শেয়ালের গল্প

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

এক ছিল শেয়াল। সে ভারি ধূর্ত। রোজ রোজ লোকের হেঁসেলে ঢুকে, হাঁড়ি ভেঙে খেয়ে, কখন কোথা দিয়ে যে সে পালায় কেউ টের পায় না।

লোকেরও জ্বালাতন। ছেলে যাবে পাঠশালায়, মা ভাত বাড়তে গিয়ে দেখে—ওমা! হাঁড়ি ভাঙা, ভাত নেই। চাষা ভোরবেলা খেতে যায়, দুটি পান্তা খেয়ে বেরোয়, ভাতের হাঁড়ি এনে দেখে—হাঁড়ি ফাঁকা! রোজ রোজ এমনি হতে লাগল।

পাড়াসুদ্ধ লোক বলল, এ তো ভারি জ্বালা! উপোস করে কাঁহাতক থাকি! কিন্তু ভাত যে কে খায়, কেউ আর কিছুতেই ঠিক করতে পারে না।

এমনি করে দিন যায়। চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। একদিন শিয়াল পড়ল ধরা। পাপ কাজ কয়দিন ঢাকা থাকে? একদিন যেমনি এক চাষার হেঁসেলে সে সেঁধিয়েছে, চাষা দেখতে পেয়ে খপ করে তাক ধরে ফেলল। বলল —

রোজ রোজ ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান,

এইবার ঘুঘু তব বধিব পরান!

শেয়াল ধরা পড়ে ‘কাহুয়া কাহুয়া’ করে চ্যাঁচাতে লাগল। চাষা তাকে ঘা-কতক দিয়ে, আচ্ছা করে বেঁধে, চালের বাতায় টাঙিয়ে রেখে দিল। পা দুটো উপর দিকে, মাথাটা নিচের দিকে করে সে ঝুলতে লাগল। যন্ত্রণায় তার প্রাণ যায়!

চাষা কাজে যাবার সময় তার স্ত্রীকে ডেকে বলল, ওগো শুনছ! আজি এই শেয়ালটাকে কেটে রেঁধে রাখো; রাত্রে এসে খাব।

শুনে তো শেয়ালের প্রাণ শুকিয়ে গেল। মনে মনে বলল, হায় হায়, কেন এমন কাজ করলুম! কেন চুরি করতে এলুম! খাবার লোভে শেষে প্ৰাণটা হারালুম!

চাষা তো বেরোল। তার স্ত্রী ঘরের কাজকর্ম করতে লাগল। শেয়ালটা ওদিকে মনে মনে যুক্তি আঁটছে—কী করে পলাই!

চাষার স্ত্রী ধান ভানছিল। শেয়াল তাকে ডেকে বলল, চাষা গিন্নী! চাষা গিন্নী! আহা, ধান ভানতে তোমার বড় কষ্ট হচ্ছে। আমায় যদি নাবিয়ে দাও তাহলে তোমার হয়ে ধান ভেনে দিই।

চাষার স্ত্রীর সত্যিই ধান ভানতে কষ্ট হচ্ছিল। সে ভাবল, মন্দ কী, আজকের ধানগুলো শেয়ালকে দিয়েই ভাঙিয়ে নিই না! এই ভেবে সে একখানা কাস্তে নিয়ে শেয়ালের পায়ের দড়ি কুচ করে কেটে দিল। শেয়ালটা তড়াক করে লাফিয়ে তার ঘাড়ে পড়ল। ঘাড় মটকে তাকে মেরে ফেলল। তারপর তার কাপড় পরে তারই মাংস কেটে, রেঁধে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে রইল।

রাতের বেলা চাষা ঘরে ফিরে এসে বলল, কই গিন্নি! কী রেঁধেছ দাও।

শেয়াল বুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে চাষার সামনে মাংসের থালা ধরে দিল। চাষা একটু মুখে ঠেকিয়ে বলল,—থু থু থু! এ কীসের মাংস!

