কিছু প্রতিশ্রুতি-পত্রও। সভা ভঙ্গ হ’ল।

আমাদের শেঠজীও এসেছেন। প্রকৃতই সাত্ত্বিক পুরুষ একজন, কেননা ওঁরা যখন ত্যাগ করেন তখন সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েই ত্যাগ করার ক্ষমতা রাখেন। চক্ষুর অন্তরালেই যথাসম্ভব রাখেন নিজেকে; কখন এসে নিঃসাড়ে পেছনের একটি চেয়ারে বসে তদ্‌গত হয়ে শুনছিলেন, সভা ভঙ্গ হলে একটি নিভৃত স্থান দেখে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সভামণ্ডপ আস্তে আস্তে খালি হয়ে এল। ভক্তের দল টেবিলের কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘিরে রইল। তারাও চলে গেলে রইলে উদ্যোক্তাদের জন কয়েক। টাকা নোট গুলো গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছে, মহারাজ নিজের আসনে রয়েছেন বসে? একটু-আধটু এদিক-ওদিক আলোচনা হচ্ছে। এদিক থেকেই স্টেশনে গিয়ে উঠবেন।

নিতান্ত জড়োসড়ো হয়ে শেঠজী এসে পাশটিতে দাঁড়ালেন। তারপর অসীম বিনয়ের সঙ্গে দশটি মোহর থালাটার একপাশে রেখে দিয়ে বললেন, “আশ্রমের জন্যে গরীবের থোড়া ভেট, মহারাজ, নিয়ে কৃতার্থ করুন।” দানটা ত বিশিষ্ট, দাতার মধ্যেও একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে বেশ। মহারাজ একটু চেয়ে রইলেন মুখের দিকে। তারপর তার মনে পড়ে গেল। প্রসন্ন একটু হাসির সঙ্গে বললেন—“আপনাকে ত চিনি শেঠজী; সেবার ও আশ্রম আপনার অযাচিত দান পেয়ে বিস্তর উপকৃত হয়েছিল। আপনি সত্যিই মহানুভব।”

শেঠী লজ্জিত হয়ে পড়লেন, ঘাড়টা একটু নামিয়ে জোড় হস্তে বললেন—“কুছু নোয় মহারাজ, আমি এক দোক্‌ড়া কা ভি আমি নই। আমি কি করতে পারে? আসে, পিছনে আপন জগৎটিতে বসে বসে শোনে আবার দণ্ডবৎ করে আপন ঝোপড়িতে চলে যায়। মহারাজের মুখের কথা এক এক অচ্ছর লাখ টাকা; আমি তার কি দাম দিতে পারে?”

সম্পাদক টংকা আর নোট গুণে গুছিয়ে তুলতে তুলতে বললেন—“তাই বা ক’টা লোকে বলে বলুন। মহারাজের কথার মূল্য বোঝা, স্বীকার করা,—সেও ত মহানুভবেরই লক্ষণ।”

বিনয়ে আরও নুয়ে পড়লেন শেঠজী, বললেন—“কুছুনা, বাবুজী, মহানুভব-টব ও-সব কুছু না। মহারাজের উপদেশ শুনে নফা উঠায়, ব্যস্। যেতো নফা উঠায় তার হিসাবে কি দিতে পারে?”

মহারাজ বললেন—“লাভ যে ওঠা এইটেই আমার পক্ষে যথেষ্ট শেঠজী। এ যা আশ্রম তৈরির ব্যাপার এ ত বাইরের, একজন মানুষের মনও যদি তৈরি করতে পারি তার চেয়ে বড় সার্থকতা আমার কি আছে বলুন। বড় আনন্দ হ’ল শুনে। আমার বক্তব্য শুনে আপনি যদি অল্পকিছুও লাভবান হয়ে থাকেন…”

“অল্প নয় মহারাজ, পুরা নফা উঠিয়েছে। অগ্‌লে অগ্‌লে বার যে আপনি ভাষণ দিলেন—অহিন্‌সা নিয়ে তার এক এক অচ্ছর মার মনে আছে মহারাজ। আর পুরা নফা উঠিয়েছে…”

“বড়ই আনন্দ হ’ল শুনে শেঠজী।”

“পুরা নফা উঠিয়েছে মহারাজ। ইয়াদ্‌ থাকতে পারে শুধু খটমলদের হিন্‌সা কোরবার হুকুম চেয়ে নিয়েছিল মহারাজের কাছে—যারে আপনারা ছারপোকা বোলেন। তা হয়রান হয়ে উ হিন্‌সাভি ছেড়ে দিয়েছে। বোলে—যা শালা কোতে খুন চুষবি চুষে লে, আমি পরোয়া করে না। ইবার আবার মহারাজের মুখে সত্য ভাষণের উপদেশ শুনলো। নজর খুলে গেলো।”

