যত নষ্টের গোড়া মগডালের ঐ কামরাঙা ফলটি।
বাড়ির খিড়কির দিকে বেশ অনেকখানি দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটা বাগান। মাঝখানে একটা পুকুর, তার চারিদিকে আম, জাম, নারকেল, সুপারির গাছ। কামরাঙার গাছটা ঘাটের এক পাশে।
দুপুর গড়িয়ে গেছে। এ-বেলার পাট সেরে খাওয়াদাওয়া করে যে-যার ঘরে এখন। বাড়ি একেবারে নিষুতি; আওয়াজের মধ্যে ঠাকুরমার ঘর থেকে রামায়ণ পড়ার গুণগুণানি ভেসে আসছে মাঝে মাঝে, উঠানের মাঝে সকড়ি বাসন-কোসন ঘিরে কাকেদের গজালি। বেড়ালটা কোথা থেকে কি চুরি করে খেয়ে এসে খিড়কির দোরের চৌকাঠের ওপর বসে বাঁ হাতে মুখটা মুছে নিল; তার মানে বাড়ির ভেতর এখন নিশ্চিন্ত বিশ্রামের পালা।
এইটি কামরাঙা অভিযানের সময়। ওদিকে বেশ চলছিল, তারপর মাঝখানে রবিবার নিয়ে দিনচারেকের ছুটি যাওয়ায় বাবা-কাকা-দাদার দুপুরে সবাই বাড়িতেই থাকত, সুবিধা হয় নি। তারপর কাল আবার কাকা গাছটা বিক্রি করে দিলে, ফোড়ে এসে সব ফল পাড়িয়ে নিয়ে গেল। আজ আর কামরাঙার লোভে আসা নয়, শোকে চোখের জল ফেলতে আসা বলা চলে।
ফোড়ে একেবারে মুড়িয়ে নিয়ে গেছে গাছটা; পাকা হলদে ফলে গাছটা যে অমন আলো করে রেখেছিল, তার একটাও নজরে পড়ে না। ঘুরে ঘুরে অনেক দেখল নীনা; না, একটাও নেই কোথাও। দাঁতে আঙুলের নখ খুঁটতে খুঁটতে ঘাটের বেঞ্চে এসে বসে পড়ল; পেছনে নূতন চালদা গাছটার একটা ছায়া পড়েছে।
অভিযানে ও একলা নয়, আরও আছে। গাছের ওপর থেকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে এসে তারই আসার প্রত্যাশায় নীনা মাঝে-মাঝে পুকুরের ওপারে চেয়ে চেয়ে দেখে নিচ্ছিল, সেখানে অর্ধচন্দ্রাকারে দেয়ালের খানিকটা ভেঙে গেছে। বীরু আসবে।
বীরুও নিত্য অভিযাত্রী একজন। আরও আছে, চন্দোর; কিন্তু বীরুর মতো অমন মনে-প্রাণে নয়। কাল যখন ফোড়ে পাড়াচ্ছে কামরাঙাগুলা সে কী দৃষ্টি দিয়ে যে দাঁড়িয়েছিল বীরু, মনে হচ্ছিল নীনার মনের কথা যেন একটি একটি করে বুঝতে পেরেছে নিজের মনে। এমন যে, নীনার কামরাঙার চেয়ে ওরই জন্যে যেন আরও বেশি করে কষ্ট হচ্ছিল। চলোও ছিল, কিন্তু অমন নয়। তার যেন কতকটা তামাশা দেখা গোছের, মাঝে মাঝে নীনার দিকে চেয়ে হাসতেও বাধে নি তার। সব সময় বেশ ভালোও লাগে না চন্দোরকে। নেহাৎ নাকি খেলার জুটী, তাই।…বীরুকে বড্ড ভালো লাগে নীনার। দু’চোখে খুঁজে পাচ্ছে না, বীরু এলে চারচোখে যদি পায়।
ওপারে অর্ধচন্দ্রের মাথায় বীরুর মুখটা ফুটে উঠল। তারপর সমস্তটা; তারপরই সে টুপ করে বাগানে লাফিয়ে পড়ল।
