বুড়ো-বুড়ির এক পোষা কুকুর ছিল। কুকুরটিকে তারা বড় ভালোবাসত। তাদের ছেলেপুলে ছিল না; এই কুকুরটিকে তারা আপনার ছেলের মতন দেখত।
কুকুরটি বুড়ো-বুড়িকে খুব ভালোবাসত। একদণ্ড তাদের কাছছাড়া হত না। বুড়ি বসে বসে যখন রান্না করত, কুকুরটা তখন রান্নাঘরের চৌকাঠ আগলে বসে থাকত। রান্না শেষ হলে বুড়ি এসে কুকুরটার মুখ ধরে আদর করে চুমু খেত; কুকুরের প্রাণে আহ্লাদ ধরত না। সে বুড়ির বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কেঁউ কেঁউ করে কত কথাই বলত, কত আদর জানাত।
রাত হলে বুড়ি কুকুরটাকে নিজের বিছানায় নিয়ে বুকের মধ্যে করে ঘুমোত। সে যেন ঠিক তার নিজের ছেলে।
একদিন ভোর রাত্রে বুড়ি স্বপ্ন দেখল যে, সে আর তার স্বামী যেন এক গহীন বনের মধ্যে গেছে। তারা ছাড়া আর জনমনিষ্যি সেখানে নেই। কেবল কুকুরটা সঙ্গে আছে। সেই তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।
যেতে যেতে, যেতে যেতে তারা এক জায়গায় এসে পড়ল, যার পর আর পথ নেই; সামনে এক প্রকাণ্ড পাহাড়। কুকুরটা তাদের সঙ্গে করে সেই পাহাড়ের একটা গুহার মধ্যে প্রবেশ করল।
গুহার সামনেটা ঘোর অন্ধকার, কিন্তু ভিতরটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। সেখানে মণি, মাণিক, মুক্তো, হীরে, জহরত, মোহর, পাহাড়ের মতন থাকে থাকে সাজানো; লাল, নীল, সবজে, হলদে, কতরকমের যে রঙ তার ঠিক নেই। বুড়ো-বুড়ি অবাক হয়ে সেই সব দেখতে লাগল।
এদিকে ভোর হয়ে আসতেই কুকুরটা ভেউ ভেউ করে ডেকে উঠল। তাতেই বুড়ির স্বপ্ন ভেঙে গেল।
বুড়ি সকালবেলা বুড়োকে স্বপ্নের কথা সব বলল। বুড়ো শুনে অবাক। কিছু দিন যায়। একদিন বুড়ো কাঠ কাটতে বনে গেছে, কুকুরটাও সঙ্গে আছে। কাঠ কাটতে কাটতে হাঁপিয়ে পড়ে বুড়ো এক গাছতলায় বসে একটু আরাম করছে, এমন সময় দেখল কুকুরটা দৈত্যের মতন প্রকাণ্ড একটা গাছের তলায় উপুড় হয়ে পড়ে, সেখানকার মাটি নখ দিয়ে কেবলই আঁচড়াচ্ছে। সেই গাছে ছিল একটা বুড়ো শঙ্খচিল, সে প্রাণপণে চিৎকার করছে।
বুড়ো ভাবলে, এ কী ব্যাপার! সে কুকুরকে ইশারা করে ডাকল, কুকুর তাতে শুধু ভেউ ভেউ করে উঠল, সেখান থেকে নড়ল না। আরও জোরে জোরে মাটি আঁচড়াতে লাগল।
কী হয়েছে তাই দেখবার জন্যে বুড়ো সেই গাছের দিকে এগিয়ে গেল।
কুকুরটা তাকে দেখে তার মুখের পানে চেয়ে কেঁউ-মেউ করে কী যেন বলল। বুড়ো তা বুঝতে পারল না।
কুকুরটা তখন তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে মাটির উপর প্রাণপণে আরও আঁচড় দিতে লাগল।
কী জানি কেন, ওদিকে গাছের মাথার চিলটাও মনের দুঃখে ডানাদুটো ঝটপট ঝটপট করতে লাগল, আর থেকে থেকে চিরিরি চিরিরি করে ফুকরে কেঁদে উঠতে লাগল।
আঁচড়ে আঁচড়ে কুকুর অনেকটা মাটি তুলে ফেলল। বুড়ো মনে করল, আমিও খুঁড়ে দেখি না, কী আছে! এই ভেবে সেও কোদাল ধরে মাটি খুঁড়তে লাগল। খুঁড়তে খুঁড়তে খুঁড়তে খুঁড়তে কোদালের মাথা ঠুং করে কীসের গায়ে লাগল। বুড়ো হাত দিয়ে দেখে, একটা মস্ত ঘড়া!
