গরীবের ঘরে এমন সুন্দর মেয়ে কেউ কখনো দেখেনি। যেন পদ্মফুলটি! ছেঁড়া কাপড়, ময়লা সাজ, গায়ে গয়না নেই, তবু রূপ যেন ফেটে পড়ছে! যেখান দিয়ে চলে সেখানটা আলো করে যায়—কাঁদলে মুক্তা, হাসলে মানিক ঝরে।
এমন সুন্দর মেয়ে, বাপ-মার বড় ইচ্ছা তাকে ভালো করে খাওয়ায়, ভালো করে পরায়, গায়ে দুখানা গয়না দেয়; কিন্তু কোথায় পাবে,—দুবেলা তাদের আহারই জোটে না।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের রূপও বাড়তে লাগল। তাই দেখে গ্রামের সকলে বলাবলি করল, এ মেয়ে কখনো মানুষ নয়—নিশ্চয় কোনো দেবকন্যা! দেবতার পাপে গরীবের ঘরে জন্মেছেন।
বাপ-মার বড় ভাবনা হল। এমন রূপসী মেয়েকে নিয়ে কী করবে? এত রূপ কোথায় লুকোবে? এ রূপের কথা যদি রাজার কানো যায় তাহলে রক্ষা নেই, মেয়েকে তখনই কেড়ে নিয়ে যাবে!
বাপ-মায়ে ফন্দি আঁটতে লাগল, মেয়ের রূপ কী করে ঢাকবে। সে রূপ কি ঢাকা পড়ে? সোনার বরণ অঙ্গে ছাই মাখালে, ছাই ফুড়ে রূপের আভা ফুটে উঠল। মেঘের বরণ কেশের গোছা কেটে দিলে, চাঁদ মুখের শোভা উছলে উঠল। রূপ তাতে কম হল না।
গ্রামের মধ্যে এক নাপিত আছে। বুদ্ধিতে সে সকলের সেরা। বাপমা তার কাছে গিয়ে পড়ল। পরামর্শ চাইল কী করবে।
নাপিত ভায়া অনেক ভেবেচিন্তে বলল, দেখো, এক কাজ করো, মেয়ের মাথার মাপ দিয়ে একটা ধুচুনী তৈরী করাও। সে ধুচুনী পরলে যেন সমস্ত মুখটা ঢাকা পড়ে। মেয়ের মুখ ঢাকলেই রূপ ঢাকা পড়বে।
তাই হল। বড় দেখে একটু ধুচুনি তৈরী করিয়ে মেয়ের মাথায় এঁটে দিল। মেয়ের মুখ ঢাকা পড়ল, রূপও তাতে ঢাকল।
মা মেয়েকে বলে দিল, দেখিস মা, ধুচুনি কখনো খুলিসনি, তাহলে তোকে কোটালের লোক ধরে নিয়ে যাবে।
মেয়েটি সেই ধুচুনি পরেই বেড়ায়। ধুচুনি পরে বেড়ানো—এমন মজার সঙ গ্রামের কেউ কখনো দেখেনি। তারা সকলে আশ্চর্য হল। মেয়ের বাপমাকে জিজ্ঞেস করলে তারা কিছু বলত না।
সকলে ভাবল এ একটা পাগলামি। আসল কথাটি কেউ জানল না, জানলে কেবল নাপিত ভায়া আর মেয়ের বাপ-মা।
গ্রামের ছেলেগুলো ধুচুনি পরা দেখে ভারি মজা পেল। পথে মেয়েটি বেরোলেই কেউ ঠাট্টা করে, কেউ হাততালি দেয়, কেউ ধুচুনি ধরে টানে। মেয়েটির তাতে বড় রাগ হত, ইচ্ছা হত সেটা মাথা থেকে টেনে ফেলে দেয়, কিন্তু কোটালের লোক ধরে নিয়ে যাবে, এই ভয়ে তা করতে পারত না। মেয়েটির বয়স বেড়ে উঠল, মাথায়ও বড় হল; তখন ধুচুনিটা মাথার সঙ্গে একেবারে এঁটে গেল-টানলেও আর খোলা যায় না।
অনেক দিন গেল। গ্রামের কেউ আর মেয়ের মুখ দেখতে পায় না। সেইজন্যে তার রূপের কথা আর কারোর মনেই রইল না।
একদিন হল কী, মেয়েটির বাপ হঠাৎ মারা গেল। কিছুদিন পরে তার শোকে মাও গেল। মেয়েটি তখন অকূল পাথরে পড়ল, কোথায় যায়, কার দুয়ারে দাঁড়ায়, আর কেই বা খেতে দেয়!