ঠিক এই সময় কামরাঙা গাছের মাথায় দুটো কাক উড়ে এসে ঝটাপটি লাগিয়ে দিলে। কাকে কামরাঙা খায় নাকি?…কামরাঙা খায় না এমন জীবও আছে নাকি?…নিজের প্রশ্ন আর নিজের উত্তরে নীনার চোখ দুটো আরও যেন সতর্ক হয়ে উঠেছে, তাইতেই নজর পড়ে গেল—ওদের ঝটাপটিতে যে গোটাকতক পাতা ঝরে পড়ল, তাতে সোনার মতো হলদে একটা টলটলে পাকা কামরাঙা বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
বীরু এসে পড়েছে। অনেকটা সান্ত্বনার স্বরে বলল—“মিছে খুঁজছিস, কাল একটা একটা করে তুলে নিয়ে গেছে ফোড়ে-ব্যাটা; দেখলুম ত দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছিল—যদি…”
দাঁতে দাঁতে পিষে একটা শব্দ করল।
নীনা বলল—“একটি আছে।”
“কই।”
“তাও একেবারে মগডালে।”
বীরু মাথাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল, বলল—“কই দেখতে পাচ্ছি না ত।”
“এই যে, সরে আয় না।”
টেনে নিয়ে পাশে বসিয়ে নিল নীনা, তারপর মাথায় মাথায় মিলিয়ে মাঝখান দিয়ে তর্জনীটা সন্তর্পণে তুলে নিয়ে বলল—“ঐ দেখ।”
মুখটা সরিয়ে নিয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল বীরু—“পেকে টসটসে হয়ে রয়েছে! না রে?”
চন্দোরও পাঁচিল টপকে এসে দাঁড়িয়েছে পাশে, প্রশ্ন করল—“আছে নাকি?”
নীনাই উত্তর দিল-—“একটি; তাও একেবারে মগডালে।”
তারপর একটু লুব্ধভাবেই জুড়ে দিলে—“কিন্তু এবারকার মত এইটেই শেষ, না ভাই?—তা একটির জন্যে কে গাছে উঠতে যাবে বল। কার এত গরজ?”
“বলিস ত উঠি না হয়।”
একেবারে শিউরে উঠল নীনা, বলল—“রক্ষে করো। শেষকালে ডাল ভেঙে হুড়মুড়িয়ে…”
বিপদের চরমটা আর বলে শেষ করল না।
দাঁতে নখ খুঁটতে খুঁটতে কি একটা ভাবছে চন্দোর। বার দুই আড় চোখে চাইল নীনা, তারপর বলল—“তাও বুঝতুম—হ্যাঁ, কতকগুলো রয়েছে একসঙ্গে। মোটে ত একটি।”
চন্দোর একটু মুচকি হেসে চাইল ওর দিকে; বীরুর দিকেও, বলল—“একটি বলেই ত আরও মজা। চমৎকার একটা ইয়ে হয়। এই এক্ষুনি পড়ে আসছি।”
—সাতমহুলা বাজার পুরী। তার একেবারে মাঝখানেকটিতে সোনার পালঙে মখমলের গদিতে শুয়ে আছেন কেশবতী রাজকন্যে। হাসলে তাঁর ঠোঁটে হীরে ঝরে, কাঁদলে চোখ বেয়ে পড়ে মুক্তো।
পড়ত বলাই ঠিক, কেন না রাজকন্যা এখন হাসেনও না কাঁদেনও না। সে এক বড় দুঃখের কাহিনী। একদিন রাজপুরীতে এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী এসে উপস্থিত হলেন, বললেন—“মহারাজ, আমি সারা পৃথিবী ঘুরেছি, বহু আশ্চর্য জিনিস সব দেখেছি—ভগবান কত সুন্দর আর কত সব আশ্চর্য আশ্চর্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন এই দেখে বেড়ানই আমার জীবনের ব্রত। ঘুরতে ঘুরতেই পাশের রাজ্যে শুনলাম আপনার মেয়ে নাকি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সব চেয়ে সুন্দর—তার নাকি হাসিতে হীরে ঠিকরে পড়ে, কান্নায় মুক্ত ঝরে। আমি তাকে দেখতে চাই একবারটি। যে ভগবানের এত দয়া পেয়েছে সে মহা পুণ্যবতী, তাকে আশীর্বাদ করে যেতে চাই আমি।”