“সত্যিই খুব আনন্দ হ’ল আপনার কথা শুনে শেঠজী। সংসার বড় ভয়ানক জায়গা। কত প্রলোভন চারিদিকে, তার মধ্যে সত্যে অটল থেকে জীবন নির্বাহ করা, সে যে কি কঠিন…”

“সে আমি বিলকুল অটল থাকব মহারাজ, শপথ করিয়ে নিন।…লেকিন …”

অতিমাত্ৰ কুণ্ঠিত হয়ে শেঠজী চুপ করে গিয়ে মাথা নত করলেন।

একটু চুপচাপ গেল। ওদিকে টাকা নোট গোণা-গাঁথা হয়ে গেছে, এবার মহারাজকে নিয়ে মোটরে গিয়ে ওঠা। কিন্তু শেঠজীর হঠাৎ ভাবান্তরে সবাইকেই একটু থমকে দাঁড়াতে হ’ল। কিছুই বলেন না দেখে সম্পাদক বললেন—“লেকিন বলে থেমে গেলেন শেঠজী, কিছু বলবেন কি মহারাজকে?…আমাদের এখান থেকেই গিয়ে গাড়ি ধরতে হবে।”

শেঠজী ফতুয়ার পকেট থেকে আরও দু’টি মোহর বের করে শুন্য থালাটায় রাখলেন। মহারাজের দিকেই চেয়ে করজোড়ে নিবেদন করলেন—

“আমি অটল থাকবে, জানে হনুমানজী; মহারাজের উপদেশ অচ্ছরে অচ্ছরে পালন করবে। দেখুন, খটমল হিন্‌সা করাভি ছেড়ে দিয়েছে। বললো, খা শালা কোতো লেহু খাবি আমি মহারাজের উপদেশ থেকে অলগ হোব না। সত্য ভি ঐরকম পালন করব, লেকিন যাবার আগে শুধু একটো এজাজৎ দিয়ে যান…”

“বলুন।”—একটু বিস্মিতই হয়ে গেছেন।

“লেক্‌শন্ এসে গেল, ভোটাভোটি, মুন্সিপালিটির কমিশনার হোবার জন্যে ভোট মেঙে বেড়াচ্ছে। যে হোবার হোক ইতে আমার কি আছে মহারাজ? কেউ রাজাও করে দেবে না, কেউ বাদশাও করে দেবে না। লেকিন বিলকুল চৈন নেই, জান্ হয়রান করে দিয়েছে। সোকাল, দুপহর, সোঞ্ঝা, রাত, যোখোন দেখুন একজন না একজন হাজির! সোভি কেমন—একজন ত ডাগদর, উস্‌পর আমার বাড়ির ডাগদর। উই গেল ত উকিলসাহেব এসে হাজির; হরিহর বোস বাবু, আমাদের বংশীরাম গোকুলচন্দ ফারমের উকিল—হাতে একঠো ভারী কেসও রয়েছে। বাৎচিৎ হচ্ছে, দুর থেকে দেখে জমিদার হীরাবাবু তার গাড়ী ঘুরিয়ে চলে গেল—আবার সুবিস্তা বুঝে আসবে। জমিদার, ওরই মকানে বংশীরাম গোকুল চন্দের গুদাম। এবার খেয়াল করুন মহারাজ সচবাৎটুকু কেমন করে কাকে বলি?…

ই-সব গেল ত রাত্রিবেলা আমার সম্‌ধি এসে হাজির, আমার লেড়কীর শ্বশুর উভি ভোটের জন্যে নাম দাখিল করেছে। উর সঙ্গে সম্‌ধিন্‌ভি! সচ পুছেন ত সম্‌ধির সঙ্গে আমার বিলকুল ভালোবাসা নেই মহারাজ; সাদিতে লেনদেন নিয়ে অনমন চলেছে দু’তরফে, লেকিন সচ বাৎ কি করে বলি বলুন? না কুছু লেনা, না কুছু দেনা, মুফতের জান হয়রানি। ইর ওপর যদি একজনকে “হাঁ” বলে বাকিয়ে তিনজনকে “না” বলি ত গায়ের মাংস ছিঁড়িয়ে খাবে। আর কাকে “হাঁ” কাকে “না” বলি বলুন?—এক ডাগদর, এক উকিল, এক জমিদার, এক সম্‌ধি, উর সাথে সমধিন্‌ভি আছে।

ইর জন্যে মহারাজের হুকুম নিয়ে রাখছি—‘লেক্‌শনের ই-কটা দিন দুখানি মিথ্যা কোথা বলতে দিন—সির্‌ফ দু’খানি—“হাঁ হাঁ আপনাকে ছেড়ে কাকে ভোট দিবো? লেকিন গোপন রাখবেন কোথাটা।” ব্যস, সিরফ এই দু’খানি…আর, ইর জন্যে যদি নরক দর্শন হোয় ত যেন উদেরই হোয় মহারাজ, গরীব হাজারীমল শেঠ কি করিয়েছে?”