এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ‘জাপানী ফানুস’ গল্পগ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জাপানী ফানুস’ বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি আকর্ষণীয় গল্পগ্রন্থ। ১৯০৯ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে জাপানি গল্পের উপাখ্যান অবলম্বন করে লেখক নিজের কল্পনা ও ভাবনার সংমিশ্রণে সাতটি শিশুপাঠ্য গল্প রচনা করেছেন। কাহিনিগুলোর বৈচিত্র্য, রূপকথার আবহ এবং চমৎকার কল্পনাশক্তি বইটিকে ছোটদের পাঠের জন্য যেমন উপভোগ্য করে তুলেছে, তেমনি বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসেও এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন করেছে।
‘জাপানী ফানুস’-এর বিশেষত্ব এর নামের মধ্যেই যেন নিহিত। দূরদেশের সংস্কৃতি ও কাহিনির উপাদানকে বাংলা ভাষা ও কল্পনার জগতে এনে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় সেগুলোকে নতুন রূপ দিয়েছেন। ফলে গল্পগুলিতে জাপানি উপাখ্যানের আবহ থাকলেও সেগুলো নিছক অনুবাদ হয়ে থাকেনি; লেখকের নিজস্ব রচনাশৈলী ও কল্পনাশক্তি প্রতিটি কাহিনিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
শিশু পাঠকের উপযোগী করে রচিত হওয়ায় গল্পগুলোর ভাষা সহজ, কাহিনিনির্ভর এবং কৌতূহল জাগানো। বিস্ময়, অভিযান, কল্পনা ও নৈতিক বোধ—এই উপাদানগুলো গল্পগুলোর মধ্যে বিভিন্নভাবে উপস্থিত। অচেনা দেশ ও সংস্কৃতির পটভূমি শিশুদের কল্পনার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে এবং একই সঙ্গে ভিন্ন সংস্কৃতির গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
গ্রন্থটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর চিত্রসজ্জা। সমকালীন প্রকাশনা-বিবরণে বইটিকে সচিত্র গল্পের বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে নন্দলাল বসুর চিত্র সংযুক্ত ছিল। সেই অর্থে ‘জাপানী ফানুস’ কেবল পাঠ্য গল্পের সংকলন নয়; সাহিত্য ও চিত্রকলার সমন্বয়ে শিশুর কল্পনাজগতকে সমৃদ্ধ করার একটি প্রয়াসও ছিল।
বাংলা শিশুসাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে বিদেশি কাহিনি, লোককথা ও রূপকথার নানা উপাদান বাংলা সাহিত্যে নতুনভাবে রূপ পেতে শুরু করেছিল। ‘জাপানী ফানুস’ সেই প্রবণতার একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। জাপানি কাহিনির উপাদানকে বাংলা শিশুমনের উপযোগী করে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিকে যেমন পাঠকের সামনে নতুন এক কল্পলোক উন্মুক্ত করেছেন, অন্যদিকে বাংলা শিশুসাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্যও বাড়িয়েছেন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত হলেও ‘জাপানী ফানুস’ আজও বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাস ও বিকাশ নিয়ে আগ্রহী পাঠকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। জাপানি উপাখ্যান, বাংলা লেখকের কল্পনা, শিশুপাঠ্য কাহিনি এবং শিল্পসম্মত চিত্রসজ্জার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রন্থটি পুরোনো বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় নিদর্শন।