শেয়াল হাততালি দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। বলল,—

যেমন কর্ম তেমন ফল,

মশা মারতে গালে চড়।

বলি, আমার মাংস খেতে চেয়েছিলে না? এখন আমার মাংস খেলে? বলেই শেয়ালটা কাপড় খুলে ফেলে ভোঁ-দৌড় দিল। চাষা খাবারের বাসন ছুড়ে ফেলে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে বসল।

সেই বাড়ীতে একটা ধাড়ি ইঁদুর থাকত। চাষার কাছে খেয়ে মানুষ বলে চাষাকে সে বড় ভালোবাসে। চাষার কান্না শুনে গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে সে বলল, চুপ করো গো, চুপ করো; কেঁদো না। আমি শেয়ালকে জব্দ করছি।

চাষা বলল, তুমি পুঁচকে এতটুকু! তুমি শেয়ালের কী করবে?

ইঁদুর বলল,—দেখো না কী করি! তুমি এক কাজ করো—আমার পিঠে একটা ডালা বাঁধো—সেই ডালায় চারটি মুড়ি দাও, ব্যস, আর কিছু চাই না।

চাষা ইঁদুরের পিঠে মুড়িসুদ্ধ ডালা বেঁধে দিলে। ইঁদুর সেই ডালা পিঠে করে ছুট। একেবারে বনের মধ্যে হাজির।

শেয়াল সেদিন আর গর্ত থেকে বেরোয়নি। সমস্ত দিন খাওয়া নেই। খিদেয় প্ৰাণ যায়। গর্ত থেকে বেরিয়ে যে খাবার জোগাড় করবে তা আর সাহস হচ্ছে না। কী জানি যদি চাষা এসে মারে। গর্তের ভিতর পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে, এমন সময় ইঁদুর এসে সেইখানে দাঁড়াল। তার পিঠের ডালা থেকে মুড়ির গন্ধ ভর ভর করে বেরিয়ে শেয়ালের নাকে গেল, তাতে তার ক্ষিদের আগুন দুগুণ জ্বলে উঠল।

শেয়াল গর্ত থেকে একটু মুখ বাড়ীয়ে বলল, ইঁদুর ভাই, ইঁদুর ভাই! দুটি মুড়ি দেবে?

ইঁদুর বলল,—না ভাই, এ মুড়ি আমি দিতে পারব না। আমার কাচ্চা-বাচ্চারা এই মুড়ির জন্যে হাঁ করে বসে আছে।

শেয়াল বলল, ভাই, না খেতে পেয়ে প্ৰাণ যায়; পায়ে পড়ি, দুটি মুড়ি দাও।

ইঁদুর বলল, যদি এক কাজ করো তো দিতে পারি।

শেয়াল বলল, কী কাজ?

ইঁদুর বলল, আমার চারটি খড় আছে, সেইগুলো যদি পিঠে করে আমার বাড়ী বয়ে দিয়ে এসো।

শেয়াল বলল, আচ্ছা।

তখন ইঁদুর একবোঝা খড় শেয়ালের পিঠে আচ্ছা করে বেঁধে দিল। শেয়াল যাচ্ছে। ইঁদুর সঙ্গে সঙ্গে পথ দেখিয়ে চলেছে। খানিকদূর যেতে ইঁদুর করলে কি, না, দুটো পাথর কুড়িয়ে ঠকঠক করে ঠুকতে লাগল।

শেয়াল সেই শব্দ শুনে চমকে উঠে বলল, ও কী! ও কী!

ইঁদুর বলল, ও কিছু নয়! ও ঠকঠকি!

তারপর ইঁদুর সেই পাথর থেকে আগুন বার করে শেয়ালের পিঠে বাঁধা খড়ের বোঝায় ধরিয়ে দিল। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।

শেয়াল ভয় পেয়ে বলে উঠল, ও কী গো, ও কী!

ইঁদুর বলল, ও কিছু না। ও দাউ-দাউ।

দেখতে দেখতে সমস্ত খড় পুড়ে শেয়ালের পিঠের চামড়া পর্যন্ত জ্বলে গেল। শেয়াল জ্বলনীর চোটে—বাপ রে, মা রে, গেলুম রে, করে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে দৌড় দিল।

তার পরদিন ইঁদুর লঙ্কা-বাটা দিয়ে একটা মলম তৈরী করে বেদেনীর বেশ ধরে বনের মধ্যে গেল। যেখানে শেয়ালের গর্ত সেইখানে গিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল,—

দাঁতের পোকা বার করি,

গায়ে বাত ভালো করি,

পোড়া ঘা আরাম করি।

শেয়াল গর্তের ভিতরে পড়ে গায়ের জ্বালায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বেদেনীর ডাক শুনে বলল, বেদেনী ভাই! বেদেনী ভাই! একটা ওষুধ দেবে?

