জাপানী ফানুস

কাঠুরের গল্প

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

এক বুড়ো কাঠুরে, তার গালে এক আব— মস্ত যেন ডাব! একদিন কাঠ কাটতে এক পাহাড়ে গেছে। বাড়ি ফেরবার মুখে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আর তার সঙ্গে গাছের ডালপালা উড়িয়ে, পাথরের কুচি ছড়িয়ে এলোমেলো হাওয়া উঠল। সেই অবস্থায় তো আর বাড়ি ফেরা যায় না! পথের মাঝে অনেকদিনকার এক প্রকাণ্ড গাছ। সেই গাছের গুঁড়ি ফোঁপরা হয়ে একটা কোটরের মতো হয়েছে, তারই ভিতরে সে আশ্রয় নিল।

ঝড়বৃষ্টি থামে না। ক্রমে রাত অনেক হয়ে এল। তখনও কাঠুরে সেই কোটরের মধ্যে বসে। এমন সময় শুনতে পেল, একদল লোক গণ্ডগোল করতে করতে অনেক দূর থেকে তার দিকে ক্রমে ক্রমে এগিয়ে আসছে। সে ভাবল, তাই তো! আমি মনে করেছিলুম এই পাহাড়ের মধ্যে আমি একাই বুঝি ঝড়-বৃষ্টিতে পড়েছি, কিন্তু তা তো নয়, আরও ঢের লোক রয়েছে যে!

তখন তার মনে একটু সাহস এল। কোটরের ভিতর থেকে মুখটি বাড়িয়ে একবার উঁকি মেরে দেখল। সামনেই সেই দল। কিন্তু তারা ঠিক মানুষের মতো নয়। তাদের চেহারা অদ্ভুত। কারো মোটে একটা চোখ, কারো হাত আছে, পা নেই। কারো শুধু মুণ্ডুটা আছে ধড়টা নেই। কারো মুখটাই একেবারে নেই। তারা কেউ সাদা, কেউ নীল, কেউ হলদে, কেউ বেগুনে, কেউ লাল, কেউ কালো, কেউ অন্য রঙের, রঙবেরঙ পোশাক পরা।

একটা অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত করে তারা কী-একরকম কাঠ দিয়ে আগুন তৈরী করল। ঝমাঝম বৃষ্টি, তবু দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। তার আলোয় সমস্ত পাহাড়টা দিনের মতো হয়ে গেল। তখন কাঠুরে দেখল, সেটা একটা দৈত্যের দল!

অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে সার দিয়ে ঘিরে বসে দৈত্যেরা খাচ্ছে, হাসিঠাট্টা চলছে, গল্পগুজব জমে উঠেছে, এমন সময় তাদের মধ্যে থেকে একজন ছোকরা লাফিয়ে উঠে ধেই ধেই করে নাচ শুরু করে দিল। তার দেখাদেখি আরও অনেকে নাচবার জন্য উঠে দাঁড়াল। সকলকার নাচের চোটে পাহাড়টা টলমল করে উঠল।

কাঠুরে কোটরে বসে এইসব ব্যাপার দেখছে; নাচ দেখে তার মনটাও নেচে উঠছে। যা থাকে কপালে— এই না বলে সে কুড়ুলটা ফেলে, পাগড়িটা ভালো করে মাথায় এঁটে, কোটর থেকে ছুটে বেরিয়ে দৈত্যদের মাঝখানে লাফিয়ে পড়ল। তাদের সঙ্গে মিলে মহাফুর্তি করে নাচ আরম্ভ করল। তার সে নাচন দেখে কে! ঘুরে ঘুরে, পা তুলে তুলে, হাত নেড়ে নেড়ে, কোমর বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে! দৈত্যরা সে নাচ দেখে ভারি খুশি! মানুষের নাচ তারা আর কখনো দেখেনি।

নাচ শেষ হয়ে গেলে তারা সকলে মিলে বাহবা দিয়ে উঠল। তারপর বলল, কাঠুরে ভাই, তুমি নাচো বেশ! কিন্তু একদিন নাচ দেখিয়ে সরে পড়লে হচ্ছে না, রোজ এসে এমনি করে নাচতে হবে।

কাঠুরে বলল, বেশ তো!

একজন দৈত্য তখন বলে উঠল, বিশ্বাস নেই। আমরা দৈত্য, আর ও মানুষ; ছাড়া পেলে আমাদের ভয়ে হয়তো আর এ-মুখো হবে না। ও যে আমাদের কাছে নিশ্চয়ই আসবে তার জন্য একটা কিছু জিনিস জিম্মে রাখা যাক।

সকলে চেঁচিয়ে উঠল, ঠিক বলেছ ভাই!

একজন বলল, ওর কুড়ুলটা রেখে যাক।

আর একজন বলল, না না, ওর পাগড়িটা।

অমনি একজন বাধা দিয়ে বলল, দূর! পাগড়ী, কুড়ুল তো ভারি জিনিস! একটা গেলে দশটা হবে। তার চেয়ে ওর একটা পা কেটে রাখা হোক।

যে পাগড়ী জিম্মে রাখার কথা বলেছিল, সে চটে উঠে বলল, তোর যেমন বিদ্যে! পা কেটে নিলে আমাদের কাছে ফিরে আসবে কী করে? আমাদের মত তো দত্যি নয় যে একপায়ে হাঁটবে।

কী যে জিম্মে রাখা হবে তা আর কিছুতেই ঠিক হয় না। তখন এক কন্ধকাটা দৈত্য পেটের ভিতর থেকে কথা কয়ে বলল, ঠিক হয়েছে! ঠিক হয়েছে!