রাজা ত মহা খুশী, সন্ন্যাসীকে আদর-অভ্যর্থনা করে বসিয়ে কেশবতীকে নিয়ে আসবার জন্যে ভেতরে খবর পাঠালেন।
ফল কিন্তু হ’ল উল্ট। রাজার মেয়ে, তিনি সাতমহল পুরীর মধ্যেই মানুষ হয়েছেন, নিজেও যেমনি সুন্দর তেমনি মন্দ কিছু দেখেন নি, মন্দ কিছুর কথা শোনেন নি জীবনে। হঠাৎ, মাথা থেকে চার দিকে দড়ির মতন কি ঝুলছে, খালি গায়ে এক গা চুল, একটা হরিণের ছাল পরা একটা লোককে দেখে শুধু প্রণাম করতেই ভুলে গেলেন না, হাসিও পারলেন না সামলাতে, আর সে হাসিতে হীরের টুকরো ছিটকে ছিটকে পড়তে লাগল চারিদিকে।
সন্ন্যাসীর চোখে আগুন উঠল জ্বলে। …কী! আমায় দেখে উপহাস্যি, দেমাক! তোর হাসি-কান্না দুই-ই আজ থেকে রইল বন্ধ। তুই অর্ধেক অচৈতন্য হয়ে থাকবি পড়ে, শুধু নিজের পাপের কথাটুকু থাকবে মনে, এদিকে না থাকবে কথা, না থাকবে ঠোঁটে হাসি, না থাকবে চোখে কান্না।
যেন বজ্রাঘাত হ’ল অমন সুখের রাজপুরীতে। রাজা পায়ে লুটিয়ে পড়লেন সন্ন্যাসীর, বললেন—“ভালোমন্দ কিছুই জানে না মেয়ে—যা করেছে তা উপহাস্যি নয়, পুরীর বাইরে পৃথিবীর কিছু দেখে নি বলেই তার এই দশা, সে একেবারেই নিরপরাধিনী, তাকে মাপ করুন সন্ন্যাসী।” অনেক করে বলতে, অনেক কান্নাকাটি করতে মনটা ভিজল সন্ন্যাসীর। বললেন—“বেশ, যা বলে ফেলেছি তা মিথ্যা হবে না; তবে এক উপায় বলে যাচ্ছি, দেখো যদি সম্ভব হয়। সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে অমুক রাজ্যে দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা একটা প্রকাণ্ড হ্রদ আছে। বিশাল বিশাল অজগর, বিশাল বিশাল কুমীরে ভরা সেই হ্রদের মাঝখানটিতে একটি ছোট্ট দ্বীপ, তার মাঝখানটিতে একটি বিশাল গাছ—তার মাথা গিয়ে আকাশে ঠেকেছে একেবারে—সেই গাছের একেবারে মগডালে একটি মাত্র হীরে-মোতির ফল—কত মানুষ তার লোভে যে সেই হ্রদে প্রাণ দিয়েছে তার হিসেব নেই। কেউ যদি সেই হীরে-মোতির ফল তুলে নিয়ে এসে তার রস নিঙড়ে রাজকন্যার মুখে দিয়ে দিতে পারে, তবে তার মুখে আবার কথা ফিরে আসবে; ঠোঁটে হীরে-ঠিকরানো হাসি ফুটবে, চোখে মুক্ত-ঝরা কান্না দেখা দেবে।”
এর জন্যে রাজার দিক থেকে কিন্তু কোন চেষ্টাই করা হবে না। কেন না কে এই ফল এনে দিতে পারবে হাতেই কন্যাকে সমর্পণ করতে হবে।
আধ-ঘুমন্ত আধ-জাগা হয়ে সোনার পালঙে শুয়ে আছেন কেশবতী কন্যে। শুকনো মুখে হাসি নেই, শুকনো চোখে একটা উদাস দৃষ্টি—কী পাপে আমার এ দশা?—কে আমায় সেই হীরে-মোতির ফল এনে দিয়ে আবার আমায় তোমাদের জগতে ফিরিয়ে নেবে গো? কী করে? কবে?