বেদেনী বলল, কীসের ওষুধ গা?

শেয়াল বলল, পোড়ার ওষুধ।

বেদেনী বলল, খুব ভালো ওষুধ আছে—দিলেই চট করে আরাম হয়ে যাবে। বেরিয়ে এসো, দিচ্ছি।

শেয়াল গর্ত থেকে বেরিয়ে এল।

ইঁদুর তার সেই লঙ্কাবাটা দিয়ে তৈরী মলম খানিকটা নিয়ে শেয়ালের পিঠে লাগিয়ে দিল। মলম লাগাবা-মাত্রই শেয়ালের পিঠটা চিড়বিড় করে জ্বলে উঠল।

শেয়াল বলল, ওকী গো, ওকী?

বেদেনী বলল, কিছু নয়! ও চিড়বিড়!

ঘায়ের উপর লঙ্কাবাটা লেগে শেয়ালের পিঠ হু হু করে জ্বলতে লাগল। সে কাৎরাতে কাৎরাতে গিয়ে গর্তের ভিতর সেঁধোল। তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি! প্ৰাণ যায়! প্ৰাণ যায়! জ্বলে গেল! জ্বলে গেল! শেয়াল ফুকরে ফুকরে বলতে লাগল, আগুনের জ্বলন ছিল ভালো! প্ৰাণ গেলে ছিল ভালো!

কিছুদিন যায়। শেয়ালের পিঠের ঘা অনেক কষ্টে আরাম হল। এতদিন তো আর বাইরে বেরিয়ে সে খাবার আনতে পারেনি, রোগেই ভুগেছে; না খেয়ে কাঠির মতন রোগ হয়ে গেছে; দেখলে আর চেনা যায় না। কী করে? পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। গর্তের ভিতর আর থাকতে না পেরে একদিন ধুকতে ধুকতে সে বেরিয়ে এল। মানুষদের বাড়ী যেদিকে, ভয়ে সেদিক আর মাড়াল না—সমুদ্রের ধারে গেল।

ইঁদুর সমুদ্রের ধারে একটা গাছের গুঁড়ি দাঁত দিয়ে কুরছিল। শেয়াল তাকে জিজ্ঞেস করল, কী করছ ভাই?

ইঁদুর বলল, আরে, নৌকো বানাচ্ছি।

শেয়াল বলল, নৌকো নিয়ে কী হবে, ভাই?

ইঁদুর বলল, সমুদ্রে যাব।

শেয়াল বলল, সমুদ্রে গিয়ে কী করবে?

ইঁদুর বলল, কেন, মাছ ধরব।

শেয়াল বলল, আমায় দুটো মাছ দেবে, ভাই?

ইঁদুর বলল, ওরে বাপরে! আমার কাচ্চাব্বাচ্চারা সাত দিন না খেয়ে আধমরা হয়ে আছে; তাদের মুখে আগে না দিয়ে কি আর কাউকে দিতে পারি।

শেয়াল বলল, ভাই, একমাস খেতে পাইনি; জ্যান্ত মরে আছি।

ইঁদুর বলল, তবে এক কাজ করো না!

শেয়াল বলল, কী কাজ, ভাই?

ইঁদুর বলল, তুমিও একখানা নৌকো গড়ো না!

শেয়াল বলল, তোমার মতন তো ভাই, আমার দাঁত নেই! আমি যে কুরতে পারব না।

ইুঁদুর বলল, নাই বা পারলে।

শেয়াল বলল, তবে কী করে নৌকো বানাব?

ইঁদুর বলল, কেন, বালির নৌকো বানাও!

ইঁদুরের কথায় শেয়াল বালির নৌকো তৈরী করল। তারপর ইঁদুর যেমন কাঠের নৌকো জলে ভাসিয়ে মাঝ সমুদ্রে মাছ ধরতে গেল, তেমনি শেয়ালও বালির নৌকো জলে ভাসিয়ে মাছ ধরতে গেল। খানিক দূর যেতেই বালির নৌকো গেল ভূস করে এলিয়ে। অগাধ জলে পড়ে শেয়াল ঝাঁপাই ছুড়তে লাগল, আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ইঁদুর ভাই, ইঁদুর ভাই! রক্ষা করো! মলুম, গেলুম!

ইঁদুর হাততালি দিয়ে বলতে লাগল—

যেমন কর্ম তেমনি ফল!

মশা মারতে গালে চড়!