মাটি খুঁড়ে ঘড়া বেরোল। ঘড়ার ভিতরে একরাশ চকচকে মোহর।
বুড়ো সেদিন কাঠের বোঝা মাথায় না নিয়ে মোহরের বোঝা মাথায় করে ঘরে ফিরল। বুড়ি দেখে তো অবাক! ফোকলা মুখে হাসি ধরে না, বলল, ওমা! স্বপ্ন তো তবে ঠিক—এই তো সেই মোহরের পাহাড়!
কী জানি কেমন করে পাড়াময় জানাজানি হয়ে গেল, বুড়ো কাঠুরে বন থেকে একঘড়া মোহর পেয়েছে। তার কুকুরটাই সেই মোহর মাটি আঁচড়ে বার করেছে। সকলে বলল, নিশ্চয় ও কুকুর নয়, ও যক্ষের চর! যক্ষের ধন কোথায় লুকোনো আছে ও তা জানে।
বুড়ো-বুড়ির দুঃখ ঘুচে গেল; ভাঙা কুঁড়ে ভেঙে মস্ত এক কোঠা উঠল। বাড়ীতে দাস-দাসী ধরে না! সোনার পালঙ্কে তুলোর গদিতে শুয়ে তারা ঘুমোয়, দাসীরা পা টেপে। সখীরা এসে গান গেয়ে ঘুম ভাঙায়। কুকুরের আদর ধরে না! সোনার থালে আর খাবার আসে, জরি-মোড়া কিঙ্খাপের জামা সে গায়ে দেয়। সোনার খাটে পালঙ্কের বিছানায় বুড়ির পাশে ঘুমোয়।
পাড়ায় আর একজন হিংসুটে কাঠুরে ছিল। সে ভারি গরীব; দুবেলা দু-মুঠো খেতে পায় না। বুড়ো-বুড়ির ঐশ্বর্য্য দেখে তার ভারি হিংসে হল। সে একদিন বুড়োর কাছে গিয়ে বলল, ভাই, তোমার কুকুরটা আমায় একবার দেবে?
বুড়ো ভালোমানুষ, অতশত বোঝে না। সে বলল, বেশ তো! নিয়ে যও না!
কাঠুরে কুকুরটাকে সঙ্গে করে বনের মধ্যে নিয়ে গেল; নিয়ে গিয়ে বলল, কোথায় মোহর আছে খোঁড়!
কুকুর সেকথায় কান দিল না, আপন মনে ল্যাজ আর কান নাড়তে লাগল।
কাঠুরে বলল, খোঁড়।
কুকুর চুপ করে গো-ভরে দাঁড়িয়ে রইল।
কাঠুরে রেগে উঠে বলল,—খোঁড় বলছি, নইলে টের পাওয়াব! কোথায় মোহর আছে বার কর।
কুকুর সেকথায় নড়ল না—যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। কাঠুরে রেগে উঠে তাকে মারতে গেল। কুকুর ডাক ছেড়ে ভেউ-ভেউ করে উঠল। কাঠুরে আবার মারতে গেল। কুকুরটা তখন প্রাণের দায়ে দৌড়ে গিয়ে বনের এক জায়গা নখ দিয়ে ঘসঘস করে আঁচড়াতে আরম্ভ করল।
কাঠুরে ভাবল, ঠিক হয়েছে! কুকুরের আঁচড়ানো জায়গাটা সে তখন একখানা কোদাল এনে খুঁড়তে লাগল। খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে পাহাড়ের মতো মাটি উঁচু করল। হাত দুখানা যেন ভেঙে এল, গা বেয়ে টসটস করে ঘাম ঝরতে লাগল, তবু তো কই মোহর দেখা গেল না!