বনে বনে কাঠ কুড়িয়ে, হাটে বেচে যা পায় তাই দিয়ে মেয়েটি কিছুদিন চলল। একদিন কাঠ কুড়িয়ে বাড়ী ফিরে দেখে তার বাপের কুঁড়েঢুকু ঝড়ে পড়ে গেছে, মাথা রাখবার আর ঠাঁই নেই। সে রাত্রি সে জলে-ঝড়ে গাছতলায় কাটালে। চোখের জলে ভিজে মাটি আরও ভিজিয়ে দিল।
সকালে জল-ঝড় থেমে গেছে, তখনও মেয়েটি সেই গাছতলায় বসে বসে চোখের জল ফেলছে। তাই দেখে এক চাষার মনে দয়া হল। সে তাকে নিজের বাড়ী যত্ন করে নিয়ে গিয়ে খেতে পরতে দিল।
মেয়েটি চাষার বাড়ীতে আছে। সেখানে খায়দায় আর রোজ চাষার সঙ্গে ক্ষেতে গিয়ে কাজ করে; ক্ষেতের ছোটখাট কাজকর্ম চাষা তাকে দিয়েই করিয়ে নেয়।
একদিন সকালে মেয়েটি ক্ষেতের আগাছা কাটছে; মহারাজ সেদিন রাজ্য দেখতে বেরিয়েছেন। সকালবেলায় দেখলেন মেয়েটি একমনে কাজ করছে, সন্ধ্যেবেলা সেইখান দিয়ে যাবার সময় দেখলেন, তখনও মেয়েটি কাজে ব্যস্ত। মেয়েটির মাথায় ধুচুনি দেখে তাঁর কেমন কৌতুহল হল। তিনি তার কাছে এগিয়ে গিয়ে কথা কইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাথায় ধুচুনি কেন?
মেয়েটিকে একথা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না, সে অবাক হয়ে মুখের পানে চাইল। ভাবল, লোকটা তো ভারি বোকা-একথাটা জানে না! তারপর বলল, নইলে যে কোটালের লোক ধরে নিয়ে যাবে!
মহারাজ একথার মানে বুঝতে পারলেন না। মনে ভাবলেন, এর কিছু কারণ আছে, কিন্তু মেয়েটিকে তা জিজ্ঞেস করায় ফল নেই। সে নিশ্চয়ই জানে না। তাই সেকথা আর না তুলে মেয়েটির আগাগোড়া পরিচয় নিলেন। মেয়েটির মিষ্টি কথায় মহারাজের প্রাণ গলে গেল। তারপর যখন তার দুঃখের কথা শুনলেন তখন তাঁর মনেও দুঃখ হল। মেয়েটির উপর কেমন একটা স্নেহ এল; তাকে তিনি নিজের বাড়ী নিয়ে যেতে চাইলেন। মেয়েটি রাজি হয়ে তাঁর সঙ্গে চলে গেল।
মেয়েটি সেদিন রাজবাড়ি পৌঁছল, সেইদিনই যুবারাজ পাঠশালার ছুটি পেয়ে বাড়ী এলেন। বাড়ীতে একটা আনন্দের ধূম পড়ে গেছে— খাওয়াদাওয়া চলছে। মেয়েটি কাজকর্মে ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যুবরাজের নজর তার দিকে পড়ল।
মেয়েটির রূপ কারো চোখে পড়েনি। কিন্তু তার গুণে বাড়ীর সকলে ভুলে গেল। একদিনের মধ্যে সবাই তার আপনার হয়ে পড়ল।
ধুচুনিপরা দেখে বাড়ীর সকলেই ভারি আশ্চর্য হল। সবাই তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল। সে মহারাজকে যা বলেছিল সকলকে তাই বলল,—নইলে কোটালের লোক ধরে নিয়ে যাবে যে!
সেকথা সবাই হেসে উড়িয়ে দিল। তারা ভাবল মেয়ের মুখটা দেখতে ভারি বিশ্ৰী, তাই তা ঢেকে রাখবার জন্যে এই ফন্দি! সে অতি কুৎসিত, এই কথা রাজবাড়ীর সবাই বলাবলি করতে লাগল।
যুবরাজ মেয়েটির সঙ্গে ভাব করলেন। ছুটিতে যতদিন বাড়ী রইলেন তার সঙ্গে গল্প করে, খেলা করে, বেড়িয়ে কাটিয়ে দিলেন। যাবার সময় তাঁর প্রাণটা কেমন কেঁদে উঠল, তাকে ছেড়ে যেতে মন চাইল না। বিদায় চাইবার সময় গলাটা কেমন কেঁপে এল, চোখের কোণে একটু জল এল, যুবরাজ তা সামলে নিয়ে বললেন, আবার ছ-মাস পরে ফিরে আসব; তুমি আমায় মনে রাখবে তো?