সেই কথা শুনে সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, কী? কী?

কন্ধকাটা তখন বলল, ওই যে ওর গালে একটা মাংসের ঢিবি রয়েছে, ওইটে নিয়ে রাখো না! হাত, পা, চোখ, মুখ সব মানুষেরই আছে, কিন্তু ওই মাংস-ঢিবি বড় চট করে দেখতে পাওয়া যায় না; ওটা নিয়ে রাখলে কাঠুরে ভায়াকে নিশ্চয়ই ফিরে আসতে হবে।

কাঠুরের কাছ থেকে তখন তারা তার গালের আবটি জিম্মে চাইল। কাঠুরে বলল, এ আর বেশি কথা কী! প্রাণ চাইলে তাও দিতে পারি।

একজন দৈত্য এসে কী-একটা মন্তর আউড়ে তার গালের আবটা আস্তে আস্তে মুচড়ে ছিঁড়ে নিল। কাঠুরের কিচ্ছু কষ্ট হল না।

সে জিনিসটা কী, তাই দেখবার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। এ-ওর হাতে ছোঁ মারে, সে-তার হাতে ছোঁ মারে।

এমন সময় গাছের মাথায় পাখী ডেকে উঠল; পুবদিক থেকে সোনার আলোয় বন ছেয়ে গেল। অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে দৈত্যগুলোও কোথায় মিলিয়ে গেল।

কাঠুরে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছে; ফিরতে ফিরতে বেলা হল। গ্রামের লোকজন তখন যে যার কাজে বেরিয়েছে। পথের মাঝে কাঠুরের সঙ্গে দেখা। তার মুখের পানে চেয়ে দেখে— আব নেই। কী আশ্চর্য! কেউ বলল, কাঠুরে মামা! কেউ বলল, কাঠুরে দাদা! কেউ বলল, কাঠুরে খুড়ো!— তোমার আবটি কী হল?

কাঠুরে উত্তর করল, সে অনেক কথা। কাজ সেরে সাঁঝের বেলা আমার ঘরে আসিস, সব কথা বলব।

কাঠুরে কাঠ কাটতে গিয়েছিল, ঝড়বৃষ্টিতে পড়ে দৈত্যের সঙ্গে নেচেছিল, তারপর তারা কেমন করে তার গালের আবটি খসিয়ে নিয়েছে— এই সব কথা দেখতে দেখতে গ্রামময় রটে গেল। সেই গ্রামে আর একজন বুড়ো ছিল, তার গালেও আব। সে ভাবল— যাই না কেন, আমার আবটা খসিয়ে আসি। এই ভেবে সেও রাত্রে সেই পাহাড়ে গেল। কাঠুরে যেখানে বসেছিল, সেই কোটরে গিয়ে বসে রইল।

দৈত্যরা আগের রাত্রে যেমন এসেছিল, সে রাত্রেও তেমনি এল, তেমনি আগুন জ্বালল, খেল, তারপরে নাচতে লাগল। সেইসব দৈত্যদের বিকট চেহারা দেখে বুড়োটা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে যে গিয়ে তাদের সঙ্গে নাচবে, তা আর সাহস হল না। কিন্তু না নাচলেও নয়। গালের আবটি তা না হলে খসবে না। প্রাণে ভয়ও আছে, আবার আবটি ছেঁড়াও চাই। কী করে? বলিদানের পাঁঠার মত ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোনোরকম করে সে দৈত্যদের মাঝে গিয়ে হাজির হল।

বুড়োকে দেখে দৈত্যরা কাঠুরে এসেছে মনে করে আনন্দে হল্লা করে উঠল। বলল, কাঠুরে ভায়া! আর কেন? নাচ শুরু করে দাও!

বুড়ো তখনও কাঁপছে। সেই সব ভয়ংকর চেহারা চোখের সামনে দেখে তার আত্মাপুরুষ শুকিয়ে গেছে, সে কি তখন নাচতে পারে?

তার দেরী দেখে দৈত্যরা আবার চেঁচিয়ে বলল, নাচো, নাচো, আমাদের সব ফুর্তি যে সব জল হয়ে গেল! রাত যে শেষ হয়!

বুড়োর পা তখনও থরথর করে কাঁপছে। নাচবার জন্য সে যেই এক পা তুলেছে অমনি ধুপ করে মাটিতে পড়ে গেল, উঠে নাচবার আর ক্ষমতা রইল না।

দৈত্যদের আজ আর তেমন আমোদ হল না। তারা ভারি চটে গেল। বলল, যাও, তোমার আর নাচতে হবে না! এই নাও তোমার জিম্মের জিনিস। এই বলে বুড়োর আরেক গালে কাঠুরের আবটা চট করে বসিয়ে দিল।

দেখতে দেখতে সকাল হয়ে এল, দৈত্যরাও কোথায় মিলিয়ে গেল।

তখন বুড়ো কী করে? মনের দুঃখে তার কান্না পেতে লাগল। এক গালে আব ছিল, এখন দুই গালে দুটি আব নিয়ে সে কাঁদতে কাঁদতে গ্রামে ফিরে এল। গ্রামের ছেলেরা এই মজা দেখে হো হো করে হাততালি দিতে লাগল।