কাঠুরে ভাবল, এখানে নিশ্চয়ই অনেক মোহর আছে। তাই এত খুঁড়তে হচ্ছে! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খুঁড়ে, কাঠুরে মাটির সঙ্গে গাঁথা এক মস্ত মাটির ঘাড়া বার করল। তখন তার আনন্দ দেখে কে! ঘড়াটাকে নিয়ে তার গায়ের মাটি ঝেড়েপুছে মাথায় তুলে সে বাড়ী চলল। বাড়ীতে এসে বলল, গিন্নি।
গিন্নি হাত বাড়ীয়ে বলল, কই দেখি! কাঠুরে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, খবরদার। ছুঁয়ো না—এ ঘড়ার গায়ে আমি কাউকে হাত দিতে দেব না!
গিন্নি এই কথায় চটে উঠল, বলল, অ্যাঁ, দেবে না? আমি বুদ্ধি দিয়েছি, তাই তো মোহর পেয়েছ! নইলে মোহর পেতে কোথা? মোহর আমার; দাও আমাকে!
কাঠুরে বলল, সমস্ত দিন মাথায় ঘাম পায়ে ফেলে মোহরের ঘাড়া মাথায় করে বয়ে নিয়ে এলুম—সে মোহর তোমায় দেব—কী কথাই বলল! মোহরের ঘাড়া নিয়ে তখন কাড়াকড়ি পড়ে গেল। এ-ওর হাত থেকে টানে, ও-এর হাত থেকে কাড়ে। এমনি করতে করতে ঘড়াটা দুজনের হাত ফসকে মাটিতে পড়ে গেল।
এ কী! আরে ছ্যাঃ! দুৰ্গন্ধ! কাঠুরে আর তার স্ত্রীর সর্বাঙ্গ ময়লায় ভরে গেল।
কাঠুরে তো চটে আগুন! একখানা কাঠের চেলা নিয়ে কুকুরটার মাথায় তখনই ধ্যা করে বসিয়ে দিল—তাইতেই কুকুরটা মরে গেল।
কাঠুরে তখন তার স্ত্রীকে বলল,—ময়লা সাফ করো—দুৰ্গন্ধে ঘরে টেকা যাচ্ছে না।
স্ত্রী রেগে উঠে বলল, আমার বয়ে গেছে! মাথায় করে ময়লা বয়ে নিয়ে এলে তুমি, সে ময়লা সাফ করব আমি!
কাঠুরে তখন কী করে? নিজের হাতে সেই ময়লা সাফ করে রাত দুপুরে স্নান করে এসে, মনের দুঃখে ছেড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। রাগে তার গা জ্বলতে লাগল। ভোরবেলা উঠে কুকুরটাকে এক গাছতলায় পুঁতে ফেললে।
সকাল হতেই বুড়ো-বুড়ির কাছে খবর গেল, তাদের কুকুরটি মরে গেছে। তারা মনের দুঃখে কাঁদতে লাগল। তাদের মুখে আর আহার রোচে না, রাতে ঘুম হয় না; রাতদিন কেবল হা-হুতাশ করে।
এদিকে হল কী? না, যে গাছের তলায় কুকুরটাকে পুতে ফেলেছিল সেই গাছটা দেখতে দেখতে একটা প্ৰকাণ্ড গাছ হয়ে উঠল—আকাশে তার মাথা, ক্রোশ জুড়ে তার ডালপালা!
সেই গাছটা ছিল বুড়ো-বুড়ির। সেটা যখন এত বড় হয়ে উঠল তখন বুড়ো করলে কি, না, তারই গুড়িটা নিয়ে একটা জাঁতা তৈরী করল।
কী আশ্চর্য! জাঁতার এমন গুণ কেউ কখনো দেখেনি—একবার গম দিয়ে পিষতে আরম্ভ করলেই অফুরন্ত গম ভেঙে ভেঙে জাঁতা বেয়ে উপছে পড়ে। আর নতুন করে গম দেবার দরকার হয় না, কোথা থেকে যেন আপনা আপনিই আসে। যত খুশি কেবল জাঁতা ঘুরিয়ে যাও আর গম বার করো।
এমনি করে এই জাঁতা ঘুরিয়ে যে গম পেল, বুড়ো তাই বাজারে বিক্রি করে আরও অনেক টাকা করলে।
কাঠুরে যখন এই কথা শুনল তখন তার প্রাণ হিংসেয় জ্বলতে লাগল। সে আবার বুড়োর কাছে গেল। বলল, ওগো, তোমাদের জাঁতটা আমাকে একবার ধার দেবে?