মেয়েটি কথা কইতে পারলে না, শুধু একটু ঘাড় নাড়ল। তারপর যখন সত্যই যুবরাজ চলে গেলেন তখন তার মন কেমন আঁধার হয়ে এল। যুবরাজ পাঠশালায় পড়েন; থেকে থেকে মেয়েটির কথা মনে পড়ে, পড়া ভুলে যান, গুরুমশায়ের কাছে ধমক খান। মেয়েটি বাড়ীর কাজকর্ম করে, যুবরাজের কথা মনে জাগে, কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায়, হাতের কাজ হাতেই থাকে। শেষ আর হয় না, বাড়ীর লোকে নিন্দা করে।
দেখতে দেখতে ছ-মাস কেটে যায়। যুবরাজ আবার বাড়ী ফিরে এলেন। বাড়ীর সকলের তাতে আনন্দ হল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আনন্দ হল মেয়েটির।
এইবার যুবরাজের বিয়ের কথা উঠল। রাজা-রাণী কনে ঠিক করলেন। বিয়ের আনন্দে সকলে মেতে উঠল। কিন্তু যুবরাজের মনে আনন্দ নেই, সদাই মুখটি ভার-ভার করে আছেন।
তাই দেখে রাজা-রাণীর ভাবনা হল। কীসের জন্যে ছেলের মনে দুঃখ হয়েছে তা লুকিয়ে লুকিয়ে খোঁজ নিলেন। জানতে পারলেন—এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে যুবরাজের ইচ্ছা হয়েছে। তাকে ছাড়া নাকি আর কাউকে তিনি বিয়ে করবেন না।
সর্বনাশ! কোথাকার কুরুপা কুড়োনো মেয়ে তার ঠিক নেই, ছেলে তাকে বিয়ে করতে চায়। রাজা-রাণী বললেন, তা কখনো হবে না! যুবরাজ বললেন,—তবে থাক, আমার বিয়ে হয়ে কাজ নেই। আপনার জন সবাই কত বলল, পাড়াপড়শিরা কত বোঝাল, যুবরাজ কিছুতে শুনলেন না।
কেউ বলল, ছোট ঘরের মেয়ে তোমার বাড়ী দাসী হয়ে আছে, তাকে তুমি বিয়ে করবে! লোকে শুনলে ছি-ছি করবে যে!
যুবরাজ বললেন, তা হোক।
কেউ বলল, ও মেয়ের তো রূপ নেই—ও যে বিশ্ৰী!
যুবরাজ বললেন, তা হোক।
কেউ বলল, মেয়ের যে মুখ দেখবার জো নেই—ধুচুনির ভিতর কী আছে, কে জানে?
যুবরাজ বললেন, তা হোক।
মেয়েটির উপর সকলের ভারি রাগ হল। তারা চটে উঠে বলল,— ডাইনি কোথাকার! আমাদের যুবরাজকে ভুলিয়েছিস!
এই কথা শুনে মেয়েটির মনে বড় কষ্ট হল। সে কথা না বলে শুধু চোখের জল ফেলতে লাগল। তাই দেখে যুবরাজের চোখেও জল দেখা দিল।
যুবরাজের গোঁ দেখে রাজা বললেন, যা খুশি করুক গে—আমি জানি না বাপু!
রাণী বললেন, তা বইকি—অমন কুরূপার সঙ্গে আমি ছেলের বিয়ে দিলুম। আর কী!
মেয়েটি দেখল, তাকে নিয়েই যত গোলমাল। তার জন্যে যুবরাজকে এই কষ্ট সইতে হচ্ছে। বাড়ীতে কারো মনে সুখ নেই। তাকে বিয়ে করলে যুবরাজের হয়তো মাথা হেঁট হবে, সবাই তাঁর নিন্দা করবে। সে ভাবল, আমি পোড়ারমুখীর জন্যে এত! দূর হোক গে। ছাই, মাথার ধুচুনি খুলে ফেলি, কোটালের লোক ধরে নিয়ে যাক—তাহলেই সব আপদ চুকে যাবে!
আমার কপালে যাই ঘটুক, যুবরাজের মান তাহলে নষ্ট হবে না তো! এই না ভেবে সে একটা কাস্তে এনে ধুচুনিটা টুকরো টুকরো করে ফেলল। এতদিনের ঢাকা মুখ খুলে গেল, মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ যেন বেরিয়ে পড়ল।
যুবরাজ সেইখান দিয়ে সে সময় যাচ্ছিলেন, তিনি তাই দেখে থমকে দাঁড়ালেন। রাজা-রাণী যাচ্ছিলেন তাঁরাও থমকে দাঁড়ালেন। সবাই অবাক হয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। মনে ভাবলেন, এমন রূপ কি মানুষের হয়?
রাণীমা আর থাকতে পারলেন না; ছুটে গিয়ে মেয়েটির মুখে চুমো খেলেন। মহারাজকে বললেন, মহারাজ, তুমি সব ঠিক করো, ছেলের আমি বিয়ে দেব—লক্ষ্মী আমার ঘরে এসেছেন।