নিঝুম পুরী, কারুর মুখেই নেই আর হাসি, কেঁদে কেঁদে চোখের জলও শুকিয়ে গেছে সবার চোখে।
কেশবতী কন্যাকে বাঁচিয়ে তুলে তাকে পাওয়ার লোভে কত লোকে কুমীর অজগরের হ্রদে প্রাণ দিলে—শেষকালে দূর-রাজ্যের রাজপুত্র স্বপনকুমার তার বন্ধু কোটালপুত্র অরূপকুমারকে সঙ্গে করে, পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে…
বীরু বলল—“আমি রাজপুত্র স্বপনকুমার হব, কামরাঙাটা—মানে, হীরেমোতির ফল পেড়ে আনছি গাছে উঠে।”
“বাঃ, আমি যে গল্পটা শোনালুম!”
“আহা, গল্প না শুনলে যেন পাড়তুম না! বলে, যাচ্ছিলুমই উঠতে গাছে, সুদো বরং নীনাকে…”
নীনা অতটা পক্ষপাতিত্ব অবশ্য করল না, তবে সমাধান করে দিল একটা। বলল—“খেলাই যখন, মিলেমিশে করাই ভালো নয় ভাই? তুই গল্পটা বললি, বীরু উঠল গাছে। তুই হলি অরূপকুমার, বীরু হ’ল স্বপনকুমার। অরূপকুমার নামটিও বেশি মিষ্টি যেন। আমি ত তাই বলব।”
সাতমহলা পুরীর মধ্যে ঢুকে সোনার পালঙে গিয়ে শুলে অবশ্য চলবে না, বিপদ আছে ত? খিড়কি থেকে বেরিয়েই ডানদিকে গোয়াল ঘর। বুধীকে মাঠে চরাতে নিয়ে গেছে, তারই সিমেন্টের নাদাটায় মোটা করে বিচালি বিছিয়ে তার ওপর বুধীর গায়ের চটটা পেতে মখমলের গদি করে দেওয়া হ’ল। কেশবতী কন্যা একটু গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ে বলল—“যখন উঠছিসই কষ্ট করে বন্ধু কোটালপুত্রের গল্প শুনে, তখন একটু খুঁজেপেতে দেখবি আরও আছে কিনা; নষ্ট হবে ঝরে পড়ে। পোড়া কাকেদের যা উপদ্রব!…আর শোন, সত্যি রস নিঙড়ে দিতে যাস নে যেন।” মুখে জল এসে পড়ায় একটা ঝোলটানা শব্দ করে বলল—“এই চুপ করলুম আমি।”
দু’জনের দিকে চেয়ে একটু মুক্তঝরা হাসি হেসে ঠোঁট দুটি চেপে দিল।
কোটালপুত্র অবশ্য আর বন্ধু রইল না। মুখটা গোঁজ করে ঘাটের রাণার গিয়ে চুপটি করে বসে রইল খানিক্ষণ, তারপর রাজপুত্র যখন পুকুরটার চারিদিকে সাতবার চক্র দিয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে হীরে-মুক্ত ফলের গাছে চড়তে যাবে, সেও আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে পড়ল।
না, নামটা আর করে নি চন্দোর। মগডালে ও চড়ে নি তখন বীরু, তাহলে আর বোধ হয় কিছু বাকি থাকত না। আধা-আধি চড়েছে এমন সময় কানে গেল—“ওগো, উঠে দেখো এসে কে যেন তোমাদের কামরাঙা গাছে চড়েছে!!”