বুড়ো ভালোমানুষ, কাঠুরে যে তার কুকুর মেরে ফেলেছে সেকথা সে মনে করেই রাখেনি। সে কাঠুরিকে বলল, তার আর কী! নাও না! কাঠুরে বাড়ী গিয়ে জাঁতায় গম পিষতে লগল। কিন্তু কী আশ্চর্ষ। তার বেলায় সব উল্টে গেল! সে যত গম দেয় জাতা তা কিছুতেই পিষতে চায় না, যত গম ঢালে সে গম যে কোথায় উবে যায়। তার ঠিক নেই! এমনি করে কাঠুরের অনেক গম লোকসান হল। তার পুঁজি-পাটা সব গেল। সে রেগে উঠে জাঁতাটা মড়মড় করে ভেঙে ফেলে তাতে আগুন জ্বলিয়ে দিল। তারপর তার ছাই নিয়ে বুড়োর কাছে এসে রেগে বলল, এই নাও তোমার জাঁতা!
বুড়ো আর সে ছাই নিয়ে কী করবে? তার একমুঠো সে হাতে নিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল। বাড়ীর সামনে কতকগুলো মরা ফুলগাছ ছিল, বাতাসে উড়ে এসে যেমন সেই মরা গাছগুলোর গায়ে সেই ছাই লাগা অমনি সেগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠল—ফুলে ফুলে তাদের সর্বাঙ্গ ভরে গেল।
সে দেশের রাজকন্যার ভারি ফুলের শখ। কিন্তু তাঁর ফুলবাগানে বছর বছর অনেক ফুলগাছ মরে যায়। এতে তাঁর ভারি দুঃখ। রাজকন্যা যখন শুনলেন ছাই লেগে মরা গাছ জ্যান্ত হয়েছে, তখনই তিনি অনেক টাকা দিয়ে বুড়োর কাছ থেকে সেই ছাই খানিকটা কিনে নিলেন।
দেশের চারিদিকের লোকে বুড়োর নাম গাইতে লাগল। রাজা তাকে আদর করে ডেকে নিয়ে নিজের রাজসভায় বসবার আসন দিলেন; ধনে—মানে বুড়ো গ্রামের সকলের চেয়ে বড় হয়ে উঠল।
কাঠুরের তাতে হিংসে ধরে না! সে আবার বুড়োর কাছে গেল। তার কাছ থেকে একটু ছাই চাইল। বুড়ো তখনই দিয়ে দিল।
কাঠুরে সেই ছাই নিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল। দেখতে দেখতে চারিদিকের গাছপালা দুলিয়ে ঝড় উঠল।
রাজকন্যা ঠিক সেই সময় সখীদের নিয়ে ছাদে বসে নানা রঙের ফুল মিলিয়ে মালা গাঁথছিলেন। ঝড়ের সঙ্গে উড়ে একতাল ছাই তাঁর চোখে পড়ল। রাজকন্যা হাতের মালা ফেলে দিয়ে, নীলাম্বরীর আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন।
সখীরা সব বলে উঠল, কী হল? কী হল?
রাজকন্যা বললেন, কী জানি, কোথা থেকে কী ঝড়ে উড়ে এসে চোখে পড়ল।
সখীরা বলল, দেখি, দেখি। রাজকন্যা চোখ মেলতে পারেন না—চোখ দিয়ে হুহু করে জল পড়ে। আঁচল দিয়ে মুছে মুছে মুখ-চোখ ফুলে উঠল।
রাজা যখন এই কথা শুনলেন তখন ভারি চটে উঠে বললেন, কে এমন করে ছাই ওড়ায়—ধরে নিয়ে আয় তাকে!
সন্ধান করতে দশ জন লোক ছুটল। খুঁজে খুঁজে তারা কাঠুরেকে বেঁধে নিয়ে হাজির করল। রাজা তো তাকে দেখেই চটে আগুন। তারপর যখন শুনলেন যে বুড়ো-বুড়ির উপর হিংসে করে সে এত কাণ্ড করেছে তখনই তিনি হুকুম দিলেন, চালচুলো কেটে কাঠুরেকে এ দেশ থেকে এখনই তাড়িয়ে দে!
রাজার লোক কাঠুরের এক গালে চুন আর এক গালে কালি মাখিয়ে, নেড়া মাথায় ঘোল ঢেলে, গাধার পিঠে চড়িয়ে, ঢাক-ঢোল বাজাতে বাজাতে তাকে দেশের বার করে দিল।