সঙ্গে সঙ্গে জ্যাঠামশাইয়ের গলা—“কে রে? দাড়া, আসি।”
নেহাৎ পৌঁছায় নি মগডালে, তাই, নইলে হীরে-মোতির ফল পাড়তে গিয়ে আর সবারই যা হয়েছে তাই হয়ে যেত, পুরোপুরিই মিলে যেত গল্পটা।… বীরুর যখন জ্ঞান হ’ল তখন দেখে সে নীনার জ্যাঠাইমার কোলে ঘাটের বেঞ্চের ওপর, জলের ঝাপটায় মাথা ভিজে, গেঞ্জি জামা সব ভিজে; হাতের মাঝখানে একটা কনকনানি, নীনার মা নীচের বসে হাতটা তুলে ধরেছেন।
চারিদিকে ভিড়; বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসেছে। প্রশ্ন, প্রশ্নের আকারেই তিরস্কারও কিছু কিছু। তার সঙ্গে আহা-গো, বাছারে!—ও আছে। নীনার জ্যাঠাইমার গলা—“গেল বাড়িতে খবর দিতে কেউ?…কত দেরি হচ্ছে রিকশা ডেকে আনতে? হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তোলা দরকার আগে যে, কি হ’ল, না হ’ল।”
চোখ আবার জড়িয়ে আসছে বীরুর; কান্না পাচ্ছে।…মা এসেছে, চোখে আঁচল, বাবাও এসেছেন।…দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল সবাই। যেন মার গলা—“না, একবারটি বাড়ি নিয়ে চলো, বাছা আমার আর ফিরবে কিনা…”
বাড়ির সদরে ভিড় নেই। বাড়িটা ওদের একটেরেও ত। বাড়ির মধ্যে থেকে হাঁটতে হাঁটতেই বেরিয়ে এল, বাবার গায়ে ভর করে। মা গায়ে ডান হাতটা রয়েছে চেপে, বাঁ হাতে আঁচল তুলে চোখ মুছছে। বাবা বললেন—“অত হেদোয় না, তবে ফাঁড়া কেটে গেল একটা বটে।”
একটু দাঁতে চেপে বলেন—“শুধু ক’টা ফাঁড়া যে কাটাতে পারবেন, সেইটাই জানি না।”
রিকশায় উঠে বসল, পাশে বাবা। মার ভুল হয়ে গেছে, যেমন প্রায়ই হয়। বলল –“এই দেখো মরণ আমার! মা চণ্ডীর ফুল দোব একটু যে!”
বাবা একটু রেগে বললেন—“শীগগির।” তারপর দেরি হচ্ছে দেখে ডাকলেন, তারপর নেমে পড়ে গজগজ করতে-করতে তিনিও চলে গেলেন ভেতরে, রিকশাওলাটাকে পাশে দাঁড় করিয়ে।
ভালোই হ’ল একরকম; নীনারা এসে পড়েছে; নীনা আর চন্দোরও। শুকনো মুখ দুজনের। নীনার মুখের কথা, ঠোঁটের হাসি, চোখের জল কি সত্যিই মিলিয়ে গেল জটাধারী সন্ন্যাসীর শাপে?… চন্দোরের ওপরও আর রাগ নেই বীরুর—আহা বেচারি। তার দোষেই ত এরকমটা হ’ল!
কি বলবে কি করবে যেন বুঝে উঠতে পারছে না বীরু। কিছু যেন বলতেই হয়। তার নিজের জন্যেও, ওদের দুজনের জন্যে একটু দুঃখ, একটু সান্ত্বনা, একটু হয়তো আক্রোশও চন্দোরের ওপর।…বাবা, মা বেরিয়ে আসছেন।
কথাও বেরুল বীরুর—এ বেশ হ’ল ভাই, না?…মিথ্যে মিথ্যে খেলতে খেলতে কেমন সত্যিই হাসপাতালে যাচ্ছি?”
কেশবতী কন্যার চোখে মুক্তো ঝরল, ঠোঁটে দুটি হীরের কুঁচিও।